অনীশ-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

অনীশ

চার শ ন নম্বর কেবিনের তােল পুরােপুরি পাল্টে গেছে। দেয়াল ঝকঝক করছে, কারণ প্লাস্টিক পেইন্ট করা হয়েছে। এ্যাটাচড় বাথরুমের দরজায় ঝুলছে হাল্কা নীল পর্দা। বাথরুমের কমােডের ফ্ল্যাশ ঠিক করা হয়েছে। পানির ট্যাপও সারানাে হয়েছে। মেঝেতে পানি জমে থাকতএখন পানি নেই।

কেবিনের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। বুড়ি বিছানায় শুয়ে শুয়ে গভীর মনােযােগে খাতায় কীসব লিখছে। লেখার ব্যাপারটি যে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তা বােঝা যাচ্ছেহাতের কাছে বাংলা অভিধান দেখে। সে মাঝেমাঝেই অভিধান দেখে নিচ্ছে।

লেখার গতি খুব দ্রুত নয়। কিছুক্ষণ পরপরই খাতা নামিয়ে রেখে তাকে চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম করতে দেখা যাচ্ছে।

এই সময় টেবিল ল্যাম্পটি সে নিভিয়ে ঘর অন্ধকার করে দিচ্ছে।

টেবিল ল্যাম্পটা খুব সুন্দর।

একটিমাত্র ল্যাম্প ঘরের চেহারা পাল্টে দিয়েছে। 

বুড়ি লিখছে 

গত পরশু মিসির আলি নামের একজনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে।

পরিচয় বলা ঠিক হচ্ছে না কারণ আমি তাঁর সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানি না।

তিনিও আমার সম্পর্কে কিছু জানেন না। মানুষটি বুদ্ধিমান, নিশ্চয়ই এটা চমৎকার একটা গুণ।

কিন্তু তীর দোষ হচ্ছে, তিনি একই সঙ্গে অহঙ্কারী।

অহঙ্কার—বৃদ্ধির কারণে, যেটা আমার ভালাে লাগে নি।

বুদ্ধির খেলা দেখিয়ে তিনি আমাকে অভিভূত করতে চেয়েছেন।

অনীশ-পর্ব-(৩)

কেউ আমাকে অভিভূত করতে চাইলে আমার ভালাে লাগে না। রাগ হয়। বয়স হবার পর থেকেই দেখছি আমার চারপাশে যারা আসছে, তারাই আমাকে অভিভূত করতে চাচ্ছে। একএক বার আমার চেচিয়ে বলার ইচ্ছা হয়েছেহাতজোড় করছি, আমাকে রেহাই দিন। আমাকে আমার মতাে থাকতে দিন। পৃথিবীতে অসংখ্য মেয়ে আছেযাদের জন্মই হয়েছে অভিভূত হবার জন্যে। তাদের কাছে যান। তাদের অভিভূত করুন, হােয়াই মি? 

এই কথাগুলি আমি মিসির আলি সাহেবকে বলতে পারলে সবচেয়ে খুশি হতাম তাকে বলতে পারছি না। কারণ উনি আমাকে সত্যিসত্যি অভিভূত করেছেন। চমকে দিয়েছেন। ছােট বালিকারা যেমন ম্যাজিক দেখে বিস্ময়ে বাকহারা হয়, আমার বেলাতেও তাই হয়েছে। আমি হয়েছি বাক্যহারা। মজার ব্যাপার হচ্ছেআমার এই বিস্ময়কে তিনি মােটেই পাত্তা দিলেন না। ম্যাজিশিয়ানরা অন্যের বিস্ময় উপভােগ করেতিনি করেন নি। 

সবুজ রঙের দেয়ালের লেখা প্রসঙ্গে যখন আমি যা জেনেছি তা তাঁকে বলতে গেলাম, তিনি কোনাে আগ্রহ দেখালেন না। আমি যখন তাঁর বিছানার পাশের চেয়ারে বসলাম, তিনি শুকনাে গলায় বললেন, “কিছু বলতে এসেছেন?” 

অনীশ-পর্ব-(৩)

আমি বললাম, “না। আপনার সঙ্গে গল্প করতে এসেছি।” 

তিনি বললেন, “ও” তাঁর চোখমুখ দেখেই মনে হল, তিনি বিরক্ত মহাবিরক্ত। নিতান্ত ভদ্রতার খাতিরে কিছু বলতে পারছেন না। চেয়ারে বসেছি, চট করে উঠে যাওয়া ভালাে দেখায় না। কাজেই মিসির আলি সাহেবের অসুখটা কি, কত দিন ধরে হাসপাতালে আছেন-এই সম্পর্কে কয়েকটা প্রশ্ন করলাম।

তিনি নিতান্তই অনাগ্রহে জবাব দিলেন। আমি যখন বললাম, আচ্ছা তাহলে যাই?’ তিনি খুবই আনন্দিত হলেন বলে মনে হল। সঙ্গেসঙ্গে বললেন, “আচ্ছাআচ্ছা। আবার আসবেন’—এই সামান্য বাক্যটি বললেন না। এটা বলাটাই স্বাভাবিক ভদ্রতা। 

তাঁর ঘর থেকে ফিরে আমার বেশ কিছু সময় মন খারাপ রইল। আমার জন্যে এটাও একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার। আমার একধরনের ডিফেন্স মেকানিজম আছেঅন্যের ব্যবহারে আমি কখনাে আহত হই নাকারণ এসবকে আমি ছেলেবেলা থেকেই তুচ্ছ করতে শিখেছি।

অনীশ-পর্ব-(৩)

মিসির আলি সাহেব আমার কিছু উপকার করেছেন, তার নিজের কেবিন ছেড়ে দিয়েছেন।

আমি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু তাই বলে তিনি আমাকে অপমান করতে পারেন না।

এই অধিকার তাঁর নেই।

ঘন্টা দুই আগে তিনি যা করলেন তা অপমান ছাড়া আর কী।

উনি ব্রেলিং ধরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি ব্লাড় ম্যাচিং নাকি কি হাবিজাবি করে উপরে এসেছি।

আমার পায়ের শব্দে তিনি তাকালেন। 

আমি বললাম, ভালাে আছেন?’ তিনি কিছু বললেন না। তাকিয়েই রইলেন। 

আমি বললাম, “চিনতে পারছেন তো? আমি বুড়ি।” তিনি বললেন, ‘ও আচ্ছা। 

‘ওআচ্ছা কোনাে বাক্য হয়? এত তাচ্ছিল্য করে কেউ কখনাে আমাকে কিছু বলে নি। আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। আমার উচিত ছিল আর কোনাে কথা না-বলে নিজের কেবিনে চলে আসা। তা নাকরে আমি গায়ে পড়ে বললাম, আজ আপনার শরীরটা মনে হয় ভালাে, হাঁটাহাঁটি করছেন। তার উত্তরে তিনি আবারও বললেন, “ও আচ্ছা।

তার মানে হচ্ছে আমি কি বলছি নাবলছি তা নিয়ে তাঁর কোনাে মাথাব্যথা নেই। দায়সারা ওআচ্ছা দিয়ে সমস্যা সমাধান করছেন। আমি তাে তাকে বিরক্ত করার জন্যে কিছু বলি নি। আমি কাউকে বিরক্ত করার জন্যে কখনাে কিছু করি না। উল্টোটাই সবসময় হয়। লােকজন আমাকে বিরক্ত করে। ক্রমাগত বিরক্ত করে।

অনীশ-পর্ব-(৩)

 মিসির আলি নামের আপাতদৃষ্টিতে বুদ্ধিমান এই মানুষটি আমাকে অপমান করছেন। কে জানে, হয়তো জেনেশুনেই করছেন। মানুষকে অপমান করার সূক্ষ্ম পদ্ধতি সবার জানা থাকে না, অস্বাভাবিক বুদ্ধিমান মানুষরাই শুধু জানেন এবং অকারণে প্রয়ােগ করেন। সেই সুযােগ তাদের দেওয়া উচিত না। আমি শীতল গলায় বললাম, “মিসির আলি সাহেব। 

উনি চমকে তাকালেন। আমি বললাম, “ঠিক করে বলুন তাে আপনি কি আমাকে চিনতে পেরেছেন? 

 ‘চিনব না কেন?” 

“আমি যা-ই জিজ্ঞেস করছি আপনি বলছেন“ও আচ্ছা। এর কারণটা কি আপনি আমাকে বলবেন?” 

“আপনি কী বলছেন আমি মন দিয়ে শুনি নি। শােনার চেষ্টাও করি নি। মনে হয় সেজনােই ‘ও আচ্ছা বলছি। 

“কেন বলুন তাে?” 

“আমি প্রচণ্ড মার্থাব্যথায় কষ্ট পাচ্ছি। এই উপসর্গ নতুন হয়েছে, আগে ছিল না। আমি মাথাব্যথা ভুলে থাকার জন্যে নানান কিছু ভাবছি। নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছি।” 

আমি বললাম, মাথাব্যথার সময় আপনাকে বিরক্ত করবার জন্যে দুঃখিত। কিছু মনে করবেন না। | আমি নিজের ঘরে চলে এলাম, কিন্তু লোকের মাধ্যবহার গল্প বিশ্বাসকরলাম না। প্রচণ্ড মাথাব্যথা নিয়ে এমন শান্ত ভঙ্গিতে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে না, এবং প্রচণ্ড মাথাব্যথায় এত সুন্দর যুক্তিভরা কথাও মনে আসে না। ভদ্রলােকের মানসিকতা কী তা মনে হয় আমি আঁচ করতে পারছি।

অনীশ-পর্ব-(৩)

কিছু কিছু পুরুষ আছে, যারা রূপবতী তরুণীদের অগ্রাহ্য করে একধরনের আনন্দ পায়। সচরাচর এরা নিঃসঙ্গ ধরনের পুরুষ হয়, এবং নারীসঙ্গের জন্যে তীব্র বাসনা বুকে পুষে রাখে। | মিসির আলি সাহেব যে একজন নিঃসঙ্গ মানুষ, তা এই দু’ দিনে আমি বুঝে ফেলেছি। এই ভদ্রলােককে দেখতে কোনাে আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধব এখন পর্যন্ত আসে নি।

আমাদের দেশে গুরুতর অসুস্থ একজনকে দেখতে কেউ আসবে না তা ভাবাই যায় না। একজন কেউ হাসপাতালে ভর্তি হলে তার আত্মীয়স্বজন আসে, বন্ধুবান্ধব আসে, পাড়া-প্রতিবেশী আসে, এমনকি গলির মােড়ের যে মদীদোকানি সে-ও আসে। এটা একধরনের সামাজিক নিয়ম। মিসির আলির জন্যে কেউ আসছে না।

অবশ্যি ভ্রামাকে দেখতেও কেউ ড্রাসছে না। আমার ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করা যায়। আমি কাউকেই কিছু জানাই নি। যারা জানে তাদের কঠিনভাবে বলা হয়েছে তারা যেন আমাকে দেখতে নাআসে। তারা আসছে না, কারণ আমার নিষেধ অগ্রাহ্য করলে তাদেরই সমস্যা।

 আচ্ছা, আমি এই মানুষটিকে নিয়ে এত ভাবছি কেন ? নিতান্ত অপরিচিত একজন মানুষকে নিয়ে এত চিন্তাভাবনা করার কোনাে মানে হয়! আমি নিজে নিঃসঙ্গ বলেই কি একজন নিঃসঙ্গ মানুষের প্রতি মমতাবােধ করছি? 

অনীশ-পর্ব-(৩)

ভদ্রলােক আমার প্রতি অবহেলা দেখিয়েছেন, আমি তাতে কষ্ট পাচ্ছি। আমরা অতি প্রিয়জনদের অবহেলাতেই কষ্ট পাই। কিন্তু এই ভদ্রলােক তো আমার অতি প্রিয় কেউ নন। আমরা দুজন দু প্রান্তের মানুষ। তাঁর জগৎ ভিন্ন, আমার জগৎ ভিন্ন। হাসপাতাল ছেড়ে চলে যাবার পর আর কখনাে হয়তাে তীর সঙ্গে আমার দেখা হবে না। 

 আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, এই হাসপাতালে যে-ক’টা দিন আছি সেই কটা দিন ভদ্রলােকের সঙ্গে গল্পটল্প করলে আমার ভালাে লাগবে। কারাে সঙ্গে কথা বলেই আমি আরাম পাই না। যার সঙ্গেই কথা বলি, আমার মনে হয় সে ঠিকমতাে কথা বলছে না

ভান করছে। নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করছে। যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষ। সে ধরেই নিচ্ছে তার কথাবার্তায় মুগ্ধ হয়ে আমি মনে-মনে তার সম্পর্কে খুব উচু ধারণা করছি, অথচ আমি যে মনেমনে অসংখ্য বার বলছি হাঁদারাম, হাঁদারাম, তুই হাঁদারাম, সেই ধারণাও তার নেই। 

অনীশ-পর্ব-(৩)

মিসির আলি নিশ্চয়ই সেরকম হবেন না। তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে নিশ্চয়ই আমি কখনাে মনেমনে বলব নাহাঁদারাম। আমার নিজের একটি নিতান্তই ব্যক্তিগত গল্প আছে, যা আমি খুব কম মানুষকেই বলেছি। এই গল্পটাও হয়তাে আমি তাঁকে বলতে পারি। আমার এই গল্প আমি যাঁদেরকে বলেছি তাঁদের সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে শুনেছেন, তারপর বলেছেনআপনার মানসিক সমস্যা আছে।

ভালাে কোনাে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যান। | মানুষ এই এক নতুন জিনিস শিখেছে, কিছু হলেই সাইকিয়াট্রিস্ট। মাথা এলােমেলাে হয়ে আছে। সাইকিয়াট্রিস্ট সেই এলােমেলাে মাথা ঠিক করে দেবেন। মানুষের মাথা কি এমনই পলকা জিনিস যে সামান্য আঘাতেই এলােমেলো হয়ে যাবে? এই কথাটিও মিসির আলি সাহেবকে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে।

ভদ্রলােক মাস্টার মানষ, কাজেই ছাত্রীর মতো ভঙ্গিতে খানিকটা ভয়েভয়ে যদি জিজ্ঞেস করা যায়আচ্ছা সার, মানুষের মাথা এলােমেলাে হবার জন্যে কত বড় মানসিক আঘাতের প্রয়ােজন? তখন তিনি নিশ্চয় এই প্রশ্নের জবাব দেবেন। সেই জবাবের গুরুত্ব থাকবে। কারণ মানুষটির ভেতর লজিকের অংশ বেশ শক্ত। 

অনীশ-পর্ব-(৩)

বুড়ি বলল, ‘স্যার, আসব?” 

মিসির আলি বিছানায় কাত হয়ে বই পড়ছিলেন—-বইটির নাম‘Mysteries ofafterlife’—লেখক F. Smyth, 1 মজার বই। মৃত্যুর পরের জগৎ সম্পর্কে এমন সব বর্ণনা আছে, যা পড়লে মনে হয় লেখকসাহেব ঐ জগৎ ঘুরে এসেছেন। বেশ কিছুদিন সেখানে ছিলেন। ভালােমতাে সবকিছু দেখা। এ জাতীয় বই যে লেখা হয়, ছাপা হয় এবং হাজারহাজার কপি বিক্রি হয় এটাই এক বিস্ময়।

 তিনি বই বন্ধ করে বুড়ির দিকে তাকালেন। মেয়েটির সঙ্গে বেশ কয়েকবার তাঁর দেখা হয়েছে। মেয়েটির ভাবভঙ্গিতে মনে হয় তাঁর সঙ্গে দেখা করার ব্যাপারে সে একধরনের আগ্রহ বােধ করছে। আগ্রহের কারণ স্পষ্ট নয়। তার কি কোনাে সমস্যা আছে? থাকতে পারে।

মিসির আলি এই মুহুর্তে অন্যের সমস্যা নিয়ে ভাবতে চাচ্ছেন না। তাঁর নিজের সমস্যাই প্রবল। শরীরসমস্যা। ডাক্তাররা অসুখের ধরন এখনাে ধরতে পারছেন না। বলছেন যকৃতের একটা অংশ কাজ করছে না।

যকৃৎ মানুষের শরীরের বিশাল এক যন্ত্র ! সেই যন্ত্রের অংশবিশেষ কাজ নাকরলেও অসুবিধা হবার কথা নয়তাহলে অসুবিধা হচ্ছে কেন? মাথার যন্ত্রণাইবা কেন হচ্ছে? টিউমারজাতীয় কিছু কি হয়ে গেল? টিউমার বড় হচ্ছেমস্তিষ্কে চাপ দিচ্ছে। সেই চাপটা শুধু সন্ধ্যার পর থেকে দিচ্ছে 

কেন? 

বুড়ি আবার বলল, ‘সার, আমি কি আসব?’ 

মেয়েটির পরনে প্রথম দিনের আসমানী রঙের শাড়ি। হয়তাে এই শাড়িটিই তার লাকি শাড়ি | অপারেশন টেবিলে যাবার আগে সে বলবেআমাকে এই লাকি শাড়িটা পরতে দিন। প্লীজ ডাক্তার, প্লীজ। 

রাত আটটা প্রায় বাজে। এমন কিছু রাত নয়, তবু মিসির আলির ঘুম পাচ্ছে। কারাে সঙ্গেই কথা বলতে ইচ্ছা করছে না।

 

Read more

অনীশ-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *