রুবিনা মোবাইল হাতে রকিং চেয়ারে দুলছে। বেচারিকে দেখে মায়া লাগছে। কেউ তার পাশে নেই, অবশ্য সে চাচ্ছেও না কেউ তার পাশে থাকুক। তার বাবা-মা আমেরিকায় থাকলেও বেশ কিছু আত্মীয়স্বজন ঢাকায় থাকেন। পুলিশের একজন অ্যাডিশনাল আইজি তার চাচাতো ভাই। রুবিনা কারও সঙ্গেই যোগাযোগ করছে না।
রকিং চেয়ারের দুলুনি বন্ধ করে রুবিনা ডাকল, কাদের! কাদের সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত হলো। এখন তার হাতে তসবি। সে তসবি ঘোরাচ্ছে, কিন্তু মনে মনে কিছু পড়ছে না। পড়লে আমি বুঝতে পারতাম। কাদেরের কর্মকাণ্ডে আমি মজা পাচ্ছি। মৃত্যুর পরেও মজা পাওয়ার বিষয়টা নষ্ট হচ্ছে না, এটা ভালো।কাদের! সিগারেট নিয়ে আসো।এক কার্টুন নিয়ে আসি, ম্যাডাম?
আনো।সালমা দুই-একটা টুকটাক জিনিস চেয়েছে। চা-পাতা, চিনি, কফি। আনব? আনো।দুপুরে কি ঘরে পাক হবে, ম্যাডাম? পাক হবে না কেন? মানুষের মৃত্যু হয়, ক্ষুধার মৃত্যু হয় না।কাদের বলল, আপনার আর কিছু লাগবে ম্যাডাম?একটা পত্রিকা নিয়ে আসতে পারো, সকাল না কী যেন নাম?
সাতসকাল।হ্যাঁ, সাতসকাল। থাক, পত্রিকা আনতে হবে না।টাকা দেন, ম্যাডাম। দুই হাজার দিলেই চলবে।আমার খাটের ডান দিকের ড্রয়ারে টাকা আছে। তাড়াতাড়ি আসবে। আমার সিগারেট শেষ।ড্রয়ার খুলে কাদের ৫০ হাজার টাকার একটি বান্ডিল পেল। ব্যাংকের সাটা কাগজ নেই, বান্ডিল থেকে কিছু হয়তো খরচ হয়েছে। কাদের বান্ডিল নিয়ে বের হচ্ছে। আমি ‘চোর চোর’ বলে চিৎকার করছি। আমার চিক্কার রুবিনার কানে গেল না। যাওয়ার কথাও না।
আমি কাদেরের সঙ্গে আছি। কাদের লক্ষ্য করছে না আমাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন তাকে অনুসরণ করছে। সে ইন্সপেক্টর খলিলের লোক। তাকে রাখা হয়েছে বাড়ির ওপর নজরদারির জন্য। সে মোবাইলে খলিলের সঙ্গে যোগাযোগ করল।
কাদের রাস্তার পাশের এক চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়ানো। চায়ের অর্ডার দিয়েছে। কাদের সিগারেট খায় না। একটা সিগারেটও সে ধরিয়ে খুক খুক করে কাশল। সে ভয়াবহ আনন্দে আছে। মুক্তির আনন্দ।খুব ইচ্ছে ছিল কাদেরের সঙ্গে সঙ্গে থাকার। সেটা সম্ভব হলো না। আমি এখন পলিনের ঘরে। পলিন তার ফেসবুকে ইংরেজিতে তথ্য দিচ্ছে। তথ্যের বাংলাটা এমন:
আমার সত্ত্বাবার শবদেহ এখন বারান্দায় রাখা আছে। কফিনের ভেতর তিনি আছেন। আমার খারাপ লাগছে। কান্না পাচ্ছে। আমার এই সবাবা আমাকে খুব আদর করতেন। তিনি অত্যন্ত জ্ঞানী ছিলেন। আমাকে বিজ্ঞানের অনেক কিছু বলতেন। তিনি অঙ্ক করে একবার আমাকে দেখিয়েছেন যে ৩ সমান ২ হতে পারে। তিনি কীভাবে করেছিলেন আমার মনে নেই। তিনি বেঁচে থাকলে তাঁর কাছে শিখে নিতাম।
রুবিনা রান্নাঘরে, তার হাতে এক হাজার টাকার একটা নোট। রুবিনা সালমাকে বলল, আমাকে এক প্যাকেট সিগারেট এনে দাও, কাদের দেরি করছে। সিগারেট আনতে পারবে না? ড্রাইভার আসেনি। ড্রাইভার থাকলে তাকে পাঠাতাম।সিগারেট আনতে পারব আপা। আপনি গেটে দারোয়ানরে বলে দেন। দারোয়ান আটকাবে।বলে দিচ্ছি। তাড়াতাড়ি এসো। বেনসন অ্যান্ড হেজেস আনবে—লাইট।জি আচ্ছা। যাব আর আসব।সালমা তার ব্যাগ নিয়ে বের হলো। আর ফিরল না।
পলিনের ফেসবুকের আপডেট: আজ আমাদের বাসায় রান্না হয়নি। আমি আর মা অরেঞ্জ জুস এবং দুধ খেয়েছি। আর ডিম সিদ্ধ খেয়েছি। কাদের চাচা আর সালমা খালা বাজার করতে গিয়ে ফিরে আসেননি। মায়ের ধারণা, তারা দুজনেই পালিয়ে গেছে।সন্ধ্যাবেলা ডিবি ইন্সপেক্টর খলিল টেলিফোন করল। রুবিনা টেলিফোন ধরল। খলিল বলল, ম্যাডাম, আপনাদের বাড়ির কেয়ারটেকারকে মহাখালী বাসস্টেশন থেকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। তাকে থানা হাজতে নিয়ে যাব, না কি আপনার কাছে পাঠিয়ে দেব?
রুবিনা বলল, আমার কাছে পাঠিয়ে দিন।আপনার বাসার কাজের মেয়ে সালমার মোবাইল ফোন আমরা ট্র্যাক করছিলাম। তাকেও ধরা হয়েছে। তার ব্যাগে বেশ কিছু জিনিসপত্র পাওয়া গেছে। তাকেও কি পাঠিয়ে দেব।হ্যাঁ। রাতে রান্না করবে।খলিল বলল, ম্যাডাম, আমি আমার জীবনে অনেক অদ্ভুত মানুষ দেখেছি, আপনার মতো দেখিনি।
রুবিনা বলল, আমার চেয়েও অনেক অদ্ভুত আমার স্বামী। তিনি মারা গেছেন, তাঁর সব অদ্ভুতের সমাপ্তি হয়েছে। আমি কি আপনাকে একটা অনুরোধ করতে পারি? পারেন। স্বামীর ডেডবডি নিয়ে আমি বিপদে পড়েছি। ভালো বিপদে পড়েছি। আপনি কি কোনো গতি করতে পারেন? কী ধরনের গতি? ডেডবড়ি তাঁর গ্রামের বাড়িতে পাঠাতে পারেন? হ্যাঁ, পারি।সাসপেক্ট হিসেবে আপনারা কি আমাকে অ্যারেস্ট করবেন?
এখনো না। আপনি তো পালিয়ে যাচ্ছেন না, আমাদের নজরদারিতেই আছেন। তবে আপনার বন্ধু রবিউলকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। যাকে আপনি আদর করে রবি ডাকেন।ও, আচ্ছা।আপনার জন্য আরেকটি দুঃসংবাদ আছে। আপনার হাজব্যান্ডের বড় মামা কিছুক্ষণ আগে মারা গেছেন। সরি।রুবিনা বলল, আপনি সরি হচ্ছেন কেন? আপনি তো তাকে মারেননি।আপনাকে একটি দুঃসংবাদ দিয়ে কষ্টের কারণ হয়েছি বলে সরি বললাম।ঠিক আছে।
আমার কাছ থেকে আর কোনো সাহায্য কি আপনি চান।চাই। এনায়েত নামের একজনের টেলিফোন নাম্বার দেবেন বলেছিলেন। টেলিফোন নাম্বারটা চাই। তার আগে জানতে চাই আমি আপনার প্রধান সাসপেক্ট। আমাকে সাহায্য করতে চাচ্ছেন কেন? আপনার মতো রূপবতী একজন ফাঁসিতে ঝুলবে ভাবতে কষ্ট লাগছে বলেই হয়তো বলছি।আমি কুরূপা হলে কি এনায়েতের নাম্বার আপনি দিতেন না?
হয়তো না। নাম্বারটা লিখুন।একটু ধরুন, আমি কাগজ-কলম নিয়ে আসছি।রুবিনা কাগজ-কলম আনতে গেছে আমি আর্তচিৎকার করছি—রুবিনা ভুল করবে না। ভয়ংকর ফাঁদে পা দেবে না। খবরদার খবরদার খবরদার।রুবিনা শান্ত ভঙ্গিতে টেলিফোন নাম্বার লিখল। রুবিনা ফাঁদে পা দিতে যাচ্ছে, আমি তাকে আটকাতে পারছি না। আমি একজন অবজার্ভার ছাড়া কিছুই না। শুধু দেখা ছাড়া আমার কিছু করার নেই।রুবিনার ঠোটের ফাঁকে বাঁকা হাসি। এই হাসি আমার পরিচিত। কোনো দুষ্টু বুদ্ধি তার মাথায় এসেছে। ভয়ংকর কোনো দুষ্টু বুদ্ধি। দুষ্টু বুদ্ধিটা কী হতে পারে।
রুবিনা এনায়েত নামের ডিবি পুলিশের এজেন্টের কাছে টেলিফোন করছে। আমি আতঙ্ক নিয়ে অপেক্ষা করছি।আপনি এনায়েত। হুঁ।শুনেছি, আপনি মানুষের দস্তখত নকল করতে পারেন। আসলেই কি পারেন?আপনার কী দরকার সেটা বলেন। ধানাই-পানাই কথা না। কাজের কথায় আসুন।আমার স্বামীর দস্তখত নকল করতে পারবেন?
না পারার কারণ দেখি না।একটা কাগজে লেখা থাকবে, আমার মৃত্যুর জন্য ডিবি ইন্সপেক্টর খলিল দায়ী। এর নিচে আমার স্বামীর দস্তখত করে দিবেন। পারবেন? দস্তখতের নমুনা ডিবি ইন্সপেক্টর খলিল সাহেবের কাছে আছে। তার কাছ থেকে নিয়ে নেবেন। এই কাজের জন্য কত টাকা নেবেন?
আমি বললাম, সাবাস।আফসোস আমার সাবাস বলাটা রুবিনা শুনতে পেল না। রুবিনার বুদ্ধিতে চমকৃত হয়ে আমি একজীবনে অনেকবার বলেছি, সাবাস।একবার আমার দামি একটা মোবাইল ফোন হারিয়ে গেল। মোবাইল ফোনটা বাথরুমের বেসিনের ওপর রেখে মুখ ধুয়ে শোবার ঘরে ঢুকেছি।
তখন মনে পড়ল মোবাইল ফোন বাথরুমে রেখে এসেছি। বাথরুমে ঢুকে দেখি ফোন নেই। শুধু বাথরুমে কেন সারা বাড়িতে কোথাও নেই।রুবিনা বলল, শোবার ঘরে আমি বসে আছি। তুমি বাথরুম থেকে বের হওয়ার পর সেখানে কেউ ঢোকেনি।আমি বললাম, মোবাইল ফোনটা বাথরুমের বেসিনে আমি রেখেছি। বেসিন সামান্য ভেজা ছিল, টাওয়েল দিয়ে মুছে তার ওপর রেখেছি।
রুবিনা বলল, তাহলে এই কাজটা তুমি করেছ তোমাদের ইউনিভার্সিটির বাথরুমে। তোমার ব্রেইন ইউনিভার্সিটির বাথরুম আর বাড়ির বাথরুমে গুলিয়ে ফেলছে। টেলিফোন করে খোঁজ নাও।খোঁজ নিয়ে ইউনিভার্সিটির বাথরুমে মোবাইল ফোন পাওয়া গেল। আমি মনে মনে বললাম, সাবাস! সন্ধ্যা ছয়টা।মাইক্রোবাসে করে আমার ডেডবডি গ্রামের বাড়ির দিকে রওনা হয়েছে। ড্রাইভারের পাশে বসেছে কাদের।
এক দিনে সে বুড়ো হয়ে গেছে। সোজা হয়ে হাঁটতে পারছে না, বাঁকা হয়ে হাঁটছে। কথাও পরিষ্কার বলতে পারছে না। সব কথাই জড়ানো। ধরা পড়ার পর পুলিশ তাকে ভালোমতো ডলা দিয়েছে। নিচের ঠোট কেটে ফুলে উঠেছে। এই ফোলা মনে হয় আরও বাড়বে। সে কেন পালিয়ে গিয়েছিল, এই ব্যাখ্যা রুবিনাকে দিতে গিয়েছিল। রুবিনা বলল, তোমার কথা পরে শুনব। তোমার স্যারের ডেডবডি নিয়ে রওনা হয়ে যাও।কী নিয়ে রওনা হব, ম্যাডাম?
তোমার স্যারের ডেডবডি।কাদের ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, ‘জি ম্যাডাম।‘ এমনিতেই সে আতঙ্কে ছিল, এখন সেই আতঙ্ক দশ গুণ বাড়ল। চোখ কোটর থেকে বের হওয়ার উপক্রম হলো।কাজের মেয়ে সালমা ফিরে এসেছে। যেন কিছুই হয়নি, এই ভাব নিয়ে সে রান্না বসাচ্ছে। একবার এসে বলে গেল, মরা বাড়িতে মাছ খাওয়া নিষেধ। ইলিশ মাছের বদলে ডিমের সালুন করি?
রুবিনা হাই তুলতে তুলতে বলল, যা ইচ্ছা করো।ডিবি ইন্সপেক্টর খলিল আমার স্টাডিরুমে। সেখানে সে কী করছে, কিছুই বুঝতে পারছি না। সেই ঘরটা দেখতে পাচ্ছি না। রুবিনাকে দেখতে পাচ্ছি, সে সন্ধ্যাবেলার শাওয়ার নিচ্ছে। পলিনকে দেখছি, সে কম্পিউটারে গেম খেলছে। গেমের নাম ‘ডায়মন্ড রাশ’। পলিনের সঙ্গে এই খেলা আমিও অনেকবার খেলেছি। অ্যাংকরের গোপন গুহায় ঢুকে হীরা সংগ্রহ করতে হয়।
নানা ঝামেলা আছে। মাথায় পাহাড় ভেঙে পড়ে, সাপ এসে ছোবল দেয়। আমি সব ঝামেলা এড়াতে পারি না। পলিন পারে।আমি এখন শীতার্ত। শরীর থাকলে বলতাম, শীতে শরীর কাঁপছে। শরীর নেই, তার পরও শীতের অনুভূতি। ভয় হচ্ছে, এই শীত কি আরও বাড়বে? যদি আরও বাড়ে, তখন কী হবে? তার চেয়ে বড় চিন্তা, আমার ডেডবডি কবর হয়ে যাওয়ার পর আমার কী হবে?
আমার অস্তিত্ব থাকবে, নাকি থাকবে না? কবরে নামানোর দৃশ্য কি আমি দেখতে পাব? এই দৃশ্যটা আমার দেখার শখ আছে।ইন্সপেক্টর খলিল টেলিফোনে জানিয়েছিল, বড় মামা মারা গেছেন। আমার জন্য এটা ছিল অতি আনন্দের সংবাদ। বড় মামার নিশ্চয়ই আমার অবস্থা হয়েছে। তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারব।
এখনো সেটা সম্ভব হয়নি। যে আমাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, সে বড় মামার সঙ্গে আমাকে দেখা করায়নি। সে কি আমাকে নিয়ে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা করছে? পরিকল্পনাটা কী? পুরো স্মৃতিশক্তি আমাকে দেওয়া হয়নি। আমাকে বিষ খাওয়ানোর বিষয় আমার মনে নেই। জুঁই নামের যে মেয়েটি রাত তিনটায় রুবিনাকে টেলিফোন করেছিল, তার কথা মনে নেই। পলিনের বাবা কে, তা-ও মনে নেই।
এমনকি হতে পারে যে আমাকে শুধু প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হচ্ছে? অপ্রয়োজনীয় তথ্য কম্পিউটারের ভাইরাসের মতো। অ্যান্টিভাইরাস প্রোগ্রাম। দিয়ে আটকে দেওয়া হচ্ছে। আদার রিয়েলিটি বইয়ে পড়েছিলাম, মানুষ, জীবজন্তু, গাছপালা—সবই হলো ম্যাট্রিক্স ছবিটার মতো, কম্পিউটারের খেলার মতো ভারচুয়াল গেম। আমরা একজন মাস্টার প্রোগ্রামের তৈরি বিনোদন খেলা।
রুবিনা মেয়েকে নিয়ে চা খেতে বসেছে। রুবিনা যথারীতি এক পট চা নিয়ে বসেছে। পিরিচে কাটা আপেল, মাখন লাগানো টোস্ট বিস্কুট। ছোট্ট গ্লাসে বেদানার রস। রুবিনা চোখমুখ কুঁচকে বেদানার রস খেল। পলিন বলল, বেদানার রস তুমি পছন্দ করো না?
করি তো? তা হলে খাওয়ার সময় মুখ কুঁচকাও কেন? রুবিনা বলল, কষ্টা, এই জন্য পছন্দ করি না।তা হলে খাও কেন? প্রচুর ভিটামিন-ই আছে, এই জন্য খাই। অ্যান্টি-এজিং প্রপার্টি আছে।বেদানার রস খেলে তোমার বয়স বাড়বে না? ধীরে বাড়বে।তুমি কি অনেক দিন বেঁচে থাকতে চাও?
সবাই চায়।আমি চাই না।অল্প বয়সে মরে যেতে চাও? হুঁ। ওই লোক বাবার স্টাডিরুমে এতক্ষণ ধরে কী করছে? রুবিনা চমকে উঠে বলল, বাবা বলছ কেন? তুমি তো ওকে কখনো বাবা ডাকতে না।মনে মনে ডাকতাম। এখন উনি মারা গেছেন, তাই মনে মনে না ডেকে ঠিকমতো ডাকছি।তুমি তাকে পছন্দ কর?
হুঁ। তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছ না কেন? ওই লোকটা বাবার স্টাডিরুমে ঢুকে কী করছে? তার কাগজপত্র, ডায়েরি—এই সব ঘাঁটাঘাঁটি করছে।কেন? সে ডিবি পুলিশের লোক। তার ধারণা, তুমি এখন যাকে বাবা ডাকছ, তাকে খুন করা হয়েছে। এই বিষয়ে তদন্ত করছে।কে খুন করেছে? এখনো সে বের করতে পারেনি।বের করতে পারবে?
জানি না পারবে কি না।শার্লক হোমস থাকলে পারত। শার্লক হোমসের অনেক বুদ্ধি। তুমিও পারবে, তোমার অনেক বুদ্ধি। মা, তুমি কি জান, কে খুন করেছে? না।ওই লোক কি জানে? সে-ও জানে না। তবে তার ধারণা, আমি খুন করেছি।মা, তুমি কি করেছ? না, আমি খুন করিনি। তুমি আমার কথা বিশ্বাস করেছ?
পলিন সঙ্গে সঙ্গে বলল, করেছি। কারণ, তুমি কখনো মিথ্যা বল না।রুবিনা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, তুমি যাকে এখন বাবা ডাকছ, এই মানুষটা পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত ভালো মানুষ। বিবাহিত জীবনে কখনো কোনো বিষয় নিয়ে আমার সঙ্গে রাগ করেনি।বাবা যে ভালো মানুষ, এটা আমি জানি। কম্পিউটার গেমের সাপগুলোও জানে। তারা সহজে বাবাকে ছোবল দিতে চায় না।
আমি এখন আর রুবিনা ও পলিনকে দেখতে পাচ্ছি না। রুবিনা ও পলিন এই মুহূর্তে যে কথাটি বলল, তা আমাকে জানানোর জন্যই হয়তো এই দুজনকে এতক্ষণ দেখছিলাম। আমাকে জানানো শেষ হয়েছে বলে এদের দেখছি না। আমি দেখছি খলিলকে। সে বইয়ের তাকের পেছন থেকে ছোট্ট একটা শিশি উদ্ধার করেছে। শিশির গায়ে লেখা, ‘উইপোকার বিষ’। শিশির অর্ধেকটা খালি। খলিল খুব সাবধানে পলিথিনের ব্যাগে শিশি ভরে পকেটে রাখল।
তাকে অসম্ভব চিন্তিত মনে হচ্ছে। যে বিষ খাইয়ে হত্যা করবে, সে বিষের শিশি ফেলে যাবে না। তবে অসম্ভব বুদ্ধিমতী রুবিনা এই কাজটি করতে পারে।খলিল ভাবছে, এই মহিলার সঙ্গে কথাবার্তায় আরও সাবধান হতে হবে। ছোটখাটো ফাঁদ পেতে একে ধরা যাবে না। তার জন্য লাগবে বড় ফাঁদ। এনায়েতের ব্যাপারটা এই মেয়ে যেভাবে হ্যান্ডেল করেছে, তা বিস্ময়কর।
খলিল এখন আমার ডায়েরির পাতা উল্টাচ্ছে। এখানে সে কিছুই পাবে না। আমি ডায়েরিতে ব্যক্তিগত কিছুই লেখি না। কোয়ান্টাম জগতের রহস্যময়তা নিয়ে লেখি। অঙ্কের কিছু প্যারাডক্স লেখা হয়েছে। প্যারাডক্সগুলো পলিনের জন্য লেখা। সে অত্যন্ত পছন্দ করে। এই মুহূর্তে খলিল আগ্রহ নিয়ে অঙ্কের একটা প্যারাডক্স দেখছে। আমি লিখেছি:
৩৬ ইঞ্চি=১ গজ
উভয় পক্ষকে ৪ দিয়ে ভাগ দিলাম
৯ ইঞ্চি = ১/৪ গজ
উভয় পক্ষে বর্গমূল করা হলো
৯ = ১/৪
তাহলে দাঁড়ায়
৩ = ১/২
অর্থাৎ ৬ ইঞ্চি = ১ গজ
একটু আগে দেখানো হয়েছে, ৩৬ ইঞ্চি সমান এক গজ। এখন অঙ্কে প্রমাণ করা হলো ৬ ইঞ্চি সমান এক গজ। কী করে সম্ভব? খলিল মাথা চুলকাচ্ছে। কাগজ-কলম নিয়ে বসেছে। প্যারাডক্স মাথায় ঢুকে গেছে। অতি সামান্য প্যারাডক্সে সে অস্থির, আর আমি ঢুকে গেছি প্যারাডক্সের মহাসমুদ্রে।খলিল ও রুবিনা বসার ঘরে। রুবিনা ব্যস্ত নখে নেলপলিশ দেওয়া নিয়ে।
অ্যাশট্রের এক কোনায় তার ধরানো সিগারেট পুড়ছে। সিগারেটের ভেতর গাঁজা ভরা আছে। বিকট গন্ধ আসছে। রুবিনার হাতে নেলপলিশের ব্রাশ। আমি দুজনকে দেখছি। রুবিনা কী ভাবছে, বুঝতে পারছি না। খলিলের চিন্তা ধরতে পারছি। রুবিনার চিন্তা-কল্পনা ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। এমন সময় কি আসবে যে আমি দেখতে পাব; কিন্তু কে কী বলছে, তা শুনতে পাব না? মৃতের জগৎ পরাবাস্তব জগৎ। বাস্তবতা ব্যাপারটাই অবশ্য অত্যন্ত ধোঁয়াটে।
ক্লাসে বাস্তবতা নিয়ে আমি একবার একটা বক্তৃতা দিয়েছিলাম। আমার বক্তৃতার বিষয় ছিল বাস্তবতার বিষয়টি মানুষের মস্তিষ্ক তৈরি করে। রেটিনা থেকে ইনফরমেশন মস্তিষ্কে যায়। মস্তিষ্ক তা প্রসেস করে আমাদের যা দেখায়, তা-ই আমাদের কাছে রিয়েলিটি। প্রসেসিং প্রক্রিয়ায় সামান্য ত্রুটি হলে রিয়েলিটি অন্য রকম হবে। আমরা যা দেখছি, তা-ই বাস্তব মনে করার কিছু নেই। আমাদের মস্তিষ্ক যা ভাবতে বাধ্য করছে, তা-ই বাস্তব।ক্লাসের একটি মেয়ে প্রশ্ন কলল, স্যার, আমি যে ক্লাসে বসে আছি, এটা কি বাস্তব?আমি বললাম, তোমার নাম কী?
সে বলল, বকুল।আমি বললাম, আমাদের মস্তিষ্ক এমন ট্রিক করতে পারে যে ফুলের নামে যাদের নাম, তাদের দেখামাত্র সেই ফুলের গন্ধে চারদিক ম ম করতে থাকবে। মস্তিষ্ক এই রিয়েলিটি তৈরি করছে, যা মূল রিয়েলিটির বাইরে।আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই ক্লাসের একজন ছাত্র মুখ শুকনা করে বলল, স্যার, ওর গা থেকে গোবরের গন্ধ আসছে। সে কি তাহলে গোবর? সবাই হো হো করে হাসতে শুরু করল। সবার আগে হাসল বকুল। আমার হাসি এল না। ক্লাসভর্তি ছাত্রছাত্রীর হাসির শব্দে মাথা গমগম করতে লাগল।
এখন আবার হাসির শব্দ শুনছি। ত্রিশ-চল্লিশজন ছাত্রছাত্রীর হাসির শব্দ নয়। হাজার হাজার মানুষের চাপা হাসি। কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। কী ঘটতে যাচ্ছে, বুঝতে পারছি না। আমি কি অন্য কোনো বাস্তবতায় ঢুকতে যাচ্ছি? হাসির শব্দ ছাপিয়ে রুবিনার গলা শুনলাম, স্টাডিরুমে কিছু পেয়েছেন? ইনসেকটিসাইডের একটা বোতল পেয়েছি। বোতলে কী আছে, তা জানার জন্য ল্যাবরেটরিতে পাঠাব।খাতাপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে কিছু পাননি? না। আমি আপনার মেয়ে পলিনকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই।
আজ বাদ থাক। আরেক দিন করুন। তার বাবার ডেডবডি সারা দিন বারান্দায় পড়ে ছিল। সে সংগত কারণেই আপসেট।খলিল বলল, আমি যত দূর জানি, ইফতেখার সাহেব তার বাবা নন।বাবা না হলেও পলিন তাকে বাবা ডাকা শুরু করেছে। আগে ডাকত না। আজ থেকে ডাকছে। পলিনকে প্রশ্ন না করে আপনি আমাকে প্রশ্ন করুন। যত ইচ্ছা করুন। আমি মিথ্যা কথা বলি না।যারা মিথ্যা বলে না, তারা খুবই বিপজ্জনক।কোন অর্থে?
তারা যখন একটা-দুটো মিথ্যা বলে, তখন সেই মিথ্যাকে সত্য ধরা হয়। এক হাজার ভেড়ার পালে একটা নেকড়ে ঢুকে পড়ার মতো। এক হাজার সত্যির মধ্যে একটা মিথ্যা। ভয়ংকর মিথ্যা।রুবিনা হাসল। খলিলের উপমা তার পছন্দ হয়েছে। খলিল বলল, আপনার সঙ্গে রবিউল সাহেবের যে বন্ধুত্ব, তা আপনার স্বামী কীভাবে দেখতেন?
কোনোভাবেই দেখত না। সে জানত, রবির সঙ্গে আমার কোনো বন্ধুত্ব নেই। রবি অতি কর্মঠ একজন। সর্বকর্মে পারদর্শী। তাকে দিয়ে আমি নানা কাজ করিয়ে নিতাম। বিনিময়ে সামান্য অভিনয়।‘বিনিময়ে সামান্য অভিনয়’ ব্যাপারটা বুঝলাম না।ভাব করা যে, আমি তাকে অসম্ভব পছন্দ করি। হয়তো বা গোপনে ভালোবাসি। বিবাহিত হওয়ায় বাধা পড়ে গেছি। নয় তো তার সঙ্গে ভেগে যেতাম।অভিনয় করে আপনি কাজ আদায় করে নেন?
অভিনয় ছাড়াও আমি কাজ আদায় করতে পারি, অন্যকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে পারি। যেমন, আপনাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিলাম। আপনি মাইক্রোবাসের ব্যবস্থা করলেন, একজন পুলিশ দিলেন। কোনো সমস্যা ছাড়াই আমার স্বামীর ডেডবড়ি গ্রামের বাড়িতে রওনা হয়ে গেল।
আপনার স্বামী যে রাতে অসুস্থ হয়ে পড়লেন, সে রাতের ঘটনা বলুন। কোনো কিছু বাদ দেবেন না বা কোনো কিছু যুক্ত করবেন না।ক্ষুদ্র ডিটেইলসও কি বলব? হ্যাঁ, বলবেন।রাত ১০টার পর থেকে বলা শুরু করি। তার আগে থেকে বলার কিছু নেই।করুন। নেলপলিশ দেওয়া শেষ করে বলুন। আমি চাই, কথা বলার সময় আপনি আমার চোখের ওপর চোখ রাখবেন। কেউ অন্যদিকে তাকিয়ে কথা বললে আমার অস্বস্তি লাগে।
Read more
