তোমাকে পর্ব – ৬ হুমায়ূন আহমেদ

তোমাকে পর্ব – ৬

নীলু। কোনো জবাব না দিয়ে গম্ভীর মুখে বাগান ছেড়ে চলে গেল। সকালটা হঠাৎ করেই অন্য রকম হয়ে যাচ্ছে। লোকজন সবাই জেগে উঠেছে। রমজান ভাই ঘটং ঘটং করে টিউবওয়েলের পানি তুলছে। আকবরের মা ময়লা থালা-বাসন এনে জমা করছে টিউবওয়েলের পাশে। এক সময় ঝগড়া লেগে গেল দুজনের মধ্যে। এরা দু’জন দু’জনকে সহ্যই করতে পারে না। তবু কেমন করে থাকে এক সঙ্গে?

এদের চেঁচামেচিতেই বোধ হয় বাবার ঘুম ভাঙল। বাবা বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই চারদিক আবার চুপচাপ। বাবা বললেন, আমাকে চা দাও এক কাপ। এরা দুজনে কেউ কোনো উত্তর করল না। আকবরের মা বেড়ালের মতো ফ্যাসফ্যাস করে কি বলতেই আবার বেঁধে গোল রমজান ভাইয়ের সঙ্গে। বাবা দাঁড়িয়ে রইলেন চুপচাপ। আজকাল কেউ আর বাবাকে তেমন গ্রাহ্য করে না। আমি এগিয়ে এসে বললাম, আমি বানিয়ে আনছি। বাবা।তুই আবার চা বানাতেও জানিস নাকি? জানিব না কেন? বাবা অবাক হয়ে বললেন, কার কাছে শিখলি?

কী আশ্চর্য কাণ্ড, চা বানানো আবার শিখতে হয় নাকি? বাবা এরকম ভান করতে লাগলেনযেন খুব অবাক হয়েছেন।আর কি জানিস, রান্নাবান্না করতে পারিস? ভাত-মাছ এইসব? নাহ।এইগুলিও শিখে ফেল। একদিন বিয়েটিয়ে হবে। রান্নাবান্না না জানলে বিয়ে দেয়াই যাবে না, হা হা হা।অনেক দিন পর বাবা হাসলেন। মানুষের হাসির মতো সুন্দর কি কিছু আছে? বাবার হাসির সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে রোদ ঝলমল করে উঠল।

মা একটা কথা সব সময় বলতেন, মানুষ যখন হাসে তখন তার সঙ্গে সমস্ত পৃথিবী হাসে। কিন্তু সে যখন কাঁদে, তার সঙ্গে আর কেউ কাঁদে না। কাঁদতে হয় একা একা।চা বানাতে বানাতেই শুনলাম সেতারা গলা সাধা শুরু করেছে। নিসা গামা পামা গামা। গামা পামা গারে সা। গান-টান কিছু না, সামান্য সারে গামা, কিন্তু কি যে ভাল লাগছে শুনতে।বাবাকে চা নিয়ে দিতেই বাবা বললেন, ভাবছি তোদের নিয়ে কোথাও ঘুরেটুরে আসব। যাবি নাকি? কোথায়?

গারো পাহাড়ে গেলে কেমন হয়? জাড়িয়া জঞ্জাইল লাইনে বেশি দূর হবে না। ছয়-সাত ঘণ্টা লাগবে ট্রেনে। বন বিভাগের একটা রেস্ট হাউস আছে। যাবি নাকি?যাব বাবা।জায়গাটা সুন্দর। রাতের বেলা একটু ভয় ভয় লাগে।কেন? বন্য হাতির শব্দটব্দ পাওয়া যায়। এখন বোধ হয়। আর সে রকম নেই। তোরা যদি যেতে চাস তাহলে একটা প্রোগ্রাম করি। যাবে কবে? দুই দিনের মাত্র ব্যাপার, একটা তারিখ করলেই হয়। তুই নীলুকে জিজ্ঞেস করে আয় ও যাবে কি-না।

নীলু সব শুনে লাফিয়ে উঠল। বেড়ানোর ব্যাপারে নীলুর মতো উৎসাহী আর কেউ নেই। গারো পাহাড় দেখতে যাওয়া হবে শুনেই তার সব রাগ পড়ে গেল। নানান রকম পরিকল্পনা করে ফেললাম আমরা। যেমন শম্পাদের ক্যামেরাটা নিয়ে যাব এবং খুব ছবি তুলব। সেখানে আমরা দুজনেই শাড়ি পরব। এবং এই উপলক্ষে বাবাকে বলব দুটি শাড়ি কিনে দিতে। বন বিভাগের রেস্ট হাউসে রাতের খাবার-টাবার হয়ে যাবার পর বাবাকে বলব। গল্প বলার জন্যে। বাবা অবশ্যি গল্পটল্প তেমন বলতে পারে না। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না।

অনেক রাত পর্যন্ত আমরা হারিকেন জ্বলিয়ে বসে। থাকব। হারিকেনের আলো কী যে ভাল লাগে আমার।একেকটা দিন এমন অন্যরকম হয়। মনে হয় দুঃখ-টুঃখ সব বানানো ব্যাপার। চারদিকে শুধু সুখ এবং সুখ। সন্ধ্যাবেলা আমরা দুবোন শাড়ি পরে বারান্দায় হাঁটছি, নজমুল চাচা ডেকে পাঠালেন।কিরে বেটিরা শুনলাম দল বেঁধে নাকি পাহাড়ে যাচ্ছিস? জি চাচা।তা আমাকে একবার জিজ্ঞেস পর্যন্ত করিল না? আমারও তো পাহাড়-টাহাড়ে যেতে ইচ্ছে করে।সত্যি সত্যি যাবেন আমাদের সাথে?

এরকম পরীর মতো মেয়েদের পাহারা দিয়ে রাখার জন্যেও তো লোকজন দরকার।পরের কয়েকটি দিন আমাদের দারুণ উত্তেজনার মধ্যে কাটল। একদিন শুনলাম বন বিভাগের ডাকবাংলোটা পাওয়া গেছে। তারপর দিন-ক্ষণ ঠিক হল। নতারিখে ভোরের ট্রেনে যাব, পৌঁছব বিকাল নাগাদ। নজমুল চাচা যাবেন। রমজান যাবে। বাবার প্রেসের একজন কম্পোজিটর মাখন মিয়া সেও যাবে। কারণ মাখন মিয়ার বাড়ি ঐ অঞ্চলে, সে সব খুব ভাল চেনে।

আট তারিখ রাতে বাবা বাড়ি ফিরলেন না। রাত একটায় নজমুল চাচা খোঁজ নিতে গেলেন। আমরা তিন বোন বসার ঘরে বসে রইলাম চুপচাপ। নজমুল চাচা ফিরলেন দুটার দিকে এবং হালকা গলায় বললেন, কাজে আটকা পড়ে গেছে, সকাল বেলাতেই চলে আসবে। ঘুমিয়ে পড়! নীলু, শান্ত স্বরে বলল, বাবার কি হয়েছে বলেন?

কি আবার হবে। কাজ থেকে না মানুষের? নজমুল চাচা রেগে গেলেন। নীলুও রেগে গেল।বাবার কি হয়েছে বলেন।কাল সকালে আসবে, তখন জিজ্ঞেস করিস। কিছু হয়নি, ভালই আছে।নীলু তেজী গলায় বলল, আপনাকে এখন বলতে হবে।এরকম করে তুই আমার সঙ্গে কথা বলছিস কেন?

নীলু কেঁদে ফেলল। বাবা ফিরলেন। পরদিন দুপুরে। কোর্ট থেকে জামিনে ছাড়া পেয়ে। তার রাত কেটেছিল থানা হাজতে। মদ খেয়ে খুব নাকি হৈচৈ করছিলেন বা এই জাতীয় কিছু। খুবই কেলেংকারি ব্যাপার। আমরা সপ্তাহখানেক কেউ স্কুলে গেলাম না। ঠিক করলাম বাবার সঙ্গে কেউ কোনো কথা বলব না। ডাকলেও সাড়া দেব না। এমন ভাব করব যেন শুনতে পাইনি। কোনো লাভ অবশ্যি তাতে হল না। বাবা আমাদের ডাকাডাকি বন্ধ করে দিলেন। যতক্ষণ বাসায় থাকেন। চুপ করে থাকেন।

একদিন দেখি একটি টেলিভিশন কিনে আনলেন। সেতারার খুব সখ ছিল টিভির। কথা ছিল সেতারা আগামী জন্মদিনে ঢাকা থেকে এটি কিনে আনা হবে এবং সেই উপলক্ষে আমরা সবাই দল বেঁধে ঢাকা যাব। তিনি বোধ হয় আমাদের সঙ্গে ভাব করবার জন্যেই আগে-ভাগে কিনে ফেললেন। সন্ধ্যাবেল টিভি চালু হল। আমরা কেউ দেখতে গেলাম না। আকবরের মা এবং রমজান ভাই মোড়া পেতে টিভির সামনে রাত এগারটা পর্যন্ত বসে রইল।

বাবার কাছ থেকে অনেক দূরে সরে গেলাম আমরা। সেই সময় বড় মামার চিঠিতে জানলাম মার একটি ছেলে হয়েছে। ছেলের নাম কাজল।মায়ের শরীর খুব খারাপ। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আছেন। কি যে কষ্ট হল আমার। কত লক্ষ বার যে বললাম–মা ভালো হয়ে যাক। মাকে ভাল করে দাও। রোজ রাতে তাকে স্বপ্নে দেখতাম। রক্তশূন্য একটি লম্বাটে ফরসা মুখ। চাদর দিয়ে গলা পর্যন্ত ঢাকা। স্বপ্ন দেখে রোজ রাতেই কান্দতাম। আমরা তিন বোনই নিশ্চিত ছিলাম মা মারা যাবেন। কিন্তু তিনি সুস্থ হয়ে উঠলেন।

চিঠি লিখল মা নীলুকে। নীলু তার কোনো চিঠি আমাকে পড়তে দেয় না। কী লেখা ছিল সে চিঠিতে তা জানলাম না। নীলু শুধু বলল, কাজল খুব বিরক্ত করে রাতে মাকে মাতে দেয় না।এস.এস.সি. পরীক্ষায় খুব ভাল রেজাল্ট করলাম। এত ভাল যে সেলিনা আপা একদিনের জন্যে স্কুল ছুটি দিলেন। এবং একটি গোন্ড মেডেল দেবার ব্যবস্থা করলেন। খায়রুন্নেসা গোন্ড মেডেল। খায়রুন্নেসা তার মায়ের নাম। এই গোন্ড মেডেলটি সেবারই প্রথম ঘোষণা করা হল।

আমাদের স্কুলের কোনো ছাত্রী যদি এস.এস.সি. পরীক্ষায় সমস্ত বোর্ডে প্রথম তিনজনের মধ্যে থাকতে পারে তবেই সে এই গোন্ড মেডেল পাবে। ময়মনসিংহ ডিস্টিক্ট বোর্ড থেকে আমাকে পাঁচশ টাকা দেয়া হল। শুধু তাই না, একদিন সকালবেলা একজন স্থানীয় সংবাদদাতা আমার ইন্টারভ্যু নিতে এলেন। নজমুল চাচার উৎসাহের সীমা নেই। শাড়ি খুলে একটা কামিজ-টামিজ পর, বয়স কম দেখা যাবে। কানের দুলগুলি খুলে ফেল তো, ভাল ছাত্রীদের এই সব গয়না-টয়না মানায় না। মুখে হালকা করে পাউডার দে।

ইন্টারভ্যু পর্ব সমাধা হতে অনেক সময় লাগল। বেশির ভাগ প্রশ্নের উত্তর দিতে লাগলেন নজমুল চাচা। যেমন ভদ্রলোক যখন জিজ্ঞেস করলেন, দৈনিক কঘণ্টা পড়াশুনা করতে? আমি কিছু বলার আগেই নজমুল চাচা বললেন, ঘণ্টার কি কোনো হিসাব আছে ভাই? রাতদিনই পড়ছে। যখনই দেখি তখনি মুখের ওপর একটা বই। হা হা হা।

নজমুল চাচা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, এই মেয়ের প্রাইভেট টিচার লাগে। কী যে বলেন ভাই।কথাটি পুরোপুরি মিথ্যা। আজিজ স্যার আমাকে আর নীলুকে সপ্তাহে চারদিন অংক করাতেন। নলিনীবাবু স্যার পড়াতেন ইংরেজি।পাঠ্য বই ছাড়া বাইরের বই কেমন পড়েছ তুমি?

বাইরের বইতো বেশি পড়েছে। রবীন্দ্রনাথ টলস্টয় সব আপনার নিচের ক্লাসেই পড়ে শেষ করেছে। হা হা হা।ইন্টারভ্যু হল আসলে নজুমলা চাচার সঙ্গে। আমি শুধু হাসিমুখে তার পাশে রইলাম। এবং সেই ইন্টারভ্যু খানিকটা ছাপাও হল একটি ইরেজি পত্রিকায়। তার পরপরই একটি চিঠি পেলাম আমরা দু বোন।কল্যানীয়াষু নীলু অথবা বিলু তোমাদের দুবোনের একজনের ছবি দেখলুম। পত্রিকায়। ছবির সঙ্গে ডাকনাম দেয়া ছিল না। কাজেই বুঝতে পারছি না ছবিটি কার?

যার ছবি তার জন্যে আমার আন্তরিক অভিনন্দন। মফস্বলের একটি স্কুল থেকে এমন চমৎকার রেজাল্ট করা দারুণ ব্যাপার। আমার খুবই ভাল লাগছে। এর মধ্যে একবার ময়মনসিংহ এসেছিলাম। তোমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে গিয়েছি। গেট বন্ধ ছিল। কাজেই ভেতরে আর ঢুকিনি। পরে ভেবেছি গেট খুলে ঢুকলেই হত।অনেক সময় আমরা যা করতে চাই করতে পারি না। কেন পারি না তাও জানি না। পরে তা নিয়ে কষ্ট পাই। ঠিক না?

আমরা কেন যেন মনে হচ্ছে তোমরা দুবোন আমার চিঠি পড়ে খুব হাসবে। অবশ্যি একটি ক্ষীণ আশা যে এই চিঠি তোমাদের হাতে পৌঁছবে না। কারণ তোমাদের ঠিকানা আমার জানা নেই। শুধু জানি তোমাদের দুবোনের একজন হচ্ছে নীলু, একজন বিলু এবং তোমাদের বাড়িটির নাম উত্তর দীঘি। এ রকম সংক্ষিপ্ত ঠিকানায় চিঠি যাওয়ার কথা নয়। ঠিক না? রকিব হাসান কত অসংখ্যবার যে সেই চিঠি আমি পড়লাম। প্রতিবারই আমার মনে হয়েছে এই চিঠিতে যা লেখা হয়েছে তার বাইরেও কিছু আছে। আর একবার পড়লেই তা বোঝা যাবে।

চিঠিটি নজমুল চাচাও পড়লেন এবং বললেন, বিশিষ্ট ভদ্রলোক। খুব আদব-কায়দা। একটা ভাল সংবাদ পেয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে চিঠি দিয়েছে। এইসব ভদ্রতা কি দেশে আজকাল আছে। সং শুনলে লোকজন আজকাল বিরক্ত হয়। মা সুন্দর করে গুছিয়ে একটা চিঠি লেখ। বানান ভুল যেন না। থাকে। সাবধান! ডিকশনারি দেখবে। আর শোন, এই চিঠি যত্ন করে তুলে রাখবে। রেজাল্ট নিয়ে যত চিঠি যত টেলিগ্রাম আসবে সব তুলে রাখবে। আলাদা একটা ফাইল করে রাখবে। আমি অফিস থেকে ফাইল নিয়ে আসব।

নীলু চিঠিটার শুরুটা পড়েই গম্ভীর মুখে বলল, তোর চিঠি আমাকে দিচ্ছিস কেন? আমি অন্যের চিঠি পড়ি না।পড়া যাবে না। এমন কিছু এখানে লেখা নেই।না থাকুক।নীলু পাশ ফিরে বালিশে মুখ ঢাকল। তার বেশ কদিন ধরে জ্বর যাচ্ছে। তেমন কিছু নয়, কিন্তু বিছানা ছেড়ে উঠছে না। আমার ধারণা, সে আশা করেছিল তার রেজাল্ট অনেক ভাল হবে। রেজাল্ট মোটেও ভাল হয়নি। ফাস্ট ডিভিশন দেখা শেষ করে আমরা যখন সেকেন্ড ডিভিশন দেখতে শুরু করেছি। সে তখন দৌড়ে পালিয়েছে। নজমুল চাচা তাকে পাসের খবর দিতেই সে কেঁদে-টেদে একটা কাণ্ড করেছে।

পরের বার অনেক ভাল হবে দেখবি।আর দেখতে হবে না।সবাই কি আর ফাস্ট-সেকেন্ডে হয় নাকি রে বোকা? আমি নিজে তিন বারের বার মেট্রিক পাস করলাম। কিন্তু আইএ-তে আবার ফাস্ট ডিভিশন।থাক, আপনাকে আর বকবক করতে হবে না।বাবা নিজে এসেও সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করলেন।আরো সেকেন্ড ডিভিশন খারাপ নাকি? খারাপ হবে কেন? খুব ভাল, তুমি যাও তো এখন।

নীলুকে আমরা খুব শক্ত মেয়ে হিসেবে জানতাম। এই ব্যাপারটায় যে সে এতটা মন খারাপ করবে ভাবতেও পারিনি। কিছু দিন পরই সে জুরে পড়ে গেল। অল্পদিনের জুরেই শুকিয়ে-টুকিয়ে অন্য রকম হয়ে গেল। এক রাতে ঘুমুতে এল আমার ঘরে; একা একা তার নাকি ভয় লাগছে। কে যেন বারবার তার জানালার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। আমরা দু’জন অনেকদিন পর একসঙ্গে ঘুমুতে গেলাম। সেতারা শুয়েছে একা একটি খাটে। আমরা দু’জন একটিতে। আমি নরম স্বরে বললাম, এত মন খারাপ করেছিস কেন?

জানি না কেন।ভুক্তি পড়াশোনাই কািরসন, রেজাল্ট কোথেকে ভাল হবে।তা ঠিক।নীলু একটি হাত আমার গায়ের ওপর রেখে বলল, দু’জন এবার আলাদা হয়ে যাব; তুই যাবি ঢাকায় আর আমি এখানে কোনো ভাঙা কলেজে।আমি ঢাকায় যাব না, এইখানে থাকব।তুই ঢাকায় পড়তে যাবি একটা তো জনা কথা। সেটাই ভাল। তুই এত ভাল ছাত্রী, তোর তো ভাল কলেজেই যাওয়া উচিত।

আমরা দু’জন হালকা গলায় নানান কথাবার্তা বলতে লাগলাম। অনেক রাতে শুনলাম বাবা ঘরে ফিরেছেন। গুনগুন করে কি বলছেন। রমজান ভাই রাগী গলায় কি-সব বলছেন। নীলু ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, চল ঘুমিয়ে পড়ি।প্রায় ঘুমিয়েই পড়েছি, তখন নীলু বলল, বিলু একটা কথা। জেগে আছিস তো?আমার গা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করতে হবে তোকে।কী প্রতিজ্ঞা?

নীলু চুপ করে রইল। আমি অবাক হয়ে বললাম, কীসের প্রতিজ্ঞা? ঢাকায় গিয়ে রকিব ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে পারবি না।এসব কি বলছিস, আমি দেখা করব কেন? আর ওর চিঠির জবাব দিবি না।আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। নীলু, কাঁদতে শুরু করল। ফোঁপাতে ফোপাতে বলল, কথা দে আমাকে আমার গা ছুঁয়ে বল।কী যে কাণ্ড তোর!আমি নীলুকে জড়িয়ে ধরলাম। এমন বোকা কেন নীলুটা?

সেদিন আকাশের রঙ ছিল ঘন নীল।আমরা এমনিত কখনো আকাশ দেখি না। আমরা আকাশের দিকে তাকাই মন খারাপ হলে। মন বিষন্ন হলে আকাশও বিষন্ন হয়। হেমন্তের এই ঝকঝকে সকালে আকাশটা অসম্ভব বিষন্ন হয়ে গেল। আমি তবু মুখে হাসি টেনে রাখলাম। ভোরবেলা নাশতা খাবার সময় খুব হাসিখুশি থাকতে চেষ্টা করলাম। নজুমলা চাচাও আজ আমাদের সঙ্গে নাশতা খেলেন।

নীলু বসে রইল পাথরের মত মুখ করে। বাবা একবার সাবধানে চলাফেরার কথা বললেন।একা একা কোথাও যাবার দরকার নেই। কোথাও যেতে হলে বন্ধু-বান্ধব কাউকে সঙ্গে নিবি।নজমুল চাচা বললেন, চিন্তার কিছু নেই, সফদর সাহেব প্রতি শুক্রবারে এসে বাসায় নিয়ে যাবেন। আর ছুটি ছাটা হলো নিজে ময়মনসিংহে এসে পৌঁছে দেবেন। অতি ভদ্র সজ্জন ব্যক্তি।

আমি তাদের কথায় হা-না কিছুই বললাম না। ঠিক যখন যাবার সময় হল তখন ইচ্ছে করল। চেঁচিয়ে বলি–আমি এইখানেই থাকব। এখানকার কলেজে ভর্তি হব। কিছুই বলা হল না।নজমুল চাচা আমাকে সঙ্গে নিয়ে ট্রেনে উঠলেন। ট্রেন ছাড়তে খুব দেরি করতে লাগল। বাবা প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে রইলেন ক্লান্ত ভঙ্গিতে। নীলু সেতারা কেউ আসেনি। ওরা খুব কাদছিল। বাবা বলেছিলেন, তোরা আসিস না। তোরা থাক এখানে। আর এত কান্নাকাটির কি আছে। দুই মাস পরে তো আসছেই।

ট্রেন ছেড়ে দেবার সময় বাবা মনে হল খুব অবাক হয়ে পড়েছেন। যেন ভাবতে পারেননি ট্রেন এক সময় ছেড়ে দেবে। তিনি জানোলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে আমার বা হাত শক্ত করে চেপে ধরে ট্রেনের সঙ্গে সঙ্গে আসতে লাগলেন। নজমুল চাচা বললেন, আরে কর কি, হাত ছেড়ে দাও। বাবা হাত ছাড়লেন না। যেন শেষমূহুর্তে তার মনে হল আমি চলে যাচ্ছি। তিনি ট্রেনের লোকজন, প্লাটফরমের গাদাগাদি ভিড় সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ফুপিয়ে উঠলেন, আমার আম্মি। আমার রাত্ৰিমণি। ওরে বেটি টুনটুন।

আমি পাথরের মত মুখ করে বসে রইলাম। পৃথিবীতে এত কষ্ট কেন থাকে? কেন এত দুঃখ চারদিকে? জানালার ওপাশে কি সুন্দর সব দৃশ্য। গাঢ় নীল রঙের ডোবা একটি। তার ওপর সাদা মেঘের ছায়া পড়েছে। কঞ্চি হাতে একটি ছোট্ট ছেলে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ট্রেনের দিকে। পাট বোঝাই একটি গরুর গাড়ির চাকা আটকে গেছে। গরুটি ধবধবে সাদা। এক সময় নজমুল চাচা বললেন, ছিঃ মা কাঁদে না।

বিলু,

তোর দুটি চিঠিই পেয়েছি। প্রথমটির জবাব সঙ্গে সঙ্গে লিখেছিলাম। রমজান ভাইকে পোস্ট করতে দিয়েছি। ওমা দুই দিন পরে দেখি তার বাজারের ব্যাগ থেকে চিঠি বেরুল। ভিজে ন্যাত। ন্যাতা! অথচ রমজান ভাই আমাকে বলেছে সে নিজ হাতে চিঠি ফেলেছে। দেখ অবস্থা। তারপর তোমার দুনম্বর চিঠিটি এল। ভাবলাম রাতে জবাব লিখব। রাত ছাড়া চিঠি লিখতে ভাল লাগে না।

কিন্তু রাতে বাবার খুব জ্বর এল। মাথায় পানি ঢালতে হল, ডাক্তার আনতে হল। ডাক্তার বলছেন ম্যালেরিয়া। দেশে কী এখন ম্যালেরিয়া আছে নাকি যে ম্যালেরিয়া হবে। ডাক্তারটির বয়স খুব কম, আমার মনে হয় নতুন পাস করেছে। আমার মত পাস। বইটই ভালমতো পড়েনি। আমার সঙ্গে গম্ভীর হয়ে কথা বলছিল।মিস নীলু, ভয়ের কিছু নেই। আমি আবার এসে দেখে যাব।

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *