অনীশ-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ

অনীশ

আমি বললাম, ‘না।’ 

আমার গায়ে হাত দিয়ে স্পষ্ট করে বল। 

আমি মায়ের গায়ে হাত দিয়ে স্পষ্ট করে বললাম, তােমার বিরুদ্ধে আমার। কোনাে অভিযােগ নেই।’ 

“সত্যি ! ‘হ্যাসত্যি। শুধু খানিকটা অভিমান আছে। ‘অভিমান কেন? 

‘তােমার জামাই যেমন মনে করে, আমার ছেলের বাবা সে নয় তুমিও তাই মনে কর।’ 

মা চমকে উঠে বললেন, ‘এই কথা কেন বলছিস? 

আমি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললাম, তুমি রাতদিন এত নামাজ পড়রােজা রাখ। কিন্তু কখনাে তুমি আমার ছেলের কবরের কাছে দাঁড়িয়ে একটু দোয়া পড় নি। তার থেকেই এই ধারণা হয়েছে। বিশ্বাস কর মা, আমি ভালাে মেয়ে।মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘ঐ কবরটা আমি সহ্য করতে পারি না বলে কাছে যাই না। দূর থেকে দোয়া পড়ি মা। দিনরাতই আল্লাহকে ডেকে তাের ছেলের মঙ্গল কামনা করি। মা মারা গেলেন। 

যতটা কষ্ট পাব ভেবেছিলাম ততটা পেলাম না। বরং নিজেকে একটু যেন মুক্ত মনে হল। অতি সূক্ষ্ম হলেও স্বাধীনতার আনন্দ পেলাম। মনের এই বিচিত্র অবস্থার জনো লজ্জাও পেলাম। 

মা’র মৃত্যুর মাসখানেকের মধ্যে আমার মধ্যে মস্তিষ্কবিকৃতির লক্ষণ দেখা গেল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। সন্ধ্যা হয়হয় করছে। হঠাৎ শুনলাম আমার বাচ্চাটা কাঁদছে। ওঁয়াওঁয়া করে কান্না। এটা যে আমার বাচ্চার কান্না তাতে কোনাে সন্দেহ রইল না। আমার সমস্ত শরীর কাঁপতে লাগল। 

রকম ঘটনা প্রায়ই ঘটতে লাগল। রাতে ঘুমুতে যাচ্ছিবাতি নিভিয়ে মশারির ভেতর ঢুকছি—অমনি আমার সমস্ত শরীর ঝনঝন করে উঠল। আমি শুনলাম, আমার বাচ্চা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে কাঁদছে। আমি ছুটে গেলাম কবরের কাছে। আমার স্বামী এলেন পিছনে, পিছনে। তিনি ভীত গলায় বললেন, ‘কী ব্যাপার? কী ব্যাপার? 

অনীশ-পর্ব-(৯)

আমি বললাম, কিছু না। কিছু না, তাহলে দৌড়ে চিৎকার করে নিচে নেমে এলে কেন? 

এমনি এসেছি। কোনাে কারণ নেই।’ তােমার মাথাটা আসলে খারাপ হয়ে গেছে রূপা। বােধহয় হয়েছে।’ ‘ভালাে কোনাে ডাক্তারকে দিয়ে চিকিৎসা করাও। 

‘আচ্ছা করা। এখন তুমি আমার সামনে থেকে যাও। আমি এখানে একা একা খানিকক্ষণ বসে থাকব। 

‘কেন?* ‘আমার ইচ্ছা করছে, তাই।’ 

এখন বৃষ্টি হচ্ছে। তুমি অকারণে বৃষ্টিতে ভিজবে?” ‘ই ’ 

একজন ভালাে সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে তােমার দেখা করা দরকার। দেখা করব। এখন তুমি যাও। 

সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গেও দেখা করলাম। কাউকে জানালাম না, একাএকা গেলাম। সাইকিয়াট্রিস্ট বেশ বয়স্ক মানুষ। মাথার চুল ধবধবে সাদা। হাসিখুশি মানুষ। তিনি চোখ বন্ধ করে আমার সব কথা শুনলেন। কেউ চোখ বন্ধ করে কথা শুনলে আমার ভালাে লাগে না। মনে হয় কথা শুনছেন না। এর বেলা সেরকম মনে হল না। আমি যা বলার সব বালাম। তিনি চোখ মেলে হাসলেন। সান্তনা দেওয়ার হাসি। যে হাসি বলে দেয়-আপনার কিছুই হয় নি। কেন এমন করছেন? 

সাইকিয়াট্রিস্ট বললেন, ‘কফি খাবেন? আমি বললাম, না।’ খন—কফি খান। কফি খেতেখেতে আমরা কথা বলি। 

বেশ, কফি দিতে বলুন। 

কফি চলে এল। তিনি বললেন, আপনার ধারণা, আপনি আপনার ছেলের কান্না শুনতে পান? 

ধারণা না। আমি সত্যিসত্যি শুনতে পাই।’ 

‘আপনি কান্না শুনতে পান, তার মানে এই না যে, আপনার ছেলেরই কান্না। ছোট বাচ্চাদের কান্না একরকম। 

‘আমি আমার ছেলের কান্নাই শুনতে পাই। ‘আচ্ছা বেশ। সবসময় শুনতে পান, না মাঝেমাঝে পান? 

মাঝেমাঝে পাই। আগে থেকে কি বুঝতে পারেন যে এখন কান্না শুনবেন ? তার মানে কী? 

অনীশ-পর্ব-(৯)

গা শিরশির করে, কিংবা মাথা ধরে।যার পরপর কথা শোনা যায়। নাতেমন কিছু না। ‘আপনার মা মারা গিয়েছেনতীর কথা কি শুনতে পান? ‘না।’ 

ছােটবেলায় এমন হত? অর্থাৎ এরকম কান্ন বা শব্দ শুনতে পেতেন? 

‘না। 

আপনার সমস্যাটা তেমন জটিল নয়। আপনার ছেলের মৃত্যুজনিত আঘাতে এটা হয়েছে। আঘাত ছিল তীব্র। এতে মস্তিষ্কের ইইলিব্রিয়াম খানিকটা ব্যাহত হয়েছে। আপনার কোলে আরেকটা শিশু এলে সমস্যা কেটে যাবে। আপনার যা হয়েছে তা হল জীবনের দুঃখজনক স্মৃতি মনে অবদমিত অবস্থায় আছে। আপনি চলে গেছেন Anxiety state, সেখান থেকে নিউরাসথেলিয়া ..’ 

‘আপনার কথা কিছু বুঝতে পারছি না।’ 

‘বােঝার দরকার নেই। এমন কিছু করুন যেন নিজে ব্যস্ত থাকেন। ঘুমের অষুধ দিচ্ছিরাতে ঘুমুবার সময় খাবেন, যাতে ঘুমটা ভালাে হয়। যখন আবার কান্নার শব্দ শুনবেন তখন দৌড়ে কবরের কাছে যাবেন না, কারণ কান্নার শব্দ কবর থেকে আসছে 

শব্দ তৈরি হচ্ছে আপনার মস্তিষ্কে। আপনি নিজেকেই নিজে বােঝাবেন। মনেমনে বলবেন, সব কিছু না। এসব কিছু না। বাড়িটাও ছেড়ে দিন। ঐ বাড়ি ছেড়ে অনা কোথাও চলে যান। 

ডাক্তার সাহেবের ঘর থেকে বের হয়ে বেবিট্যাক্সি নিয়েছি, ঠিক তখন স্পষ্ট আবার কান্নার শব্দ শুনলাম। আমার বাচ্চাটিই যে কাঁদছে এতে কোনাে সন্দেহ নেই। আমি মনে-মনে বললাম, আমি কিছু শুনছি না। আমি কিছু শুনছি না। তাতে লাভ হল । সারা পথ আমি আমার বাচ্চার কান্না শুনতেশুনতে বাড়িতে এলাম।

অনীশ-পর্ব-(৯)

আমার স্বামী খুব ভালােভাবে পাশ করলেন। ইলেকট্রিক্যাল ইনজিনিয়ারিংএ প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান পেয়ে গেলেন। বিশ্ববিদ্যালয়েই তাঁর একটা চাকরি হল। আমরা আমাদের বাড়ি ছেড়ে কলাবাগানে দু’কামরার ছােট একটা ঘর ভাড়া নিলাম। আমি সংসারে মন দেওয়ার চেষ্টা করলাম। প্রচুর কাজ এবং প্রচুর অকাজ করি। রান্নাবান্না করি। সেলাইয়ের কাজ করি। আচার বানানাের চেষ্টা করি। যেঘর একবার মােছা হয়েছে সেই ঘর আবার ভেজা ন্যাড়ায় ভিজিয়ে দিই।

কাজের একটি মেয়ে ছিল, তাকেও ছাড়িয়ে দিলাম। কারণ একটাইআমি যাতে ব্যস্ত থাকতে পারি।  সারা দিন ব্যস্ততায় কাটে। রাতের বেলায়ও আমার স্বামী আমাকে অনেক রাত পর্যন্ত জাগিয়ে রাখেন। শারীরিক ভালবাসার উন্মাদনা এখন আমার নেই—তবু ভান করি যেন প্রবল আনন্দে সময় কাটছে। আসলে কাটে না। হঠাৎহঠাৎ আমি আমার বাচ্চার কান্না শুনতে পাই। আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় অবশ হয়ে আসে। 

 

Read more

অনীশ-পর্ব-(১০)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *