বৃহন্নলা-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ

বৃহন্নলা-পর্ব-৫

তখন মনে হল রাস্তায় একটা পাগলা কুকুবের হয়েছে, ভয়টা বােধহয় কুকুরের কারণেআমি একটা লাঠি হাতে নিলাম। 

শুক্লপক্ষের রাতফকফকা জ্যোৎস্না, তবু পরিষ্কার সবকিছু দেখা যাচ্ছে নাকারণ কুয়াশাকার্তিক মাসের শেষে এদিকে বেশ কুয়াশা হয়‘ 

নদীর কাছাকাছি আসতেই কুকুরটাকে দেখলামগাছের নিচে শুয়ে ছিলআমাকে দেখে উঠে দাঁড়াল এবং পিছনেপিছনে আসতে লাগলমাঝেমাঝে চাপা শব্দ করছেপাগলা কুকুর পিছনেপিছনে আসছে, আমি এগুচ্ছিব্যাপারটা খুব ভয়াবহযেকোনাে মুহুর্তে এই কুকুর ছুটে এসে কামড়ে ধরতে পারেআমি কুকুরটাকে তাড়াবার চেষ্টা করলামঢিল ছুঁড়লাম, লাঠি দিয়ে ভয় দেখালাম

কুকুর নড়ে না, দাঁড়িয়ে থাকেচাপা শব্দ করতে থাকেআমি হাঁটতে শুরু কললেই সেও হাঁটতে শুরু করে যাই হােক, আমি কোনােক্রমে নদীর পাড়ে এসে পৌছলামতখন আমার খানিকটা সাহস ফিরে এলকারণ, পাগলা কুকুর পানিতে নামে নাপানি দেখলেই এরা ছুটে পালায় অদ্ভুত কাণ্ড, কুকুর পানি দেখে ছুটে পালাল না! আমার পিছনেপিছনে পানিতে নেমে পড়লআমার বিস্ময়ের সীমা রইল নাআমি নদীর ওপারে উঠলামকুকুরটাও উঠলআর ঠিক তখন একটা ব্যাপার ঘটল। 

বৃহন্নলা-পর্ব-৫

সুধাকান্তবাবু থামলেন। 

আমি বিরক্ত গলায় বললাম, আপনি জটিল জায়গাগুলিতে দয়া করে থামবেন নাগল্পের মজা নষ্ট হয়ে যায়। 

সুধাকান্তবাবু বললেন, এটা কোনাে গল্প নাঘটনাটা কীভাবে বলব ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না বলে থেমেছি‘ 

আপনি মােটামুটিভাবে বলুন, আমি বুঝে নেব‘ 

কুকুরটা আমার খুব কাছাকাছি চলে এলপাগলা কুকুর আপনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন কিনা জানি নাভয়ংকর দৃশ্য ! সারাক্ষণ হাঁ করে থাকেমুখ দিয়ে লালা পড়ে, চোখের দৃষ্টিটাও অন্য রকমআমি ভয়ে কাঠ হয়ে গেছিছুটে পালাব বলে ঠিক করেছি, ঠিক তখন কুকুরটা কেন জানি ভয় পেয়ে গেল

অস্বাভাবিক ভয়একবার দিকে যাচ্ছে, একবার দিকে যাচ্ছেচাপা আওয়াজটা তার গলায় আর নেইসে ঘেউঘেউ করছেআমার কাছে মনে হল, সে কুকুরের ভাষায় আমাকে কী যেন বলার চেষ্টা করছেএরকম চলল মিনিট পাঁচেকতার পরই সে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লসাঁতরে ওপারে চলে গেলপুরােপুরি কিন্তু গেল না, পারে দাঁড়িয়ে রইল এবং ক্রমাগত ডাকতে লাগল। 

বৃহন্নলা-পর্ব-৫

আমি একটা সিগারেট ধরালামতখন আমি ধূমপান করতামমাস তিনেক হল ছেড়ে দিয়েছিযাই হােক, সিগারেট ধরাবার পর ভয়টা পুরােপুরি কেটে গেলহাত থেকে লাঠি ফেলে দিলামবাড়ির দিকে রওনা হব বলে ভাবছি, হঠাৎ মনে হল নদীর ধার ঘেঁষে বড়ােহওয়া ঘাসগুলাের মাঝখান থেকে কীএকটা যেন নড়ে উঠল। 

আপনি আবার ভয় পেলেন? না, ভয় পেলাম নাএকবার ভয় কেটে গেলে মানুষ চট করে আর ভয় পায় নাআমি এগিয়ে গেলাম। 

কুকুরটা তখনাে আছে? হ্যা, আছেতারপর বলুন। 

কাছাকাছি এগিয়ে গিয়ে দেখলাম একটা মেয়ের ডেডবডিএগারবার বছর বয়সপরনে ডােরাকাটা শাড়ি। 

বলেন কী আপনিযা দেখলাম তাই বলছিমেয়েটা যে মরে আছে তা বুঝলেন কী করে

যেকেউ বুঝবেমেয়েটা মরে শক্ত হয়ে আছেহাত মুঠিবদ্ধ করামুখের কষে রক্ত জমে আছে” 

কী সর্বনাশআমি দীর্ঘ সময় মেয়েটার সামনে দাঁড়িয়ে রইলামভয় পেলেন না

না, ভয় পেলাম নাআপনাকে তাে আগেই বলেছি, একবার ভয় পেলে মানুষ দ্বিতীয় বার চট করে ভয় পায় না‘ 

বৃহন্নলা-পর্ব-৫

তারপর কী হল বলুন। 

মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেলবাচ্চা একটা মেয়ে এইভাবে মরে পড়ে আছে, কেউ জানছে নাকীভাবে না জানি বেচারি মরলডেডবডি এখানে ফেলে রেখে যেতে ইচ্ছা করল নাফেলে রেখে গেলে শিয়ালকুকুরে ছিড়েখুঁড়ে খাবেআমার মনে হল এই মেয়েটাকে নিয়ে যাওয়া উচিত। 

আশ্চর্য তো!আশ্চর্যের কিছু নেইআমার অবস্থায় পড়লে আপনিও ঠিক তাই করতেননা, আমি তা করতাম নাচিৎকার করে লােক ডাকাডাকি করতামআশেপাশে কোনাে বাড়িঘর নেইকাকে আপনি ডাকতেন? তারপর কী হল বলুন। 

সুধাকান্তবাবু বললেন, আপনি আমাকে একটা সিগারেট দিনসিগারেট খেতে ইচ্ছা করছে‘ 

আমি সিগারেট দিলামবৃদ্ধ সিগারেট ধরিয়ে খকখক করে কাশতে লাগলেন

অমি বললাম, তারপর কী হল বলুনসুধাকান্তবাবু বললেন, ঘটনাটা এখানে শেষ করে দিলে কেমন হয়? আমার কেন জানি আর বলতে ইচ্ছা করছে না‘ 

ইচ্ছে না করলেও বলুনএখানে গল্প শেষ করার প্রশ্নই ওঠে নাএটা গল্প না। 

গল্প না যে তা বুঝতে পারছিতারপর বলুন আপনি কী করলেনমেয়েটাকে তুললেন

হা তুললামকেন তুললাম সেটাও আপনাকে বলিএকটা অপরিচিত মেয়ের শবদেহ কেউ চট করে কোলে তুলে নিতে পারে নাআমি এই কাজটা করলাম, কারণ এই বালিকার মুখ দেখতে অবিকল  

সুধাকান্তবাবু থেমে গেলেনআমি বললাম, মেয়েটি দেখতে মেয়েটির মতাে, যার সঙ্গে আপনার বিয়েকথা হয়েছিলআরতি

আরতিআপনার স্মৃতিশক্তি তাে খুব ভালাে! আপনি আপনার গল্পটা বলে শেষ করুন। 

বৃহন্নলা-পর্ব-৫

মেয়েটি দেখতে অবিকল আরতির মতােআমি মাটি থেকে তাকে তুললামমরা মানুষের শরীর ভারি হয়ে যায়, লােকে বলেআমি দেখলাম মেয়েটার শরীর খুব হালকাএকটা কথা বলতে ভুলে গেছি, মেয়েটাকে তােলার সঙ্গেসঙ্গে কুকুরটা চিৎকার বন্ধ করে দিলআমার কাছে মনে হল চারদিক হঠাৎ যেন অস্বাভাবিক নীরব হয়ে গেছেআমি মেয়েটাকে নিয়ে রওনা করলাম। 

আপনার ভয় করল না

না, ভয় করে নিমেয়েটার জন্যে মমতা লাগছিলআমার চোখে প্রায় পানি এসে গিয়েছিলকারনাকার মেয়ে, কোথায় এসে মরে পড়ে আছেবাড়িতে এসে পৌছলাম

 

Read more

বৃহন্নলা-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *