বাবা চুপ। মা কাটা কাটা গলায় বললেন, বেশ তো আমি ওদের বলব যেন আর না আসে।মামাদের আসা বন্ধ হয়নি। আমার ধারণা বাবার কাছ থেকে তারা টাকা-পয়সা নিতেন। আমার সব মামারাই ব্যবসা করতেন। টাকার দরকার তাদের লেগেই থাকত। এটা অবশ্যি আমাদের অনুমান। কারণ মামারা হঠাৎ এসে উপস্থিত হলেই মা গম্ভীর মুখে বলতেন, দরকার ছাড়া তো তোদের আসা হয় না, আবার দরকার হয়েছে বুঝি?
মামারা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হাসতেন।এবারো যখন এলেন সম্ভবত টাকার জন্যেই এলেন। বাবার ব্যবসা পাতির অবস্থা সম্পর্কে খুব ব্যস্ত হয়ে খোঁজখবর শুরু করলেন। আমার ঘরে ঢুকে গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করলেন, দুলাভাইয়ের ব্যবসা কেমন চলছে রে? ভালই বোধহয়। আমি তো এইসব ঠিক জানি না।না জানলে হবে কেন? খোঁজখবর রাখতে হয়। দুলাভাইয়ের ছেলে নেই। তোদেরই তো খোঁজ করতে হবে। ঠিক না?
আমি চুপ করে থাকি। বড় মামা সিগারেট ধরান একটা। নিচু গলায় বললেন, মনে হল দুলাভাইয়ের ব্যবসা ভালোই হচ্ছে। তোদের গান-বাজনা শেখাচ্ছেন, এসব তো দারুণ খবচান্ত ব্যাপার। হাতি পোষার মতো, লাভ হয় না কিছু।লাভ হবে না কেন?
আরে দূর, দুই-একদিন সারেগামা করলেই যদি গান হত তাহলে কি আর কথা ছিল নাকি? আমি কোনো উত্তর দিলাম না। বড় মামা হঠাৎ করে বললেন, তোদের এখন শাড়ি পরা উচিত, বুঝলি? তোর আর নীলুর। বড় হয়ে গেছিস।কথাটা এমন অপ্রাসঙ্গিকভাবে বলা যে আমি হকচাকিয়ে পেলাম। বড় হয়ে যাচ্ছি। বড় হওয়াটা খুব-একটা কি বাজে ব্যাপার?
রাস্তাঘাটে একা একা চলাফেরা করবি না। ঐদিন দেখলাম সন্ধ্যার পব নীলু বাড়ি আসল।বন্ধুর বাড়ি গিয়েছিল। জন্মদিন।জন্মদিন-ফন্মদিন যাই হোক একা একা যেন না যায়। সুন্দরী মেয়েদের অনেক রকম যন্ত্রণা।আমরা সুন্দরী বুঝি? হুঁ, ইয়ে সুন্দরী তো বটেই। আয়না দিয়ে নিজেদের দেখিস না? আমি হঠাৎ বলে বসলাম, কে বেশি সুন্দর মামা? আমি না নীলু?
মামা জবাব দিলেন না। তাঁকে খুব বেশি চিন্তিত মনে হতে লাগল।ক্লাস নাইনের হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষাতে নীলু অংক এবং ইংরেজিতে পাস করতে পারল না। অংকে পেল। তেইশ আর ইংরেজিতে একত্রিশ। তাকে খুব বিচলিত মনে হল না। হাসিমুখে বলল, দূর–আমি আর পড়াশুনা করব না।করবি না তো কি কারবি?বিয়ে করব।বিয়ে করবি মানে? কাকে বিয়ে করবি?
বিয়ে করার লোকের অভাব আছে নাকি? আমি হ্যাঁ বললে এক্ষুণি দুতিনটা ছেলে চলে আসবে।তাই নাকি? হুঁ, তুই কী ভাবিস আমাকে? আমি প্রসঙ্গ পাল্টে বললাম, বাবা পরীক্ষার রেজাল্ট দেখে রাগ করবেন।রাগ করবার কী আছে? সবাই একরকম হয়? কেউ ভাল করে, কেউ করে না।বাবা রাগ করলেন না। প্রগ্রেস রিপোটটা দেখলেন অবাক হয়ে।এ রকম হয়েছে কেন নীলু?
পড়াশুনা করতে আমার ভাল লাগে না বাবা।আগে তো লাগত।আগেও লাগত না। জোর করে পড়ড়াম।ভাল না লাগলেও অনেক কিছু করতে হয় নীলু। তোমাদের জন্যে একজন টিচার রেখে দিলে কেমন হয়? নীলু কথা বলে না। বাবা বললেন, তোমার কী মনে হয় বিলু মা? ভালই হবে।নীলু হালকা স্বরে বলল, এখন থেকে আমি একা একটা ঘরে থাকতে চাই বাবা।
পশ্চিমের ঐ ঘরটা পরিষ্কার করে দিলেই হবে। আমি রমজান ভাইকে বলব।একা থাকার দরকার কী? তোমার তো আবার ভূতের ভয়।এখন আমার ভূতের ভয় নেই বাবা।আমার মনে হয় না। এটা ভাল হবে।ভালই হবে বাবা।ঠিক আছে। সেতারা কার সঙ্গে থাকবে? তোমার সঙ্গে কিংবা বিলুর সঙ্গে।উঠি চলে গেল। বাবা গন্ধীর হয়ে বললেন, তোর সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে?
জি না।নীলু সারা দুপুর জিনিসপত্র সরিয়ে পশ্চিমের ঘরটা গোছাল। আমি কয়েকবার বললাম, এই–রাত্ৰিবেলা ভয় পাবি। নীলু। কোনো উত্তর দিল না। বিকেলের মধ্যে দেখলাম ঘর তৈরি হয়ে গেছে। একটা খাট। পড়ার টেবিল। আলনা। মায়ের ড্রেসিং টেবিল দিয়ে চমৎকার সাজিয়েছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে এক ফাঁকে আমাদের ঘর থেকে মায়ের ছবিটাও নিয়ে গেছে।
সেতারা পড়েছে খুব মুশকিলে। সে রাতে কার সঙ্গে ঘুমোবে বুঝতে পাছে না। আমাকে সে ঠিক পছন্দ করে না। বাবার সঙ্গেও থাকতে চায় না। কিন্তু নীলু বলে দিয়েছে সে একা একা ঘুমোবে। আমি সেতারাকে বললাম, ওর যা ভূতের ভয়, দেখবি রাত আটটা বাজিলেই এই ঘরে চলে আসবে কিংবা তোকে নিয়ে যাবে।সেতারা খুব-একটা ভরসা পাচ্ছে না। সে মুখ কালো করে দুপুর থেকেই আমার পেছনে ঘুরছে।
ছুটির দিন বিকালে সাধারণত নজমুল চাচা আমাদের সঙ্গে এসে চা খান। আজ তিনি খবর পাঠালেন তার ঘরে গিয়ে যেন আজকের চাটা খাওয়া হয়। তিনি মুক্তাগাছার মণ্ডা আনিয়েছেন। নীলু বলল, দূর–আমি যাব না।
যাবি না কেন?
আমার মাথা ধরেছে।
দুটো এসপিরিন খা।
বললাম তো ভাল লাগছে না।
নীলু তার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
নজমুল চাচার শরীর ভাল ছিল না। চাদর মুড়ি দিয়ে বসে ছিলেন। নজমুল চাচা, সাধারণত চা খেতে খেতে মজার মজার গল্পগুজব করেন। আজ সে সব কিছুই হল না। নজমুল চাচা বিরসমুখে বললেন, তোর বাবার একটা বিয়ের কথা হচ্ছে। মেয়েটির হাসবেন্ড মারা গেছে একাত্তুরের যুদ্ধে। একটি ছেলে আছে। ন’বছর বয়স। ছেলেটা তার নানার কাছে থাকে।
আমি কিছু বললাম না। নজমুল চাচা বললেন, মেয়েটা খুব ভাল। আমি চিনি। প্রাইমারি স্কুলের টিচার। একদিন নিয়ে আসব। এখানে। তোরা কথাবার্তা বলিস।জি আচ্ছা।সৎ মায়ের অত্যাচার-টত্যাচার সম্পর্কে যা শোনা যায় সে সব ঠিক না। তাছাড়া তোরা তো যথেষ্ট বড় হয়েছিস। এত বড় বড় মেয়েরা তো সাধারণত বন্ধুর মতো হয়। ঠিক না?
জানি না, হয়ত হয়।তোর বাবার অবস্থাটা দেখতে হবে না? রাত-বিরাতে বাড়ি ফেরার বাজে অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে।আমি চুপচাপ বসে রইলাম।নীলু আসেনি যে? ওরা নাকি মাথা ধরেছে।ও নাকি পরীক্ষা খুব খারাপ করেছে? জি।সংসারে বিশৃঙ্খলা আসার জন্যে এটা হয়েছে। বুঝতে পারছিস তো? চাচা আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, রমজান ভাই এসে বলল, ইউনিভার্সিটির একজন মাস্টার নাকি নিচে বসে আছে।চাচা অবাক হয়ে বললেন, কিসের মাস্টাের? মাস্টার এখানে কী জন্যে? বিলু তুই উপরে আমার কাছে পাঠিয়ে দে তো।
বসার ঘরে গম্ভীর চেহারার একজন ভদ্রলোক বসে আছেন। বয়স খুব বেশি নয়। কিন্তু অন্য রকমের একটি ভারিক্কি ভাব আছে। ভদ্রলোক আমাকে দেখেই বললেন, একটু দেরি করে ফেললাম, না? আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না।আমি আগেই আসতাম। ভাবলাম জন্যদিনে খালি হাতে আসা ঠিক না। কিন্তু তোমাদের এখানে তো কিছু পাওয়া যায় না। আমি ঘণ্টাখানিক ঘোরাঘুরি করেছি। কবিতার বই পাওয়া যায়। কবিতা তো তুমি পড় না, নাকি পড়?
আমি অবাক হয়ে বললাম, আপনি বোধহয় নীলুর কাছে এসেছেন। আমি ওর ছোট বোন বিলু। আমরা যমজ বোন। ভদ্রলোক দীর্ঘ সময় স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলেন।নীলু আমাকে বলেনি। তার যমজ বোন আছে। লোকজন কী সব চলে গেছে নাকি? কিসের লোকজন? আজি নীলুর জন্মদিন না?
না তো।ও আমাকে বলেছিল আসতে। সম্ভবত ঠাট্টা। আমি বুঝতে পারিনি। আমি ঠাট্টা বুঝতে পারি না।ভদ্রলোক চোখ থেকে চশমা খুলে কাঁচ মুছতে লাগলেন। আমি বললাম, আপনি বসুন, আমি নীলুকে ডেকে নিয়ে আসি।তোমাদের চেহারায় অদ্ভুত মিল। যমজ বোনদের মধ্যেও কিছু ডিফারেন্স থাকে। একজন মোটা হয়। অন্যজন রোগা কিন্তু…।
ভদ্রলোক চুপ করে গেলেন।আপনি বসুন আমি এক্ষুণি ডেকে আনছি।নীলুকে ভদ্রলোকের কথা বলতে সে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।এইসব কী রে নীলু? ভদ্রলোক কে? মুন্নিকে তো চিনিস? মুন্নির দূর-সম্পর্কের ভাই।তাকে আসতে বলেছিলি? হুঁ।কেন? এমনি বলেছি।আয় তাহলে। কী যে কাণ্ড।আমি যেতে পারব না। আমার মাথা ধরেছে।নীলুর মাথা ধরেছে এবং গায়ে বেশ জ্বর শুনে ভদ্রলোক অল্প হাসলেন।
আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তাহলে যাই। ওর জন্যে দুটো বই এনেছিলাম— দিয়ে দিও।আপনি বসুন, চা খেয়ে যান।তোমার বাবা আছেন? জি না। উনি রাত করে ফেরেন।তোমার বাবা যখন থাকবেন তখন একদিন আসব।ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন। হাসিমুখে বললেন, আমি আসব। এটা বোধহয় নীলু ভাবেনি। এসে পড়েছি দেখে হকচাকিয়ে গেছে।
আপনি বসুন না, চা খেয়ে যান। উপরে নজমুল হুদা চাচা আছেন, তাঁর কাছেও বসতে পারেন।না না, ঠিক আছে।আমি ভদ্রলোককে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিলাম। ভদ্রলোক শান্ত স্বরে বললেন, বেশ একটা অস্বস্তিকর অবস্থা হয়ে গেল। তাই না? আমার প্রবলেম হচ্ছে আমি ঠাট্টা-তামাশা ঠিক ধরতে পারি না। মনে হয় আমার বুদ্ধিশুদ্ধি নিচু স্তরের।বলেই ভদ্রলোক উঁচু গলায় হেসে উঠলেন। একজন ভারিক্কি ধরনের গম্ভীর চেহারার ভদ্রলোক এমন ছেলেমানুষের মতো হেসে উঠবেন আমি কল্পনাও করিনি।
নীলু বলল সে রাতে খাবে না।
কোন খাবি না রে?
বললাম না। জ্বর।
রমজান ভাই কাউকে না খাইয়ে ছাড়ে না। সে ক্রমাগত ঘ্যানঘ্যান করতে লাগল, রাইতে ভাত না খাইলে এক চড়ুইয়ের রক্ত পানি হয়।নীলু শব্দ করল না। তার ঘরের দরজাও খুলল না। সেতারার মনে ক্ষীণ আশা ছিল হয়তো শেষপর্যন্ত নীলু। তাকে ডেকে নেবে। সে সব কিছুই হল না। রাত নটা বাজতেই নীলু। তার ঘরের বাতি নিভিয়ে দিল।
খুব বৃষ্টি হল সে রাতে–ঝমঝম করে বৃষ্টি। আকবরের মা বলল, আশ্বিন মাসে বিষ্টি, লক্ষণ খুব বালা।আমি অনেক রাত পর্যন্ত বাবার জন্যে অপেক্ষ করতে লাগলাম। বাবাকে কী সব খুলে বলা উচিত? বাবা খুব দেরি করতে লাগলেন। ঝড়বৃষ্টিতে এদিকে সব ভাসিয়ে নিচ্ছে।বাবা ফিরলেন গভীর রাতে। আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। রমজান ভাই আমাকে ডেকে তুলে ফিসফিস করে বলল, ছোট আফা, লক্ষণ বেশি বালা না।
কেন কী হয়েছে?
মদ খাইয়া আইছে।
সমস্ত রাত আমার ঘুম হল না।
সেতারা এক কাণ্ড করেছে। রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেছে। দুটি পত্রিকার (দৈনিক বাংলা, অবজার্ভার) প্রথম পাতায় তার ছবি ছাপা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত থেকে শিশুসংগীত সম্মেলনের গ শাখায় স্বর্ণপদক নিচ্ছে।অথচ বাবা সেতারাকে ঢাকায় যেতেই দিতে চাননি। গানের স্যারের কত ধরাধরি কত সুপারিশ। বাবার এক কথা, না, এইসবের দরকার নেই।
শেষপর্যন্ত নজমুল চাচা যখন সঙ্গে যেতে রাজি হলেন তখনই শুধু গম্ভীর মুখে বাবা রাজি হলেন।ঢাকায় গিয়ে সে যে এই কাণ্ড করেছে তাও আমরা জানি না। রমজান ভাই পত্রিকা পড়ে। প্রথম জানল এবং এমন চোঁচামেচি শুরু করল–।সেতারা যে ভেতরে ভেতরে এমন ওস্তাদ হয়ে উঠেছে তা আমরা বুঝতেই পারিনি। সকাল বেলা ঘুম ভেঙেই অবশ্যি শুনতাম—
কোয়েলিয়া বলেরে মাই
অঙ্গনা মোরে বারে বারে
পিয়া পরদেশ গাওন কিন্নু
সদরঙ্গ পিয়ারাবা তোমাবিনা নয়নানা দরশন বারে বারে।
একই জিনিস সকালে একবার বিকেলে একবার। মাথা ধরে যাওয়ার মত অবস্থা। বাবা পর্যন্ত গানের স্যারকে একদিন বললেন, ছয় সাত মাস ধরে একই জিনিস গাচ্ছে শুনতে খুবই বিরক্ত লাগে।গানের স্যার একগাল হেসে বললেন, সময় হলে দেখবেন। হা হা হা। সময় হোক না।ফিরে আসবার পর সেতারার একটা সংবর্ধনাও হল। আমি সেতারাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলাম। বাবা কোথাও যানটান না। নীলুও যাবে না।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ঐ ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তিনি হাসিমুখে এগিয়ে এলেন, আরে নীলু, এই মেয়ে তোমার বোন? তুমি তো বলনি তোমার এমন গুণী বোন আছে। আস তুমি, তোমার সঙ্গে কথা আছে।একবার ভাবলাম বলি, আমি বিলু। কিন্তু কিছুই বললাম না।আমি দিন দশোকের মধ্যে চলে যাব। ইউনিভার্সিটি খুলে যাচ্ছে।ও।পরশুদিন আসতে বলেছিলাম আসিনি তো?
আমি অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম।আমি অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছিলাম। একবার ভাবলাম যাই তোমাদের বাসায়।আমি বিলু। নীলু আসেনি।ভদ্রলোক চশমা খুলে কাঁচ পরিষ্কার করতে লাগলেন।এত পরে বলছ কেন? প্রথমে বললেই হত।ভদ্রলোক রাগী চোখে তাকালেন। আমার দিকে। আমি এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে। একবার পেছন ফিরে দেখলাম তিনি কেমন যেন খড়গ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। আমার কেন জানি খুব কষ্ট হতে লাগল।
আমাকে কেউ তেমন পছন্দ করে না। কেন করে না। আমি জানি না। নীলু অন্য ঘরে চলে যাবার পর সেতারাও চলে গিয়েছে তার সঙ্গে। আকবরের মা আগে আমার ঘরের সামনে পাটি পেতে ঘুমাত, এখন ঘুমোচ্ছে ওদের ঘরের সামনে। নজমুল চাচা সব ঈদে আমাদের উপহার দেন। আমি লক্ষ্য করেছি নীলুর উপহারটা হয় অনেক সুন্দর অনেক দামি।
ক্লাসের মেয়েরাও আমাকে পছন্দ করে না। টগরেব বোনের বিয়েতে টগর ক্লাসের পাঁচটি মেয়ে ছাড়া সবাইকে দাওয়াত করল। আমি ঐ চার-পাঁচজন মেয়েদের মধ্যে একজন। সবাই এরকম করে কেন আমার সঙ্গে? নীলু ইদানীং আমার সঙ্গে কথা বলা ছেড়েই দিয়েছে। নিজের থেকে কিছু জিজ্ঞেস কবলে তবেই জবাব। সেদিন দেখলাম খুব সাজগোজ করছে। আমি বললাম, কোথায় যাচ্ছিস রে?
যাচিছ এক জায়গায়।
কোথায়? কোনো বন্ধু?
নীলু চুপ করে রইল।
ঐ ভদ্রলোকের কাছে যাচ্ছিস বুঝি?
গেলে কী হয়?
প্রায়ই যাস নাকি?
মাঝে মাঝে যাই।
এরকম যাওয়া ঠিক না। লোকজন খারাপ বলবে।খারাপ বললে বলুক না। আমি কী পায়ে ধরে সোধছি–আমাকে খারাপ না বলার জন্যে।আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, ঐ ভদ্রলোকের নাম কী? রকিব ভাই, অংক পড়ায়। খুব শিগগির আমেরিকা চলে যাবে।উনিই বলেছেন বুঝি? মুন্নি বলেছে। উনি মুন্নির খালাতো ভাই হন।কোন মুন্নি? কালো মুন্নি?
হুঁ।নীলু কপালে একটা টিপ পরে অনেকক্ষণ আয়নার দিকে তাকিয়ে আবার টিপটি তুলে ফেলল। হালকা গলায় বলল, মুন্নির ধারণা রকিব ভাই ওকে বিয়ে করবে।করবে নাকি? কী জানি করতেও পারে। আমার কিছু যায় আসে না। করতে চাইলে করবে।যায় আসে না, তাহলে যাস কেন?
নীলু থেমে থেমে বলল, আমি ওদের বাড়ি গেলেই মুন্নি রাগ করে। দারুণ রাগ করে। কিন্তু কিছু বলতে পারে না। আমার খুব মজা লাগে। সেই জন্যে যাই।ছিঃ, নীলু। এইসব কী? শুধু মুনি না। ওর মাও রাগ করেন। সেদিন কি বলছিলেন শুনবি? কি বলছিলেন? বলছিলেন, মুন্নির সঙ্গে রকিব ভাইয়ের বিয়ের কথা সব পাকাপাকি হয়ে আছে, শ্রাবণ মাসে। বিয়ে? ডাহা মিথ্যা। কোনো কথাই হয়নি।তুই জানালি কী করে কোনো কথা হয়নি?
আমি জিজ্ঞেস করলাম।
কাকে জিজ্ঞেস করলি?
রকিব ভাইকে। আবার কাকে?
খুব খারাপ হচ্ছে নীলু।
খারাপ হলে আমার হচ্ছে, তোর তো হচ্ছে না। তুই আমার সঙ্গে বকবক করিস না। যা ভাগ।নীলু আজকাল স্কুলেও নিয়মিত যাচ্ছে না। সকালবেলা স্কুলে যাবার জন্যে তৈরি টৈরি হয়ে হঠাৎ বলবে, আজকে আর যাব না। পেট ব্যথা করছে।সেদিন সেলিনা আপা (আমাদের হেড মিসট্রেস) আমাকে তার ঘরে ডেকে নিয়ে গেলেন। রাগী গলায় বললেন, তুমি কী গত শুক্রবার কালোমত রোগা একটা ছেলের সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলছিলে? বিউটি লন্ড্রির সামনে?
কই না তো আপা।আমিও তাই ভাবছিলাম। ঐটা নীলু। আজেবাজে ছেলের সঙ্গে আজকাল খুব মিশছে মনে হয়। তোমার বাবাকে বলবে। ঐ সব লোফার টাইপের ছেলে। পানের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট খায়, মেয়ে দেখলে শিস দেয়। বলবে তুমি তোমার বাবাকে।জি বলব।ঠিক আছে তোমার বলার দরকার নেই। তাকে বলবে। আমার সঙ্গে দেখা করতে।জি আচ্ছা।
