আঙুল কাটা জগলু পর্ব -০৭ হুমায়ূন আহমেদ

আঙুল কাটা জগলু

ডেডবডি। পত্রিকায় পড়েছেন নিশ্চয়ই, কুখ্যাত সন্ত্রাসী মতি মিয়া ক্রসফায়ারে মারা গেছে। তার ডেড বডি নিয়ে যাত্রা করেছি। খালুসাহেব, আমাদের জন্য একটু দোয়া রাখবেন। আপনি কি বাদলের সঙ্গে কথা বলবেন?

খালু সাহেব স্পষ্ট স্বরে বললেন, না। বলেই টেলিফোন অফ করে দিলেন।আমরা রোয়াইলবাড়ি পৌছিলাম সন্ধ্যাবেলা। পরিকল্পনা ছিল ঘণ্টাখানেকের মধ্যে দাফন-কাফন শেষ করে ঢাকার দিকে রওনা হব। নানান ক্যাচাল শুরু হয়ে গেল। জাগ্ৰত জনতা আমাদের ঘিরে ধরল। জাগ্ৰত জনতার মুখপাত্ৰ জামে মসজিদের পেশ ইমাম মওলানা তাহেরউদ্দিন জ্বালাময়ী ভাষণ দিলেন। তাঁর বক্তব্য, অতি দুষ্ট সন্ত্রাসীর কবর রোয়াইলবাড়িতে হবে না।

জাগ্ৰত জনতাকে কখনো কিছু বোঝানো যায় না। তাদেরকে কিছু বলা বৃথা। আমরা সেখান থেকে রওনা হলাম মতি মিয়ার মামার বাড়ি বাল্লা গ্রাম। এই গ্রাম যেহেতু অতি প্রত্যন্ত অঞ্চলে, সেখানে জাগ্ৰত জনতার দেখা পাবার কথা না।দেখা গেল আমার অনুমান ভুল। বাল্লা গ্রামের জনতা আরো বেশি জাগ্রত। তাদের মূর্তি আরো উগ্ৰ। বাল্লা গ্রামের জাগ্ৰত জনতার মুখপাত্র জনৈক হিন্দু মেম্বার। তার নাম যাদব।

যাদববাবু চোখ-মুখ লাল করে বললেন, আপনাদের বিবেচনা দেখে অদ্ভুত হয়েছি। এমন এক খুনিকে আমাদের গ্রামে নিয়ে এসেছেন! আমি বললাম, এখন তো সে আর খুন করতে পারবে না। কবরে ঢুকায়ে দেবেন। শরীর পচে-গলে যাবে।অসম্ভব! অসম্ভব! আপনারা যদি এক্ষণ বিদায় না হন, অসুবিধা আছে।কী অসুবিধা?

সেটা মুখে বলব না। কাজে দেখবেন।আমি জগলু ভাইকে টেলিফোন করলাম। জানতে চাইলাম কী করণীয়। জগলু ভাই শান্ত গলায় বললেন, লাশ ফেলে চলে আসো।কোথায় ফেলে আসবে?

যেখানে ইচ্ছা ফেলে আসো।বলেই জগলু ভাই টেলিফোন অফ করে দিলেন। বাদল আমার দিকে তাকিয়ে হাসি–হাসি মুখে বলল, খুবই মজা লাগছে। গুড অ্যাডভেঞ্চার। ডেড বডি নিয়ে ঘুরছি। কবর দেয়ার জায়গা পাচ্ছি না। সো ইন্টারেস্টিং। সো ম্যাচ ফান—

দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী আঙুল-কাটা জগলু ভাইয়ের ডানহাত মতি মিয়ার ডেডবডি নিয়ে আমরা মোটামুটি ভালো ঝামেলাতেই পড়ে গেলাম। রাত একটা থেকে শুরু হয়েছে বৃষ্টি। এমন বৃষ্টি যে দুই হাত সামনে কী হচ্ছে দেখা যায় না। আমরা ঢাকার দিকে ফিরে আসছি। শেষ চেষ্টা হিসেবে আজিমপুর গোরস্তানে ট্রাই করব এরকম পরিকল্পনা।

নিশিরাতে সাধারণ শব্দও কানো অন্যরকম শোনায়। গাড়ির চাকার শব্দ, বাতাসের শব্দ এবং বৃষ্টির শব্দ—সব মিলেমিশে একাকার হয়ে কেমন ভৌতিক আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। মাঝেমধ্যেই মনে হচ্ছে সাদা চাদরে মুড়ি দেওয়া মতি মিয়া কাশছে। বুড়ো মানুষের খকখক কাশির মতো কাশি।বাদল চমকে উঠে বলল, ভাইজান, কে কাশে? মাইক্রোবাসের ড্রাইভার নিয়ামত আলি চাপাগলায় বলল, আয়াতুল কুরসি পড়েন। আইজ আমরার খবর আছে।বাদল আমার কাছে ঘেঁষে এসে ফিসফিস করে বলল, মতি মিয়া কাশছে নাকি?

আমি উদাস গলায় বললাম, বুঝতে পারছি না। ঠাণ্ডা লেগে কাশিরোগ হতে পারে। তবে লাশদের ঠাণ্ডা লাগে এ-রকম আগে শুনি নাই।বাদল বলল, চলো, আমরা উনাদের পাজেরো গাড়িতে চলে যাই।নিয়ামত বলল, আপনেরা পাজেরো গাড়িতে যাইবেন আর আমি একলা থাকুম এইখানে? ভূতের থাপ্পড় একা খামু? মাফ চাই!

বলতে বলতে ব্রেক চেপে সে গাড়ি থামিয়ে দিল। মনসুর সাহেবের গাড়ি অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। সেটাও ফিরে এল। মনসুর সাহেব গাড়ির উইন্ডোগ্লাস নামিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, কী হয়েছে? আমাদের ড্রাইভার বলল, লাশ জিন্দা হয়ে গেছে। কাশতেছে।মনসুর সাহেব বললেন, কি বল এইসব?

বাদল সঙ্গে সঙ্গে বলল, ঘটনা সত্য। একবার হাঁচি দিয়েছে, আমি স্পষ্ট শুনেছি।নিয়ামত আলি বলল, সে ভুতে-পাওয়া লাশ নিয়ে যাবে না। লাশ এইখানে নামিয়ে দিতে হবে। লাশ নামানোর সময়ও সে হাত দিয়ে ধরবে ।উনি চুপ করে রইলেন। মিতু বলল, সব ঝামেলা। আপনি তৈরি করেছেন। কী করা যায় সেটাও আপনি ঠিক করবেন।আমি বললাম, তুমি আমার অবস্থায় হলে কী করতে?

মিতু বলল, আপনার অবস্থা আমার কখনো হতো না।লাশ এখানে ফেলে রেখে যাব কি না, সেটা বলো।আপনার যা ইচ্ছা করুন, আমি আর পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করব; তারপর বাবাকে নিয়ে চলে যাব।নিয়ামত আলি বলল, বাহাসের সময় নাই। এই জিনিস রাস্তার ধারে ফেলায়া আমরা চইল্যা যাব। সোজা কথা। সোজা হিসাব।

মৃত মানুষের ওজন বাড়ে কথাটা সত্যি। হালকা-পাতলা মতি মিয়াকে নড়ানোই মুশকিল। টানাটানির কাজ আমাকেই করতে হচ্ছে। কেউ ধরবে না। বাদলও না। মনসুর সাহেব পাঁচ-ব্যাটারির একটা টর্চ জ্বালিয়ে ধরে আছেন।নিয়ামত আলি শেষ কথা বলে দিয়েছে, তাকে এক লাখ টাকা দিলেও সে লাশ হাত দিয়ে ধরবে না। দুই লাখ দিলেও না।

অনেক ঝামেলা করে ডেডবডি নামালাম এবং কাদায় পা হড়কে গড়িয়ে পানিভরতি গর্তে পড়ে গেলাম। লাশের গা থেকে কাপড় খুলে গেছে। তার বীভৎস মুখ বের হয়ে আছে। লাশের চোখের পাতা রিগর মটিস হবার আগেই বন্ধ করতে হয়, নয়তো লাশ বিকট ভঙ্গিতে চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে। মতি মিয়ার চোখ কেউ বন্ধ করেনি বলে তার চোখ ভয়ঙ্কর ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে।

তাকে নিয়ে পানিতে নামার পর একটা ঘটনা ঘটল। ডেডবডি পানিতে ভেসে উঠল। এমনভাবে ভাসল, যেন সে বসে আছে এবং আমাদের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ছে। চারদিকেই ঘন শালবন। বাতাস লেগে গাছের পাতায় শিসের মতো শব্দ হলো। সবার কাছে মনে হলো মাথা দোলাতে দোলাতে মতি মিয়া শিস দিচ্ছে।

মিতু আতঙ্কিত গলায় বলল, হিমু সাহেব, আপনি এখনো গর্তে বসে আছেন কেন? উঠে আসুন তো! আমি আপনার পায়ে পড়ি। প্লিজ উঠে আসুন।আমি বললাম, উঠে আসতে পারছি না। ব্যাটা আমার শার্ট ধরে আছে।মিতু বলল, এসব আপনি কী বলছেন?

আমি বললাম, ঠাট্টা করছি। মৃত মানুষ শার্ট ধরবে কীভাবে? নামার সময় তার আঙুলের ভেতর শার্ট ঢুকে গেছে।নিয়ামত আলি বলল, আমি পরিষ্কার দেখছি ভাইজান উঠতে ধরছিল, লাশটা খপ কইরা উনার শার্ট ধরছে। আইজি আমরার খবর আছে। পড়েন। সবাই, আয়াতুল কুরসি পড়েন।

মানুষের স্বভাব হচ্ছে, সে একবার ভয় পেলে ভয় পেতেই থাকে। ভয় পাওয়াটা তার জন্য ধারাবাহিক ব্যাপার হয়ে যায়। নিয়ামত গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বলল, কেউ দয়া করে পেছনে তাকাবেন না। পিছনে তাকাইলে ধরা থাবেন।বাদল ভীত গলায় বলল, কেন? নিয়ামত আলি চাপাগলায় বলল, হারামজাদা এখন খাড়া হয়েছে।বাদল বলল, কে খাড়া হয়েছে?

নিয়ামত ফিসফিস করে বলল, বুঝেন না কেন? মতি মিয়ার লাশ খাড়া হইছে। আয়াতুল কুরাসি পড়েন। হারামজাদা মনে হয়। গাড়ির পেছনে পেছনে দৌড় দিবে। দৌড় দিয়া আমাদের ধরতে পারলে খবর আছে।গাড়ির দ্রুতগতিতে চলার অনেক বর্ণনা আছে। যেমন উল্কার গতিতে চলছে, গাড়ি ঝড়ের গতিতে চলছে। নিয়ামত বর্ণনার কাছাকাছি গতিতেই গাড়ি চালাচ্ছে। বিপজ্জনকভাবে সে মনসুর সাহেবের পাজেরোকে ওভারটেক করে এগিয়ে গিয়ে তৃপ্তির ভঙ্গিতে বলল, এখন ধরলে পাজেরোওয়ালারে ধরবে। আমরা রক্ষা পাইছি।

সে অবিশ্যি রক্ষা পেল না, পাজেরের ড্রাইভার তাকে ওভারটেক করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিয়ামত আলি পাজেরো ওভারটেক করল। ঝড়ের গতি বাড়ছে। আমাদের দুই গাড়ির ওভারটেকের খেলা চলছে।এর মধ্যে খালুসাহেবের টেলিফোন এসেছে। তিনি বাদলের সঙ্গে কথা বলতে চান। আমি বাদলের হাতে মোবাইল সেট ধরিয়ে দিলাম। বাদল ফিসফিস করে বলল, বাবা, এখন কথা বলতে পারব না। আমরা খুব বিপদে আছি। আমাদের তাড়া করছে? কে তাড়া করছে?

মতি মিয়া, মতি মিয়া হচ্ছে ডেডবডি, যাকে আমরা কবর দিতে নিয়ে যাচ্ছিলাম। সে জীবিত হয়ে গেছে! সে আমাদের তাড়া করছে। ধমকাচ্ছ কেন বাবা? নাও, হিমু ভাইজানের সঙ্গে কথা বলো।আমি মধুর গলায় বললাম, হ্যালো! খালুজান ভালো আছেন? খালার শরীর ভাল?খালুজান আকাশ ফাটিয়ে গর্জন করলেন, তুমি আমার ছেলেকে কী করেছ? কিছু করিনি তো খালুজান।সে এইসব কী আবোল-তাবোল বলছে। মরা লাশ তাড়া করেছে। মনে হয় চোখের ধান্দা। আমাদের ড্রাইভার নেয়ামতও সেরকম বলছে। আপনি কি ড্রাইভার নেয়ামতের সঙ্গে কথা বলবেন?

চুপ! সন্টুপিড। তুমি শুধু ঢাকায় এসে উপস্থিত হও। দেখো, তোমাকে কী করি।এত উত্তেজিত হবেন না খালুসাহেব। অতিরিক্ত উত্তেজনায় স্ট্রোকফ্রোক হয়ে যেতে পারে।চুপ! স্টুপিড।একই গালি বারবার কেন দিচ্ছেন্ন খালুজান? অন্য কোনো গালি দেন। একই গালি বারবার দিলে গালির পাওয়ার কমে যায়।খালুজান বললেন, তোমাদের এখানে তোমরা দুজন ছাড়া আর কে আছে?

নিয়ামত আলি আছে। আমাদের ড্রাইভার।দেখি, তার হাতে টেলিফোনটা দাও।আমি বললাম, খালুজান, তার হাতে টেলিফোন দেওয়া যাবে না। সে যে-গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে, এখন যদি তার হাতে টেলিফোন দিই। সে অ্যাক্সিডেন্ট করবে। আমি বরং তার কানের কাছে টেলিফোনটা ধরি, আপনার যা বলার বলেন।

বিত্তান্ত সবই সত্য। আপনে মুরুব্বি, আপনের সঙ্গে মিথ্যা বইলা কোনো ফায়দা আছে? খামাখা ধমকাইতেছেন ক্যান? আমি ড্রাইভার নিয়ামত। আমি ধমকের ধার ধারি না। সন্ট্রপিড গালি কইলাম দিবেন না। আমি জান হাতে নিয়া গাড়ি চালাইতাছি। আমি বইসা বইসা… ছিঁড়তাছি না। বুঝছেন মুরুব্বি?

ঝড়ের গতি কমে এসেছে। আমরা ঢাকার কাছাকাছি চলে এসেছি। বাদলের ভয়টা মনে হয় কমেছে। সে আমার কাধে মাথা রেখে আরামে যুমুচ্ছে।মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছি। গন্ধটা পরিচিত কোনো ফুলের না, আবার অপরিচিতও না। গন্ধের উৎস ধরার চেষ্টা করছি। ধরতে পারছি না।

গন্ধের উৎস ধরে ফেলা জটিল কোনো কাজ না। চোখ মেললেই বোঝা যাবে ব্যাপারটা কী। চোখ মেলতে ইচ্ছা করছে না। আধো-ঘুম আধোজাগরণ অবস্থার আলাদা মজা আছে। এ-অবস্থায় অনুমান-অনুমান খেলা খেলতে ভালো লাগে।এখন বুঝতে পারছি। ফুলের গন্ধের উৎস আমার বিছানার পাশের চেয়ার। সেই চেয়ারে কেউ-একজন বসে আছে। হাতে ফুল নিয়ে এসেছে। প্রসেস অব এলিমিনেশন পদ্ধতিতে কি বের করা যায়, কে?

আমার কাছে ফুল নিয়ে আসার মানুষ একজনই—ব্রহ্মপা। রূপা অবশ্যই আসেনি। সে গভীর রাতে আমার মেসবাড়িতে উপস্থিত হবে না। রাত অনেক। আমি ঘুমুতে গেছি। এগারোটার দিকে। দু-তিন ঘণ্টা নিশ্চয়ই ঘুমিয়েছি। অবশ্যই রাত একটার বেশি। প্রসেস অব এলিমিনেশন পদ্ধতিতে রূপা বাতিল। শুধু রূপা না, পুরো মহিলাজাতিই বাতিল। কোনো মহিলাই রাত একটায় মেসে উপস্থিত হবে না।

বাকি থাকল পুরুষ। এমন কোনো পুরুষ এসেছে যে গায়ে আফটার শেভ লোশন দিয়েছে, কিংবা সেন্ট দিয়েছে। খালুসাহেব গায়ে সেন্ট দেন। বাদলের সমস্যা নিয়ে গভীর রাতে আমার কাছে তিনি উপস্থিত হতে পারেন। তবে তিনি চেয়ারে চুপচাপ বসে থাকার লোক না। তা ছাড়া ঘর অন্ধকার। তিনি ঘরে ঢুকেই বাতি জ্বালাবেন। প্রসেস অব এলিমেনশন পদ্ধতিতে তিনিও বাতিল।

এমন কেউ আমার বিছানার কাছে বসে আছে, যে বাতি জ্বালানোর ব্যাপারে আগ্রহী না। অর্থাৎ, সে নিজের পরিচয় গোপন রাখতে চাচ্ছে। এমন লোক কে হতে পারে? আঙুল-কাটা জগলু ভাই? উনি কি গায়ে সেন্ট দেন।আমি চোখ না মেলেই বললাম, জগলু ভাই, কখন এসেছেন? চেয়ারে বসে-থাকা মানুষটা জবাব দিল না। তবে সিগারেট ধরাল। তামাকের গন্ধ পেলাম।তোমার ঘর সবসময় খোলা থাকে? জি।আমার জিনিস কোথায়?

আমি উঠে বসতে বসতে বললাম, সুটকেসের কথা বলছেন? চৌকির নিচে আছে। হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিন।পাঁচিশ লক্ষ টাকাভিরতি সুটকেস, তুমি চৌকির নিচে রেখে দিয়েছ। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ পর্যন্ত করনি। এটা আমাকে বিশ্বাস করতে বলছ? হ্যাঁ, বলছি। যা চলে যাবার সেটা যাবেই। হাজার চেষ্টা করেও ধরে রাখা যাবে না। মনসুর সাহেব তার টাকা পয়সা ব্যাংকে রাখেন। তার পরও সেখান থেকে পঁচিশ লক্ষ টাকা বের হয়ে গেল না? টাকা ঠিকঠাক আছে?

আছে বলেই তো মনে হয়। আমি গুনে দেখিনি। বাতি জ্বালাই, গুনে দেখুন।বাতি জ্বালাতে হবে না।আপনি মেসে ঢুকেছেন কীভাবে? কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেনি? দারোয়ান জিজ্ঞেস করেছিল কোথায় যাব।–তোমার কথা বলেছি, দরজা খুলে দিয়েছে।আপনি কি একা এসেছেন?

একা আসি নাই। আমি একা ঘোরাফেরা করি না।আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, আমরা পৃথিবীতে আসি একা, পৃথিবী থেকে ফেরত যাই একা, কিন্তু পৃথিবীতে ঘোরাফিরা করি অনেককে নিয়ে।এই ধরনের সস্তা ফিলসফি আমার সঙ্গে কপচাবে না। এইসব থার্ড রেট কথাবার্তা আমি জানি।

বাতিটা জ্বালাই, জাগলু ভাই। মুখ দেখতে পাচ্ছি না বলে কথা বলে আরাম পাচ্ছি না। তা ছাড়া সুটকেসের টাকাও আমাদের গোনা দরকার। পঞ্চাশটা পঞ্চাশ হাজার টাকার বান্ডিল থাকার কথা।জগলু ভাই কিছু বললেন না। আমি বাতি জ্বালালাম। সুটকেস খুলে টাকার বান্ডিল গুনলাম। জগলু ভাই কোনো কথা বলছেন না। তিনি তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। টাকার পরিমাণ ঠিক আছে কি না, এই বিষয়ে তার কোনো আগ্রহ দেখা গেল না।হিমু! জি জাগলু ভাই?

তোমার সম্পর্কে আমি কিছু খোঁজখবর নিয়েছি। তোমাদের মেসের দারোয়ানকেও জিজ্ঞেস করলাম। বেশির ভাগ মানুষের ধারণা, তুমি সাধুসন্ন্যাসী টাইপ কেউ। তুমি নাকি ভবিষ্যৎ বলতে পার। আমার ভবিষ্যৎ কী বলো দেখি।আমি কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে রাখলাম। তারপর চোখ খুলে বড় করে নিশ্বাস নিয়ে বললাম, আপনি পুলিশের হাতে ধরা পড়বেন। তারপর ফাঁসিতে ঝুলবেন।জগলু ভাই বিরক্ত গলায় বললেন, আমি যে ফাঁসিতে ঝুলাব এটা বলার জন্য সাধু-সন্ন্যাসী, পীর-ফকির হওয়া লাগে না। যে-কেউ বুদ্ধিমান মানুষ বলতে পারবে যে, আমাকে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে।

আমি বললাম, কবে ধরা পড়বেন সেটা কিন্তু যে-কোনো মানুষ বলতে পারবে না।তুমি বলতে পারবে? অবশ্যই।কবে? সেপ্টেম্বরের এগারো তারিখ।জগলু ভাই হতভম্ব গলায় বললেন, সেপ্টেম্বরের এগারো তারিখ? আমি বললাম, জি। আপনার ছেলের জন্মদিন।ছেলের জন্মদিন করতে গিয়ে আমি পুলিশের হাতে ধরা খাব? জি।এত সহজ হিসাব?

জি, হিসাব সহজ।জগলু ভাই হাতের সিগারেট ফেলে দিয়ে নতুন আরেকটি ধারালেন। চেয়ার টেনে আমার দিকে খানিকটা বুকে এলেন। গুছিয়ে কোনো কথা বলার প্রস্তুতি। বেশির ভাগ মানুষই গুছিয়ে কথা বলার সময় শ্রোতার দিকে খানিকটা এগিয়ে আসে।

হিমু, আমাকে তোমার কী মনে হয়? বোকা না বুদ্ধিমান? বুদ্ধিমান।কীরকম বুদ্ধিমান?আপনার বুদ্ধি বেশ ভালো।একজন বুদ্ধিমান মানুষ, যে জানে তার ছেলেকে সবসময় পুলিশ নজরে রাখছে, সে কি তার ছেলেকে দেখতে যাবে?

আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, বড় বোকামিগুলি বুদ্ধিমান মানুষরাই করে।জগলু ভাই সুটকেস-হাতে উঠে দাঁড়ালেন। আমি বালিশের নিচ থেকে মোবাইল সেট বের করে উনার দিকে এগিয়ে দিলাম। জগলু ভাই বললেন, এটা তুমি রেখে দাও। এটা তোমার গিফট।আমি বললাম, গিফট আমি নেই না, জগলু ভাই। গিফট নেয়া আমার ওস্তাদের নিষেধ আছে।কে তোমার ওস্তাদ?

আমার বাবা। তিনি বলে গিয়েছেন, হিমালয়, কাউকে কিছু দিবি না, কারো কাছ থেকে কিছু নিবিও না। নিজেকে সবরকম দেয়া-নেয়ার বাইরে রাখবি। উপহার দেয়া-নেয়া, প্ৰেম দেয়া-নেয়া কিংবা স্নেহ-মমতা দেয়ানেয়া কোনোকিছুর মধ্যেই থাকবি না।

জগলু ভাই মোবাইল টেলিফোন হাতে নিলেন। প্যান্টের পকেটে রাখলেন আর তখনই মোবাইল বেজে উঠল। আমি বললাম, জগলু ভাই, আপনার ছেলে টেলিফোন করেছে। সে প্রায়ই গভীর রাতে টেলিফোন করে। দেখি, শেষবারের মতো তার সঙ্গে কথা বলি।জগলু ভাই বললেন, আমি যে এখানে আছি সেটা বলবে না। খবরদার! হ্যালো, হিমু চাচু! হ্যালো, বাবু।কেমন আছ, হিমু চাচু? ভালো আছি। তুমি কেমন আছ? আমিও ভালো আছি। হিমু চাচু, তুমি কী করছ?

তোমার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলছি।আমিও তোমার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলছি। হি হি হি।জগলু ভাই আমার কানের কাছে তার মাথা নিয়ে এসেছেন। কী কথাবার্তা হয় শুনতে চাচ্ছেন। মোবাইল-নামক যন্ত্রের ভলুম বাড়ানোর ব্যবস্থা আছে। কাজটা কীভাবে করা হয় আমি জানি না। জানলে ভলু্যম বাড়িয়ে দিতাম, তাতে জগলু ভাইয়ের সুবিধা হতো। ছেলের প্রতিটি কথা পরিষ্কার শুনতে পেতেন।

হিমু চাচু! বলো, শুনছি।আমাকে তুমি যে ভূতের বাচ্চাটা দিয়েছ তার নাম হলো হং।তুমি নাম দিয়েছ? না। ও আমাকে বলেছে।তোমার সঙ্গে কি ওর কথা হয়? হয়। রোজ রাতে সে কথা বলে।কী কথা বলে? অনেক কথা বলে। বাবার কথা বলে।বাবার কথা কী বলে?

বাবা কোথায় আছে, কী করছে—এইসব বলে।ভূতের বাচ্চাটাকে জিজ্ঞেস করো তো এখন তোমার বাবা কোথায় আছে।সেটা তো আগেই জিজ্ঞেস করেছি।হং কী বলেছে? বলেছে, বাবা তোমার সঙ্গে আছে।কথা বলবে বাবার সঙ্গে? না। আমি এখন ঘুমাব।বাবার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছ না কেন? হং নিষেধ করেছে।কেন নিষেধ করেছে? হং বলেছে, আমি যদি অনেক দিন বাবার সঙ্গে কথা না বলি তা হলেই জন্মদিনে বাবা আমাকে দেখতে আসবে। কথা বললে আসবে না। আমি এখন আর তোমার সঙ্গে কথা বলব না। আমি ঘুমাব।

জগলু ভাই এখন বসে আছেন। মুখে জ্বলন্ত সিগারেট। আমি জগলু ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, আর রাত করে লাভ কী? চলে যান।জগলু ভাই বললেন, ভূতের বাচ্চার ব্যাপারটা কী? আমি বললাম, কোনো ব্যাপারই না। একটা সবুজ বোতলে আমি কিছু সিগারেটের ধোয়া ভরে দিয়ে দিয়েছি।ভূতের বাচ্চা কথা বলছে, এই রহস্যটা কী? শিশুমনের কল্পনা। এর বেশি কিছু না।আমি যে তোমার সঙ্গে আছি সেটা কীভাবে বলল?

কাকতালীয় ব্যাপার। লেগে গেছে। জগৎসংসারে কাকতালীয়া ব্যাপার ঘটে। ভালোমতো চিন্তা করে দেখুন, আপনার জীবনেও অনেকবার ঘটেছে।জগলু ভাই উঠে দাঁড়ালেন। আমি বললাম, সুটকেস, ফেলে যাচ্ছেন।জগলু ভাই বললেন, এত রাতে টাকা নিয়ে বের হব না। থাকুক তোমার কাছে। পরে একসময় এসে নিয়ে যাবে।

আমি বললাম, তা হলে একটা কাজ করি, সুটকেসটা নিরাপদে থাকে এমন একটা জায়গায় রেখে দেই। আবার মনসুর সাহেবের কাছে দিয়ে আসি? জগলু ভাইয়ের ঠোঁটে এই প্রথম সামান্য হাসির আভাস দেখলাম। তিনি হ্যাঁ-না কিছুই বললেন না।আমি বললাম, শুভ্ৰ কেমন আছে? জগলু ভাই বললেন, শুভ্ৰ কেমন আছে আমাকে জিজ্ঞেস করছি কেন?

আপনাকে জিজ্ঞেস করছি। কারণ আমার ধারণা। আপনি তার খোঁজ খবর নেন।শুভ্ৰ ভাল আছে।আমি বললাম, জগলু ভাই আমার ধারণা আপনার সঙ্গে এই আমার শেষ দেখা। আপনি কি ঐ ধাঁধার উত্তরটা জানতে চান। ঐ যে কোন সে প্রাণী খাদ্য গ্ৰহণ করে না…।

উত্তর জানতে চাই না। উত্তর আমি নিজে নিজে বের করব।সহজ লাইনে চিন্তা করবেন জগলু ভাই। সমস্যা যত জটিল তার সমাধান তত সহজ। অতি জটিল যে জীবন তার ব্যাখ্যা সেই কারণেই অতি সহজ।ব্যাখ্যা কি? আপনি এই ধাঁধাটার জবাবও নিজেই বের করুন। আপনি দীর্ঘ সময় জেগে থাকবেন ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করার সুযোগ পাবেন।

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *