রাতে তেল ডলাডলির অংশটা সে বড়ই উপভোগ করে। হাওলু মিয়া কাজটা করেও চমৎকার। সরিষার তোলে রসুন দিয়ে জ্বাল দেয়। সেই তেলের বাটি হারিকেনের উপর দিয়ে রাখে। তেল থাকে গরম। গরম তেল গায়ে ডলা হয়। আরামে বন্দুর চোখ বন্ধ হয়ে আসে। চোখ বন্ধ করে নানান গল্প করতে তার বড় ভালো লাগে।
হাওলু মিয়া শোনো, কাজকর্মের চাপ একটু কমলে তোমারে আমাদের অঞ্চলে নিয়া যাব। আহারে কী জায়গা! কী বিরাট বাড়ি চাচাজির! মূল বাড়ি, উত্তর বাড়ি, শহর বাড়ি। তয় ভূতের উপদ্ৰব।ভূতের উপদ্রব? ছোট বাড়িতে ভূতের উপদ্ৰব থাকে না। বড় বড় সব বাড়িতে জিন-ভূত থাকে। অনেক ঘর থাকে খালি, এরা আশ্রয় নেয়।আপনে জিন-ভূত দেখছেন? চাচাজির বাড়িতে থাকব, জিন-ভূত দেখব না। এইটা হয়! ভয় পাইছেন?
নাহ্। রোজ রাতে দেখলে ভয় থাকে না। দেখতে চাইলে তোমারে দেখাব। কোনো অসুবিধা নাই। বেশি ভয় পাইলে আয়াতুল কুরসি পইড়া ফু দিবা। আয়াতুন কুরসি জানো তো? জি না।শিখা নিবা। আয়াতুল কুরসি মুখস্থ না করলে তোমারে নিয়া যাব না। কখন কী বিপদ হয়! বিবাহ করেছ? জি না।
ইচ্ছা করলে আমাদের অঞ্চলে বিবাহ করতে পারো। আমাদের অঞ্চলের মেয়ে অত্যধিক সুন্দর। তাদের আদব-লোহাজও ভালো। আমি ব্যবস্থা করে দিব। আমার এককথায় বিবাহ হয়ে যাবে। চাচাজির সঙ্গে কাজ করেছি। তো। আমাদের ইজ্জতই অন্যরকম। কেউ কোনো কথা ফেলব না।হাওলু মুগ্ধ হয়ে শোনে। অতি আশ্চর্য সেই ভাটি অঞ্চলে তার যেতে ইচ্ছা করে।
মঞ্জু বাগদীর বাজারের হাট থেকে একটা ঘোড়া কিনেছেন! গাধা ধরনের ঘোড়া। সাইজে ছোট। গাধার মতোই লম্বা লম্বা কান। হাঁটা-চলার আগ্রহ খুবই কম। সে তার চার ঠ্যাঙ মাটিতে পুতে দাঁড়িয়ে থাকে। লাগাম ধরে টানাটানি, পিঠে বাড়ি কিছুতেই কাজ হয় না।পরীবানু বিরক্ত। সে বেজার মুখে বলল, এটা কী ঘোড়া কিনেছেন। গাধা মার্কা ঘোড়া।মঞ্জু বলেছেন, গাধা মার্কা ঘোড়াই দরকার। আমি গাধা মার্কা লোক। আমার ঘোড়াও গাধা মার্কা।ঘোড়া কেনার আপনার দরকারটা কী ছিল?
দরকার আছে বলেই কিনেছি। বিনা দরকারে আমি কিছু করি না। ঘোড়া আমি তোমার জন্যেও কিনি নাই। আমার জন্যেও কিনি নাই। ঝড়-তুফানের জন্যে কিনেছি। এরা ঘোড়ায় চড়া শিখবে। এরা দুইজন হেজি-পেজি না। এরা সিদ্দিক সাহেবের নাতি।ঘোড়া উঠানে দাঁড়িয়ে থাকে। ঝড়-তুফান দুই ভাই মহানন্দে ঘোড়ার পিঠে বসে থাকে। এদের আনন্দ দূর থেকে দেখে পরী। আনন্দে তার চোখেও পানি আসে। সে তার জীবনের আনন্দ-সংবাদ জানিয়ে লীলাবতীকে একটি চিঠিও লিখেছে—
বুবু,
শত সহস্ৰ সালাম। নিবেদন আমরা সকলে মঙ্গলমতো আছি। তুফান কিছুদিন কাশিতে কষ্ট পাইয়াছে। বাসক পাতার রস খাইবার পর আরোগ্য হইয়াছে। ঝড় মাশাল্লাহ ভালো আছে। অসুখ-বিসুখ তার তেমন হয় না।এইদিকে আমি ঘর-দুয়ার গুছাইবার চেষ্টা করতেছি। আপনার মামাকে আপনি চিনেন। তিনি বিনা কাজের কাজি।
সকাল হইতে নিশিরাত পর্যন্ত কর্ম ছাড়াই অতি ব্যস্ত। লাটিমের মতো ঘূর্ণনের মধ্যে আছেন। নিজের বিষয়-সম্পত্তি কী আছে কিছুই জানেন না। আমি এখানে না আসিলে সমস্তই দশভূতে লুটিয়া খাইত।তাহার বিষয়-সম্পত্তি খারাপ না, ভালোই। বাড়ির পেছনের বাগানে সুপারি গাছ আছে একচল্লিশটা। কাঁঠাল গাছ সতেরোটা, আম গাছ সাতটা, পেয়ারা গাছ আঠারোটা।
আপনি নিশ্চয়ই আমার পত্র পাঠ করিয়া হাসিতেছেন এবং আপনার ধারণা হইয়াছে, আমার বর্তমান কাজ গাছ গোনা। ইহা সত্য। আমি এখন উনার কী আছে না আছে তাহা নিয়াই ব্যস্ত। উনার প্রতিটি জিনিসই মনে হয় আমার জিনিস। আপনাদের বিশাল ভূ সম্পত্তি দেখিয়া আসিয়াছি। তাহার কোনো কিছুই আমার আপন মনে হয় নাই। বুরু, আমার কথায় মনে কষ্ট নিবেন না।
আপনার মঞ্জু মামার মা মৃত্যুকালে প্রচুর গয়না রাখিয়া গিয়াছিলেন। উনি কিছুই জানিতেন না। পুরাতন বাক্স পোটলা পুঁটলি ঘাঁটিতে ঘাটিতে আমি তার সন্ধান পাই। স্যাকরা আনাইয়া গয়না ওজন করাইয়াছি। সর্বমোট ছাপ্পান্ন ভরি সোনার গয়না আছে।
বুবু, আপনি জাইতরী-কইতরীকে নিয়া কোনো দুশ্চিন্তা করিবেন না। দুইবোন ভালো আছে। আনন্দে আছে। আপনার মামা বাড়ির পেছনের বাগানে দুই বোনের জন্য দুইটি খড়ের চালা নির্মাণ করিয়াছেন। একটির নাম দিয়াছেন কইতর মহল। অন্যটির নাম দিয়াছেন জাইতর মহল। দুইবোন দিনের বেশিরভাগ সময় এই দুই চালাতে থাকে।
আপনার মঞ্জু মামার বাড়িতে পানির ভালো ব্যবস্থা ছিল না। আমি একটি টিউবওয়েল বসাইয়াছি। আল্লাহর মেহেরবানি, টিউবওয়েলের পানি অতি সুস্বাদু প্রমাণিত হইয়াছে। নিজেদের বাড়িতে টিউবওয়েল থাকা সত্ত্বেও অনেকে আমাদের টিউবওয়েলের পানি নিতে আসে। এই বাড়িতে একটি কুয়া ছিল। সংস্কারের অভাবে কুয়া বুজিয়া গিয়াছিল। আমি ঠিক করাইয়াছি এবং কুয়াতলা বাঁধাইয়া দিয়াছি। জায়গাটা এখন অতি মনোরম হইয়াছে।
বুবু, আপনাকে লেবু বাগানের কথা বলিতে ভুলিয়া গিয়াছি। লেবু বাগান আমার শাশুড়ির নিজের হাতে করা। সারা বৎসর বাগানে লেবু থাকে। বাড়ির সামনের পুকুরের পাড়ে আমার শাশুড়ির হাতে লাগানো নারিকেল গাছ আছে ত্ৰিশটা। প্রতিটা গাছই ফলবতী। আগে ডাব-নারিকেল দশ ভূতে নিয়া যাইত। এখন আর হইতেছে না। পুকুরের চার দিকে কাঁটাতারের বেড়া দিবার সিদ্ধান্ত নিয়াছি। ইনশাল্লাহ আগামী বর্ষার আগেই কাৰ্য সমাধা করিব।
বুবু, অনেক কথা লিখিয়া ফেলিয়াছি। পত্রে কোনো ভুল-ত্রুটি করিয়া থাকিলে ক্ষমা দিবেন।
ইতি— আপনার স্নেহের হতভাগিনী
পরীবানু।
লীলাবতী মূল বাড়ির উঠানে বসে আছে। সে মজার একটা দৃশ্য দেখছে। তার সামনে হাত পঁচিশেক দূরে একটা কাঁঠালগাছ। কাঁঠালগাছের নিচে গর্তমতো হয়েছে। বর্ষার পানি জমেছে। গর্তে। সেই পানিতে একটা কাক গোসল করছে। গোসল সারছে অতি ব্যস্ততায়। ঠোঁটে পানি নিয়ে পালকে মাখছে। কাকের স্নান মুগ্ধ হয়ে দেখার কিছু না।
অস্বাভাবিক কোনো দৃশ্য না। সব পাখিই স্নান করে। তবে কাকের বিশেষত্ব তার তাড়াহুড়ায়। কাকের স্নান দেখলে মনে হয়, জরুরি কোনো কাজ ফেলে সে এসেছে, তাকে অতি দ্রুত চলে যেতে হবে। তারপরেও এই দৃশ্যটা লীলাবতী মুগ্ধ চোখে দেখছে অন্য কারণে। কাকের স্নান দেখার জন্যে অন্য আরেকটা কাক পাশে বসে আছে। সে ঘাড় বাঁকিয়ে আছে এবং মাঝে মাঝে কা কা করছে।
লোকমান এসে লীলাবতীর পাশে দাঁড়াল। লীলাবতী বলল, লোকমান ভাই, আপনি পুরুষ কাক কোনটা আর মেয়ে কাক কোনটা বুঝতে পারেন? যে কাকটা গোসল করছে সে ছেলে না মেয়ে? লোকমান না-সূচক মাথা নাড়ল।লীলাবতী বলল, মাথা নেড়ে। আপনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন? আপনি জানেন না?জানি না।আমার ধারণা যে কাকটা গোসল করছে সেটা মেয়ে কাক। দেখুন। সাইজে ছোট।কিছু খাবেন আপা? না।আজি দুপুরে কি জঙ্গলে খাবেন?
তাও জানি না। এখন আপনি সামনে থেকে যান। আপনাকে সবসময় আমার চোখের সামনে থাকতে হবে না।লোকমান সরে গেল। লীলাবতী আবার তাকালো কাকটার দিকে। প্রথম কাকটার গোসল হয়ে গেছে, এখন দ্বিতীয় কাকটা গোসল করছে। এটাও মনে হয় বিস্মিত হবার মতো ঘটনা। গর্তটা দুটা কাকের একসঙ্গে গোসল করার মতো বড় ছিল। তারা তা করল না কেন? তাদের মধ্যেও কি সৌজন্য বোধের কোনো ব্যাপার আছে?
লীলাবতী উঠে দাঁড়াল। হাঁটতে শুরু করল স্নানরত কাকটার দিকে। তাকে দেখলে একসময় তারা দুজন ভয় পেয়ে উড়ে চলে যাবে। ভয়টা কখন পাবে এটা তার পরীক্ষা করার ইচ্ছা। সব পাখি মানুষকে সমান ভয় পায় না। কোনো পাখি হয়তো তার দশ গজের কাছাকাছি আসতে দেবে। আবার কেউ দেবে পাচি গজ পর্যন্ত। পাখিদের ভয়ের একটা স্কেল তৈরি করা যেতে পারে।
কাক ১০ গজ
শালিক ১৫ গজ
বক ২০ গজ
লীলাবতী কাক দুটার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। এরা নড়ছে না। দুজনই বিরক্ত হয়ে তাকে দেখছে কিন্তু ভয় পাচ্ছে না। জংলা ভিটার পাখিরা তাকে ভয় পায় না। সেখানে লীলাবতীর জন্যে চেয়ার-টেবিল রাখা হয়েছে। চিঠি লেখার ব্যবস্থা। মাসে একটি চিঠি সে তার বাবাকে লিখতে পারে। চিঠি সে জঙ্গলের ভেতর সাজিয়ে রাখা চেয়ার-টেবিলে বসে লেখে।
পাশেই বড় পাটিপাতা বড় চৌকি। শুয়ে বিশ্রাম করার জন্য রাখা। সে যখন চিঠি লেখে তখন চৌকিতে ধান ছিটিয়ে দেয়। দুনিয়ার পাখি নেমে আসে। লীলাবতীকে জঙ্গলের খুঁটিনাটি প্রতিটি বিষয় লিখতে হয়। লিখতে হয় বলা ঠিক হয় নি। সিদ্দিকুর রহমান কখনো মেয়েকে এই বিষয়ে কিছু লিখতে বলেন নি। লীলাবতী নিজ থেকেই লেখে। যে মানুষটা হাজতের অতি ক্ষুদ্র একটা ঘরে আটকা পড়ে গেছেন, তার কাছে একটা খোলা জানালা নিয়ে যাওয়া।
বাবা, মাছরাঙ্গা পাখি যে ফুল খায়— এই তথ্য কি আপনি জানেন? মাছরাঙ্গা পাখি মাছ খায়–এটাই আমরা সবাই জানি। কিন্তু আমি নিজে ফুল খেতে দেখেছি। জঙ্গলের মাঝামাঝি ডোবার মতো যে জায়গা আছে, সেখানে ছোট ছোট লতানো গাছে ফুল ফুটেছে। ফুলের রঙ নীল। মাছরাঙ্গা পাখিকে দেখলাম শাঁ করে আকাশ থেকে নেমে ঠোঁটে ফুল নিয়ে উড়ে চলে গেল। আমি যে শুধু একবার ঘটনাটা দেখেছি তা না। অনেকবার দেখেছি। কচুরিপানার ফুল ছিড়ে নিতেও দেখেছি।
ফুলের বিষয়ে আরেকটা মজার কথা বলি। বনের একেবারে শেষ মাথায় যেখানে কয়েকটা তালগাছ আছে সেই জায়গায় ঝোপমতো জায়গায় কিছু সাদা ফুল ফুটেছে। ফুলগুলি লম্বাটে ধরনের। ফুলের গোড়ায় এবং গাছে প্রচুর কাঁটা। আমি ফুল ছিঁড়ে হাতে নিলাম। গন্ধ শুকলাম। মিষ্টি গন্ধ। অনেকটা খেজ্বর গুড়ের গন্ধের মতো। তারপরই সমস্যা শুরু হলো। যে সব জায়গায় ফুলটা লেগেছে। সে সব জায়গায় হঠাৎ চুলকানি এবং জুলুনি শুরু হলো।
আমার হাত গেল ফুলে। গন্ধ শোকার সময় নাকেও ফুল লেগেছিল। নাকও ফুলে গেল। নিঃশ্বাস নিতে পারি না। এমন অবস্থা। ফুলটা আমি অনেককে দেখিয়েছি। কেউ নাম বলতে পারে না। আমি একটা বইয়ের ভেতর ফুলটা রেখে বই চাপা দিয়ে ফুল শুকিয়েছি। আপনাকে আবার যখন দেখতে আসব, ফুলটা সঙ্গে করে নিয়ে আসব। এই ফুলের নিশ্চয়ই কোনো নাম আছে, আমি নাম দিয়েছি বিষফুল ॥.’ লীলাবতীর চিঠি। দীর্ঘ হয়। সেইসব দীর্ঘ চিঠিতে অনেক কিছু লেখা থাকলেও তার নিজের কথা কিছুই থাকে না।
সে লেখে না যে, আমি একটি বিশাল বাড়িতে সম্পূর্ণ একা থাকি। আমাকে পাহারা দেবার জন্যে লাঠি হাতে লোকমান ভাই শুধু একা উঠানে বসে থাকেন।এই বাড়িতে কেউ আসে না। সবাই ভয় পায়। বাড়িতে নাকি জিন-ভূতপ্ৰেত ঘুরে বেড়ায়। যে দু’তিনজন গ্রামের মহিলাকে লোকমান নিয়ে এসেছিল তারা সবাই চলে গেছে। তারা নাকি নিজের চোখে অনেক কিছু দেখেছে। নিশিরাতে সাদা কাপড় পরা লম্বা লম্বা মানুষরা নাকি উঠানে হাঁটাহাঁটি করে।
নিশিরাতের শূন্য বাড়ির বিশাল খাটের মাঝখানে বসে মাঝে মাঝেই লীলার মনে হয়, ঝোকের মাথায় হঠাৎ একদিন বাবাকে কিছুক্ষণের জন্যে দেখতে আসাটা কি ভুল ছিল? নাকি এটা ছিল পূর্ব নির্ধারিত? সে আসবে এবং মাকড়সার জালে পোকা আটকে পড়ার মতো আটকে যাবে।লীলার যখন সাত বছর বয়স সে থাকত তার মামার বাড়িতে, তখন তাদের অনেকগুলি রাজহাঁস ছিল। এদের মধ্যে একটা কী কারণে যেন অন্ধ হয়ে গেল। হাঁটতে পারত না।
মুখ থুবড়ে পড়ে যেত। গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেত। শুধু যখন কেউ তাকে ধরে পুকুরের পানিতে ছেড়ে দিত, সে স্বস্তি পেত। একা একা নিজের মনে সাঁতার কাটত। এখন লীলার মনে হয়, সে নিজেই অন্ধ রাজহাঁস। অন্ধ রাজহাঁসটা একা একা দিঘির শান্ত জলে ঘুরত, সে হয়তো অপেক্ষা করত কিছু একটা ঘটবে, বদলে যাবে তার পৃথিবী। লীলাও অপেক্ষা করে। আমরা সবাই অপেক্ষা করি। প্রকৃতি তার মানব সন্তান তৈরিই করেছে অপেক্ষা করার জন্যে।