আঙুল কাটা জগলু পর্ব -০৪ হুমায়ূন আহমেদ

আঙুল কাটা জগলু

যত্ন করে কোথাও রেখে দিলে পরে কোনো একসময় জগলু ভাইকে দিয়ে দিলাম।আমার সঙ্গে ফাজলামি করছেন? ফাজলামি করব কেন? সুটকেসটা বাদলের খাটের নিচে রাখা নিরাপদ না। আমি যেখানে থাকি সে ঘরের দরজা লাগানোর ব্যবস্থাটা নাই।দয়া করে আপনি আর কখনো আমাকে টেলিফোন করবেন না।কেন?

আপনি একধরনের খেলা খেলার চেষ্টা করছেন। আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু বি এ পার্ট টু ইট। আমাকে আর আমার বাবাকে এর মধ্যে জড়াবেন না।জগলু ভাই যেভাবে নিজের কথার মাঝখানেই টেলিফোন কেটে দিয়েছিলেন এই মেয়েও তা-ই করল। তার নিজের কথা পুরোপুরি শেষ না করেই লাইন কেটে দিল।

বাদলের যোগব্যায়াম শেষ হয়েছে। সে সোফায় বসে আছে। তার মুখ শুকনা। চোখ বিষন্ন। সাধারণ ব্যায়ামের পর মানুষজন শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়। যোগব্যায়ামের পর হয়তো মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়। মানুষের মানসিক ক্লান্তি ধরা পড়ে চোখে।আমি বললাম, তোর হুম-সুন শেষ?

বাদল বলল, হঁ।ভ্যাবদা মেরে বসে আছিস কেন? সমস্যা কী? গান বাজতে শুরু করেছে।নে দি লদ গান? হুঁ। কী যে যন্ত্রণা! তোমাকে যদি বোঝাতে পারতাম! ঘুমের মধ্যেও এই গান হয়। তোমাকে এইজন্যেই পাগলের মতো খুঁজছি।আমি কী করব?

গানটা থেকে আমাকে উদ্ধার করো। গানটা মাথা থেকে বের করে দাও।তোর জন্যে খালুসাহেব সাইকিয়াট্রিস্টের ব্যবস্থা করছেন। সাইকিয়াট্রিস্ট গান বের করে দেবেন। সাইকিয়াট্রিস্টদের হাতে নানান কায়দাকানুন আছে।তাদের চেয়ে অনেক বেশি কায়দাকানুন তোমার হাতে আছে। তুমি ইচ্ছা করলেই আমাকে উদ্ধার করতে পার।তোকে উদ্ধার করলে লাভ কী? কোনো লাভ নেই?

না। তোকে এক জায়গা থেকে উদ্ধার করলে আরেক জায়গায় পড়বি।তখন তুমি আবারও উদ্ধার করবে।ধারাবাহিক পতন এবং ধারাবাহিক উৎখান? হুঁ।তোর গানটা কী আরেকবার বল তো— নে দি লদ বা রয়াওহালা গপা…শেষ শব্দ গপা?

হ্যাঁ গপা।শুধু গপা না হয়ে গপাগপ হলে ভালো হতো।ভাইজান, প্লিজ, হেল্প মি। এই গানের জন্যে আরাম করে আমি ঘুমাতে পর্যন্ত পারি না।তোর গানের অর্থ বের করে ফেললেই গানটা মাথা থেকে দূর হবে বলে আমার ধারণা। তবে দূর হলেও লাভ হবে না, আবার অন্য কোনো গান তোর মাথায় ঢুকে পড়বে।যখন ঢুকবে তখন দেখা যাবে। আপাতত এটা দূর করো।

তোর মাথায় একটা গানের প্রথম লাইন উলটো করে বাজছে। লাইনটা হলো, পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে। মিলিয়ে দ্যাখ।বাদল বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকল। তারপর ঘোরলাগা গলায় বলল, আরো তা-ই তো! এটা তুমি কখন বের করলো? এখন? না। যেদিন বলেছিস সেদিনই বের করেছি।এতদিন বলনি কেন? দরকার কী?

হিমু ভাইজান, তুমি অদ্ভুত একজন মানুষ। শুধু অদ্ভুত না, অতি অতি অদ্ভুত।আমরা সবাই অতি অতি অদ্ভুত। তুই নিজেও অতি অতি অদ্ভুত, আবার জগলুভাইজানও অতি অতি অদ্ভুত! জগলু ভাইজান কে? তুই চিনবি না। আছে একজন। নিশি মানব। মাথা থেকে গানটা গেছে?

হুঁ।ঘুমিয়ে পড়।আজ খুবই আরামের একটা ঘুম হবে ভাইজান।বাদল সোফায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমন্ত বাদলকে দেখতে ভালো লাগছে। পৃথিবীর সব ঘুমন্ত মানুষ একরকম। একজন ঘুমন্ত মানুষের সঙ্গে আরেকজন ঘুমন্ত মানুষের কোনো প্ৰভেদ নেই। জাগ্ৰত মানুষই শুধু একজন আরেকজনের কাছ থেকে হা ।

মোবাইল টেলিফোনের রিং বাজছে। জগন্নু ভাই টেলিফোন করেছেন। তিনি ঘুমিয়ে থাকলে তাঁর সঙ্গে বাদলের কোনো প্ৰভেদ থাকত না। জেগে আছেন বলেই তিনি এখন আলাদা।জগলু ভাই, স্লামালিকুম।জিনিস কি ঠিকঠাক আছে? জিনিসের চিন্তায় আপনার কি ঘুম হচ্ছে না? যা জিজ্ঞেস করেছি। তার জবাব দাও।জিনিস ঠিকঠাক আছে, ওই যে সুটকেস দেখা যায়। ডালা খুলে দেখিব? দরকার নাই। কাল সকালে তোমার সামনে ডালা খুলব।জগলু ভাই, আপনি এখন আছেন কোথায়? তা দিয়ে তোমার দরকার কী?

ঝুম বৃষ্টি পড়ছে তো, এই সময় পুত্রের পাশে শুয়ে থাকার আলাদা আনন্দ। বজ্ৰপাতের সময় বাচারা ভয় পায়। তখন হাত বাড়িয়ে বাবামাকে ছুয়ে দেখতে চায়। আপনার ছেলে নিশ্চয়ই অনেক দিন আপনাকে ছয়ে দেখে না।আমার ছেলে আছে তুমি জানো কীভাবে?

অনুমান করে বলছি জগলু ভাই। আমি কিছুই জানি না। আপনার যেবয়স এই বয়স পর্যন্ত আপনি চিরকুমার থাকবেন, তা হয় না। বিয়ে করলে ছেলেমেয়ে হবার কথা। জগলু ভাই, আপনার কি একটাই ছেলে? হ্যাঁ।যদি একটাই ছেলে হয়, তা হলে অবশ্যই তার নাম বাবু।এক ছেলে হলে তার নাম বাবু হবে কেন?

হবেই যে এমন কোনো কথা নেই, তবে বেশির ভাগ সময় হয়। অতিরিক্ত আদর করে। সারাক্ষণ বাবা বাবা ডাকা হয়। সেই বাবা থেকে বাবু।হিমু! জি ভাইজান? আমার সঙ্গে চালাকি করবে না। আমি জানে শেষ করে দেব।জি আচ্ছা।আমারছেলের নাম বাবু তুমি কোত্থেকে জেনেছ? অনুমান করেছি।আবার চালাকি! আমার সঙ্গে চালাকি? আমার ছেলের নাম কি তোমাকে মতি বলেছে?

জি না।তোমাকে যে মোবাইল টেলিফোন দেয়া হয়েছে। সেখানে কি তার নাম এন্ট্রি করা আছে? থাকার কথা না, তার পরেও কি আছে? জানি না জগলু ভাই।দ্যাখো, এক্ষুনি চেক করে দ্যাখো।কীভাবে চেক করতে হয় এটাও তো জানি না। আমি শুধু মোবাইল অন-অফ করতে জানি। আমার খালাতো ভাই বাদল এইসব ব্যাপারে খুবই পারদর্শী, তবে সে এখন ঘুমুচ্ছে।তাকে ডেকে তোলো।

সে খুবই আরাম করে ঘুমুচ্ছে, তাকে ডেকে তোলা যাবে না।আমি ডেকে তুলতে বলছি, তুমি তোলো।আচ্ছা জগলু ভাই শুনুন, মনে করুন। আপনার ছেলে অসুস্থ। অনেক দিন সে আরাম করে ঘুমায় না। একবার দেখা গেল অসুখ কমেছে। সে আরাম করে ঘুমুচ্ছে। তখন কি আপনি তাকে ঘুম থেকে তুলবেন?আমার ছেলে যে অসুস্থ এটা তুমি জানো কীভাবে?

জগলু ভাই, আমি কথার কথা বলেছি।অবশ্যই কথার কথা না। তুমি যা বলেছ জেনেশুনেই বলেছ। এইসব তথ্য তুমি কোথায় পেয়েছ তোমাকে বলতে হবে। এক্ষুনি বলতে হবে… জগলু ভাই হয়তো আরো অনেক কিছু বলত, হুট করে লাইন কেটে গেল। আমি টেলিফোন সেট মাথার কাছে রেখে ঘুমিয়ে পড়লাম। বাকি রাতে জগলু ভাই আর টেলিফোন করলেন না। আমি আর বাদল সকাল দশটা পর্যন্ত ঘুমালাম।ঘুমের মধ্যে বাদল কোনো স্বপ্ন দেখল কি না। আমি জানি না, তবে আমি নিজে দীর্ঘ স্বপ্ন দেখলাম।

স্বপ্নে আমার বাবা আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি কিছুক্ষণ পরপর আমার মাথা একটা চৌবাচ্চায় ড়ুবাচ্ছেন। চৌবাচ্চার পানি নাকমুখ দিয়ে ঢুকছে। ফুসফুস ফেটে যাবার মতো হচ্ছে। এর মধ্যেও তিনি অতি মধুর গলায় আমার সঙ্গে কথা বলছেন। আমার মাথা পানিতে ডোবানো। এই অবস্থায়ও আমি বাবার কথার জবাব দিতে পারছি। স্বপ্নে সবই সম্ভব।বাবা বললেন, হিমালয় বাবা! কষ্ট হচ্ছে?

হুঁ।বেশি কষ্ট হচ্ছে? হুঁ।স্বাভাবিকভাবে নিশ্বাস নেবার আনন্দটা কী, এখন বুঝতে পারছিস? পারছি।সহজভাবে নিশ্বাস-প্রশ্বাসেই যে মহাআনন্দ এটা বুঝতে পারছিস? পারছি। এখন ছেড়ে দাও।আর একটু।নিশ্বাস নিতে দাও বাবা, মরে যাচ্ছি।আর সামান্য কিছুক্ষণ, এই তো এক্ষুনি ছাড়ব।বাবা তুমি আমাকে এত কষ্ট দিচ্ছ কেন?কষ্ট না পেলে আনন্দ বুঝবি কিভাবে? বাবা আমি আনন্দ বুঝতে চাই না। আমি কষ্ট থেকে মুক্তি চাই।আমি তোর শিক্ষক। আনন্দ কিভাবে পেতে হয় সেটা তোকে আমি না শেখালে কে শিখাবোরে বোকা ছেলে?

আরব্য রজনীর সিন্দাবাদ সাহেব ঘাড়ে ভূত নিয়ে কতদিন হাঁটাহাঁটি করেছেন, তার উল্লেখ মূল বই-এ নেই। তবে আমি গত ছদিন সুটকেসনামক ভূত নিয়ে হাঁটাহাঁটি করছি। যেখানে যাই হাতে সুটকেস। জগলু ভাইয়ের কোনো খোঁজ নেই। তিনি মোবাইল ধরছেন না। টেলিফোন করলেই প্রাণহীন নারীকণ্ঠ বলছে, এই মুহূর্তে সংযোগ দেয়া যাচ্ছে না। একটু পরে আবার চেষ্টা করুন। আমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

খবরের কাগজ পড়া আমার স্বভাবের মধ্যে নেই, তার পরেও গত ছদিন খবরের কাগজ পড়লাম জগলু ভাইয়ের কোনো খবর পত্রিকায় এসেছে কি না জানার জন্য। তিনি কি র‍্যাবের হাতে ধরা পড়েছেন, এবং পরবর্তীতে ক্রসফায়ারে নিহত? চিতা নামের আরেক গ্রুপের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এদের ভাবভঙ্গিতে মনে হচ্ছে এরাও র‍্যাবের দূর-সম্পর্কের কাজিন। তাদের হাতে ধরা পড়লেও খবর আছে। এরাও ক্রসফায়ার বিষয়টা জানে।

পত্রিকায় গত সপ্তাহে এ-ধরনের কোনো খবর আসেনি। তা হলে জগলু ভাইয়ের ব্যাপারটা কী? এই টাইপের মানুষ সবসময় রিলে রেইসে থাকে। এদের হাত থেকে যে–কোনো সময় ব্যাটন পড়ে যেতে পারে। জগলু ভাইয়ের হাতের ব্যাটন কি পড়ে গেছে? অন্য একজন সেটা কুড়িয়ে নিয়ে ছুটিতে শুরু করেছে? রিলে রেইসের দৌড়বিদরা হারিয়ে যান, ব্যাটন হারায় না।

জগলু ভাইয়ের মোবাইলে বাবু নাম এন্ট্রি করা আছে। বাদল বের করে দিয়েছে। আমার ধারণা বাবু জগলু ভাইয়ের ছেলে। সেই নাম্বারে বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। ছেলে কি পারবে বাবার কোনো খবর দিতে?

বুধবার দুপুরে জগলু ভাইয়ের ছেলেকে টেলিফোন করলাম। গভীর এবং ভারী গলায় একটা বাচ্চা ছেলে বলল, তুমি কে? আমি বললাম, আমি সম্পর্কে তোমার চাচা হই। তুমি জগলু ভাইয়ের ছেলে না?হুঁ।তোমার নাম কী? আমার নাম হিমু।আমার বাবা কোথায়? আমি বললাম, জানি না তো কোথায়! জানো না কেন? তোমার কি বাবাকে খুব দরকার? হুঁ।কীজন্যে দরকার বলো তো?

তোমাকে বলব না।তোমার বাবার সঙ্গে দেখা হবার সম্ভাবনা আমার আছে। কাজেই আমাকে বলতে পারো। আমি উনাকে বলে দেব।তুমি আর কাউকে বলবে না তো? না।প্রমিজ? হ্যাঁ, প্রমিজ।বাবা বলেছিল। আমি জন্মদিনে যা চাই তা-ই আমাকে দেবে। তাকে বলার জন্যে আমি কী চাই! তুমি কী চাও? একটা ভূতের বাচ্চা চাই।ছেলে-বাচ্চা, না মেয়ে-বাচ্চা? ছেলে-বাচ্চা। আমি মেয়েদের পছন্দ করি না।ভূতের ছেলে-বাচ্চা যোগাড় করা খুবই কঠিন। একেবারেই যদি যোগাড় করা না যায়, তা হলে কি মেয়ে-বাচ্চায় চলবে?

না চলবে না।ভালো বিপদ হয়েছে তো! এইজন্যেই আগে-আগে বললাম। জন্মদিনের তো দেরি আছে।কত দেরি? সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখ।ভালো বিপদে পড়া গেল। এত অল্প সময়ে ছেলে-ভূতের বাচ্চা বের করা অতি জটিল ব্যাপার। আমার কলিজা পানি হয়ে যাবে।তোমাকে কিছু করতে হবে না। বাবা করবে।তোমার বাবা পারবে না। এইসব জটিল কাজের দায়িত্ব শেষটায় আমার ঘাড়েই এসে পড়বে। এখনো চিন্তা করে বলো মেয়ে-ভূত হলে চলবে কি না।

তোমাকে তো একবার বলেছি চলবে না। আমি আর তোমার সঙ্গে কথা বলব না। বেশি কথা বলা আমার নিষেধ। ডাক্তার সাহেব নিষেধ করেছেন। আমার অসুখ তো এইজন্যে।তা হলে বিদায়।বিদায়।হ্যালো শোনো ভূতের বাচ্চা দিয়ে কি করবে? খেলব।সে ঘুমাবে কোথায়? আমার সঙ্গে ঘুমাবে।ভয় পাবে তো।ভয় পাব না। ভূতের বাচ্চারা ভাল হয়। তারা ভয় দেখায় না। আমি এখন আর তোমার সঙ্গে কথা বলব না।

বাবুর সঙ্গে কথা বলার পরপরই মিতুর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করল। তাকে কিছুক্ষণ বিরক্ত করা। একটু রাগিয়ে দেয়া। এই মেয়েটা এখন আমার টেলিফোন পেলেই রেগে যাচ্ছে। সাধারণ রাগ না, ভয়াবহ টাইপ রাগ। মানুষের স্বভাব হলো, কেউ যখন ভালোবাসে তখন নানান কর্মকাণ্ড করে সেই ভালোবাসা বাড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করে, আবার কেউ যখন রেগে যায়। তখন তার রাগটাও বাড়িয়ে দিতে ইচ্ছা করে।হ্যালো, মিতু! আপনি আবার টেলিফোন করেছেন? আবার? আপনাকে আমি কী বলেছি, কখনো টেলিফোন করবেন না। নেভার এভার।

খুব জরুরি কাজে টেলিফোন করেছি। খুব জরুরি বললেও কম বলা হবে। জরুরির ওপর জরুরি। মহা জরুরি আমার সঙ্গে আপনার কী জরুরি কাজ? একটা তথ্য যদি দিতে পার।কী তথ্য? ভূতের বাচ্চা কোথায় পাওয়া যায় বলতে পারবে? কিসের বাচা? ভূতের ছেলে-বাচ্চা। একান্তই যদি না পাওয়া যায় মেয়ে-বাচ্চা হলেও চলবে। তবে আমার দরকার ছেলে-বাচ্চা।আপনি কি আমার সঙ্গে রসিকতা করার জন্যে টেলিফোনটা করলেন?

রসিকতা না। আসলেই আমার একটা ভূতের ছেলে-বাচ্চা দরকার। একজনকে কথা দিয়েছি। সে পালবে।হিমু সাহেব শুনুন। আপনার হাত থেকে উদ্ধারের জন্য আমি একটা ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমি আমার টেলিফোন সেট আর ব্যবহার করব না। আপনি চেষ্টা করেও আর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন না। তা ছাড়া এই মঙ্গলবারে আমি বাবাকে নিয়ে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছি। এমনিতেও যোগাযোগ হবে না।স্যার কি ভালো আছেন?

হ্যাঁ, বাবা ভালো আছেন।তোমরা চলে যাবে, তার আগে তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে না? দেখা হবার কোনো প্রয়োজন কি আছে? না, প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন ছাড়াও কিন্তু আমরা অনেক কিছু করি।কী করি? এই ধরো আমার টেলিফোন পাওয়ামাত্ৰই তুমি কিন্তু নিজের টেলিফোন অফ করে দিতে পারতে। তা করনি। প্রয়োজন ছাড়াই অনেকক্ষণ কথা বলেছি, এখনো বলছি।এটা ভদ্রতা।আমি যে স্যারের সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছি এটাও ভদ্রতা। তুমি কি বাসায় আছ?কেন?

তা হলে এখনই চলে আসি, ভদ্রতার ঝামেলা সেরে ফেলি। মঙ্গলবারের পর তোমাদের সঙ্গে আর দেখা হবে না। শেষ দেখাটা হোক।ঠিক আছে, আসুন। এক ঘণ্টার মধ্যে আসবেন। আমি এক ঘণ্টা পর বাবাকে নিয়ে বের হব।আমি একটা ক্যাব নিয়ে চলে আসি? আপনার ব্যাপার।আমার একার ব্যাপার না। তোমারও ব্যাপার।আমার ব্যাপার কীভাবে?

ক্যাবেই আসি বাঁ হেলিকপ্টারেই আসি ভাড়া তো তোমাকেই দিতে হবে। আমার হাত খালি।আবার রসিকতা! আবার! আমি টেলিফোন অফ করে উঠে দাঁড়ালাম। আমার হাতে সুটকেস। সুটকেসে পঁচিশ লক্ষ টাকা। কোনো ছিনতাইকারী আমাকে একটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে সুটকেস নিয়ে দৌড় দিচ্ছে না কেন? দেশ থেকে কি ছিনতাই উঠে গেছে? মেস থেকে বেরুবার সময় মেসের ম্যানেজার বদরুলের সঙ্গে দেখা। বদরুল বলল, হিমু ভাইরে সব সময় দেখি সুটকেস লইয়া ঘুরেন। সুটকেসে আছে কী?আমি বললাম, টাকা।কত টাকা?

পঁচিশ লক্ষ টাকা।বদরুল শব্দ করে হাসা শুরু করল। তার হাসি দেখে মনে হচ্ছে এমন মজার কথা সে আগে কখনো শোনেনি। বদরুল আবার কাকে ডেকে যেন বলছে, হিমু ভাইয়ের সুটকেস–ভরতি টাকা। হা হা হা। পঁচিশ লক্ষ টাকা। হা হা হা।

মিতু সরু চোখে আমার সুটকেসের দিকে তাকিয়ে আছে। মনসুর সাহেবও তাকিয়ে আছেন। পিতা-কন্যা নিজেদের মধ্যে চোখাচোখিও করলেন। মিতু বলল, সুটকেসটা পরিচিত মনে হচ্ছে।আমি বললাম, তোমার সুটকেস, পরিচিত মনে হবারই তো কথা।সুটকেসটা কি ফেরত দিতে এসেছেন? না। মঙ্গলবার পর্যন্ত তোমার কাছে রেখে যেতে এসেছি। তোমাদের ফ্লাইট কখন?বিকালে।আমি সকালে এসে সুটকেস নিয়ে যাব।মনসুর সাহেব বললেন, ব্যাগে কি টাকা?

জি স্যার। জগলু ভাইকে টাকাটা এখনো দেওয়া হয়নি। আমি সুটকেস নিয়ে নিয়ে ঘুরছি। কয়েকটা দিন ঝাড়া হাত-পা হয়ে ঘুরতে চাই। সুটকেস-হাতে হাঁটা যায় না। রিকশা নিতে হয়। আমার কাছে রিকশা ভাড়া থাকে না।পিতা-কন্যা দুজনই এখন একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। পিতার দৃষ্টিতে ভয়। কন্যার দৃষ্টিতে বিস্ময়। – মনসুর সাহেব শান্ত গলায় বললেন, হিমু। আমি তোমার ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না।আমি বিনীত ভঙ্গিতে বললাম, কোন ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন না?

কিছুই বুঝতে পারছি না। বুঝতে চাচ্ছিও না। আমি খুব খুশি হব। তুমি যদি আমাদের জীবন থেকে অফ হয়ে যাও।মঙ্গলবারের পর অফ হই স্যার? মঙ্গলবার পর্যন্ত সুটকেসটা রাখুন। এই কয়টাদিন আমি অত্যন্ত ব্যস্ত থাকব। নানান জায়গায় ছোটাছুটি করতে হবে। সুটকেস-হাতে ছোটাছুটি করা যাবে না।কী নিয়ে ব্যস্ততা?

ভূতের বাচ্চা খুঁজতে হবে। ছেলে-বাচ্চা। একজনের ফরমায়েশ। তাকে একটা ছেলে–ভূতের বাচ্চা দিতে হবে।পিতা-কন্যা। আবারও মুখ-চাওয়াচাওয়ি করছেন। আমি তাদের সামনে সুটকেস রেখে চলে এলাম। ঘাড় থেকে ভূত নামাবার জন্যে সিন্দাবাদকে নানান কায়দাকানুন করতে হয়েছিল। আমাকে কিছু করতে হয়নি। যাদের ভূত তাদেরকে দিয়ে এসেছি।

আমি লক্ষ করেছি। প্রকৃতি কাকতালীয় বিষয়গুলো পছন্দ করে। মনসুর সাহেব আমাকে বললেন, আমি খুব খুশি হব। তুমি যদি আমাদের জীবন থেকে অফ হয়ে যাও। ঠিক একই বাক্য কিছুক্ষণের মধ্যেই যদি আরো একজন বলে তাকে কি কাকৃতালীয় বলা যাবে না? বাক্যের কোনো শব্দ এদিক-ওদিক নেই।মনসুর সাহেব আমাকে যা বলেছিলেন খালুসাহেব হুবহু তা-ই বললেন। মনসুর সাহেব শান্ত গলায় বলেছিলেন। খালুসাহেব বললেন সামান্য অস্থির ভঙ্গিতে। বেশিকম বলতে এইটুকুই।

হিমু, আমি খুব খুশি হব। তুমি যদি আমাদের জীবন থেকে অফ হয়ে যাও।আমি বসে আছি। খালুসাহেবের অফিসে, ঠিক তার সামনে। খালুসাহেব মাসে মাসে আমাকে কিছু হাতখরচ দেন। একটাই শর্ত, আমি বাদলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখব না। এই মাসে শর্ত পালন করা হয়নি। বাদলের সঙ্গে একই কামরায় একরাত কাটিয়েছি।আমি কী বলছি শুনতে পেয়েছ?

জি খালুসাহেব।তুমি আমাদের জীবন থেকে পুরোপুরি অফ হয়ে যাবে।মাঝেমধ্যে অনা হতে পারব না? ধরুন ঈদের চান্দে অন্য হলাম। বাকি সময়টা অফ।কখনো না। নেভার।হাত খরচ নেবার জন্যেও কি আসিব না? হাতখরচের কথা ভুলে যাও। তুমি যে-অপরাধ করেছ, তারপর হাতখরচ দেয়া দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পোষার চেয়েও খারাপ।আমি কী করেছি?তোমার ধারণা তুমি কিছু করনি?

জি না। বরং বাদলের মাথা থেকে গানটা দূর করে দিয়েছি। বাদল আপনাকে বলেনি? বলেছে।তা হলে আপনি আমার ওপর রাগ করছেন কেন? তুমি বাদলের মাথা থেকে গান তুলে এনে আমার মাথায় পুতে দিয়েছ, কাজটা তুমি করেছ ইচ্ছা করে। কারণ, আমি তোমাকে চিনি। আমার চেয়ে ভাল করে তোমাকে কেউ চেনে না।আপনার মাথায় কোন গান ঢুকিয়েছি? পাগলা হাওয়া?

হাওয়া-ফাওয়া না, হিন্দি গানটা। সঁইয়া দিল মে আনা… আমি এই গান জীবনে কোনোদিন শুনিনি। সেদিন অফিসে আসার সময় ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়েছি। এক রেস্টুরেন্টে গানটা বাজছিল। পুরোটা শুনলাম। তার পর থেকে গান মাথায় বাজছে।বের করার ব্যবস্থা করে দেব?

তোমাকে কিছু করতে হবে না। তুমি সামনে থেকে যাও।চা-নাশতা খেয়ে যাই। আপনার অফিস থেকে চা-নাশতা না খেয়ে গিয়েছি, এরকম মনে পড়ে না।এখন থেকে মনে পড়বে। যাও বিদায় হও।চা-নাশতা নাহয় না-ই খেলাম, এক গ্লাস পানি খেয়ে যাই? পানিও না। আমার অফিস এখন থেকে তোমার জন্যে কারবালা।আমি মুখ যথাসম্ভব করুণ করে বললাম, তা হলে কি চলে যাব?

খালুসাহেব বললেন, ভাগো হিঁয়াসে।হিন্দি গালির পর দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। তার পরেও দাঁড়িয়ে আছি। খালুসাহেবের রাগের শেষ পর্যায়টা দেখতে ইচ্ছা করছে। শেষ পর্যায়ে এসে কী করবেন? ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবেন? দারোয়ান ডাকবেন? আরেকটা সম্ভাবনা আছে, ধাপ করে রাগ পড়ে যেতে পারে। মানুষের মস্তিষ্ক তীব্র আবেগ বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারে না। তীব্র আবেগের উচ্চ–স্তর থেকে মস্তিষ্ককে নামতেই হবে।

মনে হচ্ছে খালুসাহেব সেই তীব্র পর্যায়ে এখনো পৌঁছাননি। এখন তিনি চোখ সরু করে তাকিয়ে আছেন। মুখ সামান্য হাঁ-করা। মুখ থেকে হিসহিস জাতীয় শব্দ হচ্ছে। আমি কি খালুসাহেবকে আবেগের অতি উচ্চস্তরে পৌঁছানোর ব্যাপারে সাহায্য করব? এখন তাকে অতি সহজ ভঙ্গিতে উলটাপালটা দুএকটা কথা বললেই হবে।কী ব্যাপার, দাঁড়িয়ে আছ যে?

আমি বিনীত ভঙ্গিতে বললাম, খালুসাহেব, আমি দাঁড়িয়ে আছি না। তো! আমি এখনো বসে আছি। আপনার কাছে কি মনে হচ্ছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি? তা হলে তো আপনার প্ৰেশার হাই হয়েছে। আপনার প্ৰেশারটা মাপানো দরকার।তুমি বসে আছ?

জি খালুসাহেব। আমি আপনার সামনের চেয়ারটায় বসে আছি। কিছুক্ষণ আগেও পা নাচাচ্ছিলাম, আপনার রাগ দেখে পা নাচানো বন্ধ করেছি।খালুসাহেব হকচাকিয়ে গেলেন। তিনি চোখে দেখছেন। আমি দাঁড়িয়ে আছি (তা-ই দেখার কথা, আমি দাঁড়িয়েই আছি), অথচ আমার কথাও ফেলতে পারছেন না।খালুসাহেব, আমি চলে যাচ্ছি। আপনিও বাসায় চলে যান। রেস্ট নিন। ঘুমের ওষুধ খেয়ে টানা ঘুম দেন। এখনো কি আপনার কাছে মনে হচ্ছে আমি দাঁড়িয়ে আছি?

হুঁ।আমার ধারণা, আপনার মস্তিষ্ক অতিরিক্ত উত্তেজিত। আমার উপস্থিতি সম্ভবত আপনার মস্তিষ্ক নিতে পারছে না। আমি বরং চলে যাই।না, তুমি বসো।আমি তো বসেই আছি।বসে আছ? জি।

খালুসাহেব বিড়বিড় করে বললেন, ও মাই গড়! বলেই চোখ বন্ধ করলেন। আমি তৎক্ষণাৎ চেয়ারে বসে পড়লাম। খালুসাহেব চোখ মেলে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে ভীতগলায় বললেন, তুমি কি এখন বসে। আছ? না-কি দাঁড়িয়ে আছ?আপনার কাছে কি এখনো মনে হচ্ছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *