নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

নীল অপরাজিতা

বাতাসের সঙ্গে আলো কাপছে। সেই সঙ্গে কাপছে দেয়ালের ছায়া। মশা নেই বলেই বােধ হয় মশারি নেই। কতদিন পর তিনি মশারি ছাড়া ঘুমুচ্ছেন। নিজেকে কেমন যেন মুক্ত মানুষ বলে মনে হচ্ছে। 

অষ্টাঙ্গ সংগ্রহ তার হাতে। ঘুমুবার আগে আরাে কয়েকটা পাতা ওল্টানাে যাক। বইটিতে ঘুমুবার নিয়ম কানুনও দেয়া আছে। 

আটবার শ্বাস নিতে যেই সময় লাগে সেই সময় পর্যন্ত চিৎ হইয়া তাহার দ্বিগুণ সময় ডান পার্শ্বে, তাহার চারগুণ সময় বাম পার্শ্বে শয়ন করিয়া তারপর যেইভাবে শুইয়া আরাম পাওয়া যায় সেইভাবে শুইতে হয়। নাভির বাম দিকে অগ্নি অবস্থান করে। সুতরাং বাম পার্শ্বে শয়ন করা উচিত। 

তিনি ঠিক বই–এর মত নিয়মে শােবার চেষ্টা করলেন। যদিও খুব ভালমতই জানেন যে ভাবেই শােয়া হােক রাত কাটবে নিঘুম। এখন পর্যন্ত নতুন জায়গায়। প্রথম রাতে তিনি কখনাে ঘুমুতে পারেন নি। নিঘুম রাত কাটাতে তার খারাপ লাগে । বরং বলা চলে ভাল লাগে। ভাববার সময় পাওয়া যায়। আজকাল কোন কিছুর জন্যেই সময় বের করা যায় না। একান্ত ভাববার জন্যে যে সময় সব মানুষের দরকার সেই সময় কি আমরা দিতে পারি ? কর্মক্লান্তি দিনের শেষে লম্বা ঘুম, আবার ব্যস্ত দিনের শুরু। 

জেগে থাকার এক ধরনের গােপন ইচ্ছা ছিল বলেই বােধ হয় অল্প সময়ের ভেতর ঘুমে তার চোখ জড়িয়ে এল। ঘুমিয়ে তিনি বিচিত্র একটি স্বপ্ন দেখলেন। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

এই ঘরেই খাটে তিনি শুয়ে আছেন। তাঁর মন কি কারণে অসম্ভব খারাপ। বুকের ভেতর এক ধরনের কষ্ট হচ্ছে। এমন সময় দরজা খুলে গেল। হারিকেন হাতে ঢুকলাে পুষ্প। পুষ্পকে কেমন বউ বউ দেখাচ্ছে। তিনি খানিকটা হকচকিয়ে গেছেন। এই গভীর রাতে মেয়েটি তার ঘরে কেন? পুষ্প হারিকেন টেবিলের উপর রাখতে রাখতে বলল, তুমি এখনাে ঘুমাও নি? তিনি অসম্ভব চমকে উঠলেন। মেয়েটি তাকে তুমি তুমি করে বলছে কেন? 

পুষ্প খুব সহজ ভঙ্গিতে খাটে পা ঝুলিয়ে বসল। অভিমানী গলায় বলল, আচ্ছা শোন, তুমি এত ভূল কথা বল কেন? 

তিনি মনের বিস্ময় চাপা দিয়ে বললেন, ভুল কথা কি বললাম? 

‘ধুতরা ফুল বুঝি বিষাক্ত? মােটেই বিষাক্ত নয়। ধুতরার ফল বিষাক্ত। বুঝলেন জনাব ? 

বুঝলেন জনাব বলে পুষ্প খুব হাসছে। খুব পা নাড়াচ্ছে। কে ? এই মেয়েটা কে? হচ্ছে কি এসব? 

তঁার ঘুম ভেঙ্গে গেল। সবে ভাের হয়েছে। গাছে গাছে অসংখ্য পাখি ডাকছে। 

মােফাজ্জল করিম সাহেব ফজর ওয়াক্তে ঘুম থেকে উঠেন। 

হাত মুখ ধােয়ার আগেই চুলা ধরিয়ে ভাতের হাড়ি চাপিয়ে দেন। ওজু করে নামাজ শেষ করতে করতে চাল ফুটে যায়। মাড় গেলে আগুন–গরম ভাতে তিন চামুচ ঘি ঢেলে খাওয়া শুরু করেন। খাওয়া শেষ হতে হতে সূর্য উঠে যায়। তিনি রওনা হয়ে যান স্কুলে। স্কুল তাঁর বাড়ি থেকে আড়াই মাইল। বর্ষাকালে নৌকায় অনেক ঘুরপথে যেতে হয়।

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

দু’ থেকে আড়াই ঘণ্টার মত লাগে। স্কুলে পৌছতে হয় অটিটার আগে। যারা এবার এস.এস.সি দিচ্ছে তাদের স্পেশাল কোচিং হয়। আটটা থেকে দশটা। তাঁর উপর দায়িত্ব হল অংক এবং ইংরেজীর। আগে শুধু অংক করাতেন। নলিনীবাবু দেখতেন ইংরেজী। নলিনীবাবুর হাঁপানির টান খুব বেড়ে যাওয়ায় কিছুদিন ধরেই আসছেন মা। করিম সাহেবের উপর ডাকল দায়িত্ব 

পড়ে গেছে। খুব চাপ যাচ্ছে। স্কুল থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। সন্ধ্যায় বাসায় ওসি সাহেবের এক শালা পড়তে আসে। মহা মূখ। এক মাস টেন্দ পড়াবার পর জিজ্ঞেস করলেন, আমি বাড়ি যাই ইংরেজী কি ? সে পাঁচ মিনিট চিন্তা করে বলল I am home going. তিনি প্রচন্ড থাবড়া দিলেন। সে আগের চেয়েও গম্ভীর গলায় । বলল, I home going. তাঁর ইচ্ছা করছিল শক্ত আছাড় দেন। একে বলে পন্ডশ্রম। 

আজ করিম সাহেব ঘুম থেকে উঠে দেখেন পুষ্প তার আগেই উঠে বসে আছে। কেরােসিনের চুলায় চাল ফুটছে। তিনি খুশী গলায় বললেন, তুই এত সকাল সকাল উঠলি যে। রাতে ঘুম ভাল হয় নাই? 

‘হয়েছে। 

‘সকালে উঠে ভাল করেছিস মা। সুন্দর করে কয়েকটা পরােটা বানিয়ে ফেল। উনি রাতে না খেয়ে ঘুমিয়েছেন। ক্ষিধে নিয়ে ঘুম ভাঙ্গবে। গােস্ত পরােটা দিবি। আর একটা ডিম ভেজে দিস। 

‘তুমি থাকবে না বাবা? 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

না। একদিন কামাই হয়ে গেছে। অংক হল প্রাকটিসের ব্যাপার। পরপর দুই দিন কামাই দিলে সব ভুলে যাবে। সব গরু গাধার দল। 

একা একা উনার কাছে নাশতা নিয়ে যাব বাবা ? ‘হুঁ। 

‘আমার কেন জানি ভয়–ভয় করে। কি গম্ভীর। কাল রাতে একটা কথাও বললেন না। আমি জানি আঞ্জও বলবেন না। নাশতাও খাবেন না। তাছাড়া আমার 

পরােটাও ভাল হয় না বাবা। 

‘তুই একটা ভুল করছিস মা। এই সব মানুষ খাওয়া–খাদ্য নিয়ে মােটেই মাখা ঘামায় না। তুই পােলাও–কোর্মা দিলে যেভাবে খাবেন, ডাল–ভাত দিলেও একইভাবে খাবেন। কিছুক্ষণ পর তুই যদি জিজ্ঞেস করিস, কি দিয়ে খেলেন? বলতে পারবে না। হা করে তাকিয়ে থাকবে। 

পুষ্প হেসে ফেলল। করিম সাহেব বললেন, হাসছিস কেন? 

তুমি যেভাবে কথা বলছ তাতে মনে হয় – এই রকম মানুষ তুমি কত দেখেছ। আসলে এই প্রথম দেখছ। 

‘দেখতে হয় না মা। আন্দাজ করা যায়। ‘ভদ্রলােককে তােমার কি খুব পছন্দ হয়েছে? 

 

Read more

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *