গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১২)-আহমদ ছফা

গাভী বিত্তান্ত

‘দিনের মধ্যেই লাল ইটের দেয়াল মাতি ছড়িয়ে উঠে গেল । সাত আটজন মিস্ত্রি কাজ করছে। সারা দিন তাে কাজ করেই হ্যাজাক জ্বালিয়ে আধারাত 

পর্যন্ত কাজ চলতে থাকে । আৰু জুনায়েদের মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা তার স্বপ্নের গােয়াল ঘর তৈরি হতে যাচ্ছে। ইট গাঁথা হচ্ছে, সিমেন্টে বালু মেশানাে হচ্ছে, নির্মীয়মাণ গােয়ালঘরের কোনাকানচিগুলাে স্পষ্ট আকার ধারণ করছে। সবকিছুর মধ্য দিয়ে আবু জুনায়েদের আজন্মলালিত স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পেতে যাচ্ছে ।

গােয়ালঘর তৈরি হবে এবং সেই ঘরে বাস করতে একটি গাভী আসবে । প্রচণ্ড একটা রােমাঞ্চকর ব্যাপার । আবু জুনায়েদের ফুরসৎ খুবই কম। তবু দিনে দুতিনবার গিয়ে মিস্ত্রিদের কাজ দেখে আসেন। অফিসে যাওয়ার আগে একবার দেখেন। দুপুরে খেতে এলে গাড়ি থেকে নেমেই ছুটে যান। বিকেলে যেদিন কাজ থাকে না, ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে পত্রিকা পড়তে পড়তে মিস্ত্রিদের কাজ দেখতে থাকেন ।

এই অল্প কদিনের মধ্যেই দেয়ালগুলাের উচ্চতা চারফুট উঠে গেছে। এখন কলাম বসৰে ! কলামের ফাঁকে ফাঁকে জানালা । ভেতরে ভেতরে যে উত্তেজনা তিনি অনুভব করছেন, নুরুন্নাহার বানুর সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পূর্বেও সে রকম অনুভূতি তার হয়নি । 

নুরুন্নাহার বানুর সঙ্গেও তার সম্পর্কটা এখন খুবই ভালাে। কোনাে দাম্পত্য কলহ নেই, পারিবারিক জীবনে কোনাে খিটিমিটি নেই । দুজন যখন একান্তে আলাপ করেন তখন গরুর কথাটা আপনি এসে পড়ে। নুরুন্নাহার যখন প্রথম বাচ্চা পেটে ধরেছিলেন, ওনিয়েও দুজনের মধ্যে এমন সহমর্মিতা দেখা যায়নি। প্রথমবারের গর্ভবতী হওয়ার পর নুরুন্নাহার বানুর মেজাজ সব সময়ে খাট্টা হয়ে থাকত।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১২)

একটুতেই তিনি রেগে যেতেন, কেঁদে বুক ভাসাতেন এবং আবু জুনায়েদকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতেন । কেননা আৰু জুনায়েদই তার এই ভােগান্তির কারণ। শেখ তবারক আলীর বাড়ি থেকে ফেরার পরপরই নুরুন্নাহার বানুর মনটা নতুন করে আবু জুনায়েদের দিকে চলতে আরম্ভ করেছে। নুরুন্নাহার বানুর সাজ পােশাকের বহর এখন অনেক বেড়ে গেছে। প্রতিদিন নতুন করে ভাজভাঙা শাড়ি পরেন।

তােরক আলীর স্ত্রীর কাছ থেকে যে সকল অলঙ্কার উপহার পেয়েছেন, পারতপক্ষে সেগুলাে শরীর থেকে নামান না। নুরুন্নাহার বানু কীভাবে রাণী রাণী ভঙ্গি সৃষ্টি করা যায়, আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। নুরুন্নাহার বানুর এই সার্বক্ষণিক সাজগােজের ঘটা দেখে মেয়েটা ভীষণ বিরক্ত হয়ে গেছে। তার একটা প্রত্যক্ষ কারণ অবশ্য আছে।

তবারক আলীর স্ত্রী দীলুকে যে বেনারশিখানা উপহার দিয়েছেন, সে কাপড়টার প্রতি নুরুন্নাহার বানুর ভীষণ লােভ। যখন তখন সেই শাড়িটাই পরে বসেন। একদিন মেয়ে বলেই বসল, 

আম্মা নানি আমাকে যে শাড়িখানা দিয়েছেন সেটা তুমি যখন তখন পরে বসাে কেন? ওটা তাে আমার । নুরুন্নাহার বানু মেয়ের কথা গায়ে মাখেন না বিশেষ। দীলু চেচামেচি করলে জবাব দেন, 

-তুই তাে সারাক্ষণ সালােয়ার কামিজ পরে থাকিস। আমি শাড়িটা এক আধটু পরলে কি তাের শাড়ি ছিড়ে যাবে। তাের শাড়ি তাে তােরই থাকবে । 

-আম্মা ছিড়ে না যাক আমার কাপড় তুমি যখন তখন পরে বসবে না। তােমার যদি খুব শখ হয়, তাহলে নানিকে বলাে যেন তােমাকেও একখানা কিনে দেন। 

মেয়ের কথার কোনাে জবাব দেন না নুরুন্নাহার বানু। ঠিক এই রঙের নয়, এই জাতীয় একখানি শাড়ি যদি চাচি তাঁকেও দিতেন খুব ভালাে হত। হার, ব্রেসলেট, ইয়ারিং এবং হাতের চুড়ির সঙ্গে এই শাড়িটাই মানায় চমক্কার। চাচির কাছে ওরকম আরেকখান শাড়ি চাইবেন কি না ভেবে দেখেন । না সম্ভব নয়। সেটি তিনি করতে পারবেন না।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১২)

তিনি উপাচার্যের বেগম। কারু কাছ থেকে কিছু চাওয়ার মধ্যে একটা কাঙালপনা আছে। সেটি তিনি করতে পারবেন না। নুরুন্নাহার বানুর হাতে যখন কোনাে কাজ-কর্ম থাকে না, দূরের আত্মীয়দের কাছে টেলিফোন করে সুসংবাদটা প্রকাশ করেন। তবারক চাচা তাকে একই সঙ্গে গরু এবং গােয়াল দুটিই উপহার দিতে চাচ্ছেন।

নুরুন্নাহার বানুর বাবা যখন বেঁচে ছিলেন তার বড় এবং মেজো দুবােনকেই প্রথম বাচ্চা হওয়ার পর আস্ত গাইগরু উপহার দিয়েছিলেন। প্রথম বাচ্চা হওয়ার পর মেয়েরা স্বাভাবিকভাবেই বাবার কাছে গাভি পাওয়ার প্রত্যাশা করে। এ প্রত্যাশা নুরুন্নাহার বানুরও ছিল। কিন্তু তিনি চাইতে পারেননি। চাইলে বাবা অবশ্যই একটা দুধের গাই দিতেন, যাতে নাতি নাতনিরা দুধ খেতে পারে। তিনি মুখ ফুটে চাইতে পারেননি।

কারণ বাবা যদি বলে বসেন, বানু গাই কিনে দিলে তুমি রাখবে কোথায়। তােমার তাে মােটে দু’খানা ঘর । যেখানে খাওয়া সেখানে শােয়া, সেখানে রান্না । বাবা মারা গেছেন। তবারক চাচা আছেন, আল্লাহ তাঁকে তৌফিক দিয়েছেন । আর নুরুন্নাহার বানুদের একটা গাই পাের ক্ষমতা হয়েছে। বাবার দায়িত্ব চাচা পালন করছেন। শেখ তবারক আলী তার বাবার আপন ভাই না হােক, তার চাইতে অনেক বেশি। নুরুন্নাহারের আপন মায়ের পেটের ভায়েরা তার জন্য কতটুকু করে?

আব্বার বিষয় সম্পত্তি সব লুটে-পুটে খাচ্ছে। বােনের কথা কি তাদের খেয়াল আছে। বউরা তাদের ভেড়য়া বানিয়ে রেখেছে। আল্লাহর কাছে হাজার শােকর, তবারক চাচার সঙ্গে নতুন করে পরিচয় হয়েছে। বাবার মৃত্যুর পর তিনি যে শােক পেয়েছিলেন, তবারক চাচা তার অনেকখানিই ভরিয়ে দিয়েছেন।

আল্লাহ তবারক চাচাকে একখানি দিলও দিয়েছেন। ফাঁকে ফাঁকে তিনি আবু জুনায়েদের কথাও চিন্তা করেন । মানুষটা যেন কী? তবারক চাচা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকদিন ধরে কাজ করেন, অথচ আৰু জুনায়েদ তার কোনো নেতা মানুষটা যেন কী? আগে হলে বলতেন আচাবুয়া গর্দভ।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১২)

এখন তাঁর র ধাটা একটু পাল্টেছে। এখন তিনি মনে করছেন আবু জুনায়েদ সব সময়ে ভরে যেরে থাকেন। তাই ডানে বায়ে কী ঘটছে সে বিষয়ে দৃষ্টি দিতে পারেন হল এটাকে একটা চমৎকার গুণ মনে করেছেন। আবেদ হােসেন কথা দিয়েছিলেন আট দশ দিনে গােয়াল ঘর তৈরি করে ফেলবেন। কিন্তু তৈরি করতে পনের সি. লেগে গেল। তারপরেও কিছু কাজ বাকি পড়ে রইল। উত্তর দিকে যে শেডটা বানানাের কথা ছিল, এখনাে অসমাপ্ত রয়ে গেছে। আবেদ হােসেন জানালেন তাঁর ক্যালকুলেশন কখনাে ফেল হয় না। এবার হয়ে গেল, কারণ একটা অঘটন ঘটে গেছে ।

হেড মিস্ত্রির মেয়ে শ্বশুর বাড়িতে গায়ে কেরােসিন ঢেলে আত্মহত্যা করেছে । হেড মিস্ত্রির জামাই পণের টাকার দাবি নিয়ে অনেকদিন থেকেই মেয়েটার ওপর অত্যাচার করছিল। শেষমেশ অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে মেয়েটি আত্মহত্যা করে পণের টাকার দায় থেকে আত্মরক্ষা করেছে। হেড মিস্ত্রিকে মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে ছুটে যেতে হয়েছিল এবং থানা পুলিশ অনেক কিছু করতে হয়েছে। উত্তর দিকের শেড়টা আবেদ হােসেন খুব সুন্দরভাবে বানাতে চান।

শেখ তবারক আলী তাঁকে সেরকমই নির্দেশ দিয়েছেন। মামুলি মিস্ত্রি দিয়ে সুন্দর জিনিস বানানাে যায় না। তাই এ বিলম্ব এবং সেজন্য তিনি লজ্জিত। যা হােক, হেড মিস্ত্রি যখন ঝামেলা মিটিয়ে চলে আসতে পেরেছে, আর দুশ্চিন্তা নেই । এই দু’চারদিনের মধ্যেই সব কমপ্লিট হয়ে যাবে। আবেদ হােসেনের দু’চারদিন দশদিনে গিয়ে দাঁড়াল। একটু বেশি সময় নিল, তারপরেও যে গােয়াল ঘর তৈরি হল, দেখে আবু জুনায়েদের মন প্রশান্তিতে ভরে গেল। আল্লাহ এতদিনে তার একটা আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেছেন। 

আবু জুনায়েদের ইচ্ছে হল এই নতুন বানানাে গােয়ালঘরটা তার কিছু বন্ধু বান্ধবকে দেখাবেন। এমনিতে আবু জুনায়েদের বিশেষ অন্তরঙ্গ বন্ধু-বান্ধব নেই । বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা তাঁর দল করেন, প্রশাসনিক বিষয়ে নানা ব্যাপারে যাঁরা তাঁকে সাহায্য করেন, তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার হলে যারা তার পক্ষ হয়ে প্রতিবাদ করেন, ইদানীং আৰু জুনায়েদ তাঁদের মধ্যে বিশেষ কাউকে কাউকে বন্ধু মনে করতে আরম্ভ করেছেন।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১২)

আবু জুনায়েদ একটি বিশেষ কারণে সদ্যনির্মিত গােয়াল ঘরখানা সকলকে দেখাতে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। সত্যি বটে এটি গােয়াল ঘর এবং আগামীতে এই ঘরটিতে একটি চতুষ্পদ প্রাণী বসবাস করতে যাচ্ছে। কিন্তু ঘরটির নির্মাণশৈলী এত চমৎকার দেখলে চোখটা আপনা থেকেই জুড়িয়ে যায়। পাখির বাসার মতাে এই এক টুকরাে একখানি ঘর।

ঢেউটিনের চালসহ গােটা ঘরখানি যেন মাটি খুঁড়ে আচমকা সুন্দর একটা মাশরুমের মতাে ফুটে বেরিয়ে এসেছে। উপাচার্য ভবনের অসামান্য গাম্ভীর্যের পটভূমিতে এই ছােট্ট ঘরান একটি স্বপ্নবিন্দুর মতাে ফুটে উঠেছে। আবু জুনায়েদ যখন ভাবেন মেয়াদ রয়ে গেলে ঘরটি সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারবেন না, মনটা বিষাদে ছেয়ে যায় আবু জুনায়েদ মনে করেন, একই সঙ্গে গরু গােয়াল দুটিই দেখিয়ে সকলকে তাক লাগিয়ে দেবেন।

যেদিন গরুটা গােয়ালে আসাবে কয়েকজনকে সন্ধ্যেবেলা চায়ের নিমন্ত্রণ করবেন। উত্তরদিকে যে শো বানানাে হয়েছে সেখানে চেয়ার টেবিল পেতে অতিথিদের নিয়ে বসবেন। কিন্তু গরুটা কখন আসবে? কখন আসবে? 

ই হাহাকা হাতি?ি কাল সার গােয়ালঘর জালি করত আসাবন) নিষ্ঠাবান শক মন্দির নির্মাণের স্তু হি প্রতিষ্ঠার জন্য যেমন আকুলিত অন্তরে প্রতীক্ষা । করতে থাকেন, আবু জুনায়েদের মনেও সে ধরনের আকুলি-বিকুলি জন্ম নিচ্ছিল । আবু জুনায়েদ ভেবে দেখলেন, গরুটা আকাশ থেকে তাঁর গােয়ালঘরের বাসিন্দা বনে যাবে না। শেখ তবারক আলী সাহেব কথা দিয়েছেন তার ভাইঝি এবং নাতনিকে একটা গরু প্রেজেন্ট করবেন।

প্রেজেন্ট করা গরু নিরাপদে বসবাস করতে পারে, সেজন্য এই গােয়ালঘর বানিয়ে দেবেন। গােয়ালঘর বানিয়ে তিনি কথা রেখেছেন, কিন্তু গরুটা কখন নিয়ে আসবেন? গরু বিহনে গােয়ালঘরটা যেন কাঁদছে, আবু জুনায়েদের এরকম মনে হল। আৰু জুনায়েদ ভেবে দেখলেন গােয়ালঘর বানানাের পেছনে শেখ তবারক অনেক টাকা ব্যয় করে ফেলেছেন। গরু কিনতে আরাে টাকার প্রয়ােজন ।

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১২)

এদিকটা আবু জুনায়েদের দেখার বিষয় নয়। এসব তিনি ভ্রাতুস্পুত্রী এবং নাতনিকে গিফট করছেন। সুতরাং টাকার অঙ্কে তিনি হিসেব করবেন কেন? কিন্তু গরুটা কখন আসবে? চট করে তাঁর মাথায় একটা চিন্তা খেলে গেল। তবারক সাহেব, তাঁর স্ত্রী, জামাই আবেদ হােসেন এবং কন্যাকে দাওয়াত করলে চমৎকার হয়।

তাদেরকে একবার তবারক সাহেব দাওয়াত করে খাইয়েছেন, পাল্টা দাওয়াত করা তাঁর একটি সামাজিক কর্তব্য। দাওয়াত খেতে এলে গরুটা কখন আসবে সঠিক তারিখ জানা সম্ভব হবে। আসল তারিখটা জানতে পারলে বাড়তি উৎকণ্ঠার অবসান হবে। 

সেদিনই রাতে জুনায়েদ শেখ তবারক আলীকে টেলিফোন করে বসলেন । তবারক সাহেব নিজেই রিসিভ করেছিলেন। আবু জুনায়েদ আগামী শুক্রবারে আবেদ হােসেন, তার স্ত্রী এবং চাচা চাচিকে খাওয়ার নিমন্ত্রণ করলেন। শেখ তবারক আলী বললেন, 

 -এত ঘটা করে দাওয়াত করার দরকার কী। মেয়ের বাড়ি যখন ইচ্ছে খেয়ে যাব। আবু জুনায়েদ একটু ধান্ধায় পড়ে গিয়েছিলেন। তবে কি তবারক সাহেব আবু 

জুনায়েদের নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করলেন? পরের ব্যাখ্যায় আবু জুনায়েদের কাছে। সবকিছু স্পষ্ট হয়ে গেল। শেখ তবারক আলী বললেন, 

-শুনুন জামাই মিয়া দাওয়াত টাওয়াত ওগুলাে এখন রাখেন। বানু এবং তার মেয়ে আমার এখানে যতবার ইচ্ছে যখন খুশি আসতে পারেন। এমনকি আপনি এলেও কিছু এসে যায় না । আমি বাস করি একেবারে মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। আমার এখানে কে এল কে গেল কে হিলে রাখে। কিন্তু স্যার ভুলে যাবেন না আপনি দেশের সবচাইতে বড় বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য !

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১২)

আপনি কী করেন না করেন শত শত চোখ তাকিয়ে আছে। একটুখানি খুঁত পেলেই আপনার নিজের পেশার মানুষেরাই আপনাকে ছিড়ে খুঁড়ে ফেলবে। আপনার বাড়িতে খেলাম না খেলাম এ নিয়ে উতলা হবেন না। আমাদের ভেতরের যে সম্পর্ক সেটা তাে তুচ্ছ কারণে নষ্ট হওয়ার নয়। আমি আপনার কাছ থেকে একটা জিনিসই জানতে চাইব। 

আবু জুনায়েদ বললেন, বলুন কী বলতে চান? -গােয়াল ঘরটা আপনার পছন্দ হয়েছে কি না। আৰু জুনায়েদ বললেন, 

-হ্যা খুবই পছন্দ হয়েছে। গরুর বদলে যে কোনাে রুচিবান মানুষকে এই ঘরে বাস করতে বললে খুশি হয়ে রাজি হবে। আপনার পছন্দবােধ এত উন্নতমানের। 

শেখ তবারক আলী বললেন, 

-আপনি পছন্দ করেছেন শুনে আমার দিলটা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। বানুর কেমন লেগেছে? 

-আপনাদের মেয়ে তাে একেবারে পাগল। লােকজনকে ডেকে দেখাবার জন্যে হন্যে হয়ে উঠেছে। 

-শুনুন জামাই মিয়া, শেখ তবারক আলী বললেন, 

-ওটি ঘটতে দেবেন না। এই সমস্ত জিনিস যত কম মানুষ জানে ততই উত্তম। আমি কী বলছি আপনি বুঝতে পারছেন তাে? 

আবু জুনায়েদ এক মিনিট থামলেন, তারপর বললেন, -হ্যা পারছি। 

-আজ বৃহস্পতিবার। আগামী কাল শুক্রবার। রাত আটটার পরে আমার লােক গরুটা নিয়ে আপনার বাড়িতে যাবে। আপনাকে কিছুটা চিন্তা করতে হবে না। গরুর সঙ্গে খইল ভূষি কুড়া ঘাস সবই যাবে । যে লােক গরুর সঙ্গে যাবে সেই লােকটিই দেখাশােনার জন্য সেখানে থেকে যাবে। দক্ষিণ দিকের শেডটা সেজন্যই তৈরি করা হয়েছে। অনায়াসে বিছানা পেতে একজন মানুষ ঘুমােতে পারে। রাত সাড়ে নটা দশটার দিকে আমি এক ফাঁকে একবার দেখে আসব ।। 

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১২)

আবু জুনায়েদ অবাক হয়ে গেলেন। শেখ তবারক আলী মানুষটির বিশালতা ও সূক্ষ্ম চিন্তার পরিধি দেখে আবু জুনায়েদের কাণ্ডজ্ঞান লােপ পাওয়ার মতাে অবস্থা। যে সকল ভাবনা-চিন্তা আবু জুনায়েদের মনে একবারও উদয় হয়নি, শেখ তবারক আলী সেগুলাে থরে থরে ব্যাখ্যা করে গেলেন। শেখ তবারক আলী যে তার স্ত্রী নুরুন্নাহার বানুর আপন চাচার অধিক সে কথা তলিয়ে বিচার করবে কে?

লােকে যখন জানবে ঠিকাদার শেখ তবারক আলী নুরুন্নাহার বানুকে জড়ােয়া গয়নার সেট উপহার দিয়েছেন, মেয়েকে বেনারশি এবং সােনার চুড়ি দিয়েছেন, আর সুন্দর একটি গােয়ালঘর বানিয়ে দিয়ে একটি মহামূল্যবান গন্ত পর্যন্ত সেখানে ঢুকিয়ে দিয়েছেন, আবু জুনায়েদের প্রতি একান্ত সহানুভূতিশীল করে মনও বিরূপ হয়ে যাবে।

অলঙ্কার হােক, শাড়ি হােক, গােয়াল ঘর, গ ই হোক না সবকিছুর একটা নগদ অর্থমূল্য রয়েছে। কেউ যদি আপতি . হলে শ্বেবিদ্যালয়ের কনস্ট্রাকশন কাজে শেখ তবারককে অধিক সুবিধে দেয় :  জুনায়েদ এসব ঘুষ হিসেবে গ্রহণ করেছেন, তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনাে উপায় থাকবে না ।

কতিপয় প্রাক্তন উপাচার্যের কেলেঙ্কারির কাহিনীতে ঠিকাদারদের নাম যুক্ত হয়েছিল, আৰু জুনায়েদ বিলক্ষণ সেসব অবগত আছেন। তারপরেও আবু জুনায়েদ জেনেশুনে ওই আভড়ার সঙ্গে পড়ে গেলেন। তাঁর প্রতি লােমকূপ পর্যন্ত আঁৎকে শিউরে উঠল । ললাকে শুনলে বলবে কী?

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১২)

এই দুশ্চিন্তাটি মনে স্থায়ী হতে দিলেন না। শেখ তবারক আলী তাকে ঘুষ দেননি। তিনি কোনােরকম অর্থঘটিত কোনাে কেলেঙ্কারি করবেন একথা স্বপ্নেও তার মনে উদয় হয়নি । মানুষ যা ইচ্ছে বলুক। আবু জুনায়েদের বিবেক পরিষ্কার । শেখ তবারক আলী এ পর্যন্ত উপহার গােয়ালঘর এবং গরুর পেছনে যে অর্থ ব্যয় করেছেন, তার পেছনে ঠিকাদারি স্বার্থসিদ্ধির কোনাে মতলব নেই।

তার জান্নাতবাসী শ্বশুর একসময়ে শেখ তবারক আলীকে জীবনের আসল বৃত্তিটি ধরিয়ে দিয়েছিলেন । আজ শেখ তােরকের পয়সাকড়ির অন্ত নেই। তার থেকে সামান্য অর্থ যদি জান্নাতবাসী অগ্রজপ্রতিম গােফরান ভাইয়ের কন্যা এবং নাতনির পেছনে ব্যয় করে উপকারের প্রতিদান দিয়ে থাকেন, কার কী বলার থাকতে পারে?

তারপরেও যদি কেউ খারাপ কথা বলে তার জবাব দেয়ার ক্ষমতা মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদের আছে। তার যে একেবারে শিরদাড়া নেই, একথা ভাবা মােটেও ঠিক হবে না। সব দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে সােজা হয়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করলেন। আগামী শুক্রবারে রাত আটটার পরে তবারক সাহেবের লােক গরু নিয়ে আসবে সংবাদটি নুরুন্নাহার বানুকে জানানাে প্রয়ােজন।

 

Read more

গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(১৩)-আহমদ ছফা

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *