আনিসকে দেখে সিদ্দিক সাহেব চমকে উঠলেন। চোখ টকটকে লাল। ফরসা গালও লালচে হয়ে আছে। ইটার ভঙ্গিও অন্যরকম। মাতালের মতো হেলেন্দুলে হাঁটা। হাঁটার মধ্যে তাকানোর মধ্যে কেমন যেন ডোন্ট কেয়ার ভাব। এমনিতে সে মাটির দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে কুঁজা হয়ে হাঁটে। কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে তার আলাদা নাম আছে— কুঁজা মাস্টার।সিদ্দিকুর রহমান বললেন, আনিস, কেমন আছো?
আনিস বলল, আমি অইত্যান্ত ভালো আছি। আপনি চা খেতে ডেকেছেন, চা খাব না। আমার ধারণা। আপনি চা খেতেও ডাকেন নি। চা খাওয়াটা অজুহাত। আপনি আমাকে কিছু বলার জন্য ডেকেছেন।সিদ্দিকুর রহমান বিস্মিত হলেন। মাস্টার এরকম ভঙ্গিতে কথা বলছে কেন? তিনি বিস্ময় প্রকাশ করলেন না। আধশোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসতে বসতে বললেন, কিছু বলার জন্য ডাকি নাই। একটা বিষয় জানার জন্যে ডেকেছি। আজ কি পূর্ণিমা?
জি, পূর্ণিমা। আশ্বিনা পূর্ণিমা। এই পূর্ণিমায় ভূত দেখা যায় আর আষাঢ়ি পূর্ণিমায় সাধু মানুষ দেখা যায়। আষাঢ়ি পূর্ণিমায় গৌতম বুদ্ধ গ্ররহত্যাগ করেছিলেন।গৃহত্যাগ কেন করেছিলেন? সংসার থেকে সেই রাতেই তার মন উঠে গিয়েছিল। মানুষ যখন হঠাৎ অসম্ভব সুন্দর কোনো জিনিস দেখে তখন বিচিত্র কারণে সবকিছু থেকে তার মন উঠে যায়।
আমি তো আমার দীর্ঘ জীবনে অনেক সুন্দর জিনিস দেখেছি। আমার তো মন উঠে নাই।হয়তো উঠেছে, আপনি বুঝতে পারেন নাই। মানুষ অন্য মানুষের মন কিছুকিছু বুঝতে পারে, নিজের মন কিছুই বুঝতে পারে না।তুমি কথা তো খুব গুছিয়ে বলো।জি, আমি কথা গুছিয়ে বলতে পারি। এটা কোনো বড় ব্যাপার না। যে লোক ট্রেনে স্বপ্নে পাওয়া বড়ি বিক্রি করে সেও খুব গুছিয়ে কথা বলে।বড় ব্যাপার কোনটা?
বড় ব্যাপার হলো যে কথা বলছে সে জানে কি-না কী বলা হচ্ছে।তুমি জানো? জি আমি জানি।খুবই ভালো কথা। এখন আমাকে আরেকটা জিনিস বলো, আমার ছেলে যে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাবে এটা তুমি জানতে। জানার পরেও আমাকে বিষয়টা জানাও নি। আমাকে জানালে আমি আমার ছেলেকে আটকাতে পারতাম। জানাও নি কেন?
আনিস বলল, বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবার বুদ্ধি আমি তাকে দিয়েছিলাম। আমি বুদ্ধি দিয়েছি আবার আমি সেটা আপনাকে বলে দেব–তা তো ঠিক না। সাপ হয়ে দংশন করব, ওঝা হয়ে ঝাড়ব— তা তো হয় না।সিদ্দিকুর রহমান অবাক হয়ে বললেন, পালিয়ে যাবার বুদ্ধি তুমি দিয়েছ? জি।কেন?
আপনি তার জন্যে খুবই লজ্জাজনক শাস্তির ব্যবস্থা করেছিলেন। অপমানটা সে নিতে পারছিল না। আমাকে বলল। ইঁদুর-মারা বিষ খাবে। আমার কাছে মনে হলো, বিষ খাওয়ার ব্যাপারটা মাথা থেকে দূর করার জন্যে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবার বুদ্ধি দেয়াই ভালো।যে বলে ইঁদুর-মারা বিষ খাবে সে কোনোদিন খায় না। বলে কয়ে বিষ খাওয়া হয় না।
কেউ-কেউ আবার বলে-কয়ে খায়। একেকজন মানুষ একেক রকম। ভরাপূর্ণিমায় কেউ বাড়ি-ঘর ছেড়ে চলে যায়, আবার কেউ দরজা বন্ধ করে ঘুমায়।মাসুদকে তুমি কবে ফিরে আসতে বলেছ?
আমি কিছু বলি নাই। তবে সে খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে। সে গৃহী ধরনের ছেলে। বাড়ি ছেড়ে বেশি দিন বাইরে থাকতে পারবে না।তুমি কি কোনো ফুলের গন্ধ পাচ্ছ? জি-না। আমার নাক বন্ধ।সিদ্দিকুর রহমান বললেন, তোমার কি শরীর খারাপ? আনিস বলল, সামান্য খারাপ। মনে হয় জ্বর এসেছে।সিদ্দিকুর রহমান বললেন, যাও শুয়ে থাকো।
আনিস চলে যাচ্ছে। সিদ্দিকুর রহমান ভুরু কুঁচকে আনিসের দিকে তাকিয়ে আছেন। আনিস কী অদ্ভূত ভঙ্গিতে হেলেদুলে যাচ্ছে! মনে হচ্ছে পায়ের সঙ্গে বাড়ি খেয়ে সে হুড়মুড়িয়ে পড়ে যাবে। লোকমান বলল, হুক্কা আইন্যা দেই? সিদ্দিকুর রহমান হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লেন, যদিও তার তামাক খেতে ইচ্ছা করছে না। নির্জন উঠানে বসে থাকতে ইচ্ছা করছে না, আবার উঠে যেতেও ইচ্ছা করছে না।
জোছনা প্রবল হয়েছে। বাড়ির পেছনের কামরাঙা গাছের ছায়া তার গায়ে পড়েছে। কামরাঙা গাছের চিড়ল-বিড়ল পাতার ছায়া জোছনায় সুন্দরভাবে এসেছে। বাতাসে গাছ কাঁপছে, ছায়াও কাঁপছে। সিদ্দিকুর রহমান নিজের গায়ের ছায়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন। দৃশ্যটা তাঁর কাছে সুন্দর লাগছে, তবে মাস্টারের কথামতো এই সুন্দর দৃশ্য দেখে তার মনে কোনো ভাব তৈরি হচ্ছে না।
লোকমান! জি? মাসুদ এক-দুই দিনের মধ্যে ফিরে আসবে। যেদিন ফিরে আসবে সেদিনই কানে ধরে তাকে ট্রেনে তুলে দিবে। আমার হুকুমের অপেক্ষা করবে না।জি আচ্ছা।লোকমান হুক্কার নল তাঁর হাতে তুলে দিল। তিনি নল টানছেন। ভুড়ুক ভুড়ুক শব্দ হচ্ছে। শব্দ শুনতে তাঁর ভালো লাগছে।
কন্যার বাপ হুক্কা খায়
বুনকা বুনকা ধোঁয়া যায়।
সুন্দর সিমাসা। কে তাকে বলেছিল? রমিলা বলেছিল। একদিন তিনি বারান্দায় বসে হুক্কা টানছেন, হঠাৎ রমিলা ঘরের ভেতর থেকে বলে উঠল— কন্যার বাপে হুক্কা খায়, বুনকা বুনকা ধোঁয়া যায়। কী কারণে জানি রমিলার সিমাসা তার খুবই ভালো লাগল। তিনি সঙ্গে সঙ্গে রমিলাকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন— ঘরের ভেতর থেকে কী বললা আরেকবার বলো। রমিলা ভয়ে অস্থির হয়ে বলল, আমার ভুল হইছে মাপ কইরা দেন। সিদ্দিক সাহেব অবাক হয়ে বললেন, ভুলের কী হইছে? সুন্দর সিমাসা বলেছি, আমার পছন্দ হয়েছে। রমিলা তার পরেও বলল, আর কোনোদিন বলব না। আমারে ক্ষমা দেন। তিনি দুঃখিত হয়ে বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে যাও, ক্ষমা দিলাম।
অতি সুন্দর এই সিমাসাটা লীলাকে বললে কেমন হয়? হুক্কায় টান দিয়ে বুনকা বুনকা ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে বলবেন। লীলা নিশ্চয় মজা পাবে। মেয়েটা নিজের মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে কী ভাবছে কে জানে! তাকে পাশে বসিয়ে কিছুক্ষণ গল্প করলে বোঝা যেত সে কী ভাবছে। কিন্তু তাকে ডেকে এনে আয়োজন করে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। যদি তার আসতে ইচ্ছা করে সে আসবে নিজের মতো। সে কবে চলে যাবে? যেরকম হুট করে এসেছিল— সেরকম হুট করেই কি চলে যাবে? যদি সে একবার ঠিক করে চলে যাবে তাহলে তাকে আটকানো যাবে না। তার মাকেও আটকানো যায় নি। এই মেয়েটা পুরোপুরি তার মা’র স্বভাব পেয়েছে। মাতৃ-স্বভাবের মেয়ে জীবনে সুখী হয় না। পিতৃ-স্বভাবের মেয়ে সুখী হয়। এই নিয়েও একটা সিমাসা আছে। সিমাসটা যেন কী? সিদ্দিকুর রহমান ভুড়ুক ভুড়ুক শব্দে হুক্কা টানছেন, চোখ বন্ধ করে সিমাসা ভাবার চেষ্টা করছেন। কিছুটা মাথায় আসছে, কিছুটা আসছে না—
মা-স্বভাবী দেখান হাসি
কন্যা থাকেন ভঙ্গে
বাপ-স্বভাবী সুখ-কপালি
কন্যা থাকেন রঙ্গে।
এই তো মনে পড়েছে। কন্যা থাকেন রঙ্গে। রঙ্গে থাকা অনেক বড় ব্যাপার। তিনি মনে-প্ৰাণে চাচ্ছেন তার কন্যা থাকবে রঙ্গে।লীলা তার সৎমার খাওয়া দেখছে। রমিলা খুব গুছিয়ে ভাত খাচ্ছেন। পাটিতে বসেছেন— সামনে জলচৌকি, সেখানে ভাত-তরকারি। ঘোমটা দিয়ে বসেছেন। অসুস্থ মানুষের হুসাহাস খাওয়া না, ফেলে ছড়িয়ে একাকার করাও না। যেন তিনি এ-বাড়ির নতুন বউ। নতুন বউ বলেই ঘোমটা টেনে লাজুক-লাজুক ভঙ্গিতে খেতে হচ্ছে।
রমিলার ঘরে আলো নেই। ঘরের বাইরে জানালার পাশে হারিকেন রাখা হয়েছে। তার আলো ভেতরে পড়েছে। সেই আলো কাটা বেছে ছোটমাছ খাবার জন্যে যথেষ্ট না। অসুস্থ মহিলার ভাত খাওয়া দেখে লীলার রাগ লাগছে। কষ্টও লাগছে। সাৰ্ব্বক্ষণিক দেখাশোনার জন্য এই মহিলার একজন কাউকে দরকার। সেরকম কেউ নেই। লীলার বাবা সুস্থ-সবল একজন মানুষ।
তার পেছনে ছায়ার মতো দুজন লোক আছে। যেন একজন মানুষের দুটা ছায়া। অথচ অসহায় এই মহিলাকে দেখার কেউ নেই। তার নিজের ছেলেমেয়েরাও একবার এসে খোঁজ নেয় না। খুশির মা বলে একজন মহিলা প্রতিদিন একবার আসেন। মনে হচ্ছে এই মহিলার উপরই দায়িত্ব। খুশির মা খুবই কাজের মেয়ে, তার পরেও সে তো এ-বাড়িতে থাকে না।
লীলা লক্ষ করেছে, তার সৎমায়ের খাবারের সময়েরও কোনো ঠিক নেই। আজ তিনি সন্ধ্যাবেলায় খেতে বসেছেন। গতকাল দুপুরে তিনি কিছুই খান নি। এই ব্যাপারটা নিয়ে লীলা খুশির মার সঙ্গে কথা বলেছে। খুশির মা বলেছে–আম্মাজিগো, উনি যখন ভাত খাইতে চাইবেন তখন ভাত দিলে খাইবেন। না চাইলে ভাত দিলে উনি খুবই রাগ করেন।লীলা বলল, খুবই রাগ করেন মানে কী? রাগ করলে কী করেন— ভাতের থালা-বাটি উল্টে ফেলেন?
সেইটা করলে তো ভালোই ছিল আম্মাজি। বেশি রাগলে পরনের কাপড় খুঁইল্যা দাঁত দিয়া ছিড়েন। বড়ই লইজার বিষয়। এইজন্যেই তো উনার দেখভালের জন্যে বাইরের লোক রাখা হয় না। উনার নিজের ছেলেমেয়েরা উনারে দেখতে আসে না। লইজ্জা পায়।কথাগুলি লীলার কাছে যুক্তিযুক্ত বলে মনে হলো না। সব যুক্তি মন গ্ৰহণ করে না। এই যুক্তিও করছে না।লীলাকে চমকে দিয়ে রমিলা হঠাৎ ক্ষীণ স্বরে বললেন, মাগো, কী দ্যাখো?
লীলা বলল, আপনার খাওয়া দেখি।রমিলা চাপা হাসি-মাখানো গলায় বললেন, খাওয়ার মধ্যে কী আছে গো মা? খাওয়া তো রঙ্গিলা নাইচ না যে দেইখ্যা মজা পাইবা! লীলা বলল, খাওয়া রঙ্গিলা নাচ না হলেও খাওয়া দেখার মধ্যে আনন্দ আছে। আপনার ছেলেমেয়েরা যখন খেতে বসত। তখন আপনি পাশে বসে তাদের খাওয়া দেখতেন না? দেখে আনন্দ পেতেন না?
তুমি তো দূর থাইক্যা দেখতেছ। কাছে বইসা খাওয়া দ্যাখো।আসছি। বাবার কাছ থেকে চাবি নিয়ে এসে দরজা খুলে আসছি।চাবি চাইলে তোমার বাবা চাবি দিব না। এক কাজ করো, তোমার বাপের ঘরে যাও। সেই ঘরে কাঠের দুইটা বড় আলমারি আছে। কালা রঙের আলমারির তিন নম্বর ড্রয়ারে চাবি আছে।আপনি জানেন কীভাবে?
আমি অনেক কিছু জানি। কেউ আমারে কিছু না বললেও আমি জানি। মাসুদ চইল্যা গেছে— কেউ আমারে কিছু বলে নাই। কিন্তু আমি জানি।কেউ আপনাকে কিছু না বললেও তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছে, সেখান থেকে আপনি শুনেছেন।এইটা ঠিক বলছ মা। আমার কান খুবই পরিষ্কার। যাও চাবি দিয়া দরজা খুঁইল্যা আমার সাথে বসো। আমি খাওয়া বন করলাম। তুমি সামনে বসলে খাওয়া শুরু করব।
লীলা চাবি আনতে বাবার ঘরে ঢুকল। চাবি যেখানে থাকার কথা সেখানেই আছে। সে চাবি হাতে নিয়ে ঘুরল আর তখন সিদ্দিকুর রহমান বললেন, চাবি নিয়া কই যাও? ঘটনাটা হঠাৎ ঘটায় চট করে লীলার মাথায় কোনো জবাব এলো না। সে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। সিদ্দিকুর রহমান বললেন, তালা খুলে তুমি তোমার সৎমারে আজাদ করতে চাও?
তা না। উনি ভাত খাচ্ছেন, আমি সামনে বসে থাকব।সামনে বসে থাকার দরকার নাই।আমি উনাকে কথা দিয়ে এসেছি। সামনে বসে খাওয়াব। উনি খাওয়া বন্ধ করে বসে আছেন।
যখন-তখন যে-কোনো মানুষরে কথা দিবা না। কথা অনেক দামি জিনিস।লীলা শান্ত গলায় বলল, কথা দামি জিনিস বলেই তো আমি আমার কথা রাখব।না। একজন অসুস্থ মানুষকে আমি কথা দিয়ে এসেছি। উনি আমার কথা বিশ্বাস করে খাওয়া বন্ধ করে বসে আছেন। আমি যদি এখন তার কাছে না। যাই তাহলে উনি খাবেন না।না খেলে না খাবে। পাগল-মানুষ এক-দুই বেলা না খেলে কিছু হয় না।আপনি এমন একটা ছোট কথা কী করে বললেন?
সিদ্দিকুর রহমান ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তাহলে একটা ঘটনা শোনো–মরিয়ম নামের একটা মেয়েকে রেখেছিলাম যে তোমার সৎমায়ের দেখভাল করবে। ভাটি অঞ্চলের গরিব ঘরের মেয়ে। রমিলা একদিন কী করল শোনো— মরিয়মরে ভুলিয়ে-ভালয়ে দরজা খুলাল। তারপর হুট করে ঘর থেকে বের হয়ে বঁটি দিয়ে তারে কোপ দিল।
আমি মরিয়মকে প্রথমে নেত্রকোনা, তারপর ময়মনসিংহ সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। সেখানেই সে মারা যায়। মামলা-মোকদ্দমা যেন না হয়। সেজন্যে আমাকে অনেক টাকা-পয়সা খরচ করতে হয়েছে। মরিয়ম গরিব ঘরের মেয়ে বলে অল্পের উপর দিয়ে গিয়েছে। এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছি কেন আমি এত সাবধান। আমার কথা শোনো— যেখানে চাবি ছিল সেখানে রাখো।
লীলা বলল, উনি আমাকে কিছু করবেন না। উনি আমাকে পছন্দ করেন।সিদ্দিকুর রহমান বিরক্ত গলায় বললেন, মরিয়মকেও রমিলা খুব পছন্দ করত। তাকে রমিলা ডাকত— ময়না সোনা। এই নিয়া তোমার সাথে আর কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। দাও, ঘরের চাবিপ্রায় আধঘণ্টার উপর ট্রেন থেমে আছে।
কোন থেমে আছে। কেউ বলতে পারছে না। কতক্ষণ থেমে থাকবে তাও কেউ বলতে পারছে না। ব্যাপারটা নিয়ে কাউকে চিন্তিত মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে সবাই খুশি। জানালার পাশে একটা সিট নিয়ে লীলা বসেছে। বেঞ্চের সর্বশেষ সিট বলে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসেছে। লীলার পাশেই মঞ্জু। তার হাতে ফ্লাস্ক ভর্তি গরম পানি। চা বানানোর সরঞ্জাম।
ভদ্রলোকের প্রধান শখ চলন্ত ট্রেন বা বাসে নিজের হাতে বানিয়ে চা খাওয়া। মঞ্জুর মেজাজ খারাপ। তার আরো কিছুদিন থাকার ইচ্ছা ছিল। জায়গাটা সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার আগেই চলে যেতে হচ্ছে এটা কেমন কথা? চলে আসার সময় কইতরী এমন কান্না শুরু করল যে তার নিজের চোখেও পানি এসে গেল। তিনি গম্ভীর গলায় ঘোষণা দিলেন– মা, কাঁদিস না। আমি লীলাকে পৌছে দিয়ে চলে আসব। তারপর যতদিন ইচ্ছা নিজের মতো থাকব। ভদ্রলোকের এককথা। আমি ভদ্রলোক।
লীলাদের উল্টোদিকের বেঞ্চে কান্ত হয়ে আনিসুর রহমান শুয়ে আছে। এই গরমেও তার গায়ে মোটা চাদর। শীত লাগছে–এই কথাটা সে কাউকে বলতেও পারছে না। আশেপাশে কেউ থাকলে সুটকেস খুলিয়ে সুটকেস থেকে সে আরেকটা চাদর বার করত। পায়ের তালুতে শীত বেশি লাগছে। একজোড়া মোজা পরলেও হতো। সে চোখ খোলা রাখতে পারছে না। চোখে রোদ লাগছে।
আনিসুর রহমান কলেজের চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। এখন সে যাচ্ছে মায়ের কাছে। ডাক্তার দেখিয়ে প্রথমে শরীর সারাবে। পরেরটা পরে দেখা যাবে। তার যাত্ৰাসঙ্গী হয়েছে বড় সাহেবের মেয়ে লীলা। এটা অস্বস্তিকর। পরিচিত কেউ না থাকলে ভালো হতো। পরিচিত কেউ থাকা মানেই কিছু সৌজন্যমূলক কথাবার্তা। অসুস্থ অবস্থায় কোনো কথাবার্তা বলতে ইচ্ছা করে না।
কথা শুনতেও ভালো লাগে না। তবে লীলা মেয়েটা ভালো। তার মধ্যে লোক দেখানো ব্যাপারটা নেই। শরীর কেমন? খারাপ লাগছে?— এই জাতীয় কোনো কথাই সে বলছে না। জানোলা দিয়ে মুখ বের করে সে আছে নিজের মতো। মঞ্জু আনিসের কাছে এসে বলল, আমার কাছে বালিশ আছে, নিজের বালিশ বিছানার চাদর ছাড়া আমি বের হই না। আপনাকে দেব?
আনিস বলল, না।লাগলে বলবেন, লেজা করবেন না। আমার হলো উঠল বাই তো কটক যাই সিস্টেম। ব্যােগ গোছানোই থাকে। ব্যাগে লুঙ্গি, মশারি, দড়ি, টর্চলাইট, হাতুড়ি সব পাবেন। মেডিসিন বক্স একটা আছে, সেখানে যাবতীয় এসেনসিয়াল ড্রাগ পাবেন। পেট খারাপ হয়েছে— ফ্রাজিল আছে। মাথা ধরার ওষুধ আছে, জ্বর কমানোর ওষুধ আছে। থার্মোমিটার আছে। প্ৰেশার মাপার যন্ত্র আছে।আনিস বলল, ভালো তো! মঞ্জু বলল, ভালো-মন্দ জানি না। আমি সবসময় তৈরি থাকতে পছন্দ করি। দেখি, আপনার জ্বর কত মেপে দেই।আনিস বলল, দরকার নেই।
মঞ্জু বলল, অবশ্যই দরকার আছে। আপনার চোখ-মুখ লাল হয়ে আছে। জ্বর একশ দুইয়ের উপরে। জ্বর একশ দুই ক্রস করলে চোখ-মুখ লাল হয়ে যায়।প্লিজ, আমার কিছু লাগবে না।শুনলাম আপনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে ফর গুড চলে যাচ্ছেন? চির বিদায়।হুঁ।সঙ্গে ক্ল্যাশ হয়েছিল? হুঁ।কলেজের প্রফেসরের চাকরি তো ভালো চাকরি। ছাড়লেন কেন? কারো সঙ্গে কি ক্ল্যাশ হয়েছিল? হুঁ।কার সঙ্গে?
আপনার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছে না। কিছু মনে করবেন না।মঞ্জু কিছু মনে করল বলে মনে হলো না। সে ব্যস্ত হয়ে পড়ল ফ্রাঙ্ক নিয়ে। ফ্লাস্কের মুখ খুলছে না। মনে হয় প্যাচ কেটে গেছে।ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। এতক্ষণ কামরাভর্তি লোক ছিল, এখন প্রায় ফাকা। এই কামরায় যারা এসেছিল তারা লীলাকে উঠিয়ে দিতে এসেছিল।
তাদেরকে বলা হয়েছিল, সিট দখল করে বসে থাকবে যাতে বাইরের কেউ উঠতে না পারে। ট্রেন ছেড়ে দেবার সময় নেমে যাবে।আনিসের পায়ের কাছে দুই ভদ্রলোক বসেছেন। মনে হয় রাজনীতির লোক। ক্রমাগত বকবক করে যাচ্ছে— যুক্তফ্রন্ট ভেঙে গেছে, উচিত শিক্ষা হয়েছে। এখন বুঝ কত ধানে কত চাল! ইস্কান্দর মীর্জা সাহেব উচিত কাজ করেছেন।ইস্কান্দর মীর্জটা কে?
মেজর জেনারেল। কঠিন লোক। বাঙালির জন্যে দরকার কঠিন লোক।রাজনীতির আলাপে উৎসাহিত হয়ে মঞ্জু। তাদের সঙ্গে যুক্ত হলো এবং অতি দ্রুত একমত হলো যে, পূর্ববাংলার গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ কঠিন চীজ। সে পানি ছাড়াই চিড়া ভিজাতে পারে। আলোচকদের গলা উঁচু থেকে উঁচু হচ্ছে। আনিস একবার শুধু বলল, একটু আস্তে কথা বলবেন? কেউ তা শুনল না।
লীলা জানোলা দিয়ে তাকিয়ে আছে। কেন জানি তার খুব মজা লাগছে। নয়াপাড়া নামের জায়গাটায় সে বেশ কিছুদিন কাটিয়েছে। জায়গাটার জন্যে কিছুটা হলেও তার মনখারাপ লাগা উচিত। তা লাগছে না। ভাবটা এরকম যে সে একটা জরুরি কাজে গিয়েছিল।
কাজ শেষ হয়েছে, এখন ফিরে যাচ্ছে। মন খারাপ করা বা বিষন্ন হবার মতো কিছুই ঘটে নি। যদিও লীলার সৎমা খুব কান্নাকাটি করলেন। মস্তিষ্কবিকৃত মানুষের কান্নাকাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার কিছু নেই। তারা কারণ ছাড়াই কাব্দে। রমিলা লীলার হাত ধরে বিস্মিত গলায় বললেন, চইল্যা যাবা? লীলা বলল, আমি সারাজীবন এখানে থাকার জন্যে আসি নাই। আপনাদের দেখার শখ ছিল। দেখেছি, শখ মিটেছে। এখন চলে যাচ্ছি।থাকলে কী হয়?
থাকলে কিছু হয় না। কিন্তু আমি আরো পড়াশোনা করব। এখানে পড়াশোনা করব কোথায়? পড়াশোনা না করলে কী হয়? লীলা হেসে ফেলল। হাসি থামিয়ে বলল, আমার প্রসঙ্গে আপনি যে কথা বলেছিলেন তা কিন্তু হয় নি।কী বলেছিলাম? আপনি বলেছিলেন। আমি এইখানেই থাকব, কোথাও যাব না।পাগল-মানুষের কথা।লীলা বলল, আপনি ভালো থাকবেন। নিজের যত্ন নেবেন।
রমিলা তখন কাঁদতে শুরু করলেন। সৎমায়ের কাছ থেকে বিদায় নেয়া লীলার জন্যে কঠিন হয়ে দাঁড়াল। একসময় সিদ্দিকুর রহমান এসে বললেন, মেয়ের হাত ছাড়ো। তাকে যেতে দাও। রমিলা তৎক্ষণাৎ লীলার হাত ছেড়ে একপাশে গুটিয়ে গেলেন। ভীতচোখে তাকাতে লাগলেন। সিদ্দিকুর রহমান বললেন, যে যেতে চায় তাকে জাপটে ধরে রাখা যায় না। বুঝেছ? রমিলা ভীত গলায় ফিসফিস করে বললেন, বুঝেছি।বিদায়মুহূর্তে সিদ্দিকুর রহমান মেয়েকে কিছু বললেন না। কিছুক্ষণ আগেই বাড়িতে একটা নাটক হয়েছে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত। চুপচাপ থাকাই বাঞ্ছনীয়।
নাটক তৈরি হয়েছে মাসুদকে নিয়ে। সে ভোরবেলায় এসে উপস্থিত। চোখমুখ শুকনা। মাথার চুল উঠে গেছে। দেখে মনে হয়েছে কয়েক দিন না খেয়ে আছে। গালের চামড়া দেবে আছে। চোখের নিচে কালি। সিদ্দিকুর রহমান কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, আছ কেমন? মাসুদ অস্পষ্ট স্বরে বলল, ভালো।দেশ-বিদেশ ঘুরলা? মাসুদ কিছু বলল না। সিদ্দিকুর রহমান বললেন, ফিরে আসলা কেন?
মাসুদ চুপ করে রইল। সিদ্দিকুর রহমান বললেন, জবান বন্ধ কেন? কথা বলো। কার টানে ফিরলা? আমার টানে ফিরো নাই এইটা আমি জানি। আমার জন্যে এত টান কারোর নাই। তুমি তোমার ভাইবোনের জন্যেও ফিরো নাই। ঘরবাড়ির টানেও ফিরো নাই। তুমি কি পরীবানুর টানে ফিরেছ? দেখা হয়েছে তার সাথে?
মাসুদ জবাব দিচ্ছে না। সে আতঙ্কে অস্থির হয়ে আছে। সিদ্দিকুর রহমান আবারো বললেন, পরীবানুর সঙ্গে দেখা হয়েছে? হ্যাঁ কিংবা না একটা কিছু বলো।মাসুদ বলল, জি দেখা হয়েছে।পরীবানু তোমাকে দেখে খুশি হয়েছে?
