বৃহন্নলা-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

বৃহন্নলা-পর্ব-৫

মনে হচ্ছে নিশুতি রাতআমি কোলে করে একটা মৃতা বালিকা নিয়ে এসেছি, অথচ আমার মােটও ভয় করছে নাআমি মেয়েটিকে ঘাড়ের উপর শুইয়ে রেখেই তালা খুলে ঘরে ঢুকলামতখন কেন জানি বুকটা কেঁপে উঠলহাতপা ঠাণ্ডা 

হয়ে এলআমি ভাবলাম ঘর অন্ধকার বলেই রকম হচ্ছে, আলাে জ্বাললেই ভয় কেটে যাবেমেয়েটাকে আমি বিছানায় শুইয়ে দিলাম

খাটের নিচে হারিকেন থাকেআমি হারিকেন বের করলামভয়টা কেন জানি ক্রমেই বাড়তে লাগলমনে হল ঘরের বাইরে অনেকেই দাঁড়িয়ে আছেঅবাক হয়ে আমার কাণ্ডকারখানা দেখছেযেন আমার সমস্ত আত্মীয়স্বজনরা চলে এসেছেআমার বাবা, আমার ঠাকুরদা, আমার ছােটপিসিকেউ বাদ নেইওরা যে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছে, তাও আমি শুনতে পাচ্ছিহারিকেন জ্বালাতে অনেক সময় লাগলহাত কেঁপে যায়

বৃহন্নলা-পর্ব-(৬)

দেশলাইয়ের কাঠি নিভে যায়, সলতায় আগুন ধরতে চায় নাটপটপ করে আমার গা দিয়ে ঘাম ঝরছেশেষ পর্যন্ত হারিকেন জ্বললআমার নিঃশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এলআমি খাটের দিকে তাকালামএটা আমি কী দেখছি! এটা কি সম্ভব? সব কী? আমি দেখলাম, মেয়েটা খাটের উপর বসে আছেবড়বড় চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকেআমার পায়ের নিচের মাটি কেপে উঠলমনে হল মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছি 

স্পষ্ট শুনলাম উঠোন থেকে ভয়ার্ত গলায় আমার বাবা ডাকছেন, সুধাকান্ত, সুধাকান্ত, তুই বেরিয়ে আয়সুধাকান্ত, তুই বেরিয়ে আয়বাপধন, বেরিয়ে আয়

আমি বেরিয়ে আসতে চাইলাম, পারলাম নাপা যেন মাটির সঙ্গে গেঁথে গেছেসমস্ত শরীর পাথর হয়ে গেছেআমি মেয়েটির উপর থেকে চোখ সরিয়ে নিতে পারলাম নামেয়েটি একটু যেন নড়ে উঠলকিশােরীদের মতাে নরম কোমল গলায় একটু টেনেটেনে বলল, তুমি একাএকা থাকবড়াে মায়া লাগে গাে! কত বার ভাবি তােমারে দেখতে আসবতুমি কি আমারে চিনতে পারছ? আমি আরতি গাে, আরতিতুমি কি আমারে চিনছু?

বৃহন্নলা-পর্ব-(৬)

আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো বললাম, হ্যা

তােমার জন্যে বড় মায়া লাগে গাে, বড় মায়া লাগেএকাএকা তুমি থাকবড় মায়া লাগেআমি কত ভাবি তােমার কথাতুমি ভাব না? 

আমি যন্ত্রের মতাে বললাম, ভাবি

আমার মনে হল বাড়ির উঠোনে আমার সমস্ত মৃত আত্মীয়স্বজন ভিড় করেছেআট বছর বয়সে আমার একটা বােন পানিতে পড়ে মারা গিয়েছিলসেও ব্যাকুল হয়ে ডাকছেদাদা, তুই বেরিয়ে আয় দাদাআমার ঠাকুরমার ভাঙাভাঙা গলাও শুনলামসুধাকান্ত, সুধাকান্তখাটের উপর বসেথাকা মেয়েটা বলল, তুমি ওদের কথা শুনতেছ কেন গাে? এত দিন পরে তােমার কাছে আসলামআমার মনটা তােমার জন্যে কান্দেওগাে, তুমি আমার কথা ভাৰ না? ঠিক করে বলভাব না?  

বৃহন্নলা-পর্ব-(৬)

ভাবি আমার গায়ে হাত দিয়ে বল, ভাবিওগাে আমার গায়ে হাত দিয়ে বল” 

আমি একটা ঘােরের মধ্যে আছিসবটাই মনে হচ্ছে স্বপ্নস্বপ্নে সবই সম্ভবআমি মেয়েটির গা স্পর্শ করবার জন্যে এগুলাম, তখনি আমার মৃ মা উঠোন থেকে চোঁচালেনখবরদার সুধাকান্ত, খবরদার

আমার ঘাের কেটে গেলআমি কী করছি? আমি কী করছি? আমি হাতে ধরে রাখা হারিকেন ছুঁড়ে ফেলে ছুটে ঘর থেকে বেরুতে গেলামখাটের উপর বসে থাকা মেয়েটি পিছন থেকে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লআমার ডান পায়ের গােড়ালি কামড়ে ধরলভয়াবহ কামড়মনে হল পায়ের হাড়ে সে দাঁত ফুটিয়ে দিয়েছে” 

সে হাত দিয়ে আমাকে ধরল নাকামড়ে ধরে রাখলআমি প্রাণপণ চেষ্টা করলাম বেরিয়ে যেতেকিছুতেই পারলাম নাএতটুকু একটা মেয়েকী প্রচণ্ড তার শক্তি! আমি প্রাণপণে চেচালামকে কোথায় আছ, বাঁচাওআমাকে বাচাওআমাকে বাঁচাওতখন একটা ব্যাপার ঘটলমনে হল কালাে একটা কীযেন উঠোন থেকে ঘরের ভিতর ঝাপিয়ে পড়লঝাপিয়ে পড়ল মেয়েটির উপরচাপা গর্জন শােনা যেতে লাগলমেয়েটি আমাকে ছেড়ে দিল

বৃহন্নলা-পর্ব-(৬)

আমি পা টানতেটানতে উঠোনে চলে এলাম!

উঠোনে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারলাম ভিতরে ধস্তাধস্তি হচ্ছেধস্তাধস্তি হচ্ছে পাগলা কুকুর এবং মেয়েটার মধ্যে

মেয়েটা তীব্র গলায় বলছেছাড়, আমাকে 

কুকুরটা ক্রুদ্ধ গর্জন করছেসেই গর্জন ঠিক কুকুরের গর্জনও নয়অদেখা ভুবনের কোনাে পশুর গর্জনসেই গর্জন ছাপিয়েও মেয়েটির গলার স্বর শােনা যাচ্ছেআমারে খাইয়া ফেলতাছেওগাে তুমি কই? আমারে খাইয়া ফেলতাছে‘ 

সুধাকান্তবাবু থামলেনআমি বললাম, তারপর? তিনি জবাব দিলেন নাআমি আবার বললাম, তারপর কী হল সুধাকান্তবাবু

তিনি আমার দিকে তাকালেনযেন আমার প্রশ্নই বুঝতে পারছেন নাআমি দেখলাম তিনি থরথর করে কাঁপছেনআমি বললাম, কী হল সুধাকান্তবাবু

তিনি কাঁপা গলায় বললেন, ভয় লাগছেদেয়াশলাইটা একটু জ্বালান তাে! | আমি দেয়াশলাই জ্বাললামসুধাকান্তবাবু তাঁর পা বের করে বললেন, দেখুন, কামড়ের দাগ দেখুন

আমি গভীর ক্ষতচিহ্রে দিকে তাকিয়ে রইলামসূধাকান্তবাবু বললেন, এখনাে আসেবাড়ির পিছনে থপথপ করে হাঁটেনিঃশ্বাস ফেলেজানালার পাট হঠাৎ করে বন্ধ করে দিয়ে ভয় দেখায়হাসেনাকী সুরে কাঁদেএকেক দিন খুব বিরক্ত করেতখন কুকুরটাও আসেহুটোপুটি শুরু হয়ে যায়সাধারণত কৃষ্ণপক্ষের রাতেই বেশি হয়। 

বৃহন্নলা-পর্ব-(৬)

আমি বললাম এটা কি কৃষ্ণপক্ষ? সুধাকান্তবাবু বললেন, নাচাঁদ দেখতে পাচ্ছেন না?‘ 

আমি বললাম, আপনি তাে ভাই ভয়াবহ গল্প শােনালেনআমি তাে এখন রাতে ঘুমুতে পারব না‘ 

ঘুমানর দরকার নেইকিছুক্ষণের মধ্যে সূর্য উঠবে। চাঁদ ডুবে গেছে দেখছেন  আমি ঘড়ি দেখলামচারটা বাজতে কুড়ি মিনিটসত্যিসত্যি রাত শেষ হয়ে  

সুধাকান্তবাবু বললেন, চা খাওয়া যাক, কি বলেন? হ্যা, খাওয়া যাক। 

তিনি চুলা ধরিয়ে কেটলি বসিয়ে দিয়ে নিচু গলায় বললেন, বড়াে বিরক্ত করেমাঝেমাঝে টিল মারে টিনের চালে, থুথু করে থুথু ফেলেভয় করেরাতবিরাতে বাথরুমে যেতে হলে হাতে জ্বলন্ত আগুন নিয়ে যেতে হয়গলায় এই দেখুন একটা অষ্টধাতুর কবচকোমরে সবসময় একটা লােহার চাবি বাঁধা, তবু ভয় কাটে না। 

বৃহন্নলা-পর্ব-(৬)

বাড়ি ছেড়ে চলে যান না কেন? কোথায় যাব বলেন? পূর্বপুরুষের ভিটেকাউকে সঙ্গে এনে রাখেন না কেন? কেউ থাকতে চায় না রে ভাই, কেউ থাকতে চায় না‘ 

সুধাকান্তবাবু চায়ের কাপ হাতে তুলে দিলেনচুমুদিতে যাব, তখনি বাড়ির একটা কপাট শব্দ করে নড়ে উঠলআমি চমকে উঠলামহাওয়ার কোনাে বংশও নেই কপাটে শব্দ হয় কেন?  আমি সুধাকান্তবাবুর দিকে তাকালামতিনি সহজ গলায় বললেন,ভয়ের কিছু নেইচা খানকিছুক্ষণের মধ্যেই ভাের হবে‘ 

বাড়ির পিছনের বনে খচমচ শব্দ হচ্ছেআসলে আমি অস্থির বােধ করছিএই অবস্থা হবে জানলে কে আসত এই লােকের কাছে! আমার ইচ্ছে করছে ছুটে পালিয়ে যাইসুধাকান্তবাবু বললেন, ভয় পাবেন না‘ 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *