একা একা পর্ব – ৪ হুমায়ূন আহমেদ

একা একা পর্ব – ৪

কেউ মারা যাচ্ছে, এটা দেখতে ভালো লাগে না। অনেক বার দেখেছি।আমি চুপ করে রইলাম। বাবুভাই নিচু গলায় বলল, মুখে আমরা অসংখ্য বার বলি মরতে তো হবেই, কিন্তু সত্যি সত্যি মৃত্যু যখন আসে তখন মনটন ভেঙে যায়।বাবুভাই চাদর গায়ে উঠে বসল। ঠাণ্ডা গলায় বলল, আমাদের হাতে এক বার বেলুচ রেজিমেন্টের এক নন-কমিশও অফিসার ধরা পড়ে গেল। হাবিলদার মেজর। ব্যাটাকে আমরা এগার মাইল হাঁটিয়ে মেথিকান্দা নিয়ে এলাম।

ব্যাটার মনে কোনো ভয়ডর নেই। সিগারেট দিই। ভূসভূস করে টানে। চা দিয়েছি, শেষ করে আরেক কাপ চাইল। ব্যাটার সাহসের তারিফ করি মনে মনে।নাম কী ছিল? নাম মনে নেই। নাম দিয়ে দরকার কি? এমনি জিজ্ঞেস করলাম।নাম বাহাদুর খাঁ। ঝিলামের এক গাঁয়ে বাড়ি। দুই ছেলে ছিল–এক জন মটর মেকানিক, অন্য জন নেভিতে।ও।এইসব আমি মনে করতে চাই না। নামধাম দিয়ে কী হয়?

আমি সিগারেট ধরলাম। ক্ষুধা বোধ হচ্ছে ক্ষুধার সময় সিগারেট ভালো লাগে না। বমি-বমি লাগে। বাবুভাই বলল, মেথিকান্দা পৌঁছেই শুনি নতুন করে মিলিটারি রিইনফোর্সমেন্ট আসছে। আমাদের এক্ষুণি পালাতে হবে। ঠিক করা হল, বাহাদুর খাঁকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হবে না।মেরে ফেলা হবে? হুঁ।তারপর?

ব্যাপারটা বুঝতে পারার পর এত বড়ো একটা সাহসী মানুষ ছরছর করে পেচ্ছাপ করে ফেলল, কথা জড়িয়ে গেল। উল্টা-পাল্টা কথা বলতে লাগল।তারপর? এর আবার তারপর কি? বাবুভাই হঠাৎ রেগে গেল। তার সম্ভবত নেশা হয়েছে।আমাদের অভ্যেসই হচ্ছে একটা তারপর খোঁজা। মৃত্যুর আবার তারপর কি?

আমি জবাব দিলাম না। বাবুভাই সিগারেটে টান দিয়ে খকখিক করে খুব কাশতে লাগল। কাশি থামলে কড়া গলায় বলল, আমি মরবার সময় এক জন সাহসী মানুষের মতো মরব।লাভ কি তাতে? লাভ-লোকসান জানি না। সব কিছুতে লাভ-লোকসান খোজা মানুষের আরেকটি অভ্যাস। বাজে অভ্যাস।তুমি শুধু শুধু রাগছ, বাবুভাই।শুধু শুধু রাগছি?

হুঁ।টগর দেখ, তোকে আমি একটি কথা বলে রাখি–মারবার সময় আমি এক জন সত্যিকার সাহসী মানুষের মতো মরব। আরো এক জন বড়ো ডাক্তার আন, এই বলে হৈ-চৈ শুরু করব না।ভালো কথা। শুনে খুশি হলাম।দরজার পাশে খুঁট করে শব্দ হল। বাবুভাই অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ গলায় বলল, কে? কে?

আমি, আমি শাহানা। অন্ধকারে কী করছ? কিছু করছি না। তুমি কী চাও? ভেতরে আসব? না।শাহনা চাপা স্বরে বলল, ঘর অন্ধকার করে বসে আছ কেন?তাতে কারো তো কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।শাহানা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, নানার জ্ঞান হয়েছে, তোমাকে খুঁজছে।ঠিক আছে, যাব।শাহানা কয়েক সেকেণ্ড চুপ করে থেকে বলল, ভালো করে হাত-মুখ ধুয়ে গেলে ভালো হয়।শাহানা নেমে গেল সিঁড়ি দিয়ে। বাবুভাই অস্পষ্ট স্বরে বলল, বেশ তেজী মেয়ে। ঠিক না?

হুঁ।এক জন মেয়ে-মানুষের মধ্যে এরকম তেজ দেখা যায় না।হুঁ।বাবুভাই বিছানা থেকে নামল। ক্লান্তস্বরে বলল, শরীর খারাপ লাগছে। গলায় আঙুল দিয়ে বমি করব।যা করবার তাড়াতাড়ি কর, দাদা তোমাকে ডাকছে।তোকে আরেকটা কথা বলতে চাই। বেশ জরুরী।পরে বলবে।কথাটা শাহানা প্রসঙ্গে।

দাঁড়িয়ে থাকলেই বাবুভাই কথা বলবে। আমি নিঃশব্দে বের হয়ে এলাম। শাহানা প্রসঙ্গে বাবুভাইয়ের কী বলার থাকতে পারে, তা ঠিক বোঝা গেল না। শাহানা সেই জাতীয় মেয়ে, যাদের প্রসঙ্গে কারো কিছু বলার থাকে না। এদের চোখের দৃষ্টি হয় শীতল, হৃদয়ও থাকে। শীতল। এরা শান্ত ভঙ্গিতে সংসারের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করে। আমাদের বুড়ো সম্রাট শাহজাহানের কাছে সারা দুপুর বসে থাকে জাহানারা সেজে। যখনই প্রয়োজন মনে করে, তখনি গলার স্বর অস্বাভাবিক শীতল করে আমাকে উপদেশ দিতে আসে। যেমন দিন সাতেক আগে হঠাৎ আমাকে এসে বলল, গতকাল নীলুর সঙ্গে কী কথা হচ্ছিল তোমার?

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, কেন?

দেখলাম নীলু। খুব হাসছে।

জোক বলছিলাম একটা। মজার গল্প।

কি জোক?

তার দরকারটা কী?

দরকার আছে। একটা কাঁচা বয়সের মেয়ে। ওর সঙ্গে তোমার এত মাখামাখি করা ঠিক না।

অসুবিধাটা কোথায়?

অল্পবয়েসী মেয়েরা অতি সহজেই উইকিনেস গ্রো করিয়ে ফেলে এবং পরে কষ্ট পায়। গরিব-দুঃখী মানুষের মেয়ে, এদের নিয়ে ছেলেখেলা করা ঠিক না।

তাই বুঝি?

হুঁ।

শাহানা আমাকে দ্বিতীয় কথা বলার সুযোগ না দিয়ে উঠে চলে গেল।

রাগে গা জ্বলতে লাগলো আমার।

ছোটফুফু চলে এসেছেন। সঙ্গে অল্পবয়স্ক মৌলবী এক জন। লোকটির মাথায় বেতের একটা টুপি। অত্যন্ত ফর্স একটা পাঞ্জাবি আছে গায়ে। (এই জাতীয় লোকদের গায়ে সাধারণত এত ফর্সা জামাকাপড় থাকে না।) পায়ে স্পঞ্জের স্যাণ্ডেলের বদলে পরিষ্কার একজোড়া চটি জুতো। লোকটি বারান্দায় একটা হাতলওয়ালা চেয়ারে চুপচাপ বসে আছে। মাঝে মাঝে ঠোঁট নড়ছে দেখে বোঝা যায়, কিছু একটা পড়ছে মনে মনে। আমাকে দেখে অত্যন্ত পরিচিত ভঙ্গিতে বলল, আসসালামু আলায়কুম। ভালো আছেন?

আমি জবাব না দিয়ে দাদার ঘরে ঢুকে পড়লাম। ঘর ভর্তি মানুষ। দাদা আমাকে ঢুকতে দেখেই বললেন, কে? বাবু? জ্বি-না, আমি টগর।ও তুই। বাবু কই? আসছে।বড়োচাচা হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, লাটসাহেবের হয়েছেটা কি? এতক্ষণ লাগে?

দাদা শান্ত স্বরে বললেন, চিৎকার করিস না। আসুক। ধীরেসুস্থে। তাড়া নেই কোনো! ছোটচাচা বললেন, সন্ধ্যা থেকে তাকে দেখি না, সে আছে কোথায়? দাদা ক্লান্ত স্বরে বললেন, আমার শখ ছিল বাবুর একটা বিয়ে দিয়ে যাই।বড়োফুফু। সঙ্গে সঙ্গে বললেন, বাবু এখন বিয়ে করবে কি? রোজগারপাতি কোথায়?

দাদা বিরক্ত চোখে তাকালেন। বড়োফুফু বললেন, ফরিদের বিয়ে দেওয়া দরকার। ওর বিয়েটা নিজে দাঁড়িয়ে দিয়ে যান। আপনার শরীরটা একটু সুস্থ হলেই কথাবার্তা ফাইনাল করব। জাস্টিস বি. করিম সাহেবের ছোট মেয়ের সঙ্গে কথাবার্তা হচ্ছে……।

দাদা ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, বাবু কোথায়? তাঁর ফর্সা কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে, নিঃশ্বাস নিতে বোধহয় কষ্ট হওয়া শুরু হয়েছে আবার।দাদা বললেন, তোমরা কেউ একটা গামছা দিয়ে মুখটা মুছিয়ে দাও।ছোটফুফু, দৌড়ে রুমাল ভিজিয়ে আনলেন। প্রদ্যোত বাবু বললেন, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে? হুঁ।অক্সিজেনের ব্যবস্থা হচ্ছে। অক্সিজেন দেওয়া শুরু হলেই আরাম হবে।ডাক্তার, শান্তিতে মরতে দাও। ঝামেলা করবে না।ছোটফুফু বললেন, এইসব কথা কেন বলছেন বাবা?

মা, সময় শেষ হয়ে এসেছে।ছোটফুফু, চোখ মুছতে লাগলেন। বাবুভাই এলেন সেই সময়। দাদা হাত ইশারা করলেন। বসতে বললেন তাঁর কাছে। ক্লান্ত স্বরে বললেন, সবাই আছে। এইখানে? বড়োচাচী বললেন, জ্বি আছে। দাদা মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখলেন, ছোটন কোথায়?

ছোটন হচ্ছে আমার ছোটচাচী, দাদার খুব প্রিয়পাত্রী। বড়োফুফু, বললেন, ছোটন গেছে চিটাগাং। কী যে এদের কাণ্ড! এমন অসুখবিসুখের মধ্যে কেউ বাইরে যায়? ছোটচাচা বললেন, সে কাল আসবে। দাদা বললেন, কাল পর্যন্ত আমার সময় নেই। তোমরা কেউ গিয়ে আলমারি খোল।

বড়োফুফু বললেন, বাইরের লোকজন না থাকাই ভালো। এই মেয়ে, নীলু না তোমার নাম? তুমি বাইরে যাও।দাদার ভ্রূকুঞ্চিত হল। তিনি কিছুই বললেন না। প্রদ্যোত বাবুও উঠে দাঁড়ালেন, আমি বারান্দায় গিয়ে বসছি।আলমারি খোলা গেল না। বড়োচাচা এদিক-সেদিক নানাভাবে চাবি ঘোরালেন। দরজা ঝাঁকালেন। কিছুতেই কিছু হল না। দাদা ক্লান্ত স্বরে বললেন, তুই কোনোদিনই কিছু পারলি না। চাবিটা রহমানের কাছে দে।

বড়োচাচা চাবি দিলেন না। আবার ঝাঁপিয়ে পড়লেন আলমারির দরজার গায়ে, যেন এটা খোলার উপর তাঁর বাঁচা-মরা নির্ভর করছে। দেখতে–দেখতে তাঁর কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘম পড়তে লাগল। তিনি ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলেন। বড়োফুফু, অধৈৰ্য হয়ে বললেন, দেখি, চাবিটা দাও আমার কাছে। বড়োচাচা দিলেন না। চোখ ছোট করে তাকালেন। যেন কথাবার্তা কিছু বুঝতে পারছেন না। বাবুভাই বললেন, ফুফু, বাবাকে খুলতে দিন। বড়োফুফু। ফোঁস করে উঠলেন, সে এটা খুলবে কীভাবে? তার সে-বুদ্ধি থাকলে তো কাজই হত।

একটা সামান্য ব্যাপারে আবহাওয়া বদলে গেল। বড়োচাচা এমন করতে লাগলেন, যেন স্টীলের আলমারি খুলতেই হবে। আমি লক্ষ করলাম, তাঁর হাত কাঁপছে। ফুফু বিরক্তির একটা শব্দ করলেন। বড়োেচাচার চোখের দৃষ্টি অপ্রকৃতিস্থ মানুষের মতো হয়ে গেল। জীবনে তিনি অসংখ্য বার পরাজিত হয়েছেন, কখনো কিছুমাত্র বিচলিত হন নি। আজ তাঁর এরকম হচ্ছে কেন কে জানে?

তুলনামূলকভাবে দাদা অনেক স্বাভাবিক। তিনি যেন কৌতূহলী হয়ে বড়োচাচার কাণ্ড লক্ষ করছেন। বড়োচাচা এক সময় ছুটে ঘর ছেড়ে চলে গেলেন। দাদা লম্বা একটি নিঃশ্বাস ফেলে মিনুকে ডাকতে লাগলেন। তাঁর চোখের দৃষ্টি বদলে গেল। মনে হল তিনি যেন স্পষ্ট দেখছেন মিনু ছোট ছোট পা ফেলে ঘরময় হেঁটে বেড়াচ্ছে। দাদা অবাক বিস্ময়ে তার হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে দেখছেন। তিনি এক বার বললেন, কেমন আছ আম্মা বেটি?

বলার পরপরই দাদার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। যেন মেয়েটি চমৎকার কোনো উত্তর দিয়েছে। আমার একটু ভয়-ভয় করতে লাগল। বাবুভাই বললেন, ডাক্তার সাহেবকে ডাকা দরকার। তার কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে দাদা হাঁপাতে শুরু= করলেন। অদ্ভুত একটা শিস দেবার মতো শব্দ হতে লাগল। প্রদ্যোত বাবু দৌড়ে ঘরে এসে ঢুকলেন। বাইরে গাড়ির শব্দ হল। অক্সিজেন ইউনিট নিয়ে ওরা বোধহয় এসে পড়েছে। আমি বাবুভাইয়ের পেছন-পেছন ঘর ছেড়ে বাইরে চলে এলাম। মৌলবী লোকটি তখনো চেয়ারে ঠিক আগের মতো বসে আছে। দোয়াটোয়া পড়ছে হয়তো। তার ঠোঁট কাঁপছে দ্রুত ভঙ্গিতে। বাবুভাই কড়া গলায় বলল, কে আপনি?

লোকটি হকচকিয়ে গেল। বাবু ভাই দ্বিতীয় বার বলল, কে আপনি?

প্রশ্নের উগ্র ধরন দেখেই হয়তো লোকটি অবাক হয়ে উঠে দাঁড়াল।

আমি বললাম, উনি এক জন কোরানে হাফেজ।

কোরানে হাফেজ? গোটা কোরান শরিফটা মুখস্থ করেছেন?

জ্বি জনাব।

কী উদ্দেশ্যে করেছেন?

বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে করি নাই।

বাবুভাই বিরক্তির স্বরে বলল, এক সময় এটার দরকার ছিল। মুখস্থ করে মনে রাখতে হত, কিন্তু এখন আর দরকার নেই। কোরান শরিফ পাওয়া যায়। বুঝলেন? জ্বি, বুঝলাম। তবে জনাব, শখ করে অনেকে অনেক কিছু করে। আমি এক জনকে চিনতাম, সে একটা গোটা কবিতার বই মুখস্থ করেছিল।বাবুভাই একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। লোকটি মৃদু স্বরে বলল, শখ করে অনেকে অনেক কিছু করে।

আপনি ঠিক বলেছেন। কিছু মনে করবেন না।

জ্বি না, কিছু মনে করি নাই।

আপনার নাম কি?

মোহাম্মদ ইসমাইল।

ইসমাইল সাহেব, আপনাকে চা দিয়েছে?

আমি চা খাই না।

আপনি কি আমার দাদার জন্য দোয়া করছেন?

জ্বি জনাব, করছি। আপনারাও করেন।

ইসমাইল সাহেব বসে পড়ল। অপূর্ব সুরেলা গলায় কোরান পড়তে শুরু করল। যার এত সুন্দর গলা, সে কেন এতক্ষণ মনে মনে পড়ছিল? বাবুভাই অনেকক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। শাহানাও ভেতর থেকে বাইরে এসে দাঁড়াল। সে মাথায় কাপড় দিয়েছে। সে দেখলাম তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে বাবুভাইয়ের দিকে। যেন কিছু বুঝতে চেষ্টা করছে। ঘরের ভেতর থেকে দাদার গলা শোনা গেল। অন্য রকম আওয়াজ।

শুনলেই মনে হয় তাঁর বুকের উপর পাথরের মতো ভারি কিছু একটা চেপে বসেছে। প্রাণপণ চেষ্টা করেও সেটা সরান যাচ্ছে না। ছোটফুফু, কাঁদতে শুরু করেছেন। এই প্রথম বোধ হয় এ বাড়ির কেউ কাঁদল। কান্না খুব ছোঁয়াচে, এক্ষুণি অন্য সবাই কাঁদতে শুরু করবে। আমাদের এ বাড়িতে কোনো শিশু নেই। কেউ এখানে কাঁদে না। দীর্ঘ দিন পর এ বাড়ির মানুষেরা চোখ মুছবে।ছোটফুফু পাংশু মুখে বাইরে এসে বললেন, টগর, একটা জায়নামাজ দে তো, নিরিবিলিতে একটা খতম পড়বা।

আমি বললাম, ফুফা আসবেন না? আসবে হয়তো। খবর পেয়েছে।কোথায় বসে দোয়া পড়তে চান? তিনতলায় যাবেন? কেউ নেই। কিন্তু তিনতলায়।তাতে কী হয়েছে? ভয়টয় পেতে পারেন।ভয় পাব। কী জন্যে? কী সব কথাবার্তা বলিস! ছোটফুফু অত্যন্ত বিরক্ত হলেন। আমাদের এই বংশের সবাই অল্পতেই বিরক্ত হয়। অল্পতে রেগে ওঠে।সিঁড়ি দিয়ে উঠতে-উঠতে ছোটফুপু বললেন, বাবা আজ রাত্ৰেই মারা যাবেন!কেমন করে বলছেন?

ঘরে ঢুকেই আমার মনে হল। ঘরে মৃত্যু বসে আছে।আমি চুপ করে রইলাম। ছোটফুফু বললেন, কবিরের এই দোঁহাটা পড়েছিস।কোনটা? জন্মের সময় শিশুটি কাঁদে, তার আশেপাশের সবাই আনন্দে হাসে। আর মৃত্যুর সময় যে মারা যাচ্ছে সে হাসে, অন্য সবাই কাঁদে।কথাটা ঠিক নয় ফুফু।ঠিক না? ঠিক না কেন?

যে মারা যাচ্ছে সে আরো বেশি কাঁদে। কেউ মরতে চায় না।ছোটফুফু উত্তর দিলেন না। তবে তিনি বিরক্ত হয়েছেন বোঝা যাচ্ছে–তাঁর ভ্রূ কুঞ্চিত। চোখ তীক্ষ্ণ।তেতিলায় গিয়ে ফুফুর ভাবান্তর হল। আমার মনে হল তিনি একটুখানি ভয় পেলেন। আমাকে বললেন, উপরটা দেখি খুব চুপচাপ। কেউ নেই মনে হচ্ছে।জ্বি, সবাই নিচে।তুই বারান্দায় একটু বসে থাক, দোয়াটা পড়তে আমার বেশি সময় লাগবে না।ঠিক আছে, বসছি।

বারান্দায় এসে বসামাত্র রূপরূপ করে বৃষ্টি পড়তে লাগল। আকাশে যে মেঘ করেছে লক্ষই করি নি। দমকা বাতাস দিতে লাগল। পাঁচটা কাঠি নষ্ট করবার পর সিগারেট ধরান গেল। বসে থেকে শুনলাম, ছোটফুফু উঁচু গলায় কী-একটা দোয়া পড়ছেন। বেশ কিছু দিন ধরেই ছোটফুফু ধর্ম-টর্মের দিকে অস্বাভাবিক ঝুকেছেন! দুই বার গিয়েছেন আজমীর শরিফ। মগবাজারের কোন এক পীর সাহেবের কাছে মুরিদ হয়েছেন। ঘোমটা ছাড়া কোথাও বের হন না। ধর্মে এই অস্বাভাবিক মতির পেছনের কারণ হচ্ছে আমাদের ছোটফুফা।

এক দিন খবরের কাগজে একটা বেশ রগরগে খবর ছাপা হল। তের বৎসরের বালিকা পরিচারিকা ধর্ষণের দায়ে গৃহস্বামী গ্রেফতার। প্রথম পৃষ্ঠায় পুরো দুই কলাম জুড়ে খবর। অর্ধেক পড়বার পর অর্থাৎকে উঠতে হল-গৃহস্বামী আমাদের ছোটফুফা। কোনো পরিচিত ব্যক্তির সম্পর্কে এই ধরনের খবর ছাপা হতে পারে, তা আমার ধারণার বাইরে ছিল। কী সর্বনাশ!

ছোটফুফু দশটার দিকে এসে আমাদের বোঝাতে চেষ্টা করলেন যে, ব্যাপারটা একটা ষড়যন্ত্র। ফুফা নাকি সে-রাতে সন্ধ্যা থেকেই তাঁর সঙ্গে ছিলেন। ছোটফুফু এত চোখের জল ফেলতে লাগলেন যে আমরা প্ৰায় বিশ্বাস করে ফেললাম ব্যাপারটা ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু দাদা গম্ভীর স্বরে বললেন, এ হারামজাদাটা যেন আমি জীবিত থাকা অবস্থায় এ বাড়ি না। আসে। ছোটফুফু কাঁদতে-কাঁদতে বললেন, আপনি আমার কথা বিশ্বাস করলেন না?

দাদা বললেন, তুইও আসবি না এ বাড়িতে।ফুফার কিছুই হল না। হবার কথাও নয়। ফুফাদের এত টাকা পয়সা যে, এইসব ছোটখাট জিনিস তাদের সম্পর্শ করতে পারে না। ঝামেলা হয়। গরিবদের। বড়োলোকদের ঝামেলা কী?

 

Read more

একা একা পর্ব – ৫ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *