জলপদ্ম পর্ব:০২ হুমায়ূন আহমেদ

জলপদ্ম পর্ব:০২

পাঁচশ টাকার নোট মোট কতগুলি আছে? ইলার গুনে দেখতে ইচ্ছা করছে। টাকা দেখলেই সব মানুষেরই বোধহয় গুনতে ইচ্ছা করে। ইলার যা ভাগ্য, গুনার সময়ই হয়ত জামান এসে উপস্থিত হবে। থাক, গোনার দরকার নেই। আন্দাজে মনে হচ্ছে একশটার মত হবে। তার মানে পঞ্চাশ হাজার টাকা। কি সর্বনাশ! গা ঝিম ঝিম করে। এতগুলি টাকা একটা মানুষ পকেটে নিয়ে ঘুরে? যদি সত্যি সত্যি হারিয়ে যেত। ইলা টাকা গুনতে বসল। একশ বারটা পাঁচশ টাকার নোট। তার মানে ছাপান্ন হাজার। কি সর্বনাশ!

ইলা দরজা বন্ধ করে আলনার দিকে গেল। ঘরে পরার একটা শাড়ি নেবে। বাথরুমে গিয়ে গা ধুবে। প্রচণ্ড গরম লাগছে। গা কুটকুট করছে। বাথরুমে গিয়ে হয়ত দেখা যাবে পানি নেই। বিকেলের দিকে এ বাড়িতে পানি থাকে না। জামানকে একটা বড় বালতি কিনতে বলেছিল। জামান বিরক্ত হয়ে বলেছে–খামোকা একটা বড় বালতি কেনার দরকার কি? দুজন মাত্র মানুষ–বালতি-ফালতি কিনে বাড়ি ভর্তি করার জাস্টিফিকেশন নেই। শুধু ঝামেলা। কি কিনতে হবে, কি কিনতে হবে না-–তা আমাকে বলার দরকার নেই। আমার চোখ-কান খোলা, আমি জানি কি দরকার–কি দরকার নী। শখন যা দরকার হবে, আমি ঠিকই কিনব।

কি অদ্ভুত মানুষ! টাকা আছে, অর্থ খরচ করবে না। বিয়ের প্রথম এক মাস ইলা কিছু বুঝতে পারে নি। সে ভেবেছিল, মানুষটার আর্থিক অবস্থা বোধহয় তাদের মতই। টাকা-পয়সা নেই। যদিও থাকছে সুন্দর একটা ফ্ল্যাটে। বসার ঘরে কাপেট আছে, সোফা আছে, টিভি, ফ্রী আছে। তবে হাতে হয় নগদ টাকা নেই। বিয়ে উপলক্ষে জিনিসপত্র কিনেই সব শেষ করে ফেলেছে। লোকটার উপর খুব মায়া হয়েছিল। মায়া হয়েছিল বলেই বিয়ের তিন দিনের দিন সে বলেছিল–আমার কাছে সাতশ টাকা আছে। তোমার যদি দরকার হয় তুমি নিতে পার।কোথায় পেলে সাতশ টাকা।ভাইয়া আমাকে এক হাজার টাকা দিয়েছিল। বিয়েতে কিছু দিতে পারে নি এই জন্যে এক হাজার টাকা দিল। আমি নিতে চাই নি …।এক হাজার থেকে সাতশ আছে, বাকি তিনশ কি করলে?

ইলা বিস্মিত হয়ে বলল, খরচ করেছি।গরীব ঘরের মেয়ে। খরচের এই হাত তো ভুলি না। দেখি, এই সাতশ টাকা। আমাকে দিয়ে দাও। কোন কিছুর প্রয়োজন হলে বলবে। একটা কথা মন দিয়ে শোন–ইলা এই জীবনে অনেক কিছুই কিনতে ইচ্ছা করবে। কিনতে ইচ্ছা করলেই কিনতে নেই। টাকা-পয়সা অনেকেরই থাকে–খুব কম মানুষই থাকে যারা টাকা জমাতে পারে। হাতের ফাঁক দিয়ে টাকা বের হয়ে যায়। বুঝতে পারে না। বুঝতে পারছ? ইলা শুকনো গলায় বলল, পারছি। তার মনটা বেশ খারাপ হল। মানুষটা তাহলে কৃপণ। বেশ ভাল কৃপণ। ইলা লক্ষ্য করল মানুষটা শুধু কৃপণ না, মন ছোট। কৃপণ মানুষের মন এম্নিতেই ছোট থাকে–তুবে তারা গোপন রাখতে চেষ্টা করে। এই লোকটা তা করে না। বরং চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

বিয়ের পরপর রুবা এসেছে, বড় বোনের সঙ্গে কয়েকদিন থাকবে। জামান হাসিমুখে গল্পটল্প করছে, তবু এক ধরনের গম্ভীর গভীর ভাব। সারাক্ষণ ভুরু কুঁচকানো। মিলি এমন কমছে কেন ইলা কিছুতেই অতে পারে না। তৃতীয় দিনের দিন রাতে ঘুমুতে যাবার সময় জামান হাই তুলতে তুলতে বুলল, রুবা কদিন থাকবে? ইলা হাসিমুখে বলল, এস. এস. সি, পরীক্ষা হয়ে গেছে। এখন তো ছুটি। চলে যেতে চেয়েছিল, আমি জোর করে রেখে দিয়েছি।জামান গম্ভীর গলায় বলল, জোর করে রাখার দরকার কি? জোর জবরদস্তি ভাল না। হয়ত এখানে থাকতে ভাল লাগছে না।ভাল লাগছে না কে বলল। ভাল লাগছে–দেখ না ক হাসিখুশি।

সারাক্ষণ দেখি টিভির নব টেপাটেপি করছে। এইসব সেনসিটিভ ইনস্টমেন্ট। হুট করে নষ্ট করে দেবে।ইলা হতভম্ব হয়ে গেল। কি বলছে এই মানুষটা? জামান সহজ স্বাভাবিক ভুলিতে স্বলল, ঐ দিন দেখি ফ্রীজের দরজা ধড়াম করে বন্ধ করল। ট্রাকের দরজাও এমন করে কেউ বন্ধ করে না। ফ্রীজের দরজা নিয়ে কুস্তি করার দরকার কি? ইলা বলল, আচ্ছা, কাল সকালে ওকে যাত্রাবাড়িতে রেখে এস।সকালে পারব না, কাজ আছে। দেখি বিকেলে না হয় রেখে আসব।না সকালেই রেখে আস।রাগ কর না-কি? ফালতু ব্যাপার নিয়ে আমার সঙ্গে রাগারাগি করবে না। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে বেশি মাখামাখি কচলাকচলি আমার পছন্দ না। তারা থাকবে তাদের মত। আমরা থাকব আমাদের মত। বুঝতে পারছ? পারছি।

বিয়ের পর সুখী হবার একমাত্র উপায় হচ্ছে বাপের বাড়ি দ্রুত ভূলে যাওয়া। ভুলে যাবার চেষ্টা কর।চেষ্টা করব।জামান সত্যি সত্যি সকালে রুবাকে নিয়ে যেতে চাইবে, ইলা ভাবে নি। অমনি তাই কয়ল। ইলার চেয়ে অবাক হল রুবা। রুবা বলল, দুলাভাই, আমার তো আরো তিনদিন থাকার কথা। আমি যাব কেন? থাকতে চাইলে তিনদিন খাক, অসুবিধা কি! তোমার আপা বলে রেখে আসতে।রুবা গেল ইলার কাছে। বিস্মিত হয়ে বলল, দুলাভাই আমাকে যাত্রাবাড়িতে রেখে আসতে চাচ্ছে–ব্যাপার কি? ব্যাপার কিছু না।তোমাদের মধ্যে ঝগড়া-টগড়া হয়েছে? না।

এমন গম্ভীর মুখে না বলছ কেন? আচ্ছা শোন, মা যদি শুনে তোমাদের মধ্যে ঝগড়া হয়েছে–মা খুব মন খারাপ করবে।আমাদের মধ্যে কোন ঝগড়া হয় নি। আমার প্রচণ্ড মাথাধরা। এই জন্যেই বোধহয় গম্ভীর হয়ে আছি। তোর থাকতে ইচ্ছা হলে থাক।না আপা, এখন যাই। দুলাভাই বলছিলেন তিনি ভিসিআর কিনবেন। কেনা হোক, তখন এসে অনেকদিন থাকব। রোঞ্জ পাঁচটা করে ছবি দেখব। তোমরা টেলিফান করে নিবে আপা? এত সুন্দর বাড়ি–টেলিফোন ছাড়া মানায় না।টেলিফোনের অনন্য অ্যাপ্লিাই করেছে। এসে যাবে শিগগির।দুলাভাইয়ের কি অনেক টাকা আপা? জানি না।ইলা আসলেই জানে না। মানুষটা সম্পর্কে জানে না। তবু তরি সঙ্গে সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জীবন যাপন করে।

অন্তুর পেছনে মাত্র উনিশ টাকা খরচ হয়েছে। হাসান বাসে করে তাকে মেডিকেলের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে গেছে। ডাক্তার দুটি স্টিট দিয়েছেন। এসিএস এবং কমবায়োটিক ইনজেকশন শুধু কিনতে হয়েছে। হসান পাঁচশ টাকার নোটটা ভাঙায়নি। ফেরত এনেছে। ইলা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মানিব্যাগে রেখে দিলেই হবে। জামান কিছুই জানতে পারবে না।তোমাকে আমি সকালে টাকাটা দিয়ে দেব।জ্বি আচ্ছা।বস একটু, টা খাও।আমি চা খাই না।চা না খেলে শরবত খাও। আমি লেবু দিয়ে শরবত বানিয়ে দি। ভাল লাগবে।কিছু লাগবে না ভাবী।তুমি বস তো দেখি।

হাসান জড়সড় হয়ে সোফায় চেয়ারে বসল। এখনো মুখ তুলে তাকানা। কার্পেটের ডিজাইন দেখছে। পুরুষ মানুষ এমন হয় কখনো? কি বিশ্রী মেয়েলী স্বভাব! কি পড় তুমি? বি, এ পড়ি। এ বহুর পরীক্ষা দেব।তাই নাকি? কখন পড়? আমি তো সব সময় তোমাকে বারান্দায় বসে খুঁকিতে দেখি।নাইট সেকশনে পড়ি। জন্নাথ কলেজে। ও আচ্ছা।ডে সেকশনে ভর্তি হতাম। চান্স পেয়েছিলাম। চাচা নিষেধ করলেন। চাচা বললেন–দিনে অনেক কাজকর্ম আচ্ছে। তাই… চাচা কে? আমাদের বাড়িওয়ালা? জ্বি। আমি শুনেছিলাম তিনি তোমার মামা।জ্বি-না, চাচা। বাবার ফুপাতো ভাই।দিনের বেলায় কি কাজ কর? বাজার করি। তারপর প্রেসে যাই। চাচার একটা প্রেম আছে মগবাজারে। কম্পোজ সেকশন।ও, তাই নাকি? জ্বি।

তুমি আমার অনেক উপকার করলে ভাই, নাও, শরবত খাও। ঘরে আর কিছু নেই।হাসান এক নিঃশ্বাসে শরবতের গ্লাস শেষ করেই উঠে পড়ল। ইলার মনে হল শরবতের বদলে চা দিলে গরম চ-ও হয়ত সে এভাবে এক নিঃশ্বাসে খেয়ে ফেলত।ভাবী যাই? তুমি আরেকদিন এসে আমাদের সঙ্গে চারটা ডাল-ভাত খাবে। আর শোন, তুমি আমাকে এত লজ্জা পাচ্ছি কেন? মুগ্ধ তুলে তাকাও। রাস্তায় কখনো দেখা হলে আমি তোমাকে চিনতে পারব না। এখনো আমি ভালমত তোমার মুখ দেখি নি।হাসান মুখ তুলে তাকাল। এই প্রথম সে হাসল। লাজুক ধরনের সুন্দর একটা ছেলে। কচি মুখ। সে আবার বলল, ভাবী যাই? আচ্ছা যাও।আর শোন, তুমি আমাকে ভাবী ডাকবে না। আপা ডাকবে। ভাবী ডাকটা শুনতে ভাল লাগে না।জ্বি আচ্ছা।

আজ রাতে গেটটা একটু খোলা রাখতে হবে। এর ফিরতে দেরি হয়ে। এগারটা যারটা বেজে যাবে।জ্বি আচ্ছা।অন্তুর জ্বর এসেছে। বেশ ভাল জ্বর। রাতে সে কিছুই খেল না। ইলা বসার ঘরে মাদুর পেতে অন্তুকে শুইয়ে দিল। বেচারা মরার মত শুয়ে আছে। গালে মশা বসেছে, সেই মশা তাড়াবারও চেষ্টা করছে না। ছেলেটার জন্যে একটা মশারি কিনতে হবে। জামানকে বলে দেখলে হয়। রাজি হতেও তো পারে। মশারি কোন অপ্রয়ােজনীয় জিনিস নয়। প্রয়োজনের জিনিস।ইলা অন্তুর হাতে একটা পাঁচ টাকার নোট দিল। সে টাকা পেয়ে খুব খুশি। হাসার চেষ্টা করছে। ইলা বলল, খবর্দার, হাসবি না। হাসলে ঠোঁটে টান পড়বে। ব্যথা পাবি।

অন্তু ব্যথা পাচ্ছে। তবু হাসছে। এরা কন্তু অল্পতে খুশি! ঠোঁটের ব্যথার কথা এখন আর তার মনে নেই। মনে থাকলেও ব্যথা অগ্রাহ্য করে সে ঘুমুবে। ভোরবেলা ওঠে কাজকর্ম করবে। টাকাটা লুকানো থাকবে গোপন কোন জায়গায়। বারবার কাজ ফেলে দেখে অসবে নোটটা ঠিকমত আছে কি না।অন্তু। দুধ খাবি? এক কাপ দুধ এনে দেই? দুধ গন্ধ করে।থাক তুহিলে। গন্ধ করলে খেতে হবে না। ঘুমিয়ে পড়।বাধ্য ছেলের মত অন্তু চোখ বন্ধ করল। ঘুমিয়ে পড়ল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে।ছেলেটার বাবা-মা কোথায় আছে ইলা জানে না। অন্তু নিজেও জানে না। জানলে খবর দিত।জামান রাত এগারটায় ফিরল। কোন কথা না বলে গম্ভীর মুখে তোয়ালে হাতে বাথরুমে ঢুকল। সেখান থেকেই চেঁচিয়ে বলল, খেয়ে এসেছি। এক কাপ চা করে দাও।

আশ্চর্যের ব্যাপার! হারানো মানিব্যাগের কথা সে কিছুই বলছে না। ইলা ভেবেছিল ঘরে ঢুকে সে জিজ্ঞেস করবে, মানিব্যাগ পেয়েছ? এতলি টাকা মানিব্যাগে। জিজ্ঞেস করাই তো স্বাভাবিক। যে কোন মানুষ করবে। জামানের মত সাবধানী মানুষ আরো বেশি করবে। জিজ্ঞেস করছে না কেন? খালি গায়ে বারান্দায় বসে ড্রামান চা খাচ্ছে। বারান্দায় বাতি নেভানো। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। তবু সে যে খুব চিন্তিত, এটা বোঝা যাচ্ছে। কেমন কুঁজো হয়ে বসেছে। একটু পরপর শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেলছে। ইলা ঠিক করল, রাতে শোবার সময় সে বলবে মানিব্যাগ ঘরে পাওয়া গেছে। তুমি ফেলে গিয়েছিলে। এত চিন্তা করার কিছু নেই।

ইলা চায়ের কাপ জামানের দিকে বাড়িয়ে ধরল। জামান শান্ত গলায় বলল, বিরাট একটা লোকসান হয়েছে।কি লোকসান? পকেট মার হয়েছে।বল কি? হারামজাদা মানিব্যাগ নিয়ে গেছে।সত্যি নিয়েছে? এটা আবার কি রকম কথা? সত্যি না তো কি? আমি তোমার সঙ্গে ঠাট্টা-ফাজলেমি করছি? ইলা কিছু একটা বলতে গিয়েও বলল না। জামান চায়ের কাপ নামিয়ে উঠে দাঁড়াল। নিজের মনেই বলল, কোত্থেকে নিয়েছে তাও জানি। কলাবাগানে রিক্সা থেকে নামলাম। ঠিক তখন একটা লোক ঘাড়ে পড়ে গেল। মানিব্যাগ যে তখনি পাচার হয়ে গেছে আমি বুঝতে পারি নি। রিকশা ভাড়া দিতে গিয়ে বুঝলাম। এর মধ্যে হারামজাদা হাওয়া।মানিব্যাগ পকেটে ছিল?

মানিব্যাগ পকেটে থাকবে না তো কোথায় থাকবে? অনাবশ্যক কথা বল কেন? কি বিশ্রী অভ্যাস।কত টাকা ছিল? ছিল কিছু। ঠাণ্ডা এক গ্লাস পানি দাও, আর পানি দাও। দেশটা চোরে ভর্তি হয়ে গেছে।জামান ঘুমুতে এল খবরের কাগজ হাতে। বিছানায় বসে মানুষটা ভুরু কুঁচকে কাগজ পড়ছে। ইলা বুঝতে পারছে জামান আসলে কাগজ পড়ছে না। নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছে। ইলা শুয়ে আছে। তাকিয়ে আছে জামানের দিকে। বড় মায়া লাগছে।

ইলার ঠিক মাথার নিচেই প্রায় একশ বারটা পঁচিশ টাকার নোট বোঝাই মানিব্যাগ। না একশ বার না, তের। হাসানের ফেরত দেয়া নোটটাও সে রেখে দিয়েছে। সে এক সময় ক্ষীণ স্বরে বলল, এই, একটা কথা শোন।জামান বিরক্ত স্বরে বলল, এখন ঘুমাও তো। কোন কথা শুনতে পারব না। কখাবার্তা যা সকালে বলব। দুপুর রাতের জন্যে জমা করে রাখবে না।ঘুমুবে না? কেন যন্ত্রণা করছ? তোমার ঘুম তুমি ঘুমাও।টাকা হারানোয় খুব খারাপ লাগছে? না, খারাপ লাগছে না। খুব আনন্দ পাচ্ছি।জামান খবরের কাগজ ভাঁজ করে মেঝেতে খুঁড়ে ফেলল। এটি তার স্বজ্জাবের বাইরে। সে খুব গোছালো। এমন কাজ কখনো করবে না। ইলা বলি, বাতি নিভিয়ে দেব? দাও।

ইলা বাতি নিভিয়ে দিল। অন্তু মিয়া কুঁ-কুঁ শব্দ করছে, জ্বর বোধহয় আরো বেড়েছে। জ্বর বাড়লে কি করতে হবে ডাক্তার কি তা বলেছে? ঘরে একটা থার্মোমিটার নেই। তাদের যাত্রাবাড়ির বাসায় থার্মোমিটার আছে। রুবার দখলে থাকে। রুবার একটা কাঠের বাক্স আছে। সেই বাক্সে শুধু যে থার্মোমিটার আছে তাই মা–ডেটল আছে, তুলা আছে, বার্নল আছে। বাক্সের গায়ে বড় বড় করে লেখা–আরোগ্য নিকেতন।ইলা ক্ষীণ গলায় বলল, ঘুমুচ্ছ? জামান জবাব দিল না। তবে সে যে এম্বনে ঘুমায় নি তা বোঝা যাচ্ছে।ইলা আর কিছু বলল না। আর ঘুম আসছে। প্রায়ই তার এরকম হয়। জ্বের্গে ক্লেগে রাত পার করে দেয়। নানান কথা ভাবে। রাত জেগে ভাবতে তার বড় ভাল লাশে।

জামান বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলছে। ইলা খুব সাবধানে বিছানা থেকে নামল। ফ্যানের নিচেও খুব গরম লাগছে। বারান্দায় এসে সে কিছুক্ষণ বসবে। এটও নতুন কিছু নয়। প্রায়ই বসে। অন্ধকারে একা একা বসে থাকার মধ্যে এক ধরনের আনন্দ আছে।ইলা বারান্দায় চেয়ারে বসতে বসতে ভাবল, মানিব্যাগটা ফিরিয়ে না দিলে কেমন হয়? সে নিজে বুঝতে পারছে, এটা খুবই অন্যায় চিন্তা। কিন্তু কিছুতেই মাথা থেকে দূর করতে পারছে না। এক বান্ডিল পাঁচশ টাকার নোট। এত টাকা এক সঙ্গে সে নিজে কখনো দেখে নি। টাকাটা কি সে নিজের জন্যে রেখে দিতে পারে না? যদি রাখে তাহলে কি খুব বড় পাপ হবে?

অন্তু আহ-উহ করছে। ইলা উঠে গিয়ে তার কপালে হাত রাখল। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। মাথায় পানি ঢালা দরকার। এত রাতে পানি ঢালাঢ়ালির ব্যবস্থা করলে জামানের ঘুম ভেঙে যাবে। সে খুব বিরক্ত হবে। ইলা অসহায় ভঙ্গিতে অন্তুর মাথার পাশে বসে রইল।তার নিজের পানির পিপাসা হচ্ছে, কিন্তু উঠে যেতে ইচ্ছা করছে না। একজন কেউ যদি হাতের কাছে থাকত এবং বলা মাত্র গ্লাস ভর্তি বরফ শীতল পানি নিয়ে আসত তাহলে চমৎকার হত।অন্তু! উঁ! তোর অসুখ সারলে তোকে আমি মার বাসায় রেখে আসব। সেখানে খুব আরামে থাকবি।আচ্ছা।এ বাড়িতে তোর কি ভয় লাগে? হুঁ।ইলা মনে মনে বলল, আমারো ভয় লাগে। পানির পিপাসা ক্রমেই বাড়ছে। উঠে যেতে ইচ্ছা করছে না। এখন যদি জামান ঘুমের ঘোরে বল, পানি দাও। সে পানি নিয়ে আসবে। অন্তু চাইলেও আনবে। অথচ নিজের জন্যে পানি আনতে যাবার সামান্য কষ্টটাও করবে না।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *