অনীশ-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

অনীশ

আমার ধারণা শরীর থেকেই ভালবাসার জন্ম হতে পারেআমি আমার স্বামীকে ভালবাসলামআমার ধারণা, এই ভালবাসার উৎস শরীরমানুষের মন যেমন বিচিত্র, তার শরীরও তেমনি। 

আমি এবং আমার মা, আমরা দুজনই ছিলাম নিঃসঙ্গতৃতীয় ব্যক্তি এসে আমাদের এই নিঃসঙ্গতা দূর করলবাড়ির একতালাটা মা আমাদের দুজনকে ছেড়ে 

দিলেন। মা’র সঙ্গে থেকেও তাঁর কাছ থেকে আলাদা থাকার স্বাদ খানিকটা হলেও পাওয়া গেল। আমরা একসঙ্গে খাবার খেতাম। তখন আমার স্বামী মজারমজার কথা বলে আমাদের খুব হাসাতেন। আমামাকে তিনি বেশ পছন্দ করতেন। আমরা হয়তাে খেতে বসলাম, তিনি আমামার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আম্মা, আপনাকে এমন মনমরা লাগছে কেন? তাহলে শোনেন একটা মজার গল্পমন ভালাে করে দেবে। আমাদের দেশের বাড়িতে সফদরগঞ্জ বাজারে এক দর্জি থাকত। এক ঈদে সে তিনটা হাত দিয়ে এক পাঞ্জাবি বানাল … 

গল্প এই পর্যন্ত শুনেই মা হাসতেহাসতে ভেঙে পড়লেন | মা হাসছেন, আমি হাসছি আর উনি মুখ গম্ভীর করে বসে আছেনকখন আমরা হাসি থামাব সেই অপেক্ষা। 

ঘরজামাইদের নানান রকম ত্রুটি থাকে। তারা সারাক্ষণ শ্বশুরবাড়ির টাকাপয়সা সম্পর্কে খোঁজখবর করে। তাদের চেষ্টাই থাকে কী করে সব কিছুর দখল নেওয়া যায়। আমার স্বামী তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। তিনি কখনাে এসব নিয়ে মাথা ঘামান নি। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। রাতদিন পড়াশােনা নিয়ে থাকতেন। অবসর সময়টা মা’কে গল্প শােনাতে পছন্দ করতেন। আমাকে গল্প শােনানাের ব্যাপারে তিনি তেমন আগ্রহ বােধ করতেন না। আমার শরীর তিনি যতটা পছন্দ করতেন, আমাকে ততটা করতেন না। 

অনীশ-পর্ব-(৮)

বিয়ের দু’ মাস যেতেই আমার ধারণা হল সম্ভবত আমি ‘কনসিভ করেছি। পুরােপুরি নিশ্চিতও হতে পারছি না। একই সঙ্গে ভয় এবং আনন্দে আমি অভিভূত।  এক রাতে স্বামীকে বললাম। তিনি সরু চোখে দীর্ঘ সময় আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘পেটে বাচ্চা?’ 

আমি চুপ করে রইলাম। ‘বয়স কত বাচ্চার?’ ‘জানি না। আমি কী করে জানব? ডাক্তারের কাছে নিয়ে চল, ডাক্তার দেখে বলুক। 

‘ডাক্তারের কাছে নিতে হবে না। বাচ্চা কখন এসেছে সেটা তুমিই জান। ঐ যে পাঁচ রাত ছিলে অন্য জায়গায়, ঘটনা তখন ঘটে গেছে। ‘কী বলছ তুমি! 

রকম চমকে উঠবে না। চমকে ওঠার খেলা আমার সাথে খেলবে না। তােমার পেটে অন্য মানুষের সন্তান। 

আমি হতভম্ব। 

আমার স্বামী কুৎসিততম কথা ক’টি বলে বাতি নিভিয়ে শুতে এলেন এবং অন্যসব রাতের মতােই শারীরিকভাবে আমাকে গ্রহণ করলেন।

ঘৃণায় আমি পাথর হয়ে গেলাম। 

 আমি বললাম, আমার শান্তির দরকার নেই। অশান্তিই ভালাে।’মানসিক আঘাতে আঘাতে আমি বিপর্যস্ত। একদিন ইচ্ছে করেই আমার স্বামী আমার পেটে লাথি বস লেন এই আশায় যেন গর্ভপাত হয়ে যায়। আমি দু’হাতে পেটে চেপে বসে পড়তেই তিনি গভীর আগ্রহে বললেন, ‘কি, যন্ত্রণা খালাস হয়ে গেছে?’রাতে আমি ঘুমুতে ভঙ্গিতে। দিনের কোনােকিছুই তখন তাঁর মনে থাকে না। | আমার স্বামী আমাকে বললেন, ‘বাচ্চাটিকে তুমি নষ্ট করে ফেলা যদি নষ্ট করে ফেল, তাহলে আমি আর কিছু মনে পুষে রাখব না। সব ভুলে যাব। সব চলবে আগের মতাে। তুমি মেয়ে খারাপ না।

অনীশ-পর্ব-(৮)

আমি বললাম, ‘বাচ্চা আমি নষ্ট করব না। এই বাচ্চা তােমার। ‘চুপ থাক। নষ্ট মেয়েছেলে। ‘তুমি দয়া করে আমাকে বিশ্বাস কর।’ 

‘চুপচুপ চুপ বললাম—পাঁচ ব্লাত বাইরে কাটিয়ে ঘরে ফিরেছ। রাতে কী মচ্ছব হয়েছিল আমি জানি না? ঠিকই জানি। আমি খোঁজ নিয়েছি। তুমি কোনাে খোঁজ নাও নি। ‘চুপ চুপ বললাম।’ 

আমি দিনরাত কাঁদি। আমার মাও দিনরাত কাঁদেন। এক পর্যায়ে মা আমাকে বলতে বাধ্য হলেনবাচ্চাটা নষ্ট করে ফেলাই ভালাে। বাচ্চাটা তুই নষ্ট করে ফেল। সংসারে শান্তি আসুক।’ 

আমি বললাম, আমার শান্তির দরকার নেই। অশান্তিই ভালাে। 

মানসিক আঘাতেআঘাতে আমি বিপর্যস্ত। একদিন ইচ্ছে করেই আমার স্বামী আমার পেটে লাথি বসালেন এই আশায় যেন গৰ্ভপাত হয়ে যায়। আমি দু’হাতে পেটে চেপে বসে পড়তেই তিনি গভীর আগ্রহে বললেন, “কি, যন্ত্রণা খালাস হয়ে গেছে? | রাতে আমি ঘুমুতে পারি না। দিনে খেতে পারি না। ভয়ংকর অবস্থা। আমার পেটের ও ব্যাহত হচ্ছে। ডাক্তার প্রতিবারই পরীক্ষা করে বলেন-বেবির গ্রোথ তো ঠিকমতাে হচ্ছে না। সমস্যা কী? আরাে ভালােমতো খাওয়াদাওয়া করবেন। প্রচুর বিশ্রাম করবেন। দৈনিক দু গ্লাস করে দুধ খাবেন। আর ওয়েট বেৰিহলে খুব সমস্যা।এই দেশে বেশির ভাগ শিশুমৃত্যু হয় আন্ডারওয়েটের জন্য।’

অনীশ-পর্ব-(৮)

আমার সন্তানের যখন ছ’ মাস তখন ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটল। আমার স্বামী এক সকালে চায়ের টেবিলে শান্তমুখে ঘােষণা করলেন‘আমি আজ এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আপনারা আমার কথা শােনেন নি। সন্তানটাকে নষ্ট করতে রাজি হন নি। কাজেই আমি বিদায়। তবে আরেকটা কথা-যদি সন্তানটা মৃত হয়, মৃত হবারই কথা, তাহলে আমি আবার ফিরে আসব। অতীতে যা ঘটেছে তা মনে রাখব না। রূপা মেয়ে খারাপ না ।

পার্কেচক্রে তার পেটে অন্য পুরুষের সন্তান এসে গেছে। আমি সেই অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছি। সন্তান মৃত হলে সব চলবে আগের মতাে।’ আমার মা কঠিন গলায় বললেন, সন্তান মৃত হওয়ার কথা তুমি বললে কেন? এই কথা কেন বললে?” 

বললাম, কারণ আমি জানি সন্তান মৃত হবে। আমি.আমি.….. ‘তুমি কি? 

আমার স্বামী আর কিছু বললেন না। মা’র অনুরােধ, কান্নাকাটি, আমার কান্না কিছুতেই কিছু হল না, তিনি চলে গেলেন। আমি অসুস্থ হয়ে পড়লাম। প্রচণ্ড জর, গায়ে চাকাচাকা কিসব বেরুল, মাথার চুল পড়ে গেল। ভয়ংকর- ভয়ংকর স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম। সেই সময়ের সবচেয়ে কমন স্বপ্ন ছিলআমি একটা ঘরে বন্দি হয়ে আছি। ঘরে কোনাে আসবাবপত্র নেই। সাদা দেয়াল। হঠাৎ সেই সাদা দেয়াল ফুড়ে একটা কালাে লম্বা হাত বের হয়ে এল।

হাত না, যেন একটা সাপ। সাপের মাখা যেখানে থাকে সেখানে মাখার বদলে মানুষের আঙুলের মতো আঙুল। হাতটা আমাকে পেঁচিয়ে ধরল। ঠাণ্ডা কুৎসিত তার স্পর্শ। ঘুম ভেঙে যায়। দেখি, সারা শরীর ঘামে চটচট করছে। বাকি রাতটা জেগে থাকার চেষ্টা করি। আব্বার একসময় তার মতাে আসে। সেই একই স্বপ্ন দেখি, চিৎকার করে জেগে উঠি! | | বাচ্চার ‘ মাসের সময় ডাক্তার খুবই চিন্তিত হয়ে পড়লেন। বললেন, বাচ্চার সাইজ অত্যন্ত ছােট, মুভমেন্ট কম। আপনি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যান। মনে হচ্ছে বাচ্চা যথেষ্ট অক্সিজেন পাচ্ছে না।’ 

অনীশ-পর্ব-(৮)

হাসপাতালে ভর্তি হলাম। দুর্বল, অপষ্ট একটি শিশুর জন্ম দিলাম। নিজেও খুব অসুস্থ হয়ে পড়লাম। বাচ্চাকে রাখা হল ইনকিউবিটরে। অসুস্থ অবস্থায় একদিন দেখি দরজার কাছে আমার স্বামী দাঁড়িয়ে। ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি বললাম, ভেতরে এস। সে হিসহিস করে বলল, বিষের পুঁটলিটা কই? এখনাে বেঁচে আছে? এখনাে বেঁচে আছে কেন তা তো বুঝলাম না তার তাে মরে যাওয়া উচিত ছিল। আমি দরগায় মানত করেছি। এমন দরগা, যেখানে মানত মিস হয় না।’ আমি আঁৎকে উঠলাম। সে ঘরে ঢুকল না, খানিকক্ষণ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেল। আমি মাকে বললাম, ‘কিছুতেই আমি হাসপাতালে থাকব না। কিছুতেই না। হাসপাতালে থাকলেই সে এসে কোনােনাকোনােভাবে বাচ্চার ক্ষতি করার চেষ্টা করবে।’ 

মা বললেন, তাের এই অবস্থায় হাসপাতাল ছাড়া ঠিক হবে না। বাচ্চা খানিকটা সামলে নিয়েছে, কিন্তু তাের অবস্থা খুব খারাপ। বাড়িতে নিয়ে গেলে তুই মরে যাবি। 

অনীশ-পর্ব-(৮)

‘মরে গেলেও আমি বাড়িতেই যাব।

এখানে থাকব না।

‘ডাক্তার তােকে ছাড়বে না।

‘ডাক্তারকে তুমি ডেকে আন মা।

আমি তাঁর পা জড়িয়ে ধরব। 

ডাক্তার আমাকে ছাড়লেন। বাচ্চা নিয়ে আমি বাসায় চলে এলাম। দারােয়ানকে বলে দিলাম, দিনরাত যেন গেট বন্ধ থাকে। কাউকেই যেন ঢুকতে দেওয়া না হয়। কাউকেই ।  আমার শরীর খুবই খারাপ হল। একরাতের কথাঘুমুচ্ছি। মা ঘরে ঢুকে বললেন, ‘বাচ্চাটা যেন কেমন করছে। 

আমার বুক ধড়াস করে উঠল। আমি ক্ষীণ স্বরে বললাম, কেমন করছে মানে কী মা ? মনে হচ্ছে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে! ‘তুমি বসে আছ কেন? তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাও। 

অ্যাম্বুলেন্স খবর দিয়েছি।’ অ্যাম্বুলেন্স আসতে দেরি করবে, তুমি বেবিট্যাক্সি করে যাও।’ 

এমন সময় বাচ্চা দুর্বল গলায় কেঁদে উঠল। মা ছুটে পাশের ঘরে গেলেন। পরক্ষণেই আমার ঘরে ফিরে এলেন। তাঁর মুখ সালা! হাতপা কাঁপছে। আমি চিৎকার করে জ্ঞান হারালাম। জ্ঞান ফিরল চারদিন পর হাসপাতালে। আমি বললাম, আমার বাচ্চা, আমার বাচ্চা? 

মা পাথরের মতো মুখ করে রইলেন। আমি আবার জ্ঞান হারালাম। 

আমার বাচ্চার কবর হল আমাদের বাড়ির পিছনে। আম গাছের নিচে। ছােট্ট একটা কবর ছাড়া বাড়িতে কোনাে রকম পরিবর্তন হল না। সবকিছু চলতে লাগল আগের মতাে। আমার স্বামী ফিরে এলেন। আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘আই অ্যাম সরি। সময়ের সঙ্গেসঙ্গে তুমি শােক কাটিয়ে উঠবে। আমি তােমাকে সাহায্য করব। 

অনীশ-পর্ব-(৮)

আমি প্রাণপণ চেষ্টা করলাম শােক কাটিয়ে উঠতে। প্রবল শােক একবার আসে না। দু’ বার করে আসে। তাই নাকি নিয়ম। অন্যের কথা জানি না, আমার বেলায় নিয়ম বহাল রইল। চার মাসের মাথায় মা মারা গেলেন। মা শেষের দিকে খুব চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন। কারাে সঙ্গে কথা বলতেন না। নিজের ঘরে দরজাজানালা বন্ধ করে বসে থাকতেন। মৃত্যুর দু’ দিন আগে আমাকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, আমার বিরুদ্ধে তাের কি কোনাে অভিযােগ আছে? 

 

Read more

অনীশ-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *