এইসব দিনরাত্রি পর্ব – ১১ হুমায়ূন আহমেদ

এইসব দিনরাত্রি পর্ব – ১১

ডানাকাটা পরী তুমি নও ভাবী। এ-রকম কোনো মিসকলো পসন থাকা উচি৩ না। তবে দেখতে খারাপও না।নীলু হেসে ফেলল। রফিক সিগারেট ধরিয়ে উৎসাহের সঙ্গে বলল, আমার কথা শোন ভাবী, চাকরির চেষ্টা কর। এই যুগে একার রোজগারে কিছু হয় না। দু জনে মিলে হাল ধরা।তোমার ভাই পছন্দ করবে না।এর মধ্যে পছন্দ-অপছন্দের কিছু নেই। কোশ্চেন অব সারভাইভেল।চাকরির ব্যাপার নিয়ে অনেক দিন থেকেই নীলু ভাবছে। বন্যা গত মাসে এসেছিল। তাকে এক সময় বলেই ফেলেছে, তুই বলেছিলি আমার জন্যে একটা ব্যবস্থা করে দিবি। চাকরি জুটিয়ে দিবি। মনে আছে?

মনে থাকবে না কেন? করতে চাস? হুঁ। কী রকম চাকরি? মোটামুটি ধরনের একটা কিছু, তোকে তো আর ফস করে ক্লাস ওয়ান অফিসার বানিয়ে ফেলবে না।কেরানির চাকরি? অসুবিধা আছে? দেড়-দু হাজার টাকা পাবি সব মিলিয়ে। এই বাজারে এটাই-বা মন্দ কী? কারবি? তাহলে আগামী সোমবার আয় আমার অফিসে। আমি কথা বলে রাখব।কার সঙ্গে কথা বলবি? লোক আছে। তুই আয় তো।নীলু সোমবারে যেতে পারেনি। বুধবারে সত্যি সত্যি গিয়ে উপস্থিত। বন্যা অফিস থেকে ছুটি নিয়ে নিল। হাসিমুখে বলল, তোর এ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে হাতে দেবার ব্যবস্থা করতে না পারলে আমার নাম বন্যা নয়।বলিস কি তুই!মামাকে তোর কথা বলে রেখেছি। সার্টিফিকেটগুলি এনেছিস? না।বললাম না। সার্টিফিকেটগুলি সব আনতে?

এখন গিয়ে নিয়ে আসব? আচ্ছা থাক, পরে হলেও চলবে।মতিঝিলের এমন একটি অফিসে তারা ঢুকল যে, নীলুর বুক কাঁপতে শুরু করল। রিসিপশনে উগ্র ধরনের সাজ-করা ভারি সুন্দরী একটি মেয়ে। ঝক ঝক তকতক করছে চারদিক।এইটাই নাকি অফিস? হুঁ, কেন, পছন্দ হচ্ছে না? নীলু কিছু বলল না। বন্যা বলল, চল, মামার সঙ্গে তোকে পরিচয় করিয়ে দিই। মুখ এমন শুকনো করে রেখেছিস কেন? নীলু ফিসফিস করে বলল, এখানে আমার চাকরি হবে না।বুঝলি কী করে হবে না?

আমার মন বলছে হবে না। কিছু কিছু জিনিস। আমি টের পাই। সিক্সথ সেন্স।রাখি তোর সিক্সথ সেন্স।বন্যার মামা তেমন কোনো উৎসাহ দেখালেন না। দুএকটা ছোটখাট প্রশ্ন করলেন–কিবে পাস করেছেন? এর আগে কোথাও চাকরি করেছেন? টাইপিং জানা আছে কিংবা শর্টহ্যাণ্ড? বাসা কোথায়? এমন কিছু জটিল প্রশ্ন নয়, কিন্তু উত্তর দিতে গিয়ে নীলুর কথা জড়িয়ে যেতে লাগল এবং এক বান্ন মনে হল, না এলেই ভালো ছিল।ভদ্রলোক তাদের কফি খেতে বললেন। প্রাইভেট ব্যবসার নানা সমস্যার কথা বললেন এবং এক সময় টেলিফোন নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। দুটি মেয়ে বসে আছে তাঁর সামনে, এটা তাঁর মনেই রইল না। নীলু ফিস-ফিস করে বন্যাকে বলল, আমরা কি চলে যাব? বন্যা ইশারায় তাকে বসতে বলল। সবচে যে জিনিসটি নীলুর কাছে আশ্চর্যজনক মনে হল, তা হচ্ছে-বিন্যার সঙ্গে এই ভদ্রলোকের তেমন কোনো যোগাযোগ নেই।

বন্যা নিজেও কেমন যেন মিইয়ে আছে। নীলু লক্ষ করল, তাদের দু জনের মধ্যে কথাবার্তা প্রায় কিছুই হয় নি। এমন এক জন অল্প পরিচিত মানুষের কাছে বন্যা তাকে এতটা ভরসা দিয়ে কেন নিয়ে এসেছে, কে জানে! নীলুর বেশ মন খারাপ হল।টেলিফোনে ভদ্রলোক প্রায় এক ঘণ্টা কথা বললেন। খুব জরুরি টেলিফোন বোধহয়। কারণ কথা শেষ করেই তিনি বললেন, আমি আজ একটু ব্যস্ত। অর্থাৎ উঠতে বলা হচ্ছে। বন্যা শুকনো মুখে বলল, একটা কিছু ব্যবস্থা করে দেন মামা। চাকরির ওর খুব দরকার। রাগ হবার মতো কথা। নীলুর চাকরির এমন কিছু দরকার নেই। কিন্তু বন্যা এমনভাবে কথাটা বলল, যেন নীলু ছেলেমেয়ে নিয়ে না খেয়ে আছে।ভদ্রলোক নিরাসক্ত গলায় বললেন, আমাদের এখানে কোনো ওপেনিং নেই। ভবিষ্যতে হবে, এ-রকম আশাও নেই। তবে আমার কাছে পাটিকুলার্স রেখে যান, আমি দু-এক জনকে বলে দেখব।

ও কিন্তু মামা অত্যন্ত ভালো মেয়ে।ভালো মেয়েদের অফিসে দরকার নেই, অফিসে দরকার এফিশিয়েন্ট মেয়ে।ও খুব এফিশিয়েন্ট।বুঝলে কী করে? উনি তো এর আগে অফিসে কোনো কাজ করেন নি।মামা, আপনি একটু দেখবেন।নিশ্চয়ই দেখব। নাম-ঠিকানা এবং একটা বায়োড়াটা আপনি আমার সেক্রেটারির কাছে দিয়ে যান।নীলুর এসব করার কিছুমাত্র ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু বন্যা এমন আগ্রহ নিয়ে এসেছে, তাকে না বলতে খারাপ লাগল। সে এমন ভাব করছে যেন বায়োডাটা লিখে দিলেই তার চাকরি হয়ে যাবে। এমন ছেলেমানুষও থাকে এই যুগে!নীলু বাড়ি ফিরল খুব মন খারাপ করে। এতটা মন খারাপ হবে সে নিজে বুঝতে পারে নি। সে বোধহয় ধরেই নিয়েছিল চাকরিটা হবে। নানা রকম পরিকল্পনাও তার ছিল। প্রতি মাসে মাকে কিছু টাকা পাঠাবে।

বেতন পাবার সঙ্গে সঙ্গেই সে মানি অর্ডার করবে। যত দিন মা বেচে থাকবেন তত দিনই পাঠানো হবে। এ বাড়ির কারোর কিছু বলার থাকবে না। তার নিজের টাকা। দু একটা শখের জিনিস কিনবে। একটা টিভি। একটা ফ্রিজ। একটা হারমোনিয়াম। গানের দিকে তার খুব ঝোঁক ছিল। তার বাবারও ছিল। বাবাই দু, মেয়েকে গান শিখিয়েছিলেন। বাবা মারা যাবার পর কোথায় সব ভেসে গেল! কী চমৎকার গানের গলা ছিল বিলু আপার! বাবা সব সময় বলতেন, আমার এই মেয়ে গান গেয়ে পাগল করে দেবে সবাইকে। কোথায় গেল গান, কোথায় কি! নীলু তার বোনের কথা কখনো ভাবতে চায় না। ওটা যেন একটা দুঃস্বপ্ন।

কোনোকালে তারা যেন কোনো বোন ছিল না। বিলু নামের কাউকে সে চেনে না। কিন্তু তবু একেক সময় এমন পরিষ্কারভাবে বিলু আপার মুখ মনে আসে।–আদুরে, স্নিগ্ধ একটা মুখ! যেন সে বলছে, কিরে নীলু, রোদে ঘুরে তোর মুখটা রাঙা হয়ে আছে। দেখি, বস তো আমার পাশে। নীলু প্রায়ই ভাবে, এত মায়াবতী একটি মানুষ কী করে হয়! কী দুঃখী মেয়েই না ছিল আপা, অথচ কী সুখী—সুখী চেহারা! গভীর দুঃখের কিছুমাত্র ছাপ ছিল না বিলু আপার চোখে। আনন্দ উজ্জ্বল হাসি-হাসি দুটি চোখ।শফিক সাধারণত রাত আটটার মধ্যে এসে পড়ে। সাড়ে আটটা বাজছে, এখনো তার ফেরার নাম নেই। হোসেন সাহেবও ফেরেন নি। কোথায় ঘুরছেন কে জানে। এত দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তাঁর রাগ থাকে না। আজ আছে। রাগ পড়ে নি শাহানারও। এখনো তার ঘরের দরজা বন্ধ। মনোয়ার রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করেছেন, লাভ হয় নি।

নীলু। বারান্দায় এসে দাঁড়াল। দিন খারাপ করেছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বৃষ্টি হলে ভালোই হবে। গুমোট হয়ে আছে। নীলু আকাশের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল।টুনী জেগে উঠেছে। তার হাসি শোনা যাচ্ছে। অদ্ভুত স্বভাব হয়েছে মেয়েটার, ঘুম ভেঙে হাসতে শুরু করে। পৃথিবীর সব বাচ্চারাই জেগে উঠে কাঁদে। শুধু টুনীই বোধহয় হাসে। দূর থেকে টুনীর হাসি শুনতে এমন মজা লাগছে।বৌমা।নীলু চমকে তাকাল। মনোয়ারা টুনীকে কোলে নিয়ে বারান্দায় চলে।একটু হলেই তো সর্বনাশ হত! কী যে কাণ্ড কর তুমি!কী হয়েছে মা? খাটের কিনারে শুইয়ে রেখেছি। নিজে নিজে উঠে বসেছে, একটু হলেই পড়ত। এত অসাবধান হলে চলে? নীলু কিছু বলল না।বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছ কেন? দিন খারাপ করেছে মা।ঘরে আস। দরজা-জানালা বন্ধ করা। বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকার দরকারটা কী?

জানালা বন্ধ করবার আগেই হঠাৎ করে প্রচণ্ড বাতাস বইতে শুরু করল। রীতিমতো ঝড়। ইলেকট্রিসিটি চলে গিয়ে অন্ধকার হয়ে গেল চারদিক। মনোয়ারা টুনীকে কোলে নিয়ে অকারণেই ছোটাছুটি করতে লাগলেন। মোমবাতি খুঁজে পাওয়া গেল না। হারিকেনে তেল নেই। প্রচণ্ড শব্দে বাথরুমের জানালার একটা কাঁচ ভাঙল। মনোয়ারা আকাশ ফাটিয়ে চেঁচাতে লাগলেন, বৌমা, তোমার কি কোনো কালেও বুদ্ধিসুদ্ধি হবে না। ঝড়-বাদলার দিনে হাতের কাছে হারিকেন রাখবে ঠিকঠাক করে–এক ফোঁটা তেল নেই হারিকেনে। এসব কী?

টুনীও ভয় পেয়ে কাঁদতে শুরু করেছে। নীলু বলল, ওকে আমার কাছে দিন মা।মনোয়ারা রেগে গেলেন, অন্ধকারে হাত থেকে ফেলবে। ও থাকুক আমার কাছে। তুমি তোমার কাজ কর।করার মতো কোনো কাজ নেই। নীলু তার ঘরে চলে গেল। ঝামািঝম শব্দে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। গাঢ় অন্ধকার চারদিকে। এক-এক বার বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে আর আলো হয়ে উঠছে চারদিক। পরীক্ষণেই প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ছে। মনে হয় এই কাছেই কোথাও যেন পড়ল। চুপচাপ বসে থাকতে ভালোই লাগছে নীলুর।ভাবী।নীলু। তাকাল। অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে শাহানা এগিয়ে আসছে। নীলু হাসিমুখে বলল, রাগ কমেছে নাকি শাহানা? শাহানা জবাব দিল না। নীলু হালকা গলায় বলল, ওদের কী অবস্থা, কে জানে! কাদের?

বাবা আর রফিক।তোমার বরের কথা তো কিছু বল নি। নাকি ভাইয়াকে নিয়ে তুমি ভাব না? শাহানা উঠে এল খাটের উপর। মৃদুস্বরে বলল, হঠাৎ করে এমন দিন খারাপ হল কীভাবে? যা ভয় লাগছে।ভয়ের কী আছে? টুনী কাঁদছে। মনোয়ারা তাকে শান্ত করবার চেষ্টা করছেন। কোনো লাভ হচ্ছে না। শাহানা বলল, ভাবী, তুমি টুনীকে নিয়ে এস তো।তুমি নিয়ে এস, আমার কাছে দেবেন না।আমি যাচ্ছিটাচ্ছি না।নীলু হালকা গলায় বলল, এত ছোট ব্যাপার নিয়ে এ-রকম রাগ করেচ কেউ? জীবনে রাগ করার মতো অনেক বড়ো বড়ো ব্যাপার ঘটবে।শাহানা মৃদুস্বরে বলল, হঠাৎ করে আমার কেমন যেন রাগ ধরে যায়। আর এ-রকম করব না।মোমবাতি কোথায় আছে জান?

জানি। আমার টেবিলের ড্রয়ারে।একটা মোমবাতি মার ঘরে দিয়ে আস না। টুনী অন্ধকার দেখে কাঁদছে।আমি পারব না ভাবী। তুমি যাও! নীলু। মোমবাতি জ্বলিয়ে মনোয়ারার ঘরে রেখে এল। টুনীর কান্না থেমে গেল সঙ্গে সঙ্গে। হাত-পা ছুঁড়ে খেলা জুড়ে দিল। নীলুর ইচ্ছা হল বলে, ওকে আমার কাছে একটু দিন না মা। কিন্তু সে কিছু বলল না। মনোয়ারা দেবে না।বৌমা, কটা বাজল? নটা পঁচিশ।এ তো মহাচিন্তায় পড়লাম। কোথায় আটকা পড়ল। ওরা কে জানে? এসে পড়বে মা। আপনার দাঁতব্যথা কমেছে? কমেছে।কিছু খাবেন আপনি? দুপুরে তো কিছু খান নি।না, কিছু খাব না। তুমি দেখ, শাহানার রাগ ভাঙাতে পার। কিনা। যন্ত্রণা হয়েছে একটা! ওর রাগ তেঙেছে মা। আমার ঘরে বসে আছে।মনোয়ারা একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন।দরজায় ধাক্কা পড়ছে। নীলু দরজা খুলে দেখল, আনিস দাঁড়িয়ে আছে। কাকভেজা হয়ে গেছে সে।ব্যাপার কী আনিস? অবস্থা কাহিল ভাবী। চা খাওয়াতে পারবেন?

তা পারব। শুকনো কাপড় কিছু পরে আস।শুকনো কাপড় আমার কিছু নেই ভাবী। ঘর ভেসে গেছে। একটা গামছা-টামছা কিছু দিন।এস ভেতরে। শাহানাকে বলছি, কাপড় দেবে তোমাকে! নীলু চা বানিয়ে বসার ঘরে ঢুকে দেখল, অন্ধকারে আনিস এবং শাহানা পাশাপাশি বসে আছে। ওদের বসার ভঙ্গিটার মধ্যেই কিছু একটা ছিল যা দেখে হঠাৎ নীলু একটু চমকাল।ভালোবাসাবাসির কোনো ব্যাপার নেই তো? শাহানার বয়স খুবই কম। এই সময়ে মন তরল থাকে। সবাইকেই ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।দরজায় আবার ধাক্কা পড়ছে। হোসেন সাহেবের গলা পাওয়া যাচ্ছে–ও বৌমা, বৌমা।রাত দশটার মধ্যে ভিজতে ভিজতে সবাই এসে উপস্থিত হল। তুমুল বর্ষণ হল সারা রাত। আনিস থেকে গেল এ বাড়িতে। সোফার উপর বিছানা হল তার, অনেক রাত পর্যন্ত জেগে রইল সে।জেগে রইল শাহানাও। সমস্ত রাত তার মন কেমন করতে লাগল।

আজ প্রথম বারের মতো সে একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করেছে। আনিস ভাই যখন গামছায় তার মাথার ভেজা চুল মুছছে, তখন হঠাৎ তার ইচ্ছা করছিল গামছাটা তার কাছ থেকে নিয়ে নিতে। তার বলতে ইচ্ছা করছিল, আনিস ভাই, মাথাটা নিচু করুন, আমি মুছিয়ে দিচ্ছি। কেন এ-রকম মনে হল? এ-রকম মনে হওয়া নিশ্চয়ই খুব খারাপ। খুব খারাপ মেয়েদেরই নিশ্চয়ই এ-রকম মনে হয়। কিন্তু সে খারাপ মেয়ে হতে চায় না। সে খুব একটা ভালো মেয়ে হতে চায়।

শাহানা চাদর দিয়ে মাথা ঢেকে কাঁদতে শুরু করল। সে অন্ধকারে একা ঘুমুতে ভয় পাবে বলেই মনোয়ারা আজ তার সঙ্গে ঘুমিয়েছেন। তিনি অবাক হয়ে বললেন, কী হয়েছে রে শাহানা, কাঁদছিস কেন? শাহানা ধরা গলায় বলল, জানি না কেন।অদ্ভুত এক ধরনের কষ্ট হচ্ছে শাহানার। এ ধরনের কষ্ট পৃথিবীতে আছে, তা তার জানা ছিল না। মনোয়ারা শাহানার গায়ে হাত বুলিয়ে তাকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করলেন। তিনি কি কিছু বুঝতে পারছেন? মায়েরা অনেক কিছু বুঝে ফেলে।শাহানা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে মা।

কবির সাহেব সাধারণত অন্ধকার থাকতে ঘুম থেকে ওঠেন। হাত-মুখ ধুয়ে হারিকেন জ্বলিয়ে তাঁর পড়ার টেবিলে বসেন। জরুরি লেখালেখির কাজগুলি সূর্য ওঠার আগেই সেরে ফেলা হয়। আজ তেমন কোনো জরুরি লেখালেখির ব্যাপার নেই। অভ্যাস-বশে লেখার টেবিলে বসেছেন। শুধু শুধু বসে থাকার কোনো মানে হয় না, তিনি একটি প্রবন্ধ লিখতে বসলেন। প্রবন্ধের নাম-স্বাধীনতা। প্রথমে ইচ্ছা ছিল মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের ভূমিকা এই বিষয়ে কিছু লিখবেন। প্রতিটি লেখারই নিজস্ব প্ৰাণ আছে। সে লেখাকে ঘুরিয়ে দেয়। এই লেখাটিও সে-রকম হল। তিন পৃষ্ঠা লেখার পর কবির সাহেব লক্ষ করলেন, দেশের স্বাধীনতার প্রসঙ্গে না লিখে তিনি লিখছেন ব্যক্তিগত স্বাধীনতা প্রসঙ্গে। তিনি ভুরু কুচকে লেখাটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর বয়স হয়ে যাচ্ছে, যা ভাবছেন তা লিখতে পারছেন না। এটা বয়সের লক্ষণ। জরার লক্ষণ। সময় কি তাহলে শেষ হয়ে আসছে?

তিনি একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। মানুষের মতো এমন শক্তিধর একটি প্রাণী এত ক্ষীণ আয়ু নিয়ে আসে কেন? একটি কচ্ছপ বাঁচে আড়াইশ বছর। কচ্ছপের আড়াইশ বছর বাঁচার কোনো প্রয়োজন নেই। জীবনের অপচয়।শওকত উঠে পড়েছে। সে সাড়াশব্দ করে ডন-বৈঠক করছে। কবির সাহেব বিরক্ত হয়ে তাকালেন শওকতের দিকে। গুনে গুনে সে পঞ্চাশটা ডন দেবে, তারপর কেরোসিন কুকার জ্বালিয়ে চা বানাতে বসবে। বিরাট একটা জামবাটিতে শরবতের মতো মিষ্টি চা এনে টেবিলে রেখে গালভর্তি হাসি দিয়ে বলবে, স্যার, চা। চা তিনি খান না। বহু বার এই কথা শওকতকে বলা হয়েছে। কোনো লাভ হয় নি। সে কাজ করে তার নিজের ইচ্ছায়। অন্য কেউ কী বলছে না-বলছে, তার কোনো তোয়াক্কা করে না। তার ধারণা, সকালবেলা এক বাটি চা দিয়ে সে স্যারের সেবা করছে, এবং স্যারের আপৰ্ত্তিটা মৌখিক—আসলে তিনি মনে মনে খুশিই হন।

শওকত তাঁর সঙ্গে এসে জুটেছে মাস তিনেক হয়। তবে কবির সাহেবের সঙ্গে তার পরিচয় দীর্ঘদিনের। নীলগঞ্জ স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়বার সময় সে উধাও হয়ে যায়। কোথায় আছে, কী করছে, কেউ বলতে পারে না। মাসখানেক পর খবর পাওয়া গেল সে এক সার্কাস পাটিতে ঢুকে সোহাগী চলে গেছে। নিউ অপেরা সার্কাস। খুব বড়ো দল। কবির সাহেব খবর পেয়ে সোহাগী চলে যান এবং কানে ধরে তাকে নীলগঞ্জে নিয়ে আসেন। কানো ধরা কথাটা মুখের কথা নয়, সোহাগী থেকে নীলগঞ্জ আসার সারাটা পথ তিনি সত্যি সত্যি তার কান চেপে ধরে ছিলেন। পরবর্তী এক বৎসর কোনো রকম ঝামেলা হয় না।

সে ক্লাস এইটে প্রমোশন পায়! ক্লাস এইটেই সে মহা গুণ্ড। হিসেবে নীলগঞ্জে মোটামুটি একটা ত্রাসের সৃষ্টি করে। নীলগঞ্জের চেয়ারম্যান সাহেবের ছোট মেয়ের জামাইয়ের সঙ্গে কী একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঝগড়া করে। এবং লাথি মেরে তার পা ভেঙে ফেলে। কবির সাহেব খবর পেয়ে বেত হাতে তাকে ধরতে যান। তার কোনো খোঁজে পাওয়া যায় না; তব বাবা গ্রামের দরবার ডেকে তাকে ত্যাজ্যপুত্র করে দেন। পুত্রের প্রতি বিরাগ্যবশত এটা অবশ্যি করা হয় না, করা হয় চেয়ারম্যান সাহেবের রোষের হাত থেকে বাঁচবার জন্যে। চেয়ারম্যান হাজি খবিরউদ্দিন খুব সহজ লোক না;

যাই হোক, পরবর্তী চার বছর শওকতের কোনো সন্ধ্যান পাওয়া যায় না। উড়ো খবর আসে, সে চলে গেছে আসাম! এত জায়গা থাকতে আসাম যাবার কারণটি কারোর কাছেই পরিষ্কার হয় না।চার বছর পর এক সকালবেলা কবির সাহেব দেখলেন তাঁর বাড়ির বারান্দায় শওকত ঘুমাচ্ছে। চেনার উপায় নেই। বিশাল জোয়ান।কি রে, তুই কোত্থেকে? স্যারের শরীরটা ভালো? আমি ভালো, তুই এসেছিস কখন? রাইতে।বাড়িতে যাস নি? না, বাড়িত গিয়া কী হইব? এইখানেই থাকবি নাকি?

হুঁ।কবির সাহেবের ধারণা, কিছুদিন থাকবে, তারপর নিজের জায়গায় ফিরে যাবে। কিন্তু এ-রকম কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। খাচ্ছে—দাচ্ছে, আছে নিজের মতো। এর মধ্যে খবর পেয়েছেন, সে খবিরউদ্দিশ্বকে শাসিয়ে এসেছে। বলে এসেছে, বেশি তেড়িবেড়ি করলে বিলের মইধ্যে পুইও থুইয়াম। ভয়াবহ ব্যাপার!কবির সাহেব সরবতের মতো মিষ্টি চায়ের খানিকটা খেলেন। সূর্য উঠি-উঠি করছে। বেরিয়ে পড়বার সময় হয়েছে। সূর্য ওঠার আগেই তিনি সমস্ত গ্রামে একটা চক্কর দিয়ে আসেন।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *