পুষ্পের গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। তাদের বাড়ি গ্রামের এক প্রান্তে। আশে–পাশে কোন বাড়ি–ঘর নেই যে সে ছুটে গিয়ে বলবে – আমার বড় বিপদ। আমাকে একটু সাহায্য করুন।
শওকত সাহেব নিঃশব্দে উপস্থিত হলেন। পুষ্প হারিকেন উচিয়ে ধরল। তিনি লজ্জিত ও বিব্রত গলায় বললেন, ঝড়ের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। চশমা টশমা ভেঙ্গে একাকার করেছি।
পুষ্প কিছুই বলল না। | ‘চিনতে পারছ তাে আমাকে? কাদা মেখে ভূত হয়ে আছি। তােমাদের বাড়িতে ডেটল জাতীয় কিছু আছে? হাত কেটে ফেলেছি।
পুষ্প হারিকেন উচু করে ধরেই আছে। কিছু বলছে না। মনে হচ্ছে সে একটা ঘােরের মধ্যে আছে।
‘তুমি বােধ হয় খুব দুঃশ্চিন্তা করছিলে। এমন ঝড় শুরু হবে কল্পনাও করিনি। তবে মজার ব্যাপার কি জান –1 enjoyed it. শুধু তাই না –1 enjoyed it thoroughly. করিম সাহেব কোথায় ? উনি ফেরেননি?
‘তুমি পুরাে ঝড়ের সময়টা একা ছিলে?
‘জি। আপনি কূয়াতলায় আসুন। কাদা ধুয়ে তুলুন। আমি সাবান এনে দিচ্ছি। হাত কতটা কেটেছে?”
‘বেশী না।”
‘দেখি।
তিনি হাত মেলে ধরলেন। অনেকখানিই কেটেছে। রক্তে মাখামাখি হয়ে আছে।
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ
‘কুয়াতলা কোন দিকে? আমি এখন প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। হারিকেনটা ভালমত ধর।।
পুষ্প বলল, চশমা ছাড়া এখন আপনার চলবে কি করে? ‘স্যুটকেসে আমার আরেকটা চশমা আছে।
শওকত সাহেব মাথায় প্রায় তিন বালতি পানি ঢেলে ফেললেন। পুষ্প বলল, আর পানি দেবেন না ঠাণ্ডা বাধিয়ে বসবেন।
তিনি হাসিমুখে বললেন, পানিটা গরম, গীয়ে ঢালতে খুব আরাম লাগছে। বৃষ্টির পানি কি যে ঠাণ্ডা ছিল কল্পনাও করতে পারবে না। মনে হচ্ছিল শীতে জমে যাচ্ছি। শােন পুষ্প, তােমাকে এখানে দাড়িয়ে থাকতে হবে না – তুমি খুব কড়া করে এক কাপ চা বানাও।
পূষ্প নড়ল না। সে তােয়ালে হাতে দাঁড়িয়ে আছে। পুষ্প আবার বলল, আর পানি ঢালবেন না। আপনি নির্ঘাৎ অসুখ বাঁধাবেন। | ‘আমার কিচ্ছু হবে না। আমি হচ্ছি ওয়াটার প্রুফ। যখন ক্লাশ টেনে পড়ি তখন একবার বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে পৌষ মাসের শীতে পুকুরের পানিতে সারারাত গলা ডুবিয়ে বসেছিলাম। যদি অসুখ না বাধাই তাহলে একশ টাকা পাব। এই ছিল বাজী। বাজীতে জিতে একশ টাকা পেলাম এবং “ওয়াটার প্রুপ” টাইটেল পেলাম। এদিকে আমার বন্ধুরা যারা সারারাত পুকুর পাড়ে বসেছিল তাদের প্রত্যেকের ঠাণ্ডা লেগে গেল। একজনতাে নিউমােনিয়ায় মর মর হল। যে পুষ্প এতক্ষণ গম্ভীর হয়েছিল সে খিল খিল করে হেসে উঠল।
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ
তিনি বললেন, তুমি দেখি হাসতেও পার। আমি ভেবেছিলাম তুমি হাসতে পার না।
পুষ্প বলল, আপনি কি সত্যিই ওয়াটার প্রুফ টাইটেল পেয়েছিলেন ? সত্যি পেয়েছিলাম। একটা রাবার স্ট্যাম্প বানিয়ে ছিলাম যেখানে লেখা
Md. Shawkat
- W. P.
- w. P. মানে ওয়াটার প্রুফ। বুঝলে পুষ্প, কেন জানি খুব আনন্দ লাগছে। কারণটা ধরতে পারছি না।।
পুষ্প বলল, আমি বলব কারণটা কি?
‘বল তাে।
‘ঝড়ের সময় আপনি খুব ভয় পেয়েছিলেন। ভেবেছিলেন মারা যাচ্ছেন। যখন দেখলেন মারা যাননি এবং ঝড় শেষ হয়েছে তখন আনন্দে মন ভরে গেল।
‘যুক্তিতাে তুমি ভালই দিয়েছ। ভেরি গুড। আই লাইক ইট। তােমার বুদ্ধি তাে ভালই।
‘আপনি কি ধরেই নিয়েছিলেন বুদ্ধি খারাপ হবে ? ‘খারাপ হবে ধরিনি। এভারেজ বুদ্ধি ধরেছিলাম। ভালও না। খারাপও না। ‘আপনি কি নিজেকে খুব বুদ্ধিমান মনে করেন। ‘া করি। তুমি কর না?” ‘া আমিও করি।
‘ওয়াটার প্রুফ টাইটেল রাখা তার সম্ভব হল না। গােসল শেষ করে গা মুছতে গিয়ে মনে হল জ্বর আসছে। হাত–পা কেমন জানি করছে। মাথা ভার ভার হয়ে গেছে। পুরােপুরি নিশ্চিত হবার জন্যে নিজের ঘরে ঢুকে সিগারেট ধরালেন। সিগারেট বিস্বাদ লাগল। তিনি বিছানায় শুয়ে পড়লেন। গায়ে চাদর টেনে দিলেন। চাদরে শীত মানছে না। পুষ্পকে বলতে হবে কম্বল–টম্বল দিয়ে যেতে।
নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ
কম্বলের কথা মনে আসতেই – দু‘লাইনের কবিতাও মনে এসে গেল।
“ভঞ্জের পিসি তাই সন্তোষ পান
কুঞ্জকে করেছেন কম্বল দান।” এখন এই কবিতা মাথার ভেতর ক্রমাগত ঘুরপাক খেতে থাকবে। কিছুতেই মাথা থেকে তাড়ানাে যাবে না।
ভঞ্জের পিসি তাই সন্তোষ পান।
কুঞ্জকে করেছেন কম্বল দান। স্বাতীকে এই কবিতা তিনি শুনাতেন। অতি দ্রুত আবৃতি করতেন। স্বাতী কিছু না বুঝেই হাত তালি দিত এবং খিলখিল করে হাসত। হামাগুড়ি দিয়ে তার কাছে এগিয়ে আসত। একবার স্বাতী খাটে বসে আছে – তিনি ঘরে ঢুকে দ্রুত কবিতা পড়লেন। স্বাতী হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসতে গিয়ে খাট থেকে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল।
রেনু ছুটে এসে মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে – চিৎকার করে উঠল – কি হয়েছে? আমার মেয়ের কি হয়েছে?
রেনুর সেই হাহাকার এখনাে বুকে বিঁধে আছে। কবিতার সঙ্গে সঙ্গে সেই
Read more
