বলপয়েন্ট পর্ব-০৬ হুমায়ূন আহমেদ

বলপয়েন্ট

আসলে আমি মানুষ হয়েছি অদ্ভুত পরিবেশে। একা একটি বাড়ির অগুনতি রহস্যময় কোঠা। বাড়ির পেছনে জড়াজড়ি করা বাঁশবন। দিনমানেই শেয়াল ডাকছে চারদিকে। সন্ধ্যা হব-হব সময়ে বাঁশবনের এখানে-ওখানে জ্বলে উঠছে ভূতের আগুন। দোতলার বারান্দায় পা ছড়িয়ে বিচিত্র সুরে কোরআন পড়তে শুরু করেছে কানাবিবি।সমস্তই অবিমিশ্র ভয়ের।

আবছা অন্ধকারে কানাবিবির দুলে দুলে কোরআন-পাঠ শুনলেই বুকের ভেতর ধক করে উঠত। নানিজান বলতেন, কানার কাছে এখন কেউ যেও না গো। শুধু কানাবিবির কাছেই নয়, মোহরের মা পা ধোয়াতে এসে বলত, পুলাপান কুয়াতলায় কেউ যেও না। কুয়াতলায় সন্ধ্যাবেলায় কেউ যেতাম না। সেখানে খুব একটা ভয়ের ব্যাপার ছিল।ওখানে সন্ধ্যাবেলায় যেতে নেই।

চারদিকেই ভয়ের আবহাওয়া। নানিজানের মেজাজ ভালো থাকলে গল্প ফঁদতেন। সেও ভূতের গল্প : হাট থেকে শোল মাছ কিনে ফিরছেন তার চাচা। চারদিকে অন্ধকার হয়ে এসেছে। শ্রাবণ মাস, বৃষ্টি পড়ছে টিপটিপ।ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সড়ক ছেড়ে বাড়ির পথ ধরেছেন, অমনি পেছন থেকে নাকি সুরে কে চেঁচিয়ে উঠল, মাছটা আমারে দিয়ে যা।

রাতেরবেলা ঘুমিয়ে পড়া ছেলেমেয়েদের জাগিয়ে এনে ভাত খাওয়াত মোহরের মা। লম্বা পাটিতে সারি সারি থালা পড়ত। ঘুম-ঘুম চোখে ভাত মাখাচ্ছি, এমন সময় হয়তো ঝুপ করে শব্দ হলো বাড়ির পেছনে। মোহরের মা খসখসে গলায় চেঁচিয়ে উঠল, পেততুনি নাকি? পেততুনি নাকি রে?

নবু মামা প্রায় আমার গায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে চাপা সুরে বলত, ভয় পাচ্ছি, ও মোহরের মা, আমার ভয় লাগছে।নানাজানের সেই প্রাচীন বাড়িতে যা ছিল, সমস্তই রক্ত জমাট-করা ভয়ের। কানাবিবি তার একটিমাত্র তীক্ষ্ণ চোখে কেমন করেই না তাকাত আমাদের দিকে। নবু মামা বলত, ঐ বুড়ি আমার দিকে তাকালে কঞ্চি দিয়ে চোখ গেলে দেব। কানাবিবি কিছু না বলে ফ্যালফ্যালিয়ে হাসত।

মাঝেমধ্যে বলত, পুলাপান ভরাও কেন? আমি কিতা? পেত্নী? পেত্নী না হলেও সে আমাদের কাছে অনেক বেশি ভয়াবহ ছিল। শুধু আমরা নই, বড়রাও ভাকে সমীহ করে চলতেন। আর সমীহ করবে নাই-বা কেন? বড় নানিজানের নিজের মুখ থেকে শোনা গল্প।তার বাপের দেশের মেয়ে কানাবিবি। বিয়ের সময় সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। ফাই-ফরমাস খাটে। হেসে-খেলে বেড়ায়। একদিন দুপুরে সে পেটের ব্যথায় মরোমরো।কিছুতেই কিছু হয় না, এখন যায় তখন যায় অবস্থা।নানাজান লোক পাঠিয়েছেন আশু কবিরাজকে আনতে।

আশু কবিরাজ এসে দেখে সব শেষ। বরফের মতো ঠান্ডা শরীর। খাঁটিয়ায় করে বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাঁশ কাটতে লোক গেল। নিজান মড়ার মাথার কাছে বসে কোরআন পড়তে লাগলেন। অদ্ভুত ব্যাপারটা ঘটল ঠিক তখনি। আমার লিজান ভয়ে ফিট হয়ে গেলেন। নানাজান আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠলেন, ইয়া মাবুদ, ইয়া মাবুদ। কারণ কানাবিবি সে সময়ে ভালো মানুষের মতো উঠে বসে পানি খেতে চাচ্ছে। এরপর থেকে স্বভাব-চরিত্রে আমূল পরিবর্তন হলো তার।

দিনরাত নামাজ-রোজা। আমরা যখন কিছু কিছু জিনিস বুঝতে শিখেছি তখন থেকে দেখছি, সে পাড়ার মেয়েদের তাবিজ-কবজ দিচ্ছে। সন্ধ্যা হতে-না- হতেই দোতলার বারান্দায় কুপি জ্বালিয়ে বিচিত্র সুরে কোরআন পড়ছে। ভয় তাকে পাবে না কেন? এ তো গেল রাতের ব্যাপার। দিনেরবেলাও কি নিস্তার আছে? গোল্লাছুট খেলতে গিয়ে যদি ভুলে কখনো পুবের ঘরের কাছাকাছি চলে গিয়েছি, অমনি রহমত মিয়া বাঘের মতো গর্জন করে উঠেছে, খাইয়া ফেলামু।

পোলা, কাঁচা খাইয়া ফেলামু। কচ কচ কচ। ভয়ানক জোয়ান একটা পুরুষ শিকল দিয়ে বাঁধা। ব্যাপারটাই ভয়াবহ! বদ্ধ পাগল ছিল রহমত মিয়া, নানাজানের নৌকার মাঝি।তিনি রহমতকে স্নেহ করতেন খুব, সারিয়ে তুলতে চেষ্টাও করেছিলেন। লাভ হয় নি।এ সমস্ত মিলিয়ে তৈরি হয়েছে আমার শৈশব। গাঢ় রহস্যের মতো ঘিরে রয়েছে আমার চারদিক। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, অল্পবয়সের ভয়কাতর একটি ছেলে তার নিত্যসঙ্গী নবু মামার হাত ধরে ঘুমোতে যাচ্ছে দোতলার ঘরে।

নবু মামা বলছেন, তুই ভেতরের জানালা দুটি বন্ধ করে আয়, আমি দাঁড়াচ্ছি বাইরে। আমি বলছি, আমার ভয় করছে, আপনিও আসেন। মামা মুখ ভেংচে বলছেন, এতেই ভয় ধরে গেল! টেবিলে রাখা হারিকেন থেকে আবছা আলো আসছে। আমি আর নবু মামা কুকুরকুণ্ডলী হয়ে লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছি। নবু মামা শুতে না-শুতেই ঘুম। একা একা ভয়ে আমার কান্না আসছে। এমন সময় বাড়ির ভেতর থেকে হৈচৈ শোনা গেল।

শুনলাম, খড়ম পায়ে খটখট করে কে যেন এদিকে আসছে। মোহরের মা মিহি সুরে কাঁদছে।আমি অনেকক্ষণ সেই কান্না শুনে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম।জানতেও পারি নি সে-রাতে আমার মা মারা গিয়েছিলেন।সে-রাতে আমার ঘুম ভেঙেছিল ফজরের নামাজের সময়।জেগে দেখি বাদশা মামা চুপচাপ বসে আছেন চেয়ারে।আমাকে বললেন, আর ঘুমিয়ে কী করবি, আয় বেড়াতে যাই। আমরা সোনাখালি খাল পর্যন্ত চলে গেলাম।

সেখানে পাকা পুলের ওপর দুজনে বসে বসে সূর্যোদয় দেখলাম। প্রচণ্ড শীত পড়েছিল সেবার। কুয়াশার চাঁদরে গাছপালা ঢাকা। সূর্যের আলো পড়ে শিশিরভেজা পাতা চকচক করছে। কেমন অচেনা লাগছে সবকিছু। মামা অন্যমনস্কভাবে বললেন, রঞ্জু, আজ তোর খুব দুঃখের দিন।দুঃখের দিনে কী করতে হয়, জানিস? না।হা হা করে হাসতে হয়। হাসলেই আল্লা বলেন, একে দুঃখ দিয়ে কোনো লাভ নেই। একে সুখ দিতে হবে। বুঝেছিস? বুঝেছি।

বেশ, তাহলে হাসি দে আমার সঙ্গে।এই বলে তিনি হো হো করে হেসে উঠলেন। বাদশা মামার খুব মোটা গলা ছিল। তার হাসিতে চারদিক গমগম করতে লাগল। আমিও তার সঙ্গে গলা মেলালাম। বাদশা মামা বললেন, আজ আর বাসায় ফিরে কাজ নেই, চল শ্রীপুর।যাই। সেখানে আজ যাত্রা হবে। আমি মহাখুশি হয়ে তার সঙ্গে চলোম।কত দিনকার কথা, কিন্তু সব যেন চোখের সামনে ভাসছে।

১০.

দীর্ঘদিনের জন্য যারা দেশের বাইরে যায়, তারা সঙ্গে কী নেয়? আমার অনুমান একটা জায়নামাজ (বাবা-মাকে খুশি রাখার জন্য, গানের সিডি, রান্নার বই। যারা নিজেদের ইনটেলেকচুয়েল মনে করেন তারা রবীন্দ্রনাথের এক কপি সঞ্চয়িতা নেন (কখনো সেখান থেকে কিছু পাঠ করা হয় না)। আমি দীর্ঘদিনের জন্যে আমেরিকা যাচ্ছি। Ph.D নামক ডিগ্রি করে ফিলসফার টাইটেল পাব। আমি সঙ্গে নিচ্ছি একটা বিশাল বই।

মরিসন অ্যান্ড বয়েডের লেখা Organic Chemistry. বাজারে আমার নিজের তখন চারটি বই নন্দিত নরকে, শঙনীল কারাগার, তোমাদের জন্য ভালোবাসা, অচিনপুর।বইগুলোর একটি করে কপি হলেও সঙ্গে নেওয়া উচিত ছিল। কেন নেই নি তা এখন আর মনে নেই। হয়তো নিজের লেখা বইগুলো সঙ্গে নিতে লজ্জা পাচ্ছিলাম।

Organic Chemistry-র বিশাল বই সঙ্গে নেওয়ার একটাই কারণ। এই বিষয়ে আমি অত্যন্ত দুর্বল। শুনেছি ইউনিভার্সিটিতে প্রথম দিনেই তারা একটা পরীক্ষা নেয়। আমি নিশ্চিত পরীক্ষা নিলেই আমি এই বিষয়ে ফেল করব। দীর্ঘদিন ভ্রমণে যতটা পারা যায় ঝালিয়ে নেওয়া। আমি যাচ্ছি North Dakota State University-তে। তিনটা

ইউনির্ভাসিটি আমাকে টিচিং অ্যাসিসটেন্টশিপ অফার করেছে। এর অর্থ আন্ডার গ্রাজুয়েট ছাত্রদের ক্লাস নেব, তার বিনিময়ে Ph.D করার সুযোগ।North Dakota State University বেছে নেবার পেছনের কারণ কিন্তু সাহিত্য। রসায়ন না। Little house in the Praire-র লেখিকা যে-জীবনের কথা বলেছেন তা North Dakota-র। উনার বই ছোটবেলায় মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়েছি। তার

অনেকগুলো বই অনুবাদ করেছিলেন জাহানারা ইমাম।প্রথম বইটির নাম তিনি দিয়েছিলেন ঘাসের বনে ছোট্ট কুটির। লরা ইঙ্গেলসের প্রতিটি বই পড়ে গহীন অরণ্য, বরফের কাল, শিকার, প্রেইরি ল্যান্ডে যাত্রার গল্প পড়ে কতবার ভেবেছি–আহা, তারা কী সুখেই না ছিল? ইউনিভার্সিটিতে Orientation হচ্ছে। আমাকে জিজ্ঞেস করা হলো, প্রচণ্ড শীতের এই Fargo শহর আমি কেন পছন্দ করলাম?

গরম অঞ্চলের ইউনিভার্সিটি বাদ দিয়ে কেন শীতের দেশের ইউনিভার্সিটি? আমি লরা ইঙ্গেলসের নাম করলাম।শিক্ষক ভুরু কুঁচকে বললেন, Who is she? আমি হতভম্ব! (এখন হতভম্ব হই না। এখন আমি জানি পৃথিবীর সব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিশেষ জ্ঞান জানলেও সাধারণ জ্ঞানে সামান্য ‘Sof’)

মাসে আমার বেতন ৪৫০ ডলার। প্রথম মাসের বেতন পেয়েই মাকে একশ ডলার পাঠালাম। তাকে কপর্দকশূন্য অবস্থায় রেখে এসেছি (পাঠক! কপর্দক মানে কী? সাধারণ জ্ঞানের পরীক্ষা হচ্ছে)। গুলতেকিনের পেটে তখন আমার বড় মেয়ে। তার পৃথিবীতে আসার সময় হয়ে এসেছে, অথচ তার মা’র হাতও শূন্য। কী যে অবস্থা! একশ’ ডলার পাঠিয়ে খুবই স্বস্তি পেলাম।

আমেরিকায় আমার নতুন জীবন শুরু হলো। সেখানে শিল্প- সাহিত্য-সংস্কৃতি অনুপস্থিত। রসায়নময় জীবন। আন্ডার গ্রাজুয়েট ছাত্রদের প্রবলেম ক্লাস নেই। নিজে ক্লাস করি। প্রতি সপ্তাহেই পরীক্ষা। আমি ডাঙার মাছের মতোই খাবি খাচ্ছি।প্রবলেম ক্লাসেও নানা সমস্যা। ছাত্রদের ইংরেজি বুঝি না। ওরাও আমার ইংরেজি বুঝে না। উদাহরণ দেই।

এনট্রফির একটা অংশ আমি বেশ সময় নিয়ে বুঝালাম। তখন এক ছাত্রী উঠে দাঁড়াল। বিনীত গলায় বলল, তুমি যে কথাগুলো বললে তাকি এবার ইংরেজিতে বলবে? সারা ক্লাসে হাসির শব্দ। আমি আবার মতো দাঁড়িয়ে কী করব বুঝতে পারছি না।

প্রবলেম ক্লাস মূলত রসায়নের অঙ্কের ক্লাস। সেখানে ছাত্র-ছাত্রীরা উদ্ভট প্রবলেম নিয়েও উপস্থিত হয়। যেমন এক ছাত্র বলল, সে এক ইন্ডিয়ান মেয়ের সঙ্গে ডেটিং করছে কিন্তু সেই মেয়ে তাকে চুমু খেতে দিচ্ছে না।একজন ইন্ডিয়ান হিসাবে এই প্রবলেমের সমাধান কী বলে তুমি মনে কর?

আমার থাকার জায়গা নিয়েও সমস্যা। প্রথমে এক আমেরিকান বুড়ির বাড়িতে উঠলাম। সে তার বাড়ির দোতলায় কয়েকটা এলোমেলো রুম বানিয়ে রেখেছে।রুমগুলো ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টদের ভাড়া দেয় (আমি কালো গাত্রবর্ণের কারণে তার কাছে ইন্ডিয়ান। সে বাংলাদেশের নাম কখনো শোনে নি।) দোতলায় একটা বাথরুম, তার কোনো দরজা নেই। বুড়ির যুক্তি তোমরা ছেলেরা ছেলেরা বাস কর। তোমাদের প্রাইভেসির দরকার কী?

তার বাড়ির দশ গজের ভেতর কোনো সিগারেট খাওয়া যাবে না। আমি সিগারেট খাই শুনে সে আমার বিছানার ওপর একটা স্মোক ডিটেকটর লাগিয়ে দিল। অদ্ভুত কোনো কারণে আমার প্রতি বুড়ির আচার-আচরণ হঠাৎ বদলে গেল। তার আদর এবং যত্নে আমি অতিষ্ঠ হয়ে গেলাম। এক পর্যায়ে সে বলল, তুমি আমাকে মা ডাক। এ দেশে আমিই তোমার মা। একদিন বলল, তোমার ঘরেরস্মোক ডিটেকটরের কানেকশন আমি অফ করে দিলাম।

ঠান্ডার মধ্যে সিগারেট খাবার জন্য বাইরে না গিয়ে এখন ঘরেই খাবে। তবে খবরদার অন্য বোর্ডাররা যেন জানতে না পারে। প্রতি রবিবার আরেক যন্ত্রণা। বুড়ি আমাকে চার্চে নিয়ে যাবে। আমি বললাম, আমি মুসলিম।আমি কেন চার্চে যাব? বুড়ি বলল, গডের চার্চে সব ধর্মের লোক যেতে পারে।আমি বললাম, আমি যাব না।বুড়ি মন খারাপ করে চলে যায়। পরের রবিবারে আবার আসে।

পৃথিবীতে অনেক ধরনের অত্যাচার আছে। ভালোবাসার অত্যাচার হচ্ছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অত্যাচার। কারণ এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে কখনোই কিছু বলা যায় না। সহ্য করে নিতে হয়। ফার্গো শহরে প্রথম বরফ পড়ল। পুরো এলাকা ঢেকে গেল বরফে। বুড়ি আমার রুমে উপস্থিত। আমার জন্য বরফে হাঁটার জুতা নিয়ে এসেছে। ঘটনার এখানেই ইতি নয়। বুড়ি ঘোষণা করল, সে আমাকে হাত ধরে ধরে ইউনিভার্সিটিতে নিয়ে যাবে। কারণ বরফে হাঁটার বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা নেই।

পিছলে পড়ে পা ভাঙতে পারি।অনেক চেষ্টা করেও আজ আমি ওই মমতাময়ীর নাম মনে করতে পারছি না। নিজের ওপর প্রচণ্ড রাগ লাগছে।সব নিরানন্দের মধ্যেই নাকি কিছু আনন্দ লুকানো থাকে।বুড়ির অন্ধকার কোঠায় হঠাৎ একদিন আনন্দের সন্ধান পেলাম। একা একা বই পড়ার আনন্দ। ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখি সায়েন্সের বই ছাড়াও গল্প- উপন্যাসের বিশাল কালেকশন। এর আগে লুই হামসুনের একটা মাত্র বই পড়েছি Vagabond। তার অন্য বইগুলো পড়ার খুব শখ ছিল। বাংলাদেশে পাই নি।

লাইব্রেরিয়ানকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি কম্পিউটারের বোতাম চেপে বললেন, আমাদের কাছে ভার তিনটি বই আছে। তুমি চাইলে বাকিগুলোও আনিয়ে দেব।আমি বললাম, কীভাবে? লাইব্রেরিয়ান বললেন, আমাদের Inter library loan system আছে। যে বই আমাদের নেই, সেই বই আমরা পনেরো দিনের জন্য আমেরিকার যে-কোনো লাইব্রেরি থেকে লোন করে আনতে পারি।আমি সরল বাংলায় বললাম, খাইছে আমারে।লাইব্রেরিয়ান চোখ কপালে তুলে বলল, তার মানে?

আমি বললাম, এটা আমাদের বাংলা ভাষার একটা শব্দ।এর মানে হলো—I have been eaten. কিছুই বুঝতে পারছি না। কে তোমাকে খেয়েছে? তোমার অপূর্ব System. লাইব্রেরিয়ানের বয়স চল্লিশ। হিজড়ার মতো দেখতে একজন মহিলা। শুষ্কং কাষ্ঠং। তাকে মানুষ মনে হয় না।

মনে হয় ব্যাকরণের বই।চিড়িয়াখানায় যে লোক জিরাফের দেখাশোনা করে তার গলা খানিকটা লম্বা হয়ে যায়। যে মহিলা লাইব্রেরিতে কাজ করবেন, তিনি বইয়ের মতো হয়ে যাবেন সেটাই স্বাভাবিক।একটা পর্যায়ে ভদ্রমহিলা আমার বই পড়ার ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ হলেন। লাইব্রেরিতে গেলেই তিনি আমাকে ঘরে বানানো কালো কেক খেতে দেন (অতি অখাদ্য), কফি খেতে দেন (কেকের চেয়েও অখাদ্য)। থ্যাংকস গিভিংয়ে তিনি আমাকে তার বাড়িতে টার্কি খাবার দাওয়াত করলেন। আমেরিকান নিয়ম অনুযায়ী এক বোতল রেড ওয়াইন কিনে (জীবনে প্রথম নিজের পয়সায় মদ কেনা) উপস্থিত হলাম।

ভদ্রমহিলা আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন এইভাবে—এর নাম হুমায়ুন। বাংলাদেশ থেকে এসেছে। নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির ইতিহাসে এর মতো পড়ুয়া ছেলে নেই। সে সব বই পড়ে ফেলেছে।ভদ্রমহিলার স্বামী, মা-বাবা সবাই খুব মাথা দোলাতে লাগল যেন এমন আনন্দের খবর তারা এর আগে শোনে নি।

ভদ্রমহিলা আমাকে Robert Frost এর কবিতার বইয়ের একটি রাজকীয় সংস্করণ উপহার দিলেন। বইয়ের ওপর লেখা To a person who loves book and books love him. খাবারের টেবিলে টার্কি নামের বিশাল পক্ষী রোস্ট করা অবস্থায় আছে। তার পেটভর্তিও নানান খাবার।টার্কির মাংসের রঙ একেক জায়গায় একেক রকম।

কোনোটা কালো, কোনোটা লাল, কোনোটা সাদা। আমাকে প্রত্যেক জায়গা থেকে খানিকটা করে কেটে দেওয়া হলো। আমি খাবার মুখে দিয়ে শিউরে উঠলাম।বিকট বোটকা গন্ধ। এই দ্রব্য খাওয়া মানে সাক্ষাৎ মৃত্যু। বমি করতে করতেই মারা যাব। এই বিপদ থেকে কী করে উদ্ধার পাওয়া যায়?

আমি মুখ কাচুমাচু করে বললাম, টার্কির মাংস যে খেতে অসাধারণ হয়েছে তা গন্ধ থেকেই টের পেয়েছি, কিন্তু আমি নিরামিশাষি, আমি মাছ-মাংস-ডিম কিছুই খাই না। আমার জন্য ব্যস্ত হতে হবে না। এক প্লেট সালাদ আর আপেল পাই আমার জন্য যথেষ্ট।আমেরিকায় পড়াশোনা করা অবস্থাতেই খবর পাই আমাকে বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। বাজারে আর তখন মাত্র চারটা বই। বয়স ত্রিশ- একত্রিশ। আমি পেয়ে গেছি বাংলা একাডেমী পুরস্কার।

লাইব্রেরিয়ানকে খবরটা দিতে গেলাম। তিনি খুবই অবাক হয়ে বললেন, তুমি যে একজন লেখক এই খবরটা তো আমাকে কোনোদিন বলে নি। আমি বললাম, পড়াশোনার চাপে আমি নিজেই ভুলে গিয়েছিলাম। ভদ্রমহিলা হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, Standing ovation for a fiction writer. অবাক হয়ে দেখি বিদেশিনীর চোখ ছলছল করছে। এক জীবনে পরম করুণাময় কতভাবেই না আমাকে আনন্দ দিয়েছেন।আমি যে লেখক না–এই বিষয়টি আমেরিকায় যাবার পর

স্পষ্ট হয়ে গেল। টানা পাঁচ বছর আমেরিকায় ছিলাম। Ph.D করেছি, পোস্ট ডক করেছি। এই পাঁচ বছরে এক লাইনও লিখি নি। গল্প-উপন্যাসের তো প্রশ্নই ওঠে না।একজন সত্যিকার লেখক না লিখে থাকতে পারবেন না। তাকে কিছু না কিছু লিখতেই হবে। একজন তবলাবাদক তবলী না পেলে টেবিলে বা চেয়ারে বোল তোলেন। একজন গায়ককে গুনগুন করতেই হয়।

সেখানে আমি কীভাবে না লিখে পারছি? আমার সমস্যাটা কী? প্রচণ্ড পড়াশোনার চাপ। লেখার সময় নেই —এইসব ভুয়া কথা। একজন লেখক প্রচণ্ড কাজের চাপের ভেতর থেকেও লেখার সময় বের করে নেবেন। তাহলে আমি কেন পারছি না? সমস্যাটা কি পরিবেশ? বাংলাদেশের আলো- বাতাস গায়ে লাগছে না বলেই বাংলা ভাষার লেখকের বলপয়েন্ট দিয়ে কালি বের হচ্ছে না? বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ শুনছি না, ব্যাঙের ডাক শুনছি না—এটাই কি সমস্যা?

মা’কে চিঠি লিখলাম তিনি যেন ক্যাসেটে ব্যাঙের ডাক এবং বৃষ্টির শব্দ রেকর্ড করে পাঠান। আমার সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা আহসান হাবীব ক্যাসেট রেকর্ডার নিয়ে বৃষ্টির দিনে বনবাদাড়ে ঘুরতে লাগল। যথাসময়ে বর্ষা এবং ব্যাঙের ডাকের ক্যাসেট চলে এল।

আমি তখন ইউনিভার্সিটি হাউজিং-এ চমৎকার বাড়ি পেয়েছি। ডুপলেক্স বাড়ি। একতলায় রান্নাঘর, বসার ঘর এবং স্টাডি রুম। দোতলায় দু’টা শোবার ঘর। গুলতেকিন তার কন্যাকে (নোভা) নিয়ে চলে এসেছে। মেয়ের বয়সও দেখতে দেখতে তিন বছর হয়ে গেছে। নিখুঁত বাংলা এবং নিখুঁত ইংরেজিতে। হড়বড় করে কথা বলে। উইকএন্ডে আশেপাশের সব বাঙালি চলে আসে। খিচুড়ি মাংস রান্না হয় এবং ক্যাসেটে বৃষ্টির শব্দ ও ব্যাঙের ডাক বাজে। বাঙালি ছেলেগুলির চোখ ছলছল করতে থাকে।

বাদলা দিনে মনে পড়ে ছেলেবেলার গান বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদেয় এল বান। আমার জীবনচর্যা সম্পর্কে বলি। সামারে দুই মাস কাজের চাপ থাকে না। সবাই ভ্যাকেশনে যায়। আমার ভ্যাকেশনে যাবার ডলার নেই। আমি ইউনিভার্সিটি থেকে কিছু জমি লিজ নিয়ে চাষাবাদ শুরু করে দিলাম।

চাষি হুমায়ূন। আমার সঙ্গী মেয়ে নোভা। পিতা-কন্যা দু’জনের হাতেই খুরপা। আমরা মাটি কোপাই! বীজ বুনি। গাছে পানি দেই। এই সময়টায় মেয়ের সঙ্গে নানা গল্প করি। সবই বাংলাদেশের গল্প। বাংলাদেশের বিশাল নদী, বাঁশবাগানে জোছনা, রয়েল বেঙ্গল টাইগার এবং হরিণে ভর্তি সুন্দরবন, বিশাল সমুদ্র, সিলেটের ডিঙ্গিপোতা হাওর যেখানে সমুদ্রের মতো বড় বড় ঢেউ ওঠে।

নোভা চোখ বড় বড় করে শোনে। একদিন সে বলল, আমাদের দেশটা “a piece of paradise”, তাই না বাবা? আমি বললাম, অবশ্যই তাই। তবে একটু ভুল করেছ। আমি নিশ্চিত Paradiseও এত সুন্দর না। আমি অতি ভাগ্যবান, আমি আমার জীবন Paradise-এ কাটিয়ে দিতে পারছি। আমার মেয়েটা ভাগ্যবতী না। তার জীবন কাটছে আমেরিকায়। সে এবং তার স্বামী না-কি ঐ দেশের নাগরিকত্বও পেয়েছে। মেয়েটির কি কখনো তার বাবার সঙ্গে কথোপকথন মনে পড়ে? জানি না। আমার সঙ্গে দীর্ঘদিন তার কোনো যোগাযোগ নেই।

শুরুতে যে তথ্য দিয়েছি, লেখালেখি কিছুই করি নি, সেখানে সামান্য ভুল আছে। চিঠি লিখতাম। মাকে, ভাইবোনদের। আমি ভালো আছি। তুমি কেমন আছ? এর বাইরে চিঠিতে তেমন কিছু লেখার থাকে না। দেশের সবাই চায় অনেকক্ষণ ধরে চিঠি পড়তে। কাজেই আমি বানিয়ে বানিয়ে অনেক কিছু লিখতাম যা মোটেই সত্যি না।

যেমন একবার টর্নেডোর বর্ণনা দিলাম। একবার লিখলাম ব্লিজার্ডে কীভাবে আটকা পড়েছিলাম। Frost bite হয়ে গেছে। এইসব কি সাহিত্যের আওতায় পড়বে? Vladimir Nabokov (বিখ্যাত রাশিয়ান লেখক এবং সমালোচক-এর মতে এইসবও সাহিত্যের মধ্যে পড়বে।

তিনি বলছেন, Neanderthal যুগে একটি বালক গুহা থেকে চিৎকার করতে করতে বের হলো—নেকড়ে বাঘ! নেকড়ে বাঘ! দেখা গেল তার পেছনে পেছনে ছুটে আসছে নেকড়ে বাঘ। তখন কিন্তু সাহিত্যের জন্ম হলো না। সাহিত্যের জন্ম হলো তখনি যখন একটা বালক চিৎকার করতে করতে আসছে—নেকড়ে বাঘ! নেকড়ে বাঘ! অথচ তার আশেপাশে কোনো নেকড়ে বাঘ নেই।

আমেরিকায় শুরুতে বেশ অর্থকষ্টে ছিলাম। নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। একটা উদাহরণ দিয়ে পরিষ্কার করি। বড় মেয়ের প্রথম জন্মদিন। তারিখটা বেকায়দা ধরনের, ২৮ আগস্ট মাসের শেষদিকে। বেতনের চেক পেতে আরো তিনদিন লাগবে। হাতের সব ডলার শেষ। মেয়ের মা’র মেয়ের প্রথম জন্মদিন নিয়ে নানান পরিকল্পনা। আমি উপহার কিনে নিয়ে এলাম দুই কেজি ময়দা। মেয়ে ময়দা ছানতে পছন্দ করে।

আমি প্যাকেট খুলে মেয়ের চারপাশে ময়দা বিছিয়ে দিলাম। সে মহানন্দে দুই হাতে ময়দা ছানাছানি করতে লাগল। সে আনন্দে যতই হাসে, তার মা দুঃখে ততই কাঁদে। মেয়ের প্রথম জন্মদিনে দুই কেজি ময়দা! তার কষ্ট দেখে আমি বলেছিলাম, দোয়া করছি যেন তোমার সব ছেলেমেয়ে থাকে দুধেভাতে। যেন তারা কখনো অর্থকষ্টে না পড়ে। পরম করুণাময় আমার প্রার্থনা শুনেছেন। গুলতেকিন আমার অর্থকষ্ট লাঘবের জন্যে কাজে নেমে পড়ল। বেবি সিটিং করে। পত্রিকার অ্যাড দেখে কাপড় এনে রিফু করে দেয়। এইসব বিষয় অন্য বইগুলিতে বিস্তারিত লিখেছি বলে এখানে আর লিখলাম না।

এই সময় একটা ঘটনা ঘটল। আমার প্রফেসর একদিন আমাকে ডেকে বললেন, তোমার কর্মকাণ্ডে আমি যথেষ্ট অসুখী (Very unhappy). তোমার টিচিং অ্যাসিসটেন্সশিপ বাতিল করা হলো। আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। এই লোক বলে কী? আমি খাব কী? প্রফেসর বললেন, যাও Mail fox চেক কর। আমাকে Blank took দেবে না। Studentদের Blank look আমার একেবারেই পছন্দ না। আমি মেইল বক্স চেক করতে গেলাম। সবার জন্যে আলাদা আলাদা মেইল বক্স। আমারটা খুলে একটা চিঠি পেলাম, তাতে লেখা তোমার Performance এ আমরা খুশি। তুমি যাতে মনেপ্রাণে Ph.D ডিগ্রির জন্যে কাজ করতে পার তার জন্যে তোমাকে স্কলারশিপ দেয়া হলো।

তোমাকে এখন আর টিচিং অ্যাসিসটেন্সশিপ করতে হবে না।স্কলারশিপের পরিমাণ ৫৫০ ডলার। টিচিং অ্যাসিসটেন্ট হিসেবে আগে পেতাম ৪৫০ ভলার।আমেরিকানরা মজা করতে পছন্দ করে। আমার প্রফেসর আমার সঙ্গে একটু মজা করলেন। এখানে যার কথা লিখছি তার নাম প্রফেসর Jeno Wicks. তিনি আমার Ph.D Guide ছিলেন না। তিনি ছিলেন বিভাগের চেয়ারম্যান। ফার্গো শহরে তাঁর ছবির মতো সুন্দর একটা বাড়ি ছিল।বাড়ির পেছনে ছিল সুইমিং পুল। তিনি আমেরিকান সব উৎসবে বিদেশী ছাত্রদের তার বাড়িতে দাওয়াত করতেন।

প্রচুর আয়োজন থাকত। তার যুক্তি-বিদেশী ছেলেমেয়েগুলি নিজের দেশ ছেড়ে এখানে একা একা বাস করছে। তারা উৎসব উপলক্ষে কিছুক্ষণ আনন্দ করুক। গত বত্সর প্রফেসর জেনো উইকস মারা গেছেন। নর্থ ডেকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি তাদের বুলেটিনের মাধ্যমে জানিয়েছে, প্রফেসর জেনো উইকস তাঁর সমস্ত বিষয়সম্পত্তি ইউনিভার্সিটিকে দান করে গেছেন।আমি আমার এক জীবনে অনেক মহাপ্রাণ মানুষের সংস্পর্শে এসেছি। জীবনের এই সঞ্চয় তুচ্ছ করার মতো নয়।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *