বাবর খবর পেয়েছেন, তার পুত্র বাগানের ভেতরে একটা দোতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থাকেন । একটা জানালার সামনে তাঁকে ঘন্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে দেখা যায় । প্রচুর পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে ছবি আঁকেন । ছবি আঁকায় একজন হাবশি (খোজা ) চিত্রকর তাঁকে সাহায্য করে ।
চার মাস পার হয়ে গেল । এই চার মাসে সম্রাট বাবর পুত্রকে দু’বার আসতে বললেন । হুমায়ূন মীর্জা বেয়াদবির চূড়ান্ত করলেন, চিঠির জবাব দিলেন না ।
বাবর সিংহাসনে । দিনের প্রথমার্ধের রাজকার্য শুরু হয়েছে, এই সময় খবর এল পুত্র হুমায়ূন এসেছেন । সম্রাট বললেন, তাকে এক্ষনি এই মুহূর্তে রাজসভায় উপস্থিত হতে বলো ।
*মোঘল চিত্রকলার শুরু হুমায়ূনকে দিয়ে ।
দূত ভীত গলায় বলল, হুমায়ূন মীর্জার পক্ষে সম্ভব না । তিনি অপারগ ।
কেন ?
তিনি অচেতন অবস্থায় আছেন । তাঁর জীবনসংশয় ।
সম্রাট বাবর রাজসভা ভেঙে দিয়ে ছুটে গেলেন পুত্রকে দেখতে ।
কোথায় হুমায়ূন মীর্জা ? দেখে মনে হচ্ছে একজস মৃত মানুষ পড়ে আছে ।
হুমায়ূন মীর্জার ব্যক্তিগত চিকিৎসক বললেন, উনি চিকিৎসার অতীত । শুধুমাত্র আল্লাহপাক তাঁর গোপন ভাণ্ডার থেকে যদি কিছু দেন তবেই হুমায়ূন মীর্জার জীবনরক্ষা হবে ।
বাদশাহ নামদার পর্ব –৪
দিল্লীর চিকিৎসকদের সভা বসল । তাঁরাও বললেন, সম্রাটপুত্র আমাদের চিকিৎসার অতীত । তাঁর জন্যে আল্লাহপাকের কাছে আমরা প্রার্থনা করতে পারি, এর বেশি কিছু করতে পারি না ।
সুফি সাধক মীর আবুল কাশিম তখন সম্রাটকে বললেন, পুত্রের প্রাণের বিনিময়ে আপনি যদি আপনার অতি প্রিয় কিছু দান করেন তাহলে হয়তো-বা শাহজাদার জীবন রক্ষা হতে পারে ।
বাবর বললেন, আমার কাছে নিজের প্রাণের চেয়ে আর কিছুই নেই । আমি শাহজাদার জন্যে আমার প্রাণ দিতে প্রস্তুত ।
হতভম্ব মীর আবুল কাশিম বললেন, সম্রাট আপনি এটা কী বললেন ? এই কাজ আপনি করতে পারেন না । আপনি বরং কোহিনূর হীরা দান করে দিন ।
বাবর বললেন, আমার পুত্রের জীবনের দাম কি সামান্য একখণ্ড হীরা ?
অচেতন হুমায়ূন মীর্জা বিছানায় শুয়ে আছেন । ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ । ঘরের ভেতরে তিনটা প্রদীপ জ্বলছে । সম্রাট বাবর ছাড়া শাহজাদার সঙ্গে আর কেউ নাই । বাবর পুত্রের মাথার পাশ থেকে ঘুরতে শুরু করলেন । তিনি মনে মনে বলছেন, পুত্রের ব্যাধি আমি আমার শরীরে ধারণ করলাম । পরম করুণাময়, তুমি আমার পুত্রকে সুস্থ করে দাও । সম্রাট তিনবার চক্কর দেওয়ার পর পর অচেতন হুমায়ূন চোখে মেলে বললেন, বাবা । আপনি এখানে কী করছেন ?
পুত্রকে কালান্তক ব্যাধি শরীরে ধারণ করে পঞ্চাশ বছর বয়সে সম্রাটের মৃত্যু হয় । ৬ জমাদিয়াল আউয়াল ৯৩৭ হিজরি, ইংরেজি ২৬ ডিসেম্বর, ১৫৩০ । তার তিন দিন পর হুমায়ূন মীর্জা সিংহাসনে বসেন ।
সম্রাট হুমায়ূনের বাম হাতে একটি অদ্ভুত সুন্দর হালকা নীল রঙের বৈদুর্যমণি (Lapis Lazuli)। ডান হাতে একটি চিঠি । চিঠি পাঠিয়েছেন রাজস্থান থেকে রাজপুত্র রানী কর্ণাবতী । চিঠির সঙ্গে কয়েকগাছি হলুদ সুতা ।
বাদশাহ নামদার পর্ব –৪
সম্রাট চিঠি পড়ছেন না । চিঠি এবং বৈদুর্যমণি এক হাত থেকে আরেক হাতে চালাচালি করছেন । যখন চিঠি ডান হাতে তখন বৈদুর্যমণি বাম হাতে । দৃর্শটি সম্রাটের দুই ভগ্নি গুলবদন এবং গুলচেহরা চিকের আড়াল থেকে দেখে মজা পাচ্ছে । দরবার চলাকালে এই দুই বোন চিকের আড়াল থেকে দরবারের কাজকর্ম দেখে । সম্রাটের অন্তঃপুরের আত্মীয়স্বজনদের রাজদরবার দেখার জন্যেই চিকের ব্যবস্থা । যারা দেখবে তারা দরবারের লোকজনের কাছে অদৃশ্য ।
প্রধান উজির বললেন, সম্রাট কি কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত ?
সম্রাট হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ালেন ।
চিন্তার বিষয় কি জানতে পারি ?
হ্যাঁ পারেন । জাদুবিদ্যার বইটি এখনো জোগাড় করা গেল না । এই নিয়ে আমি চিন্তিত ।
সম্রাট হিন্দুস্থানের জাদুবিদ্যা নামের একটি বইয়ের সন্ধান পেয়েছেন । বইটি আছে তাঁর ছোটভাই কামরান মীর্জার কাছে । সে সংগ্রহ করেছে কান্দাহারের এক দুর্গ থেকে ।
সম্রাট হুমায়ূনের এই বইটি পড়ার খুব ইচ্ছা । বইটি নাকি লেখা হয়েছে প্যাঁচার রক্ত দিয়ে । দিনের বেলা বইয়ের লেখা অস্পষ্ট থাকে, রাতে স্পষ্ট হয় । সম্রাট তাঁর ভাইয়ের কাছে বইটি চেয়ে পত্র দিয়েছেন । কামরান মীর্জা পত্রের জবাব দেননি ।
উজির বললেন, রানী কর্ণাবতীর পত্রটি কি আপনি পড়বেন ?
গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে ।
সম্রাট চিঠি পড়তে শুরু করলেন-
আমি আপনাকে ‘ভাই’ ডাকলাম । আমাদের নিয়ম অনুযায়ী ভাইকে রাখি পাঠালাম । আমি মহাবিপদে পড়েছি । গুজরাটের বাহাদুর শাহ আমার দুর্গ অবরোধ করেছেন । দুর্গ রক্ষার প্রয়োজনীয় শক্তি আমার নেই । দুর্গে এক হাজার রাজপুত্র রমণী এবং তিন হাজার শিশু আছে । বাহাদুর শাহ দুর্গে প্রবেশ করলে আমাদের মৃত্যুবরণ করা ছাড়া উপায় নেই ।
এখন বোন ভাইকে ডাকছে একটি বৈদুর্যমণি পাঠিয়েছে । কারণ বোন শুনেছে তার ভাই ছবি আঁকেন । বৈদুর্যমণি চূর্ণ করে যে নীল রঙ হবে তার দ্যুতি অসাধারণ । বোন কর্ণাবতী আশা করছে তার ভাই এই রঙ ব্যবহার করে একটা ছবি আঁকবে ।
ইতি
রানী কর্ণাবতী
বাদশাহ নামদার পর্ব –৪
সম্রাট চিঠির তাঁর প্রধান উজিরের দিকে বাড়িয়ে দিলেন । প্রধান উজির চিঠি পড়ে বললেন, রত্ন পাঠিয়ে দিন রাজকোষে । চিঠির জবাব দেওয়ার প্রয়োজন নেই ।
ভাই বোনের চিঠির জবাব দেবে না ।
রানী কর্ণাবতী বিপদের বোন । বিপদে পড়েছেন বলেই ভাই পাতিয়েছেন । বিপদে না থাকলে এবং তাঁর শক্তি প্রবল থাকলে তিনি মোঘল সাম্রা্জ্য আক্রমণ করতেও পিছপা হতেন না । তা ছাড়া আপনি নিজেও এখন মহাবিপদে আছেন ।
কী রকম?
আপনার ভাই কামরান মীর্জা শক্তি সঞ্চয় করছেন । তিনি পাঞ্জাব দখল করেছেন । তিনি যে-কোনো সময় আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করবেন । একই কথা আপনার আরেক ভাই হিন্দাল মীর্জা সম্পর্কেও সত্যি । এদের চেয়ে ও অনেক বড় সমস্যা তৈরি করতে যাচ্ছে পাঠান শের খাঁ । সে বাংলা জয় করেছে । আগ্রার দিকে তার যাত্রা শুধু সময়ের ব্যাপার ।
হুমায়ূন ছোট্র নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত হতে বলুন । আমি স্বয়ং চিতোরের দিকে রওনা হচ্ছি ।
এই সিদ্ধান্ত সমরবিশারদদের সঙ্গে আলোচনার পর নিন ।
সমরবিশারদরা আপনার মতোই কথা বলবে । কিন্তু আমি আমার বিপদগ্রস্ত বোনের পাশে দাঁড়াতে চাই ।
শাহানশাহ্, রাজনীতিতে আবেগের স্থান নেই ।
হুমায়ূন বললেন, আমার রাজনীতিতে আছে । একজনের চরম বিপদে আমি তার পাশে যখন দাঁড়াব, তখন দেখা যাবে আমার চরম বিপদেও কেউ একজন আমার পাশে এসে দাঁড়াবে ।
বাদশাহ নামদার পর্ব –৪
# হুমায়ূনের কথা সত্যি হয়েছিল । রাজ্যহারা পথের ফকির হুমায়ূনকে সাহায্য করেছিলেন পারস্য সম্রাট । সেখানেও একটি চিঠির ভূমিকা ছিল ।
প্রধান উজির বিরক্তি চাপার চেষ্টা করছেন । পারছেন না । সম্রাটের কোনো কর্মকাণ্ডই সম্রাটসুলভ না । তিনি বাস করেন সম্পূর্ণ নিজের জগতে । সেই জগৎ নিয়ন্ত্রণ করে সুরা, আফিম এবং কবিতা । তুরস্ক থেকে এক কবি এসেছে, রাজসভায় তাঁকে উচ্চস্থানে দেওয়া হয়েছে । কবির নাম দিদির আলী ।
সম্রাট গ্রহ-নক্ষত্র বিচার করাকে এখন রাজকার্যের অংশ ভাবছেন । সারাক্ষণ শুভ-সময় অশুভ-সময় নির্ণয় করে চলেছেন । তিনি পোশাকও পরছেন গ্রহ-নক্ষত্র বিবেচনা করে । রবিবারে পরছেন হলুদ পোশাক । সেদিন তিনি রাজ্য পরিচালনা-বিষয়ক সভা করেন ।
সোমবার পরেন সবুজ পোশাক । ঐদিন তিনি আনন্দে থাকেন । রাজসভায় গীত-বাদ্য হয় ।
মঙ্গলবারে লাল, মঙ্গলগ্রহের লাল রঙের পোশাক পরেন । সেদিন যুদ্ধবিগ্রহ নিয়ে আলোচনা করেন । তাঁর মেজাজ থাকে উগ্র । সামান্য অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেন ।
আজ মঙ্গলবার । সম্রাট লাল পোশাক পরেছেন । যুদ্ধযাত্রা ঘোষণা দেওয়ার এইটিই কি কারণ ?
প্রধান উজির আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, সম্রাট তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, তীর ধনুক নিয়ে আসুন । একটি তীরের আগায় বাহদুর শাহর নাম লেখা থাকবে । আরেকটির আগায় আমার নাম । আমি নিজে তীর ছুঁড়ে দেখব কোনটি আগে যায় । যার তীর আগে যাবে, সে-ই যুদ্ধে জিতবে । সম্রাট তীর অনেক আগে গেল ।
পরদিন (বুধবার) ফজরের নামাজের পর হুমায়ূন চিতোরের দিকে সসৈন্যে রওনা হলেন । দুপুরে এক হ্রদের পাড়ে সৈন্যরা দ্বিপ্রহরের খাবারের জন্যে থামল ।
