দেয়াল পত্রিকার নাম হবে ‘সুনীল সাগর’। আমি সেই নাম পাল্টে নাম দিলাম ‘সুনিলিত সাগরিত’। সম্পূর্ণ অর্থহীন নাম। আমি প্রধান সম্পাদক। জাফর ইকবাল, আহসান হাবীব ছিল পত্রিকার অঙ্গসজ্জার দায়িত্বে। পনেরো দিন পর পর ঢাউস এক কাগজে সবার লেখা ছাপা হতো। কেউ বাদ যেত না। সুনিলিত সাগরিত পত্রিকাটি আমাদের পারিবারিক ধারাবাহিক ইতিহাস। আমার নিজের লেখালেখির ইতিহাস। আমার দুই ভাইয়ের লেখালেখিরও ইতিহাস। দুই বোন সুফিয়া ও শিখুও ভালো লিখত। তারা কেন জানি এই পারিবারিক পত্রিকার বাইরে নিজেদের প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকল।
দেয়াল পত্রিকার প্রকাশনা অতি সঙ্গত কারণেই ছিল অনিয়মিত। একটা পর্যায়ে প্রকাশনা হয়ে দাঁড়াল পারিবারিক বিশেষ বিশেষ ঘটনানির্ভর। পরিবারের একজন সদস্যের বিয়ে হচ্ছে, সেই উপলক্ষে প্রকাশনা।কেউ প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে যাচ্ছে বা কারো প্রথম সন্তানের জন্ম হচ্ছে, সেই উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা।
সুনিলিত সাগরিতের সর্বশেষ সংখ্যাটি বের হয় আমার বড় মেয়ে নোভা। আহমেদের বিয়ে উপলক্ষে। পরিবারের বাইরের কারো লেখাই এখানে প্রকাশের নিয়ম নেই। কিন্তু আমার খুব ইচ্ছা ছিল ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নোভাকে আশীবাদ জানিয়ে যে চারটি লাইন লিখেছিলেন তা পত্রিকায় ঢোকানো। তা সম্ভব হয় নি। সংসার ছেড়ে বাইরে চলে আসার কারণে পত্রিকাটির ওপর আমার কোনো। নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আমি নিজে যে লেখাটি লিখেছিলাম সেটিও প্রকাশ হবে কিনা তা নিয়েই শঙ্কিত ছিলাম।
আমি আমার বড় মেয়ের বিয়েতে বিশেষ কোনো উপহার দিতে চেয়েছিলাম। শাড়ি, গয়না, ফ্রিজ, টিভির বাইরে কিছু। কী দেয়া যায় কী দেয়া যায়? নোভার অতি প্রিয় লেখকের নাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। নোভার বিয়ের আসরে তার প্রিয় লেখককে উপস্থিত করলে কেমন হয়? এই উপহারটি হয়তো তার পছন্দ হবে।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং তার স্ত্রী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়কে নিমন্ত্রণ জানালাম। তাদের বললাম, মেয়ের বিয়েতে gift হিসেবে তাদের প্রয়োজন। আমাকে অবাক করে দিয়ে দুজনেই চলে এলেন। এয়ারপোর্টে থেকে সরাসরি বিয়ের আসর বিডিআর-এর দরবার হলে উপস্থিত হলেন। নোভা তার বরকে নিয়ে স্টেজে বসে ছিল। বিয়ের এবং উৎসবের উত্তেজনায় সে খানিকটা দিশেহারা। আমি বললাম, মা, তোমার বিয়ের গিফট দেখে যাও। নোভা তার অতি প্রিয় লেখককে বিয়ের আসরে উপস্থিত দেখে চমকে উঠল।
পাঠক কি ধরতে পেরেছেন মানুষকে চমকে দেয়ার একটা প্রবণতা আমার মধ্যে আছে? সৃষ্টিশীল সমস্ত কর্মকাণ্ডে চমক একটি বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। আমরা কখন চমকাই? সচরাচর ঘটে না তা ঘটতে দেখলে চমকাই।একজন Fiction writer চমকের ব্যাপারটি কিন্তু তার মাথায় রাখেন, কেউ অবচেতনভাবে এই কাজটি করেন, আবার কেউ সচেতনভাবেই করেন। যেমন জর্জ বার্নাড শ। লেখালেখির সময় সচেতন এবং অবচেতনভাবে অনেক কিছু করতে হয় বলেই এই কর্মটি অতীব জটিল।
Writing is a dog’s life, but the only life worth living.
–Gustave Flauvert.
লেখকের জীবন হলো কুকুরের জীবন, কিন্তু এই একমাত্র অর্থবহ জীবন। অধ্যাপনা ছেড়ে আমি একসময় কুকুরের জীবন বেছে নেব তা কখনো ভাবি নি। এক দুপুরের কথা।বয়স উনিশ। মন আবেগে পূর্ণ। ইউনিভার্সিটি ছুটি হয়েছে।ছুটি কাটাতে বরিশালের পিরোজপুরে গিয়েছি।
একগাদা chemistry বই নিয়ে গেছি। আগামীকাল থেকে পড়তে শুরু করব, এই ভেবে ভেবে সময় কাটাচ্ছি। বইয়ের পাতা খোলা হচ্ছে না। বিকালে কেমন যেন অস্থির লাগে। আমি হাঁটতে বের হই। হুলারহাটের দিকে এগুতে থাকি। প্রথমেই একটা কবরখানা পড়ে। গাছপালায় ঢাকা এমন সুন্দর একটা জায়গা। একদিন কবরখানার ভেতরে
ঢুকলাম। অবাক কাণ্ড, কবরখানার ভেতর টলটলে পানির ছোট্ট একটা পুকুর। পুকুরের পাশে শ্যাওলা ধরা এক কামরার মসজিদ ভাঙা ঘাট। ভাঙা ঘাটে অতি বৃদ্ধ একজন (সম্ভবত মসজিদের ইমাম, কবরখানার কেয়ারটেকার)আমাকে দেখে বললেন, কী চান বাবা।আমি বললাম, কিছু চাই না।কবরখানায় ঘুরতেছেন কেন?
বেড়াচ্ছি।বাবা, এইটা কি কোনো বেড়ানোর জায়গা? আছরের ওয়াক্ত হয়েছে, আসেন নামাজ পড়ি।আমি বললাম, আমার অজু নাই।পুকুরে পানি আছে। অজু করেন।বৃদ্ধ কঠিন চোখে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। একবার ইচ্ছা করল দৌড়ে পালিয়ে যাই। কেন জানি সাহসে কুলাল না। বৃদ্ধ অজু করে উঠে দাঁড়িয়েছেন। অপেক্ষা করছেন আমার জন্যে।অজু কীভাবে করতে হয় জানেন?
জানি।অজুর দোয়া জানেন? জি-না।থাক, দোয়া লাগবে না। অজু করে আসেন। একত্রে নামাজ পড়ি।আমি অজু করলাম এবং বৃদ্ধকে নিয়ে অন্ধকার মসজিদেঢুকলাম। আসরের নামাজের দোয়া মনে মনে পড়তে হয়।বৃদ্ধ কিন্তু শব্দ করে পড়ছেন। সূরা ফাতিহার পর তিনি অতি দীর্ঘ একটা সূরা পাঠ করতে শুরু করলেন। ভয়ে আমি অস্থির হয়ে গেলাম। দ্রুত অন্ধকার নামছে। চারদিকে কবর। পুকুরের পানিতে কেউ সাঁতরাচ্ছে এমন শব্দ হচ্ছে।
নামাজের শেষে তিনি দীর্ঘ দোয়ায় বসলেন। এই দোয়া কোনোদিন শেষ হবে আমার এরকম মনে হলো না।নামাজে সালাম ফেরানোর একটা ব্যাপার আছে। একবার ডানে একবার বামে সালাম দিতে হয়। এই অতি বৃদ্ধ মাওলানা দোয়ার মধ্যেও কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে দিয়ে সালাম ফেরাচ্ছেন। পাগল না তো?
ঠিক মাগরেবের আগে আগে বৃদ্ধ দোয়া শেষ করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, যান বাড়িত যান।আমি বললাম, আপনি একা একা এখানে থাকেন? হুঁ।একাই নামাজ পড়েন? বৃদ্ধ বললেন, একাই নামাজ পড়ি। তবে মাগরেব এবং এশার ওয়াক্তে অনেক জিন আমার সঙ্গে নামাজ পড়ে। সূরা পাঠে ভুল করলে তারা লোকমা দেয়।
আমি দ্রুত বের হয়ে এলাম। মাগরেবের ওয়াক্তের বাকি নাই। জিনরা সম্ভবত আসতে শুরু করেছে।আমার বৈকালিক ভ্রমণে পিরোজপুর গোরস্থান একটি বিশেষ জায়গা দখল করে ফেলল। প্রায়ই সেখানে যাই, কবরের গায়ে লেখা নামগুলি পড়ি। বৃদ্ধ কেয়ারটেকারকে দেখি কবর পরিষ্কার করছেন। ঝোপঝাড় কাটছেন। তিনি আর কখনো আমাকে নামাজ পড়তে ডাকেন নি। তাঁর সঙ্গে আমার কথাবার্তা তেমন হতো না। একদিন শুধু বললেন, আপনার কোনো আত্মীয়স্বজন কি এখানে আছেন।
আমি বললাম, না। তাহলে রোজ আসেন কেন? আমি চুপ করে রইলাম। জবাব দিতে পারলাম না। বৃদ্ধ বিড়বিড় করে বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাপাকের কোনো ইশারা আছে বইল্যাই আপনে আসেন।জানি না কাকতালীয় ব্যাপার কি-না, মিলিটারির হাতে নিহত আমার বাবার কবর হয় এই পিরোজপুরের গোরস্থানেই।কবরস্থান-বিষয়ক অংশটি বিস্তারিত লেখার একটা কারণ আছে। আমি একদিন কবরস্থান থেকে ফিরেই প্রথম উপন্যাস লেখায় হাত দিই। সন্ধ্যাবেলা আয়োজন করে
Chemistry-র বই বের করে পড়তে বসি। খাতায় লেখি—The term ‘macromolecule’ was first suggested by Staudinger. এইটুকু লিখেই পরের লাইনে লিখলাম বাস থেকে নেমে হকচকিয়ে গেলাম। Macromolecule-এর সঙ্গে বাসের কোনোই সম্পর্ক নেই।
তারপরেও কেন লিখলাম! বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বাসার সামনে বিশাল পুকুর।পুকুর থেকে ঝুপ ঝুপ বৃষ্টির শব্দ আসছে। পিরোজপুর শহরে বৃষ্টি হওয়া মানেই কারেন্ট চলে যাওয়া। আমি সিরিয়াসলি পড়ছি ভেবেই আমার সামনে হারিকেন দেয়া হয়েছে। আমার মাথার ভেতর একের পর এক লাইন
আসছে। এক ধরনের অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে আমি লিখতে শুরু করেছি আমার প্রথম উপন্যাস—শঙ্খনীল কারাগার। বৃষ্টিতে ভেসে গেছে সব। রাস্তায় পানির ধারা স্রোত।লোকজন চলাচল করছে না, লাইটপোস্টের বাতি নিবে আছে। অথচ দশ মিনিট আগেও যেখানে ছিলাম সেখানে বৃষ্টির নামগন্ধ নেই। শুকনা খটখট করছে চারদিক। কেমন অবাক লাগে ভাবতে, বৃষ্টি এসেছে, ঝুপ ঝুপ করে একটা
ছোট্ট জায়গা ভিজিয়ে চলে গেছে। আর এতেই আশৈশব পরিচিত এ অঞ্চল কেমন ভৌতিক লাগছে। হাঁটতে গা ছমছম করে।শঙ্খনীল কারাগার আমার প্রথম লেখা উপন্যাস, যদিও প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস নন্দিত নরকে। আমার পরম সৌভাগ্য, আমার বাবা শঙখনীল কারাগার উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি পড়ে যেতে পেরেছেন। সেই গল্প আরেকদিন করব।
০৪.
উনিশ বছর বয়সের অনেক তরুণ-তরুণী উপন্যাস লিখেছে।এটা এমন কোনো উল্লেখযোগ্য ব্যাপার না। যেটা উল্লেখ করার মতো সেটা হচ্ছে, আমি লিখেছি খুব দ্রুত।তিন রাতের বেশি সময় লেগেছে বলে আমার মনে হয় না।উপন্যাস শেষ করেছি মধ্যরাতে। শেষ করার পর পর মনে হয়েছে–ইশ, কাউকে যদি পড়াতে পারতাম! এমন সুন্দর একটা গল্প। কেউ জানবে না?
সুন্দর একটা গল্প বলেছি এটা বুঝতে পারছিলাম। লেখার সময় প্রতিটি চরিত্র চোখের সামনে ভাসছিল। রাবেয়া আপা অনেকবার আমার সামনে দিয়ে হেঁটে গেছেন, প্রতিবারই তার কাঁচের চুড়ির শব্দ শুনেছি। কিটকি গায়ে চমৎকার সেন্ট মাখে। যতবার কিটকির কথা লিখেছি, ততবারই সেন্টের গন্ধ পেয়েছি। উপন্যাসের কিছু কিছু জায়গা লেখার সময় টপটপ করে চোখ দিয়ে পানি পড়েছে।
গল্প ভালো লিখেছি বুঝতে পারছি, কিন্তু উপন্যাস কি হয়েছে? উপন্যাস লেখার নিশ্চয়ই অনেক নিয়মকানুন আছে। আমি তো কিছুই জানি না। উপন্যাস লেখার বিষয়ে সমারসেট মম বলেছেন—There are three rules for writing the novel. Unfortunately no one knows what they are.
তিন মাসের জন্য লেখালেখি শেখার একটা স্কুলে আমি ক্লাস করেছিলাম। আমার আগে সেই স্কুলে পশ্চিমবঙ্গের আরেক ঔপন্যাসিকও ক্লাস করেছেন। তাঁর নাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। স্কুলটা হলো আমেরিকার আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ক্রিয়েটিভ রাইটিং ফ্যাকাল্টি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সেই স্কুল থেকে কিছু শিখতে পেরেছিলেন কি-না আমি জানি না। আমি কিছুই শিখতে পারি নি।
মনে আছে একদিন আমাদের শিক্ষক Idea বিষয়ে এক ঘণ্টার ক্লাস নিলেন। তিনি বললেন, কীভাবে Idea লালন করতে হয়। Idea-র পূর্ণতার জন্য সময় দিতে হয়।তারপর idea-কে প্রকাশের উপায়গুলো নিয়ে ভাবতে হয়।আমি মহাবিরক্ত হয়ে উসখুস করছি। শিক্ষকের সেটা চোখ এড়াল না। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ডক্টর আহমেদ (সব ছাত্রের নাম তিনি জানতেন), আইডিয়া বিষয়ে তোমার কি কিছু বলার আছে?
আমি উঠে দাঁড়ালাম এবং পরিষ্কার গলায় বাংলায় বললাম, শিল্পীর শিরে কিলবিল করে আইডিয়া উইপোকা বলে, চল ভাই তারে খাই গিয়া। শিক্ষক বললেন, What does it mean? আমি ইংরেজিতে অনুবাদ করে তাকে শোনাব, উইপোকার ইংরেজি কিছুতেই মাথায় আসছে না। শেষটায় বললাম Creative person’s head is full with ideas Little bugs say, let us eat them.
তিনি হতাশ গলায় বললেন, এখনো বুঝতে পারছি না।আমি বললাম, আইডিয়া হলো ক্ষুদ্র পোকাদের আহার। এর বেশি কিছু না।পুরনো কথায় ফিরে যাই। প্রথম উপন্যাস ভূমিষ্ঠ হয়েছে।এখন কী করা যায়? আমি বাবার অফিসের ফাইলের নিচে গোপনে রেখে চলে এলাম। বাবা ফাইল দেখতে দেখতে পাণ্ডুলিপি পেয়ে যাবেন। এবং অবশ্যই আগ্রহ নিয়ে পড়বেন।বাবার অফিস ছিল আমাদের বাসারই একটা কামরা।ফাইলপত্রে ঠাসা একটা ঘর। বাবার মাথার ওপর বিশাল এক টানা পখি। রশিদ নামের একজন ছিল সরকারি পাংখাপুলার। তার কাজ মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে আধো ঘুম আধো জাগরণ অবস্থায় যন্ত্রের মতো পাখার দড়ি টেনে যাওয়া।
অয়োময় নাটক লেখার সময় আমি একটি পাংখাপুলারের চরিত্র এনেছিলাম। বাবার পাংখীপুলার রশিদের প্রচ্ছন্ন ছায়া হয়তো তার মধ্যে ছিল। আমি রশিদকে গোপনে বলে এলাম, যদি দেখো বাবা ফাইল বাদ দিয়ে নীল রঙের একটা খাতা পড়তে শুরু করেছেন তাহলে আমাকে খুবর দেবে। রশিদ দাঁত বের করে বলল, নিশ্চিন্ত থাকেন।টেনশান নিয়ে আমি অপেক্ষা করছি। রশিদ কোনো খবর দিচ্ছে না।
দুপুরে খাবার সময় বাবাকে ভেতরে এসে খেতে বলা হলো। বাবা বললেন, দেরি হবে। এই সময় রশিদ এসে আমাকে চোখ টিপ দিয়ে বলল, নীল খাতা! আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল।একসময় বাবা এসে গম্ভীর ভঙ্গিতে দুপুরের খাবার শেষ করলেন। আমার লেখা বিষয়ে কোনো কথা বললেন না। সন্ধ্যাবেলা মাগরেবের নামাজ শেষ করে মা’কে ডেকে বললেন, আল্লাহপাক তোমার বড় ছেলেকে লেখক বানিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। শুকুর আলহামদুলিল্লাহ।
আমার জন্য আরো বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। বাবা রাতে আমার হাতে একতোড়া কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এখানে একটা নাটক আছে। রেডিও নাটক। আমি লিখেছি। নাম—কত তারা আকাশে। ঢাকা বেতারের একজন। প্রডিউসারের বাড়ি পিরোজপুরে। তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন, নাটক ভালো হলে প্রচারের ব্যবস্থা করবেন। তুই নাটকটা পড়ে দেখ। কোনো পরিবর্তন লাগলে করে ফেলবি।
আমি মহানন্দে নাটক কাটাকাটি করতে লাগলাম। একসময় জিনিস যা দাঁড়াল, তাকে আর বাবার লেখা নাটক বলা যায় না। বাবা নাটক পড়ে বললেন, অসাধারণ জিনিস দাঁড় হয়েছে। নাটক জমা দেয়া হলো। প্রডিউসার সাহেব আশ্বাস দিলেন, প্রচার হবে, তবে দেরি হবে।দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হবার কারণে সব এলোমেলো হয়ে গেল। পিতাপুত্রের যৌথ নাটক প্রচার হলো না।ছুটি শেষ হয়ে গেল।
আমি বাক্সভর্তি কেমিস্ট্রি বই নিয়ে ঢাকায় ফিরলাম। শঙ্খনীল কারাগারের পাণ্ডুলিপি ফেলে এলাম। পাণ্ডুলিপি সঙ্গে রাখার কিছু নেই। বই হিসাবে শঙ্খনীল কারাগার প্রকাশিত হবে, পাঠক পড়বে, কোনো একদিন বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় সেই উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র বানাবে। সেই চলচ্চিত্র দেশে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের সম্মান পাবে, মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে পাবে Honourable mention—এইসব কিছুই ঊনিশ বছরের যুবকটি জানত না।
স্বাধীনতার ত্রিশ বছর পর মা এবং ভাইবোনদের নিয়ে পিরোজপুরে বাবার কবর জিয়ারত করতে গেলাম। মা এবং ভাইবোনরা খুব কান্নাকাটি করল। অদ্ভুত কোনো কারণে আমার চোখে পানি এল না। তাদের বাসায় রেখে সন্ধ্যাবেলা আমি আবার কবরস্থানে গেলাম। আমার সঙ্গে দু’টা বই নন্দিত নরকে, তোমাদের জন্যে ভালোবাসা।
নিতান্তই ছেলেমানুষের মতো বই দুটা কবরের ঝোপঝাড়ের ভেতর রেখে অনেকক্ষণ কাঁদলাম।মনে মনে বললাম, নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছ নয়নে নয়নে।বাবার কবরে শ্বেতপাথরে এই দু’টা লাইনই লেখা।প্রায়ই ভাবি, আমার নিজের কবরে এপিটাফ হিসেবে কী লেখা থাকবে? লেখাটা কি আমিই লিখব? নাকি অন্য কেউ আমার হয়ে লিখে দেবে?
গায়ক আব্বাসউদ্দিনের কবর আজিমপুর গোরস্থানে।সেখানে এপিটাফ হিসাবে তার অতি বিখ্যাত গানের চরণ লেখা বন্ধু কাজল ভ্রমরা রে কোন দিন আসিবেন বন্ধু কয়া কয়া যাও যে ক’বার দেখেছি মনের ভেতরে গান গুনগুন করে উঠেছে।এমন সুন্দর কোনো কিছু কেউ কি লিখবে আমার জন্য? কোনো পত্রিকা কি কোনো শোকগাথা প্রচার করবে?
তারা কী লিখবে? William Faulkner বলেছেন, একজন লেখকের obituary হওয়া উচিত এক লাইনের। He wrote books, then he died. মানুষটা বই লিখেছে, তারপর মারা গেছে।বাহ্ চমৎকার। এর চেয়েও সুন্দর একটা কথা লিখি? আমার প্রিয় লেখক Jorge Luis Borges বলেছেন—When writers die they become books, which is after all, not too bad an incarnation. মৃত্যুর পর লেখকরা বই হয়ে যান। এরচেয়ে ভালো আর কী হতে পারে?
পুনশ্চ : আমি যে পিতৃভক্ত ছেলে এই তথ্যটা নিশ্চয়ই ইতোমধ্যে পাঠকরা জেনেছেন। অতি সঙ্গত কারণে প্রশ্ন উঠতে পারে, এমন পিতৃভক্ত একজন ছেলে ত্রিশ বছর পর বাবার কবর দেখতে যায় কীভাবে? ঢাকা থেকে পিরোজপুর যেতে আট ঘণ্টা লাগে।প্রশ্নটার জবাব আমার কাছে নেই।সবার ব্যস্ততা। কেউ সময় বের করতে পারে না। কত কিছু।আমরা জটিল আধুনিক এক জগতে বাস করি।তারপরেও ত্রিশ বছর পর হঠাৎ সবাইকে জড়ো করে কেন কবরস্থানে গেলাম গল্পটা বলা দরকার।
এই গল্পে সামান্য Supernatural touch আছে।বাংলাদেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে সবুজ সাথী নামের প্রেসক্রিপসন নাটক নিয়ে অনুষ্ঠান হচ্ছে। এই সিরিয়ালটির লেখক এবং পরিচালক যেহেতু আমি, আমাকেও প্রতিটি অনুষ্ঠানে থাকতে হচ্ছে। খুলনার অনুষ্ঠান শেষ করে আমরা যাচ্ছি বরিশালে। গাড়ি করে যাচ্ছি।
আমার সঙ্গে আছেন আসাদুজ্জামান নূর, জাহিদ হাসান এবং অভিনেত্রী-গায়িকা শাওন। ত্রিশ বছর পর এই অঞ্চলে প্রথম যাত্রা। সবকিছু বদলে গেছে। আমি যাচ্ছি ঘুমুতে ঘুমুতে। হঠাৎ ঘুম ভাঙল। আমি প্রায় চেঁচিয়ে বললাম, ড্রাইভার সাহেব, গাড়ি থামান। গাড়ি থামান। আসাদুজ্জামান নূর বললেন, সমস্যা কী, শরীর খারাপ লাগছে?
আমি বললাম, শরীর খারাপ না, তবে কেমন জানি লাগছে।মনে হচ্ছে আমি অতিপরিচিত জায়গায় এসেছি।গাড়ি থামল। আমি ঘোরলাগা অবস্থায় গাড়ি থেকে নামলাম। কিছুই চিনতে পারছি না। খুলনা-বরিশাল হাইওয়ের একটি অংশে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। আমি বিব্রত ভঙ্গিতে বললাম, আমার কেন জানি মনে হচ্ছে খুব কাছে কোথাও আমার বাবার কবর।জাহিদ বলল, কী বলেন হুমায়ূন ভাই?
শাওন বলল, উনি যখন বলছেন তখন একটু খুঁজে দেখলে হয়।বেশি খোঁজাখুঁজি করতে হলো না। একজন বলল, সামান্য পেছনে গেলেই পিরোজপুর গোরস্থান। আমি সবাইকে নিয়ে গোরস্থানে ঢুকলাম। আমরা কবর জিয়ারত করলাম।শাওন বলল, আমি আমার জীবনে অতি রহস্যময় একটা ঘটনা দেখলাম।
ছেলে পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে দেখে বাবা ছেলেকে ডেকে পাঠালেন।সব ঘটনার পেছনেই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকে। আমার হঠাৎ ঘুম ভেঙে গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়ার পেছনেও নিশ্চয়ই কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে। থাকলেও আমি তা জানি না।বরিশালের অনুষ্ঠান শেষ করে ঢাকায় ফিরেই আমি সব ভাইবোন এবং মাকে নিয়ে পিরোজপুর গোরস্থানে এসে উপস্থিত হলাম,
০৫.
When I’m writing I’m always aware that this friend is going to
like this, or that another friend is going to like that paragraph
or chapter, always thinking of specific people. In the end all
books are written for your friends.
–Gabriel Garcia Marquoz
ঢাকা শহরে একজন ‘হন্টন পীর’ আছেন। তাঁর একমাত্র কাজ সারাদিন হাঁটা। একা হাঁটেন না। ভক্তদের নিয়ে হাঁটেন। একজন বাবার মাথায় ছাতা ধরে থাকে। একজনের হাতে থাকে পানির বোতল। অন্য একজনের হাতে কলার কাদি।বাবা খুব সম্ভব কলার ভক্ত। আমি বেশ কয়েকবার দূর থেকে এই হন্টন বাবাকে লক্ষ করেছি। একবার মিনিট পাঁচেক বাবার আশেপাশেই ছিলাম। উদ্দেশ্য বাবার ঘটনাটা কী জানা। বাবার জনৈক ভক্ত আমাকে চিনে ফেলে অবাক হয়ে বলল, আপনি বাবার কাছে কী চান?
আমি বললাম, গল্প চাই! আমি আমার যৌবনে হন্টন পীরের মতো একজনকে পেয়েছিলাম। আমরা দলবেঁধে তার পেছনে হাঁটতাম। তিনি যদি কিছু বলতেন মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। গভীর রাতে নীলক্ষেত এলাকায় তিনি হাঁটতে হাঁটতে আবেগে অধীর হয়ে দুই হাত তুলে চিৎকার করতেন। ‘আমার বাংলাদেশ! আমার বাংলাদেশ!’ আমরা গম্ভীর মুগ্ধতায় তার আবেগ এবং উচ্ছ্বাস দেখতাম।তাঁর নাম আহমদ ছফা। আমাদের সবার ছফা ভাই।
ছফা ভাই ছিলেন আমার Mentor. এই ইংরেজি শব্দটির সঠিক বাংলা নেই। Mentor এমন গুরু যার প্রধান চেষ্টা শিষ্যকে পথ দেখিয়ে উঁচুতে তোলা। ছফা ভাই শুধু যে একা আমার Mentor ছিলেন তা না, অনেকেরই ছিলেন।দেশ সদ্য স্বাধীন হয়েছে। শিশু রাষ্ট্র জন্মের যন্ত্রণায় তখনো ছটফট করছে। আর ছফা ভাই ছটফট করছেন আবেগে এবং উত্তেজনায়।
কত অদ্ভুত অদ্ভুত পরিকল্পনা তার মাথায়। দেশকে শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীতে এভারেস্ট শিখরের কাছাকাছি নিয়ে যেতে হবে। দেশ মেধা এবং মননে পৃথিবীর সব রাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাবে। ইত্যাদি। ছফা ভাই এমন একজন মানুষ যিনি তার উত্তেজনা নিমিষে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারেন। আমরাও ছফা ভাইয়ের মতোই উত্তেজিত হই। কল্পনায়। ভাসে ভবিষ্যতের অপূর্ব বাংলাদেশ।
ছফা ভাই সাপ্তাহিক একটা পত্রিকা বের করে ফেললেন।নিজেই সম্পাদক, মুদ্রাকর এবং প্রধান লেখক। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, গল্প লেখা শুরু করে দাও। রোজ রাতে একটা করে গল্প লিখতে হবে। আমার পত্রিকায় নিয়মিত গল্প ছাপা হবে। ছফা ভাইয়ের কথা মানেই আদেশ। আমি রাত জেগে গল্প লিখে ফেললাম। আজ আর সেই গল্পের নাম মনে নেই।
গল্প কী লিখেছিলাম তাও মনে নেই। ছফা ভাইয়ের পত্রিকাটার কথাও মনে নেই। দুই- তিন সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পর পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়।ছফা ভাই তখন দারুণ অর্থকষ্টে। থাকার জায়গা নেই। ক্ষীণ সম্ভাবনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলে সিট পাবেন। পাচ্ছেন না। একদিন আমি ছফা ভাইকে ভয়ে ভয়ে বললাম, হলে সিট পাওয়া পর্যন্ত আমাদের বাসায় কি থাকবেন?
আমার মা তখন বাবর রোডে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের স্ত্রী হিসাবে একটা বাড়ির দোতলাটা বরাদ্দ পেয়েছেন। সেখানে না আছে পানির ব্যবস্থা, না আছে কিছু। ছফা ভাই আমাদের সঙ্গে থাকতে রাজি হলেন। আমরা তাঁকে সবচেয়ে বড় কামরাটা ছেড়ে দিলাম। মা তার নিজের সন্তানদের যে মমতায় দেখেন, একই। মমতা ছফা ভাইয়ের দিকেও প্রসারিত করলেন।
