ঝুমুর দোকানে ঢুকেছে। দোকানে লোকটা একা না। আট-দশ বছরের একটা ছেলেও আছে। সে শার্টের বোতাম লাগাচ্ছে। লোকটা একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বলল, বসেন।ঝুমুর বসল। না বসে সে কী আর করবে। লোকটা এখন কী করবে ঝুমুর জানে। কোনো একটা অজুহাতে ছেলেটাকে বাইরে পাঠিয়ে দেবে। তারপর দরজা বন্ধ করে দেবে।মবিন সাহেব বাসাতেই থাকে। আজ যেন কোথায় গেছে। এসে পড়বে।
ঝুমুরকে উদ্দেশ করে কথাগুলো বলা। পরিস্থিতি শুরুতে একটু স্বাভাবিক করা।চা খাবেন? ঝুমুর হ্যাঁ না কিছু বলল না। লোকটা পকেট থেকে পাঁচ টাকার একটা নোট বের করে বলল, ইসমাইল দৌড় দে।ঝুমুর যা ভেবেছে তাই–ছেলেটাকে সরিয়ে দিচ্ছে। তার ইচ্ছা করল চিৎকার করে বলে খবরদার তুই যাবি না, তুই বসে থাক।ছেলেটা ছোট একটা কেতলি হাতে উল্কার মতো বের হয়ে গেল। মনে হয় চা-আনার কাজ তার খুব পছন্দ।
মাথাটা মুছে ফেলেন।লোকটা একটা তোয়ালে ঝুমুরের দিকে বাড়িয়ে ধরেছে। ঝুমুর বলল, মাথা মুছতে হবে না। লোকটা তোয়ালে রেখে দিয়ে সহজ গলায় বলল, ভয় পাবেন না। ভয় পাওয়ার কিছু নাই। মবিন সাহেব আসতে দেরি করলে আমি আপনাকে বাসায় দিয়া আসব।
ঝুমুর যা ভেবেছে তা হচ্ছে না। ছেলেটা চলে যাবার পরও লোকটা দরজা বন্ধ করছে না। বরং ছেলেটার ফেলে যাওয়া শার্টের বোতাম লাগাচ্ছে। শার্টের বোতাম লাগানোর কাজগুলো সাধারণত মেয়েরা করে। ছেলেদের এই কাজ করতে দেখলে একটু অস্বস্তি লাগে।এই দোকানটা কি আপনার? না, আমি একজন কর্মচারী।আপনার বাসা কোথায়? বাস-টাসা নাই।রাতে থাকেন কোথায়?
দোকানেই থাকি।হোটেলে খাই।ঝুমুর খুব অবাক হচ্ছে। কারণ সে লোকটার সঙ্গে কথা বলছে। আগ্রহ করে কথা বলছে। অবশ্য কথা না বলেই বা কী করবে? দু’জন মানুষ তো চুপচাপ বসে থাকতে পারে না। তাছাড়া মানুষটাকে তার এখন খুব ভদ্র, খুব বিনয়ী মনে হচ্ছে। ছোট কাজ যারা করে তারাও ভদ্র হতে পারে, বিনয়ী হতে পারে।ছেলেটা চা নিয়ে এসেছে। তিনটা কাপ বের করল। ছোট ছোট কাপ। কাপের সাইজ যে এত ছোট হতে পারে ঝুমুরের ধারণা ছিল না।
তারা তিনজনই চুকচুক করে চা খাচ্ছে। সবচে’ বেশি মজা করে চা খাচ্ছে ছোট ছেলেটা। প্রতিবারই চুমুক দিয়ে আহ্ করে উঠছে। বাইরে বৃষ্টির তোড় আরো বেড়েছে। ছোট ছেলেটা দীত বের করে বলল, শহীদ ভাই তুফান আইতাছে। যেন তুফান আসা খুব আনন্দের ব্যাপার। ঝুমুর বলল, আমার মার খুব শরীর খারাপ। এই জন্যে মবিন ভাইকে নিতে এসেছি।কী হয়েছে? অজ্ঞান হয়ে গেছে।জ্ঞান ফেরো নাই? আমি যখন আসি তখনো ফেরে নাই।বলেন কী?
ঝুমুরেরও মনে হলো আরো তাই তো! এতক্ষণে একবারও তার মা’র কথা মনে হয়। নি। সে বেশ আরাম করে চা খাচ্ছে। মা কেমন আছে কে জানে। মারা যায় নি তো? ঝুমুর উঠে দাঁড়াল। ক্ষীণস্বলে বলল, আমি চলে যাব।শহীদ নামের লোকটা বলল, চলুন আমি সঙ্গে যাই।ঝুমুর কোনো আপত্তি করল না। লোকটাকে তার ভালো লাগছে। বেশ ভালো লাগছে।
শহীদ ঝুমুরকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েই ডাক্তার আনতে গেল। এবং মুহুর্তের মধ্যে ডাক্তার নিয়ে এল। ডাক্তার ব্লাডপ্রেসার মাপলেন। প্রেসার কমাবার ওষুধ দিলেন। শহীদ ওষুধ আনতে গেল। ছাতা নেই, ভিজতে ভিজতে গেল।মিতু বলল, লোকটা কে রে? ঝুমুর বলল, আমার চেনা একজন।চেনা মানে কি? কীভাবে চিনিস? পরিচয় হয়েছে কোথায়?
ঝুমুর জবাব দিল না।মিতু চিন্তিত গলায় বলল, কত দিনের পরিচয়? ঝুমুর বলল, অনেক দিনের।অনেক দিনের মানে কি? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। ও কি প্রায়ই আসে। নাকি? কথা বলছিস না কেন? কী করে? শার্টের বোতাম লাগায়।তুই কি আমার সঙ্গে ফাজলামি করছিস? ফাজলামি করছি না, যা সত্যি তাই বলছি।বান্দরের মতো দেখতে একটা লোক, তার সঙ্গে তোর এত খাতির কীভাবে হলো?তুমি এত রাগছ কেন আপা? না। আমাকে বল এত খাতির কীভাবে হলো?
তোমার হৈচৈ শুনে মা জেগে যাবে আপা।মিতু বিস্ময় নিয়ে বোনের দিকে তাকিয়ে আছে। ঝুমুর বলল, আপা উনি ওষুধ নিয়ে আসার পর উনাকে রাতে খেয়ে যেতে বলি? বেচারা হোটেলে খায়। হোটেলের কুৎসিত খাবার খেয়ে খেয়ে শরীরের কী হাল করেছে দেখেছ?
তুই খুবই আশ্চর্য একটা মেয়ে রে ঝুমুর।রাতদুপুরে মবিন ভাই যদি এরকম ছোটাছুটি করত তুমি কি তাকে না খাইয়ে বিদেয় দিতে? মবিন ভাই আর সে এক হলো? এক ভাবলেই এক।মিতু তীব্ৰদূষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ঝুমুর সেই তীব্ৰদৃষ্টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বলল, চারটা চাল বসিয়ে দেব আপা? যা ইচ্ছা কর।বেগুন আছে। বেগুন ভেজে ফেলি? যা ভাজতে ইচ্ছে করে সব ভেজে ফেল।মিতু অবাক হয়ে দেখল ঝুমুর সত্যি সত্যি রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছে। মেয়েটা কি পাগল হয়ে গেল?
শহীদ খাবারের কথা শুনে আকাশ থেকে পড়ল। ঝুমুর বলল, না না করলে হবে না, আপনাকে খেয়ে যেতে হবে। গামছাটা দিয়ে ভালোমতো মাথা মুছে ফেলুন।আমি খাব না। অন্য কোনো দিন এসে… আপনাকে খেয়ে যেতে হবে। না খেয়ে আপনি যেতে পারবেন না।শহীদ অস্বস্তিতে মরে যাচ্ছে। মেয়েটার কাণ্ডকারখানা সে কিছুই বুঝতে পারছে না। মেয়েটা কি পাগল টাইপের? ঝুমুর বলল, খাবার কিছু নেই–বেগুন ভাজা, ডাল আর আলু ভর্তা। আপনার কষ্ট হবে।মিতু বলল, উনি খেতে চাচ্ছেন না, তুই এত জোর করছিস কেন?
এত রাতে উনি হোটেলেও কিছু পাবেন না, না খেয়ে থাকবেন নাকি? শহীদ শরমে মরে গিয়ে মিতুর দিকে তাকাল।মিতু বলল, আপনি খেয়ে যান। ঝুমুর চট করে খাবার দিয়ে দে।মিতু মা’র ঘরে বসে আছে। দরজা খোলা। খোলা দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে–মাথা নিচু করে মানুষটা খাচ্ছে। তার সামনে ঝুমুর বসে আছে। সে খাবার তুলে দিচ্ছে। কী যেন আবার নিচু গলায় বলছে। কী বলছে? বলুক যা ইচ্ছা।শাহেদার ঘুম ভেঙেছে। শাহেদা বললেন, ছেলেটা কে রে?
মিতু বলল, আমি জানি না মা।শাহেদা বললেন, যার ইচ্ছা আসছে, খেয়ে যাচ্ছে। কিছুই বুঝতে পারছি না মা, কিছুই বুঝতে পারছি না।তুমি চিন্তা কোরো না মা। আমার মনে হয় না চিন্তার কিছু। তুমি ঘুমিয়ে থাক।শাহেদা চুপ করে গেলেন। তাঁর চোখ বন্ধ। বন্ধ চোখের কোণা বেয়ে পানি পড়ছে। ঘরে আলো নেই বলে মিতু তা দেখতে পাচ্ছে না।ঝুমুর চাদরে সারা শরীর ঢেকে শুয়ে আছে। মাথাও চাদরের নিচে ঢুকানো। আজ সে একা ঘুমুবে। মিতু ঘুমুবে মা’র সঙ্গে। ঘুমুতে যাবার আগে সে বোনের ঘরে ঢুকল। বিছানায় বসতে বসতে বলল, ঘুমুচ্ছিস নাকি ঝুমুর?
ঝুমুর জবাব দিল না। মিতু বলল, তুই জেগে আছিস আমি জানি। মুখ থেকে চাদর সরা।ঝুমুর চাদর সরাল। মিতু বলল, ছেলেটা কে? জানি না।জানি না মানে? ওর নাম কি? শহীদ।তোর সঙ্গে কত দিনের পরিচয়? আজই পরিচয় হয়েছে।সে কী! মবিন ভাইয়ের বাসার নিচে দরজির দোকানে কাজ করে। আমাকে তাদের ঘরে নিয়ে গেল। চা খাওয়াল।আর তুই তাকে এরকম খাতির-যত্ন করে দিলি। না জানি সে কী ভাবছে?
ঝুমুর লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসছে। হঠাৎ হাসি থামিয়ে সে বলল, পরশুদিন সকালে বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে আপা।পরশুদিন আসুক। তখন দেখা যাবে।তুমি তো আজকের কাণ্ড দেখ নি–আজকের কান্ত দেখলে তোমার আক্কেলগুডুম হয়ে যেত।তোর কাণ্ড দেখে আমার আক্কেলগুড়ুম হয়ে গেছে।ঝুমুর মাথা নিচু করে খুব হাসছে। হাসি দেখে মিতুর বড় মায়া লাগল। হঠাৎ সে বলল, আয় তো ঝুমুর তোকে একটু আদর করি। ঝুমুর চোখ তুলে তাকাল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আপাকে জড়িয়ে ধরল।
দু’বোন দু’জনকে জড়িয়ে ধরে অনেক রাত পর্যন্ত কাঁদল। কেন কাঁদল তারা জানে না।এক সময় ঝুমুর চোখ মুছে লজ্জিত ভঙ্গিতে ডাকল, আপা! কি?আমরা এত কান্নাকাটি করছি কেন? আমি কী জন্যে কাঁদছি সেটা আমি জানি, তুই কী জন্যে কাঁদছিস সেটা তোর জানার কথা।আমি জানি না।
না জেনেই ভেউ ভেউ করে কাঁদছিস? হুঁ। আপা শোন– বল শুনছি।পরশু কী হবে বল তো—বাড়িওয়ালা চাচা যখন আসবে তখন তুমি যদি না থাক? আমি না থাকলে তুই তো থাকবি। তুই সামলাবি।আমি সামলাব? তুমি কি পাগল-টাগল হয়ে গেলে? কী সব কুৎসিত কথা যে লোকটা বলছিল! বলুক না। এক সময় বলার কথা শেষ হয়ে যাবে।লোকজন সঙ্গে করে নিয়ে আসবে। কুৎসিত কুৎসিত কথা বলবে তখন আমি কী করব?
তুই ঘর থেকে কাঁদতে কাঁদতে বের হবি। তাতেই কাজ হবে। কিছু মানুষের সিমপ্যাথি পেয়ে যাবি। যদি কাদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাস তাহলে আর দেখতে হবে না। সব লোক তোর পক্ষে চলে আসবে।কী যে তোমার কথা। আপা ! মিতু হাসতে হাসতে বলল, ইচ্ছা করলে লোকটাকে আমরা কঠিন শাস্তিও দিতে পারি। কীভাবে জনিস? কিভাবে?
খুব সহজ-কাঁদতে কাঁদতে ছোট্ট একটা অভিনয় করতে হবে। লোকজনের দিকে তাকিয়ে বলতে হবে–যখন তখন আমাদের বাসায় আসত। কখনো পেঁপে নিয়ে আসত, কখনো কলা, কখনো আম নিয়ে আসত। একদিন খারাপ একটা ইঙ্গিত করে। আমরা তাকে ঘর থেকে বের করে দেই। তারপর থেকে সে আমাদের তাড়িয়ে দেবার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে।
কেউ তোমার কথা বিশ্বাস করবে না।করবে। মানুষের চরিত্রের দিকে ইঙ্গিত করে যাই বলা হয় তাই সবাই বিশ্বাস করে।তুমি বলতে পারবে এমন কথা? না।পরশুদিনের কথা ভেবে আমার এমন অস্থির লাগছে! অস্থির লাগার কিছু নেই। পরশুদিন কেউ আসবে না। আমি ব্যবস্থা করব।
কী ব্যবস্থা করবে? সেটা তোর জানার দরকার নেই। তবে নিশ্চিত থাক। পরশুদিন কেউ আসবে না। কী ব্যবস্থা তুমি করবে। সেটা না জানলে আমি নিশ্চিত হতে পারব না। আমি ঘুমুতে পারব না।আমার চেনা একজন মানুষ আছে। তাকে জানালেই আর কোনো সমস্যা হবে না।উনি কি ভয়ঙ্কর কোনো মানুষ?
মোটেই না। আমুদে একজন মানুষ। কিন্তু তার ভয়ঙ্কর ক্ষমতা।এরকম মানুষকে তুমি চেন কীভাবে? বেঁচে থাকার জন্যে অনেক” মানুষকে চিনতে হয়। অনেক কুৎসিত কাণ্ডকারখানা করতে হয়।বেঁচে থাকাটা কি এতই জরুরি? মিতু ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে বলল, মাঝে মাঝে মনে হয় বেঁচে থাকা খুব জরুরি। আবার মাঝে মাঝে মনে হয় মোটেই জরুরি না।কখন তোমার কাছে মনে হয় বেঁচে থাকাটা জরুরি? ঘুম পাচ্ছে–শুয়ে পড়।না বল–কখন তোমার কাছে মনে হয় বেঁচে থাকাটা জরুরি?
মিতু নিচু গলায় বলল, মাঝে মাঝে শুটিং শেষ হবার পর–অনেক রাতে বাসায় ফিরি। পথে মনে হয় তুই আমার জন্যে বারান্দায় চুপচাপ বসে আছিস। পথে কোনো রিকশা দেখলেই চট করে উঠে দাঁড়াচ্ছিস, তখন বেঁচে থাকাটা খুব জরুরি মনে হয়। মাঝে মাঝে শেষ রাতের দিকে হঠাৎ মনে হয় মা আমার কপালে হাত রেখে দেয়া পড়ছেন, তখন বেঁচে থাকাটা জরুরি মনে হয়। শুধু জরুরি না, অসম্ভব জরুরি মনে হয়।
তুমি আসল কথাটা কিন্তু আপা বল নি। আসল কথাটা এড়িয়ে গেছ।আসল কথাটা কী? আমরা কিছু না–মবিন ভাইয়ের কথা তোমার যখনই মনে হয় তখনি বেঁচে থাকাটা তোমার কাছে খুব জরুরি মনে হয়। ঠিক বলেছি না। আপা? হয়তো ঠিক বলেছিস।হয়তো না–আমি জানি এটাই আসল সত্য, বাকি সব নকল সত্য।বয়সের তুলনায় তুই বেশি বেশি জেনে ফেলছিস। জানা ভালো, তবে বেশি জানা ভালো না।
ঝুমুর বিছানায় উঠে বসতে বসতে বলল, খুব দুঃখী মানুষেরও বোধহয় বেঁচে থাকা জরুরি মনে হয় তাই না। আপা?হয় বোধহয়। নয়তো তারা বেঁচে থাকে কেন?সবাই তো আর বেঁচে থাকে না। কেউ কেউ আবার মরেও যায়। বিষ খায়। গলায় দড়ি দিয়ে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলে পড়ে। কেন পড়ে?জানি না কেন?মবিন ভাইকে প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করেছিলাম—উনি উত্তর দিতে পারেন নি।তাকে আবার কখন জিজ্ঞেস করেছিস?
ঐ দিন স্কুল থেকে টিফিন পিরিয়ডে পালিয়ে তাঁর কাছে চলে গেলাম। তাঁর ঘরে কী সুন্দর একটা শীতলপাটি পাতা! আমার সব সময় মনে হয়েছে তার ঘরটায় একা একা হাত-পা ছড়িয়ে শীতলপাটিতে ঘুমুতে পারলে খুব একটা আরামের ঘুম হবে। সেই জন্যে গিয়েছিলাম। তখন প্রশ্নটা করলাম।মিতু তীক্ষ্ণ গলায় বলল, ঘুমিয়েছিলি?
হুঁ। মবিন ভাই ঘরের ভেতরে আমাকে রেখে তালা দিয়ে ছাত্র পড়াতে চলে গেলেন। সন্ধ্যাবেলা এসে তালা খুললেন। আমি সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুমিয়েছি। কী শান্তির ঘুম যে ঘুমিয়েছি! ও আচ্ছা।তুমি কি রাগ করলে আপা?
না।কিন্তু তোমার গলার স্বর কেমন কঠিন হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে তুমি রাগ করেছ।পাশের ঘর থেকে শাহেদা ডাকলেন, মিতু, এই মিতু।মিতু উঠে গেল। ঝুমুর আবার চাদর দিয়ে সারা শরীর ঢেকে ফেলল। চাদর দিয়ে শরীর ঢাকামাত্র আলাদা একটা জগৎ তৈরি হয়ে যায়। সেই জগতে কত কাণ্ড হয়। আধোঘুম জাগরণে ঝুমুর তার রহমস্যময় জগতে ঘুরে বেড়াতে লাগল।
এখন সে হয়েছে দারুণ বড়োলোকের এক মেয়ে। ঘর থেকে সে পালিয়ে চলে এসেছে। তাকে খোঁজার জন্যে হুলস্থূল পড়ে গেছে। দু’লাখ টাকা পুরস্কার পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। খুঁজে পাওয়া যাবে কী করে, সে অতি সাধারণ একটা জায়গায় লুকিয়ে আছে। একটা দরজির দোকানে। দরজির দোকানের কর্মচারীর নাম শাহেদ। সে রাতে দরজা বন্ধ করতে গিয়ে দেখে এক কোণায় রাজকন্যাদের মতো একটা মেয়ে লুকিয়ে আছে। সে ভয় পেয়ে বলল, কে?
ঝুমুর বলল, আমি নীলাঞ্জনা (রাজকন্যার নাম নীলাঞ্জনা চৌধুরী) আপনি এখানে কেন? আমি কয়েকদিন লুকিয়ে থাকব। আপনি কি আমাকে লুকিয়ে রাখতে পারবেন না? আপনার মতো রূপবতী মেয়েকে আমি কোথায় লুকিয়ে রাখব? লুকিয়ে রাখতে না চান না রাখবেন, শুধু আজ রাতটা থাকতে দিন, আমি ভোরবেলা চলে যাব।রাতে কোথায় ঘুমুবেন?
কেন আপনার খাটে ঘুমুব। আপনি একদিকে তাকিয়ে ঘুমুবেন, আমি অন্যদিকে তাকিয়ে ঘুমুব। মাঝখানে একটা বালিশ দিয়ে রাখব যাতে গায়ের সঙ্গে গা লেগে না যায়।আপনি তো ভয়ঙ্কর কথা বলছেন।আমি মোটেই ভয়ঙ্কর কথা বলছি না। আমি সহজ স্বাভাবিক কথা বলছি।ঝুমুর নীলাঞ্জনা চৌধুরীর ভূমিকায় অনেক রাত পর্যন্ত অভিনয় করল। তার ঘুম এল শেষ রাতে। তখন মোরগ, ডাকতে শুরু করেছে।
মাগরিবের নামযের পর মবিন তার ছাত্রীর বাড়িতে যায়। গরমের দিন বলে সন্ধ্যা ৭টার দিকে আযান পড়ে। সাতটা থেকে নটা–এই দুঘণ্টা একনাগাড়ে পড়ায়। মাঝখানে ইন্টারভ্যালের মতো হয়। ছাত্রী এবং ছাত্রীর মা দু’জন উঠে চলে যান। তখন তার জন্যে চা আসে–লেবু চা। চা খাওয়া শেষ হওয়ামাত্র ছাত্রী এবং ছাত্রীর মা ঢোকেন। পড়াশোনা শুরু হয়। দেয়াল ঘড়িতে ন’টার ঘণ্টা পড়ামাত্র ছাত্রী প্ৰথমে ঘড়ির দিকে, তারপর তার মা’র দিকে তাকায় –এর অর্থ পড়া শেষ। দু’জন আবার উঠে চলে যায়।
মবিনের মাঝে মাঝে মনে হয় সে রোবটকে পড়াচ্ছে। যা বলছে লাইলী নামের রূপবতী রোবট তার মেমরি সেলে ঢুকিয়ে নিচ্ছে। পড়ানোয় রোবটের লাভ কতটুকু হচ্ছে তাও ধরা যাচ্ছে না। এ ধরনের ছাত্রী পড়িয়ে আরাম নেই। তাছাড়া সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়। কোনো কারণে রোবটের মর্যাদা বা সম্মান ক্ষুন্ন না হয় সেই ভয়।
একবার একটিভ ভয়েস পেসিভ ভয়েস পড়ানোর সময় মবিন একটু ঝুকে এসে–ছেটেবিলের নিচে তার পা লেগে গেল রোবটের সঙ্গে। রোবট ভয়ঙ্করভাবে কেঁপে উঠল। মুখ তুলে তাকাল মবিনের দিকে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। ঠোঁট কাঁপতে শুরু করছে। মনে হচ্ছে এক্ষুণি প্ৰচণ্ড এক চিৎকার দেবে। মবিনের হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। রোবটের মা টেবিলের নিচে কী হয়েছে বুঝতে পারলেন না। তবে মেয়ের মুখভঙ্গি দেখে কিছু আঁচ করলেন। শঙ্কিত গলায় বললেন, কী হয়েছে রে?
লাইলী চোখ নামিয়ে বলল, কিছু না।হাঁপ ছেড়ে মবিন আবার পড়াতে শুরু করল। একবার তার ইচ্ছে করল একটা কাগজে ইংরেজিতে লেখে Young lady, that was not intentional–দিকে বাড়িয়ে দেয়। সেই সাহসও হলো না। মেয়েটি যদি কী লেখা হয়েছে না পড়েই প্ৰেমপত্র লেখা হয়েছে মনে করে চিৎকার দিয়ে ওঠে।
চাকরিটা ছেড়ে দিতে পারলে মবিনের জন্য ভালো হতো। ছাড়া যাচ্ছে না। দুঘন্টা পরিশ্রমে সাত শ’ টাকা বেতন প্লাস দুবেলা খাওয়া ভাবা যায় না।মবিনের ধারণা ছাত্রীর রোবট ভাব এবং ছাত্রীর মায়ের খবরদারি কিছুদিনের মধ্যেই কমে যাবে। যখন দু’জনই লক্ষ করবে এই মাস্টারের উদ্দেশ্য পড়ানো–টেবিলের পা দিয়ে পা চেপে ধরা না, প্রেমপত্র লেখা না।
মবিনের ধারণা মিলছে না–দু’মাস হলো সে পড়াচ্ছে, ছাত্রী এবং ছাত্রীর মা দু’মাস আগে যেমন ছিল এখনো তেমনই আছে। মবিনকে পড়ানোর সময় হাত-পা খুব সাবধানে রাখতে হয়। সারাক্ষণ মনে হয় সে একটা কচ্ছপ হলে মেয়েটিকে পড়ানো সহজ হতো। হাত-পা খোলসের ভেতর ঢুকিয়ে শুধু মাথাটা বের করে ছাত্রী পড়াত।প্রকৃতি জীব জগতের নানান ‘ফরম’ নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার পর মানুষের জন্যে বর্তমান ফরম বেছে নিয়েছে। মানুষের জন্যে কচ্ছপ ফরমটাও খুব খারাপ ছিল না।
মবিন তার ছাত্রীর বাসার বারান্দায় উঠে কলিংবেলে হাত রাখল। এই আরেক বিরক্তিকর ব্যাপার। এ বাড়িতে কলিংবেল টেপার অনেকক্ষণ পর একজন কেউ এসে দরজা খোলে। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মনে হয় অনন্তকাল পার করে দিচ্ছে।আজ দেরি হলো না। কলিংবেল টেপামাত্র দরজা খুলে গেল। বুড্ডা মাথা বের করে বলল, আফা পড়ব না।
মবিনের ভুরু কুঞ্চিত হলো। গতকালও রোবট পড়তে আসে নি। কেন আসে নি। সেই কারণও দর্শানো হয় নি। রোবটমাতা শুধু বলেছেন–লাইলী আজ পড়বে না। তুমি রাত ন’টার দিকে এসে খেয়ে যেও। মবিন চলে এসেছে। রাত ন’টায় ভাত খাবার জন্যে যায় নি। খাওয়ার জন্যে আবার ফিরে যেতে লজ্জা লাগল। রাতে হোটেলে খেয়ে নিয়েছে। মানুষের অভ্যাস কত দ্রুত বদলায় কাল রাতে সে টের পেয়েছে। হোটেলের খাবার বলতে গেলে কিছুই খেতে পারে নি। যা খেয়েছে তাও হজম হয় নি–পেট নেমে গেছে।
বুড্ডা বলল, আফনেরে বলছে ভাত খাইয়া যাইতে।তোমার আপা আজো পড়বে না? জ্বে না।পড়বে না কেন শরীর খারাপ? জ্বে।কী হয়েছে তার? শইল খারাপ হইছে।মবিন চলে আসছে। তার মন একটু খারাপ। হোটেলের ভয়ঙ্কর খাবার আজো খেতে হবে। পেট খারাপের ব্যাপারটা মনে হয় স্থায়ী হয়ে যাবে। মবিন গেট পর্যন্ত চলে এসেছে, বুড়া ছুটে এসে বলল, আম্মা আফনেরে ডাকে।
রোবটের মা অবশ্যি সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিলেন না। মবিনকে আধঘণ্টার মতো বারান্দায় বসে থাকতে হলো। বুডা এসে এক সময় বলল, আফনেরে ভিতরে যাইতে বলছে। মবিন বুডার পেছনে পেছনে ঢুকল। রোবটমাতা বললেন, তুমি কাল খেতে আস নি কেন? লাইলী পড়ুন না পড়ুক তোমার দু’বেলা খাওয়ার কথা, তুমি খাবে।ওর কী হয়েছে?গায়ে গোটা গোটা উঠেছে, মনে হয় হাম।আমি কয়েকদিন আসা বাদ দেব?
বাদ দাও। ও সুস্থ হলে আমি খবর পাঠাব।জ্বি আচ্ছা। আজ তাহলে যাই? এখনি যাবে কেন? ভাত খাও। ভাত খেয়ে একবারে যাও। ভাত দিতে বলেছি। মবিনের খাওয়ার সময় ভদ্রমহিলা সামনে থাকেন না। আজ রইলেন। কাছে এলেন না–দূরে বসে রইলেন। মবিনের অস্বস্তি লাগছে। দীর্ঘদিন একা একা খেয়ে অভ্যাস হয়ে গেছে। মহিলাদের কেউ আশপাশে থাকলে অস্বস্তি লাগে। ভদ্রমহিলা অবশ্যি দূরে বসে আছেন। সেটাও অস্বস্তিকর। মাতৃসম মহিলারা খাবার সময় এত দূরে থাকবেন কেন?
তোমার বাবা-মা কি বেঁচে আছেন? জ্বি।কোথায় থাকেন, দেশে? জ্বি।বাবা কিছু করেন? স্কুল টিচার ছিলেন। এখন গ্রামেই থাকেন। সামান্য জমিজমা আছে, না থাকার মতোই।ভাইবোন ক’জন? ভাই নেই, চার বোন।বোনদের সব বিয়ে হয়ে গেছে? দু’জনের হয়েছে।ব্যক্তিগত সব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার জন্যে রাগ করছ না তো? জ্বি না। আমার কাজের ছেলেটা বলছিল তোমার ঘরে সুন্দরমতো একটা মেয়েকে দেখেছে।মেয়েটা কে?
ওর নাম মিতু। ওর বড় ভাই আমার সঙ্গে পড়ত।যে ভাই খুনের জন্যে জেল খাটছে? মবিন বিরক্ত হলো–মহিলা সব জেনেশুনেই জিজ্ঞেস করছেন মেয়েটা কে? এতসব প্রশ্নের দরকারই বা কি? সে দরিদ্র প্রাইভেট মাস্টার। পড়াতে এসেছে, পড়িয়ে চলে যাবে। ব্যাস।ঐ মেয়ে কি তোমার কাছে প্রায়ই আসে?
জ্বি।মেয়েটা কী করে।সিনেমার ছোটখাটো রোল করে।এতেই ওদের সংসার চলে? চলে আর কোথায়? কোনোমতে জীবন ধারণ করা।তিনজনের সংসার, বাড়ি ভাড়া, বোনের স্কুলের খরচ সব মেয়ের সামান্য রোজগারে চলে?
চালাতে হয়।আমি মেয়েটার নামে অনেক আজেবাজে কথা শুনি। দামি দামি গাড়ি নাকি মাঝেমধ্যে নামিয়ে দিয়ে যায়।মবিনের খাওয়া হয়ে গেছে। সে হাত ধোয়ার জন্যে উঠল। ভদ্রমহিলা নিজেও উঠে দাঁড়ালেন। উপদেশ দিচ্ছেন এমন ভঙ্গিতে বললেন, এ জাতীয় মেয়েদের সাথে সম্পর্ক না রাখাই ভালো।মবিন কঠিন কিছু কথা বলতে গিয়েও বলল না। কী হবে কঠিন কথা বলে?আমি তাহলে যাই?
বোস। আরেকটু বোস। তোমার সঙ্গে একটা জরুরি কথা আছে। খুব জরুরি।মবিন বিস্মিত হলো। তার সঙ্গে এই মহিলার কী জরুরি কথা থাকতে পারে? টেবিলের নিচে একবার তার রোবটকন্যার পায়ের সঙ্গে তার পা লেগে গিয়েছিল–এই খবরটা কি মেয়ে তার মা’কে জানিয়েছে?
Read more