প্রতিমা বলল, হ্যাঁ। তবে এ বাড়িতে না। বারিধারায় আমার পাশাপাশি দুটা ফ্ল্যাট আছে-একটায় আপনি থাকবেন, অন্যটায় আমি থাকব। আমি একজন ইনটেরিয়ার ডিজাইনারকে খবর দিয়েছি–সো আপনার ফ্ল্যাটটা আপনার প্রয়োজনমতো সাজিয়ে দেবে। লাইব্রেরি থাকবে, লেখার টেবিল থাকবে।আমাকে গিয়ে তোমার ফ্ল্যাটে উঠতে হবে?
হ্যাঁ। স্যার এ রকম শুকনা মুখ করে তাকালে হবে না। আমি আগামীকাল সকাল নটার সময় আসব। ঝড়-বৃষ্টি-সাইক্লোন-হরতাল যাই হোক না কেন সকাল নটায় আমি উপস্থিত হব।ঠিক আছে।এর মধ্যে আমার লেখাটা পড়ে ফেলবেন। লেখার কিছু কিছু অংশ ভালোমতো দেখে নেবেন। আমি দাগ দিয়ে রেখেছি।তুমি কি এখন চলে যাচ্ছ? প্রতিমা হাসতে হাসতে বলল, হ্যা-তবে কাল দেখা হবে। ঠিক সকাল নটায়। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। লাভ নেই-আপনি নিশ্চয়ই একদিনের মধ্যে বাড়ি বদলাতে পারবেন না?
মিসির আলির মনে হল মেয়েটা পুরোপুরি সুস্থ না। কিছু সমস্যা তার এখনো রয়ে গেছে।মিসির আলি দুপুরের খাওয়া শেষ করে ঘড়ির দিকে তাকালেন, দুটা পঁচিশ বাজে। বিছানায় এসে কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করা যায়। দুপুরের খাবার শেষ করে বই হাতে বিছানায় কত হবার মধ্যে আনন্দ আছে। শরীর ভরা আলস্য, চোখভর্তি ঘুম-হাতে চমৎকার একটা বই। আজ অবশ্যি হাতে বই নেই-প্রতিমা নামের জ্বলন্ত মোমবাতির লেখা বাহান্ন পৃষ্ঠার খাতা। হাতের লেখা না, কম্পিউটারে কম্পোজ করা হয়েছে, স্পাইরেল বাইন্ডিং করা হয়েছে।
হাতের লেখা হলে ভালো হত। মানুষ তার চরিত্রের অনেকখানি হাতের লেখায় প্রকাশ করে। কারো লেখা হয় জড়ানো। একটা অক্ষরের গায়ে আরেকটা অক্ষর মিশে থাকে। কেউ কেউ লেখে গোটা গোটা হরফে। কেউ প্রতিটি অক্ষর ভেবেচিন্তে লেখে। কেউ অতি দ্রুত লেখে। লেখা দেখেই মনে হয় তার চিন্তা করার ক্ষমতা দ্রুত। সে মাথার চিন্তাকে অনুসরণ করছে বলে লেখাও দ্রুত লিখতে হচ্ছে। তবে কেউ কেউ লেখে টিমোতালে।
বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৭
কম্পিউটার মানুষকে অনেক কিছু দিচ্ছে, আবার অনেক কিছু কেড়েও নিচ্ছে। কম্পিউটারের লেখায় কোনো কাটাকুটি নেই। হাতের লেখায় কাটাকুটি থাকবেই। সেই কাটাকুটিই হবে মানুষের চরিত্রের রহস্যের প্রতিফলন। হাতের লেখার যুগ পার হয়েছে। এখন শুরু হয়েছে কম্পিউটারে লেখার যুগ। এই যুগ শেষ হয়ে নতুন যুগ আসবে। কী রকম হবে সেটা?
মানুষ চিন্তা করছে আর সেই চিন্তা লেখা হয়ে বের হয়ে আসবে? সে রকম কিছু হলে মন্দ হয় না। তা হলে সেই যুগ হবে হাতের লেখার যুগের কাছাকাছি। কারণ চিন্তার মধ্যেও কাটাকুটি থাকবে।প্রতিমার লেখার ওপর মিসির আলি চোখ বুলাতে শুরু করলেন। তাঁর কাছে মনে হচ্ছে তিনি কোনো গল্পের বই পড়ছেন। মেয়েটা সে রকম ভঙ্গিতেই লেখার চেষ্টা করছে। লেখার ভঙ্গিটা জার্নালিস্টিক হলে ভালো হত। প্রতিমা লিখছে–
আমার নাম প্রতিমা। এটা কিন্তু কাগজপত্রের নাম না। কাগজপত্রে আমার নাম আফরোজা। যেহেতু আমার মা খুব শখ করে প্রতিমা নাম রেখেছিলেন, এবং আমার বয়স এক বছর পার হবার আগেই মারা গেছেন সে কারণে মার প্রতি মমতাবশত সবাই আমাকে ডাকা শুরু করল প্রতিমা। মুখে মুখে ডাকনাম এক ব্যাপার, কাগজপত্রে নাম থাকা অন্য ব্যাপার।
আকিকা করে আমার মুসলমানি নাম রাখা হল। তবে সেই নামে কেউ ডাকত না। শুধু বাবা মাঝে মধ্যে ডাকতেন। তখন আমি জবাব দিতাম না।আমার বাবা আমাকে অতি আদরে মানুষ করতে লাগলেন। তিনি আদর্শ পত্নীপ্রেমিকদের মতো দ্বিতীয় বিয়ে করেন নি। বাড়িতে মাতৃস্থানীয় কেউ না থাকলে তার কন্যার অযত্ন হবে ভেবে তিনি সাৰ্ব্বক্ষণিক একজন নার্স রাখলেন। ছোটবেলায় এই নার্সকেই আমি মা ডাকতাম।
বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৭
আমার বয়স যখন পাঁচ বছর তখন কী একটা কারণে যেন এই নার্স মহিলাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। শৈশবের এই স্মৃতিটি আমার মনে আছে। এই মহিলা হাউমাউ করে কাঁদছেন এবং বাবার পা জড়িয়ে ধরতে যাচ্ছেন। বাবা বলছেন-ডোন্ট টাচ মি। ডেন্ট টাচ মি। তোমাকে যে আমি কানো ধরে উঠবাস করাচ্ছি না। এই কারণেই তোমার সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
যে মহিলাকে আমি মা বলে জানতাম সেই মহিলার এমন হেনস্তা দেখে আমি খুবই অবাক হলে গেলাম। ভয়ে আমার হাত-পা কঁপতে লাগল। আমাকে অন্য ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। নার্স মাকে আমি এর পরে আর কোনোদিন দেখি নি। বাড়িতে এই মহিলার কোনো ছবি ছিল না বলে কিছুদিনের মধ্যেই আমি তার চেহারাও ভুলে গেলাম। শুধু মনে থাকিল-শ্যামলা একটি মেয়ে-যার মুখ গোলাকার এবং তিনি ঠোঁট গোল করে শিস দিতে খুব পছন্দ করতেন।
শৈশবের ভয়াবহ স্মৃতি এই একটাই। এই স্মৃতির ব্যাপারটা আমাকে সাইকিয়াট্রিস্টদের কাছে বারবার বলতে হয়েছে। বাবা আমাকে নিয়ে অনেক বড় বড় সাইকিয়াট্রিস্টর কাছে নিয়ে গিয়েছেন। তাদের প্রথম প্রশ্নই হল-শৈশবে কোনো দুঃখময় স্মৃতি আছে Painful memory?
মিসির আলি সাহেবও এই প্রশ্ন করলেন। তবে অন্য সাইকিয়াট্রিস্টরা যেমন এই ঘটনা শুনে ঝাঁকের পর ঝাঁক প্রশ্ন করেছিলেন মিসির আলি তা করলেন না। তিনি শুধু বললেন-ঐ মহিলার গলার স্বর কেমন ছিল? আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম। গলার স্বর দিয়ে কী হবে? উনার গলার স্বর কেমন জানতে চাচ্ছেন কেন?
মিসির আলি বললেন, এমনি জানতে চাচ্ছি।আমি বললাম, গলার স্বর মিষ্টি ছিল। খুব মিষ্টি। উনার বিষয়ে আমার আর কিছু মনে নেই শুধু মনে আছে উনি ঠোঁট গোল করে শিস দিতেন।মিসির আলি বললেন, আরেকটি জিনিস নিশ্চয়ই তোমার মনে আছে। উনি যে তোমাকে বিশেষ নামে ডাকতেন সেটা তো মনে থাকার কথা।উনি আমাকে বিশেষ নামে ডাকতেন এটা আপনাকে কে বলেছেন? কেউ বলে নি। আমি অনুমান করছি।এ রকম অনুমান কেন করছেন? কেন?
বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৭
তোমার কথা থেকে মনে হচ্ছে এই মহিলা তোমায় খুবই আদর করত। মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে অতি আদরের কাউকে বিশেষ নামে ডাকা। যে নামে অন্য কেউ ডাকবে না। এই থেকেই অনুমান করছি তোমাকে বিশেষ কোনো নামে ডাকতেন। সেই বিশেষ নামটা কী? উনি আমাকে ডাকতেন মাফু। মা বলার পর ফুঁ বলে লম্বা টান দিতেন—এ রকম করে মাফুউউউ।মিসির আলি হাসলেন এবং প্রায় সেই মহিলার মতো করে ডাকলেন মাফুউউউ। আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, জি। তিনি বললেন, মাফু তুমি কেমন আছ?
আমি বললাম ভালো নেই। আপনি আমাকে সারিয়ে দিন।তিনি আবারো হাসলেন। এবং আমার সঙ্গে সঙ্গে মনে হল–ইনি আমাকে সারিয়ে দেবেন। উনার সেই ক্ষমতা আছে।এখন আমি আমার অসুখের ঘটনাটা বলি-আমি যখন ইউনিভার্সিটিতে থার্ড ইয়ারে পড়ি তখন বাবার শরীর হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। হার্টের সমস্যা, ভায়াবেটিস, অ্যাজমার অ্যাটাক সব একসঙ্গে। তিনি প্রায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। আমাকে একদিন ডেকে নিয়ে বললেন-মা, তোর কি পছন্দের কোনো ছেলে আছে? আমি বললাম কেন?
বাবা বললেন, তোর কোনো পছন্দের ছেলে থাকলে বল। আমি তোর বিয়ে দিতে চাই। আমার শরীর ভালো না। যে কোনো সময় যে কোনো কিছু ঘটতে পারে। তার আগেই আমি দেখে যেতে চাই তোর সংসার হয়েছে। যার ওপর ভরসা করতে পারিস এমন একজন কেউ তোর আশপাশে আছে।আমি বললাম, আমার পছন্দের কেউ নেই।বাবা বললেন, আমি দেখেশুনে তোর জন্যে একজন ছেলে নিয়ে আসি? বাবার হতাশ মুখ দেখে আমার খুবই মায়া লাগল। তখন তার অ্যাজমার টান উঠেছে। বুকের ভেতর থেকে শা শা শব্দ আসছে।
বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৭
মনে হচ্ছে তার ফুসফুসে ছোট কোনো বাঁশি কেউ রেখে দিয়েছে–যেই তিনি লম্বা করে নিশ্বাস নিচ্ছেন। ওমনি সেই বাঁশিতে শব্দ উঠছে। তখন আমার বিয়ে করার কোনো রকম ইচ্ছা ছিল না। বাবার অবস্থা দেখে বললাম, তুমি যা ভালো মনে কর—করতে পার! বাবা অতি দ্রুত একটা ছেলে যোগাড় করে ফেললেন। ছেলের বাবা মফস্বলের কোনো এক কলেজের অধ্যাপক। বাবা-মার একমাত্র ছেলে। মেডিকেল কলেজে ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। সুন্দর চেহারা। ছেলের সঙ্গে বাবা আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন।
আমি দেখলাম ছেলে খুব লাজুক। কথা বলার সময় সে সরাসরি আমার দিকে তাকায় না। অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। আমি তাকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে খেতে গেলাম। সেখানে কথা যা বলার। আমিই বললাম। সে শুধু হ্যাঁ হুঁ করল। বিয়ে উপলক্ষে ছেলের বাবা-মা ঢাকায় চলে এলেন। ঢাকায় তারা দুমাসের জন্যে একটা বাড়ি ভাড়া করলেন। সব যখন ঠিকঠাক তখন বাবা বললেন-এখন বিয়ে হবে না। ছেলেটার কিছু সমস্যা আছে। কী সমস্যা বাবা তা ব্যাখ্যা করলেন না।
বিয়ে বাতিল হয়েছে শুনে ছেলের বাবা-মা দুজনই খুব আপসেট হয়ে পড়লেন। বাবার সঙ্গে নানান কথাবার্তা বলতে লাগলেন। আমার সঙ্গেও কথা বলার চেষ্টা করলেন। আমি কথা বললাম না। শুধু যে ছেলের বাবা-মা আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন তা না, ছেলেও আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইল। বারবার টেলিফোন-সে শুধু পাঁচ মিনিটের জন্যে কথা বলতে চায়।
সেই পাঁচ মিনিট তাকে দেওয়া হল না। তারপরই একটা দুৰ্ঘটনা ঘটল। ছেলেটা রিকশা করে যাচ্ছিল। পেছন থেকে একটা মাইক্রোবাস এসে ধাক্কা দিয়ে তাকে ফেলে দিল। লোকজন ধরাধরি করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। হাসপাতালে নেবার পথেই সে মারা গেল।ছেলেটির সঙ্গে আমার কোনো মানসিক বন্ধন তৈরি হয় নি, কাজেই তার মৃত্যু আমার জন্যে ভয়ঙ্কর রকম আপসেট হবার মতো কোনো ঘটনা না। তারপরেও কয়েকদিন আমার মন খারাপ গেল। বেচারা পাঁচ মিনিট আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল। কী হত পাঁচ মিনিট কথা বললে?
বাঘবন্দি মিসির আলি পর্ব:০৭
আমার সমস্যাটা শুরু হল ছেলেটার মৃত্যুর ঠিক ছদিন পর। আমি আমার ঘরে ঘুমাচ্ছি। টেলিফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। আমার হাতের কাছে টেলিফোন। টেলিফোন ধরার আগে ঘড়ি দেখলাম। রাত তিনটা বাজে। রাত তিনটায় কে টেলিফোন করবে? কোনো ক্র্যাংক কল নিশ্চয় এসেছে। টেলিফোন ধরলেই জড়ানো গলায় কেউ নোংরা কোনো কথা বলবে। ধরব না ধরব না করেও টেলিফোন ধরলাম। হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে লাইন কেটে দিল।
আমি বিরক্ত হয়ে টেলিফোন রেখে বাথরুমে গেলাম। রাতে ঘুম ভেঙে গেলে আমার খুব সমস্যা হয়। ঘুম আসতে চায় না। হাত-মুখ ধুয়ে ঘরে ঢুকে অবাক হয়ে দেখি আমার বিছানায় পা তুলে ছেলেটা বসে আছে। যে বইটা পড়তে পড়তে রাতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সেই বইটা তার হাতে। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সে বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছে। আমি ঘরে ঢুকতেই সে বই রেখে বলল, পাঁচটা মিনিট তোমার সঙ্গে কথা বলব। এর বেশি না।
আমি চিৎকার করে মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম। শুরু হল আমার দুঃস্বপ্নের দিনরাত্রি।এইটুকু পড়েই মিসির আলি খাতা নামিয়ে রাখলেন। মেয়েটির চিকিৎসা কীভাবে করা হয়েছে তাঁর মনে পড়েছে। লেখা পড়ে নুতন কিছু জানা যাবে না। মিসির আলির ঘুম পাচ্ছে। বরং কিছুক্ষণ ঘুমানো যেতে পারে। ঘুমের মধ্যে বৃষ্টি নামলে চমৎকার হয়। বৃষ্টির শব্দটা কোনো-না-কোনো ভাবে ঘুমন্ত মানুষের মাথায় ঢুকে যায়। ঝমঝম শব্দে আনন্দময় বাজনা মাথার ভেতর বাজতে থাকে। মানুষের অবচেতন মন বৃষ্টির গান খুবই পছন্?
Read more
