মনে হচ্ছে নিশুতি রাত। আমি কোলে করে একটা মৃতা বালিকা নিয়ে এসেছি, অথচ আমার মােটও ভয় করছে না। আমি মেয়েটিকে ঘাড়ের উপর শুইয়ে রেখেই তালা খুলে ঘরে ঢুকলাম। তখন কেন জানি বুকটা কেঁপে উঠল। হাত–পা ঠাণ্ডা
হয়ে এল। আমি ভাবলাম ঘর অন্ধকার বলেই এ–রকম হচ্ছে, আলাে জ্বাললেই ভয় কেটে যাবে। মেয়েটাকে আমি বিছানায় শুইয়ে দিলাম।
‘খাটের নিচে হারিকেন থাকে। আমি হারিকেন বের করলাম। ভয়টা কেন জানি ক্রমেই বাড়তে লাগল। মনে হল ঘরের বাইরে অনেকেই দাঁড়িয়ে আছে। অবাক হয়ে আমার কাণ্ডকারখানা দেখছে। যেন আমার সমস্ত আত্মীয়স্বজনরা চলে এসেছে। আমার বাবা, আমার ঠাকুরদা, আমার ছােটপিসিকেউ বাদ নেই। ওরা যে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছে, তাও আমি শুনতে পাচ্ছি। ‘হারিকেন জ্বালাতে অনেক সময় লাগল। হাত কেঁপে যায়।
বৃহন্নলা-পর্ব-(৬)
দেশলাইয়ের কাঠি নিভে যায়, সলতায় আগুন ধরতে চায় না। টপটপ করে আমার গা দিয়ে ঘাম ঝরছে। শেষ পর্যন্ত হারিকেন জ্বলল। আমার নিঃশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এল। আমি খাটের দিকে তাকালাম—এটা আমি কী দেখছি! এটা কি সম্ভব? এ–সব কী? আমি দেখলাম, মেয়েটা খাটের উপর বসে আছে। বড়–বড় চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমার পায়ের নিচের মাটি কেপে উঠল। মনে হল মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছি।
‘স্পষ্ট শুনলাম উঠোন থেকে ভয়ার্ত গলায় আমার বাবা ডাকছেন, ও সুধাকান্ত, ও সুধাকান্ত, তুই বেরিয়ে আয়। ও সুধাকান্ত, তুই বেরিয়ে আয়। ও বাপধন, বেরিয়ে আয়।
‘আমি বেরিয়ে আসতে চাইলাম, পারলাম না। পা যেন মাটির সঙ্গে গেঁথে গেছে। সমস্ত শরীর পাথর হয়ে গেছে। আমি মেয়েটির উপর থেকে চোখ সরিয়ে নিতে পারলাম না। মেয়েটি একটু যেন নড়ে উঠল। কিশােরীদের মতাে নরম ও কোমল গলায় একটু টেনে–টেনে বলল, তুমি একা–একা থাক। বড়াে মায়া লাগে গাে! কত বার ভাবি তােমারে দেখতে আসব। তুমি কি আমারে চিনতে পারছ? আমি আরতি গাে, আরতি। তুমি কি আমারে চিনছু?’
বৃহন্নলা-পর্ব-(৬)
‘আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো বললাম, “হ্যা।
“তােমার জন্যে বড় মায়া লাগে গাে, বড় মায়া লাগে। একা–একা তুমি থাক। বড় মায়া লাগে। আমি কত ভাবি তােমার কথা। তুমি ভাব না?”
‘আমি যন্ত্রের মতাে বললাম, ভাবি”।
‘আমার মনে হল বাড়ির উঠোনে আমার সমস্ত মৃত আত্মীয়স্বজন ভিড় করেছে। আট বছর বয়সে আমার একটা বােন পানিতে পড়ে মারা গিয়েছিল। সেও ব্যাকুল হয়ে ডাকছে—ও দাদা, তুই বেরিয়ে আয় দাদা। আমার ঠাকুরমার ভাঙা–ভাঙা গলাও শুনলাম—ও সুধাকান্ত, সুধাকান্ত। খাটের উপর বসে–থাকা মেয়েটা বলল, “তুমি ওদের কথা শুনতেছ কেন গাে? এত দিন পরে তােমার কাছে আসলাম। আমার মনটা তােমার জন্যে কান্দে। ওগাে, তুমি আমার কথা ভাৰ না? ঠিক করে বল—ভাব না?
বৃহন্নলা-পর্ব-(৬)
ভাবি। “আমার গায়ে হাত দিয়ে বল, ভাবি। ওগাে আমার গায়ে হাত দিয়ে বল।”
‘আমি একটা ঘােরের মধ্যে আছি। সবটাই মনে হচ্ছে স্বপ্ন। স্বপ্নে সবই সম্ভব। আমি মেয়েটির গা স্পর্শ করবার জন্যে এগুলাম, তখনি আমার মৃ মা উঠোন থেকে চোঁচালেন—খবরদার সুধাকান্ত, খবরদার!
‘আমার ঘাের কেটে গেল। এ আমি কী করছি? এ আমি কী করছি? আমি হাতে ধরে রাখা হারিকেন ছুঁড়ে ফেলে ছুটে ঘর থেকে বেরুতে গেলাম। খাটের উপর বসে থাকা মেয়েটি পিছন থেকে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমার ডান পায়ের গােড়ালি কামড়ে ধরল। ভয়াবহ কামড়। মনে হল পায়ের হাড়ে সে দাঁত ফুটিয়ে দিয়েছে।”
‘সে হাত দিয়ে আমাকে ধরল না। কামড়ে ধরে রাখল। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করলাম বেরিয়ে যেতে। কিছুতেই পারলাম না। এতটুকু একটা মেয়ে—কী প্রচণ্ড তার শক্তি! আমি প্রাণপণে চেচালাম—কে কোথায় আছ, বাঁচাও। আমাকে বাচাও। আমাকে বাঁচাও। তখন একটা ব্যাপার ঘটল। মনে হল কালাে একটা কী–যেন উঠোন থেকে ঘরের ভিতর ঝাপিয়ে পড়ল। ঝাপিয়ে পড়ল মেয়েটির উপর। চাপা গর্জন শােনা যেতে লাগল। মেয়েটি আমাকে ছেড়ে দিল।
বৃহন্নলা-পর্ব-(৬)
আমি পা টানতে–টানতে উঠোনে চলে এলাম!
‘উঠোনে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারলাম ভিতরে ধস্তাধস্তি হচ্ছে। ধস্তাধস্তি হচ্ছে ঐ পাগলা কুকুর এবং মেয়েটার মধ্যে।
মেয়েটা তীব্র গলায় বলছে—ছাড়, আমাকে
‘কুকুরটা ক্রুদ্ধ গর্জন করছে। সেই গর্জন ঠিক কুকুরের গর্জনও নয়। অদেখা ভুবনের কোনাে পশুর গর্জন। সেই গর্জন ছাপিয়েও মেয়েটির গলার স্বর শােনা যাচ্ছে—আমারে খাইয়া ফেলতাছে। ওগাে তুমি কই? আমারে খাইয়া ফেলতাছে।‘
সুধাকান্তবাবু থামলেন। আমি বললাম, তারপর? তিনি জবাব দিলেন না। আমি আবার বললাম, তারপর কী হল সুধাকান্তবাবু?
তিনি আমার দিকে তাকালেন। যেন আমার প্রশ্নই বুঝতে পারছেন না। আমি দেখলাম তিনি থরথর করে কাঁপছেন। আমি বললাম, ‘কী হল সুধাকান্তবাবু?
তিনি কাঁপা গলায় বললেন, ‘ভয় লাগছে। দেয়াশলাইটা একটু জ্বালান তাে! | আমি দেয়াশলাই জ্বাললাম। সুধাকান্তবাবু তাঁর পা বের করে বললেন, ‘দেখুন, কামড়ের দাগ দেখুন।
আমি গভীর ক্ষতচিহ্রে দিকে তাকিয়ে রইলাম। সূধাকান্তবাবু বললেন, ‘ও এখনাে আসে। বাড়ির পিছনে থপথপ করে হাঁটে। নিঃশ্বাস ফেলে। জানালার পাট হঠাৎ করে বন্ধ করে দিয়ে ভয় দেখায়। হাসে। নাকী সুরে কাঁদে। একেক দিন খুব বিরক্ত করে। তখন ঐ কুকুরটাও আসে। হুটোপুটি শুরু হয়ে যায়। সাধারণত কৃষ্ণপক্ষের রাতেই বেশি হয়।
বৃহন্নলা-পর্ব-(৬)
আমি বললাম এটা কি কৃষ্ণপক্ষ? সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘না। চাঁদ দেখতে পাচ্ছেন না?‘
আমি বললাম, আপনি তাে ভাই ভয়াবহ গল্প শােনালেন। আমি তাে এখন রাতে ঘুমুতে পারব না।‘
ঘুমানর দরকার নেই। কিছুক্ষণের মধ্যে সূর্য উঠবে। চাঁদ ডুবে গেছে দেখছেন আমি ঘড়ি দেখলাম। চারটা বাজতে কুড়ি মিনিট। সত্যি–সত্যি রাত শেষ হয়ে
সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘চা খাওয়া যাক, কি বলেন? ‘হ্যা, খাওয়া যাক।
তিনি চুলা ধরিয়ে কেটলি বসিয়ে দিয়ে নিচু গলায় বললেন, বড়াে বিরক্ত করে। মাঝে–মাঝে টিল মারে টিনের চালে, থুথু করে থুথু ফেলে। ভয় করে। রাতবিরাতে বাথরুমে যেতে হলে হাতে জ্বলন্ত আগুন নিয়ে যেতে হয়। গলায় এই দেখুন একটা অষ্টধাতুর কবচ। কোমরে সবসময় একটা লােহার চাবি বাঁধা, তবু ভয় কাটে না।
বৃহন্নলা-পর্ব-(৬)
বাড়ি ছেড়ে চলে যান না কেন? ‘কোথায় যাব বলেন? পূর্বপুরুষের ভিটে। ‘কাউকে সঙ্গে এনে রাখেন না কেন? ‘কেউ থাকতে চায় না রে ভাই, কেউ থাকতে চায় না।‘
সুধাকান্তবাবু চায়ের কাপ হাতে তুলে দিলেন। চুমুক দিতে যাব, তখনি বাড়ির একটা কপাট শব্দ করে নড়ে উঠল। আমি চমকে উঠলাম। হাওয়ার কোনাে বংশও নেই কপাটে শব্দ হয় কেন? আমি সুধাকান্তবাবুর দিকে তাকালাম। তিনি সহজ গলায় বললেন,‘ভয়ের কিছু নেই—চা খান। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভাের হবে।‘
বাড়ির পিছনের বনে খচমচ শব্দ হচ্ছে। আসলে আমি অস্থির বােধ করছি। এই অবস্থা হবে জানলে কে আসত এই লােকের কাছে! আমার ইচ্ছে করছে ছুটে পালিয়ে যাই। সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘ভয় পাবেন না।‘