করিম সাহেব বললেন, স্যার আমার মেয়ে পুষ্প। আমার একটাই মেয়ে।
ময়মনসিংহে থাকে। হােস্টেলে থেকে পড়ে। এইবার আই—এ দেবে। পরীক্ষার ছুটি দিয়েছে। ও ভেবেছিল হােস্টেলে থেকে পড়াশােনা করবে। আমি বললাম, মা চলে আয়। একা একা থাকি। সে চলে এসেছে। চলে আসায় খুবই ক্ষতি হয়েছে। ঘর সংসার সবই এখন তার দেখতে হয়। এখন ভাবছি হােস্টেলে দিয়ে আসব।
পুষ্প মেঝেতে ট্রে রেখে এগিয়ে এসে পা ছুঁয়ে সালাম করল। শওকত সাহেব খানিকটা বিব্রত বােধ করলেন। কদমবুসি করলে মাথায় হাত দিয়ে আশীবাদের কিছু কথা বলার নিয়ম আছে। তিনি কখনাে তা পারেন না।
পুষ্প বলল, স্যার আপনার শরীর কেমন?
মেয়েও বাবার মতই তাকে স্যার ডাকছে। প্রশ্ন করেছে বােকার মত। তিনি যদি এখন – শরীর ভাল, না বলে বলেন – শরীর খুবই খারাপ’ তাহলেই মেয়েটি হকচকিয়ে যাবে। পরের কথাটা কি বলবে ভেবে পাবে না।
তিনি অকিয়ে আছেন পুষ্পের দিকে। | মেয়েটিকে অস্বাভাবিক রকমের স্নিগ্ধ লাগছে। স্নান করার পর পর ক্ষণস্থায়ী যে স্নিগ্ধতা চোখে মুখে ছড়িয়ে থাকে সেই স্নিগ্ধতা। মেয়েটি কি এখানে আসার আগে স্নান করেছে? সম্ভবত করেছে। চুল আদ্র ভাব। মেয়েটির গায়ের রঙ অতিরিক্ত ফর্সা। শুধুমাত্র ফর্সা রঙের কারণে এই মেয়েটির ভাল বিয়ে হবে। মেয়েটার মুখ গােলাকার। মুখটা একটু লম্বাটে হলে ভাল হত। একে কি রূপবতী বলা যাবে? হ্যা যাবে। মেয়েটি রূপবতী তবে আকর্ষণীয় নয়।
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ
রূপবতীদের দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে কিন্তু কাছে যেতে ইচ্ছে করে না। যারা আকর্ষণীয়া তারা নিজেদের দিকে প্রবল ভাবে আকর্ষণ করে। | মােফাজ্জল করিম সাহেব বললেন, ওর নাম স্যার আসলে পুষ্প না। ওর ভাল নাম নাজনীন। আমরা ডাকতাম নাজু। একদিন ওর বড় মামা এসে বললেন, নাজু, ফাজু আবার কি রকম নাম। এত সুন্দর মেয়ে – এর নাম হল পুষ্প। সেই থেকে পুষ্প নাম।
শওকত সাহেব কেন জানি বিরক্তি বােধ করছেন। পিতা এবং কন্যা আগ্রহ নিয়ে তার সামনে বসে আছে। এরা তার কাছ থেকে মুগ্ধ ও বিস্মিত হবার মত কিছু শুনতে চায়। এমন কিছু যা অন্য দশজন শুনাবে না, তিনিই বলবেন। এক ধরনের অভিনয় করতে হবে। অন্যদের থেকে আলাদা হবার অভিনয়। আশে পাশের মানুষদের চমৎকৃত করতে হবে। পৃথিবীর সব বড় মানুষরাই গ্রহের মত। তাদের আশে পাশে যারা আসবে তারাই উপগ্রহ হয়ে গ্রহের চারপাশে পাক খেতে হবে। কোন মানে হয় না।
মেয়েটা এসেছে। আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তাকে কিছু একটা বলতে হবে। ইন্টারেস্টিং কিছু। কিছুই মাথায় আসছে না। তিনি এক ধরনের যন্ত্রণা বােধ করছেন।
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ
তিনি থেমে থেমে বললেন, পুষ্প খুব ভাল নাম। তবে পূষ্প না হয়ে কোন বিশেষ ফুলের নামে নাম হলে আরাে ভাল হত। অনেক আজে বাজে ধরনের ফুলও কিন্তু আছে। যেমন ধুতরা ফুল। বিষাক্ত ফুল। আবার কুমড়া ফুলও ফুল, সেই ফুল আমরা বড়া বানিয়ে খাই।
পুষ্প তাকিয়ে আছে। এক পলকের জন্যেও চোখ সরাচ্ছে না। মেয়েটির চোখে এক ধরনের কাঠিন্য আছে। সতেরো আঠারাে বছরের মেয়ের চোখে এ জাতীয় কাঠিন্যতো থাকার কথা না। এদের চোখ হবে হ্রদের জলের মত। স্বচ্ছ, গভীর এবং আনন্দময়।
করিম সাহেব বললেন, স্যার হাতটা ধুয়ে ফেলেন। রাততাে অনেক হয়েছে। আপনার নিশ্চয়ই ক্ষিধে লেগেছে।
শওকত সাহেব বললেন, আপনি কিছু মনে করবেন না। আমি রাতে খাব না। ‘সেকি ? ‘শরীর ভাল লাগছে না।” ‘ভাল না লাগলেও চারটা খাওয়া দরকার। রাতে না খেলে শরীরের এক ছটাক রক্ত চলে যায়। ‘রক্ত চলে গেলেও কিছু করার নেই। আমার যা ভাল লাগেনা আমি কখনােই তা করি না। ‘কিছুই খাবেন না স্যার?
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ
পুষ্প মৃদুস্বরে বলল, এক গ্লাস দুধ দিয়ে যাই? ‘না–দুধ আমি এম্নিতেই খাই না। রাতে যদি ক্ষিধে লাগে আমার সঙ্গে বিস্কিট আছে। ঐ খেয়ে পানি খেয়ে নেব। আমার সম্পর্কে আর কিছুই চিন্তা করতে হবে। করিম সাহেব বললেন, খাবারটা ঢাকা দিয়ে রেখে যাব? ‘না। ভাত তরকারী পাশে নিয়ে ঘুমুতে ভাল লাগবে না। করিম সাহেব মেয়ের দিকে তাকালেন। বেচারী মুখ কালাে করে ফেলেছে। আহা কত আগ্রহ নিয়ে সে রান্না বান্না করেছে। নীচে ফিরে গিয়ে নিশ্চয়ই কাদবে!
করিম সাহেব বললেন, আর কিছু না খান। এক টুকরা ভাজা মাছ কি খাবেন? ডুবা তেলে ভাজা। ডুবা তেলে ভাজা হােক আর ভাসা তেলেই ভাজা হােক আমি খাব না। আমার একেবারেই ইচ্ছে করছে না। পিতা এবং কন্যা বের হয়ে গেল।
দু’জন অসম্ভব মন খারাপ করেছে। ঘর থেকে বেরুবার আগে পুষ্প এক পলকের জন্যে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকাল শওকত সাহেবের দিকে। এবারের চোখের দৃষ্টি আগের মত নয়। সম্পূর্ণ অন্য রকম। চোখের মণিতে হ্রদের জলে আকাশের ছায়া। যে আকাশে মেঘের পরে মেঘ জমেছে।
শশাবার ঘরটা শওকত সাহেবের খুব পছন্দ হয়েছে। হলঘরের মত বিরাট ঘর। দু‘পাশেই জানালা। জানালা দুটিও বিশাল। এক সঙ্গে অনেকখানি আকাশ দেখা যায়। কালাে রঙের প্রাচীন খাট।
খাটে বিছানাে চাদর থেকে ন্যাপথলিনের গন্ধ আসছে। খাটের পাশের টেবিলে কেরােসিনের টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। টেবিল ল্যাম্পের এই আলােতেও এক ধরনের রহস্য আছে।
Read more
