হ্যাঁ। বুঝেও না বুঝার ভান করেছি। আমি স্বাভাবিক মেয়ে হতে চেয়েছি। মদিনা! মেঝেতে শোবার দরকার নেই। এসো খাটে এসে শোও। তুমি বিশেষ এক ক্ষমতা নিয়ে পৃথিবীতে এসেছ। আমিও এসেছি। এই ক্ষমতার উৎস যদি ব্রেইনের টিউমার হয় তাহলে এই জিনিস আমারও আছে। এসো খাটে আস।
মদিনা বিনাবাক্য ব্যয়ে খাটে উঠে এল। ক্ষীণ স্বরে প্রায় ফিসফিস করে বলল, আপনার খুব তাড়াতাড়ি রাশেদ ভাইজানের কাছে যাওয়া দরকার।রূপা বলল, আমি জানি। আর কোনো কথা না। ঘুমাতে চেষ্টা কর। ঘুম এলে বৃষ্টির শব্দ শোন।মদিনা জেগে আছে, বৃষ্টির শব্দ শুনছে। সে ঠিক করে রেখেছে রূপা আপা ঘুমুতে এলে সে একটা হাত আপার গায়ে রাখবে। আপা নিশ্চয়ই কিছু বলবে না।
তিন দিন হল রাশেদ উকিল বাড়িতে আছে। একতলা পাকা দালান। বাড়ির পেছনে পুকুর। চারদিকে জঙ্গল। একসময় পুকুরের ঘাট বাঁধানো ছিল। এখন ভেঙে পড়েছে।মূল বাড়িও ভেঙেছে। কোথাও কোথাও দেয়াল ধসে পড়েছে। ছাদের অবস্থা ভয়াবহ। বৃষ্টি হলেই ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে।
একটা ঘর মোটামুটি ঠিক আছে। তবে দরজা নেই। রাশেদ চৌকি কিনে সেখানেই বিছানা পেতেছে। বিছানা বলতে শীতল পাটি, একটা বালিশ। সে হারিকেন কিনেছে দুটা। একটা দিন-রাত সারাক্ষণই তার চৌকির নিচে জ্বালিয়ে রাখে। যেন ঘরে সাপ আসতে না পারে। রাশেদের ধারণা বাড়িভর্তি সাপ। ইটের ভাঙ্গাবাড়ি সাপদের বাসস্থানের জন্যে আদর্শ। তবে সে যেহেতু সাপদের বিরক্ত করছে না। সাপরাও সম্ভবত তাকে বিরক্ত করবে না।
বাড়ির দারা ঠিক আছে। ইদারা তেমন ভাঙে নি। ইদারার পানিও ভাল। ইদারার বাঁধানো অংশে বসে থাকতে রাশেদের ভাল লাগে। তার বাবা যখন বাড়ি থাকতেন বেশির ভাগ সময় এই জায়গায় বসে থাকতেন। মন ভাল থাকলে রাশেদের সঙ্গে গল্প করতেন, ও বাবা রাশেদ! আমার দাদা অর্থাৎ তোমার বড় বাবা জ্বীন সাধক ছিলেন এটা জান?
না।তাঁর পালা একটা জ্বীনের মৃত্যু হয়েছিল। দাদাজান মানুষের মতো তারে কবর দেন।কোথায়? বাড়ির পেছনে যে জঙ্গল আছে, সেইখানে পাকা কবর আছে। কবরের গায়ে আরবিতে লেখা তালিব। মনে হয় এইটাই জ্বীনের নাম। কবর দেখতে চাইলে একদিন নিয়া যাব। অজু করে যেতে হয়। যেতে চাও? চাই।আচ্ছা একদিন নিয়া যাক। এই জ্বীন দাদাজানরে টাকা-পয়সা আইন্যা দেয়। তিনি পাকা ঘর তুলেন। শুনেছি ঘর তুলতেও জ্বীন সাহায্য করেছে।এইসব কি সত্য বাবা? জানি না।
রাশেদ এসেছে শুনে তার দূর সম্পর্কের চাচা হাকিম উদ্দিন দ্বিতীয় রাতে হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে দেখা করতে এসেছেন। ধমক দিয়ে বলেছেন, ভাইস্তা ব্যাটা তোমার কি মাথা খারাপ হইছে? চল আমার সাথে আমার বাড়িত থাকবা। এইখানে থাকলে সাপে কাটব। বাড়িভর্তি সাপ। গত বিষুদবারে এই বাড়ির উঠানে সাপে কাটছে।রাশেদ বলল, ব্যবস্থা নিয়েছি চাচা। কার্বলিক এসিড দিয়েছি। দুটা হারিকেন সারারাত জ্বলে। মশারি কিনেছি, রাতে মশারি খাটিয়ে ঘুমাই। এই বাড়িতে থাকা আমার জন্যে বিশেষ প্রয়োজন।প্রয়োজনটা কি?
আমি একটা মিরাকলের জন্যে অপেক্ষা করছি। এই বাড়িতে থাকলেই মিরাকলটা ঘটবে। অন্য কোধাও থাকলে ঘটাবে না।মিরাকল জিনিসটা কি? অসম্ভব কোনো ঘটনা। যা হবার কথা না তা হওয়া।ভাত খাইবা কই? সেটা নিয়ে এখনো চিন্তা করি নি। ব্যবস্থা হয়ে যাবে।ব্যবস্থা কে করব? আসমান থাইকা টিফিন কেরিয়ার হাতে নিয়া ফিরিশতা নামব?
যদি নামে সেটাও হবে একটা মিরাকল।হাকিম উদ্দিন বললেন, যেতে না চাও জোর করে নিব না। তিন বেলা খাওয়া আমি পাঠাব। তোমার নেংটা কালে তোমাকে দেখেছি, এখন এত বড় হইছ। শুনছি বড় ডাক্তারও না-কি হইছ। আমার শূলবেদনা আছে। ডাক্তার কবিরাজ অনেক করাইছি, ফায়দা হয় নাই। শূলবেদনার একটা চিকিৎসা দিয়া যাবা।রাশেদ হাসতে হাসতে বলল, আমি নকল ডাক্তার চাচা। রোগ-ব্যাধির ডাক্তার না। লেখাপড়ার ডাক্তার।
ও আচ্ছা। তোমার কি কি জিনিস লাগবে বল। বাড়িতে গিয়া পাঠাব। ফুটফরমাশ খাটার জন্য একজন আসবে তার নাম ইয়াসিন। চোখে চোখে রাখবা, বিরাট চোর।চাচা আমার কিছু লাগবে না। শুধু যদি বইপত্র কিছু থাকে পাঠিয়ে দেবেন। আমি পড়ার কিছু নিয়ে আসি নি। রাতে কিছুক্ষণ বই না পড়লে আমার ঘুম আসে না।বইপত্র কই পাব? বাড়িতে লেখাপড়ার কোনো কারবারই নাই। বিষাদসিন্ধু থাকতে পারে। বিষাদসিন্ধু পড়বা? হ্যাঁ পড়ব। সাদা কাগজ পাঠাতে পারবেন?
এইটা পারব। কাগজ কলম সবই আছে। যে বাড়িতে লেখাপড়া নাই, সেই বাড়িতে কাগজ কলম থাকে। যাই হোক, শখ কইরা থাকতে আসছ। পূর্ব পুরুষের বাস্তুভিটা। থাক এক রাইত। তারপর আমার এইখানে চইল্যা আসবা। আমি ঘর ঠিক কইরা রাখব। পল্লী বিদ্যুতের লাইন নিয়েছি। মাঝে মধ্যে পাখা চলে। যে গরম পড়েছে। পাখা ছাড়া গতি নাই।
রাশেদের তেমন কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। ঘুমুতে যাবার আগে বিষাদসিন্ধু পড়ছে। তার চাচা বিষাদসিন্ধু ছাড়াও মহুয়া সুন্দরীর কাহিনী এবং চল্লিশ আউলিয়ার কেরামত নামের দুটি বই পাঠিয়েছেন। কাগজ কলম পাঠিয়েছেন। রাশেদ বই পড়ার ফাঁকে ফাঁকে চিঠি লিখছে। চিঠি লেখা হচ্ছে রূপা ব্যানার্জিকে। এক নাগারে লিখছে না। থেমে থেমে লিখছে। কারণ পাশাপাশি সে ঢাকার রূপাকেও চিঠি লিখছে। রাশেদের খুব ইচ্ছা দুটা চিঠিই যেন একই রকম হয়। সামান্য উনিশ বিশ হতে পারে। বেশি না।
রূপা (ব্যানার্জি) কেমন আছ? আমি পালিয়ে আছি।এমন জায়গায় পালিয়েছি যে তুমি আমাকে খুঁজে বের করতে পারবে না।তুমি আমার জীবনে শনি গ্রহের মত উপস্থিত হয়েছ।তুমি ভয়ংকরভাবে আমার প্রেমে পড়েছ এটা আমি জানি। ভালবাসাবাসির ব্যাপারটা হাততালির মত। দুটা হাত লাগে। এক হাতে তালি বাজে না। অর্থাৎ একজনের ভালবাসায় হয় না।তুমি কি জান আমার প্রতিটি দুঃস্বপ্নে তুমি থাক।রূপা (ঢাকা) কেমন আছেন?
আমি পালিয়ে আছি।এমন জায়গায় পালিয়েছি যে একটু চেষ্টা করলেই আপনি আমাকে খুঁজে বের করতে পারবেন।আপনি আমার জীবনে ধ্রুবতারার মত এসেছেন।আমি ভয়ংকভাবে আপনার প্রেমে পড়েছি এটা আপনি জানেন না। ভালবাসাবাসির ব্যাপারটা হাততালির মত। দুটা হাত লাগে। এক হাতে তালি বাজে না। অর্থাৎ একজনের ভালবাসায় হয় না।আপনি কি জানেন আপনাকে প্রায়ই আমি স্বপ্নে দেখি।এই ধরনের চিঠি হুড়হুড় করে লেখা যায় না। সময় লাগে। রাশেদ সময় দিচ্ছে। দুটা চিঠির কোনটাই সে পাঠাবে না। তারপরেও আগ্রহ করে সে কেন চিঠি লিখছে তাও জানে না।
ইয়াসিন তার জন্যে তিনবেলা খাবার নিয়ে আসছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হল প্রতিবেলাতেই পোলাও থাকছে। সকালের নাশতাতেও পোলাও। যদিও রাশেদের চাচা বলে দিয়েছেন ইয়াসিন বিরাট চোর। তার প্রমাণ এখনো পাওয়া যায় নি তবে সে অতি কর্মঠ একজন তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। একদিনে ঝোপঝাড় কেটে বাড়ির চেহারা পাল্টে ফেলেছে। সে একা কাজ করছে না, একজন এসিসটেন্টও জুটিয়েছে।
রাস্তা থেকে বাড়ি পর্যন্ত ইট বিছানো হয়েছে। এখন আর কাদা ভেঙে বাড়িতে ঢুকতে হবে না। পুকুরের ঘাট মোটামুটি ঠিক করা হয়েছে। কচুরিপানা তুলে ফেলায় পুকুরের টলটলে পানি বের হয়েছে।রাশেদ বলল, ইয়াসিন তোমার মত কর্মী মানুষ আমি আমেরিকায় দেখেছি। বাংলাদেশে দেখিনি। তোমার কাজ করার ক্ষমতা দেখে আমি মুগ্ধ।ইয়াসিন বলল, কিছু টেকা-পয়সা খরচ করা কি সম্ভব স্যার? দুই একটা জিনিস খরিদ করতাম।কি খরিদ করবে?
আপনে বুকের নিচে বালিশ দিয়া লেখেন। আপনার জন্যে একটা চেয়ার, টেবিল। ছাদে পলিথিনের চাদর দিব যেন বৃষ্টির পানি চুয়াইয়া না পড়ে। কয়েকটা টিন দরকার, বেড়া দিব। একটা কেরোসিনের চুলা কিনব। চায়ের সরঞ্জাম কিনব। মাঝে-মধ্যে চা খাইবেন।
তোমার কত টাকা লাগবে বল।
হাজার দুই টেকা হইলে চলব।
তোমাকে পাঁচ হাজার টাকা দিচ্ছি। যা লাগে খরচ করবে বাকিটা তোমার। একজন কর্মী মানুষকে আমার উপহার।ইয়াসিন কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলল, হেকিম চাচার সাথে আমি দেড় বছর আছি। মাসে পনেরশ টাকা বেতন দেওয়ার কথা। এখনও এক পয়সা পাই নাই। আপনে এক দিনের পরিচয়ে এতগুলো টেকা দিলেন। স্যার বলেন আপনার জন্য কি করব?
কিছুই করতে হবেনা ইয়াসিন। তুমি খুশি হয়েছ। এতেই আমি খুশি।স্যার আপনার জন্য কিছু একটা আমার করাই লাগবে।রাশেদ বলল, বাড়ির পেছনের জঙ্গলায় জ্বীনের কবর বলে একটা কবর আছে। শুনেছ এ রকম কথা।স্যার শুনেছি। কবরটা দেখৈছি। গ্রামের কিছু মেয়েছেলেরা মানত করে। কবরে মোমবাতি দেই।এই কবরটা ভাঙতে পারবে? দেখতাম ভেতরে কি আছে।স্যার এইটা পারব না।রাশেদ বলল, আমার ধারণী কবরে ধন-রত্ন লুকানো। বাবার দাদাজান হঠাৎ যে কোনো উপায়ে প্রচুর ধন-রত্ন পান। তায় লুকিয়ে রাখেন জ্বীনের কবরে।
যাতে ভয়ে কেউ সে দিকে না যায়।কবর খুঁড়তে পারব না স্যার। যদি বলেন, আপনার জন্য মানুষ খুন করব। স্যার। আপনার আহর দোহাই লাগে। কবরের ধারে কাছে যাবেন না।আচ্ছা যাব না। ঢাকা থেকে হারুন সাহেবকে নিয়ে আসব। তাকে দিয়েই ভাব। উনি রহস্য পছন্দ করেন।ইয়াসিন ঠিক করল, বাকি জীবন সে এই মানুষটার সেবা করে কাটাবে। মানুষটা চলে গেলে সে এই বাড়িতেই থাকবে। বাড়ি দেখাশোনা করবে। জ্বিনের কবরে বাতি দিবে। ইয়াসিনের নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছে। একজন ভাল মানুষের সঙ্গে থাকা বিরাট ভাগ্যের ব্যাপার।
রাতে বৃষ্টি হয়েছে বলেই সকালের রোদটা কোমল লাগছে। যেন রোদটা স্নান করেছে, রোদের নিজেরই শীত শীত লাগছে। চায়ের কাপ হাতে রূপা ছাদে হাঁটছে। অনেকদিন গাছপালার যত্ন করা হয়নি। গাছগুলিকে দেখাচ্ছে জঙ্গুলে ঝোপের মত। মাধুরীলতা গাছে ফুল ফুটেছে। এই গাছের নাম রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর প্রিয় কন্যা মাধুরীর নামে নাম। ছাদের বাগানে আরেকটা গাছ আছে যার নামও রবীন্দ্রনাথের রাখা–উদয় পদ্ম। এইসব তথ্য রূপা জানে তার মায়ের কাছ থেকে। এই মহিলার গাছপালার শখ ছিল, কবিতার শখ ছিল, গানের শখ ছিল। এখন সব শখ টগরের বাবা নামের মানুষটিতে স্থির হয়েছে।
মলিনা টেলিফোন হাতে ছাদে এসেছে। রূপাকে দেখে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল।আফা আপনে এইখানে? আমি সারা দুনিয়া খুঁজছি। আম্মা ফোন করছে।রূপা টেলিফোন হাতে নিল। মলিনা বলল, কাইল রাইত কি খোয়াব দেখছি আফা শুনেন। খোয়বে রাশেদ ভাইজান বললেন, মলি কফি খাব। আমি জাইগা উঠলাম। দৌড় দিয়া রান্নাঘরে ঢুইকা গ্যাসের চুলা জ্বালাইলাম তখন বুঝলাম, খোয়াব দেখছি। কি আচানক বিষয়।
রূপা বলল, আমি টেলিফোনে কথা বলব। তুমি নিচে যাও। নাশতার জোগাড় দেখ।মলিনা অনিচ্ছায় চলে গেল। রূপা আফা যখন কারো সঙ্গে কথা বলে তখন তার দূর থেকে শুনতে ভাল লাগে। আফার গলার স্বর এমন মিড়া।মা কেমন আছ? ভাল। এতক্ষণ লাগে টেলিফোন ধরতে? মা সরি।বেনু মেয়েটার খবর তোকে কে দিয়েছে বল।কেউ দেয়নি মা।কেউ তোকে বলেনি, তোর কাছে আসমানি ওহি নাজেল হয়েছে?
অনেকটা সে রকম। ঐ বিষয়ে পরে কথা বলব। আমার মন বলছে তুমি খুব খারাপ অবস্থায় আছ। তোমার তো কোথায়ও যাবার জায়গা নেই। তুমি এ বাড়িতে চলে এসো। টগর ৈনিয়ে চলে এসো।শায়লা কঠিন গলায় বললেন, আমার কোথাও যাবার জায়গা নেই মানে কি? আমার তিন ভাই আছে। এক বোন আছে।
তোমার তিন ভাই দেশের বাইরে থাকেন। বোনের সঙ্গে তোমার কোনো যোগাযোগ নেই। ছোট খালা তোমাকে সহ্যই করতে পারেন না। ঐ বাড়িতে কীভাবে থাকবে ছোট খালা রাত্রি গেটই খুলবে না।তোদের এখানে আমি কোন যুক্তিতে উঠব? তুমি আমার মা সেই যুক্তিতে উঠবে। সুলতান চাচা যদি আমাদের বাড়িতে স্থায়ীভাবে থাকতে আসতে পারেন। তুমি পারবে না কেন?
উনি তোদের এখানে থাকেন।কয়েকদিন ধরে আছেন। বাবা তাকে স্থায়ীভারে থাকতে বলেছেন। তিনি রাজি। তার না-কি আর একা একা থাকতে ভাল লাগে না। মা! তুমি কি কাঁদছ? তোমার কান্নার শব্দ পাচ্ছি।লায়লা জবাব দিলেন না
রূপা বলল, মা! তোমার লাগানো উদয় সই গাছে ফুল ফুটেছে। মাধুরীলতা গাছে ফুল ফুটেছে। এসে দেখে যাও।না। টগরকে নিয়ে আমি ফার্মগেটের ওভারব্রিজে কাঁথা বিছিয়ে থাকব, তাদের বাড়িতে না।টগরকে নিয়ে এভারব্রিজে থাকা ঠিক হবে না মা।শায়লা কঁদছেন। আগে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন। এখন শব্দ করে কাঁদছেন। রূপা বলল, মী গাড়ি পাঠাব? পাঠিয়ে দেই?
শায়লা ফুঁপাতে ফুঁপাতে বললেন, পাঠিয়ে দে।নাশতার টেবিলে হারুনকে অত্যন্ত উত্তেজিত মনে হল। তাঁর উত্তেজনার বিশেষ কারণ ঘটেছে। পত্রিকায় খবর এসেছে–নওগাঁর একটা পুকুরের পানি দশ মিনিটে হঠাৎ উধাও! প্রথম একটা বিকট শব্দ হল তারপর দেখা গেল হড়হড় করে পুকুরের পানি নেমে যাচ্ছে।
হারুন বললেন, সরেজমিন তদন্ত করা দরকার।সুলতান বললেন, অবশ্যই দরকার। অবশ্যই দরকার।হারুন বললেন, এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে আগে আমরা নওগাঁয় যাব, না নেত্রকোনা যাব।সুলতান বললেন, নওগাঁ। পুকুর ঘাটে তাবু খাটিয়ে বাস করতে হবে। পুকুরের পানি যেভাবে নেমে গেছে সেইভাবে উঠেও আসতে পারে।হারুন বললেন, আমার মনে হয় আগে নেত্রকোনা যাওয়া উচিত। রাশেদ সায়েন্সের ছেলে তাকে নিয়ে নওগাঁ যাব।
সুলতান বললেন, রূপার মতামত নেয়া যাক। সে যা বলে তাই হবে। সে যা বলে তাই হবে।রূপা বলল, চল আগে নেত্রকোনা যাই। আমিও তোমাদের সঙ্গে যাব। মদিনাও যাবে। সেখান থেকে ফিরে সবাই দলবেঁধে পুকুর দেখে আসব আর মদিনাকে তার বাবা মার কাছে রেখে আসব।হারুন বললেন, মলিনা একা থাকবে কেন? সেও আমাদের সঙ্গে যাক।রূপা বলল, মলিনা যেতে পারবে না। মা টগরকে নিয়ে এই বাড়িতে থাকতে আসছেন। মার দেখাশোনার জন্যে একজনকে দরকার।
হারুন চা খাচ্ছিলেন। তার হাত থেকে চায়ের কাপ পড়ে গেল। রূপা বলল, বাবা! তুমি এখন থেকে সুলতান চাচার সঙ্গে একতলায় থাকবে। আমার বড় ঘরটা আমি মাকে আর টগরকে দিয়ে দিব। তোমার পায়রার খুপড়িটা আমি নিয়ে নেব। তোমার কি কোনো আপত্তি আছে বাবা? হারুনের গলা দিয়ে বিচিত্র আওয়াজ বের হল। এই আওয়াজের কোনো অর্থ নেই।সুলতান হতভম্ব গলায় বললেন, তোর মা কখন আসবে?
রূপা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, মাকে আনতে অনেকক্ষণ আগে গাড়ি গিয়েছে। মনে হয় যে কোনো সময় চলে আসবেন।হারুনের গলা দিয়ে আবারও বিচিত্র আওয়াজ বের হল।রাত অনেক। মাইক্রোবাস আঠারোবাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে। রূপা বসেছে ড্রাইভারের পাশের সিটে। তার চোখে ঘুম নেই। পেছনের একটি সিটে বালিশে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছেন হারুন।
আরেক সিটে ঘুমাচ্ছেন সুলতান। মদিনা আসে নি! শায়লা এবং টগরের দেখাশোনার জন্য সেও থেকে গেছে। অতি অল্প সময়ে টগরের সঙ্গে তার ভাল ভাব হয়েছে। এর খুব প্রয়োজন ছিল। টগরের বয়স তের। তার আচরণ চার বছরের শিশুর মত। সে একটি বাড়তি ক্রমোজম নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে।রূপা বলল, ড্রাইভার সাহেব আমরা মনে হয় চলে এসেছি। ঐটা রেল স্টেশন না?
জী আফা।রেল স্টেশনে নিশ্চয়ই চায়ের দোকান আছে। সেখানে জিজ্ঞেস করবেন উকিল বাড়ি কোথায়।জী আচ্ছা।প্রথম আমি এক কাপ চা খাব তারপর উকিল বাড়ি যাব।রেল স্টেশনের চায়ের দোকান খোলা। উকিল বাড়ির সন্ধান সেখানেই পাওয়া গেল। চায়ের দোকানি একজনকে সঙ্গে দিয়ে দিচ্ছে যে বাড়ি চিনিয়ে দেবে। দোকানের চা কখনোই ভাল হয় না। এই চা-টা ভাল। চা খাওয়ানোর জন্যে অনেক চেষ্টা করেও রূপা তার সুলতান চাচা বা বাবাকে জাগাতে পারল না। তাদের চোখে রাজ্যের ঘুম ভর করেছে।
মাইক্রোবাস রাশেদের পৈতৃক বাড়ির কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে। আর যাবে না। এখান থেকে হেঁটে যেতে হবে।রূপা বলল, বাবা আর সুলতান চাচা ঘুমাচ্ছেন। তাদের এখন জাগানোর দরকার নেই। আমি একা যাব। রাশেদ সাহেবকে একটা সারপ্রাইজ দেব।
রূপা এগুচ্ছে। আকাশে সপ্তমীর চাঁদ। ড়ুবে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ড়ুবন্ত চাঁদের আলোয় অনেক রহস্যময়তা। চারপাশে প্রচুর জোনাকি। রূপা অনেক দিন পর এত জোনাকি একসঙ্গে দেখল। বাহ্! কি সুন্দর একটা পুকুর। চঁাদের আলোয় বনের ছায়া পড়েছে পুকুরে। রূপার ইচ্ছা করছে এখনই পুকুরে নেমে সাঁতার কাটতে। একটা কুটুম পাখি ডাকছে। কি সুন্দর পাখিটার গলা।
রূপা বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে আছে। একটা ঘর দেখা যাচ্ছে। ঘরের দুজা নেই। রাশেদ কি এই ঘরেই থাকে? রূপা প্রথম কথা রাশেদকে কি বলবে ঠিক করছে। সে বলবে, প্রকৃতি ঠিক করে রেখেছে আমরা দুজন বাকি জীবন একসঙ্গে থাকব। আমি এসেছি।ঘরের ভেতর থেকে রাশেদ ভয়ার্ত গলায় বলল, কে? কে? উঠানে কে?
রূপা বলল, ভয় পেও না। আমি রূপা।হতভম্ব রাশেদ উঠানে এসে দাঁড়িয়েছে। সে বিস্ময়ে অভিভূত গলায় বলল, এইমাত্র স্বপ্ন দেখেছি একগাদা ধবধবে শাদা ফুল নিয়ে তুমি এসেছ। ঘুম ভেঙে দেখি সত্যি তুমি। ফুল কোথায়?
ফুল আনতে ভুলে গেছি। সরি।সপ্তমীর চাঁদ ড়ুবে গেছে। চারদিক অন্ধকার। তারপরও অন্য এক আলোয় উকিল বাড়ি আলোকিত। এই আলোর উৎস প্রকৃতি জানে। মানুষ জানে না। প্রকৃতি তার সব রহস্য কখনোই প্রকাশ করে না!
