যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ পর্ব:০৫ হুমায়ূন আহমেদ

যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ

ওসি সাহেব সোফায় গা এলিয়ে বসতে বসতে বললেন, বাসায় কি আপনি একা?কী উত্তর দেব দ্রুত চিন্তা করতে হচ্ছে। আমি কি বলব, বাসায় কেউ নেই? ধরা যাক তাই বললাম, তারপর শোবার ঘর থেকে খুটি খুঁট শব্দ হলো, তখন কী হবে?আমি ওসি সাহেবের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে চায়ের পানি চাপিয়ে দিলাম। চিনি ছাড়া চা নিয়ে দেব। বলব, চিনির কোটা পাচ্ছি না। এতে লাভ হবে। এক চুমুক দিয়ে উঠে পড়তে হবে।

এই ভদ্রলোককে দ্রুত ঘর থেকে বের করে দিতে হবে। তবে ওসি সাহেব। আসায় একটা সুবিধাও হয়েছে। ভদ্রলোক দেখে গেছেন। আমি বাসাতেই আছি। স্বাভাবিকভাবেই আছি।চা এনে ওসি সাহেবের সামনে রাখলাম। তিনি ওয়কিটকিতে কার সঙ্গে যেন কথা বলছেন। খেজ্বরে আলাপ।ভাই, চা নিন। ঘরে চিনি আছে কিন্তু চিনির কৌটাটা কোথায় জানি না।চিনি নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমি চায়ে চিনি খাই না।

ওসি সাহেব চাযে চুমুক দিয়ে বললেন, চা তো ভালো বানিয়েছেন। গুড়। মাঝে মাঝে আপনার বানানো চা এসে খেয়ে যেতে হবে।জি আসবেন।ওসি সাহেব সিগারেট ধরালেন। মনে হয় তিনি বেশ কিছু সময় এখানে কাটাবেন। শোবাব ঘরের দরজাটা কি এক ফাকে আটকে দেব? ওসি সাহেব বসেছেন শোবার ঘরের দরজার দিকে পেছন দিয়ে। কাজেই আমি যদি দরজা বন্ধ করে দেই, উনি বুঝতে পারবেন না।

আমি শোবার ঘবেব দরজাবি কাছে চলে এলাম। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দরজা টেনে বন্ধ করলাম। এক ফাঁকে দেখলাম রুবা মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে আছে সে আমাকে দেখে হাসল। আমি ওসি সাহেবের সামনের চেয়ারে এসে বসেছি। ওসি সাহেব বললেন, কী এমন চুপচাপ কেন? বউ এক রাতের জন্য গেছে, এতেই আপনি যা মন খারাপ করেছেন–আশ্চর্য! হাসিমুখে কিছু বলুন তো শুনি।

শরীরটা ভালো লাগছে না। জ্বর জ্বর লাগছে।এই জ্বরের নাম হলো বিরহ, জ্বর। শুনেন ভাই, একটা উপদেশ দেই–স্ত্রীকে বেশি ভালোবাসবেন না। বেশি ভালোবেসেছেন কি মরেছেন–স্ত্রীকে আর পাবেন না। সবচে ভালো হয় যদি ভালো না বেসে পারেন। আচ্ছা উঠি।বসুন না। একা আছি, কথা বলতে ভালো লাগছে।বসলে হবে নারে ভাই। পুলিশের চাকরিতে বসাবসি বলে কিছুই নেই। ভাবি ফিবলে একটা খবর দেবেন।

জি আচ্ছা।আমি ওসি সাহেবকে বাসার গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গেলাম। তিনি যখন জিপে উঠতে যাচ্ছেন তখন এক মুহুর্তের জন্যে মনে হলো–আচ্ছা, ব্যাপারটা উনাকে খুলে বললে কেমন হয়! যদি তাকে বলি–ভাই, আমি আমার স্ত্রীকে খুন করেছিলাম, এখন দেখছি সে বেঁচে আছে। পানি খাচ্ছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে, কথা বলছে। বিশ্বাস না করলে আপনি আসুন আমার সঙ্গে, আপনাকে দেখাই।

শেষ পর্যন্ত বলা হলো না। ওসি সাহেব জিপে উঠে বললেন, ভাই চলি? বলেই জিপ স্টার্ট দিলেন। আমি বেশ কিছু সময় ঠাণ্ডার মধ্যে একা একা গেটের কাছে দাঁড়িয়ে রইলাম। ঘরে ফিরতে ভয় লাগছে। ইচ্ছা করছে পালিয়ে যেতে। কিন্তু পালিয়ে যাওয়া যাবে না। আমাকে ঘরেই ফিরতে হবে।আচ্ছা রুবাকে কেন মারলাম? তাকে মারাটা কি খুব জরুরি ছিল?

রুবাকে মেরে ফেলার প্রথম চিন্তাটা আমার মাথায় আসে আমাদের বাসর রাতে। চিন্তাটা আসে খুব অল্পসময়ের জন্যে। ইংরেজিতে বলা যায়। It came as a flicber, আমার ধারণা সব মানুষের ক্ষেত্রে এরকম ঘটে। মুহুর্তের জন্যে হলেও পাশের মানুষটাকে খুন করতে ইচ্ছা করে। এটা দোষের কিছু না; আমার মনে হয় এটাই স্বাভাবিক। বাসর রাতে কী ঘটল বলি। সারাদিনের ক্লান্তিতে আমি অবসন্ন। প্ৰচণ্ড মাথা ধরেছে। মাথার দুপাশের শিরা দপদপ করছে। দুপুরে কিছু খাই নি। ক্ষুধার কারণে বমি বমি লাগছে। এই অবস্থায় রুবা ঘরে ঢুকল।

আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছি–এত সুন্দর একটা মেয়ে! আগেও তো তাকে দেখেছি–এত সুন্দর লাগে নি! অন্য কোনো মেয়ে না তো? রুবা আমার দিকে তাকিয়ে হড়বড় করে বলল, শুনুন, আমার প্রচণ্ড দাঁত ব্যথা করছে। আপনার সঙ্গে আজ রাতে কোনো কথাবার্তা বলতে পারব না। দয়া কবে কিছু মনে করবেন না। আমি চারটা পেইন কিলার খেয়েছি। আমার মাথা ঘুরছে।আমি বললাম, ব্যথা কমেছে?

না কমে নি। ব্যথা আরো বেড়েছে। আপনি ডেনটিষ্ট হলে ভালো হতো। ফন্ট করে আমার দাঁত তুলে ফেলতেন। বলেই সে খিলখিল করে হাসতে লাগল। আমি অবাক হয়ে দেখছি— এত সুন্দর করে কেউ হাসে কী করে? হাসব দমকে তার মাথা থেকে শাড়ির আঁচল পড়ে গেল। তার ফর্স গলা বের হয়ে গেল। তার গলাটা কি অন্যদের গলার চেয়ে বেশি লম্বা? আমার ক্ষণিকের জন্যে ইচ্ছা করল শক্ত করে দুহাতে তার গলা চেপে ধরতে। It came as a flicber.

রুবা অবশ্যি দাঁত ব্যথা নিয়েই সে-রাতে অনেক গল্প করল। বেশিরভাগ তার বন্ধু বান্ধবের গল্প। এক একজনের গল্প উঠলে সে উদ্ধৃসিত হয়ে যায়–জানেন, ওব মতো মানুষ হয় না। অসাধারণ! অসাধারণ! আমি এক পর্যায়ে বললাম, আমি কিন্তু অসাধারণ না রুবা। আমি সাধারণ। রুবা হাই তুলতে তুলতে বলল, তা জানি।কীভাবে জানো? বললে রাগ করবেন না তো?

না রাগ করব না।রাগ করলেও আমি অবশ্যি বলে ফেলব। আমি পেটে কথা রাখতে পারি না। আপনি যে খুব সাধারণ সেটা টের পেলাম যখন আপনার সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিকঠাক হয়ে গেল। কারণ আমার ভাগ্য খুব খারাপ, আমি এই জীবনে যা যা চেয়েছি কোনোটাই পাই নি। আমি সবসময় চেয়েছি অসাধারণ একজন স্বামী কাজেই আমি যে সাধারণ একজন স্বামী পাব সেটা তো ধরেই নেওয়া যায়। যায় না?

হ্যাঁ যায়।এমনিতে আমি খুব সুন্দর। যে-ই দেখবে সে-ই বলবে সুন্দর। অথচ যখন আমাকে সুন্দর দেখানো দবকার তখন আমাকে দেখায় বাদরের মতো।কখন তোমাকে সুন্দর দেখানোর দরকার? একবার একটা ছেলে আমাকে দলবল নিয়ে দেখতে এলো। কী সুন্দর ছেলে। হ্যান্ডসাম, টল। প্লেন চালায়, পাইলট। আমি খুব যত্ন করে সাজিলাম। সাজার পর আয়নার তাকিয়ে দেখি কী যে বিশ্ৰী দেখাচ্ছে। এত সুন্দরী মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও ওরা আমাকে পছন্দ করল না।

তাহলে তো তোমার ভাগ্য আসলেই খারাপ।আমি খুব ভালো কবিতা আবৃত্তি করতে পারি। যে-ই শুনবে সে-ই মুগ্ধ হবে। টেলিভিশনে কবিতা আবৃত্তির অডিসন দিতে গেলাম— বেছে বেছে সেই দিনই আমার গলায় কী যে হলো, এক সঙ্গে দুতিন রকম স্বর বের হয়। টেলিভিশনের যে প্রযোজক অডিসিন নিচ্ছিলেন, তিনি হেসে ফেললেন। অন্যরাও হাসতে লাগল। শুধু আমি নিজের মনে তিন রকমের স্বরে কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলাম। হিহিহি।

রুবা। আবারো হাসতে লাগল। আবারো তার শাড়ির আঁচল মাথা থেকে খসে। পড়ল। তখন আমার মনে হলো–এই অদ্ভুত মেয়েটা কি সত্যি বাকি জীবন আমার পাশে থাকবে? আমি বললাম, তোমার দাঁত ব্যথা কি কমেছে? রুবা হাসতে হাসতে বলল, আমার দাঁত ব্যথা ছিল না। আপনার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করছিল না বলে, মিথ্যা করে বলেছি–দাঁত ব্যথা।ও আচ্ছা।কথা বলতে ইচ্ছা করছিল না কেন সেটা শুনবেন? বলো?

প্রথমবার আপনার চেহারা যতটা খারাপ লেগেছিল–আজ তার চেয়ে দশগুণ বেশি খারাপ লাগছে। এই জন্যেই কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। আচ্ছা। আপনি কি কবিতা শুনতে ভালোবাসেন? না।জানতাম ভালোবাসেন না। আমি যে-সব জিনিস পছন্দ করি আমার স্বামী সে-সব পছন্দ করবেন তা কী করে হয়। আপনি আবার রাগ করছেন না তো?

না।আমার কিন্তু অনেক ছেলেরন্ধু আছে। আমি ওদের সঙ্গে খুব ঘোরাঘুরি করি। আপনি আবার বলবেন না–ওসব চলবে না। গৃহপালিত পশু হয়ে যাও। বলবেন না তো?না।তাহলে এক মিনিটের জন্যে আমার হাতটা ধরতে পারেন।রুবা হাত বাড়িয়ে দিল। এমন চমৎকার একটা মেয়েকে ভেবে চিন্তে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করেছি। কেন করলাম? আমি কি অসুস্থ? আমি কি সাইকোপ্যাথ?

না, আমি অসুস্থ না। আমি সাইকোপ্যাথও না। আমি যা করেছি ঠিকই করেছি। এই মেয়েকে ধরে রাখার ক্ষমতা আমার ছিল না। ও সরে যাচ্ছিল। আমি তা হতে দিতে পারি না! এখন সে আর কোথাও যেতে পারবে না। কোনো বন্ধু এসে এখন আর তার কবিতা শুনবে না। বা কারো সঙ্গে বুড়িগঙ্গায় জোছনা দেখতে যেতে পারবে না।আচ্ছা আজ কি জোছনা আছে? আকাশ আলো হয়ে আছে, কিন্তু আমি কোনো চাঁদ দেখছি না।ঘরে ফেরা দরকার, ঘরে ফিরতে ইচ্ছা করছে না। রুবার মুখোমুখি হতে ভয় করছে।

আমি ঘরে ঢুকলাম। বসার ঘরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। হঠাৎ মনে হলোশোবার ঘরের দরজাটা না খুললে কেমন হয়? থাকুক রুবা বন্ধ ঘরে। আমি বাতটা সোফায় শুয়ে কাটিয়ে দেই। ডেডবডি সরানোর কাজ রাতের বেলা না করে দিনে করাই ভালো। দিনে চারদিকে প্রচুর মানুষ থাকে। সবাই ব্যস্ত। কেউ কারো দিকে সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকায় না। রাতে সবাই সবাইকে সন্দেহ করে।

শোবার ঘরের নিবে হাত রাখতেই ভেতরে ঝন ঝন শব্দে কাচের কী যেন ভাঙল। কী হচ্ছে? এসব কী হচ্ছে? আমি খুব সাবধানে দরজা ফাঁক কবলাম যেন প্রয়োজনে ঝাট করে দরজা বন্ধ করে দেয়া যায়।শোবার ঘরের মেঝেতে রুবা বসে। পানির গ্রাসের ভাঙা টুকরো জড়ো করার চেষ্টা করছে। গ্রাসটা টেবিল থেকে নিচে পড়ে ভেঙেছে। আমি তার শব্দই শুনেছি। চিণ্ডাভাবনা না করেই বললাম, কী হয়েছে?

রুবা জড়ানো গলায় বলল, গ্লাস।শোন রুবা, উঠে দাড়াও। গ্লাসের ভাঙা টুকরা জড়ো করতে হবে না। উঠে দাড়াও। দাড়াও বললাম।সে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে–পারছে না। টেনে তোলার জন্যে অসহায় ভঙ্গিতে একটা হাত আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। এটা কি কোনো ট্রিকস? আমাকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা? আমি তার হাত ধরব, আর সঙ্গে সঙ্গে সে জাপ্টে ধরবে আমাকে। হরর ক্টোরিতে এরকম থাকে। মৃত মানুষ জীবিত মানুষকে মরণ আলিঙ্গনে জাপ্টে ধরে। রুবা। আবার বলল, ধর, আমাকে টেনে তোল।

আমি ধরলাম এবং টেনে তুললাম। হরর গল্পের মতো সে আমাকে মরণ আলিঙ্গনে বঁধিল না। পাড় মাতালরা যেমন হেলতে দুলতে থাকে সেও তেমনি হেলছে দুলছে। তার হাত শীতল, বরফের মতোই শীতল। তার হার্ট কি বিট করছে? এই মুহুর্তে তার বুকে হাত রেখে কিংবা নাড়ি ধরে তা বোঝা যাবে না। কারণ ধ্বক ধ্বক শব্দে আমার নিজের হোটই কাঁপছে। সেই শব্দ অন্য সব শব্দকে ঢেকে ফেলবে।

রুবা।উঁ।তুমি মরে গেছ। বুঝতে পারছি? উঁ।তুমি কীভাবে কথা বলছি, কীভাবে হাঁটাহাঁটি করছ, আমি জানি না। তোমার কেমন লাগছে বলো তো? উঁ, উঁ না। কথা বলো। লেট আস টক। তুমি কি আমার কথা বুঝতে পারছি? উঁ।বলে আমার নাম কী? বলো, আমার নাম বলে।মিজান।এই তো হয়েছে। এসো এখন এই চেয়ারটায় বোস। নাও, এই চাদর দিয়ে গা ঢাক। উলঙ্গ মানুষ দেখতে ভালো লাগে না। রাস্তায় নগ্ন পাগলীদের দিকে কেউ তাকায় না। এখন আমার কথাবা জবাব দাও–তোমার এখন কেমন লাগছে? ভায।ভয় লাগছে?

হুঁ।ভয় লাগবে কেন? ভয় লাগার কী আছে? একজন মৃত মানুষের ভয় লাগার কিছু নেই। তয় জীবিত মানুষের। মৃত মানুষের কোনো ভয় নেই। তাদের জগৎ ভয়শূন্য। You understand? বাতি জ্বালাও।বাতি জ্বালাব? হুঁ।রুবা, ঘরে বাতি জ্বলছে। একটা টিউব লাইট জ্বলছে। টেবিল ল্যাম্পও জ্বলছে।অন্ধকার।তোমার কাছে অন্ধকার লাগছে?

হুঁ।আমাকে দেখতে পাচ্ছ? ছায়া ছায়া।শোন রুবা, আমি তোমাকে মেরে ফেলেছি।জানি।তুমি জানো? হুঁ।আমার ওপর কি তোমার কোনো রাগ আছে? না।রাগ থাকলে বলে। না।তুমি কি আমাকে খুন করতে চাও? না।রুবা! তুমি কি প্রতিশোধ নিতে চাও? না।গুড ভেরি গুড। বুঝলে রুবা, একটা কোনো সমস্যা হয়ে গেছে। মৃত মানুষের কথা বলার কোনো কারণ নেই–কিন্তু তুমি কথা বলছি। কীভাবে বলছ? আমি জানি না।তোমার কি ঘুম পাচ্ছে?

হুঁ।এসো, শুয়ে থাক। বিছানায় শুয়ে থাক।আচ্ছা।আমি রুবার হাত ধরে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিলাম। গায়ে চাদর টেনে দিলাম। সে অদ্ভুত শব্দ করছে। খুন খুন শব্দ।কী হয়েছে? ভয় লাগে।শোন রুবা, ভয়ের কিছু নেই। আমি তোমার পাশে বসে আছি।শোন রুবা, ভয়ের কিছু নেই। আমি তোমার পাশে বসে আছি।আচ্ছা।দাও, তোমার হাত দাও। তোমার হাত ধরে বসে থাকব।আচ্ছা।পানি খাবে? না! পানি খাবে না? খাব।

রুবাকে কড়া ঘুমের ওষুধ কিছু খাইয়ে দিলে কেমন হয়? যে কাজটা আমি করতে পারি নি ঘুমের ওষুধ সেটা করবে। হাই ডোজের হিপনল আমার কাছে আছে। পানিতে গুলে সরবতের মতো করে খাইয়ে দিতে পারলে আর দেখতে হবে না। রুবা খেতে আপত্তি করবে বলে মনে হচ্ছে না। মবে গেলে তার জন্যেও ভালো, আমার জন্যেও ভালো!

ড্রয়ার খুলে কুড়িটা টেবলেট পেলাম। আধগ্লাস পানিতে কুড়িটা টেবলেট, ঘন পেস্টের মতো তৈরি হলো। চেখে দেখি তিতা এবং মিষ্টি মিলে বিশ্ৰী স্বাদ। এই জিনিস কেউ খেতে পারবে না, কিন্তু রুবা পারবে। অবশ্যই পারবে। সে মানুষের স্তরে এখন নেই। সে এখন অন্য কোনো স্তরে। এই স্তরে স্বাদ-বৰ্ণ-গন্ধ বলে কিছু থাকার কথা না।

আচ্ছা, আমি এইসব কী ভাবছি? এখন ভাবাভাবির সময় না। সময়টা হলো কাজের। টাইম অব অ্যাকশন। দেরি করা যাবে না। সময় নষ্ট করা যাবে না। যা করার খুব ভেবে-চিন্তে করতে হবে। সকাল আটটার আগে ডেডবডি সরিয়ে শ্বশুরবাড়িতে যেতে হবে। শ্বশুর সাহেবকে ঘুম থেকে তুলে কাঁদো কাঁদো গলায় বলতে হবে।–রুবা এখনো ফিরে নি। শ্বশুরবাড়ি থেকেই ওসি সাহেবকে টেলিফোন করতে হবে।

আমি গ্রাস হাতে রুবার কাছে গেলাম। রুবা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ তুলে আমাকে দেখল। না।রুবা নাও, খেয়ে ফেলে।সে গ্লাস নেবার জন্যে হাত বাড়াল না। বাড়বে না জানতাম। সেই বোধ এখন তার নেই। আমাকেই খাইয়ে দিতে হবে। আমি তাকে উঠে বসালাম, তার মুখের কাছে গ্লাস ধরলাম। সে খাচ্ছে। চুকচুক করে খাচ্ছে।খেতে মজা না?

উঁ।খাও, আরাম করে খাও। খেয়ে ঘুমিয়ে থাক।উঁ।তুমি মেয়ে খারাপ না। মেয়ে ভালো।উঁ।শুধু ভালো মেয়ে বললে কম বলা হয়, তুমি বেশ ভালো মেয়ে… ..বুঝতে পারছ? হুঁ। আমি যা করেছি। বাধ্য হয়ে করেছি। ঈর্ষার কারণে করেছি। তোমাল নানান ধরনের বন্ধু-বান্ধব। ওদের সঙ্গে তুমি কত গল্প কর, কত হাসোহাসি। আমার সঙ্গে কোনো গল্প কর না। হুঁট করে ওদের সঙ্গে বের হয়ে যাও, আমার সঙ্গে যাও না। এ জন্যেই রাগ হতো।

হুঁ।বেশি রাগ না, অল্প রাগ। অল্প রাগটা বাড়তে বাড়তে এরকম হয়ে গেল।বুঝতে পারছি? হুঁ।তাছাড়া আমার চেহারা ভালো না। মুখ খানিকটা বাঁদরের মতো, দাঁত বের হয়ে থাকে–এই নিয়ে আমার মধ্যে এক ধরনের কমপ্লেক্স আছে। আমার ধারণা, কেউ আমাকে সহ্য করতে পারে না। রুবা, তুমি কি আমার কথা শুনতে পোচ্ছ?

হুঁ।অফিসেও কেউ আমার সঙ্গে কথা বলে না। প্রয়োজনে কথা বলে, অপ্রয়োজনে কথা বলে না। শুধু নুরুজ্জামান সাহেব মাঝে মাঝে বলেন। আর কেউ না। তুমিও তাই কর। কাজেই আমার ধারণা হয়েছিল–তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। বুঝতে পারছি?

হুঁ।এই জন্যেই আমি তোমাকে মেরে ফেলেছি। যাতে কখনো আমাকে ফেলে চলে যেতে না পার। বুঝতে পারছি কি বলছি? হুঁ।কাজটা অন্যায় হয়েছে। খুব অন্যায়। পৃথিবী জায়গাটা সুবিধার না। এখানে মাঝে মাঝে অন্যায় না।হুঁ।তোমার জন্যে আমার এখন খারাপ লাগছে। খারাপ লাগা উচিত না, কিন্তু লাগছে।আচ্ছা।আমি খুব শক্ত মানুষ, বুঝলে রুবা, অসম্ভব শক্ত মানুষ। মন খারাপ কী ব্যাপার তা আমি জানি না। আমি কোনোদিন কাঁদি না। কিন্তু তোমার অবস্থা দেখে খারাপ লাগছে।হুঁ।আমার মার কথা কি আমি তোমাকে কোনোদিন বলেছি রুবা?

না।বলি নি। আমি কাউকে বলি নি। আমি কি আমার বড়বোনের কথা বলেছি? না।আমি কাউকেই কিছু বলি না। আমি সব নিজের মধ্যেই রেখে দেই। হুঁ।আমার বড়বোনের নাম কী বলো তো? রুবা।ঠিক বলেছ, রুবা। তোমাদের দুজনের মধ্যে খুব মিল। আমার বড়বোন ঘুমের মধ্যে হাঁটফেল করে মারা গিয়েছিল। ডাক্তারের রিপোটে তাই আছে। আসল ব্যাপারটা শুনবে? রুবা শব্দ করল না। আমি বললাম, কিছু খাবে?

না।তুমি এখন আরাম করে ঘুমাও। শুয়ে পড়। এসো শুইয়ে দেই।আমি রুবাকে শুইয়ে দিলাম। সে কোনো আপত্তি করল না। মুখ এখনো হা হয়ে আছে, ওষুধের গুঁড়া লেগে আছে। কুৎসিত দেখাচ্ছে। চোখ খোলা। মাছের মতো চোখ, চোখে পলক পড়ে না।আমি রুবার গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে বললাম, চোখ বন্ধ করে ঘুমুতে চেষ্টা কর। কড়া ঘুমের ওষুধ দিয়েছি–ভালো ঘুম হবে। যা ঘটার ঘুমের মধ্যেই ঘটবে। তুমি কিছু টের পাবে না। চোখ বন্ধ করা।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *