তিনি জবাব দিলেন না। বড় করে নিশ্বাস ফেললেন। আমি বললাম, আপনার প্ৰেশারটা তো মনে হয় মাপানো দরকার। আমি কি ফার্মেসি থেকে কোনো–একজনকে প্ৰেশার মাপার জন্যে ধরে নিয়ে আসবে? খালুসাহেব ক্ষীণগলায় বললেন, আরো কিছু সময় পার হোক। তুমি এখন বসে আছ না। দাঁড়িয়ে আছ?
বসে আছি।একটু দাঁড়াবে? অবশ্যই দাঁড়াব।আমি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললাম, আপনার কাছে কি এখনো মনে হচ্ছে আমি বসে আছি? না।তা হলে তো মনে হয় আপনি ঠিক হয়ে গেছেন। খালুসাহেব আমি যাই।যাই-যাই করছি কেন? বসো।জি আচ্ছা। চা দিতে বলুন। চা খাই। চায়ের সঙ্গে নাশতা। সকালে কিছু খাইনি।
খালুসাহেব বেল টিপে বেয়ারাকে চা-নাশতার কথা বললেন।আমি চা খাচ্ছি। খালুসাহেব আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তবে এখন তাঁর দৃষ্টি স্বাভাবিক। মস্তিষ্ক মনে হয় অতি উত্তেজিত অবস্থা থেকে নরমাল অবস্থায় দ্রুত ফিরে আসছে।হিমু! জি খালুসাহেব? প্রশ্ন করলে সত্যি জবাব দেবে? অবশ্যই। আমি নিতান্ত প্রয়োজন না হলে মিথ্যা বলি না।
খালুসাহেব সিগারেট ঠোঁটে নিয়ে দেয়াশলাই জ্বালিয়ে ধরালেন। প্রথমবারে পারলেন না। কয়েকটা কাঠি নষ্ট হলো। সিগারেটে লম্বা লম্বা টান দিয়ে নাকে-মুখে ধোঁয়া বের করতে করতে বললেন, তুমি আমার কাছে চা খেতে চেয়েছিলে, আমি না করে দিলাম। অফিস থেকে বের করে দিতে চেয়েছিলাম। তখন তুমি ঠিক করলে যে-করেই হোক তুমি অফিসে থাকবে। চা-নাশতা খাবে। তারপর মাসের টাকাটা নিয়ে বিদেয় হবে। তোমার উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে তুমি একটা কৌশল বের করলে। আমাকে বিভ্রান্ত করলে। আমি কি ঠিক বলছি?
জি খালুসাহেব।দাঁড়িয়ে থাকা বসে থাকার খেলা খেললে। দাঁড়িয়ে থেকেও বললে বসে আছি। ঠিক বলেছি? জি খালুসাহেব।তুমি যে অতি বিপজ্জনক একটি প্রাণী তা কি তুমি জানো? না খালুসাহেব, এটা জানি না।তুমি অতি বিপজ্জনক।খালুসাহেব মানিব্যাগ খুলে টাকা বের করতে করতে বললেন, তোমার মাসিক অ্যালাউন্স। আমি দিয়ে দিচ্ছি, এখন চলে যাও।জি আচ্ছা।
প্রতিমাসের দুই তারিখে এসে টাকা নিয়ে যেও, আমি তোমার অ্যালাউন্স বন্ধ করব না।থ্যাঙ্ক য়্যু।তবে তুমি আমার কাছে আসবে না। আমার সেক্রেটারির কাছ থেকে টাকা নিয়ে যাবে।জি আচ্ছা।খালুসাহেব সিগারেটে শেষ লম্বা টান দিয়ে সিগারেট অ্যাশট্রেতে রাখতে রাখতে বললেন, এখন তোমাকে অতি ভদ্রভাবে বলছি চলে যাও। নো হার্ড ফিলিংস।আমি খালুসাহেবের অফিস থেকে সরাসরি চলে এলাম রমনা পার্কে।
দুপুরে ঘুমানোর জন্যে রমনা পার্ক অতি উত্তম জায়গা। এই সময় পার্ক থাকে। ফাকা। যে–কোনো একটা খালি বেঞ্চের দখল অতি সহজেই নেওয়া যায়। মাথার ওপর ঘন পাতার গাছ দেখে বেঞ্চ খুঁজে নিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়া। মাথা-মালিশের ছেলে।পুলে দুপুরবেলায় বেশি ঘুরঘুর করে। তাদের কোনো-একজনকে ডেকে নিলে আরামের ষোলোকলা পূর্ণ হবে। এরা ঘণ্টা হিসেবে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। পাঁচ টাকা করে ঘণ্টা।
এখন আমার মাথার ওপর দুটা বড় সাইজের ছাতিম গাছ। ছাতিম গাছের পাতার ছায়া পড়েছে বেঞ্চে। আমি পা লম্বা করে শুয়ে আছি। আমার মাথায় ঝাঁঝালো সরিষার তেল মালিশ করে দিচ্ছে জিতু মিয়া। তার দায়িত্ত্ব শুধু তেল মালিশ করা না, আমি যেন নির্বিয়ে দুই ঘণ্টা ঘুমুতে পারি সেই ব্যবস্থা করা। জিতু মিয়া বলেছে, ভাইজান লিচ্চিন্ত থাহেন।
আমি লিচিন্ত আছি।জিতু মিয়া মাথা-মালিশের ব্যাপারে এক্সপার্ট বলেই মনে হচ্ছে। নানানভাবে দলাইমলাই করছে। আমার চোখ ভারী হয়ে আসছে। ঘুমিয়ে পড়লে মাথা-মালিশের আরাম থেকে বঞ্চিত হব বলে প্ৰাণপণে জেগে থাকার চেষ্টা করছি। জিতুর সঙ্গে টুকটাক কথাও বলছি।দুপুরে খাওয়াদাওয়া হয়েছে?
নাহ্।কিছু রোজগার হয় নাই?নাহ্।আমি প্রথম কাস্টমার? সকালে একজন পাইছিলাম। হে খারাপ কাজ করতে চায়।তোর কি চুরির অভ্যাস আছে? অল্পবিস্তর আছে।চুরিটা করিস কখন? কাস্টমার ঘুমিয়ে পড়লে?
জিতু মিয়া ফিক করে হেসে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, আমার পকেটে মোবাইল টেলিফোন আছে। টাকা আছে। চুরি যদি করিস মোবাইলটা নিস না। অন্যের জিনিস।আপনি লিচ্চিন্তে ঘুমান। আপনের জিনিস নিমুনা।নিবি না কেন? আফনেরে চিনি। আফনে হইলদা সাধু।আমার নাম জানিস?
আপনে হিমু ভাইজান। আপনে কতবার পার্কে আইসা ঘুম গেছেন। একবার আপনের পকেট থাইক্যা সাতশ টাকা চুরি গেছিল।তুই নিয়েছিলি? আমার ভাই নিছিল।সে কই? তার খুঁজ নাই।তোরা কি দুই ভাই।একটা ভইনও আছে।নাম কি বোনের? কালিমা।কালিমা কীরকম নাম? গায়ের রং কলো? কালো না, ময়লা।বোন থাকে কই? তারও খুঁজ নাই।এখানে দুপুরে খাওয়াদাওয়া কী পাওয়া যায়?
সবই পাওয়া যায়। ভাত-মাছের হোটেল আছে, কাচিচ্চ বিরিয়ানি, মোরগপোলাও আছে।তোর কোনটা পছন্দ? ভাত-মাছ, না মোরগপোলাও, কাচিচ্চ বিরিয়ানি? মোরগপোলাও।আমি ঘুমিয়ে পড়লে পকেট থেকে টাকা নিয়ে মোরগপোলাও খেয়ে আসবি।আফনে ঘুম থাইক্যা উঠেন, তার পরে খামুনে।সেটাও খারাপ হয় না। আমিও দুপুরে কিছু খাইনি, একসঙ্গে খাব। এরা মোরগপোলাও রাধে কেমন?
জব্বর রান্ধে। এক মাইল দূর থাইক্যা বাস আসে।এই জিনিস খেয়ে দেখা দরকার। ঘুম থেকে উঠে নেই, ডাবল মোরগপোলাও খাব।কতক্ষণ। ঘুমিয়েছি জানি না। ঘুম ভাঙল মোবাইলের শব্দে। গানের মতো সুরে পকেটে মোবাইল বাজছে। কানে ধরতেই জগলু ভাইয়ের কঠিন গলা শোনা গেল, মোবাইল ধরো না কেন? রিংয়ের পর রিং হচ্ছে, ধরছ না।আমি মধুর গলায় বললাম, কেমন আছেন জগলু ভাই?
মোবাইল ধরতে এতক্ষণ লাগল কেন?ঘুমাচ্ছিলাম জগলু ভাই।আমার জিনিস কোথায়? সেইফ জায়গায় আছে।তুমি কোথায়? পার্কে।কোথায়? পার্কে। রমনা পার্কে।পার্কে কি কর।ঘুমাচ্ছি।পার্কে ঘুমাচ্ছ? ঘুমাবার জন্য অতি উত্তম জায়গা জগলু ভাই। সব ধরনের মানুষের ঘুমানোর ব্যবস্থা আছে।ঠিক কোন জায়গায় আছ বলো, আমি দশ মিনিটের মধ্যে উপস্থিত হব। জিনিস নিয়ে যাব।আপনি এতদিন ছিলেন কোথায়?
আমি এতদিন কোথায় ছিলাম সেটা দিয়ে তোমার দরকার নেই।দুপুরে কি খাওয়াদাওয়া করেছেন? খাওয়াদাওয়া না করলে আমার সঙ্গে খেতে পারেন। এখানে অসাধারণ মোরগপোলাও পাওয়া যায়, যার সুঘ্ৰাণ এক মাইল দূর থেকে পাওয়া যায়।তুমি কোথায় আছ, আমি কোন গেট দিয়ে ঢুকব সেটা বলো।আপনি একা আসবেন? না সঙ্গে লোকজন থাকবে?
কোনো বাড়তি কথা না। যেটা জানতে চাচ্ছি সেটা বলো।আঙুল-কাটা জগলু ভাই আমার পাশে বেঞ্চিতে বসে আছেন। তার চুলী সুন্দর করে আঁচড়ানো। চোখে সানগ্লাস। ইন্ত্রি-করা হালকা সবুজ রঙের শার্ট ইন করে পরেছেন। প্যান্টের রং ধবধবে সাদা। পায়ের কালো জুতা চকচক করছে। মনে হচ্ছে এখানে আসার আগে বুট-পালিশওয়ালাকে দিয়ে জুতা পালিশ করিয়েছেন। গায়ে সেন্ট মেখেছেন। তবে সেন্টের গন্ধ ভালো না। নাকে লাগে।জগলু ভাইয়ের বসে থাকার মধ্যে হতভম্ব ভাব আছে। মনে হচ্ছে তিনি জমে পাথর হয়ে গেছেন। সুটকেস মনসুর সাহেবের বাসায় রেখে এসেছি শোনার পর থেকে তার এই অবস্থা।
জিতু মিয়াকে তিন ডাবল মোরগপোলাও আনতে পাঠিয়েছি। সে বলেছে আনতে দেরি হবে। ফ্রেশ রান্না করিয়ে আনবে। আমি এবং জগলু ভাইয়ের আশপাশে কেউ নেই। তার পরেও জাগলু ভাই যে চারদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন তা বোঝা যাচ্ছে। তিনি একা আসেননি। তার সঙ্গে আরো দুজন আছে। এই দুজনের কাউকেই আগে দেখিনি। এরা দূর থেকে জগলু ভাইয়ের দিকে লক্ষ রাখছে।
তুমি সুটকেস মনসুর সাহেবের বাসায় রেখে এসেছ? জি। আপনার কোনো খোঁজ পাচ্ছি না, এই জিনিস নিয়ে কোথায় কোথায় ঘুরব? তুমি এক্ষুনি এই মুহুর্তে আমার জিনিস। এনে দেবে। যদি না পার তোমার কিন্তু সময় শেষ।আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, এনে দেব। কোনো অসুবিধা নেই। বসে আছ কেন? উঠে দাড়াও। জিনিস নিয়ে কি আমি পার্কে আসব? আপনারা এইখানে অপেক্ষা করবেন?
জগলু ভাই জবাব দিলেন না। সিগারেট ধরালেন। আমি বললাম, ভালোমতো চিন্তাভাবনা করে বলুন।তুমি এইখানেই নিয়ে আসবে।ঠিক আছে। খাওয়াদাওয়া করে তারপরে যাই। আপনার জন্যেও মোরগপোলাও আনতে পাঠিয়েছি।তুমি এক্ষুনি যাবে। এই মুহূর্তে।আমি উদাস গলায় বললাম, জগলু ভাই, আমি না খেয়ে যাব না।তোর বাপ যাবে।
আমি সহজ গলায় বললাম, আমার বাপও যাবে না। তার পক্ষে যাওয়া সম্ভব না। আর আমি নিজেও যাব না। আসুন খাওয়াদাওয়া করি, তারপর ব্যবস্থা করছি। খাওয়াদাওয়া করলে আপনার নিজের মেজাজও ঠাণ্ডী হবে। ঠাণ্ডা মাথায় আমরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।তোকে এখনই গুলি করে মেরে ফেলব, হারামজাদা।এখন মেরে ফেললে সুটকেস কে এনে দেবে?
শুয়োরের বাচ্চা, চুপ।আমি জগলু ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, তুই চুপ।জগলু ভাই হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকালেন। তিনি মনে হয় তার সমস্ত জীবনে এত বিস্মিত হননি। আমি ঠিক আগের মতো ভঙ্গিতে বললাম, মোরগপোলাও আসছে, সোনামুখ করে মোরগপোলাও খাবি। বুঝেছিস? তেড়িবেড়ি করলে থাপ্পড় খাবি।
জিতু মিয়া খাবার নিয়ে আসছে। তার মুখ হাসিহাসি। আমি জগলু ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, খাওয়ার পর পান খাওয়ার অভ্যাস আছে? তোর জন্যে পান আনিয়ে রাখব? এরকম করে তাকাচিচ্ছস কেন? তোকে এর আগে কেউ তুই করে বলে নাই? জগলু ভাই মোরগপোলাও খাচ্ছেন। আগ্রহ করেই খাচ্ছেন। তাঁর চেহারা থেকে হতভম্ব ভাবটা অনেকখানি কেটেছে। আমি বললাম, মোরগপোলাওটা ভালো না জগলু ভাই?
তিনি বললেন, হুঁ।আমি বললাম, আপনার ছেলেরও তো মোরগপোলাও পছন্দ।জগলু ভাই বলল, তুমি জানলে কীভাবে?আমার সঙ্গে কথা হয়। সে জন্মদিনে মোরগপোলাও খাবে বলে বলেছে। আমরা এই বাবুর্চিকেই অর্ডার দিয়ে রাখি? জগলু ভাই বললেন, ওর সঙ্গে তোমার আর কী কথা হয়েছে?জন্মদিনে সে কী উপহার চায় সেটা আপনাকে বলতে বলেছে।কী উপহার চায়?
একটা ছেলে-ভূতের বাচ্চা চায়। খেলনা না। আসল জিনিস।ছেলে-ভূতের বাচ্চা আমি পাব কোথায়? এটা তার মাথায় আসলো কেন? তোমার সঙ্গে কি তার প্রায়ই কথা হয়।মাঝে মাঝে হয়। আপনার সঙ্গে কথা হয় না? না।টেলিফোন করেন না কেন? টেলিফোন করলেই তাকে দেখতে যেতে বলবে। সেটা কখনো পারব না।পারবেন না কেন?
পুলিশের ইনফরমার সবসময় নজর রাখছে। ফোন করলেই ধরা পড়ব। মতিকে পাঠিয়েছিলাম। পুলিশ তাকেও ধরে নিয়ে গেছে। কোথায় নিয়ে গেছে। জানি না। মনে হয় মেরেই ফেলেছে।খাওয়া শেষ করে জগলু ভাই পান খেলেন। সিগারেট ধরালেন, তার চেহারায় কিছুক্ষণের জন্য হলেও একটা সুখী-সুখী ভাব চলে এল। আমি বললাম, জগলু ভাই একটা কাজ করুন লম্বা হয়ে বেঞ্চীতে শুয়ে পড়ুন।কেন?
জিতু মিয়া আপনার মাথা মালিশ করে দেবে। মাথা মালিশে ডিগ্ৰী দেবার ব্যবস্থা থাকলে এই বিষয়ে সে Ph.D. পেয়ে যেত। জিতু আপনার মাথা মালিশ করবে। আপনি পাঁচ-দশ মিনিটের তোফা ঘুম দেবেন। দুপুরের ঘুমটাকে কি বলে জগলু ভাই?
সিয়াস্তা! আপনি সিয়াস্তায় চলে যাবেন। আমি আপনার কানের কাছে রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা আবৃত্তি করব।তুমি রবার্ট ফ্রস্ট জান? কয়েকটা জানি। আপনি শুনলে অবাক হবেন আমার বাবা আপনার মতই ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন। আপনাকে কি দুই-এক লাইন রবার্ট ফ্রস্ট শুনাব?
না। তুমি জিতু মিয়াকে সামনে থেকে যেতে বল।সে তো আপনার সামনেই বসে আছে।জগলু ভাই জিতু মিয়ার দিকে তাকিয়ে কঠিন ধমক দিলেন— যা ভাগ লাথি দিয়ে কোমড় ভেঙ্গে ফেলব।জিতু মিয়া মুখ শুকনা করে উঠে চলে গেল। আমি বললাম, জগলু ভাই জনগণের সঙ্গে আপনার ব্যবহার তো খুবই ভাল।
তিনি আড়াচোখে আমার দিকে তাকিয়ে আরেকটা সিগারেট ধরালেন। আমি বললাম, জগলু ভাই টপ টেরার হতে হলে কি কি গুণাবলী লাগে একটু বলবেন?কেন? কৌতূহল। এর বেশি কিছু না। আমি নিজে চিন্তা করে কয়েকটা পয়েন্ট বের করেছি। আপনার সঙ্গে মিলে কি-না বুঝতে পারছি না। বলব?
বল শুনি।প্রথমেই লাগে খারাপ বাবা-মা। একটা ভাল বাবা এবং একটা খারাপ মা কখনো-সন্ত্রাসী ছেলের জন্ম দিতে পারেন না।জগলু ভাই হাতের সিগারেট ফেলে দিয়ে বললেন, তুমি তোমার স্বভাব মত আমার সঙ্গে ফাইজলামী করছ। এটা আর করবে না।জ্বি আচ্ছা করব না।আমার বাবা-মা আদর্শ মানুষ ছিলেন। বাবা ছিলেন নান্দিনা হাই স্কুলের অংকের শিক্ষক। বাবার যে কোন একজন ছাত্রকে ডেকে তুমি যদি বল— অংক বদরুলকে চোন? সেই ছাত্র চোখের পানি ফেলে দেবে।উনার নাম অংক বদরুল? হুঁ। বাবা কি রকম মানুষ ছিল শুনতে চাও?
চাই।বাবাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করত। আপনার ছেলে-মেয়ে কি? বাবা বলত আমার দুই মেয়ে, পুত্র সংখ্যা কয়েক হাজার। বাবা তার সব ছাত্রকে পুত্ৰ মনে করত।পনেরো-বিশ বছরের পুরাতন ছাত্রদের নামও বাবার মনে থাকত। একটা ঘটনা বলি শোন— বাবার সঙ্গে নিউমার্কেট কাচা বাজারে গিয়েছি। এক লোক বিশাল সাইজের একটা কাতল মাছ কিনছে। সম্ভবত বাজারের সবচে বড় কাতল। তার চারদিকে ভিড় জমে গেছে। বাবা ভিড় ঠেলে লোকটার কাছে গিয়ে বললেন, তুই মাসুদ না? তোকে একবার চড়মেরেছিলাম মনে আছে? এক থাপ্পর খেয়ে তোর জ্বর এসে গেল। ঐ লোক সঙ্গে সঙ্গে বাবার পায়ে পড়ে গেল। তাকে টেনে তোলা যায় না। এমন অবস্থা।
আমি বললাম, তারপর ঐ লোক কি করল? কাতল মাছটা আপনাদের বাড়িতে দিয়ে গেল? তুমি জান কিভাবে? অনুমান করছি।এখানে অনুমানের কোনো ব্যাপারই নাই। অবশ্যই এই ঘটনা তুমি জান। কিভাবে জান বল। এই মুহূর্তে বল।ড্রাঙ্গালু ভাই আপনি খামাখা উত্তেজিত হচ্ছেন। আমি অনুমানে বলছি।অনুমানটা করলে কিভাবে?
আপনার বাবার একজন ছাত্র আপনার বাবাকে দেখে তার পা ছয়ে সালাম করেছে এটা তো কোনো বড় ঘটনা না। একজন প্রিয় শিক্ষকের দেখা পেলে সব ছাত্ররাই এ রকম করবে। ঐ ছাত্র বিশাল কাতল মাছটা আপনাদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে এটাই ঘটনা। এই কারণেই আপনি ঘটনাটা মনে রেখেছেন।তোমার যুক্তি ঠিক আছে।আমি বললাম, আপনার বাবা কি আপনার উত্থান দেখে যেতে পেরেছেন?
জগলু ভাই জবাব দিলেন না। আমি বললাম, জগলু ভাই আপনি আপনার বাবার গল্প খুব আনন্দ নিয়ে করেছেন। গল্পের একটা পর্যায়ে দেখলাম। আপনার চোখ চিকচিক করছে। বাবার গল্প করে যে আনন্দ আপনি পেয়েছেন সেই আনন্দ কিন্তু আপনার ছেলে বাবু পাবে না। আপনাকে নিয়ে কোনো গল্প করতে গিয়ে তার চোখ চক চক করবে না।উপদেশ দিচ্ছ?
জ্বি না।থাপ্পর দিয়ে তোর দাঁত ফেলে দিব হারামজাদা।দাঁত ফেলে দেবেন?অবশ্যই দাঁত ফেলে দেব। তুই লেকচার কপচাচ্ছিস। তুই আমাকে মরালিটি শিখাস? একটা সোসাইটিতে সব ধরনের মানুষ থাকবে। সাধুসন্ত্রাসী যেমন থাকবে, চোর-ডাকাতও থাকবে। সন্ত্রাসী থাকবে, চাঁদাবাজ থাকবে। তুই জঙ্গলে কখনও ঢুকেছিস। জঙ্গলে ফলের গাছ যেমন আছে— কাঁটা গাছও আছে।
ফুলের বাগানে কিন্তু শুধু ফুল গাছেই আছে।ঐ ফুলের বাগান মানুষের তৈরি প্রকৃতির তৈরি না।প্রকৃতি সব দিয়েছে যাতে আমরা মানুষরা বিচার-বিবেচনাকরে ভালমন্দ আলাদা করতে পারি।চুপ।জগলু ভাই উঠে দাঁড়ালেন। আমিও উঠে দাঁড়ালাম। জগলু ভাই থমথমে গলায় বললেন, তুই যাচ্ছিস কোথায়?
আপনাকে সুটকেসটা দিতে হবে না? চলুন আমার সঙ্গে সুটকেস রিলিজ করে আপনার হাতে হাতে দিয়ে দেই।চল।মাঝখানে শুধু দুই মিনিট সময় নেব। একটা রাস্তায় দুই মিনিটের জন্যে যাব। আপনার কি অসুবিধা আছে জগলু ভাই? জগলু ভাই জবাব দিলেন না। আরেকটা সিগারেট ধরালেন।জগলু ভাই আমার পেছনে পেছনে আসছেন। কালো চশমায় তাকে অন্ধ রবীন্দ্র সংগীত শিল্পীর মত লাগছে। তবে এই রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী অস্থির প্রকৃতির। সারাক্ষণই এদিক-ওদিক দেখছেন। খুট করে সামান্য কোনো শব্দ হল— সঙ্গে সঙ্গে সেদিকে তাকালেন। এই অবস্থা।
একটু পরপর আকাশের দিকেও তাকাচ্ছেন। আকাশে মেঘের ঘনঘটা। আমাদের রিকশা নেয়া উচিত ছিল। জগলু ভাই রিকশা নেবেন না। যে গাড়িতে করে এসেছেন সেই গাড়িও গলির ভেতর ঢুকাবেন না। তার নাকি সমস্যা আছে।কলাবাগানের গলিতে যখন ঢুকছি। তখন পটকা-ফাটা কিংবা রিকশার টায়ার-ফাটা শব্দ হল। জগন্দু ভাই লাফিয়ে উঠলেন। বডিগার্ড ধরনের যে দুজন তার সঙ্গে ছিল তারা এখনও আছে।
বডিগার্ড দুজনের একজন বোকা টাইপ চেহারার। সে মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটে। কোন কিছুতেই বিচলিত হয় না। আরেকজন জগলু ভাইয়ের চেয়েও অস্থির। সে কিছুক্ষণ পরপর দাঁড়িয়ে পড়ে এবং পেছন দিকে তাকায়। তার মনে হয় ঘাম রোগ আছে। কপাল বেয়ে ঘাম পড়ছেই। যখন সে দাঁড়িয়ে যায়। তখন রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে।জগলু ভাই বললেন, তুমি কার বাসায় যাচ্ছ? আমি বললাম, শুভ্রর বাসায় যাচ্ছি।শুভ্ৰ কে?
আমার অতি ঘনিষ্ট এক বন্ধু। তার সঙ্গে দুই মিনিট কথা বলব।আপনি ইচ্ছা করলে বাড়ির সামনে দাঁড়াতে পারেন। কিংবা আমার সঙ্গে বাড়িতে ঢুকতেও পারেন।আমি বাইরে দাঁড়াব। তুমি দুই মিনিটের বেশি এক সেকেন্ড দেরী করবে না। তোমার বন্ধুর সঙ্গে আজ দেখা না করলে হয় না।খুবই জরুরি দরকার। সে আমাকে একটা ধাঁধা দিয়েছিল। ধাঁধার উত্তর বের করেছি। তাকে সেটা জানানো দরকার।কী ধাঁধা? এমন কি বস্তু যার জীবন আছে কিন্তু সে খাদ্য গ্ৰহণ করে না! যে সন্তান জন্ম দেয়। কিন্তু সস্তানকে চোখে দেখে না! এমন কিছু কি আছে? অবশ্যই আছে।সেটা কী?
চিন্তা করে বের করুন এটা কি! আবার বলো তো– এমন কি বস্তু যার জীবন আছে কিন্তু সে খাদ্য গ্ৰহণ করে না! যে সন্তান জন্ম দেয়। কিন্তু সন্তানকে চোখে দেখে না! ভাল যন্ত্রণা তো! জটিল ধাঁধা।জটিল ধাঁধার উত্তর সহজ হয়। আপনি সহজভাবে চিন্তা করুন। জটিলভাবে করবেন না।
বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করেছে। বড় বড় ফোটা। লক্ষণ ভাল না। ঝুম বৃষ্টির পূর্বাভাস। শুভ্রদের বাড়ির গেট পর্যন্ত আসতেই ঝুম বর্ষণ শুরু হল। আমি জগলু ভাইকে নিয়েই বাড়িতে ঢুকলাম। বাড়ি বলা ঠিক হয় না। টিনের ছাউনি। ছাউনির ভেতর সিমেন্টর বস্তা, রড রাখা। তার ফাকে বড় চৌকি পাতা। চৌকির উপর বসে যে লেখাপড়া করছে তার নামই শুভ্র।
শুভ্রর বয়স দশ। রাজপুত্রদের চেহারার যে বর্ণনা পাওয়া যায়— সে রকমই তার চেহারা। বড় বড় চোখ। চোখে বুদ্ধি ঝলমল করছে। শুভ্রর বাবা জায়গাটার কেয়ারটেকার। এখানে যে বহুতলা ফ্ল্যাটবাড়ি হবে তিনিই সেটা দেখাশোনা করছেন। জগলু ভাই বললেন, এই ছেলে কে?
আমি বললাম শুভ্র। আমার বন্ধু। এই পৃথিবীর দশজন সেরা বুদ্ধিমান বালকদের একজন।কার ছেলে? যার ছেলে তার নাম নেয়ামত। এই পৃথিবীর দশজন সৎ মানুষদের তিনি একজন।এর সঙ্গে পরিচয় হল কিভাবে? আপনার সঙ্গে যেভাবে পরিচয় হয়েছে নেয়ামত ভাইয়ের সঙ্গেও একইভাবে পরিচয় হয়েছে। হঠাৎ দেখা। হঠাৎ পরিচয়।জগলু ভাই চোখ থেকে চশমা খুলেছেন। তাঁর দৃষ্টি শুভ্রর দিকে। সেই দৃষ্টিতে আগ্রহ এবং কৌতূহল। আমি বললাম, এই তোর বাবা কই?
শুভ্ৰ আমার দিকে না তাকিয়ে বলল, চিটাগাং।যতবারই শুভ্ৰকে দেখতে এসেছি ততবারই সে প্রথম কিছুক্ষণ এমন ভাব করেছে যে আমাকে দেখতে পাচ্ছে না। কথা বলে অন্য দিকে তাকিয়ে। কথা বলার ভঙ্গিটা— অপরিচিত কারো সঙ্গে কথা বলছে।চিটাগাং কবে গিয়েছে? গতকাল।তোকে ফেলে রেখে চলে গেছে? শুভ্ৰ জবাব দিল না।রাতে এখানে একা ছিলি? হুঁ।ভয় পেয়েছিলি? হুঁ।আজ রাতেও একা থাকিবি? হুঁ।ভয় পাবি না?
পাব।মাঝে মাঝে ভয় পাওয়া ভাল। ভয় পেলে শরীরের সব যন্ত্রপাতি ঝাকুনির মত খায়। শরীর ভাল থাকে। যারা সব সময় ভয়ের মধ্যে থাকে তাদের শরীর ভাল থাকে।এই বলে আমি জগলু ভাইয়ের দিকে তাকালাম। জগলু ভাই বললেন, একটা বাচা ছেলেকে একা রেখে বাবা চিটাগাং চলে গেছে। এটা কেমন কথা?
