মনোয়ারা বেগম দোয়া করছেন। দিলশাদের চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। এমন ব্যাকুল হয়ে সে অনেকদিন কাঁদে নি। প্রাণভরে কাঁদার কারণেই হয়তো দিলশাদের মন খুব হালকা হয়ে গেল। নিজেকে তার এখন কিশোরী মেয়ের মতো লাগছে। বিয়ের আগে সে যেমন মাকে জড়িয়ে ধরে হৈচৈ চেঁচামেচি করত আজও সেরকম করতে ইচ্ছে হচ্ছে।দিলশাদ বলল, মা, তুমি আজ রাতে ভালো কিছু রান্না কর তো, আমি তোমার এখানে খাব।কী খাবি বল?তুমি যে কুচি কুচি করে ডিম দিয়ে আলু ভাজি কর ঐটা খাব।শুধু আলু ভাজি? সঙ্গে আর কী খাবি?
তোমার দাঁতের যে অবস্থা– এই নিয়ে রাঁধবে কীভাবে? বরং আমাকে বলে দাও আমি রাধি।দাঁতের ব্যথাটা এখন অনেক কমে গেছে। বুঝতে পারছি না কারণটা কী। তুই এরকম আরো কিছুক্ষণ হাসিমুখে থাকলে ব্যথাটা মনে হয় পুরোপুরি চলে যাবে।মনোয়ারা হাসলেন। দিলশাদ বলল, তোমার বাগানে বসে চা খাব মা। চা বানিয়ে আন। মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে, তাই না মা? আকাশে মেঘ জমেছে। বৃষ্টি হতেও পারে।বৃষ্টি হলে তোমাকে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজব। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন তোমাকে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতাম। মনে আছে মা?
হুঁ, মনে আছে।যতবার বৃষ্টিতে ভিজতাম ততবারই বড় আপার ঠাণ্ডা লেগে গলা-টলা ফুলে বিশ্রী অবস্থা হতো।মনোয়ারা হাসতে হাসতে বললেন, তোর বড় আপার অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। এখন বৃষ্টিতে ভিজতে হয় না। বৃষ্টি হচ্ছে এই শব্দ শুনলেই তার ঠাণ্ডা লেগে গলা ফুলে যায়। ব্যাঙের ডাক শুনলেও বোধহয় তার এখন ঠাণ্ডা লেগে গলা ফোলে।দিলশাদ খিল খিল করে হাসছে। মনোয়ারা মুগ্ধ চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি অনেকদিন পর তার অতি আদরের এই মেয়েটিকে এমন প্রাণ খুলে হাসতে দেখলেন।
মনোয়ারা তার এই বাগান নিজের হাতে করেছেন। বাগানের যে শৃঙ্খলা থাকে এখানে তা অনুপস্থিত। মনোয়ারা যেখানে যে গাছ পেয়েছেন লাগিয়েছেন। সম্প্রতি আঙুরের লতা লাগানো হয়েছে। লতা অনেকদুর উঠেছে। মাচা বেঁধে দিতে হয়েছে। একটা পানগাছ আগেই ছিল। সেই পানগাছ মানকচুর পাতার মতো বিশাল পাতা ছেড়েছে। বরই গাছ আছে, নারকেলি বরই। একবার এই বরই খেয়ে খুব ভালো লেগেছিল। কয়েকটা বিচি নিজের হাতে পুঁতে দিলেন। একটি থেকে চারা বের হয়েছে। সেই চারা লক লক করে বাড়ছে।
কাজি পেয়ারার কয়েকটা গাছ আছে– এখনো ফল ধরে নি। তার খুব শখ জলপদ্ম লাগানোর। ছোট্ট বাগানে আর জায়গা নেই- তবু তিনি মাঝখানে কিছুটা ফাঁকা জায়গা রেখেছেন। জায়গাটা খুঁড়ে জলাশয়ের মতো করে জলপদ্ম লাগাবেন। হাদিউজ্জামান সাহেবের ভয়ে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করতে পারছেন না।দিলশাদ পানগাছের পাশে দাঁড়িয়েছিল। খুঁটি বেয়ে এই গাছ অনেকদূর উঠে গেছে। মনোয়ারা চা হাতে মেয়ের পাশে এসে দাঁড়ালেন। দিলশাদ বলল, এটাই কি তোমার সেই বিখ্যাত পানগাছ?
হুঁ।রাক্ষুসী পান বলে মনে হচ্ছে। এত বড় পাতা! পাতাগুলি বেশি বড় হচ্ছে। এত বড় হচ্ছে কেন বুঝতে পারছি না।খেয়ে দেখেছ? হুঁ। আমি তো এখন এই পানই খাই।খেতে কেমন মা? খেতে ভালোই, একটু কষটা কষটা।আমাকে একটু দিও তো তোমার রাক্ষুসী পান, খেয়ে দেখব।দিলশাদ ঘাসের উপর পা ছড়িয়ে বসল। মনোয়ারা বসলেন মেয়ের পাশে।তোর টাকা কী পরিমাণ জোগাড় হয়েছে রে দিলু? হয় নি।হয় নি! তাহলে এত নিশ্চিত আছিস কীভাবে? নিশ্চিত তোমাকে কে বলল মা?
তোকে দেখে কেমন নিশ্চিত মনে হচ্ছে।আমার কাছে এই মুহূর্তে তিন লাখ টাকার সামান্য বেশি আছে। বড় দুলাভাই তিন দেবেন। তাঁকে খুব ধরব যেন আরো এক বেশি দেন। কত হলো? সাত? আপাতত আমি এই নিয়ে রওনা হব।আরো তো লাগবে।হ্যাঁ লাগবে। আমার স্কুল জীবনের বান্ধবী রীতা আছে মেরিল্যান্ডে। ওকে চিঠি লিখেছি। ও আমার থাকার ব্যবস্থা করবে। ও বলেছে আমেরিকায় অনেক বাংলাদেশী আছে। তাদের কাছ থেকে চাঁদা তুলবে। আগেও কয়েকবার এরকম তোলা হয়েছে। বিদেশে যেসব বাঙালি থাকেন, তাদের মন যে-কোনো কারণেই হোক—উদার হয়। ফেলো ফিলিংস থাকে। সমস্যা হবে না মা।
ইনশাল্লাহ্ বল দিলু। সমস্যা হবে না এ জাতীয় কথা কখনো বলবি না। সবসময় বলবি ইনশাল্লাহ সমস্যা হবে না।দিলশাদ বলল, ইনশাল্লাহ সমস্যা হবে না।মনোয়ারা চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে এক হাত মেয়ের কাঁধে রেখে বললেন তোর জন্যে আমি কিছু টাকা রেখেছি।দিলশাদ চমকে উঠে বলল, তুমি? আমি তোকে বলেছিলাম না যেভাবেই হোক তোকে এক লাখ টাকা জোগাড় করে দেব।বাবা তো দু লাখ টাকা দিয়েছেন।তোর বাবারটা তোর বাবার। আমারটা আমার।তুমি পেলে কোথায় এত টাকা?
তোর বাবার সবসময় ধারণা সে আমার আগে মারা যাবে— তখন আমি টাকা পয়সার সমস্যায় পড়ে যাব। আমার যাতে সমস্যা না হয় সেজন্যে সে পোস্টাফিসে পঞ্চাশ হাজার টাকা রেখেছিল। ঐটা বেড়ে বেড়ে এখন এক লাখ হয়েছে।সেই টাকা আমাকে দিয়ে দেবে? হ্যাঁ, শুধু তোর বাবা না জানলেই হলো।মনোয়ারা এখনো মেয়ের পিঠ থেকে হাত সরিয়ে নেন নি। এখনো হাত দিয়ে রেখেছেন।টাকাটা কি এখন নিবি দিলু? আমি উঠিয়ে রেখেছি।দাও, এখনি দাও।এতগুলি টাকা তুই একা নিয়ে যাবি?
কিছু হবে না। ভ্যানিটি ব্যাগে ভরে নিয়ে যাব। আজকাল হাইজ্যাকাররা মেয়েদের ভ্যানেটি ব্যাগ নেয় না। তারা জানে মেয়েরা অনেক সাবধান। ভ্যানিটি ব্যাগ হাইজ্যাক করে কিছু পাওয়া যাবে না। হাইজ্যাকাররা অনেকবার ‘ঠক খেয়েছে।পাঁচশ টাকার দুটা বান্ডিল ভ্যানিটি ব্যাগে ভরতে ভরতে দিলু বলল, মা আমি চলোম।সে-কী! তুই না বললি ভাত খাবি।অনেক দেরি হয়ে যাবে মা। তাছাড়া আজ আমার দিনটা খুব লাকি। ভিসা হলো, তারপর হঠাৎ করে তোমার কাছ থেকে এতগুলি টাকা পেলাম। লাকি দিনটা এখানে বসে বসে নষ্ট করব না। কী করবি?
বড় দুলাভাইকে ধরে আজই টাকার ব্যবস্থা করব। আমার মনে হচ্ছে আজ গেলে উনার টাকাটাও পাওয়া যাবে। আবার ইনশাল্লাহ বলতে ভুলে গেছি। ইনশাল্লাহ্।এখন তার কাছে যাবি? হুঁ।সে নাকি আলাদা থাকে? ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে। কী সব কাণ্ডকারখানা যে হচ্ছে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।তোমার কোনো মেয়েরই স্বামীভাগ্য ভালো না মা।মনোয়ারা ক্লান্ত গলায় বললেন, আমার মেয়েগুলিরও তো দায়িত্ব আছে। মেয়েরা তাদের দায়িত্ব দেখবে না। শুধু পরের ছেলেদের দোষ দেবে এটা ঠিক না।তুমি এক অদ্ভুত মহিলা মা– শুধু নিজেদের দোষ দেখবে, অন্যদের দোষ দেখবে না। আগের যুগের জন্যে তুমি ঠিক আছ, এই যুগের জন্যে তুমি মা ঠিক না।
যে ঠিক সে সব যুগের জন্যেই ঠিক।তুমি তর্ক করো না তো মা। আমার সঙ্গে তুমি তর্কে পারবে না। শুধু শুধু তর্ক করতে এসো না।আচ্ছা যা তর্ক করব না।আমার মেয়েকে তুমি দেখতে আস না কেন? আছে একটা কারণ।সেই কারণটা কী শুনি।আমি আর তোর বাবা মিলে একটা খতম পড়ছি। খতম শেষ হলে দুজন একসঙ্গে গিয়ে তোর মেয়েকে দেখে আসব আর দোয়া করে আসব।খতম শেষ হবে কবে?
লাগবে কয়েকদিন।বাবার ঐ পীর যন্ত্রণা করছে, তাই না মা? তুমি বুদ্ধিমতী মেয়ে হয়েও ভণ্ড পীরকে সহ্য করে যাচ্ছ। আশ্চর্য! পীর ভণ্ড হতে পারে। কিন্তু আমরা তো পড়ছি আল্লাহপাকের কালাম। সেখানে তো মা কোনো ভণ্ডামি আমরা করছি না।যা ইচ্ছা কর। মা আমি যাই।আচ্ছা মা যা। টাকাটা সাবধান।তুমি নিশ্চিত থাক তো মা। কেউ আমার এই টাকা নিতে পারবে না। টাকাগুলির মধ্যে আমার মেয়ের জীবন। কারো সাধ্য নেই কোনো মা’র কাছ থেকে মেয়ের জীবন ছিনিয়ে নেয়।তুই কি এখন তোর বড় দুলাভাইয়ের কাছে যাচ্ছিস?
হ্যাঁ।ওর নতুন ফ্ল্যাটের ঠিকানা জানিস? হুঁ।ওকে বলিস তো আমার সঙ্গে একটু দেখা করতে।বলব।দু-একদিনের মধ্যেই যেন দেখা করে।বলব। মা যাই? আচ্ছা মা যা। খোদা হাফেজ মা।ধানমণ্ডির এই ফ্ল্যাট বাড়িটি খুব আধুনিক। মাত্র চারতলা উঁচু ফ্ল্যাট। কিন্তু লিফট আছে দুটি। এন্ট্রির লবি পুরোটাই শ্বেতপাথরের। ধুলোমাখা জুতা পায়ে পাথরের লবীতে উঠতেও সংকোচ লাগে। মেয়ে রিসিপসনিস্ট কোনো ফ্ল্যাট বাড়িতে এখনো দেখা যায় না। এই বাড়িতে আছে। চশমাপরা ধারালো চেহারার মেয়ে। দিলশাদকে দেখে সে শুদ্ধ ইংরেজিতে বলল, ম্যাডাম, আপনি কোথায় যাবেন?
দিলশাদ ওয়াদুদুর রহমানের নাম বলল। ফ্ল্যাট নাম্বার থ্রি-সি।আপনার কি আগে অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে? জি-না।স্যার ফ্ল্যাটেই আছেন। আমি একটু কথা বলে দেখি। আপনার কী নাম বলব? বলুন দিলশাদ।রিসিপসনিস্ট মেয়েটি ইন্টারকমে নিচু গলায় কিছুক্ষণ কথা বলেই রিসিভার দিলশাদের দিকে এগিয়ে দিল–স্যার লাইনে আছেন। কথা বলুন।দিলশাদ রিসিভার হাতে নিল।হ্যালো দিলশাদ।জি দুলাভাই।তুমি এসেছ খুব ভালো হয়েছে। মনে মনে তোমাকে এক্সপেক্ট করছিলাম।তাই বুঝি? অফকোর্স তাই। চলে এসো। লিফটে করে চারতলায়। ফ্ল্যাট বাড়ি কেমন দেখছ? ফ্ল্যাটবাড়ি দেখলাম কোথায়? শুধু তো লবি দেখছি।লবি কেমন সেটাই বলো।অসাধারণ! একেবারে ইন্দ্রপুরী।
দিলশাদ তার দুলাভাইয়ের তৃপ্তির হাসি শুনল। হাসিটা একটু অস্বাভাবিক শুনাল– যদিও অস্বাভাবিক শুনানোর কোনো কারণ নেই।ওয়াদুদুর রহমানের পরনে লুঙ্গি খালি গা। দিলশাদ কলিংবেলে হাত রাখার আগেই দরজা খুলে ওয়াদুদুর রহমান বলল, সুস্বাগতম।দিলশাদ বলল, জুতা বাইরে রেখে ঢুকব, না জুতা পায়ে ঢুকব? যে অপূর্ব ফ্ল্যাট, জুতা পায়ে ঢুকতে সাহস হচ্ছে না।ওয়াদুদুর রহমান খুশি খুশি গলায় বলল, ঢং করবে না দিলু। এসো এসো, ঘরে পা দাও।সে দিলুর হাত ধরে ভেতরে টেনে নিল। দিলু একটু সংকোচিত বোধ করছে। দিলু ঢুকতে যাচ্ছে, তাকে হাত ধরে টানাটানির প্রয়োজন ছিল না।ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন কেমন দেখছ?
খুব সুন্দর। শুধু এই সুন্দরের ভেতর লুঙ্গি পরা খালি গায়ে আপনাকে মানাচ্ছে না। বাংলা ছবির বিত্তবান বাবাদের মতো আপনার গায়ে থাকা উচিত ছিল রোব টোব জাতীয় কিছু। ফ্ল্যাটে আপনি একা? অবশ্যই আমি একা একা থাকার জন্যে ফ্ল্যাট কিনেছি। পর্বত পাশে নিয়ে ঘুমানোনার জন্যে ফ্ল্যাট কিনি নি।আপা এই ফ্ল্যাট দেখে নি? কোত্থেকে দেখবে? ইচ্ছে করলেও তো ঢুকতে পারবে না। গেটেই আটকে দেবে। তাছাড়া তার যে সাইজ হয়েছে, লিফটের দরজা দিয়েও সে ঢুকবে না। ধাক্কাধাক্কি করে ঢোকাতে হবে। কার ঠেকা পড়েছে তাকে ধাক্কাধাক্কি করার? ফরগেট ইওর বড় আপা, তুমি আমার সঙ্গে এসো ফ্ল্যাটটা আগে ভালোমতো দেখাই–গাইডেড ট্যুর। আসলেই দর্শনীয়। প্রথম কী দেখবে? কিচেন?
যা দেখাবেন তাই দেখব।দিলু কিচেন দেখে মুগ্ধ গলায় বলল, কিচেনেও কি এয়ারকুলার লাগিয়েছেন না কি? ওটা এয়ারকুলার না দিলু। রান্নার ধোয়া শুষে নেবার ব্যবস্থা।টেবিলটা কি শ্বেতপাথরের দুলাভাই? হ্যাঁ শ্বেতপাথরের। রান্নাঘরে বসে যেন দুজন খেতে পারে সেই ব্যবস্থা। কিচেনে টেবিল থাকলে ফরম্যাল ডাইনিং রুমে যাবার দরকার হয় না।আপাকে তো আনছেন না– দুজন পাচ্ছেন কোথায়?
এই তো তোমাকে পেলাম। আজ এই শ্বেতপাথরের টেবিল উদ্বোধন করব। দুজন এখানে ডিনার করব। কী খেতে চাও বলো– ইন্টারকমে খবর দিয়ে দেব। ওরা চাইনিজ রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার নিয়ে আসবে। এখন এসো তোমাকে মাস্টার টয়লেট দেখাব। দর্শনীয়। গোল একটা বাথটাব ফিট করা হয়েছে। বাথটাবটার ডিজাইন এমন যে দুজন গোসল করতে পারে। বিদেশীদের আইডিয়া কত সুন্দর দেখ। এরা জানে জীবনকে কীভাবে উপভোগ করতে হয়। আমরা শুধু টাকা রোজগার করতেই জানি, খরচ করতে জানি না।
আপনি তো মনে হয় খরচ করতেও জানেন।আমি এখনো জানি না। তবে আমি শিখছি। বাচব আর কতদিন, মরে গেলেই তো সব শেষ। ঠিক না? বাথরুমটা পছন্দ হয়েছে? খুব সুন্দর।এসো বারান্দা দেখাই। তোমার মনে হতে পারে আর্কিটেক্ট জায়গা নষ্ট করেছে- আসলে তা না। বারান্দাটাই বাড়ির বিউটি। দুজনে বসার জন্যে লো হাইট সোফা রাখা হয়েছে বারান্দায়। বারান্দায় বসে বসে চাঁদের আলো দেখবে– হাতে থাকবে মিষ্টি শেরির গ্লাস, ক্যাসেটে বাজবে সিম্ফোনি– দ্যাটস লাইফ। ঠিক না?
বুঝতে পারছি না। হয়তো ঠিক।এসো বারান্দায় বসি, না চল শোবার ঘরে চল–এই একটি ঘরেই এসি আছে। একবার ভেবেছিলাম শোবার ঘরে ওয়াল টু ওয়াল কার্পেট দেব। তারপর মনে হলো গরমের দেশে কার্পেট ভালো লাগবে না। ঝকঝকে হোয়াইট সিমেন্টই ভালো। এখন কী দেব বলো? চা, না ঠাণ্ডা কিছু?
দুলাভাই আজ সারাদিন আমি বাইরে, জরুরি কিছু কথা বলে চলে যাব।বলো তোমার জরুরি কথা।আজ ভিসা পেয়েছি।একসেলেন্ট। আসল হার্ভেল হচ্ছে ভিসা।ঠিক করেছি পরশু টিকিট কাটব।পরশু কেন? হোয়াই নট টুমরো? আমার এক বন্ধুর ট্রাভেল এজেন্সি আছে। এরা কোনোরকম কমিশন না কেটে টিকিট দেবে। হাজার দশেক টাকা সেভ করতে পারবে।থ্যাংক য়্যু দুলাভাই। তারচে’ আমার যেটা বেশি দরকার তা হচ্ছে…। আমি তোমাকে যে টাকা প্রমিস করেছিলাম সেটা তো?
জি।আজ তোমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন। কারেন্ট অ্যাকাউন্টের চেক বই এইখানেই আছে। আমি এক্ষুনি চেক লিখে দিচ্ছি। যেহেতু কারেন্ট অ্যাকাউন্টের চেক তুমি কালই ভাঙাতে পারবে।দুলাভাই, আপনাকে কী বলে যে ধন্যবাদ দেব- বুঝতে পারছি না।মেয়ে সুস্থ হয়ে আসুক তারপর ধন্যবাদ দেবে। এখন বলল যা দেব বলেছিলাম তাতে হবে, না আরো কিছু লাগবে? ফিল ফ্রি।যদি আপনার পক্ষে সম্ভব হয় তাহলে আরো এক বাড়িয়ে দিন।তোমার জন্যে সবই সম্ভব। যাও এটাকে চার করে দিচ্ছি।
এখন বলল রাতে চায়নিজ খাবে, না বাংলাদেশী ফুড– ডাল ভাত। গুলশানে একটা রেস্টুরেন্ট খুলেছে একসেলেন্ট বাংলাদেশী ফুড করে। বিদেশীরা লাইন দিয়ে খায়।দুলাভাই, আজ আমি চলে যাব। আরেকদিন এসে আপনার সঙ্গে ডিনার করব।পাগল হয়েছ! তোমাকে যেতে দেব না। তোমাকে দিয়ে রান্নাঘরের শ্বেতপাথরের টেবিল উদ্বোধন করা এবং গোল বাথটাব উদ্বোধন করাব। হা হা হা।দিলশাদ অবিশ্বাসী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মানুষটা কী বলার চেষ্টা করছে?
ওয়াদুদুর রহমান বেড সাইড টেবিলের ড্রয়ার থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল। ঠোঁটে সিগারেট খুঁজতে খুঁজতে বলল, দিলু, আমি হচ্ছি খুব ফ্রাস্টেটেড একজন মানুষ। পুরোপুরি হতাশাগ্রস্ত। এক অর্থে তুমিও হতাশাগ্রস্ত। দুজন হতাশাগ্রস্ত মানুষ যদি কিছু সময় আনন্দে কাটায় তাতে জগতের কোনো ক্ষতি হয়।দুলাভাই, আপনি কী বলতে চাচ্ছেন আমি বুঝতে পারছি না।বুঝতে না পারার তত কোনো কথা না দিলু।
তুমি তো বোকা মেয়ে নও। তোমার জায়গায় তোমার আপা হলে ভিন্ন কথা ছিল। সে কিছুই বুঝত না। বিয়ের পর পর কী ঘটনা ঘটল শোন রাত একটার দিকে তোমার আপাকে ডেকে তুলে বললাম, তৃষ্ণা পেয়েছে। পানি খাব। সে ভাবল পানির তৃষ্ণাই বুঝি পেয়েছে। সে বিস্মিত হয়ে বলল, টেবিলেই তো পানির জগ আছে। গ্লাস আছে। খেয়ে নিলেই পারতে। আমাকে শুধু শুধু ডাকলে কেন? আমি তখন বললাম…।দিলশাদ বলল, আমাকে এসব কেন শুনাচ্ছেন?
ওয়াদুদুর রহমান ডানহাত বাড়িয়ে দিলশাদের গালে রাখল। আদর করার ভঙ্গিতে হাত রাখা। দিলশাদ নিজের মুখ সরিয়ে নিল না, সে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। ওয়াদুদুর রহমানের ডানহাতের আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট। সিগারেটের ধোয়ায় দিলশাদের মাথা ঘুরতে শুরু করেছে।ওয়াদুদুর রহমান অন্যহাত দিলশাদের কোলে রেখেছে। অনেকদিন আগে সিনেমাহলে এই ব্যাপার হয়েছিল।দুলাভাই, আপনি ঠিক করে বলুন তো আপনি আমার কাছে কী চাচ্ছেন? আমি নিজ থেকে কিছু চাইব না।
তুমি যা দেবে তাই হাসিমুখে নেব। হা হা হা।ওয়াদুদুর রহমান দিলশাদের দিকে আরেকটু ঝুঁকে এলো। দিলশাদ বলল, দুলাভাই, আমার গায়ের উপর উঠে পড়ার আগে একটা কথা শুনুন। প্লিজ স্টপ দেয়ার। আমার গাল থেকে আপনার হাত সরান। হ্যাঁ, এখন তাকান আমার দিকে। আমাকে বেশ কিছু টাকা আপনি দিচ্ছেন। তার পূর্বশর্ত কি এই যে, আমাকে আপনার সঙ্গে বাথটাবে বসে গোসল করতে হবে? আপনার সঙ্গে আমাকে বিছানায় যেতে হবে? তুমি পুরো ব্যাপারটা অন্যভাবে দেখছ দিলু। অন্যভাবে দেখার দরকার নেই– আমরা দুজনই র্যাশানাল হিউমেন বিং…।
দুলাভাই, আপনার টাকার আমার দরকার নেই।দরকার না থাকলে খুব ভালো কথা। দরকার নেই বলেই তুমি আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে কেন? আমি তো আপনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছি না। আপনি করছেন। কতটুক খারাপ ব্যবহার যে করেছেন তাও আপনি জানেন না।দিলশাদ উঠে দাঁড়াল। ওয়াদুদুর রহমান স্বাভাবিক গলায় বলল, চলে যাচ্ছ? দিলশাদ জবাব না দিয়ে দরজা খুলে বের হয়ে এলো। সে সিঁড়ি বেয়ে নামছে। একহাতে রেলিং ধরে নামছে, তারপরেও মনে হচ্ছে সে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে।
