রম্য কথা -পর্ব-(৮)-আনিসুল হক

রম্য কথা

এই লেখা শুরু করেছিলাম বই কিছুই পারে না, তাই বলে । এখন বলতে চাই, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি খুব গােপনে একটা কাজ করে। মানুষের মনের ভেতরটাকে পরিচর্চা করে, পরিচর্যা করে । মানুষকে মানুষের জন্যে সংবেদী ও সমব্যথী করে তােলে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, দণ্ডিতের সাথে দৃণ্ডদাতা কাঁদে যেথা সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার। দণ্ড দাতাও যে কাঁদতে পারেন, সেই রাসায়নিক বিক্রিয়াটি মানুষের হৃদয়ে গােপনে সারাক্ষণ করে চলে উৎকৃষ্ট সাহিত্য ও শিল্পের নানা মাধ্যম। 

আসলে ব্যক্তিমানুষই আসল। ব্যক্তির সমষ্টিই সমাজ। প্রতিটা ব্যক্তি যদি একটা শুভবাদী শুভ্ৰহৃদয় মানুষ হয়ে ওঠে, আলােকিত মানুষ হয়ে ওঠে, তাহলে এই জগৎটা আলােয় আলােয় ভরে উঠবে নাকি? 

কাজেই বইয়ের কাছে আমাদের ফিরে যেতে হবে বারবার । বই কিনতে হবে। এই দেশে অন্তত দেড় কোটি মানুষের হাতে মােবাইল ফোন আছে। তারা মাসে অন্ত ত ২০০ টাকার ফোন-কার্ড কেনে । স্যাটেলাইট টেলিভিশনের সংযােগ আছে অন্তত ৪০ লাখ বাড়িতে। তারা মাসে অন্তত ২০০ টাকা চাঁদা দেয় ডিশ অ্যান্টেনার জন্যে। তাহলে এই দেশে হাসান আজিজুল হকের গল্পের বই, সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্য, আনিসুজ্জামানের প্রবন্ধের বই, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের স্মৃতিকথা, শামসুর রাহমান বা আল মাহমুদের কবিতার বই কেন এক লাখ কপি বিক্রি হবে না?

রম্য কথা -পর্ব-(৮)

 হয় না, কারণ আমরা বই পড়ি না। আমাদের বাসে-ট্রেনে-বিমানে আমরা কাউকে বই পড়তে দেখি না। কিন্তু ইউরােপে আমেরিকায় এটা একটা সাধারণ দৃশ্য। বলা হচ্ছে বইয়ের দাম বেশি। মিথ্যা অভিযােগ নয়, তবে সৈয়দ মুজতবা আলী সেই কবে বলে গেছেন, বটে কোথায় দাঁড়িয়ে বলছে লােকটা এ কথা, সিনেমার টিকেটের লাইনে দাঁড়িয়ে, নাকি ফুটবল খেলার টিকেটের কিউয়ে। ৮০ টাকা দিয়ে দুই পৃষ্ঠার। গ্রিটিংস কার্ড কিনতে দাম বেশি মনে হয় না, ১০০ পৃষ্ঠার বই কিনতে গেলে দাম | একটু বেশি মনে হয়। কাগজের দাম সরকারকে কমাতে হবে । এই দাবি জোরে তুলে বলি, বই পড়ার অভ্যাসটাও আমাদের বাড়াতে হবে । বিয়েতে, বিয়ের বার্ষিকীতে, জম্মদিনে আগে যে বই উপহার দেওয়া হতাে এই দেশে, সেই রেওয়াজ কোথায় গেল? কোথায় গেল পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগারের আন্দোলন? 

এই ফেব্রুয়ারিতে বলি, আসুন, বই কিনি। বই কেনার জন্যে একটা বাজেট রাখি । ছেলেমেয়েদের হাতে বই তুলে দিই। যদি এই সভ্যতাটাকে বাঁচাতে চাই। 

২০ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ 

ও ঢেউ খেলে রে… 

ঢেউ খেলে। ঢেউ জাগে। কোথায়? নদী আর সাগরের জলে। মরুভূমির বালিসমুদ্রে। মেঘে আর বাতাসে। ঢাকাই ছবির নায়িকার তনুমনে। আল মাহমুদ লিখেছিলেন, ও পাড়ার রূপসী বােজেনা, সারা অঙ্গে ঢেউ তার তবু মেয়ে কবিতা বােঝে না। কবিতা বুঝলেও রূপসীদের অঙ্গে অঙ্গে ঢেউ বয়ে যেতে পারে। 

কিন্তু কোনাে ঢেউই কি চিরস্থায়ী? পৃথিবীতে কি এমন কোনাে ঢেউ আছে, যেটা থেকে যায়? সাগরের ঢেউ, ওটা থাকে না বলেই ঢেউ। হ্যা, পৃথিবীতে অন্তত একটি ঢেউ আছে, যেটা স্থায়ী। তার নাম ঢেউটিন। 

রম্য কথা -পর্ব-(৮)

এই ঢেউটিনের ঢেউটা মােটামুটিভাবে স্থায়ী। আর ঢেউয়ের পরিমাপ প্রতিটার বেলায় অভিন্ন। কিন্তু আপনি কি জানেন, আমরা যাকে ঢেউটিন বলি, আসলে তা টিন নয়। টিন এজেরও নয়। 

হ্যা, এগুলাে আসলে ঢেউ খেলানাে গ্যালভানাইজড লােহা। করৌগেটেড গ্যালভানাইজড আয়রন। সংক্ষেপে সিজিআই। ঢাকার ইংরেজি সংবাদপত্রে এগুলােকে বলা হয় সিআই শিট। এর সঙ্গে টিনের সম্পর্ক নেই। 

এই বিষয়টা আমিও জানতাম না। কীভাবে জানলাম? সম্প্রতি টিন নামক পদার্থটির পক্ষ থেকে কে বা কারা একটা প্রতিবাদপত্র পাঠিয়েছেন গদ্যকার্টুনের কাছে। তারা বলছেন, টিন নামের ধাতুটির নাম আসলে স্টানাম । স্টানাম মেটালিকা, বা টিনের ক্লোরাইড নানা কাজে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের কোটিকোটিপতি মন্ত্রী, এমপিদের বাড়িতে, বাগানে, মাটির নিচে যেসব ঢেউ খেলানাে পাত পাওয়া যাচ্ছে, তা টিন নয়। তা করৌগেটেড গ্যালভানাইজড় আয়রন। গ্যালভানাইজ করার জন্য লােহার সঙ্গে দস্তা মেশানাে হয়, এর মধ্যে টিনের তেমন কোনাে সংশ্রবই নেই। 

সুতরাং, লালু ফালু দুলুর নামের সঙ্গে নির্দোষ টিনের নাম যুক্ত যেন কিছুতেই না করা হয়। করা হলে, তাতে সত্যের অবমাননা হয় আর টিন নামক নিরীহ ধাতুটিকে বেইজ্জত করা হয়। 

হ্যা, এই প্রতিবাদপত্র লেখকের মতটা ভেবে দেখার মতাে। সে যেখানে নেই, সেখানে তার নামটা রাখা কেন। অবশ্য পাল্টা প্রশ্ন করা যায়, কলাবাগানে কি কলা আছে, নাকি বাগান আছে? হাতির পুলে পুলও নেই, হাতিও নেই। এমনকি গােলটেবিল বৈঠকের টেবিলগুলাে গােল হয় না, যেমন পানিপথের যুদ্ধ আদৌ জলপথে হয়নি।

রম্য কথা -পর্ব-(৮)

ওদিকে টিন-এজাররা বলছে, ঢেউটিনের বয়স মােটেও থার্টিন থেকে নাইনটিনের মধ্যে নয় যে তাকে টিন বলা যাবে। এই সিজিআই শিট তথা ঢেউটিন, এটার শুরু ১৮৪০-এর দশকে, আমেরিকায়, তারপর অস্ট্রেলিয়ায়, শেষে এই উপমহাদেশে। ঢেউ খেলানাে, হালকা, শক্ত, আর এসব দিয়ে ঘর বানানাে সােজা বলে খুব সহজেই জিনিসটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, বিশেষ করে ঘরের ছাদ হিসেবে। অস্ট্রেলিয়াতে এটা শহর অঞ্চলেও খুবই জনপ্রিয় ছাদের উপকরণ। | কাজেই যার ইতিহাস ১৬৭ বছরের, তাকে টিন বলে টিন-এজারদেরও অপমান করার মানে হয় না । 

ইতিহাসের দিক থেকে বিচার করলে এই দাবিও মানতে হয়। কিন্তু অপমানের কথাটা আসছে কেন? 

কারণটা নিহিত বিএনপি-জামায়াতের বিগত সরকারের এমপিদের কীর্তিকলাপে। এরা, এখন দেখা যাচ্ছে, সর্বভুক । কোটি কোটি টাকার চুক্তি বা ঠিকাদারিতে রাঘববােয়ালেরা বড় বড় হাঁ করেন, এটা সবাই জানে। মেনেও নিয়েছিল। তাই বলে এই কোটিকোটিপতিরা রিলিফের ঢেউটিনের লােভ সামলাতে পারবেন না!

এখন যেভাবে এদের মাটির নিচ থেকে রিলিফের ঢেউটিন, বিক্রির জন্য নয়’ সিলসংবলিত সিজিআই শিট বেরিয়ে আসছে, তাতে মনে হয়, আমাদের দুর্নীতিবাজেরা দুর্নীতিরও জাত মেরে দিয়েছেন। সেই যে কৌতুক আছে-ঘুষখাের বলছেন, পকেটে কত টাকা আছে দে, কোনাে টাকা নেই, হাতঘড়িটা খােল, হাতঘড়ি নেই, আরে দশ-বিশ টাকা যা আছে তা-ই দে, কিছুই নেই, তাহলে আমার পিঠটা একটু চুলকে দে, একদম কিছুই দিবি না, তা তাে হতে পারে না-আমাদের ক্ষমতাবানেরা এই কিসিমেরই, তাদের সামনে দিয়ে কোনাে কিছুই পার পাবে না, না হাতি, না পিপড়া। 

রম্য কথা -পর্ব-(৮)

এই মন্ত্রী-এমপিদের লােভের সঙ্গে কার তুলনা চলতে পারে? কারােরই না। একমাত্র আগুনের হয়তাে কিছুটা তুলনা চলে । আগুনের আরেক নাম সর্বভুক। সে সবকিছুকে গ্রাস করতে পারে। তার সহস্র জিহ্বা । আমাদের এই মহান নেতৃবর্গেরও ছিল সহস্র জিহ্বা আর সর্বগ্রাসী ক্ষুধা। নইলে সামান্য ঢেউটিন, যার দাম খুবই কম, যা কেবল গরিবেরই লভ্য ও ভােগ্য হতে পারে, সেটাও কি কেউ আত্মসাৎ করে । 

আমাদের লালু ভুলু দুলু ফালু ভাইয়েরা কী মহান, রিলিফের ঢেউটিনই তা প্রমাণ করে ছাড়ল। গত পাঁচটা বছরে, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি নিয়ে ওই জোট দেশটার উন্নতিতে কি বিপুল ভূমিকাই না রাখতে পারত? তারা আমাদের বিদ্যুৎ দিতে পারতেন, শিল্পায়ন করতে পারতেন, সুবিচার দিতে পারতেন, আমাদেরকে একুশ শতকের উন্নয়নের বিশ্বদৌড়ে জুড়ে দিতে পারতেন, তারা সেসবের দিকে গেলেন না, তাঁরা আমাদের দিলেন জঙ্গিদের পৃষ্ঠপােষকতা, দিলেন সীমাহীন দুর্নীতির অভয়ারণ্য। হায় খােদা, এতদিন কাদের হাতে আমরা দিয়ে রেখেছিলাম আমাদের বর্তমান আর ভবিষ্যতের ভার।

ভাই ঢেউটিন, ভাই করৌগেটেড গ্যালভানাইজড স্টিল, তুমি মাইন্ড কোরাে না, তােমার ইজ্জত খানিকটা গেছে তাে বটেই, কিন্তু তুমি আমাদের কথা একবার ভাবাে, আমাদের ইজ্জতটা কোন চুলায় গেল, কারণ এরাই ছিলেন আমাদের নেতা। আর ইংরেজিতে একটা কথা আছে, যে জাতি যে রকম, সে জাতি সে রকম নেতাই লাভ করবে-আমরাই তাে ওই টিনখােরদের আমাদের নেতা বানিয়েছিলাম। এইবার তাই চাই এমন সিস্টেম, যাতে টিনখােরেরা আর পাবলিকের ভােট ছিনিয়ে নিয়ে ফিরে আসতে না পারে, ফুলের মালা গলায় ঝুলিয়ে গেয়ে উঠতে না পারে, ও ঢেউ খেলে রে, ঝিলমিল টিনেতে ঢেউ খেলে…। 

৬ মার্চ ২০০৭ 

 

Read more

রম্য কথা -পর্ব-(৯)-আনিসুল হক

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *