এমন সিরিয়াস পড়াশোনার সময়টাতেও আমাদের ক্লাসের রুবিনার বিয়ে হয়ে গেল। সেলিনা আপা খুব রাগ করলেন–বাবা-মাদের কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই নাকি? সেলিনা আপা খুব কাটা কাটা কথা বলে অপমান করলেন রুবিনার বাবাকে। ঝাঁঝাল গলায় বললেন, আপনাদের মত শিক্ষিত মূর্থের জন্যে দেশের এমন খারাপ অবস্থা।
রুবিনা খুবই কান্নাকাটি করতে লাগল। গায়ে হলুদের দিন দেখি কেঁদে মুখটুখ ফুলিয়ে ফেলেছে। রুবিনার এক মোটাসোটা খালা পানিভর্তি মুখ নিয়ে বলে বেড়াচ্ছেন, মেট্রিক ক্লাসটা হচ্ছে মেয়েদের বিয়ের বয়স। এরপর আর রসকষ থাকে না। নীলুটা ফস করে বলে বসল, কেন, তখন রস কি হয়?
রুবিনার খালা চোখ বড় বড় করে বললেন, এই ফাজিল মেয়েটা কে? নীলু হাসিমুখে বলল, ফাজিল বলছেন কেন? খুব হাসোহাসি শুরু হয়ে গেল চারদিকে। রুবিনার খালা রেগেমেগে অস্থির। কয়েকবার বললেন, আজিকালিকার মেয়েগুলি এমন কেন?
অনেকদিন পর রুবিনার গায়ে হলুদ উপলক্ষে আমরা খুব হৈচৈ করলাম। বিয়েটিয়ে এই জাতীয় অনুষ্ঠান আমার ভাল লাগে না। গাদাগাদি ভিড়। মেয়েদের লোক দেখান আহাদীপনা। খাবার টেবিলে তাড়াহুড়ো করে বসতে গিয়ে শাড়িতে রেজালার ঝোল ফেলে দেয়া। অসহ্য! কিন্তু রুবিনার গায়ে হলুদ আমার কেন যে এত ভাল লাগল। বরের বাড়ি থেকে এলা নামের একটি মেয়ে এসেছিল, সে ঢাকায় ও লেভেলে পড়ে। ওর সঙ্গে আমার খুব বন্ধুত্ব হয়ে গেল। জন্মের বন্ধুত্ব।
এর আগে আর কোনো মেয়ের সঙ্গে এত বন্ধুত্ব হয়নি। আমরা দু’জন এক ফাঁকে ছাদে চলে গেলাম। মেয়েটি নানান কথা বলতে লাগল। একটি ছেলের সঙ্গে তার ভাব হয়েছে। ছেলেটি মেডিক্যালে পড়ে। এক বিয়ে বাড়িতে আলাপ হয়েছিল। খুব নাকি লাজুক ছেলে। আর দারুণ ভদ্র। এলা নিচু স্বরে বলল, জানো ভাই, ও একবার যা অসভ্য কথা লিখেছিল আমাকে। আমি খুব রাগ করলাম। ওর সঙ্গে দেখা করাই বন্ধ করে দিলাম। টেলিফোন করলে টেলিফোন নামিয়ে রাখতাম। শেষে কি করল সে জান? কি করল?
বলল সে বিষ খাবে। আমি তো জানি তাকে। খাবে বলেছে। যখন তখন খাবেই। ছেলেরা দারুণ সেন্টিমেন্টাল হয় ভাই।তখন তুমি কি করলে? কি আর করব, দেখা করলাম।আমি ইতস্তত করে বললাম, অসভ্য কথাটা কি লিখেছিল? এলা তরল গলায় হেসে উঠল, দূর তা বলা যায় নাকি? বিয়ের দিন তুমি আসবে তো? ঐ দিন তোমাকে ওর ঐ চিঠিটাই পড়াব। দেখবে ছেলেরা কি রকম অসভ্য হয়।
রুবিনার বিয়ের দিন আমরা কেউ ও-বাড়িতে গেলাম না। নীলুর জন্যেই যাওয়া হল না। সে কিছুতেই যাবে না এবং আমাকেও যেতে দেবে না।তুই না গেলে না যাবি। আমি যাই।না বললাম তো যেতে পারবি না।কেন অসুবিধেটা কি? ওরা আজেবাজে কথা বলছিল, তোকে বলতে চাই না।বলতে চাস না কেন?
কারণ শুনলে তোর খারাপ লাগবে।লাগুক খারাপ নীলু মৃদু স্বরে বলল, ওরা বলছিল সেতারার চেহারার সঙ্গে নাকি ঐ লোকটির খুব মিল। আর সেতারা গান-বাজনাও ঐ লোকটির মত জানে।কখন বলছিল?
রুবিনার খালা বলছিল, আমি পাশের ঘরে ছিলাম।আমি চুপ করে রইলাম।নীলু বলল, তোর মন খারাপ লাগবে বলেছিলাম না। তবুও তো শোনা চাই।আমি সে রাতে ঘুমোতে পারলাম না। বাবা ফিরলেন অনেক রাতে। সিঁড়িতে ধুপধ্যাপ শব্দ হতে লাগল। রমজান ভাইয়ের গলা শোনা গেল, ছিঃ, আপনের শরম করে না?
চুপ থাক।আপনে চুপ থাকেন।ধুপ করে একটা শব্দ হল। বাবার গলা।ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বের করে দেব। শুয়োরের বাচ্চা। বেশি সাহস হয়েছে।মেয়েরা বড় হইছে না? হায়া-শরাম নাই? চুপ থাক।আপনে চুপ থাকেন।পানি ঢালার শব্দ। আকবরের মা উঠে গেল। নবান করে কি যেন পড়ল। আবার পানি ঢালা হচ্ছে। কি হচ্ছে এসব?
বাবা আজকাল বড্ড ঝামেলা করছেন। আবার একটা বিয়ে করলে তার জন্যে ভালই হত। নজমুল চাচা যাকে বাসায় নিয়ে এসেছিলেন সেই মহিলাটিকে আমার বেশ পছন্দ হয়েছিল। ছোটখাটো মানুষ, লম্বা চুল। কথা বলেন টেনে টেনে। আমাদের সঙ্গে বেশ আগ্রহ করে কথা বললেন। নীলু যখন বলল, আচ্ছ। আপনি কি আমাদের দু’জনকে আলাদা করতে পারবেন? আমার নাম নীলু ওর নাম বিলু। কিছুক্ষণ পর যদি আমরা দু’জন এক রকম কাপড় পরে আসি তাহলে কি বলতে পারবেন। কে বিলু কে নীলু?
তিনি হাসিমুখে বললেন, আরে এ মেয়ে তো দেখি খুব পাগলী! আমাদের দু’জনারই ভদ্রমহিলাকে খুব পছন্দ হল। শুধু সেতারা মুখ গোজ করে দূরে দাঁড়িয়ে রইল। তিনি ডাকলেন, এই কি যেন নাম তোমার? সে উঠে চলে গেল। আমরা তাকে বাগান দেখাবার জন্যে নিয়ে গেলাম। সেতারা কিছুতেই যাবে না। আমরা সেতারাকে ছাড়াই বাগানে বেড়াতে গেলাম। বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া তেঁতুল গাছ দুটি দেখে তিনি খুব অবাক হলেন। আশ্চর্য হয়ে বললেন, বসতবাড়ির কাছে কেউ তেঁতুল গাছ লাগায় নাকি? নীলু বলল, লাগালে কি হয়?
বুদ্ধি কমে যায়। তেঁতুল খেলেও বুদ্ধি কমে।এটা কিন্তু ঠিক না। রকিব ভাই খুব তেঁতুল খান। কিন্তু তার খুব বুদ্ধি।রকিব ভাই কে? নীলু চুপ করে গেল। তিনিও আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। একবার শুধু বললেন, এত বড় বাড়িতে থাক, ভয় লাগে না? আমরা কিছু বললাম না। ভদ্রমহিলা যাবার আগে নীলুকে জড়িয়ে ধরে আদর করলেন এবং অত্যন্ত মৃদুস্বরে বললেন, তোমাদের মোর সঙ্গে কি তোমাদের যোগাযোগ আছে?
নীলু বলল, না নেই।তোমরা চিঠি লিখেলেই পার। তোমরা কেন লিখবে না? তোমরা লিখবে।আমাদের খুব আশা ছিল ভদ্রমহিলার সঙ্গে বাবার বিয়ে হবে কিন্তু বিয়ে হয়নি। বাবা কিছুতেই রাজি হলেন না। নজমুল চাচার ওপর রেগে গিয়ে আজেবাজে কথা বলতে লাগলেন, তোমরা পেয়েছিটা কি? আমাকে না বলে এই সব কি শুরু করেছ?
নজমুল চাচাও কি সব যেন বললেন। তুমুল ঝগড়া বেঁধে গেল।এক পর্যায়ে বাবা বললেন, যাও তুমি আমার বাড়ি থেকে এক্ষুণি বিদেয় হও। নজমুল চাচাও চোঁচাতে লাগলেন, আমি তোমার দয়ার ওপর আছি নাকি? নগদ ভাড়া দিয়ে থাকি।সে এক বিশ্ৰী অবস্থা। নজমুল চাচা সেই রাতেই ঠেলা গাড়ি নিয়ে এলেন। মালপত্র পাঠানো হতে লাগল। আমরা বসে বসে দেখলাম। ঠেলা গাড়ি এসেছে দুটি। নজমুল চাচার জিনিসপত্র তেমন কিছু নেই।
ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সব তোলা হয়ে গেল। আমরা দেখলাম। বাবা দাঁড়িয়ে আছেন সিঁড়ির কাছে আর নজমুল চাচা একটা বেতের ঝুড়ি হাতে নিয়ে নেমে যাচ্ছেন।নীলু তখন ছুটে গিয়ে সিঁড়ির মাথায় তাকে ঝাপ্টে ধরল।নজমুল চাচা বললেন, আরে মা, কি করিস তুই ছাড় ছাড়া।নীলু ছাড়ল না।নজমুল চাচা বললেন, এতো বড় মুসিবন্ত হল দেখছি। আরে বেটি কি করিস।তার হাত থেকে বেতের ঝুড়ি ছিটকে পড়ে গেল।
নজমুল চাচা ভারী গলায় বললেন, এই মালপত্র সব তুলে রাখা। সাবধানে তুলিস।নজমুল চাচা আমাদের কোন আত্মীয় নন। দোতলার তিনটি কামড়া ভাড়া নিয়ে আমাদের সঙ্গে আছেন। পনের বছরের মতো। তাঁর স্ত্রী মারা গিয়েছেন ষোল-সতের বছর আগে। একটিমাত্র মেয়ে, অল্প বয়সে বিয়ে দিয়েছিলেন। সেই মেয়ে নেদারল্যান্ড না কোথায় যেন থাকে। বছরে দুতিনটি চিঠি দেয়। চিঠিতে খুব স্বাস্থ্যবান কিছু ছেলেমেয়ের ছবি থাকে। নজমুল চাচা সেই চিঠি পড়ে গম্ভীর হয়ে বলেন, উফ এ্যারন বাংলাটা এখনো শেখে নাই। খুব খারাপ খুব খারাপ।
এ্যারন তাঁর নাতনী।নীলু অনেক কিছুই করতে পারে যা আমি পারি না। নজমুল চাচা যখন চলে যাচ্ছিলেন আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল ছুটে গিয়ে তাকে ফেরাই। কিন্তু আমি গোলাম না, ছুটে গেল নীলু। আমরা দুজনে দেখতে অবিকল এক রকম, কিন্তু দু’জন সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ হয়ে উঠছি। আমরা এ রকম কেন? কাল রাতে আমি চমৎকার একটি স্বপ্ন দেখেছি। এমন চমৎকার স্বপ্ন যে ঘুম ভেঙে খানিকক্ষণ কাদলাম। একবার ইচ্ছে হল নীলুকে ডেকে তুলি।
স্বপ্নের কথাটা বলি ওকে। কিন্তু শেষপর্যন্ত কিছুই করলাম না। গলা পর্যন্ত চাদর টেনে চুপচাপ শুয়ে শুয়ে স্বপ্নটার কথা ভাবলাম। ঘুমের মধ্যে যে স্বপ্লটিকে অর্থবহ মনে হচ্ছিল জেগে থেকে তা আর মনে হল না। আমি দেখেছিলাম একটি নদী। নদীর চারপাশে ঘন বন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর বন অদৃশ্য হয়ে গেল। দেখলাম শুধুই নদী। সেই নদীতে বালি চিকচিক করছে। কোথাও কেউ নেই। আমার একটু ভয় ভয় করছে। তবু আমি নদীতে নামতেই নদীটি আমাদের নানার বাড়ির পুকুর হয়ে গেল।
সে পুকুরে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা কুমীর কুমীর খেলছে। স্বপ্নে নদীর পুকুর হয়ে যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। আমি একটুও অবাক না হয়ে ছেলেমেয়েগুলির সঙ্গে কুমীর কুমীর খেলতে লাগলাম। একটি পাঁজি ছেলে ডুব সাতার দিয়ে কেবলই আমার পা জড়িয়ে গভীর জলের দিকে টেনে নিতে চাচ্ছিল। আমার রাগ লাগছিল। কিন্তু কিছুই বলছিলাম না। কারণ স্বপ্নের মধ্যে মনে হচ্ছিল এই ছেলেটি যেন আমার স্বামী। এক সময় ছেলেটি আমাকে মাঝপুকুরে নিয়ে গিয়ে চেঁচিয়ে বলল, এই সুশী তোমাকে এখন ছেড়ে দেই?
কেন মানুষ এমন অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখে? আমি জেগে এই ছেলেটির মুখ খুব মনে করবার চেষ্টা করলাম, কিছুতেই মনে পড়ল না। শুধু মনে পড়ল ছেলেটির চোখগুলো মেয়েদের চোখের মত টানা টানা। আর ওর হাত দুটি লম্বা এবং খুব ফরসা! কে জানে এ রকম একটি ছেলে সঙ্গেই হয়ত আমার বিয়ে হবে।
সে আমাকে আদর করে ডাকবে সুশী। কী আশ্চর্য এরকম একটা অদ্ভুত নাম এল কোথেকে? ভাবতে ভাবতে আবার আমার চোখ ভিজে উঠল। বাকি রাত এক ফোঁটা ঘুম এল না।এত ভোরে কখনো আমি আগে উঠিনি। অদ্ভুত লাগছিল আমার। আলোটাই অন্য রকম। কেমন মায়া মায়া আলো, স্বপ্নের মধ্যে যে রকম আলো দেখা যায়। সে রকম। আমি নিচে বাগানে নেমে গেলাম। কদম গাছের নিচটায়।
তখনো খুব অন্ধকার। আমার একটু ভয় ভয় করছিল। কিন্তু গাছের নিচের এসে দাঁড়ানো মাত্র দেখলাম নীলু। জেগে উঠেছে। টুথব্রাশ নিয়ে ঘুম ঘুম চোখে সিঁড়ি দিয়ে নামছে। নীলু সব সময় খুব ভোরে ওঠে। কিন্তু সে যে এ রকম অন্ধকার ভোর তা জানা ছিল না। আমি ডাকলাম, এ্যাই নীলু।নীলু আমাকে দেখতে পেল না। সে অবাক হয়ে চারদিকে তাকাতে লাগল। তারপর একটি কাণ্ড করল, মা এসেছে মা এসেছে বলে ছুটে গেল গেটের দিকে।আমি এগিয়ে এসে বললাম, এ্যাই নীলু কি হয়েছে রে?
নীলু। খুব অবাক হল। বেশ কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না। এক সময় থেমে থেমে বলল, আমি ভাবলাম মা বুঝি। গলার স্বর অবিকল সে রকম লাগল।নীলুর কি কিছুটা আশাভঙ্গ হয়েছে? কী জানি হয়ত হয়েছে। মার কথা সে হয়তো সারাক্ষণই ভাবে। মুখে বলে না।আজ এত সকালে উঠেছিস যে? দেখলাম একদিন উঠে কেমন লাগে।কেমন লাগে? ভালই তো।নীলু চুপচাপ দাঁত ঘষতে লাগল। আমি বললাম, তুই কি মার কথা খুব ভাবিস? নাহ।তাহলে আজ এ রকম ছুটে গেলি যে? আমার ইচ্ছে হয়েছে গিয়েছি। তোর তাতে কি? রাগ করছিস কেন?
নীলু জবাব না দিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। তখন মনে পড়ল। নীলুর সঙ্গে আমার ঝগড়া চলছে। গত এক সপ্তাহ ধরে কথাবার্তা বন্ধ। ঝগড়ার কারণটি অতি তুচ্ছ। আমি নীলুর একটি চিঠি খুলে পড়ে ফেলেছি। কিছুই নেই সে চিঠিতে। ছয় লাইনের একটা চিঠি। নীলুর পরিচিত প্রফেসরটি লিখেছেন। সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদার যে বইটি নীলু। পড়তে চেয়েছে সেটি তিনি দোকানে খুঁজে পান নি। পেলেই পাঠাবেন।
এমন কী আছে সেই চিঠিতে যে নীলু রাগ করল? কিন্তু সে এমন ভাব করতে লাগল যেন আমি তার কাছে লেখা খুব গোপন একটি প্রেমপত্র পড়ে ফেলেছি। আমি যখন বললাম, কি আছে এই চিঠিতে যে তুই এ রকম করছিস? যাই থাকুক, কেন আমার চিঠি পড়বি?
বেশ আর পড়ব না।পড়বি না। শুধু না, তুই আমার ঘরেও কোনোদিন ঢুকবি না।বেশ ঢুকব না।আর আমার সঙ্গে কথাও বলবি না।ঠিক আছে বলব না।ব্যাপারটা এখানেই শেষ হল না। সন্ধ্যাবেল বাবা প্রেস থেকে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে সে নালিশ করল, বাবা বিলু আমার সব চিঠিপত্র পড়ে ফেলে।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। তুমি ওকে ডেকে নিষেধ করে দাও।
ঠিক আছে করব।
না এখনই কর।
বাবা আমাকে ডেকে পাঠালেন। শান্তস্বরে বললেন, একজনের কাছে লেখা চিঠি অন্যের পড়াটা ঠিক না মা। আমি লজ্জায় বাঁচি না। নীলুটা এমন হচ্ছে কেন কে জানে। আগে এ রকম ছিল না। তার কাছে চিঠি এলেই আমাকে সে চিঠি পড়তে হত। একবার সে পেনফ্রেন্ডশিপ করল বুলগেরিয়ার কি একটা ছেলের সঙ্গে। সেই ছেলেটা সবুজ রঙের কাগজে লম্বা লম্বা চিঠি লিখিত ভুল ইংরেজিতে।
চিঠির শেষে একটা ঠোঁটের ছবি একে লিখিত Kiss। নীলু আমাকে সেই চিঠি পড়তে দিয়ে বলত, মা গো কি অসভ্য! নীলুর সেই সব চিঠির জবাবও লিখে দিতাম। আমি। একদিন সে লজ্জায় লাল হয়ে বলল, বিলু চিঠির শেষে তুইও লিখে দে Kuss। ঐ বাঁদরটার সাথে তো আর দেখা হচ্ছে না। কি বলিস? আমি লিখলাম Kiss। নীলু বহু যত্নে একটা ঠোঁটের ছবিও আঁকল।
তারপর ঐ ছেলে তার ছবি পাঠাল। মাথায় চুল নেই একটিও। গালে এত বড় একটা আঁচিল। হাতির কানের মত বড় বড় কান। ছবি দেখে দারুণ রেগে গেল নীলু। ছেলেটি লিখেছিল সুযোগ পেলেই সে তার বাংলাদেশী পেনফ্রেন্ড নীলুর সঙ্গে দেখা করতে আসবে। নীলু বলল, লিখে দে হাঁদারাম তুমি বাংলাদেশে এলে তোমার ঠ্যাং ভেঙে দেব। বাঁদর কোথাকার।
নীলু চিঠি লেখা বন্ধ করে দিলেও আমি চালিয়ে যেতে লাগলাম। মজাই লাগত। আমার। বানিয়ে বানিয়ে কত কিছু যে লিখছি। যেমন একবার লিখলাম, কাল আমরা সমুদ্রে নৌকা নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলাম। কি যে সুন্দর সমুদ্র আমাদের। খুব মজা হয়েছে। একবার সে লিখল, তোমার কি কোনো ছেলেবন্ধু আছে? আমি লিখলাম, হ্যাঁ আছে। আমার ছেলে-বন্ধুটি একজন কবি। সে আমাকে নিয়ে কবিতা লিখেছে।
ছেলেটা সত্যি সত্যি হাঁদারাম। যা লিখতাম তাই বিশ্বাস করত। তারপর একদিন সে হঠাৎ লিখে বসিল, আসছে সামারে আমি বাংলাদেশে আসব। কী সর্বনাশ! ভয়ে আমি এবং নীলু দু’জনই অস্থির। একি ঝামেলা হল। কি যে ভয়ে ভয়ে কেটেছে সেই সময়টা। রাতে ভাল ঘুম পর্যন্ত হত না। নীলু অবশ্যি খুব একটা ভয় পায়নি। ও বলত, খামোকা ভয় পাচ্ছিস, আসবে-টাসবে না। আর যদি এসেও পড়ে তাহলে বলব নীলু নামের মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেছে।
ছেলেটি অবশ্যি আসেনি। এবং চিঠিপত্রও দেয়নি। আর। হয়তো অন্য কোনো দেশের কোনো মেয়ে পেনফ্রেন্ডশিপ করেছে।নীলুর যন্ত্রণায় আরো সব চিঠি লিখতে হয়েছে আমাকে। একবার সে বলল, খুব ভাষা-টাষা দিয়ে একটা চিঠি লিখে দে তো বিলু। কার কাছে, কী–কিছুই বলবে না। লিখলাম একটা চিঠি। সেটা তার পছন্দ হল না। আবার একটা লিখলাম। কত কাণ্ড হল সে চিঠি নিয়ে। ক্লাসের মেয়েরা সেই চিঠির লাইন বলে বলে নীলুকে খ্যাপাতে লাগল।
কোথায় পেয়েছে তারা সেই চিঠি কে জানে! নীলু। যে ছেলেকে লিখেছিল সে-ই হয়ত বলে দিয়েছে। নীলু বাসায় এসে কেঁদে-টেদে অস্থির। সেই সময় নীলুর সঙ্গে খুব ভাব ছিল আমার। নীলু হঠাৎ করেই অন্য রকম হয়ে গেল। আমার কোনো বন্ধুটন্ধু নেই। নীলু দূরে সরে যেতেই আমি একা হয়ে গেলাম। এরকম একটি অদ্ভুত সুন্দর সকালে একা থাকতে ইচ্ছে করে না। আমি নীলুর খোজে বাগানের পেছনের দিকে এসে দেখি নীলু কাঁদছে। কী আশ্চর্য! আমি বললাম, কি হয়েছে রে?
কিছু হয়নি।
কাঁদছিস কেন?
তোর কাছে সব কিছু বলতে হবে নাকি?
বললে দোষ কি?
