যে কোনাে সভায় কোনােরকম পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া ঝাড়া আড়াই ঘণ্টা বক্তৃতা দিতে পারেন। উপাচার্য হওয়ার প্রথম দিকে সভা-সমিতিতে কথা বলতে উঠলে তার হাত পা কাঁপত, গলা শুকিয়ে আসত। এখন কথা বলতে গেলে জিহাটি আপনা থেকে নেচে উঠতে চায়।
শব্দগুলাে বাকযন্ত্রের মুখে পুঁটি মাছের মতাে আপনিই উজিয়ে আসে।
তথাপি কোনাে জটিল বিষয়ে বক্তৃতা দেয়ার প্রশ্ন উঠলেই ব্যক্তিগত সহকারীকে ডেকে সে বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর করতে নির্দেশ করতেন ।
মােটের ওপর একটা প্রস্তুতি গ্রহণ করেই সভা-সমিতিতে যেতেন। এই কবিদের সভাটিতে যাওয়ার সময় সহকারীকে ঢাকার কোনাে প্রয়ােজনীয়তা অনুভব করেননি। আবু জুনায়েদ নিশ্চিতভাবে জানতেন বাংলা সাহিত্য বিষয়ে তার ব্যক্তিগত সহকারী জানাশােনার তার চাইতে অনেক কম। সুতরাং, শুধুমাত্র আত্মপ্রত্যয়ের ওপর নির্ভর করে সরকার ঘেঁষা কবি সম্মেলনে প্রধান অতিথির ভাষণে একটা মজার বক্তৃতা দিয়ে বসলেন।
তিনি তার বক্তৃতার এক জায়গায় বলে বসলেন, কাজী নজরুল ইসলাম যদি দীর্ঘকাল সুস্থ থাকতে পারতেন তিনিও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতাে নােবেল প্রাইজটি পেয়ে যেতেন। হিন্দুরা ষড়যন্ত্র করে নজরুলের হট খারাপ করে দিয়েছিল, তাই তার ভাগ্যে নােবেল পুরস্কারটি জোটেনি।
নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি! ‘ৰু জুনায়েদ জাতীয় কবির সম্মান বৃদ্ধি করার জন্য যে অপূর্ব বক্তৃতা দিলেন, শুনে সরকারের চামচা কবিরা পর্যন্ত প্রমাদ গুনলেন। তারা তাদের সম্মেলনটির ওজন বৃদ্ধি করার জন্য উপাচার্য আবু জুনায়েদকে আমন্ত্রণ করে এনেছিলেন।
আবু জুনায়েদ নজরুলকে বড় করে দেখাতে গিয়ে পূর্বাপর সম্পর্করহিত একটা বেফাস মন্তব্য করে তাদের গােটা সম্মেলনটাকে খেলাে করে দিলেন।
সভার শেষে ড. (কবি) মনিরুল আলম আবু জুনায়েদকে উদ্দেশ্য করে বললেন :
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৬)
-স্যার নজরুলের ব্যাপারে এই অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্যটি না করলেও পারতেন। -কোন মন্তব্যের কথা বলছেন। আবু জুনায়েদের কণ্ঠে ঈষৎ বিরক্তির সুর ।
-আপনি যে বলেছেন নজরুল সুস্থ থাকলে নােবেল পুরস্কার পেয়ে যেতেন এবং হিন্দুরা ষড়যন্ত্র করে তার মাথা খারাপ করে দিয়েছিল।
-অন্যায় কী বলেছি। একজন কামেল এবং বুজুর্গ মানুষের কাছ থেকে আমি শুনেছি হিন্দুরা ষড়যন্ত্র করে নজরুলের মাথাটি খারাপ করে দিয়েছিল। শাহ্ সুফী খান বাহাদুর মরহুম রহমতুল্লাহ এম. এ. বিটি সাহেবের মুখ থেকে আমি ছাত্রজীবনে এই কথা শুনেছি। তিনি আমাদের হেডমাস্টার ছিলেন। আদর্শ শিক্ষক হিসেবে ব্রিটিশ সরকার তাকে খান বাহাদুর টাইটেল দিয়েছিল। সেই যুগে গােটা জেলায় তার মতাে অমন বাঘা হেডমাস্টার একজনও ছিলেন না।
তাঁকে কেউ কখনাে একটিও বেহুদা কথা বলতে শােনেনি।
জীবদ্দশায় তিনি তিন তিনবার পবিত্র মক্কা শরীফ জেয়ারত করেছিলেন।
এন্তেকালের পর তার কবরটা একটি দরগাতে পরিণত হয়েছে।
তার মুখ থেকে যে কথাটি অনেকবার শুনেছি আমি অকপটে বলেছি এতে দোষের কী থাকতে পারে।
এমন অকাট্য প্রমাণ হাজির করবার পর ড. (কবি) মনিরুল আলমের আর কিছু বলার রইল না। দুদিন না যেতেই বিরােধী দল সমর্থক সর্বাধিক প্রচারিত সংবাদপত্রটিতে আবু জুনায়েদের একটি কার্টুন চিত্র প্রকাশিত হল । আৰু জুনায়েদের প্রতিকৃতি শূয়রের আকারে আঁকা হয়েছে, সামনে মাইক্রোফোন এবং তিনি কবিতা সম্মেলনে ভাষণ দিচ্ছেন।
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৬)
উপাচার্য পদে আসীন হওয়ার পর থেকে মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদের একটি নতুন অভ্যেস জন্ম নিয়েছে। তিনি নিয়মিত শুক্রবারে মসজিদে যেয়ে জুমার নামাজটি আদায় করতে শুরু করেছেন। তার মধ্যে কোনােরকম ধর্মপ্রীতি বা পরকালভীতি জন্ম নিয়েছে বলেই শুক্রবারে মসজিদে আসাআসি করছেন, সেটা সত্যি নয়। মসজিদে যেয়ে নামাজ পড়লে তার প্রতি এক শ্রেণীর মানুষের ভক্তি শ্রদ্ধা বাড়ে, সেটা ঠিক । তবু আবু জুনায়েদ সঠিক বুঝে উঠতে পারেন না, কী কারণে তার এ নতুন অভ্যেসটি জন্মেছে।
মসজিদে কিছুদিন যাওয়া আসার পর আবু জুনায়েদের উপলব্ধি করতে বাকি রইল না, এই একটি সাংঘাতিক ব্যবহারিক প্রয়ােজনীয়তা রয়েছে। এই মসজিদে এসেই তিনি অনুধাবন করতে সক্ষম হন স্বঘােষিত নাস্তিক আহমদ তকির ওপর সাধারণ মুসল্লির কী পরিমাণ ঘৃণা রয়েছে। আহমদ তকি ভদ্রলােকটির সঙ্গে তার এক ধরনের খাতির হয়েছিল। তকি সাহেব রস করে কথাবার্তা বলতে জানতেন এবং আবু জুনায়েদ সেটা উপভােগও করতেন।
আর তাছাড়া অনেক ভালাে কথাও তকি সাহেব বলে থাকেন। মসজিদে এসেই আবু জুনায়েদ টের পেয়ে যান যে, আহমদ তকি এই সময়ের মধ্যে আল্লাহ এবং তাঁর প্রিয় রসুলের খাস দুশমনে পরিণত হয়েছেন। সহজাত অনুভব দিয়েই আবু জুনায়েদ বুঝে গেলেন ভবিষ্যতে আহমদ তকির সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
আহমদ তকি আল্লাহ রসুলের পুরনাে চিহ্নিত দুশমন। এই সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আল্লাহ রসুলের যে সকল নতুন দুশমন পয়দা হয়েছে, তাঁদের সকলের নাড়িনক্ষত্রের খবর জেনে গেছেন। আবু জুনায়েদ মনে করেন, একটা ব্যাপারে তিনি লাভবান হতে পেরেছেন।
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৬)
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনমতের হাওয়া কোনদিকে বইছে মসজিদে এলে তার একটি পূর্বাভাস তিনি পেয়ে যান। হালে তাঁর মধ্যে একটা নতুন অন্তর্দৃষ্টি জন্মাতে আরম্ভ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন ব্যাপারে জনমত গঠন করার জন্য মসজিদ একটি মােক্ষম জায়গা।
এক শুক্রবারে তার মসজিদে আসতে একটু দেরি হয়েছিল। তিনি পেছনের কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেছিলেন। কিন্তু নামাজ শেষ হওয়ায় অন্যান্য মুসুল্লীরা তাকে সামনে আসতে অনুরােধ করলেন। তিনি সামনে এলে চার পাঁচজন মুসল্লী একসঙ্গে কবিতা সম্মেলনে নজরুল ইসলাম সম্পর্কিত একেবারে বৈজ্ঞানিক সত্যটি (অর্থাৎ হিন্দুরা তার মাথাটি খারাপ করে দিয়েছিল) প্রকাশ করার জন্য একসঙ্গে ধন্যবাদ জানালেন। ফার্সি ভাষার শিক্ষক (যে বিষয়ে একজনও ছাত্র নেই) মাওলানা আবদুর রহমান তালিব দাঁড়িয়ে তার হস্ত চুম্বন করলেন এবং প্রকাশ্যে আলিঙ্গন দান করলেন।
তারপর আবদুর রহমান তালিব সাহেব সমবেত মুসল্লিদের সামনে ঘােষণা দিয়ে বসলেন, এই এতদিনে বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন পরহেজগার উপাচার্য এসেছেন। আল্লাহ তাঁর হায়াত দারাজ করুন। এই উপাচার্যকে দিয়ে ইসলামের অনেক খেদমত হবে। নামাজ শেষ করে বেরিয়ে আসছিলেন। মাওলানা আবদুর রহমান তালিব সাহেব অনুরােধ করলেন,
-হযরত আমি কি আপনার সঙ্গে আসতে পারি? আপনার দরবারে আমি পবিত্র ইসলামী উম্মাহর পক্ষ থেকে কিছু আরজি পেশ করতে চাই । আৰু জুনায়েদ মাওলানা আবদুর রহমান তালিবকে গাড়িতে উঠিয়ে নিলেন।
উপাচার্য ভবনে আসার পর মাওলানা আবদুর রহমান তালিব জানালেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের শত্রুরা তৎপর হয়ে উঠেছে। তিনি যদি একটা শক্ত অবস্থান না নেন ইসলামের জানি দুশমনেরা মুসলিম উম্মাহর ক্ষতি করতে অধিকতর তৎপর হয়ে উঠবে।
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৬)
ইসলামের ক্ষতি করার জন্য ইসলাম বিরােধীরা ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করছে, সে বিষয়ে আবু জুনায়েদ কিছু জানতেন না। তিনি একটু বিশদ করতে বললেন। উত্তরে মাওলানা সাহেব জানালেন রামনাথ ছাত্রাবাসে হিন্দুরা বিবেকানন্দ না কোন একজন হিন্দুর মূর্তি তৈরি করেছে।
এ ধরনের কাজ ব্রিটিশ আমলে সম্ভব হয়নি, পাকিস্তান আমলে সম্ভব হয়নি। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে যেখানে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম বিবেকানন্দ বাবুর পাথুরে মুর্তি বহাল তবিয়তে তৈরি হয়ে গেছে। এটা কি একটা ষড়যন্ত্রমূলক কাজ নয়?
আবু জুনায়েদ জানালেন, বিবেকানন্দের মূর্তিটা তিনিই উদ্বোধন করেছেন। মাওলানা সাহেব যেসব অভিযােগের কথা বলছেন, এসব কিছুই তার মনে আসেনি। আর মূর্তিটা তৈরি করেছে একজন মুসলমান মহিলা ভাস্কর। এতে দোষের কী থাকতে পারে, তিনি ভেবে পান না ।।
মাওলানা সাহেব জবাবে জানালেন
-আপনি খুব সরল মানুষ। মালাউনদের চক্রান্তটি ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি। একটি মুসলিম মহিলাকে দিয়ে মূর্তিটি তৈরি করিয়ে আপনাকে দিয়ে উদ্বোধন করাল, এখানেই চক্রান্তের খেলায় আমরা হেরে গেলাম। মূর্তি নির্মাণের টাকাটি দিয়েছে। গােপনে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। তারা এতই চালাক যে, মুসলমানদের দিয়ে তাদের মূর্তি নির্মাণের রাজমিস্ত্রীর কাজটি করিয়েছে এবং আপনাকে দিয়ে উদ্বোধন করিয়ে মূর্তিটা আইনগতভাবে সিদ্ধ করে নিল।
পূর্বে কখনাে মালাউনেরা মুসলমানদের এভাবে ব্যাহার করেছে আমার জানা নেই। তাদের এক দাঁতের বুদ্ধি যদি থাকত কওমের কি এত দুর্দশা হয়? | আবু জুনায়েদ দু চোখ বন্ধ করে কিছু একটা চিন্তা করতে চেষ্টা করলেন। তাঁর মনে হল মাওলানা আবদুর রহমান তালিবের কথার মধ্যে কিছু পরিমাণ হলেও সত্যি থাকা অস্বাভাবিক নয়। তিনি বললেন : | কাজটা তাে করা হয়ে গেছে। এখন কি কিছু করার উপায় আছে? আপনারা এ কথা আগে বলেননি কেন?
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৬)
মাওলানা তালিব সাহেব জানালেন,
-আগে তাে আমরা জানতাম না আপনার ঈমান এমন সাচ্চা। আমরা ধরে নিয়েছিলাম আপনি দিলরুবা খানমের লােক। ওই বেটির সঙ্গে মালাউনদের গলায় গলায় ভাব।
-এখন কী করতে হবে সেটা বলুন, যা হবার তাে হয়ে গেছে। বললেন আবু জুনায়েদ।
মাওলানা সাহেব সাড়া দিয়ে জানালেন-আপনি যদি একটা দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন, আমরা ইসলামের জন্য অনেক কিছু করতে পারি।
সে অনেক কিছুর মধ্যে কোন্ কাজগুলাে পড়ে? জানতে চাইলেন আবু জুনায়েদ। মাওলানা আবদুর রহমান তালিব ফিসফিস করে বললেন-হাবিবুল্লাহ মুসলিম ছাত্রাবাস এবং এর ফরমানুল হক মুসলিম ছাত্রাবাস টা থেকে একাত্তুর সালের পর মুসলিম নাম বাদ দেয়া হয়েছে, আমরা মুসলিম নাম যােগ করার আন্দোলন চালাব এবং দাবি তুলব বিশ্ববিদ্যালয়ের মনােগ্রাম ইসলামসম্মত নয়, সেটা পাল্টাতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মনােগ্রাম পাল্টাতে বলছেন আপনারা, সেটা কি সম্ভব । মাওলানার প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন। মাওলানা জবাবে বললেন :
-কেন সম্ভব নয়, বিবেকানন্দ বাবুর মূর্তি যদি তৈরি হতে পারে, মনােগ্রাম পাল্টানাে যাবে না কেন? খোঁজ করে দেখুন ভারতবর্ষে কোনাে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিবেকানন্দের মূর্তি বসানাে হয়নি। অথচ আপনারা এখানে পূজা আরম্ভ করে দিয়েছেন।
এবার জুনায়েদের মুখে ভয়ার্ত ভাব ফুটে উঠল। যথাসম্ভব কণ্ঠস্বর সংযত করে বললেন
-আমি কিন্তু এসবের মধ্যে থাকতে পারব না। মাওলানা আবদুর রহমান কণ্ঠে দরদ ঢেলে বললেন :
আমরা আপনার অবস্থা বুঝি। আপনাকে বিপদে ফেলার কোনাে খায়েশ আমাদের নেই। কিন্তু আমরা যখন কোনাে আন্দোলন শুরু করব আপনি সমর্থন না করতে পারেন, কিন্তু বাধা দেবেন না ।
আবু জুনায়েদ মাথা নাড়লেন। এর অর্থ হা হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।।
মাওলানা আবদুর রহমান তালিব উঠে দাঁড়িয়ে আবার বসে পড়লেন।
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৬)
-আপনার কাছে আমি আরাে দুটো আর্জি পেশ করতে চাই । আবু জুনায়েদ বললেন, বলুন।
মাওলানা সাহেব জানালেন, কলাভবনের ছাদে গুণ্ডা বদমায়েশরা নানা জায়গা থেকে মেয়েছেলে নিয়ে সারা রাত মৌজ করে কাটায়। দারােয়ানরা কোনাে বাধাই দেয় না। বরঞ্চ টাকা-পয়সা নিয়ে বদমায়েশদের সহযােগিতা করে। ও জিনিসটি আপনাকে বন্ধ করতে হবে।
আবু জুনায়েদ বললেন : দারােয়ানরা যদি এই কাণ্ড করে আমি কী করে বাধা দিতে পারি।
-মাঝে-মাঝে এক আধবার আপনি নিজে গিয়ে চেক করেন, ভয় পেয়ে দারােয়ানরা বন্ধ করে দেবে। বললেন মাওলানা তালিব।
-সেটা কি উপাচার্যের পক্ষে সম্ভব? বললেন আবু জুনায়েদ।
-কেন সম্ভব নয়? ইসলামের খলিফারা এভাবেই তাে খারাপ কাজের সংবাদ নিতেন । মাওলানা আবদুর রহমান আঙুলে দাড়ি নাড়াচাড়া করতে করতে বললেন :
উপাচার্য ভবনের পশ্চিম দিকে যে রাস্তাটা আছে তার ডানে বামে রজবতী মহিলারা তাদের হায়েজ নেফাজের পুরিন্দাগুলাে ফেলে দিয়ে যায়। এটা অত্যন্ত জঘন্য কাজ। এই পথ দিয়ে যারাই যাওয়া আসা করে তাদের কাপড়চোপড় থেকে শুরু করে সারা শরীর নাপাক হয়ে যায়। গােটা এলাকার পবিত্রতা বজায় রাখতে হলে রাস্তার পাশে পুরিন্দাটি ফেলার কাজ বন্ধ করতে হবে।
মাওলানা আবদুর রহমান তালিবের দ্বিতীয় প্রস্তাবটি শুনে একদিকে যেমন আৰু জুনায়েদের হাসি সম্বরণ করা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়াল তেমনি অন্যদিকে ভীষণ রাগ হচ্ছিল। তিনি মাওলানা সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন ;
-মহিলারা ম্যানাস্ট্রসনের প্যাড কোথায় ফেলবেন, তাও আমাকে পাহারা দিতে বলেন? সেটাও কি উপাচার্যের কাজ? মাওলানা সাহেব বললেন, আপনি অকারণে রেগে যাচ্ছেন। আমি আপনাকে পরামর্শ দিচ্ছি একটা নােটিশ লটকে দিন।
এই রাস্ত র পাশে পুরিন্দা ফেলা বেআইনী এবং অনৈসলামিক।
এই পথ দিয়ে অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমান যাতায়াত করে থাকেন।
পুরিন্দার কারণে তাদের পােশাক-পরিচ্ছদ এবং অনেক সময় তামাম শরীর অপবিত্র হয়ে যায়।
যারা পুরিন্দা ফেলে যায়, আখিরাতে তাদের আজাব ভােগ করতে হবে।
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৬)
তবারক আলীর সঙ্গে আবু জুনায়েদের পরিচয় ঘটল। এটা তার উপাচার্যের দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর সবচাইতে স্মরণীয় ঘটনা।
এ তবারক আলী ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকাদার। তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর মহিলা ছাত্রীনিবাসের নির্মাণ কাজ দেখতে গিয়েছিলেন। সেই সময়ে পাজামা পাঞ্জাবি পরিহিত কানপুরি টুপি মাথায় এক ধােপদুরস্ত বুড়ােমতাে ভদ্রলােক এগিয়ে এসে তাকে সালাম দিয়েছিলেন। ভদ্রলােকের মুখে অল্প অল্প দাড়ি। একহারা দীঘল চেহারা।
বয়েস হলেও ভদ্রলােক শিরদাঁড়ার ওপর ভর করে সােজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন। এই দাঁড়ানাের ভঙ্গি ছাড়া আরাে দুটো জিনিস আৰু জুনায়েদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। একটা হল ভদ্রলােকের তীক্ষ্ণ অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। অন্যটা গলার আওয়াজ। এমন শান্ত অনুত্তেজিত কণ্ঠস্বর আবু জুনায়েদ কখনাে শুনেছেন মনে পড়ে ।
তবারক সাহেবের কাছে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ভদ্রলােক বলতে আরম্ভ করলেন। তিনি এবং আবু জুনায়েদের স্বর্গগত শ্বশুর, আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুন, একই সময়ে ঠিকাদারী ব্যবসা আরম্ভ করেছিলেন। বলা যেতে পারে আবু জুনায়েদের শ্বশুর সাহেবই স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে তবারক আলীকে ঠিকাদারী পেশায় টেনে এনেছিলেন। কর্ম জীবনে তাঁর কাছে এক পয়সা মূলধন ছিল না। মরহুম আব্দুল গােফরানের লােক চেনার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। একবার চোখের দেখা দেখেই ঠিক ধরে নিতে পারতেন, কে কাজের মানুষ, কে ফালতু।
আর জুনায়েদের শ্বশুর সাহেব কপর্দকহীন শেখ তবারক আলীকে ওয়ার্কিং পার্টনার হিসেবে গ্রহণ করতে বিন্দুমাত্র সঙ্কোচ করেননি। আজকে যে তিনি ছেলে মেয়ে নিয়ে আল্লাহর রহমতে দুটো নুন-ভাত খেয়ে জীবন চালাতে পারছেন, তার পেছনে গােফরান ভাইয়ের মস্ত একটা ভূমিকা রয়েছে। যতদিন জীবিত ছিলেন, তিনি গােফরান সাহেবকে আপন মায়ের পেটের বড় ভাইয়ের চাইতেও অধিক শ্রদ্ধা-সম্মান করে এসেছেন। তবারক সাহেব আবু জুনায়েদের স্ত্রী নুরুন্নাহার বানুকে আপন মেয়ের মতাে জ্ঞান করেন ।
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৬)
মরহুম গােফরান ভাই কত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন, তার একটা দৃষ্টান্ত হিসেবে মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদকে নুরুন্নাহার বানুর পাত্র নির্বাচন করার প্রসঙ্গটি উত্থাপন করলেন। কত বড় বড় খানদানি পরিবারের ছেলের সঙ্গে বানুর মানে নুরুন্নাহারের বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল। গােফরান ভাই এক কথায় সবাইকে বিদেয় করে বানুর পাত্র হিসেবে আবু জুনায়েদকে পছন্দ করেছিলেন। আজকে যদি গােফরান ভাই জীবিত থাকতেন, নিজেই দেখতে পেতেন, তার পছন্দ কত সঠিক ছিল।
বানুর বর আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন। তার দুচোখের কোণা চিকচিক করে উঠল। বুঝি তখনই কেঁদে ফেলবেন। আবু জুনায়েদের ভীষণ ভয় করতে লাগল। এই তবারক বেটা তাহলে তার বিষয়ে সবকিছু জানে। তার স্বর্গগত পাতানাে বড় ভাইয়ের মহিমা কীর্তন করতে গিয়ে যদি বলে বসেন, আবু জুনায়েদ শ্বশুরের কাছ থেকে পয়সা নিয়ে লেখাপড়া করেছেন তাহলে লােকজনের সামনে তাঁর মাথাটা কাটা যাবে। তাঁর হৃদয়স্পন্দন দ্রুততর হল, বুক দুরুদুরু করতে থাকল ।
Read more
