লরির ড্রাইভারের পাশে বসে বাড়ির দিকে ফিরতে ফিরতে দীপাবলী আঁচল টেনে মাথায় ঘােমটা দিল গরম হলকার থেকে বাঁচার জন্যে। আঁচলে মুখ মুড়ে তার হঠাৎ ‘ মনে হল অর্জুন যেন তাকে আজ অবহেলা করল। আবার এটাও তাে ঠিক লরি পাওয়া না । গেলে সে কি করত তা জানা নেই, পেলে অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করত অর্জুন তার জিপ দিতে চাইলে। এই গরমে জিপ না লরি, কোনটিতে শহরে যাওয়া বেশী আরামপ্রদ তাই সে বুঝতে পারল না।
বাড়িতে পৌছে দীপাবলী লরিওয়ালাকে শহরে যাওয়ার কারণটা বলল। শুনে লােকটা
যেন আতকে উঠল, না মেমসাহেব, ওরকম করবেন না। ওইভাবে লরির ওপর শুইয়ে রুগী নিয়ে গেলে শহর পর্যন্ত আর বাঁচবে না।
দীপাবলী বিরক্ত হল, ‘আশ্চর্য, মাথার ওপর একটা ছাউনি দিতে বলছি না ?
ছাউনি ? তিন পাশ কি করবেন ? তিন পাশ দিয়ে গরমহাওয়ার ঝাপট আসবে যখন * তখন কি করবেন? আপনি বাবুর জিপ নিলেন না কেন?
দীপাবলী একটু অসহায় বােধ করছিল। ড্রাইভার একটু উইগাই করে বলল, আপনি যদি ওকে সামনের সিটে বসিয়ে নিতে যেতে পারেন তাহলে হতে পারে।
দীপাবলী মাথা নাড়ল, না, বসিয়ে নেওয়া অসম্ভব।
তখন ড্রাইভার বলল, তাহলে আমাকে আধ ঘণ্টা সময় দিন। পেছনটা ভাল করে ঢেকেঢুকে নিয়ে আসি। তবে যদি কোন ট্যাক্সি পেয়ে যাই পাঠিয়ে দেব।
রাজি না হয়ে উপায় ছিল না । লােকটি লরি নিয়ে ফিরে গেল দীপাবলী দরজা বন্ধ করে চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে তিরিকে জিজ্ঞাসা করল, কেমন আছে রে ?
সাতকাহন পর্ব-(২১)
‘একই রকম। মাকে খুঁজছিল! তিরি দরজায় দাঁড়িয়ে জবাব দিল। ভুল শুনল দীপাবলী, ‘আমাকে ? তােমাকে কে বলল ? ওর মাকে! ঢোঁক গিলল দীপাবলী, ‘খুঁজছিল মানে ? জ্ঞান ফিরেছে ? ‘না। শুধু কয়েকবার মা মা বলেছে। তুমি কিছু খাবে ?
না। দীপাবলী চোখ বন্ধ করল। এর মধ্যে যে রােদ এবং হলকা লেগেছে তাতেই শরীর কাহিল লাগছিল। মনে হচ্ছিল সব রক্ত যেন শুষে নিয়েছে। ঝিমুনি আসছিল। জন্মলগ্নে ঈশ্বর যার কপালে– ! এই অবস্থাতেই হেসে ফেলল সে। চিরদিন, জ্ঞান হবার পর থেকে ভেবে এসেছে নিজের কাজ দিয়ে ভাগ্যকে জয় করবেই। অথচ দুভাগ্য তাকে কোন না কোনভাবে একের পর এক জড়াবেই। আর কতদিন এই লড়াই চালাতে হবে জানা নেই। হয়তাে আমৃত্যু। নইলে শমিতের এখানে আসার কথা ছিল না। যার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠার মুহূর্তেই সম্পর্কের ছেদ ঘটিয়ে চলে এসেছে, সে কেন আমােক তার কাজের জায়গায় এসে ইচ্ছে করে অসুখ বাধিয়ে বসবে ? জেনেশুনে তাকে বিপাকে ফেলা। এ ব্যাপারে সে অঞ্জলির কাছে কৃতজ্ঞ। কয়েক বছর আগে মনােরমার পা ভেঙে যাওয়ার খবর দিয়ে টাকা চাওয়া ছাড়া আর কোনভাবেই তাকে বিরক্ত করেনি মহিলা।
যাকে জন্মানাের পর থেকেই মা বলে জেনেছে, তার পড়াশুনার পেছনে যে মহিলার অবদান সবচেয়ে বেশী, তিনি পরবর্তীকালে যতই দুর্ব্যবহার করুন না কেন হাত বাড়িয়ে কিছু চাইলে তার পক্ষে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হত না। কিন্তু মহিলা চাননি। নীরবে যােগাযােগ বিচ্ছিন্ন করেছেন। চাকরি পাওয়ার পর নিজের প্রতিজ্ঞার কথা মনে রেখে দীপাবলী প্রতি মাসে কিছু টাকা পাঠায়।
সাতকাহন পর্ব-(২১)
প্রতুলবাবুর কাছ থেকে হাত পেতে অমরনাথ যে টাকা তার পড়াশুনার জন্যে নিয়েছিলেন, এবং সেই টাকার যে অংশ অমরনাথের অনুরােধে তাকে নিতে হয়েছিল তা এখন ধীরে ধীরে শােধ করে সে মুক্ত হতে চায়। টাকাটা অঞ্জলির কাছে পৌছানাে মানে অমরনাথের কাছে গোছানাে। প্রতি মাসে মনি অডারের কুপনে কার সই থাকে সে কখনও যাচাই করতে যায়নি। অঞ্জলির নামের মনি অডার নিশ্চয়ই অন্য কেউ নেবে না। কিন্তু কুপনে পুরাে সই থাকে না। তবু মনের দিক থেকে প্রতি মাসে পরিষ্কার হয়ে যায় সে।
হঠাৎ অমরনাথের মুখ মনে পড়ল। একটা রক্তমাংসের মানুষ এই পৃথিবীতে সমস্তরকম সুখ দুঃখ নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। সে স্পষ্ট দেখতে পেল চা বাগানে রবিবারের সালে
অমরনাথ সেজেগুজে হাটে যাচ্ছেন, অমরনাথ তাস খেলছেন, “জলপাইগুড়ির হােস্টেলে অমরনাথ এসেছেন, চা বাগানের কোয়ার্টার্সের বাইরে অমরনাথ তার সঙ্গে গল্প করছেন । এইসব ছবি মাটি জল পাথরের মত সত্যি। এখন সবই আছে, শুধু সেই মানুষটি নেই। এটাও সত্যি এবং নির্মমভাবে সত্যি।
ঠিক এই সময় জিপের আওয়া, পাওয়া গেল। তিনি ছুটে এল বাইরের ঘরে। দরজা ফাঁক করে বাইরেটা দেখে চাপা গলায় বলল, “অর্জুনবাবু ! বলে দ্রুত ভেতরে চলে গেল। দীপাবলী সােজা হয়ে বসল। খানিক বাদেই দরজায় শব্দ হল, খােলা দরজা তবু ঠেলে খুলছে না অর্জুন।
সাতকাহন পর্ব-(২১)
দীপাবলী ডাকল, ‘আসুন । সাদা কাপড়ে মুখ ঢাকা, ঘরে ঢুকে সেটি ঈষৎ শিথিল করে অর্জুন বলল, “আবার আপনাকে বিরক্ত করতে এলাম। ‘এসেছেন যখন তখন বসুন। ‘আমি সেটা জানি। কিন্তু বসার জন্যে আমি আসিনি। লরিওয়ালার কাছে শুনলাম আপনার বাড়িতে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। এ কথাটা তখন আমাকে বলেননি ? আমি খুব খারাপ টাইপের মানুষ হতে পারি কিন্তু একটু আধটু ভাল কাজও তাে করি! | দীপাবলীর অস্বস্তি হচ্ছিল। সে উঠে দাঁড়াল, আপনাকে বিরক্ত করতে চাইনি। তাছাড়া হাটতলায় গিয়ে আপনার দেখা পাব বুঝতে পারিনি।’
‘কাউকে আমার বাড়িতে খোঁজ করতে পাঠাতে পারতেন। ‘আপনার বাড়ি কোথায় আমি জানি না। ‘তা অবশ্য। কিন্তু এরা তাে জানে। কাল রাত্রে ওদের প্রযােজনে গিয়েছিল। ‘গাড়ি পেয়ে গেলে তাে কাজ চলে যেত। ‘না ম্যাডাম। এটা তাে মাল বয়ে নিয়ে যাওয়া নয় , অসুস্থ মানুষকে আরাম দিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার। আর দেরি করবেন না, ভাগ্যিস একটা দরকার মনে পড়ে গিয়ে ফিরে এসেছিলাম! চলুন ! ব্যস্ত ভঙ্গী করল অর্জুন।
মুহূর্তে মনস্থির করে নিল দীপাবলী । শমিতের প্রয়ােজন এত জরুরি যে অর্জুনের সাহায্য নেবার ব্যাপারে কুণ্ঠা করে কোন লাভ নেই। সে নিজে যেচে উপকার নিতে যাচ্ছে না, কেউ যদি গায়ে পড়ে উপকার করতে চায় তাহলে পরবর্তীকালে সে পাল্টা কিছু আশা করতে পারে না। দীপাবলী বলল, “উনি হেঁটে গাড়িতে উঠতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে না।
সাতকাহন পর্ব-(২১)
‘কোথায় উনি ? ভেতরে যেতে পারি ?
শমিতকে বহন করে জিপে ভােলা তার এবং তিরিব পক্ষে কতটা সম্ভব এ ব্যাপারে দ্বিধা ছিল। অতএব অর্জুনকে নিয়ে ভেতরে এল দীপাবলী। খাটে শুয়ে থাকা অতবড় একটা মানুষকে দেখে অবাক হয়েছে কিনা বােঝা গেল না কারণ অর্জুনের মুখ কাপড়ে মােড়া কিন্তু তার মাথা ঘুরে গেল ভেতরের দরজা ধরে দাঁড়াননা তিরির দিকে। সেটা লক্ষ করল দীপাবলী। কয়েক সেকেন্ড পরে মুখ ঘুরিয়ে অত বলল, “ঠিক আছে, ওর শরীরের ওপর চাদর দিয়ে দিন যাতে বাইরে গেলে রেদের তাপ না লাগে।’
কিন্তু গাড়িতে তােলা হবে কি করে ? ‘এমন কঠিন জায়গায় যখন আছি তখন খুব নরম ভাবছেন কেন ম্যাডাম। দেখি চেষ্টা করে, নিয়ে যেতে পারি কিনা। অর্জুনের হাসির শব্দ শােনা গেল ।
দীপাবলী দেখল তিরির শরীর এখন আর ঘর থেকেই দেখাই যাচ্ছে না। অর্জুন তাকে দেখার পর থেকেই সে যেন আরও আড়ালে যেতে চাইছে অথচ ও যে দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে তা বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না। একটা চাদর দিয়ে শমিতকে ভাল করে ঢেকে দিল দীপাবলী । এগিয়ে গিয়ে দুহাতে যেভাবে শমিতের বিশাল শরীরটাকে তুলে নিয়ে অর্জুন দরজার দিকে এগিয়ে গেল তাতে চমকে উঠল দীপাবলী । মানুষটার শরীরে এতখানি শক্তি আছে বােঝা অসম্ভব ছিল। সে দুত দরজাব পাল্লা খুলে ওদের যাওয়ার পথ সহজ করে দিল। জিপের পেছনে শমিতকে পা মুড়ে শুইয়ে মাথার নিচে বালিশ গুজে দিল দীপাবলী । তারপর তিরিকে কিছু নির্দেশ দিয়ে শমিতের ঝােলা নিয়ে জিপের কাছে ফিরে আসতেই অর্জুন বলল, ম্যাডাম, আপনাকে ফ্রন্ট সিটে বসতে বলতে পাবছি না কারণ ওকে ধরে না থাকলে জিপ চললে পড়ে যেতে পারেন !
সাতকাহন পর্ব-(২১)
দীপবলী ঠোঁট কামড়ে পেছনে উঠে বসল। যেন সে শমিতকে এইভাবে একা শুইয়ে আরাম করে ফ্রন্ট সিটে বসতে চেয়েছে ? সে মুখে কিছু বলল না। শমিতের কাঁধ শক্ত করে ধরে রাখতে হচ্ছে । জিপ চালু হওয়ামাত্র ঝাঁকুনি শুরু হয়েছে। বিছানা থেকে যে জিপে তুলে আনা হয়েছে তা অবশ্যই টের পায়নি শমিত। পেছন দিকের ত্রিপলের পদাটা ভাল করে আটকে দিয়েছে অর্জুন তবু গরম হলকা ঢুকছে কোন ফাঁক পেযে।
জিপের ছাদ এখন আগুন } অর্জুন স্টিয়ারিং ঘােবাতে ঘােবাতে শিস দিচ্ছে। ইয়ে রাত ইয়ে চাঁদ, হেমন্তকুমারের হিন্দী গান । এই ভরদুপুরে উনুনের মত গবমে চাঁদিনী রাতের গান কেউ ভাবতে পারে ? দীপাবলী মুখ ফিরিয়ে শমিতের দিকে তাকাল। চাদরে মােড়া শরীরটাকে দেখতে স্বস্তি হচ্ছে না। তার এসব দেখার কথা ছিল না। অসুস্থ শমিতকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার দায়িত্ব ছিল মায়ার, অথচ সে সেই কাজ করছে। একসময়ের একটু ভাল লাগা, আপনি থেকে তুমিতে নেমে যাওয়ার দাম এখন কড়ায় কণ্ডায় শােধ করতে
শিস থামিয়ে হঠাৎ অজুন জিজ্ঞাসা করল, ‘হাসপাতালের কাউকে চেনেন ম্যাডাম ? ‘না, এর আগে কখনও প্রয়ােজন হয়নি। ‘আপনি ওঁর কিরকম ট্রিটমেন্ট চান ? ‘মানে ? ‘এই ছােট্ট শহরে তাে ভাল চিকিৎসা হবার কথা নয়। ‘যদি ওরা সদর হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে যেতে হবে।
সাতকাহন পর্ব-(২১)
কিছু মনে করবেন না, একটা কথা জিজ্ঞাসা করব ? ‘বলুন! অবশ্যম্ভাবী ছিল যে প্রশ্ন তার জন্যে তৈরী হল দীপাবলী । কিন্তু সেদিকে গেলই না অর্জুন, ‘রিস্ক না নিয়ে একেবারে সদর হাসপাতালে যেতে আপনার আপত্তি আছে ?
‘সময় লাগবে তাে!’ নিঃশ্বাস ফেলল দীপাবলী। ‘লরির জন্যে অপেক্ষা করলেও তাে সময় নষ্ট হত! কিন্তু আপনি অতদূরে যাবেন কেন ? ‘নিজের জন্যেই যাব।’ ‘মানে ? ‘ম্যাডাম, রােজ তত পাপ করছি যে মাঝে মাঝে, একটু আধটু পুণ্য না করলে যমরাজের
সঙ্গে আমেন্ট করাই যাবে না।
Read more
