হিমুর আছে জল পর্ব – ৪ হুমায়ূন আহমেদ

হিমুর আছে জল

আপনার ভালোর জন্য বলছিরে ভাই। আতর মিয়ার বিষয়ে ঠিক ধারণা থাকলে আপনারই সুবিধা। ভুল চাল দিয়ে বিপদে পড়বেন। আতর মিয়ার চড় খেয়ে একজন হামাগুড়ি পর্যায়ে চলে গেল। সে একজায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাচ্ছে হামাগুড়ি দিয়ে। এই যাত্রায় উঠে দাঁড়াতে পারবে এরকম মনে হচ্ছে না।তৃষ্ণা খিলখিল করে হাসছে।

এমন আনন্দময় হাসি শুধু কিশোরীরাই হাসতে পারে।রশীদ খানের পকেটে মোবাইল ফোন বাজছে। মোরগ কোকার কো করেই যাচ্ছে।আমি বললাম, ভাই মোরগটা ঠান্ডা করুন। দেরি করলে মোরগ ডিম পেড়ে দিতে পারে। আপনার পরিচিত আজরাইলীদের একজন টেলিফোন করেছে।আপনাকে বলেছে কে?

আমি হাসতে হাসতে বললাম, আমি জানি।আমার হাসিতে ভদ্রলোক বিভ্রান্ত হলেন। তৃষ্ণাও খানিকটা বিভ্রান্ত হলো। মানুষকে বিভ্রান্ত করা মজার ব্যাপার। প্রকৃতি এই বিষয়টা সবসময় করে। মানুষকে রাখে বিভ্রান্তির ভেতর।রশীদ টেলিফোন ধরেছেন। নিচুগলায় কথা বলছেন। নিচুগলার কথা আমি শুনতে পাচ্ছি। তৃষ্ণাও পাচ্ছে, সে চকচকে চোখে বিপুল আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে।

কথাবার্তার এক পর্যায়ে রশীদ বললেন, আতর মিয়া বলে কাউকে চেনো? একটা চোখ বড়। একটা ছোট। থুতনিতে কাটা দাগ।জবাবে ওপাশ থেকে কী বলা হলো তা আমরা শুনলাম না, তবে রশীদ খানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তিনি আমতা আমতা করে বললেন, বলো কী! না না, আমি কোনো ঝামেলায় যাব না। ঝামেলায় যাওয়ার আমার প্রয়োজন কী? আচ্ছা রাখি।

রশীদ খান হতাশ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।আবহাওয়া যথেষ্ট শীতল। বৃষ্টির সঙ্গে হাওয়ার ঝাপটা, তারপরেও রশীদের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।আমি বললাম, আপনার কেবিনে যে মেয়েটা আছে সে কে? আমার স্ত্রী।তাহলে যান, কেবিনে ফিরে যান। ভাবির সঙ্গে সুখ-দুঃখের গল্প করুন। সময় বেশি নাই, লঞ্চ ড়ুবে যাবে। একসঙ্গে মৃত্যুর প্রস্তুতি নেওয়ার একটা ব্যাপারও আছে।

রশীদ নড়লেন না। যেখানে ছিলেন সেখানে বসে রইলেন। তার পকেটের মোরগ আবার ডেকে উঠল, কোঁকর কোঁ।আমি বললাম, আপনার আসল স্ত্রী টেলিফোন করেছেন। টেলিফোন ধরুন। মহা বিপদের বিষয়টা তাকে জানান।তৃষ্ণ বিক্ষিত গলায় বলল, আপনি কে টেলিফোন করেছেন তা ধরতে পারেন?আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, মাঝে মাঝে পারি। সবসময় না।যে টেলিফোন করেছে তার নামও কি বলতে পারেন?

বেশিরভাগ সময় পারি না, তবে এখন বলতে পারব। যে মহিলা টেলিফোন করেছেন তার নাম ময়না।রশীদ খান ভয়াবহ চমক খেলেন। একবার বড় ধরনের চমক খেলে পরপর আরও দুবার খেতে হয়। এই জন্যেই প্রবচন দানে দানে তিনদান। রশীদ খান দ্বিতীয় চমক খেলেন। আতর আবার ফিরে এসেছে। তার সঙ্গে এক তরুণী। তরুণী ভয়ে আতঙ্কে থারথার করে কাঁপছে।

জোগাড় করেছি। লঞ্চের মালিকের পুলা ডাইল খায়া বমি কইরা বমির উপর পইড়া ছিল। আমি বললাম, পিস্তল কই রাখছেন, বাইর করেন। দেরি করবেন। না। দেরি করলে পেটে পাড়া দিয়া বাকি বমি বাইর করব। বলেই পেটে পাড়া দিলাম। সাথে সাথে জিনিস চলে আসল আমার হাতে। যন্ত্র ভালো, মেড ইন ইতালি।আমি বললাম, সঙ্গের মেয়েটা কে?

আতর হাই তুলতে তুলতে বলল, এর নাম সীমা। প্রফেসর সাহেবের ছাত্রী। স্যারের সঙ্গে ভ্রমণের জন্য এসেছিলেন। সুযোগ বুঝে লঞ্চের মালিকের ছেলের কেবিনে উনাকে ঢুকায়ে দিল। যে ভ্রমণের জন্যে উনি এসেছিলেন, সেই ভ্ৰমণই উনার হয়েছে। স্যারুের বদলে লঞ্চ মালিকের ছেলে কন্দেরের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন।

সীমা ফুঁপিয়ে উঠল। আতর বলল, সিস্টার! আপনার সারা শরীর বমিতে মাখামাখি। আগে টয়লেটে যান। সাবান দিয়ে ভালোমতো সিনান করে স্যারের কাছে যান। বিদ্যা শিক্ষা নেন।তৃষ্ণা বিস্মিত দৃষ্টিতে সীমার দিকে তাকিয়ে আছে। তৃষ্ণা বলল, আপনার কাছে একসাট্রা ড্রেস না থাকলে আমার কাছ থেকে নিতে পারেন। আপনার গা থেকে বমির বিকট গন্ধ আসছে।আমি বললাম, মেয়েটাকে কাপড় দিয়ে চল আমরা লঞ্চটা ঘুরে দেখি। এখানকার পরিস্থিতি ঠান্ড হোক।

তৃষ্ণা বলল, আপনি না বললেও আপনি যেখানে যাবেন আমি আপনার পেছনে পেছনে যাব। আজ রাতের জন্য আমি হব মেরীর little lamb. লঞ্চ দুলছে। ভীতিকর দুলুনি না, আরামদায়ক দুলুনি। বৃষ্টি ঝরেই যাচ্ছে। আমি তৃষ্ণকে নিয়ে পরিদর্শনে বের হয়েছি। তৃষ্ণার হাতে খেলনার মতো দেখতে ভিডিও ক্যামেরা। এই মেয়েটির ভয়ডর এখন যে চলে গেছে তা বোঝা যাচ্ছে। মহা বিপর্যয়ের ছবি তুলতে পারার আনন্দেই এখন সে আনন্দিত।

তৃষ্ণা হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে বলল, হিমু! আমরা মহা বিপদে আছি, কিন্তু আমার ভালো লাগছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে। আমি স্পিলবার্গের কোনো ছবিতে অভিনয় করছি। ছবির শেষ দৃশ্যে লঞ্চ ড়ুবে যাবে, আমরা দুজন একটা কাঠের মৃত্যুক্ত ধরে ভেসে থািকব।আমি বললাম, অভিনেত্রী, মন দিয়ে শুনুন। হাঁটার সময় রেলিং ধরে হাঁটুন। আপনার ক্যামেরা কিন্তু ভিজে যাচ্ছে।

এটা ওয়াটারপ্রািফ ক্যামেরা, ভিজলেও কিছু হবে না। স্কুবা ডাইভিং-এ এই ক্যামেরা ব্যবহার হয়।তাহলে তো কথাই নেই, লঞ্চ যখন ড়ুবে যাবে আপনিও ড়ুববেন এবং তখনো ছবি তুলবেন।লঞ্চ ড়ুববে না। আমার মন বলছে ড়ুববে না। আমি আমার অভিজ্ঞতা নিয়ে একটা বই লিখব। রিডার্স ডাইজেক্ট-এ একটা আর্টিকেলও লিখব। আপনি রিডার্স ভাইজেক্ট পড়েন? না।

আমার একটা লেখা রিডার্স ডাইজেদ্ষ্টে ছাপা হয়েছিল। Life নামে ওদের একটা সেকশন আছে। সেখানে মজার মজার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ঘটনা ছাপা হয়। আমারটাও ছাপা হয়েছিল। একশ ডলার পেয়েছিলাম। শুধু আমার নাম ভুল ছেপেছে। লিখেছে। Tritima, Bangladesh. রিডার্স ডাইজেস্ট্রটা আমার সুটকেসে আছে। আমি আপনাকে পড়তে দেব। পড়বেন তো? পড়ব।আপনার প্রবল ESP. ক্ষমতা। তাই না?

জানি না।আমারও ESP ক্ষমতা আছে। যারা আমার ঘনিষ্ঠ, তারা আমার এই ক্ষমতার বিষয়ে জানে।জানারই কথা।আপনি আমার একটা কথাও বিশ্বাস করছেন না। আপনার উপর আমার রাগ লাগছে। এখানে একটু দাঁড়ান। আপনাকে জরুরি কিছু কথা বলব।এখানে দাঁড়িয়ে কথা বললে আপনি ভিজে যাবেন। বৃষ্টির ছাঁট আসছে।

আসুক। আমার কথা শুনলে আপনি কিন্তু ভয়ঙ্কর চমকবেন।অনেকদিন চমকাই না। আপনার কথা শুনে চমকালে ভালো হবে। বড় ধরনের চমক লিভারের জন্য উপকারী।তৃষ্ণা মুখ কঠিন করে বলল, আমার ESP. ক্ষমতা বলছে আপনার সঙ্গে আমার বিয়ে হবে। এই লঞ্চেই বিয়ে হবে। আমি পুরো বিষয়টা স্পষ্ট চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি।কী দেখছেন?

আমি দেখছি লঞ্চ কান্ত হয়ে আছে। একজন বৃদ্ধ আমাদের বিয়ে পড়াচ্ছেন। তার চোখে সুরমা। বৃদ্ধকে দেখামাত্র আমি চিনব। আপনার ঠোঁটের কোণে হাসি। এর অর্থ আপনি এখনো আমার কথা বিশ্বাস করছেন না।অবশ্যই বিশ্বাস করছি। আমি মানুষকে বিশ্বাস করতে ভালোবাসি।

তৃষ্ণা বলল, আমি আপনাকে চিনি না। আপনার বিষয়ে কিছুই জানি না। তারপরেও আপনাকে বিয়ে করতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কেন জানেন? না।কারণ এই বিয়ে পূর্বনির্ধারিত। সবকিছুই যে পূর্বনির্ধারিত আধুনিক বিজ্ঞান এখন এই সত্য হজম করা শুরু করেছে।আমি জানতাম না। আমি শুনেছি। Free wil।-এর কথা।

এই বিষয়ে আমরা বাসর রাতে তর্ক করব। বাসর হবে। আমার কেবিনে। আমার কাছে বেলিফুলের দুটা মালা আছে। আরও লাগবে। কী অদ্ভুত কো ইনসিডেন্স! সুটকেসে ফুল আঁকা একটা চাদর আছে। এখন চলুন আমরা বুড়োটাকে খুঁজে বের করি।চলো।

আমরা বুড়োর সন্ধানে প্রথম গেলাম লঞ্চের সারেঙের ঘরে।এর আগে সারেঙকে দেখেছি বিছানায় শোয়া। এখন দেখলাম বসা অবস্থায়। সারেঙের চোখ রক্তবর্ণ। সারেঙ তৃষ্ণার দিকে তাকিয়ে পরিচিতজনের গলায় বলল, সকিনা! গম আছ নি? চানপুর যার গৈ।তৃষ্ণা বলল, এই বুড়া না।

আমরা দ্বিতীয় বুড়োর সন্ধানে বের হলাম। এই বুড়ো আমার পরিচিত। তার কাছ থেকে চাদর নিয়েছিলাম। বুড়ো ঠিক আগের জায়গায় বসে আছে। তার দৃষ্টি নিজের হাতের লাঠির দিকে। জাহাজ দুলছে, জাহাজের সঙ্গে বৃদ্ধও দুলছে। মনে হচ্ছে বিশাল রকিং চেয়ারে সে বসা।বৃদ্ধ আমার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল, বাজান! আমার চাদর কই?

আমি বললাম, চাদর জায়গামতোই আছে।শীত লাগতেছে। চাদরের প্রয়োজন ছিল।আমি বললাম, ঝড় ঠিকমতো উঠুক, চাদর এনে রেলিং-এর সঙ্গে আপনাকে বেঁধে দিব। যাতে উড়ে গিয়ে পানিতে না পড়েন।তৃষ্ণা বলল, আপনি কি ইনাকে চেনেন? আমি বললাম, চিনি। ঝড়টা ঠিকমতো উঠলে জাহাজের যাত্রী সবাই সবাইকে চিনবে।তৃষ্ণা বলল, আপনাকে অতি জরুরি কথাটাই জিজ্ঞাস করা হয় নি। আপনি কি ম্যারেড?

না।দেখুন। আমার অবস্থা। বিয়ের সব ঠিকঠাক করে ফেলেছি, অথচ আপনাকে জিজ্ঞেস করা হয় নি, আপনি ম্যারেড কি না।আমি বললাম, দুর্যোগের সঙ্গে স্বপ্নের মিল আছে। স্বপ্নে লজিক কাজ করে না। ভয়াবহ দুর্যোগেও লজিক কাজ করে না। দুর্যোগের দৃশ্যগুলিও হয় স্বপ্নের মতো ছাড়াছাড়া।আপনার বিয়েতে আপত্তি নেই তো?

না।আমার বয়স কিন্তু বেশি। আটাশ রানিং। বাঙালি ছেলেরা শুনেছি অল্পবয়েসী মেয়ে বিয়ে করতে চায়। বাঙালি ছেলেদের অদ্ভুত মানসিকতা। তারা খুবই কমবয়েসী মেয়ে বিয়ে করতে চায় কিন্তু তাদের হতে হবে উচ্চশিক্ষিত। তাদের রূপ হতে হবে রাজকন্যাদের মতো। তাদের বাবার প্রচুর টাকা পয়সা থাকতে হবে। অথচ ছেলে কিন্তু ভ্যাগাবন্ড। আপনি কি ভ্যাগাবন্ড?

হ্যাঁ।কী যন্ত্রণা! আমি যে জিনিস পছন্দ করি না। সবই আমার কপালে এসে জুটে।বিয়েটা কি তাহলে বাতিল? না। বাতিল কী জন্যে হবে? আপনার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে বাতিল হলে আপনি খুশি হন। পাত্রী হিসেবে আপনি কি আমাকে অপছন্দ করছেন? না। আমি তব মালঞ্চের হব মালাকার।কথাটার মানে কী?

আপনার জন্যে ফুলের মালা গাথার কাজটা আমি আগ্রহ নিয়ে করব।কার কবিতা? রবীন্দ্রনাথের।শুনুন, কখনোই আমার সঙ্গে কবিতা কপচাবেন না। কবিতা হচ্ছে অলসের বিলাস। আমি অলস মানুষ পছন্দ করি না।আচ্ছা।তৃষ্ণা বলল, এই মুহূর্ত থেকে আপনি আমাকে তুমি করে বলবেন। আমিও তুমি করে বলব। এতে আপনার কোনো সমস্যা আছে?

না।হিমু! তোমার মধ্যে আমি গা ছাড়া ভাব দেখছি কেন? ঠিক করে বলো—গ্ৰী হিসেবে তুমি কি আমাকে পছন্দ করছি না? দয়া করে ঝেড়ে কাশ। আমার একটা গুণ শুনলে তুমি চমকে উঠবে। বলব? বলো।বেকারি। আমি ভালো পারি। কোর্স নিয়েছি।বেকারি কী?

কেক পেষ্ট্রি এইসব বানানো। আমি যে ক্টেটে থাকি সেখানে কুকি বানানোর একটা কম্পিটিশন হয়। কুকি হলো বিঙ্কিট। আমি সেই কম্পিটিশনে অনারেবল মেনশন পেয়েছি।চমৎকার। ধরা যাক কয়েকটা ইঁদুর এবার।এর মানে কী? কবিতার লাইন।বাঙালিদের রোমান্টিসিজম কয়েক লাইন কবিতা আবৃত্তিতে সীমাবদ্ধ। আমার জন্যে খুবই বিরক্তিকর।

আগে একবার বলেছি, এখন আরেকবার বলছি, দয়া করে। আমার সামনে কবিতা আবৃত্তি করবে না।করব না।শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধ খুঁজে পাওয়া গেল। তৃষ্ণা চেঁচিয়ে বলল, ঐ তো উনি! আমি ইনাকেই স্বপ্নে স্পষ্ট দেখেছি।তৃষ্ণা দেখাচ্ছে খুনের আসামি পীর কুতুবিকে। আমি বললাম, উনার হাতে হাতকড়া পরানো। স্বপ্নেও কি তাই দেখেছি? স্বপ্লে হাতকড়া দেখি নি। হাতকড়া কেন?

উনি তিনটা খুন করেছেন। তাঁকে বরিশাল নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ফাঁসি দেওয়ার জন্যে।ইন্টারেস্টিং ব্যাপার তো। আমি উনার একটা মিনি ইন্টারভ্যু নিতে চাইলে উনি কি রাজি হবেন? অবশ্যই রাজি হবেন। ইন্টারভুদ্য দেওয়ার জন্যে উনি মুখিয়ে আছেন।আমাদের বিয়ের কাজি হবেন কি না তা আগে জেনে নেই? জানি না।তৃষ্ণ পীর সাহেবের দিকে খানিকটা এগিয়ে এসে বলল, আচ্ছা শুনুন। আপনি কি একটা বিয়ে পড়াতে পারবেন? আমরা দুজন বিয়ে করব, কাজি পাচ্ছি না।

পীর সাহেব বললেন, বিয়ে পড়াতে পারব। কিন্তু এখন পারব না। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিয়ে পড়ানো যায় না। এই মোসালা অনেকেই জানে না। ভূমিকম্প, জলোচ্ছাস, ঝড়-তুফান-এসবের মধ্যে বিয়ে হবে না।কেন? এগুলা হচ্ছে রোজ কেয়ামতের ছোট ছোট নমুনা। রোজ কেয়ামতে যেমন বিয়ে হবে না, এখনো হবে না। ঝড়তুফান কামুক, বিয়ে পড়ায়ে দিব! দেনমোহর ঠিকঠাক করুন। আপনার হাতে ক্যামেরা না?

জি।এই রকম একটা ক্যামেরা আমার স্ত্রীর ছিল। শৌখিনদার মেয়ে ছিল। খামাখা ছবি তুলত। জ্বিন কফিল যখন তারে খুন করে তখনো তার হাতে ক্যামেরা। আমার স্ত্রী ছবি তোলার মধ্যে ছিল। জ্বিন কফিল তার ঘরে ঢুকেছে। এইটাও সে ক্যামেরায় ধরেছে। আজিব মেয়েছেলে।

তৃষ্ণা কিছু বুঝতে না পেরে আমার দিকে তাকাল। আমি বললাম, জ্বিন কফিলের বিষয়টা তোমাকে পরে বুঝিয়ে বলব।পীর সাহেব বললেন, এই দুনিয়ায় কিসিম দুইটা। জ্বিন এবং ইনসান। বুঝায়। বলার কিছু নাই।আমি বললাম, আপনার স্ত্রীর ক্যামেরায় কি জিনের ছবি উঠেছে?

উঁহু, আমার ছবি উঠেছে। জ্বিন আমার রূপ ধরে তার ঘরে ঢুকেছে। জিনের এই ক্ষমতা আছে। আপনারা দুজন এখন যান, এশার নামাজের সময় পার হয়ে গেছে। এখন নামাজ আদায় করব। সামান্য দেরি হয়েছে। ওসি সাহেবের কানে ফায়ারিং হবে সেটা দেখার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম। ফায়ারিং এখনো হয় নাই। মন বলতেছে নামাজে দাঁড়াব আর ফায়ারিংটা হবে। জ্বিন কফিলের বদমাইসি। একটা মজার জিনিস দেখতে চাই, সে আমারে দেখতে দিবে না।তৃষ্ণা বলল, ফায়ারিং কী? ইনার কথাবার্তা তো আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

তৃষ্ণার কথা শেষ হওয়ার আগেই বাতাসের প্রবল ধাক্কায় লঞ্চ ডানদিকে কাত হয়ে গেল। পীর কুতুব বিকট ধ্বনি দিলেন-আল্লাহু আকবর! ঝপাং শব্দ হলো, পীর কুতুবি ওসি সাহেবকে নিয়ে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। পুলিশদের মধ্যে যে ব্যাপক চাঞ্চল্য আশা করেছিলাম, তা দেখা গেল না। একজন শুধু পানিতে ছয় ব্যাটারি টর্চের আলো ফেলতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে সেই আলোও নিভে গেল। টর্চ বৃষ্টির পানিতে ভিজেছে। কিছুক্ষণ আলো দিয়ে সে নিভে যাবে এইটাই নিয়তি।

ঘটনার আকস্মিকতায় তৃষ্ণা হতভম্ব। সে বিড়বিড় করে বলল, এরা তো ড়ুবে যাবে।আমি ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, পীর কুতুবি ড়ুববেন না। তিনি ডান্ডাবেড়ি পরা অবস্থায় মোহনা পার হবেন। ওসি সাহেব ড়ুবে যাবেন। আমার ধারণা এর মধ্যে ড়ুবেও গেছেন।তৃষ্ণা বিড়বিড় করে বলল, কী সর্বনাশ! আমি বললাম, সর্বনাশ তো বটেই। তোমার কাজিও কিন্তু ভেসে চলে যাচ্ছে। কাজি যার গৈ। কাজি যার গৈ।

যারা গৈ যারা গৈ করছি কেন?

যারা গৈ হচ্ছে ভেসে চলে যাচ্ছে।

তাতে তোমার এত আনন্দ কেন? মুসলমানদের বিয়েতে কাজিও লাগে না। আমি বইতে পড়েছি কবুল কবুল বললেই হবে।তৃষ্ণর কথা শেষ হওয়ার আগেই গুলির শব্দ হলো।পুলিশ চারজন লাফ দিয়ে উঠল। তাদের মুখ ফ্যাকাসে। গুলি কী বস্তু পুলিশ সবচেয়ে ভালো জানে। গুলির শব্দে আতঙ্কে তারাই সবার আগে অস্থির হয়।তৃষ্ণা বলল, গুলি কোথায় হয়েছে?

পুলিশের একজন বলল, আমার বন্দুক থেকে মিস ফায়ার হয়ে গেছে ম্যাডাম।তৃষ্ণা বলল, আপনা-আপনি গুলি হয়ে গেছে মানে কী? মানুষ মারা যেতে পারত।যার বন্দুক থেকে গুলি হয়েছে সে বিনয়ের সঙ্গে বলল, আল্লাহপাকের হুকুম ছাড়া কারও মৃত্যু হবে না। আপা। চিন্তার কিছু নাই।আমরা তাকিয়ে আছি কুতুবির দিকে। কুতুবি কিছুক্ষণের মধ্যেই লঞ্চের আড়ালে চলে গেলেন।

পুলিশদের একজন হাঁপ ছাড়ার মতো করে বলল, সবই আল্লাহপাকের ইচ্ছা! লঞ্চের নিয়ন্ত্রণ এখন আতর মিয়ার হাতে। তার ক্ষমতার উৎস ভীত এবং ক্ষুধার্ত যাত্রী। বিপদে মানুষের ক্ষুধা বৃদ্ধি পায়, চিন্তাশক্তি কমতে থাকে। লঞ্চ ডানদিকে কাত হয়েছে, যে-কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটবে। সেদিকে নজর না দিয়ে যাত্রীরা খেতে বসে গেছে। আজ রাতের খাওয়া ফ্রি। আতর মিয়ার সে রকমই নির্দেশ! খাওয়া নিয়ে ভালো হৈচৈ হচ্ছে।

নতুন করে ডিম ভাজা হচ্ছে। অনেকেই ডিম ভাজা খাবে। কাঁচামরিচে ঝাল নাই কেন—এই নিয়েও তৰ্ক-বিতর্ক হচ্ছে। বেঞ্চে সবার জায়গা হয় নি। অনেকেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাতে প্লেট নিয়ে খাচ্ছে! মুরগির গিলা-কলিজার একটা লুকানো হাঁড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। এই নিয়ে উল্লাস হচ্ছে। যাদের খাওয়া শেষ হয়ে গেছে, তারাও এক হাতা করে গিলা-কলিজা নিচ্ছে।

এদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। ফাঁসির আসামিরাও শেষ খাবার আগ্রহ নিয়ে খায়। কোন আইটেম কীভাবে রাঁধতে হবে তাও বলে দেয়। সরিষার তেল দিয়ে ইলিশ মাছ অল্প আঁচে কড়া করে ভাজতে হবে। মাছ থেকে যে তেল উঠবে সেই তেল এবং সরিষার তেল আলাদা করে বাটিতে দিতে হবে। ইলিশ মাছের সঙ্গে রসুনের কোয়া থাকতে হবে।

ক্ষমতাচুত রুস্তম ঠোঁট কামড়াচ্ছে। তার দৃষ্টি আতর মিয়ার দিকে। আতর মিয়া তার লম্বা পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা পিস্তল বের করে আবার পকেটে রেখে দিয়েছে। রুস্তম বুঝতে পারছে না পিস্তলটা আসল নাকি খেলনা। আজকাল খেলনা পিস্তলগুলি অবিকল আসলের মতো বানাচ্ছে। হাতে না নেওয়া পৰ্যন্ত আসল নকল বোঝার উপায় নেই।

রুস্তমের কাছে মনে হচ্ছে নকল। নকল না। হলে পকেটে লুকিয়ে রাখত না। সারাক্ষণ হাতে রাখত।নতুন কোনো চাল দিয়ে আতর মিয়ার হাত থেকে ক্ষমতা কীভাবে নেওয়া যায় তা-ই রুস্তমের একমাত্র চিন্তা! মাথায় তেমন কোনো বুদ্ধি আসছে না।লঞ্চের রেস্টুরেন্টের সামনে কিছু জায়গা খালি করা হয়েছে। এটাই এখন মঞ্চ বাঁ জনতার আদালত। মঞ্চে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর আতর মিয়া।

আতর বলল, ভাইব্রাদার সবাই মন দিয়ে শুনেন। আমরা মহা বিপদে আছি। মাইনাস টু ফর্মুলা ঘটে গেছে। পীর সাহেব এবং ওসি সাহেব পানিতে পড়ে গেছেন। আপনারাও প্রস্তুত হয়ে যান। লঞ্চ অচল। শুরু হয়েছে ঝড়। এই ঝড় এখনো পাতলা। পাতলা ভাব থাকবে না। ঘন হবে। একতলায় বড় বড় সেগুন কাঠের টুকরা আছে। সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করবেন।

দুজন দুজন করে একটা টুকরা বেছে নিবেন। হামলা হামলি বন্ধ। এক টুকরা পানিতে ফেললাম, পঞ্চাশজন তাতে ঝাপায়ে পড়বেন—তা হবে না। ক্লিয়ার? কেউ কোনো শব্দ করল না।রুস্তম বলল, আমার একটা কথা আছে।আতর বলল, কী কথা? আপনি এক নির্দেশ দিবেন, সেই নির্দেশে সবাই কাজ করবে তা তো হবে না। একটা কমিটি হবে। নির্দেশ যাবে কমিটির মাধ্যমে।কমিটিটা করবে। কে?

জনগণ করবে। কমিটিতে আওয়ামী লীগ থেকে একজন থাকবে, বিএনপির একজন থাকবে। সুশীল সমাজ থেকে একজন থাকবে। নকল পিস্তল নিয়ে ফলাফলি করলে নেতা হওয়া যায় নাআতর বলল, চুপ! আরেকটা শব্দ করলে গুল্লি। এই দেখা পিস্তল। হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখ আসল। আমি নকলের কারবার করি না।গুলি করবেন?

অবশ্যই করব। আমার চোখের দিকে তাকা। তাহলেই বুঝবি আমি যা বলি স্বতা-ই করি; যা বলি না। তাও করি।রুস্তম সমর্থন আদায়ের জন্যে এদিক-ওদিক তাকাল। সবাই খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত। সমর্থন পাওয়া গেল না। রুস্তম বলল, আপনি আপনার মতো কাজ করেন। আমি লঞ্চের ডেকে আছি। তেমন কোনো প্রয়োজন হলে ডাকবেন।

আতর বলল, কানো ধর। কানে ধরে হাঁটতে হাঁটতে চলে যা। আর আসবি কানো ধরব? কানে ধরব।অবশ্যই কালে ধরবি।যাত্রীদের একজন বলল, কানো ধরতে বলছে কানে ধরে চলে যান। ঝামেলা করেন কী জন্য? আছি বিপদে এর মধ্যে শুরু করেছেন ঝামেলা।যাত্রীদের একটা বড় অংশ বলল, কানো ধরা। কানো ধর।

রুস্তম কানে ধরতেই হো হো হাসির শব্দ উঠল। বিপদের সময় ছোটখাটো মজাও অনেক মজাদার মনে হয়। কানে ধরে লিডারশ্ৰেণীর একজন মানুষ যাচ্ছে। দেখতেই ভালো লাগছে। একজন হাততালি দিল। তার দেখাদেখি অন্যরাও হাততালি দিতে লাগল।আতর মিয়া হুঙ্কার দিল, হাততালি দেওয়ার মতো কিছু হয় নাই। বলেন, আল্লাহু আকবার। গলার ব্লগ ফাটায়ে চিৎকার দিবেন।

বিকট চিৎকার শোনা গেল, আল্লাহু আকবার! আতর বলল, এই লঞ্চে কিছু দুষ্ট লোক আছে। এইসব দুষ্ট লোকের কারণে আল্লাহপাক আমাদের উপর নারাজ হয়েছেন। দুষ্টরা সবাই এক এক করে আসবে। জীবনে বড় পাপ কী করেছে নিজের মুখে বলবে। তারপর তওবা করবে। রাজি?

বিকট আওয়াজ উঠল, রাজি।সবার আগে আমরা প্রফেসর সাহেবকে দিয়ে শুরু করব। প্রফেসর সাহেব চার নম্বর কেবিনে আছেন। তাকে ধরে নিয়ে আসেন। কেবিনের সব যাত্রী এখানে চলে আসবে। আজি সব এক। কেবিনের যাত্রী ডেকের যাত্রী বলে কিছু নাই। পূর্ণ সমাজতন্ত্র। বলেন, আলহামদুলিল্লাহ।সবাই বলল, আলহামদুলিল্লাহ।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *