বাংলাদেশের অতি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মানুষদের একজন হলো বেলায়েত। সরল রেখার মতো রোগা। ছোট মুখ। নাকের নিচে বেমানান গোঁফ। গোঁফ সবই পাকা। প্রতি পনেরো দিনে সে গোঁফে কলপ দেয়। কলপ দেয়ার পর পর তার এলার্জিক রিএকশন হয়। ঠোঁট-মুখ ফুলে উঠে। দুই দিন ফোলা এবং জ্বলুনি থাকে। বেলায়েত নানান ধরনের কলপ ব্যবহার করে দেখেছে। কোনো লাভ হয়নি।
বেলায়েত সব সময় ব্যস্ত। এই ব্যবসা সেই ব্যবসা। ঢাকা শহরে তার একটা রেস্টুরেন্ট আছে। নাম দি নিউ বিরানী হাউস এন্ড রেস্টুরেন্ট। এই রেস্টুরেন্টের সমস্ত বাজার বেলায়েত নিজে করে। সকাল আটটা বাজার আগেই বাজারে যেতে হয়। রেস্টুরেন্টের বাবুর্চির সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলার পর সে যায় কাওরান বাজার।
এখানে তার একটা কাঠ চেরাইয়ের কল এবং কাঠের দোকান আছে। দোকানের নাম বেলায়েত টিম্বার। দুপুর একটা পর্যন্ত সে বেলায়েত টিম্বারে থাকে। এখান থেকে সে যায় কলাবাগানে। এখানে সে এক কামরার একটা ঘর ভাড়া করেছে। নিউজ স্ট্যান্ড দেয়া হয়েছে। নানান ধরনের পত্রিকা এবং ম্যাগাজিন বিক্রীর ব্যবস্থা। দোকানে এখনো কাজ চলছে। র্যাক বনানো হচ্ছে। পত্রিকার সঙ্গে ডিভিডি এবং গানের সিডিও বিক্রী হবে। ডিভিডির ব্যবসা এখন ভালো চলছে।
সন্ধার পর সে কলাবাগানে বাড়ির কাজ দেখে। মিস্ত্রীদের সঙ্গে পরামর্শ, টাকা-পয়সার হিসাব— এইসব। কলাবাগানের দোতলা বাড়ির ডিজাইন সে নিজেই করেছে। ডিজাইন মতো বাড়ি তৈরির কাজ দেখছে একজন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার–পরিমল বাবু। বয়স ষাট। পরিমল বাবুর সবচেয়ে বড় গুণ বেলায়েত যে ডিজাইন করে পরিমল বাবু বলেন, অসাধারণ! পশ্চিমের জানালা অফ করে দিয়ে আপনি ভালো করেছেন।
বিকেলে সূর্যের চিড়বিড়া আলোর কোনো দরকার নেই। ফালতু খরচ। আবার পশ্চিমের জানালা রেখে দিলে তিনি বলেন, স্যার আপনি যা করেছেন বাংলাদেশে কোনো আর্কিটেক্টের মাথায় এই জিনিস ঢুকবে না। সূর্য ডোবার আগে আগে কন্যা-সুন্দর আলোর পবিত্রতা বুঝার বুদ্ধি এদের নেই। আপনি বয়সে ছোট। বয়সে ছোট না হলে আপনার পায়ের ধুলা নিতাম।
হেদায়েত তার বড় ভাইয়ের খোঁজে কলাবাগানে এসেছে। এই সময় বেলায়েতকে পাওয়া যায় বাড়ির ছাদে। কয়েক দিনের মধ্যে ছাদ ঢালাই হবে। তার প্রস্তুতি চলছে। রড বাঁধাইয়ের কাজ হচ্ছে। ব্লড মিস্ত্রী আবদুর রহমান গুনাসুতা দিয়ে রড বাঁধছে। তার কাজের সুবিধার জন্য দু’শ পাওয়ারের একটা ভান্তু তার চোখের সামনে জ্বলছে। কাজ তদারক করছেন পরিমল বাবু। তার তদারকির অর্থ সারাক্ষণ কথা বলে যাওয়া।
সব কিছুর মা আছে বুঝলে আব্দুর রহমান। বাড়ির মা হলো তার ছাদ।কিসের মাসি কিসের পিসি কিসের বৃন্দাবন মরা গাছে ফুল ফুটেছে মা বড় ধন। এখন বল দেখি বাড়ির বাবা কে? মা’কে তা তো জেনে গেছ, এখন বল বাবা কে?আব্দুর রহমান বিরক্ত মুখে বলল, জানি না স্যার।পরিমল বাবু বললেন, একটু বুদ্ধি খেলাও। বুদ্ধি খেলালেই বলতে পারবে।আব্দুর রহমান বিড়বিড় করে বলল, আপনে বুদ্ধি খেলায়া বলেন। আমি পারব না।বাড়ির বাবা হলো পিলারগুলি। বাড়ি দাড়িয়ে থাকে এর উপর। বুঝেছ? জ্বি স্যার বুঝেছি।এখন বল দেখি বাড়ির মামা খালা—এরা কে?
কথাবার্তার এই পর্যায়ে হেদায়েত সিঁড়িঘর থেকে ছাদে এসে দাঁড়াল। তাকে অপ্রস্তুত মনে হলো। তার হাতে লাল রঙের দু’টা হাওয়াই মেঠাই। পলিথিনের প্যাকেটে ভরা। হেদায়েত তার ভাইয়ের জন্য এই হাওয়াই মেঠাই কিনেছে। এখন তার সামান্য লজ্জা লাগছে। হাওয়াই মেঠাই শিশুদের প্রিয় জিনিস। বেলায়েতের ছেলে-মেয়ে নেই যে তাদেরকে দিয়ে দেয়া যাবে।
হেদায়েত হাওয়াই মিঠাইর ঠোঙ্গা দুটা লুকাতে চেষ্টা করল।বেলায়েত বলল, আছিস কেমন? হেদায়েত অন্য দিকে তাকিয়ে বলল, ভালো।তোর বৌ আছে কেমন? ভালো।ঝগড়া-টগড়া হয়েছে না-কি? হাওয়াই মেঠাই কার জন্য এনেছিস? তোমার জন্য।এনেছিস যখন দে। লুকানোর কী আছে?
হেদায়েত ভাইয়ের হাতে ঠোঙ্গা দু’টা দিল। আনন্দে বেলায়েতের চোখে প্রায় পানি এসে গেল। তার ছোট ভাইটাকে সে নিজেই কোলে-পিঠে করে বড় করেছে। হেদায়েতের জন্মের পর তার মা মারা গেলেন। একলেমশিয়া রোগে। এই মা বেলায়েতের মা না, সত্যা। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর বেলায়েতের বাবা দ্বিতীয় বিবাহ করেন। হেদায়েতের যখন তিন বছর বয়স তখন তার বাবা মারা যান। সকালে ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে গেছেন দাঁত মাজতে।
সেখানে ধুম করে মেঝেতে পরে যান। তাকে নিয়ে ছোটাছুটি শুরু হলো। হেদায়েত ভয় পেয়ে তার ভাইয়ের গলায় ঝুলে পড়ল। সে কিছুতেই নামবে না। ভাইকে গলায় ঝুলন্ত অবস্থায় নিয়েই বেলায়েত স্ট্যাক্সি ডেকে আনল। বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। ট্যাক্সিতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। বেলায়েত বুঝতে পারে নি, সে তখন ব্যস্ত ছোট ভাইয়ের ভয় কাটাতে।
বেলায়েত হাওয়াই মিঠাই ছিড়ে ছিড়ে মুখে দিচ্ছে। ভাব করছে যেন খুবই আনন্দ পাচ্ছে। বেচারা একটা জিনিস শখ করে এনেছে। আগ্রহ করে না খেলে মনে কষ্ট পাবে।দাম কত নিয়েছে রে? দশ টাকা পিস।বেলায়েত বলল, প্রডাকশন কষ্ট কত কে জানে? অল্প হওয়ার কথা। মুখে দিলেই মিলিয়ে যাচ্ছে, আসল জিনিস নাই বললেই হয়। প্রডাকশন কস্ট যদি এক টাকাও ধরি তা হলেও পার পিসে নয় টাকা লাভ। পরিমল বাবু!
জ্বি সার।একটু খোঁজ নিবেন তো হাওয়াই মেঠাইয়ের পার পিসে প্রডাকশন কস্ট কত হয়?কালই খোঁজ নিব।হাওয়াই মেঠাই এর ইংরেজি নাম কী জানেন না-কি? জ্বি না স্যার।হেদায়েত তুই জানিস? হেদায়েত বলল, ইংরেজি নাম Candy Floss। বেলায়েতের মুখে তৃপ্তির হাসি দেখা দিল। তার ভাই জানে না এমন কোনো জ্ঞান পৃথিবীতে নেই। অসাধারণ একটা ছেলে। মাশাআল্লাহ।
হেদায়েত।জ্বি ভাইজান।পরিমল বাবুকে পৃথিবীর ব্যাপারটা বল তো।পৃথিবীর কোন ব্যাপারটা? আমাকে একদিন বলেছিলি, ঐ যে পৃথিবী জীবন্ত। মৃত না— এই সব। পরিমল বাবু মন দিয়ে শুনুন। ভেরি ইন্টারেস্টিং। আব্দুর রহমান তুমিও শোন। রছে তার বেঁধে বেঁধে জীবন পার করে দিলে, কিছুই জানলে না। আফসোস!
হেদায়েত পৃথিবীর গল্প বলে যাচ্ছে, তিনজনই আগ্রহ নিয়ে শুনছে। বেলায়েতের ভাবভঙ্গিতে আগ্রহ এবং আনন্দের খাঁটি মিশ্রণ।হেদায়েত বলছে, পৃথিবীকে আমরা মৃত বস্তু হিসাবে জানি। ভেতরটায় আছে লোহা এবং নিকেল। নব্বই ভাগ লোহা এবং দশ ভাগ নিকেল। সর্ব অর্থেই এটাকে মৃত বস্তু বলা যায়। কিন্তু পৃথিবী মৃত না। জীবিত! আব্দুর রহমান হতভম্ব গলায় বলল, বলেন কি! এর জান আছে? বেলায়েত বিরক্ত গলায় বলল, আগেই কথা বল কেন? পুরা ঘটনা শোন।
হেদায়েত বলল, জীবিত প্রাণী কী করে? বেঁচে থাকতে চায়। তার অসুখবিসুখ হলে চিকিৎসা নিতে চায়। তার শরীরে কোনো ক্ষতি হলে ক্ষতি পূরণ করতে চায়। পৃথিবী তাই করে। একবার পৃথিবীর ওজন লেয়ার ফুটো হয়ে গেল। বিজ্ঞানীরা হতভম্ব হয়ে গেল। কী সর্বনাশ! পৃথিবী নিজেই ওজন লেয়ার ঠিক করল। গ্রীন হাউস অ্যাফেক্টে পৃথিবীর তাপ এখন বাড়ছে। পৃথিবী চেষ্টা করে যাচ্ছে তাপ কমাতে। সমুদ্রে অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করেছে শৈবাল। শৈবাল কার্বনডাই অক্সাইড খেয়ে নিচ্ছে। গ্রিন হাউস অ্যাফেক্ট কমছে। পৃথিবী সবই নিজে নিজে করছে। কাজেই পৃথিবীকে একটা জীবিত প্রাণী ছাড়া আর কিছু বলা যায়?
বেলায়েত বলল, অবশ্যই না। পরিমল বাবু আপনার কি মত? পরিমল বাবু আমতা আমতা করছেন। সুন্দর কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছেন না। বেলায়েত বলল, হেদায়েত এদেরকে ঐ মাছের গল্পটা বল। এরা মজা পাবে।হেদায়েত বলল, কোন মাছ? ঐ যে একটা মাছ আছে কিছুদিন থাকে স্ত্রী তারপর হয়ে যায় পুরুষ। অদ্ভুত ব্যাপার! শুনলে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়।হেদায়েত বলল, গল্পটা আরেক দিন বুলি। তোমাকে একটা জরুরি কথা বলীর জন্য এসেছি।
বেলায়েত বলল, অবশ্যই বলবি। এখনই বল। পরিমল বাবু আপনি চলে যান। আব্দুর রহমান তুমিও যাও।হেদায়েত তার রাতের অভিজ্ঞতা বলল। হাতের উপর হাত রাখা, আংটি পাওয়া কিছুই বাদ দিল না।বেলায়েত বলল, জ্বিনের উপদ্রব। আর কিছুই না। তোর বৌ সুন্দর তো এই জন্যেই উপদ্রবটা হচ্ছে। একদম চিন্তা করবি না। মগবাজারের ছোট পীর সাহেবকে নিয়ে যাব।
উনি বাড়ি বন্ধন করে দিবেন। তুই নিশ্চিত থাক। আর খবর্দার একা ঘুমাবি না! বৌ যদি বাপের বাড়ি যায় তুইও অবশ্যই সঙ্গে যাবি।যেতে ভালো লাগে না।শ্বশুরবাড়ি যেতে ভালো লাগে না, এটা কেমন কথা! তোর বাবা-মা নেই। শ্বশুর-শাশুড়ীই তোর বাবা-মা। ক্লিয়ার? হুঁ।আর কিছু বলবি? হেদায়েত বলল, সেতু তার মা’র বাড়িতে গেলে আমি এসে তোমার সঙ্গে থাকব। আমি ঐ বাড়িতে যাব না।
বেলায়েত বলল, আচ্ছা যা ঠিক আছে। টেনশান করিস না। জরুরি কথা শেষ হয়েছে, না-কি আরও কিছু বলবি? হেদায়েত মাথা নিচু করে বলল, ভাইজান সেতুকে আমার পছন্দ হয় না।বেলায়েত হতভম্ব হয়ে বলল, সর্বনাশ এইসব কী কথা! হেদায়েত মাথা নিচু করে বলল, সত্য কথা।তাকে পছন্দ হয় না কেন? আমি যতদূর জানি সে তো খুবই ভালো মেয়ে।ঘন ঘন বাপের বাড়ি যায়, এটা ছাড়া তার তো আর কোনো সমস্যা নেই।হেদায়েত বলল, পচা একটা সেন্ট সে গায়ে মাখে। আমার দম বন্ধ লাগে।
এই সেন্ট না মাখতে বল। বাজার থেকে ভালো একটা সেন্ট কিনে নিয়ে যা।হেদায়েত চুপ করে রইল। ভাইজানের এই বুদ্ধিটা খারাপ লাগছে না।বেলায়েত বলল, রাত এমন কিছু বেশি হয় নি। দোকান খোলা আছে। চল আমার সঙ্গে। সেন্ট কিনে দেই। গন্ধ শুকে শুকে সেন্ট কিনবি। ঠিক আছে? হুঁ। ঠিক আছে।বেলায়েত বলল, তোর ভাবীকেও সঙ্গে নিয়ে নেই। মেয়ে মানুষ তো, সেন্ট ভালো বুঝবে।হেদায়েত বলল, ভাবীকে সঙ্গে নিও না।তার সমস্যা কী?
হেদায়েত বলল, ভাবীর গা থেকে সব সময় রসুনের গন্ধ আসে। আমার গা লায়।বলিস কি! আমি তো রসুন-পিঁয়াজ কোনো গন্ধই পাই না। তোর তো বিরাট প্রবলেম। আমার গা থেকে কোনো গন্ধ আসে? লুকাবি না। সত্যি কথা বলবি।হেদায়েত বলল, ঘামের গন্ধ আসে। তোমার ঘামের গন্ধ খারাপ না। ভালো।বেলায়েত বলল, ঘামের গন্ধ আবার ভালো হয় কীভাবে? হেদায়েত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ভাইজান ক্ষুদা লেগেছে। দুপুরে যে কিছুই খাই নি সেটা ভুলে গেছি।
তোকে নিয়ে তো বিরাট সমস্যা। দুপুরে খাওয়ার কথা কি কেউ ভুলে? চল তোকে দি নিউ বিরানী হাউসে নিয়ে যাই। নদীর এক পাঙ্গাস আজ সকালে নিজের হাতে কিনে দিয়েছি। এগারো কেজি ওজন। এখনও আছে কিনা কে জানে।রেস্টুরেন্টে কাস্টমার গিজগিজ করছে। বসার জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। বেলায়েত তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ম্যানেজার ছুটে এসেছে। ম্যানেজার পারলে খদ্দের গলাধাক্কা দিয়ে বের করে স্যারের জন্যে জায়গা করে।
বেলায়েত বলল, আমার জন্যে ব্যস্ত হবে না। শুধু আমার ভাইকে বসার ব্যবস্থা করে দাও।হেদায়েত বলল, আমি তোমাকে ছাড়া খাব না ভাইজান।বেলায়েত মনে মনে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলল। হেদায়েত তাকে ছাড়া যে খাবে না, এটা আগেই বোঝা উচিত ছিল। বেলায়েত গলা নামিয়ে বলল, কেমন রমরমা ব্যবসা বুঝতে পারছিস? হেদায়েত বলল, বুঝতে পারছি। ৩৭ জন কাস্টমার।এর মধ্যে গুনেও ফেলেছিস! মাশাআল্লাহ।হেদায়েত বলল, ৩৭ একটা প্রাইম নাম্বার।সেটা আবার কী?বুঝিয়ে বলব?
এখন থাক। খাবার সময় বুঝিয়ে বলিস। ৩৭ জন কাস্টমার বললি— আমাদের দুজনকে ধরেছিস? আমরাও তো কাস্টমার। পয়সা দিয়ে খাব।আমাদের দু’জনকে নিয়ে হয় ৩৯, এটা প্রাইম নাম্বার না।বেলায়েত বলল, তাহলে তো সমস্যা হয়ে গেল। সমস্যা হয়েছে কি-না বল? হেদায়েত সেতুর জন্যে সেন্ট কিনে বাসায় ফিরেছে। সেন্টের নাম ক্লিওপেট্রা। বোতলের কভারে ক্লিওপেট্রার ছবি। ক্লিওপেট্রা সাপ হতে বসে আছে।
সাপটার দিকে তাকিয়ে আছে গভীর ভালোবাসায়। গন্ধটা তার কাছে যথেষ্টই ভালো লেগেছে। সে বেলায়েতকেও গন্ধ শুকিয়েছে। বেলায়েত বলেছে, আমি তো কোনো গন্ধই পাচ্ছি না। মনে হয় সর্দিতে নাক বন্ধ।সেতু বলল, রাত দশটা বাজে। কোথায় ছিলে এত রাত পর্যন্ত? ভাইজানের কাছে গিয়েছিলাম।খবর দিলেই পারতে, চিন্তা করছিলাম।হেদায়েত বলল, তোমার জন্যে একটা সেন্ট কিনেছি। ক্লিওপেট্রা নাম।
সেতু বিস্মিত হয়ে বলল, হঠাৎ সেন্ট কিনলে কেন? তুমি তো সেন্ট কেনার মানুষ না! ধারাপাতের একটা বই কিনে আনলে বুঝতাম হিসেব মতো কিনেছ। এই তুমি কি খেয়ে এসেছ? হুঁ।খেয়ে এসে ভালোই করেছ। ঘরে তেমন কিছু রান্না হয় নি। কাঁঠাল-বিচি দিয়ে ডিমের ঝোল। তুমি কী খেয়েছ? পাঙ্গাস মাছ আর মুরগির ঝাল ফ্রাই। ভাইজানের রেস্টুরেন্টে খেয়েছি। ভাইজান তোমার জন্য খাবার দিয়ে দিয়েছেন। রান্নাঘরে রেখে এসেছি।সেতু বলল, আমি তো খাব না।খাবে না কেন?
আমি মা’র বাসায় যাচ্ছি। মা কোখেকে এক রেসিপি পেয়েছে— সজনে গাছের ছালের ভর্তা। খেতে না-কি অসাধারণ। রবিন ভাই আমাদের সঙ্গে খাবেন। উনি একটা ছবি নিয়ে আসবেন। ছবির নাম Swan। এমনই ভয়ের যে দুর্বল হার্টের লোকজনের দেখা নিষেধ।
সেতু সাজ-গোজ করছে। হেদায়েত সামান্য টেনশান বোধ করছে। সেতু কি তার পুরানো সেন্টটাই মাখবে? হেদায়েতের উচিত ছিল বলা, পুরানো সেন্টের গন্ধটা আমার ভালো লাগে না। এই জন্যেই ক্লিওপেট্রা কিনেছি। এখন থেকে ক্লিওপেট্রা দেবে। মেয়েরা কি অন্যের পছন্দের সেন্ট গায়ে মাখে? মনে হয় না। সব মেয়েরই নিজের পছন্দের সেন্ট থাকে।সেতুর সাজ-গোজ শেষ হয়েছে। আজকের সাজটা ভালো হয় নি। তাকে সিনেমার এক্সট্রা মেয়েদের মতো লাগছে। তার গাড়ি এখনও আসে নি। সে হেদায়েতের দিকে তাকিয়ে বলল, আমার দিকে ভালো করে তাকাও। আমার হাতে কী?
হেদায়েত বলল, দড়ি।সেতু বলল, এক হাতে দড়ি, অন্য হাতে কঁচি। এই কাঁচি দিয়ে আমি দড়ির মাঝখানটা কেটে ফেলব।হেদায়েত বলল, কেন? ম্যাজিক দেখাচ্ছি। ঐ দিন কি বললাম, রবিন ভাইয়ের দড়ি কাটার একটা ম্যাজিক আমি ধরে ফেলেছি। সেইটাই এখন তোমাকে দেখাচ্ছি। এই দেখ দড়ির মাঝখানটা কাটলাম। দেখছ ঠিকমতো? টিসুপেপার দিয়ে কাটা অংশটা ঢাকলাম। দেখছ তো? অন্য দিকে তাকাবে। আমার দিকে তাকিয়ে থাক।আচ্ছা।এখন দেখ দড়ি কি জোড়া লেগেছে? হুঁ।সেতু বলল, তুমি অবাক হও নি?
হেদায়েত বলল, না। অবাক হব কেন? তুমি তো ম্যাজিক দেখাচ্ছে। এমন যদি হতো যে, আমরা দড়ি কাটছি আর আপনা-আপনি কাটা দড়ি জোড়া লেগে যাচ্ছে তাহলে অবাক হতাম।তুমি এমন অদ্ভুত মানুষ! হেদায়েত বলল, সরি! সেতু বলল, সরি বলার কিছু নেই। সব মানুষ কখনো এক রকম হয় না। একটা কাজ করে দাও।
কী কাজ করতে হবে হেদায়েত বুঝতে পারছে না। শাড়ি পরার পর সেতুর একজনকে লাগে, যে পায়ের কাছে শাড়ির পার ধরে টানাটানি করে। এই কাজ? না-কি সেফটিফিন লাগানো কাজ? ব্লাউজের বোতাম লাগানোর কাজও হতে পারে? এইসব কাজ মেয়েরা একা করতে পারে না। দ্বিতীয় একজন লাগে। সিস্টেমটা এমন হওয়া উচিত যেন এই ধরনের কাজ মেয়েরা নিজেরাই করতে পারে। হেদায়েত বলল, কী কাজ?
সেতু বলল, আমার জন্যে একটা সেন্ট কিনে এনেছ, সেন্টটা গায়ে নিজের হাতে স্প্রে করে দাও। এক গাদা দিও না।হেদায়েত স্পেতে চাপ দিল। মিষ্টি গন্ধ বের হচ্ছে।সেতু বলল, পুরুষদের কিছু কিছু কাজে মেয়েরা খুব খুশি হয়। এই যে তুমি সেন্ট কিনে আনলে আমি খুশি হয়েছি। গায়ে স্প্রে করে দিলে এতে আরও খুশি হয়েছি। তবে স্প্রে করার ব্যাপারটা আমাকে বলে দিতে হয়েছে, এটাই সমস্যা।
হেদায়েত বলল, সমস্যা কেন? সেতু বলল, সমস্যা কেন তোমাকে ব্যাখ্যা করতে পারব না।হেদায়েত হঠাৎ লক্ষ করল, সেতুর পায় থেকে আগের সেন্টের অতি বোটকা গন্ধ আসছে। দম বন্ধ হয়ে আসার মতো গন্ধ। এ রকম তো হওয়ার কথা না! আগের সেন্টটা তো সেতু গায়ে মাখে নি। সমস্যা কী?
সেতু বলল, গাড়ির হর্ন শুনতে পাচ্ছি। আমি গেলাম।হেদায়েত বলল, আচ্ছা।সেতু বলল, একটা চুমু খেতে চাইলে খেতে পার। চুমু খেতে ইচ্ছা করছে? হেদায়েত বলল, চুমু খেতে ইচ্ছা করবে কেন? সেতু বলল, তোমার স্ত্রী সুন্দর করে সেজে-গুজে বাইরে যাচ্ছে, তাকে বিদায় দেবার সময় চুমু খেতে ইচ্ছা করবে না, আশ্চর্য তো! হেদায়েত বলল, তোমার ঠোটের লিপস্টিক নষ্ট হয়ে যাবে তো।সেতু বলল, কী অদ্ভুত তোমার কথাবার্তা! Ok আমি গেলাম। রাতে টেলিফোনে কথা হবে।
হুঁ।সব সময় হুঁ হুঁ করবে না। তুমি বোবা-কালা না।হেদায়েত শোবার ঘরের খাটে পা ঝুলিয়ে বসে আসে। তার হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। নাদুর মা অ্যাশট্রে দিয়ে গেছে। অ্যাশট্রেতে সামান্য পানি দেয়া হয়েছে বলে সিগারেটের ছাই ওড়ছে না। নাদুর মার বুদ্ধিতে হেদায়েত মুগ্ধ। অতি সাধারণ একটা বিষয়ের জন্যে কত বড় সুবিধা হয়ে গেল। হেদায়েতের ঘুম পাচ্ছে, তবে এখন ঘুমানো যাবে না। সেতু টেলিফোন করে বলে গেছে।
তার টেলিফোনের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে। হেদায়েতের শান্তি শান্তি লাগছে। ঘরে টিভি চলছে না বলেই হিন্দি কথাবার্তা কানে আসছে না। রান্নাঘরও নিস্তব্ধ। নাদুর মা মনে হয় শুয়ে পড়েছে। কাজের মেয়েরা অতি দ্রুত ঘুমিয়ে পড়তে পারে। নিস্তব্ধ ফ্লাটবাড়ি জটিল চিন্তার জন্যে ভালো। কী নিয়ে। চিন্তা করা যায়? ম্যাজিক নিয়ে?
হেদায়েত গভীর চিন্তা শুরু করল। প্রকৃতি কি ম্যাজিক পছন্দ করে? সৃষ্টির রহস্যের অনেক কিছু লুকিয়ে রাখে? এমন কি হতে পারে যে, আলোর গতি ধ্রুবক না। প্রকৃতির ম্যাজিকের কারণে মানুষের কাছে মনে হচ্ছে ধ্রুবক। আলোর গতির বিষয়টা জটিল। প্রকৃতির ম্যাজিক প্রকাশ হয়ে পড়লে দেখা যাবে বিষয়টা দড়ি কাটার মতই সহজ।
টেলিফোন বাজছে। পাঁচটা রিং হবার পর হেদায়েত টেলিফোন ধরল, কারণ পাঁচ হলো প্রাইম সংখ্যা।কে সেতু। ঠিকমতো পৌঁছেছ? ও পাশ থেকে মিষ্টি গলা ভেসে এল, স্যার আমার নাম নীতু। রোল নাম্বার টেন।ও আচ্ছা।স্যার আমাকে চিনেছেন? হুঁ।সেতু কে স্যার। ম্যাডাম? হুঁ।উনি বাসায় নেই? না।কোথায় গেছেল? তার মা’র বাসায় গেছে। রাতে থাকবে। তারা একটা ভূতের ছবি দেখবে। ছবির নাম Swan।
দুর্বল হার্টের মানুষদের জন্যে ছবিটা নিষিদ্ধ।তাহলে তো স্যার ছবিটা আমি দেখতে পারব না। আমার হার্ট অত্যন্ত দুর্বল। প্যালপিটিশন হয়।সেই ক্ষেত্রে তোমার এই ছবি না দেখাই ভালো।স্যার আমি কী জন্যে টেলিফোন করেছি জানতে চাইলেন না তো?কী জন্যে করেছ? আপনি ক্লাসে বলছিলেন গত কাল রাতে একটা হাতের উপর আপনার হাত পড়েছিল। সেই হাতটা কার সেটা বের করেছি। আমার ধারণা বের করে ফেলতে পেরেছি।হেদায়েত আগ্রহের সুরে বলল, কার হাত?
