রান্না না জানাটা দোষের না, কিন্তু লেখাপড়া না জানাটা দোষের। বুঝাতে শার।জ্বি।রান্না যে জানে না তাকে কেউ গালি দেয় না। কিন্তু যে লেখাপড়া জানে না তাকে সবাই মূর্খ বলে গালি দেয়।লেখাপড়ার ওপর বক্তৃতাটা দিয়ে আলাউদ্দিনের ভালো লাগছে। একটু ক্লান্তি ও লাগছে। মনে হচ্ছে অনেক বেশি কথা বলা হয়েছে।
কারণ খাওয়াটা বেশি হয়ে। গেছে। শরীর হাঁসফাস লাগছে। একটা মিষ্টি পান খেতে পারলে ভালো হতো। তিনি এম্নিতে পান খান না তবে বিয়ে শাদির খাওয়ার পর মিষ্টি পানি খেতে ভালো লাগে। পানের সঙ্গে একটা সিগারেট পান হজমের সহায়ক। সিগারেট ও মনে হয় তাই।
কুটু মিয়া।জ্বি।দোকানে যাও, একটা মিষ্টি পান নিয়ে আসি। একটা সিগারেটও আনবে। ভালো কষ্মা, একটা মোমবাতি ও আনবে। কারেন্ট চলে গেলে অন্ধকার ঘরে বসে। থাকতে হয়। রোজ ভারি মোমবাতি আনব, মনে থাকে না। আমি আবার অন্ধকার সহ্য করতে পারি না।রাত বেশি হয় নি। এগারোটা চল্লিশ। আলাউদ্দিন রাত দুটা আড়াইটার আগে কখনো ঘুমাতে যান না।
গভীর রাতেই তার লেখালেখি ভালো হয়। আজ ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে। তার মুখে পান, হাতে সিগারেট। তার মনে হচ্ছে মুখ ভর্তি পান এবং হাতে জ্বলন্ত সিগারেট নিয়ে তিনি খাটে আধশোয়া হয়েই ঘুমিয়ে। পড়বেন। হাত থেকে সিগারেটটা মেলতেও পারছেন না। আধো ঘুম আধো জাগরণ অবস্থায় সিগারেটের ধোয়া টানতে তার খুবই ভালো লাগছে। তার কাছে হঠাৎ মনে হচ্ছে জীবনটা সুখের।
আলাউদ্দিন আধশোয়া অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়লেন। গ ঘুম। ঘরের বাতি জ্বলছে, মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে। দক্ষিণের জানালা দিয়ে বাতাস আসছে। সেই বাতাসও আরামদায়ক শীতল। তার ঘুম ভালো হঠাৎ। ঘরে বাতি নেই, ঘুটঘুটে অন্ধকার। মাথার ওপর ফান চলছে না। তার বুক ধক করে উঠল। চারদিকে এত অন্ধকার কলা ঘরের বাতি এখন শোনা কে এ মনা তা এত অন্ধকার ঘাকে না। এপার্টমেন্ট হাউসের আলো এসে ঘরে ঢুকে। রাস্তার আলো কে।
কুটু মিয়া পর্ব – ২
অন্ধকারেও বোঝা যায় ঘরের কোথায় কী আছে। ঘুমের মধ্যে এমন কিছু কি হয়েছে যে তিনি অন্ধ হয়ে গেছেন? তার এক দূর সম্পর্কের চাচার এ রকম। হয়েছিল। তিনি হাটে গরু নিয়ে গিয়েছিলেন বিক্রির জন্য। দরে বললো না বলে গরু বিক্রি হলো না। মেজাজ খারাপ করে তিনি গেলেন চা খেতে। চা খেয়ে গরু নিয়ে বাড়ি ফিরবেন। টোস্ট বিসর্কিট দিয়ে চা খেয়ে চায়ের নাম দিতে যাবেন, হঠাৎ চেঁচিয়ে বললেন— কী হইছে আন্ধাইর ক্যান? এই যে তার কাছে পৃখিবী হঠাৎ আন্ধাইর হলো— আলো আর ফিরল না।
তাঁর বেলায় এরকম কিছু কি হয়েছে? না-কি গোটা শহরের ইলেকট্রিসিটি চলে যাওয়ায় শহরই অন্ধকার হয়ে গেছে? কোথাও আলো নেই। ঘটনা মনে হয় এ রকমই। ইলেকট্রিসিটি নেই বলেই ফ্যান ঘুরছে না। ফ্যান ঘুরলে ফ্যানের ক্যাট ক্যাট আওয়াজটা থাকত। কুটু মিয়া মোমবাতি এনে রেখেছিল— মোমবাতিটা কোথায় আলাউদ্দিনের মনে পড়ছে না। খাটের পাশের টেবিলে রাখার কথা। টেবিলটা কোথায়?
গভীর অন্ধকার ও এক সময় চোখে সয়ে যায়। এই অন্ধকার চোখে সইছে না কেন? এ খাটের নিচে শব্দ হলো। ফোস করে নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ। আলাউদ্দিন চমকে উঠলেন। হঠাৎ তার মানে হলো জীবিত কোনো প্রাণী খাটের নিচে আছে। প্রকা কোনো প্রাণী চার পায়ে খাটের নিচে ঘুরছে। প্রাণীটার নিয়মিত নিঃশ্বাসের শব্দ এখন তিনি পাচ্ছেন। ফো-ফোস। ফো-ফোস।
তার গায়ের বোটকা গন্ধ নাকে লাগছে। খাটের নিচে গাদা কর খবরের কাগজ। এই তো প্রাণীটা এখন কাগজ ছিড়ছে। গলার ভেতর অস্পষ্ট শব্দও করছে। রাগী শব্দ।বাদর না তো? পুরনো ঢাকায় প্রচুর বার আছে। জানালা খোলা থাকলে মাঝে মাঝে এৱা ঘরে ঢুকে পড়ে। নানানভাবে মানুষজনকে বিরক্ত করে। এই অঞ্চলেও হয়তো বাদ আছে— তিনি জানেন না।
কুটু মিয়া পর্ব – ২
আলাউদ্দিন কী করবেন ভেবে পেলেন না। একবার তাঁর মনে হলো এটা দুঃস্বপ্ন। রাতের খাওয়া বেশি হয়ে গেছে। বদহজম হয়েছে। বদহজম থেকে দুঃস্বপ্ন। দেখছেন। তিনি থাকেন ছয়তলায়। দরজা বন্ধ করে শুয়েছেন। বাদর আসবে কোথেকে! না, একটু ভুল হয়েছে। তার ঘরের দরজা খোলাই ছিল। দরজা বন্ধ করার আগেই তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। তাঁর ঘরের দরজা খোলা থাকলে ও বন্য কোনো পশু এসে ঘরে ঢুকবে না। তিনি তো সুন্দরবনের ভেতর কোনো ফরেস্টের বাংলোতে বাস করছেন। সমস্যাটা কোথায়? খাটের নিচ কাগজ ছেঁড়া এখনো চলছে।
অদ্ভুই একটা কথা আলাউদ্দিনের মাথায় এলো— তাঁর খাটের নিচে কুটু মিয়া বসে নেই তো? হামাগুড়ি দিয়ে বসে আছে। কাগজ ছিড়ছে। মাথা খারাপ মানুষদের পক্ষে এই কাজটা অস্বাভাবিক কিছুই না। সেতাবগঞ্জের এক পাগল ছিল হামাগুড়ি দিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেত। পাগলের নাম সওদাগর। কেউ যদি জিজ্ঞেস করত, সওদাগর তুমি হট না কেন?
সওদাগর বলত, হাঁটলে ব্যালেন্সের সমস্যা হয় ভাইজান। সওদাগর পাগলা অনেক ইংরেজি জানত। কথাবার্তা বলত খুবই স্বাভাবিকভাবে। শুধু হাঁটত চার পায়ে। কে জানে। কুটুও হয়তো সওদাগরের মতোই মানসিক রোগী। আলাউদ্দিন কাপা কাপা গলায় ডাকলেন, কুটু। খাটের নিচ থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এলো, জ্বি স্যার।আলাউদ্দিনের সারা শরীর হিম হয়ে গেল। এটা হতেই পারে না।
খাটের নিচে কুটু মিয়া বসে থাকবে কেন? তিনি আবারো ডাকলেন, কুটু। কুটু সঙ্গে সঙ্গে বলল, জি স্যার। আলাউদ্দিন জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এখানে কী করছ? কিছু করছি না স্যার।খাটের নিচে বসে আছ কেন? কুটু জবাব দিল না। ফোঁ-ফোল, ফোঁ-ফোস শব্দ করতে লাগল। আলাউদ্দিন ভয়ে জমে গেলেন। বন্যপশুর চেয়ে মস্তিষ্ক বিকৃত মানুষ অনেক ভয়ংকর। কুটুর। উপর অশুভ কোনো কিছুর ভর হয় নি তো?
কুটু মিয়া পর্ব – ২
আলাউদ্দিন আয়াতুল কুরসি সূরাটা পড়ার চেষ্টা করলেন। এই সূরাটা একবার ঠিকমতো পড়ে হাততালি দিলে খারাপ জিনিস দূরে চলে যায়। হাততালির শব্দ যতদূর যায় অশুভ জিনিসগুলি তত দূরেই যায়। আলাউদ্দিন সূরা পড়ে শেষ করেছেন কিন্তু হাততালি দিতে পারছেন না। হাততালি দেবার ক্ষমতা তার নেই। দুটি হাতই অসাড় হয়ে পড়ে আছে। যেন এই হাত দুটা নিজের না।
অন্য কারোর হাত। এই দুই হাতের ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আলাউদ্দিন চিৎকার করতে যাবেন তখনই খুট করে শব্দ হলো। ঘরের বাতি জ্বলে উঠল, ফ্যান ঘুরতে লাগল। আলাউদ্দিন ভাঙা গলায় ডাকলেন, কুটু মিয়া কুটু মিয়া।থপথপ শব্দ করে কে যেন আসছে। কুটু মিয়াই অসিদ্রে। সে ছাড়া আর কে হবে! তার ঘরের দরজা ভেজানো। কেউ এসে দরজায় দাঁড়িয়েছে।
কুটু মিয়া।
জ্বি স্যার।
ভেতরে আস।
দরজা ঠেলে কুটু মিয়া ঢুকল। তার হাতে পানির গ্লাস। পানির গ্লাসে বরফ ভাসছে। পানির গ্লাস দেখে আলাউদ্দিনের মনে হলো তৃষ্ণায় তার বুক ফেটে যাচ্ছে। এক গ্লাস পানিতে তার হবে না। এক কলসি পানি দরকার।কুটুকে দেখে তার লজ্জা লাগছে। সহজ স্বাভাবিক একজন মানুষ। তিনি ডেকেছেন বলে বুদ্ধি করে পানির গ্লাস নিয়ে চলে এসেছে। অথচ তিনি তার সম্পর্কে কত কিছু ভেবেছেন। মস্তিষ্ক বিকৃত। ভূতের ভর হয়েছে। ছিঃ।
কুটু!
জি স্যার।
হঠাৎ কারেন্ট চলে গিয়েছিল। গরমে ঘুমটা গেল ভেঙ্গে। পানি এনে ভালো করেছ। খুবই পানির পিপাসা হয়েছিল।আলাউদ্দিন এক নিঃশ্বাসে পানির গ্লাস শেষ করে কুটুকে বললেন- কুটু দেশ তো আমার খাটের নিচে কিছু আছে কি না।কুটু নিচু হয়ে খাটের নিচ দেখল। নিচু গলায় বলল, কিছু নাই স্যার।আলাউদ্দিন বললেন, একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছিলাম। কোনো একটা জতু আমার খাটের নিচে বসে আছে।
কুটু মিয়া পর্ব – ২
হাতে মুখে একটু পানি দেন। দিক, হাতে মুখে পানি দিব। তুমি আরেক গ্লাস ঠাপ্ত পানি আন।কুটু মিয়া পা থপথপ করতে করতে চলে গেল। আলাউদ্দিন খাট থেকে নামলেন। নিচু হয়ে খাটের নিচটায় উঁকি দিলেন। খাটের নিচে কেউ নেই তা ঠিক, তবে খাটের নিচে গাদা করে রাখা সমস্ত খবরের কাগজ কুচি কুচি করে ছেঁড়া। তিনি দুঃস্বপ্ন দেখেন নি। কেউ একজন খাটের নিচে বসে সত্যি সত্যি কাগজ ছিঁড়েছে।হাজী একরামুল্লাহ অবাক হয়ে বললেন, তোমার ঘটনা কী?
আলাউদ্দিন চুপ করে রইলেন। একরামুল্লাহ সাহেব তাকে দেখে এত বিস্মিত হচ্ছেন কেন তা বুঝতে পারলেন না। এক সপ্তাহ পরে এসেছেন— এই জন্যেই কি? তিনি মুক্তি প্রকাশনীর পোষা লেখক। তাই বলে প্রতিদিন আসতে হবে এমন তো কথা নেই।হাজী সাহেব গলা খাকাড়ি দিয়ে বললেন, তুমি আগে প্রতিদিনই একবার বাংলাবাজার আসতে, এবারে ছয় দিন পরে আসলে। তাও আমি লোক পাঠিয়ে খবর দিয়েছিলাম বলে আসা। ঘটনা কী?
কোনো ঘটনা না।অসুখ বিসুখ হয় নি তো? আলাউদ্দিন না-সূচক মাথা নাড়লেন।অসুখ বিসুখ যে হয় নি সেটা তো তোমাকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে। বরং ওজন বেড়েছে। তোমার শরীরে থলথলে ভাব চলে এসেছে। পাঞ্জাবির ভেতর দিয়ে ভুড়ি দেখা যাচ্ছে। ব্যাপার কী? কোনো ব্যাপার না।বিয়ে শাদি করেছ নাকি?
জ্বি না। এই বয়সে বিয়ে শাদি!পুরুষ মানুষ যে-কোনো বয়সে বিয়ে করতে পারে। গোপনে বিয়ে করে থাকলে স্বীকার করতে অসুবিধা নাই।বিয়ে করি নি।চেহারা ফরসা হয়েছে। ইস্ত্রি কন্যা পায়জামা পাঞ্জাবি পরেছ। তোমাকে ইস্ত্রি করা কাপড়ে কোনোদিন দেখেছি বলে মনে পড়ে না।একটা কাজের লোক আছে। সেই কাপড় ধুয়ে দেয়। লন্দ্রি থেকে ইস্ত্রি করিয়ে আনে। রান্নাবান্না করে। ভালো রান্না। কুয়েতে বাবুর্চির কাজ করেছে।
কুটু মিয়া পর্ব – ২
বলো কী! একেবারে বিদেশী বাবুর্চি? ভালো হয়েছে। চিরকুমার লোকদের যে জিনিসটা প্রথম দরকার সেটা হলো একজন ভালো বাবুর্চি। খাওয়া দাওয়ার কষ্টটাই চিরকুমার লোকদের আসল কষ্ট। ভাত আর ডিম ভাজি কতদিন খাওয়া যায়।ঠিক বলেছেন।তোমাকে দুটা কাজের জন্যে ডেকেছি। দুইটাই জরুরি। একটা আমার জন্য জরুরি, আরেকটা তোমার সন্য জরুরি।
জ্বি বলুন।হাত দেখার বই-এর অবস্থা কী? একটা বই শেষ করতে তো এতদিন লাগার কথা না।আলাউদ্দিন ইতস্তত করে বললেন, আগে দিনে লিখতাম। রাতে ও লিখতাম। এখন রাতে লিখতে পারি না।হাজী সাহেব বললেন, রাতে লিখতে পার না কেন? রাতকানা রোগ হয়েছে। রাতে চোখে দেখ না?
খাওয়া দাওয়ার পর আলসেমি লাগে।কর কী? আটটা বাজতেই ঘুমিয়ে পড়? ঘুমাতে ঘুমাতে এগারোটা বেজে যায়। খবরের কাগজ পড়ি, টিভি দেখি।টিভি কিনেছ না-কি? জি। একটা চৌদ্দ ইঞ্চি টিভি কিনে ফেলেছি। কালার।লার টিভি? ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট কেনার ইচ্ছা ছিল। কুটু বলল, কিনবেন যখন কালার কিনেন। দেখলাম কুটুর কথার মধ্যে বিবেচনা আছে।কুট কে?
কুটু আমার বাবুর্চি।হাজী সাহেব অবাক হয়ে বললেন, তোমার বাবুর্চি এখন বলে দিচ্ছে কী কিনবে কী কিনবে না? আলাউদ্দিন মাথা নিচু করে বললেন, ওর বিবেচনা খারাপ না।বেশি বিবেচনা হওয়াটা আবার ভালো না। শেষে দেখা যাবে তোমার বইপত্র সে লিখে দিচ্ছে। যাই হোক, সাত দিন সময়। এর মধ্যে বই শেষ করবে। আজ বুধার, আরেক বুধবারে পাণ্ডুলিপি নিয়ে চলে আসবে।
কুটু মিয়া পর্ব – ২
জি আচ্ছা, এখন উঠি।হাজী সাহেব বললেন, তুমি এসেই যাই যাই করছ কেন? লক্ষ করেছি এর মধ্যে তিন চারবার ঘড়ি দেখেছ। চুপচাপ বস, দুপুরের খাওয়া দাওয়া করে তারপর যাবে। মোরগপোলাও আনতে বলেছি। মোরগপোলাও খেয়ে তারপর যাবে। অসুবিধা আছে? জ্বি না।উসখুস করছ কেন? বারবার পকেটে হাত দিচ্ছ, পকেটে কী? পিস্তল নাকি? চাঁদাবাজরা পিস্তল নিয়ে যখন আসে বারবার পকেটে হাত দেয়। কী আছে পকেটে?
কিছু না।কিছু একটা তো পকেটে নিশ্চয়ই আছে। বের কর দেখি জিনিসটা কী?আলাউদ্দিন পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট এবং ম্যাচ বের করলেন। তাকে খুবই ব্ৰিত মনে হলো। হাজী সাহেব বললেন, তুমি সিগারেট খাও তা তো জানতাম না। আগেও খেতে, না সম্প্রতি ধরেছ? এখন একটা দুটা খাই। খাও ভালো কথা। এত লজ্জা পাচ্ছ কেন? ধরাও একটা সিগারেট। উসখুস করার কারণ এখন স্পষ্ট হলো। নেশাখোররা সময়মতো নেশা করতে না পারলে উসখুস করে। ধরাও একটা সিগারেট।
থাক।থাকবে কেন, খাও। নেশার জিনিস সময়মতো না খেলে মেজাজ খারাপ হয়। আমি চাই না আমার সামনে মেজাজ খারাপ করে কেউ বসে থাকবে। দেখি আমাকে একটা সিগারেট দাও। তোমার সামনে ধরিয়ে তোমার লজ্জা ভেঙে দেই। আমি যে সিগারেট একেবারে খাই না তা না। তোমার ভাবির সঙ্গে ঝগড়া হলে। খাই।হাজী সাহেব সিগারেট ধরালেন আলাউদ্দিনও ধরালেন, তবে তিনি খানিকটা সংকুচিত হয়ে রইলেন।
কারণ তিনি একজন হাজী এবং ধর্মপ্রাণ মানুষের সঙ্গে মিথ্যা কথা বলেছেন— এই জন্যেই সংকোচ। তিনি বলেছেন একটা দুটা খাই। ঘটনা সে-রকম না। গত কয়েকদিন হলো প্রচুর সিগারেট খাচ্ছেন। বিশেষ করে রাতে খাওয়ার পর মুখে একটা পানি দিয়ে যখন টিভির সামনে বসেন তখন সিগারেট খেতে বড় ভালো লাগে। টিভি দেখার ব্যবস্থাটাও কুটু মিয়া খুব আরামদায়ক করেছে।
কুটু মিয়া পর্ব – ২
টিভিটা বসিয়েছে লেখালেখির টেবিলে। তিনি এখন খাটে আধশোয়া অবস্থায় থেকে টিভির দিকে তাকিয়ে থাকতে পারেন। টিভিতে বিশেষ কিছু যে দেখেন তা না। সিগারেট ধরিয়ে একটা চ্যানেল দেখতে থাকেন। সিগারেট শেষ হওয়া মাত্র অন্য একটা ধরিয়ে চ্যানেল বদলে দেন। ক্যাবল লাইন নেয়াতে এই সুবিধাটা হয়েছে। অনেকগুলি চ্যানেল।আলাউদ্দিন?
জ্বি।এখন আরেকটা জরুরি বিষয় নিয়ে তোমার সঙ্গে আলোচনা আছে। মন দিয়ে শুনতে হবে।জ্বি আচ্ছা।তোমাকে আমি স্নেহ করি। এই ব্যাপারটা আশা করি তুমি জানো।জ্বি জানি।তুমি নির্বিরোধী মানুষ। অহঙ্কার নাই। ভদ্র, বিনয়ী। কখনো মিথ্যা বলো না। এই জন্যেই পছন্দ। আমি যে তোমার মঙ্গল চাই এ বিষয়ে কি তোমার কোনো সন্দেহ আছে?
জ্বি না।হামিদা নামের আমার দূর সম্পর্কের একজন আত্মীয়া আছে। দুঃখি মেয়ে। প্রায় কুড়ি বছর আগে তার স্বামী মারা যায়। মেয়েটা পড়ে যায় অকুল সমুদ্রে। মেয়েটা রূপবতী। তাকে বিয়ে করানোর জন্যে আমরা চেষ্টা করেছি। সে রাজি হয় না। তার প্রতিজ্ঞা জীবনে বিবাহ করবে না। সে একটা চাকরি নিল। দুই মেয়েকে মানুষ করতে লাগল। যাকে বলে জীবন সংগ্রাম।
আলাউদ্দিনের সিগারেট শেষ হয়ে গেছে। তাঁর আরেকটা সিগারেট ধরাতে ইচ্ছা করছে। হাজী সাহেব কী মনে করবে এই ভেবে ধরাতে পারছেন না।আলাউদ্দিন?জ্বি। এরকম উসখুস করছ কেন? যা বলছি মন দিয়ে শোন।মন দিয়ে শুনছি হাজী সাহেব।হামিদার মেয়ে দুটাই মায়ের মতো সুন্দরী হওয়ায় দুজনেরই খুব ভালো বিয়ে হয়েছে। দুটা মেয়েই এখন আছে বিদেশে। একজন থাকে স্বামীর সঙ্গে সিংগাপুর, আরেকজন মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে।আলাউদ্দিন বলেন, খুব ভালো।
কুটু মিয়া পর্ব – ২
হাজী সাহেব বললেন, যতটা ভালো মনে হচ্ছে তত ভালো না। হামিদা। পড়েছে মহাবিপদে। একা বাস করতে হয়, নিঃসঙ্গ জীবন। আজেবাজে দুষ্ট লোক তাকে নানানভাবে তাক্ত করে। বিয়ে করলে এই সমস্যা থেকে সে বাচবে। তাকে অনেক বুঝানোর পর এখন সে বিয়ে করার ব্যাপারে নিমরাজি হয়েছে। মেয়ে দুটি চাচ্ছে মা বিয়ে করে সুখী হোক। বাংলাদেশী মেয়ের বিধবা মায়ের বিয়ের ব্যাপারে আগ্রহী হয় না। এরা যে হয়েছে সেটা আল্লাহর রহমত বলতে হবে।
আলাউদ্দিন আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে ফেললেন। হাজী সাহেব কিছু বললেন। বরং মুখ হাসি হাসি করে আলাউদ্দিনের দিকে খানিকটা ঝুঁকে এলেন। নিচু গলায় বললেন— হামিদা বানুকে তুমি বিয়ে কর না কেন? আলাউদিদন থতমত খেয়ে বললেন, আমি? হ্যাঁ, তুমি। আমার ধারণা হামিদার পাত্র হিসেবে তুমি খুবই উপযুক্ত। মেয়েটা ভালো। তরুণী বয়সে সে অপূর্ব রূপবতী ছিল। সেই রূপের খানিকটা এখনো আছে। তাকে দেখে মনেই হয় না তার বয়স পঁয়তাল্লিশ। তুমি তার ছবি দেখেছ। সুন্দরী কি তুমিই বলো।আমি ছবি কখন দেখলাম?
তোমার রান্নার বইয়ের ফ্ল্যাপে অধ্যাপিকা হামিদা বানুর ছবি আছে। এই হলো সেই হামিদা বানু।উনি অধ্যাপিকা? আরে না। বই চালাবার জন্যে লেখা। বিএ পড়ার সময় বিয়ে হয়ে গেল বলে আর পড়াশোনা হয় নি। এখন এজি অফিসে কাজ করে। জুনিয়ার অডিটর। মাসে সব মিলিয়ে ঝিলিয়ে ছয় সাত হাজার টাকার মতো বেতন পায়। তোমাদের দুজনের সংসার এই টাকায় চলে যাবার কথা। তোমার এই বিষয়ে মত কী?
আলাউদ্দিন ব্ৰিত গলায় বললেন, বিয়ের কথা কখনো ভাবি নি।হাজী সাহেব বিরক্ত গলায় বললেন, কখনো ভাব নি বলে যে কোনোদিন ভাববে না তা তো না; এখন ভাব।এখন ভাবব? তুমি এমন ভাব করছ যেন এই মুহূর্তেই তোমাকে বিয়ে করতে হবে। তুমি হ্যাঁ বলাবে আর আমি কাজী ডেকে নিয়ে আসব। চিন্তা-ভাবনা কর। সময় নাও। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আলাপ করতে চাইলে আলাপ কর।
কুটু মিয়া পর্ব – ২
জি আচ্ছা।তোমার বয়স কত? এই নভেম্বরে ৫৩ হবে।অনেক বয়স। বিয়ে করার বয়স না, কবরে চলে যাওয়ার বয়স। যাই হোক চিন্তা করে বলো।জ্বি আচ্ছা।মেয়েকে যদি দেখতে চাও, কথাবার্তা বলতে চাও, সেই ব্যবস্থাও করা যায়। একদিন বিকেলে বাসায় গিয়ে চা খেয়ে এলাম।জি আচ্ছা।কবে যাবে বলো?
আপনি যেদিন ঠিক করবেন সেদিনই যাব। আপনার বিবেচনা।আমার বিবেচনা যদি হয় তাহলে আজই চল।আলাউদ্দিন হতাশ গলায় বলল, আজ যাব? হাজী সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন, কথা শুনে চিমশা মেরে গেলে কেন? আজ যাওয়াই তো ভালো। কোনো কিছু ঝুলিয়ে রেখে লাভ নাই। দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে, বিকালে কোনো খবর না দিয়ে চলে গেলাম। হামিদাকে বললাম, হামিদা আমার এক লেখককে নিয়ে এসেছি। ভালো করে চা খাওয়া। অসুবিধা আছে?
জি না।অসুবিধা থাকলে বলো। তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে আমি জোর করে তোময় বিয়ে দিচ্ছি। এখানে জোর করার কিছু নাই। হায়াত, মউত, রিজিক, ধনদৌলত এবং বিবাহ— এই পাঁচটা জিনি আল্লাহপাক নিজে দেখেন। আল্লাহপাক চাইলে বিবাহ হবে না।জি, তা তো ঠিকই।আলাউদ্দিন আরেকটা সিগারেট ধরালেন। তবে তাঁর মন খুবই খারাপ হয়ে গেল। বিবাহ সংক্রান্ত কথাবার্তায় যে মন খারাপ হয়েছে তা না।
কুটু মিয়া পর্ব – ২
মন খারাপের প্রধান কারণ আজ দুপুরে মোরাগপোলাও খেতে হবে। হাজী সাহেব যে দোকান থেকে মোরগপোলাও আনান সেই দোকানের মোরণপোলাও অত্যন্ত ভালো। কিন্তু যত ভালোই হোক কুটু মিয়ার রান্নার পাশে কিছুই না। আজ দুপুরে কুটু মিয়া বিশেষ আয়োজন করেছে। ইলিশ মাছের ডিম রাধছে। ইলিশ মাছের ডিমের ঝোল, ইলিশ মাছের ডিমের ভাজা। এই দুই জিনিস আগেও একদিন খেয়েছেন। মনে হয়েছে বেহেশতি কোনো খানা।
আজ সেই দুই আইটেম আবার রাঁধতে বলে এসেছেন। কুটু এই দুটা তো রাধবেই, তার সঙ্গে বাড়তি এমন কোনো আইটেম করবে যে সম্পর্কে তিনি কোনো চিন্তাই করেন নি। কবে যেন পাতার একটা বাড়া খেয়েছেন— আহা কী জিনিস! বেসনে ভুবিয়ে গরম গরম ভেজে পাতে দিয়েছে। খাওয়ার সময় মনে হয়েছে বিশাল কোনো বটগাছের সব পাতা যদি এরকম বেসনে ভেজে দিয়ে দেয় তিনি খেয়ে ফেলতে পারবেন।আলাউদ্দিন।জ্বি।তোমাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনে হচ্ছে? জ্বি না, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত না।
Read more
