আনিসুল হকের গদ্যকার্টুন, রম্যরচনা আর রম্যগল্পের সংকলন একটি।
হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, এই সময়ের সবচেয়ে পরিশীলিত বিদ্রুপের নাম গদ্যকার্টুন।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছেন, রম্যতা আনিসুল হকের প্রাণের জিনিস।
এই গ্রন্থ একই সঙ্গে হাসাবে, ভাবাবে এবং বিষণ করে তুলবে।
ভালাে রম্যরচনার সেইটাই বৈশিষ্ট্য।
এই গ্রন্থ একই সঙ্গে সচল বাংলাদেশের একটি সময়ের স্থির প্রতিচ্ছবিও।
ভূ মি কা
মােটামুটিভাবে গত এক বছরে প্রকাশিত গদ্যকার্টুন, রম্যরচনা, রম্যগল্প এই বইয়ে একসঙ্গে থাকল। এগুলাে আসলে সময়ের প্রতিধ্বনি। রবীন্দ্রনাথ কথিত স্ফুলিঙ্গের মতাে, স্ফুলিঙ্গ পাখায় পেল ক্ষণকালের ছন্দ, উড়িয়ে গিয়ে ফুরিয়ে গেল এই তার আনন্দ। এখন প্রিয় পাঠকদের ভালাে লাগলেই আমার শ্রম সার্থক হবে।
জানুয়ারি ২০০৮
আনিসুল হক
কয়েক টুকরাে আমেরিকা
নিউইয়র্কের জন এফ কে বিমানবন্দর। প্রায় চব্বিশ ঘণ্টার ক্লান্তিকর উড়াল শেষে আমরা অবতরণ করেছি। সস্ত্রীক ড. আনিসুজ্জামান, রাবেয়া খাতুন, মাহমুদুজ্জামান বাবু, তারিক সুজাত আর দলবলসহ কুদ্দুস বয়াতি। এর পরের কাজ, ইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়াতে হবে। মার্কিন পাসপাের্টধারীরা একটা দরজা দিয়ে চলে যাবে, ইউরােপীয় ইউনিয়নের জন্যও আছে বিশেষ কাউন্টার। বাকিরা দাঁড়াবে ইমিগ্রেশনের লাইনে। আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল একটা মধুর বিস্ময়। আবৃত্তিশিল্পী মিথুন আহমেদ কাজ করেন এমিরেটসে। তিনি বিমানের একেবারে দোরগােড়ায় দাঁড়িয়ে। বললেন, আপনারা ভিআইপি, আমার সঙ্গে অসিন। ইমিগ্রেশন লাইনের সামনে তিনি আমাদের দাঁড় করিয়ে দিলেন।
রম্য কথা -পর্ব-(১)
আমরা সবাই আমাদের আমন্ত্রণপত্রগুলাে বের করে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। ইমিগ্রেশনের কাউন্টারে যে আমেরিকান অফিসাররা থাকেন, তাঁদের কেউ সাদা, কেউ কালাে, কেউ হিসপ্যানিক, কেউ বা পূর্ব ইউরােপ থেকে আগত। এখানে এসে সবাই আমেরিকান । তাদের একেকজনের উচ্চারণ একেক রকম। এরা যে প্রশ্ন করে, সেটা যে সব সময় বােঝা যাবে, তা না-ও হতে পারে। সহজ উপায় হলাে, হাতের আমন্ত্রণপত্র দেখিয়ে দেওয়া। নে বাবা, এখন যা বোেঝার বুঝে নে।
মাহমুদুজ্জামান বাবু কুদুস বয়াতিকে বললেন, কুদ্স ভাই, আপনার ইনভাইটেশন লেটার কই?
কুদুস বললেন, ওইটা তাে সাথে নাই, লাগেজে।
ইমিগ্রেশন পার না হওয়া পর্যন্ত লাগেজ পাওয়া যাবে না। এখন কুদুস বয়াতি ইমিগ্রেশন পার হবেন কী করে!
আমি এই সব সময়ে ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’ নিয়ম মেনে চলি। নিজের কাগজ নিয়ে সবার আগে একটা লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। দারাপুত্র পরিবার, আমি কার কে আমার, আমি জানি না।
কিন্তু শিল্পী মাহমুদুজ্জামান বাবু আবার মানবপ্রেমিক কর্তব্যপরায়ণ মানুষ। তিনি কুদুস বয়াতিকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কাগজ ছাড়া বয়াতি ইমিগ্রেশনের এই ভবনদী পেরােবেন কী করে!
বাইরে থেকে বােঝা না গেলেও দেখা যাচ্ছে, মাহমুদুজ্জামান বাবুর উপস্থিত বুদ্ধি প্রখর। তিনি বললেন, কুদস ভাই, আপনাকে যা–ই জিজ্ঞাসা করবে, বলবেন, নাে ইংলিশ।
আমরা সবাই ইমিগ্রেশন পার হয়ে গেলাম। আনিসুজ্জামান স্যার ও তাঁর স্ত্রী বেরিয়ে গেলেন সবার আগে। আমার আর বাবু ভাইয়ের সুবিধা হলাে, আমরা গত দুই বছরে দুবার ঢুকেছি আমেরিকায়। ফলে ওদের কম্পিউটারে রেকর্ড আছে। আঙুলের ছাপ মেশিনে ধরার সঙ্গে সঙ্গে পুরােনাে রেকর্ড কম্পিউটারে ওঠে, শুধু জিজ্ঞেস করে, এর আগে কবে এসেছিলে। বললে মিলিয়ে মাথা নাড়ে আর ছাড়পত্র দিয়ে দেয়। কাজেই আমরাও পেরিয়ে গেলাম। তারিক সুজাত এইবার প্রথমবারের মতাে প্রবেশপ্রার্থী। তাকে অন্য ঘরে যেতে হলাে, সেপ্টেম্বর ১১-এর পরে রেজিস্ট্রেশন করে তারপর ঢোকার নিয়ম চালু হয়েছে।
রম্য কথা -পর্ব-(১)
আমরা বাইরে অপেক্ষা করছি। যথারীতি আয়ােজকদের পক্ষ থেকে মুক্তধারার বিশ্বজিৎ সাহা অনুপস্থিত, এই বিমানবন্দরের কাছেই এসে গেছেন, মেঘের মধ্যে বিদ্যুৎরেখার মতাে মুখজোড়া হাসি নিয়ে হাজির হবেন একটু পরে, দাদা, পথে কষ্ট হয়নি তাে। আমাদের বন্ধু মঞ্জুরুল ইসলাম এসে গেছেন ফুল নিয়ে, রাবেয়া খাতুনের সম্মানে চ্যানেল আইয়ের ক্যামেরা।
কিন্তু কুদুস বয়াতি কই?
তাঁকে সপারিষদ আটকানাে হয়েছে।
আমরা যখন ইমিগ্রেশন পার হয়ে পেছনের দিকে তাকিয়েছিলাম, তখন দেখতে পেয়েছিলাম, কুদুস বয়াতিকে পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে। পুলিশের সঙ্গে যাওয়ার সময় কুদুস বয়াতি আমাদের দিকে তাকিয়ে আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের মতােই হাত নেড়েছিলেন।
এখন কুদুস বয়াতিকে রেখে আমরা নড়তেও পারছি না। তারিক সুজাতও বেরিয়ে এলেন একটু পরে। কিন্তু কুদুসের কী হবে!
তারও খানিকক্ষণ পরে কুদুস বয়াতিও বেরিয়ে এলেন। জিজ্ঞেস করলাম, ও কুদ্স ডাই, কী হলাে?
কুদুস বয়াতি জবাব দিলেন, নাে ইংলিশ।
ইমিগ্রেশনের কাউন্টারে নাে ইংলিশ শুনে তাঁকে ভেতরে আলাদা ঘরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। প্রশ্ন যা-ই হােক না কেন, কুদুস উত্তর দিয়েছেন, নাে ইংলিশ।
মাহমুদুজ্জামান বাবুর এই বুদ্ধিতে ফল হয়েছে। কুদুস বয়াতিকে সপারিষদ ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
কমেডি না ট্র্যাজেডি আমাদের দলে সবচেয়ে তরুণ কে? আনিসুজ্জামান স্যার। এই বয়সেও তিনি আমাদের আগে হাঁটেন, আমাদের চেয়েও বড় রসিকতা করেন, এবং শারীরিক ধকলও নিতে পারেন। আনিসুজ্জামান স্যার উঠেছিলেন ফাহিম রেজা নূরদের বাসায় । তারিক সুজাত আর মাহমুদুজ্জামান বাবু এক বাসায়। আমি উঠেছি যথাপূর্বং মঞ্জু সীমাদের ওখানে। | মঞ্জুরুল ইসলাম আমাদের বন্ধু, সাংবাদিক, প্রাক্তন সহকর্মী আর এখন নিউইয়র্ক এটিএন বাংলার কর্ণধার। (কর্ণধার শব্দের আসল মানে আমি জানি না, আমার ধারণা, যিনি কান ধরে থাকেন। মঞ্জুরুল ইসলাম এটিএন বাংলা নিউইয়র্কের কান না ধরলেও হাল যে ধরেছেন তাতে আমার সন্দেহ নেই)
রম্য কথা -পর্ব-(১)
মঞ্জুর নেতৃত্বে আমরা যাব আটলান্টিক সিটিতে। নিউইয়র্ক শহর থেকে ঘন্টা চারেক গাড়ি চালিয়ে যেতে হয়। আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে ওই শহরটি প্রধানত জুয়াড়িদের আকর্ষণ করার জন্য তৈরি। কিন্তু আমাদের মতাে ডাল-ভাত টাইপ বাঙালিরাও ওই শহরে যেতে পারে, নানা ধরনের থিমেটিক হােটেল দেখার জন্য। একেকটা হােটেল একেক থিমের ওপরে বানানাে, কোনােটার থিম তাজমহল, কোনােটার থিম মিসরীয় সভ্যতা ।
সে এক চোখ-ধাঁধানাে এলাহি কাণ্ড । | আমাদের হাতে বেশি সময় নেই। ওখানে পৌছাতে পৌছাতে রাত বেশি হয়ে যাবে। রাতে থাকব ওখানে। পরের দিন আবার রওনা হবাে সকাল সকাল। এই ধকল কি সইতে চাইবেন আনিসুজ্জামান স্যার। স্যার, থাকবেন, নাকি আমাদের সঙ্গে যাবেন? স্যার সঙ্গে সঙ্গে রাজি। যাবেন। এর আগেও স্যার গিয়েছিলেন আটলান্টিক সিটিতে, বঙ্গ সম্মেলনে।
একই গাড়িতে বড় মানুষদের পাশাপাশি পেলে আমি একটু সবক নিয়ে নিতে চাই। আমি পড়াশােনা করেছি বুয়েট থেকে, ওখানে শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্য-সভ্যতা নিয়ে পড়ার সুযোেগ পাইনি। বই পড়ে নিজে নিজে বােঝার চেষ্টা করি। কাজেই প্রায় কিছুই বুঝি না, আর যা বুঝি, ভুল বুঝি । বড় মানুষকে কাছে পেলে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস
করে তাঁর মতটা জেনে নেওয়া যায়। যেমন: গাড়িতে বাজছে মৌসুমী ভৌমিকের গান। একটু পরেই অ্যালেন গিন্সবার্গের সেপ্টেম্বর অন দি যশাের রােড’ বাজতে লাগল। স্যারকে বললাম, স্যার, ধরেন এই গানটা। কবিতা হিসেবে এটার খুব ভালাে বলে গণ্য হওয়ার কথা না, কারণ গানটা উপদেশমূলক।
রম্য কথা -পর্ব-(১)
কাকে বলি আজ মৃত্যু থামাও’ বলে এর একটা উপসংহারও দেওয়া আছে। কবিতার ক্ষেত্রে শব্দকেই যারা মনে করেন লক্ষ্য, যেমন মালার্মে, তাঁদের দলের কবিতায় এই উপদেশ থাকার কথা নয়। কিন্তু এই যে আমেরিকার এক কবি কবে এটা লিখেছিলেন, সেই একাত্তরে, আজ ৩৬ বছর পরে সম্পূর্ণ ভিন্ন দেশের ভিন্ন ভাষার মানুষ সেটা অনুবাদ করে গাইছে, আর আমরা সেটা কী আকুল হয়ে শুনছি, এটার কি কোনাে মূল্য নেই?
স্যার জবাব দিয়েছিলেন, নিশ্চয়ই এটা মূল্যবান।
যা-ই হােক, যে গল্প বলার জন্য এই প্রসঙ্গ এল, তা হলাে ক্লান্তিকর ভ্রমণ; রাতজাগা ইত্যাদি সত্ত্বেও দেখতে পেলাম, আনিসুজ্জামান স্যারই আমাদের মধ্যে
সবচেয়ে শক্তপােক্ত আছেন।
নিউইয়র্কে মুক্তধারার অনুষ্ঠান হচ্ছে দুটো হলে। একটা হলে আলােচনা, যেখানে দর্শকসংখ্যা খুবই কম। আরেকটা হলে সংগীতায়ােজন, গান গাইবেন হাবিব, সেটার প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ । ওই বড় মঞ্চেই গবেষক-লেখক গােলাম মুরশিদের সংবর্ধনা। হাসান ফেরদৌস, আনিস স্যার, গােলাম মুরশিদ প্রমুখের সঙ্গে আমিও উঠেছি।
দাঁড়িয়েই সংবর্ধনা বচন পঠিত হলাে, পর্দায় ভিডিও ছবিও দেখানাে হলাে গােলাম মুরশিদ সাহেবের ওপরে। তাঁকে সম্মাননা হিসেবে উত্তরীয় পরানাে হলাে। কৃত্য শেষে বাতি নিবিয়ে দেওয়া হলাে। প্রায় অন্ধকারের মধ্যে আমরা মঞ্চ থেকে নেপথ্যে চলে আসছি। হঠাৎই মেঝেতে রাখা ইয়া বড় একটা স্পিকারে পা বেধে পড়ে গেলেন আনিসুজ্জামান স্যার ।
আমি খুবই ভয় পেয়ে গেলাম। স্যারের হাত-পা কিছু ভাঙল নাকি! স্যারের স্মৃতিশক্তি, মনের জোর, চলাফেরার শক্তি একজন তরুণের পক্ষেও ঈর্ষণীয়, কিন্তু বয়স তাে আসলে মনের বন্ধন মানবে না।
স্যারের কাছে দৌড়ে গেলাম। স্যার মােটামুটি একটা ডিগবাজি খেয়েছেন। পায়ের খানিকটা কেটে গেছে, রক্তও বেরােচ্ছে ।
তিনি উঠলেন কারও সাহায্য ছাড়াই। এবং বলতে লাগলেন, “আমি ঠিক আছি, আমি ঠিক আছি।’
Read more
