মাতাল হাওয়া পর্ব:১৩ হুমায়ূন আহমেদ

মাতাল হাওয়া

ভাদু মিয়াও শব্দ করছে। সে কুড়াল দিয়ে কাঠ ফেড়ে রান্নার খুড়ি বের করছে। কেউ তাকে কাঠ ফাড়তে বলেনি। বিশ্বাস অর্জনের জন্যে নিজ থেকে আগ্রহ নিয়ে এইসব কাজ করতে হয়। সবচেয়ে বেশি যা দরকার তা হলো নিজেকে বোকা হিসেবে দাঁড় করানো। বুদ্ধিমানকে কেউ বিশ্বাস করে না। বোকাকে বিশ্বাস করে। বোকা সাজা কঠিন কোনো কাজ না।

প্রণব গায়ে তেল মাখছিলেন। কাঠ ফাড়া শেষ করে ভাদু প্রণবের সামনে দাঁড়াল। প্রণব বললেন, কিছু বলবি? ভাদু বলল, গায়ে তেল দিয়া দেই? না। মুসলমানের হাতের ভলা নেওয়া নিষেধ। মন্ত্র নিয়েছি তো। মন্ত্র নেওয়ার পর নানান বিধিনিষেধ।মন্ত্র কী? ঈশ্বরের নাম। কানে একটা নাম গুরু দিয়ে দেন। সেই নাম জপ করতে হয়।কী নাম? কী নাম সেটা তো বলতে পারব না। নিষেধ আছে।আমি কাউরে বলব না।নাম জেনে তুই করবি কী? নাম জপ করবি?

ক্যামনে জপ করতে হয় শিখায়া দিলে করব। কাজ শিখায়া দিলে আমি পারি। না শিখাইলে পারি না।কথাবার্তা শুনে তোকে তো বিরাট গাধা মনে হচ্ছে।অদু বলল, জে-না আমি গাধা না। আমার বুদ্ধি আছে। আপনার শইলে তেল ডইলা দেই? একবার তো বলেছি, না।আরাম পাইবেন।গাধা চুপ কর।ভাদু মনে মনে হাসল। তার গাধা পরিচয়টা দ্রুত স্থায়ী করতে হবে। গাধা সাজতে হলে একই কথা কমপক্ষে তিনবার বলতে হবে।

শরীরে তেল মাখার কথা দু’বার বলা হয়েছে। আরও একবার বলা দরকার। তৃতীয়বারের জন্যে ভাদু অপেক্ষা করছে। অপেক্ষাতেই আনন্দ।পাংখাপুলার রশিদ এসে প্রণবের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, বড় সাব আপনেরে ডাকে।প্রণব বিরক্ত হয়ে বললেন, কানাকানি করতেছ কেন? উনি আমারে ডাকেন এইটা গোপন কোনো কথা না। মেয়েছেলে কানে কথা বলতে পছন্দ করে। তুমি মেয়েছেলে না।

ভাদু আনন্দিত গলায় বলল, অত্যধিক সত্য কথা। সে মেয়েছেলে না।প্রণব বলল, এই বেকুব, সব কথায় কথা বলবি না।ভাদু হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।হাবীব বারান্দার ইজিচেয়ারে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। পাশেই মোড়া পাতা। এতক্ষণ মোড়ায় লাইলী বসে ছিলেন। উনি উঠে যাওয়াতে মোড়া খালি। প্রণব মোড়ায় বসতে বসতে বলল, স্যার আমাকে ডেকেছেন? হুঁ। সীতা মেয়েটার সন্ধান পাওয়া গেছে।প্রণব বলল, সীতা কে?

হাবীব বিরক্ত হয়ে বললেন, সাত খণ্ড রামায়ণ নিজে লিখে এখন বলো সীতা কে? সীতা নারায়ণ চক্রবর্তীর মেয়ে যাকে উদ্ধারের জন্যে তুমি আমার পায়ে ধরলা।প্রণব লজ্জিত গলায় বলল, ভুলে গেছি।হাবীব হাই তুলতে তুলতে বললেন, এখন মেয়েটার কী ব্যবস্থা করবে করো।প্রণব বলল, আমি কী ব্যবস্থা করব? মেয়ের বাবা-মা ব্যবস্থা করবে।

হাবীব বললেন, মেয়েটার বাবা-মা কোনো ব্যবস্থা নিবে না। মেয়ের কারণে তারা পতিত হয়েছে। মেয়ে নারায়ণগঞ্জের টানবাজারে ছিল। টানবাজার কী জানো? না।বেশ্যাপল্লী। যে মেয়ে বেশ্যাপল্লীতে ছিল, তোমাদের সমাজে তার জায়গা নাই। কথা কি ঠিক? প্রণব বলল, মেয়েটা আছে কোথায়? থানা হাজতে। ওসি সাহেব মেয়ের বাবার সঙ্গে কথা বলেছেন, তার মায়ের সঙ্গেও কথা বলেছেন। তারা মেয়েকে নিবে না। এখন তুমি বলো কী করা যায়?

প্রণব বলল, আমি কী বলব স্যার? আমি বাক্যহারা হয়েছি।আমি ওসি সাহেবকে বলেছি মেয়েটাকে আমার এখানে দিয়ে যেতে। রাত এগারোটার দিকে আসবে। তুমি মেয়েটাকে চেম্বারে বসাবে। তুমি তার সঙ্গে কোনো কথা বলবে না। যা বলার আমি বলব। আমাকে খবর দিয়ে নিয়ে যাবে। আমি ওসি সাহেবের সঙ্গে এখন কোনো কথা বলব না। তাকে চলে যেতে বলবে।

চেম্বারে সব ক’টা দরজা-জানালা বন্ধু। একটা দরজা খোলা। সেখানে পর্দা দেওয়া। বাইরের বাতাসে পর্দা কাঁপছে। টেবিলে রাখা দুটা মোমবাতির শিখাও কাঁপছে। মোমবাতি ছাড়া ঘরে একটা হারিকেনও আছে। কারেন্ট নেই। মোমবাতি এবং হারিকেনের আলোয় অন্ধকার কমছে না।

সীতা চাদরে নিজেকে সম্পূর্ণ ঢেকে জড়সড়ো হয়ে বসে আছে। তার চোখে আতঙ্ক ছাড়া কিছু নেই। মাঝে মাঝে সে কাঁপছে। তার দৃষ্টি মোমবাতির দিকে। দমকা বাতাসে একটা মোমবাতি নিভে গেল। সীতা প্রবলভাবে কাপল এবং অস্ফুট শব্দ করল, আর তখনই হাবীব ঢুকলেন।

তোমার নাম সীতা?সীতা জবাব দিল না। তার দৃষ্টি এখনো মোমবাতির শিখার দিকে।তোমার বাবা মা তোমাকে নিতে রাজি না–এই খবর পেয়েছ? সীতা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।হাবীব বললেন, তুমি আমার এখানে থাকবে। আমার কোনো অসুবিধা নাই। থাকবে? সীতা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। হাবীব বললেন, আমার একটা বুদ্ধি শোনা, কলমা পড়ে মুসলমান হয়ে যাও। হিন্দুর গায়ে যতটা দোষ লাগে, মুসলমানের লাগে না। মুসলমান হবে?

সীতা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।হাবীব বললেন, তোমার বয়স অল্প। মাঝে মাঝে অল্প বয়সে বড় সিদ্ধান্ত নিতে হয়। শম্ভুগঞ্জের পীরসাহেব আগামী বুধবার আসবেন। তার কাছে তুমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবা। তোমার নতুন একটা নাম লাগবে। তোমার নাম দিলাম হোসনা। হোসনা শব্দের অর্থ সৌন্দর্য। তোমার চেহারা সুন্দর, এই জন্যেই হোসনা নাম।

বাতাসে দ্বিতীয় মোমবাতিটাও নিভে গেল। সীতা আবারও চমকে উঠে অস্ফুট শব্দ করল।শম্ভুগঞ্জের পীরসাহেব এসেছেন। তিনি রোজা ছিলেন। সন্ধ্যাবেলা ইফতার করে মাগরেবের নামাজ পড়লেন। নামাজের শেষে ঘোষণা করলেন এশার নামাজের পর বেতরের নামাজ পড়বেন। তারপর হিন্দু কন্যাকে মুসলমান বানানোর প্রক্রিয়া শুরু করবেন। কন্যাকে বড়ইপাতা ভেজানো পানি দিয়ে গোসল দিতে হবে। নখ কাটতে হবে।

সীতাকে গোসল দেওয়া হলো। সে জলচৌকিতে পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল। পীরসাহেব সীতার সঙ্গে কিছু কথা বলার চেষ্টাও করলেন। তিনি একতরফা বললেন, সীতা শুধু শুনে গেল।কোরানপাঠ শিখবে। রোজ ফজরের নামাজের পর পাক কোরান পাঠ করবে। কোরানপাঠ শিখে নিবে।হায়াজ নেফাসের পর অপবিত্র চুল সব ফেলতে হবে। একটা চুল থাকলেও শরীর শুদ্ধ হবে না।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে পীরসাহেব গলা নামিয়ে আরও কিছু কথা বললেন! সবই অত্যন্ত অশ্লীল কথা। কোনোভাবেই একটি মেয়েকে বলা যায় না। পীরসাহেব অবলীলায় বলে গেলেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি নোংরা কথাগুলি বলে আনন্দ পাচ্ছেন।এশার নামাজের পর হাজেরা বিবি ভীষণ হৈচৈ শুরু করলেন। হাবু রে, হাবু রে, হাবু রে।হাবীব মার কাছে গেলেন। শান্তগলায় বললেন, মা, তোমার সমস্যা কী?

হাজেরা বিবি বললেন, সমস্যা আমার না। সমস্যা তোর। শুনলাম নটিপাড়ার এক হিন্দু নটি মেয়ে তুই নিয়া আসছস। তারে এখন মুসলমান বাইনতাছস। নটির আবার হিন্দু-মুসলমান কী? নটি হইল নটি।মা চুপ করো।আমি চুপ করব না। তুই চুপ কইরা আমার কথা গুন। শম্ভুগঞ্জের বদ পীরটারে হাছুনের বারি দিয়া বিদায় কর।কেন? এই পীররে অনেক দিন ধইরা আমি লক্ষ করছি। হে মেয়েছেলের চোখের দিকে কোনো সময় তাকায় না। তাকায় বুকের দিকে।মা! তোমার যন্ত্রণায় আমি অস্থির।

তুই আমার যন্ত্রণায় অস্থির না। আমি তোর যন্ত্রণায় অস্থির। তুই এক্ষণ বুনিচাটা পীর বিদায় করবি। কতবড় হারামজাদা! চউখ দিয়া বুনি চাটে। মেয়েটা কি সফুরা? ফরিদের বউ! কিছুক্ষণের জন্যে হাবীব বিভ্রান্ত হলেন। ভ্রান্তি কাটতে সময় লাগল না। মেয়েটা সফুরাই। হলুদ চাদরে শরীর ঢেকে রেখেছে। চাদর থেকে হলুদ আভা পড়েছে মুখে। সামান্য আলোছায়া কী করতে পারে ভেবে হাবীব যথেষ্ট বিস্ময় বোধ করলেন। সফুরা রূপবতী, কিন্তু এতটা রূপবতী না যে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না। অতি রূপবতীরা বর পায় না। সফুরা বর পেয়েছে। কাজেই সে অতি রূপবতীর একজন না। হাবীব কোর্টের কর্মকাণ্ডে মন দেওয়ার চেষ্টা করলেন।

কোর্টের অবস্থা গ্রামের হাটের মতো। লোকজন ঢুকছে, বের হচ্ছে। আঙুলের ডগায় চুন নিয়ে পান চিবুচ্ছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানতে টানতে উঁকি মেরে দেখছে কোর্টরুমে কী ঘটছে।টাকাপয়সার লেনদেন নিয়ে বারান্দায় মারামারি বেধে গেল। হুটাপুটি শব্দ। গালাগালি। শুরুটা দুজনের মধ্যে। কিছুক্ষণের মধ্যে তিন-চারজন যুক্ত হয়ে গেল। তীক্ষ্ণ চিৎকারে কেউ একজন বলল, মাইরালছে রে। আমারে মাইরালছে। এর মধ্যেই কোর্টে বিচারকার্য শুরু হলো।

আসামি ফরিদ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে। হাবীব লক্ষ করলেন, সে বেশ রোগা হয়ে গেছে। চোখের নিচে কালি। সে তাকিয়ে আছে সফুরার দিকে। অবাক হয়ে স্ত্রীকে দেখছে। একবার হাবীবের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে সালামের ভঙ্গি করল। কাজটা ভুল। কোর্টরুমে তিনি ফরিদের পরিচিত কেউ না।

হাবীব তার পাশে বসা প্রণবের দিকে তাকিয়ে বললেন, খবরের কাগজ পড়া এখন বন্ধ রাখে।প্রণব বললেন, গরম খবর আছে।যত গরম খবরই থাকুক কাগজ বন্ধ।প্রণব কাগজ বন্ধ করলেন। হাবীব নিচুগলায় বললেন, ফরিদের স্ত্রী সফুরা এখন ধীকে কই? আমাদের কাছে থাকে।তারে কখনো দেখি না কেন?

নিজের মনে থাকে। পোয়াতি মেয়েছেলেরা পুরুষের সামনে আসতে লজ্জা পায়।তারে বলবা যেন আমার সঙ্গে দেখা করে। এখন বলব? না, সে বাড়িতে যাক তারপর বলবা। কোনো কাজে হুটহাট আমার পছন্দ।প্রণব কানেকানে বললেন, স্যার লক্ষ করেছেন মেয়েটা এখন কেমন সুন্দর হয়েছে। শাস্ত্রে বলে স্বামী যদি দীর্ঘদিনের জন্যে পরবাসে যায় তাহলে পরবাস যাওয়ার প্রাক্কালে স্ত্রীর চেহারা পূর্ণশশীর মতো হয়।

হাবীব বললেন, এখন চুপ করো।পাবলিক প্রসিকিউটর জেরা করার জন্য এগিয়ে আসছে। হাবীব বিরক্তি নিয়ে তাকালেন। পাবলিক প্রসিকিউটরের নাম হারুন। বয়স অল্প, কিন্তু কথার মারপ্যাঁচ ভালো শিখেছে। অতি বুদ্ধিমান। লম্বায় খাটো। কোর্টে তার নামে প্রচলিত ছড়া হলো —বাইট্যা হারুন চাইট্যা খায়। হাবীব বললেন, হারুন কি বিবাহিত? প্রণব বললেন, বাঁটকুটারে বিয়ে করবে কে? স্যার কি জানেন, ইবলিশ শয়তান বাঁটি ছিল?

না।আমি বইয়ে পড়েছি, এইজন্যেই কথায় আছে, বাঁটি শয়তানের লাঠি।এখন চুপ থাকো। বাঁটুটা সওয়ালজবাব কী করে শুনি।হাবীবের সিগারেটের তৃষ্ণা হয়েছে। তিনি পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিয়ে সিগারেটের প্যাকেট স্পর্শ করলেন। তাঁর মনে হলো, কোর্টরুমে সিনিয়র আইনজীবীদের এবং জজ সাহেবের সিগারেট খাওয়ার অনুমতি থাকলে ভালো হতো। প্রায় সময়ই জটিল মামলায় চিন্তার গিট্টু লাগে। সিগারেটের ধোঁয়া সেই গিট্টু খুলতে পারে।আপনার নাম ফরিদ?

জি।আপনি ভালো আছেন? জি।মুখে বলছেন ভালো আছেন। আপনি তো ভালো নাই। আপনার চোখ লাল। চোখের নিচে কালি। রাতে তো আপনার ঘুম হয় না।হাবীবের ইশারায় তার জুনিয়র আব্দুল খালেক বললেন, অবান্তর প্রশ্ন। অবজেকশন ইউর অনার।

হারুন বলল, অবজেকশন যখন উঠেছে তখন এই বিষয়ে কথা বলব না। আমি স্বাভাবিক সৌজন্যে প্রশ্ন করেছি।মূল প্রশ্নে যান। আমি ভালো আছি, তুমি কেমন আছ?—এইসব বাদ থাক।কোর্টরুমে হাসির শব্দ উঠল অনেকেই হাসছে, তাদের সঙ্গে হারুনও হাসছে। হঠাৎ সে হাসি থামিয়ে বলল, ফরিদ সাহেব, আপনি গল্প-উপন্যাস পড়তে পছন্দ করেন, তাই না?

জি।আমি খোঁজ নিয়েছি জেলখানার লাইব্রেরি থেকে আপনি প্রায়ই বই নিয়ে পড়েন। গতকাল রাতে কি কোনো বই পড়েছেন? আব্দুল খালেক বললেন, অবজেকশন ইউর অনার। অবান্তর প্রশ্ন। জজ সাহেব কিছু বললেন না। তাকে খানিকটা কৌতূহলী মনে হলো ফরিদ বলল, রবি ঠাকুরের লেখা একটা বই পড়েছি স্যার নাম নৌকাডুবি’।কবিতার বই? জি-না স্যার। উপন্যাস। ঘটনাটা বলব?

ঘটনা বলার প্রয়োজন নাই। একটা বিষয় জানতে চাই, আপনি যখন হাজি রহমতু রাজা চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে ছিলেন তখন কি বই পড়ার সুযোগ ছিল? জি না।আপনার বক্তব্য অনুযায়ী আপনি তার সঙ্গে তিন বছর ছিলেন। তাহলে ধরে নিতে পারি এই তিন বছর বই পড়তে পারেন নাই।ফরিদ জবাব দিল না। হারুন বলল, ময়মনসিংহ পাবলিক লাইব্রেরিতে অনেক বই, এই তথ্য কি আপনি জানেন?

জানি।কীভাবে জানেন? পাবলিক লাইব্রেরিতে বই পড়তে যাওয়ার অভ্যাস কি ছিল?ফরিদ অস্বস্তি নিয়ে জজ সাহেবের দিকে তাকাল। তাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে সে কথা খুঁজে পাচ্ছে না।আপনি তো সবসময় হাজি সাহেবের সঙ্গেই থাকেন। তাই না? জি।হঠাৎ হঠাৎ উনি যখন ময়মনসিংহ আসেন, তখন আপনিও আসেন।জি।ক্ষিতিশ বাবু নামে কাউকে চিনেন?

ফরিদ বিড়বিড় করে বলল, চিনি না।মনে করার চেষ্টা করুন। উনি ময়মনসিংহ পাবলিক লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান।চিনি না স্যার।হারুন বলল, আপনি বলছেন চেনেন না, কিন্তু ক্ষিতিশ বাবু ভিন্ন কথা বলেন। তার ভাষ্যমতে আপনি নিয়মিত লাইব্রেরি থেকে বই আনা নেওয়া করেন। আপনি শরৎচন্দ্রের লেখা ‘বিন্দুর ছেলে’ বইটা পড়েছেন? জি পড়েছি।পাবলিক লাইব্রেরি থেকে নিয়ে পড়েছেন?

ইয়াদ নাই।আপনি সর্বশেষ এই বইটা ইস্যু করেছেন। আপনি থাকেন এক জায়গায়, বই আনা নেওয়া করেন আরেক জায়গায়। ঘটনা কী? ফরিদ টোক গিলল। তাকাল হাবীবের দিকে। তার চোখে হতাশা।ঘটনা কি এরকম যে, অন্য একজন খুন করেছে আপনি তার দায়ভাগ সেধে নিচ্ছেন, বিনিময়ে অর্থ পাচ্ছেন?

ফরিদ অস্পষ্ট গলায় বলল, পানি খাব স্যার। তিয়াস লাগছে। জজ সাহেব ইশারায় পানি দিতে বললেন। টিনের গ্লাসে তাকে পানি দেওয়া হলো। ফরিদ তৃষ্ণার্তের মতো পানি খাচ্ছে না। চা খাওয়ার মতো খাচ্ছে।হারুন বলল, আদালতের কাছে আমি ক্ষিতিশ বাবুকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত করার অনুমতি প্রার্থনা করছি। জজ সাহেব হ্যা-সূচক মাথা নাড়লেন।

হাবীব উঠে দাঁড়ালেন। হারুন বিপদজনক দিকে যাচ্ছে। ক্ষিতিশ বাবু, লাইব্রেরি—এইসব তথ্য হারুন ডিটেকটিভের মতো বের করেছে তা হয় না। উকিলরা সিনেমা উপন্যাসে ডিটেকটিভ হয়। বাস্তবে পান সিগারেট খেয়ে অবসর কাটায়। হারুনকে কেউ একজন তথ্য দিয়েছে। সেই কেউ একজনটা কি ফরিদের স্ত্রী সফুরা? হারুন যখন ক্ষিতিশ বাবু সম্পর্কে কথা বলছিল তখন তাকিয়ে ছিল সফুরার দিকে।

হাবীব কাঠগড়ার দিকে এগিয়ে গেলেন। আয়োজন করে হাই তুললেন। এর অর্থ এতক্ষণ যে আলোচনা হলো তা হাই তোলার মতো গুরুত্বহীন। ডাক্তার এবং উকিল এই দুই শ্রেণীর মানুষদের নিজ নিজ বিদ্যার পাশাপাশি অভিনয়ও জানতে হয়। হাবীব জজ সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, ইউর অনার। ডুবন্ত মানুষ খড়খুটা আঁকড়ে ধরে।

আসামি ফরিদ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। আদালতকেও বলেছে। আমি তার পক্ষের আইনজীবী। এমন সব তথ্য তার বিষয়ে এখন উপস্থিত হচ্ছে যা আমি নিজে জানি না। ক্ষিতিশ বাবু ভুল করেছেন। সমিল চেহারার মানুষ থাকে। বলা হয় একই চেহারার মানুষ সাতজন করে তাকে। এদের একটা নাম আছে। পুরুষ হলে এদের বলে সন্তু ভ্রাতা। মেয়ে হলে সপ্ত ভগ্নি। আমি চাই ক্ষিতিশ বাবু আদালতে উপস্থিত হয় বলুক এই সেই আসামি যে নিয়মিত বই আনা নেওয়া করে।

হাবীবের বক্তৃতার পর পর আদালত মুলতবি হয়ে গেল। হাবীব এসে বসলেন প্রণবের পাশে। প্রণব বললেন, স্যার আপনার কোনো তুলনা হয় না।হাবীব ললেন, কোনো মানুষেরই তুলনা হয় না। সারা পৃথিবীতে আমি হাবীব একজনই, আবার তুমি প্রণবও একজন। বুঝেছ? হুঁ।পত্রিকাটা নামাও। সারাক্ষণ মুখের উপর পত্রিকা ধরা।বললাম না গরম খবর আছে। পড়বেন? না।আমি সফুরাকে বলেছি আজ সন্ধ্যায় আপনার সঙ্গে দেখা করতে।কখন বললা?

এক ফাঁকে বলেছি। সে খুব চিন্তিত। তার হাত দেখে কে যেন বলেছে তার স্বামীর ফাঁসি হবে।হাবীব বললেন, একটা পান দাও।প্রণব পানের কৌটা বের করুলেন। কোর্টরুম খালি হয়ে গেছে। হাবীব এবং প্রণব এগুলো বসে আছেন। হাবীব অস্থির বোধ করছেন। অস্থিরতার কারণ ধরতে পারছেন না। প্রণব বলব, জজ সাহেবের মেয়ের বিয়ের কথা মনে আছে, স্যার?

মনে আছে। উনার মেয়ের নাম কী? শায়েরা বানু। উনি বিরাট আয়োজন করেছেন। আজই ঢাকা থেকে বাবুর্চি আসবে মিষ্টির কারিগরও আসবে।বিয়ের তারিখ যেন কী? জানুয়ারির ২০ তারিখ।হাবীব উঠে দাঁড়ালেন। জজ সাহেব খাস কামরায় আছেন। তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ হওয়া দরকার।

ডিসট্রিক জজ আবুল কাশেম ইজিচেয়ারে আধশোয়া অবস্থায় ছিলেন। হাবীবকে দেখে সোজা হয়ে বসতে বসতে বললেন, চেয়ারটা কাছে এনে বসুন। কোমরের ব্যথাটা আবার শুরু হয়েছে। বেশিক্ষণ সোজা হয়ে বসে থাকতে পারি না।আমার পরিচিত এক কবিরাজ আছে। সে গাছগাছড়া দিয়ে মালিশ করার তেল তৈরি করে। অনেকেই উপকার পেয়েছে। আপনাকে তৈরি করে দিতে বলব?বলুন। আমার মেয়ে রাতে ইন্ডিয়ান বাম ঘষে দেয়, লাভ কিছু হয় না।হাবীব বসতে বসতে বললেন, আপনার কোন মেয়ে, যার বিয়ের আলাপ হচ্ছে সে? শাহেদা বানু?

হুঁ।মেয়ে চলে গেলে আপনার তো খুব কষ্ট হবে।তা তো হবেই। এই মেয়ে বাপঅন্ত প্রাণ। রোজ দুপুরে টেলিফোন করে ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করেছি কি না। টিফিন কেরিয়ারে নিজে খাবার ভরে দেয়।হাবীব বললেন, এই কয়দিন কোর্টে খাওয়াদাওয়া না করে বাসায় মেয়ের সঙ্গে যান।কথাটা মন্দ বলেন নাই। বিয়েতে খাবারের আয়োজন কী করেছেন, একটু কি বলবেন?

অবশ্যই বলব। সবই আমার স্ত্রী ঠিক করেছেন। প্রথম মেয়ের বিয়ে, ধুমধাম করতে চায়।উনি একা তো ধুমধাম করবেন না। আমরা সবাই মিলে করব।জজ সাহেব আগ্রহ উত্তেজনায় উঠে বসলেন। আনন্দিত গলায় বললেন, পোলাও, মুরগির কোরমা, খাসির কান মাংস, দই মিষ্টি, পিঠা, পান-সুপারি।গরু রাখবো না?

হিন্দু  অতিথিদের কথা বিবেচনা করে গরু বাদ দিয়েছি।হাবীব বললেন, হিন্দু-মুসলমান এক টেবিলে খাবে না। ওরা মুরগি দিয়ে খাবে। মুসলমান মেয়ের বিয়েতে গরু না থাকলে চলে? গোমাংস ছাড়া বাকি সব মাংসই নিরামিষের পর্যায়ে পড়ে।দেখি আমার স্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করি।আপনার মেয়ের বিয়েতে আমার একজন অতিথি নিয়ে আসার বাসনা আছে। উনি আবার গোমাংস পছন্দ করেন।জজ সাহেব বললেন, অতিথি কে?

গভর্নর সাহেব। মোনায়েম খান। উনি সামাজিক উৎসবে যেতে পছন্দ করেন। অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়। অবশ্যি আপনি যদি অনুমতি দেন।জজ সাহেব উত্তেজিত গলায় বললেন, অবশ্যই উনাকে বলবেন। এটা হবে আমার মেয়ের জন্যে বিশাল ভাগ্যের ব্যাপার। আমি তো চিন্তাই করতে পারি না আমার মেয়ের বিয়েতে স্বয়ং গভর্নর উপস্থিত।

হাবীব বললেন, বরযাত্রী এবং বিশিষ্ট অতিথিদের জন্যে আমি একটা আইটেম আপনাকে করে দিতে চাই। মাছের আইটেম। পাবদা মাছ। একেকটা বোয়ালের মতো সাইজ। মাছটা মাখনের মতো। মুখে নিলে মুখের মধ্যেই গলে যায়। আমাদের গভর্নর সাহেবের পছন্দের মাছ।পাবদা মাছের ব্যবস্থা অবশ্যই করবেন। খরচ যা লাগে আমি দিব।

তাহলে তো স্যার হবে না। শাহেদা বানু মায়ের জন্যে আমি কিছু করব না? আর যে পাবদা মাছের কথা বলেছি টাকা দিলে সেটা পাওয়া যায় না। ব্যবস্থা আমাকে করতে হবে। আমি ব্যবস্থা করে আপনার কাছ থেকে টাকা নিব? স্যার বলুন আমি কি মাছের ব্যবসা করি।জজ সাহেব বললেন, আপনার কথায় যুক্তি আছে। করুন ব্যবস্থা। ভালো কথা, গভর্নর সাহেবের দাওয়াতের চিঠি কি আপনার কাছে দিব? হাবীব উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, আমার কাছে দেবেন। এই শুক্রবারে ঢাকায় যাচ্ছি। চিঠি হাতে হাতে পৌঁছে দিব।

মাগরেবের নামাজ শেষ হয়েছে। হাজেরা বিবি নামাজ পড়া ছেড়ে দিয়েছেন। এখন সেজদার জন্যে মাথা নিচু করলে সেই মাথা খাড়া করতে কষ্ট হয়। আমেনা বলে এক তরুণীকে রাখা হয়েছে, সে হাজেরা বিবির হয়ে নামাজ পড়ে। নিজের জন্যে পড়ে না। মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছ থেকে ফতোয় আনা হয়েছে। বিশেষ ব্যবস্থায় এটা সম্ভব। বদলি-হজের মতো বদলি-নামাজ। বদলি-হজ যে করে সে হজের সোয়াব পায় না, যার জন্যে হজ করা হয় তিনি সোয়াব পান।

বদলি-নামাজেও একই ব্যাপার। নামাজি সোয়াব পায় না, যার জন্যে নামাজ পড়া হচ্ছে তিনি সোয়াব পান।আমেনাকে বলা হয়েছে তাকে বদলি-হজে পাঠানো হবে। হাজেরা বিবির হয়ে বদলি-হজ করে আসবে। আমেনা অতি আনন্দে আছে। সে অন্দরমহলেও বোরকা পরে। চোখ ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। তাকে সময়ে অসময়ে নামাজ পড়তে দেখা যায়। যখন নামাজ পড়ে না, তখন তার হাতে লম্বা তসবি ঘুরে।

এই তসবি দুই হাতে ধরে রাখতে হয়। সে দাসীমহলে কিছু গল্প চালুর চেষ্টা চালাচ্ছে। একটি গল্প জ্বিন নিয়ে। তার বাবার একটা পালা জ্বিন ছিল। জ্বিনটা তাকে বিয়ে করার জন্যে পাগল ছিল। জ্বিনের কাণ্ডকারখানায় বিরক্ত হয়ে আমেনার বাবা জ্বিনকে আজাদ করে দেন। তবে সেই জিন এখনো আশা ছাড়ে নাই। এখনো বছরে একবার শীতের সময় আসে। আমেনাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়।

লাইলী তাঁর নতুন দাসীকে তার শোবার ঘরে ডেকে পাঠিয়েছেন। নতুন কেউ বাড়িতে দাখিল হওয়ার পর তিনি প্রথম পনেরো দিন তাকে দেখেন। তারপর একদিন ডেকে পাঠান। সেইদিন ঠিক হয় নতুন দাসী চাকরি করতে পারবে নাকি তাকে চলে যেতে হবে।আমেনা ‘আসসালামু আলায়কুম’ বলে ঘরে ঢুকল। তার হাতে যথারীতি লম্বা তসবি।লাইলী বললেন, এক জ্বিন তোমার প্রেমে দেওয়ানা হয়েছে বলে শুনতে পাই। ঘটনা কি সত্য? জি আম্মা।সে একাই দেওয়ানা হয়েছে, না-কি তুমিও দেওয়ানা?

সে একাই দেওয়ানা। আমি কোন দুঃখে জ্বিন বিবাহ করব! জ্বিন-মানুষের বিয়ায় সন্তানাদি হয় না।লাইলী বললেন, বিয়ে হলে সন্তান হবে না কেন? সন্তান অর্ধেক হবে মানুষ, অর্ধেক জ্বিন।আমেনা অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেল। এই মহিলাকে সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। অতিরিক্ত শান্ত চোখমুখ। ঠোটে হাসির আভাস। কিন্তু কথা বলার সময় মহিলার চোখ তীক্ষ্ণ হয়ে যায়। কপালে ভাঁজ পড়ে।লাইলী বললেন, এত বড় তসবি কি জ্বিন তোমারে এনে দিয়েছে?

জি। আপনি ঠিক ধরেছেন আম্মা।লাইলী শান্তগলায় বললেন, ফাইজলামি গল্প আমার সাথে করবা না। এই মালা জন্মাষ্টমির মেলায় কিনতে পাওয়া যায়। সাধু সন্নাসীরা এই রুদ্রাক্ষের মালা গলায় পেচায়া রাখেন। এখন বুঝেছ? আমেনা চুপ করে রইল।সারা দিন নামাজ কালাম পড়ো, তসবি টানো, ঘটনা কী?

জ্বিনের যন্ত্রণায় এই কাজ করতে হয়। দোয়া কালামের উপরে থাকতে হয়।লাইলী বললেন, ঘটনা তা-না। তুমি কাজকর্মের হাত থেকে বাঁচার জন্য এই ভাব ধরেছ। আজ তার শেষ। তুমি নামাজের সময় নামাজ পড়বা। অন্য সময় কাজকর্ম করবা। বোরকা খোলো।আমেনা বোরকা খুলল। লাইলী ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তুমি সুন্দরী মেয়ে। গরিবের ঘরে রূপ নিয়া আসছ। মানুষের কাছ থেকে সাবধান থাকবা। জিনের হাত থেকে সাবধান থাকার প্রয়োজন নাই।

নাদিয়ার বাবার সামনে কখনো পড়বা না। তুমি অন্দরমহলের দাসী। অন্দরমহলে থাকবা।জি আম্মা।এখন সামনে থেকে বিদায় হও। রুদ্রাক্ষের এই মালা যেন আর কোনোদিন দেখি 1 মাল আমার খাটে রাখে।আমেনা খাটে মালা রেখে দৌড়ে বের হতে গিয়ে চৌকাঠে বাড়ি খেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। অন্য দাসীরা ছুটে এসে ধরাধরি করে তাকে কুয়াতলায় নিয়ে গেল। চোখেমুখে পানির ঝাপটা দেওয়ার পর সে চোখ মেলে অস্পষ্ট গলায় বলল, জ্বিন থাপ্পড় মারছে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *