বাগান সত্যিই খুব সুন্দর। দুটি গোলাপঝাড় বাগান আলো করে আছে। শাহানা মুগ্ধকণ্ঠে বলল, বাহ কী সুন্দরা আসমানী চাপা গলায় বলল, এই বাগানের প্রতিটি গোলাপচারা আমার লাগান। কোনটিতে কবে ফুল ফুটিল, সব আমার ডাইরিতে লেখা আছে। এ বাড়িতে কারো বাগানের শখ ছিল না। এই শখ আমার। চল ছাদে যাই, দেখবে কত ধরনের অর্কিড আছে। কত কষ্ট করে একেকটা জোগাড় করেছি। এক বার অর্কিড আনতে গিয়ে দুটি খারাপ লোকের পাল্লায় পড়েছিলাম। ভাগ্যগুণে বেঁচে গেছি।আসমানী ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলল। শাহনার খুব ভালো লাগল মেয়েটিকে। কথা বলার কী সহজ-স্বাভাবিক ভঙ্গি! হাত ধরে-ধরে হাঁটছে। যেন কত দিনকার পুরানো বন্ধু। অথচ এই মেয়েই কী কর্কশ গলায় কাল রাতে ঝগড়া করছিলা! আজও হয়তো করবে। এক জন মানুষের অনেকগুলি চেহারা থাকে। একটি চেহারার সঙ্গে অন্য চেহারার কিছুমাত্র মিল থাকে না।
শাহানা প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল নতুন বাড়িতে নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে। স্রোতের মতো লোকজন আসছে। সবার সঙ্গেই হাসিমুখে কথা বলতে হচ্ছে। আশ্চর্যের ব্যাপার, যারা আসছে সবাই বিত্তবান। কেউ বিলেত ঘুরে এসেছে। কেউ এই সামারে আমেরিকা যাবে। এক জন শাহানাকে বলল, শাহানা যদি শপিং-এর জন্যে কোলকাতা যেতে চায় তাহলে যেন তাকে খবর দেয়। সেও সঙ্গে যাবে। কোলকাতা যাওয়া তো নয়, যেন বায়তুল মুকাররামে বাজার করতে যাওয়া। শাহানা ধাঁধায় পড়ে গেল। বিরক্ত ও বিব্রত বোধ করতে লাগল। সবচে বিরক্ত করল দাড়ি-গোঁফওয়ালা এক প্রৌঢ়। সে শাহানাকে ডাকছে আন্টি করে এবং বেশ উঁচুস্বরেই বলছে তার নেক্সট ছবিতে আন্টিকে একটা রোল করতেই হবে। এ-রকম সুন্দর একটা চেহারা, অথচ বাংলাদেশের লোক সেটা দেখবে না, তা হতেই পারে না। যদি হয়, তাহলে সেটা হবে ক্রাইম। ক্ষমার অযোগ্য একটা অপরাধ।
কী কুৎসিত লোকটির বলার ভঙ্গি, অথচ কেউ রাগ করছে না। বরং মজা পেয়ে হাসছে। খুশি-খুশি গলায় বলছে।–দাও একটা রোল শাহানাকে। মনে হয় ভালোই করবে। যেভাবে ব্লাশ করছে, তাতে ভার্জিন ভিলেজ গার্ল হিসেবে চমৎকার হওয়ারই কথা।কোথায় ছিল শাহানা, আর আজ সে কাঁথায়? পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গে মনও বোধহয় বদলে যায়। এত ভালোবাসত গল্পের বই, অথচ এখন বই নিয়ে বসার কথা মনেই হয় না। তবুও অচিন ব্লাগিনী নামের একটা বই সে বের করেছে। পড়ছে, কিন্তু মন লাগছে না। আগে একটি বই পড়া শুরু করলেই মনে হত গল্পের নায়িকা আসলে সে। এসব তার জীবনের ঘটনা। এখন মনে হচ্ছে না। উপন্যাসের নায়িকার জীবন এবং তার জীবন আলাদা। এত তাড়াতাড়ি মানুষ এত বদলে যায়? এই বাড়িতে কত মানুষ, অথচ কেউ তার পরিবর্তন লক্ষ করছে না কেন? যে-মানুষটি সবচে কাছের হওয়া উচিত, সে-ই কেমন দূরে দূরে আছে।
কী একটা মামলা নিয়ে ব্যস্ত। তাকে নাকি চিটাগাং যেতে হবে। না গেলেই নয়। গত রাতে সে খুব আগ্রহ নিয়ে মামলার কথা বলল– বুঝলে শাহানা, মামলাটা সম্পত্তি নিয়ে। হাজি নুরুল ইসলাম নামে এক বিরাট ধনী ব্যক্তি চিটাগাং-এ থাকেন। জন্মসূত্রে বাড়ি হচ্ছে ঢাকার বিক্রমপুর। ভদ্রলোক অত্যন্ত ধাৰ্মিক। এতিমখানা, স্কুল, কলেজ, মসজিদে বহু টাকা দেন। শুধু তাই না, তিনি একজন আদর্শ স্বামী, আদর্শ বাবা। ভদ্রলোক মারা যাবার পর একটা সমস্যা দেখা গেল। চিটাগাংয়ের খারাপ পাড়ার এক ফ্লেয়ে তাঁর সম্পত্তির বিরাট এক অংশ দাবি করে মামলা রুজু করে দিল। ভদ্রলোক নাকি তাকে দানপত্র করে দিয়ে গেছেন। কাগজপত্র আছে। কেলেঙ্কারি অবস্থা! কেমন ইন্টারেস্টিং না?
হ্যাঁ।তুমি কিন্তু তেমন ইন্টারেস্ট পাও নি। কেমন করে বুঝলাম বল তো? শাহানা চুপ করে রইল। জহির হাসতে-হাসতে বলল, তুমি জানতে চাও নি আমি কোন পক্ষের হয়ে মামলায় নেমেছি। তা থেকেই বুঝলাম।জহির শব্দ করে হাসতে লাগল। কাউকে হাসতে দেখলেই হাসতে ইচ্ছে করে। শাহানাও হেসে ফেলল। জহির অবাক হওয়ার মতো ভঙ্গি করে বলল, তুমি আবার হাসতেও জান নাকি? অবাক করলে তো! আমি এক মেয়েকে জানতাম, সে কিছুতেই হাসত না। যত হাসির কথা বলা হোক, সে গম্ভীর হয়ে থাকত। শেষটায় রহস্য জানা গেল।কী রহস্য?
হাসলে মেয়েটাকে খুব বাজে দেখাত।সত্যি? হ্যাঁ, কাউকে কাউকে বাজে দেখায়। আচ্ছা শোন শাহানা, একটা কাজ করলুব্ধ হয়? তুমিও আমার সঙ্গে চিটাগাং চল।আমি? হাঁ, তুমি। চিটাগাং-এর কাজ শেষ করে তোমাকে নিয়ে নেপাল থেকে ঘুরে আসব। এই সময়টা নেপালে যাবার জন্যে ভালো নয়। তবু খারাপ লাগবে না, আমি কয়েক বার গিয়েছি। যাবে? যাব।তোমাদের বাসায় এখন কিছু জানানোর দরকার নেই। নেপাল পৌঁছে সবার নামে একটা করে ভিউকার্ড পাঠিয়ে দেবে। আইডিয়াটা কেমন? ভালো না? হ্যাঁ, ভালো।এমন শুকনো মুখে বলছি কেন? হাসিমুখে বল।শাহানা হাসল। জহিরের সঙ্গে কথা বলতে তার বেশ ভালোই লাগছে। কে জানে, এই লোকটির সঙ্গে তাঁর জীবন হয়তো খুব খারাপ কাটবে না।টলম্যান শফিককে ডেকে পাঠিয়েছে।
বেয়ারা দিয়ে ডেকে পাঠানো নয়–একটা নোট দিয়েছে, যার অর্থ দুপুর এগারটায় আমার সঙ্গে দেখা করবে–জরুরি।জরুরি কিছু তো মনে হচ্ছে না। সাধারণ কিছু হলে নোট পাঠ্যত না। দুই উঠে এসে বলত, শফিক আমার ঘরে এস, একসঙ্গে চা খাব। টী-ব্রেক।যতই দিন যাচ্ছে, লোকটিকে শফিকের ততই পছন্দ হচ্ছে। তীক্ষ্ণ বুদ্ধি। অফিস ম্যানেজমেন্ট সম্পর্কে জলের মতো স্বচ্ছ ধারণা। শুধু অ ম্যানেজমেন্ট নয়–এডভারটাইজিং, পারলিক রিলেশন সবই তার নখদর্পণে। শুধু একটি সমস্যা, কারোরই কাজ করার কোনো স্বাধীনতা নেই, সব কাজ সে একাই করছে। বিভাগীয় প্রধানদের এখন আর কিছু করার নেই।
শ্রমিক-সমস্যা সে মোটামুটি ধামাচাপা দিয়েছে, পদ্ধতিটিও চমৎকার। শ্রমিকদের প্রধান দাবি ছিল–দুটি ঈদ বোনাস, যাতায়াত ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, বাড়িভাড়া।সে দুটির জায়গায় তিনটি বোনাস দিয়ে দিল! যাতায়াত ভাতা দেওয়া হল না। ঠিক হল, বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে গাড়ি ওদের নিয়ে আসবে এবং দিয়ে আসবে। ওদের দাবি ছিল মাসে পঞ্চাশ টাকা চিকিৎসা ভাতা, সেটাকে করা হল পাঁচোত্ত্বর। মূল বেতনের বিশ ভাগ বাড়ি ভাড়া দেওয়া হল এবং ঘোষণা দেওয়া হল, এক বৎসরের মধ্যে প্রতিটি শ্রমিকের বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।শ্রমিকদের জন্যে অপ্রত্যাশিত বিজয়। তারা আন্দোলনের সাত জন মূল নেতাকে গলায় মালা দিয়ে কাঁধে করে নাচতে লাগল। তাদের বিজয়–উল্লাসে বারবার শোনা গেল।–শ্রমিক-বন্ধু টলম্যান, জিন্দাবাদ। উৎসাহের প্রথম ধাক্কাটা কেটে যাবার পরপর দেখা গেল টলম্যান সাত জন শ্রমিক-নেতাকে বরখাস্ত করেছে।
টলম্যান নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, আমার আদেশের কোও রকম নড়চড় হবে না। তোমাদের কথা আমি মেনে নিয়েছি, তোমরা আমার কথা মানবে। যদি না মান, কারখানা বন্ধ করে চলে যাব। এই ক্ষমতা আমাকে দেওয়া হয়েছে। এক দিনের ছুটি তোমাদের দেওয়া হল। তোমরা চিন্তা-ভাবনা কর। এক দিন কারখানা বন্ধ থাকবে। মন ঠিক করা, কাজ করবে কি করবে না। যে এক দিন ছুটি দেওয়া হল, সেই এক দিন একটু কষ্ট করে খোঁজ নেবে, অন্য কারখানায় শ্রমিকরা কী সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। আচ্ছা, এখন যেতে পার। পরশু সকাল নটায় যারা কাজে যোগ দেবে না, তাদের চাকরি বাতিল ধরা হবে। পরবর্তী সময়ে এই নিয়ে কোনোরকম দেন-দরবার চলবে না।
টলম্যান বাংলা জানে না। সে কথা বলল ইংরেজিতে। শফিককে অনুবাদ করে দিতে হল। শ্রমিকরাও কথা বলছিল। শফিক তার ইংরেজি করে দিতে গেলে টলম্যান শুকনো গলায় বলল, ওরা কী বলছে, তা শোনার আগ্রহ আমার নেই, প্রয়োজনও নেই। আমি কী বলছ তুমি শুধু সেটাই ওদের কাছে পৌঁছে দেবে।আমার মনে হয়। ওদের কথাও জানা থাকা ভালো।শুধু তোমার মনে হলে তো হবে না, আমারও মনে হতে হবে। আমার সে-রকম মনে হচ্ছে না।অফিসের রামেশ্বর বাবুরও চাকরি চলে গেল। এমন যে ঘটবে, কেউ কল্পনাও করে নি। রামেশ্বর বাবু নিরীহ নিবিরোধ মানুষ।
কারো সাতেপাঁচে নেই। পানের কৌটা নিয়ে অফিসে আসেন। একটু পরপর পান খান। পায়ের কাছে পিকদানিতে পিক ফেলেন। একদিন টলম্যান তাঁকে ডেকে পাঠাল। ভালো আছেন? জ্বি স্যার। দুদিনের ক্যাজুয়েল নিয়েছিলেন, অসুখ সেরেছে? জ্বিস্যার।কী অসুখ? ও, আচ্ছা। নাতনীর অসুখ, আপনার নিজের কিছু না? জ্বি-না, স্যার।আপনি দুদিনের ছুটি নিয়েছিলেন, কিন্তু এসেছেন চারদিন পর। বাড়তি দু দিনের ব্যাপারে কিছুই করেননি। মনে হয় ভুলে গিয়েছিলেন।জ্বি স্যার।অফিস নটার সময় শুরু হয়, কিন্তু আপনি কোনো দিন সাড়ে দশটার আগে আসতে পারেন না।অনেক দূরে থাকি স্যার, রামপুরা।এখন তো অফিসের বাস যায়। দূরে থাকলেও অসুবিধা হবার কথা নয়।
এত সকালে ভাত রান্না হয় না স্যার।আপনি বাড়ি যান খুব সকাল-সকাল। ঠিক না? রামেশ্বর বাবু কোনো জবাব দিলেন না। প্রচুর ঘামতে লাগলেন। টলম্যান বলল, গত এক মাসে আপনি কখন অফিসে এসেছেন কখন গিয়েছেন সব লিখে রেখেছি। এই কাগজে আছে। নিন, পড়ে দেখুন।রামেশ্বর বাবু কাগজের উপরে চোখ বুলিয়ে গেলেন। কিছু পড়লেন বলে মনে হল না।ঠিক আছে, এখন যেতে পারেন।তিনি নিজের চেয়ারে এসে পানের কোটা খোলামাত্র টলম্যানের চিঠি চলে এল যার রক্তব্য হচ্ছে-এই অফিস মনে করছে তোমার চাকরি অফিসের কল্যাণে আসছে না। সম্ভবত অফিসের কাজে তোমার মন বসছে না। কাজেই-। সার কথা চাকরি শেষ।
রামেশ্বর বাবুর জন্যে সুপারিশ নিয়ে অনেকেই গিয়েছিল টলম্যানের কাছে। সেই অনেকের এক জন হচ্ছে শফিক। টলম্যান হাসিমুখে বলেছে, দয়া দেখাবার কথা তুমি বলছি কেন? দয়া দেখাবে দাঁতব্য প্রতিষ্ঠানগুলি। এটা কোনো দাঁতব্য প্রতিষ্ঠান নয়। আমরা এদেশে টাকা কামাতে এসেছি। এই সহজ। সাধারণ সত্যটি তোমরা যত তাড়াতাড়ি পার ততই ভালো।রামেশ্বর বাবু অনেক দিন এই র জন্যে কাজ করেছেন। কোম্পানির তাঁর প্রতি দায়িত্ব আছে।উনি বিনা বেতনে চাকরি করেন নি। কাজেই কোম্পানির দায়িত্বের প্রশ্নটা কেন আসছে? এই ব্যাপারটি নিয়ে আমি আর কথা বলতে চাই না। তুমি অন্য কোনো প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ করলে করতে পার। তোমাদের দেশের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা কোনটি বল তো? সুন্দরবনের কথা খুব শুনছি। কীভাবে যাওয়া যায়?
টলম্যানের নোটটি শফিকের সামনে। এগারটা বাজতে এখনও দশ মিনিট। শফিক লক্ষ করল, তার মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করছে।–যার কোনো কারণ নেই। সে চা দিতে বলল। না বললেও হত। টলম্যানের কাছে যাওয়া মানেই প্রথম এক কাপ চা খাওয়া। এই চা সে নিজে বানায়। পানি গরম করা থেকে দুধ চিনি মেশানো পর্যন্ত সে নিজেই করে। অধস্তন যে-মানুষটির জন্যে চা বানান হচ্ছে, সে অস্বস্তি বোধ করে। এটাও বোধহয় অফিস ম্যানেজমেন্টের একটা অঙ্গ।আজ টলম্যান চায়ের কথা বলল না। ফুর্তিবাজের ভঙ্গিতে বলল, দুপুরে আজ তুমি আমার সঙ্গে লাঞ্চ করবে। অসুবিধা আছে?
না স্যার।কোনো একটা ভালো রেস্তোরাঁয় যাই চল। তুমি কি মদ্য পান কর? না।আমিও করি না, তবে কোনো স্পেশাল অকেশন হলে খানিকটা করি।আজ কি কোনো স্পেশাল অকেশন? না। স্পেশাল কিছু না। আর দশটা দিনের মতো সাধারণ একটা দিন। ভালো রেস্তোরী কি আছে এখানে? মেক্সিকান ফুড পাওয়া যায়? না। তবে বড়ো হোটেলগুলি মাঝে মাঝে মেক্সিকান নাইট, স্প্যানিশ নাইট এইসব করে, তখন পাওয়া যায়।চল, ভালো, একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে যাওয়া যাক।আপনি কি আমাকে কিছু বলবেন?
হ্যাঁ, বলব। খেতে-খেতে বলব।খেতে-খেতে যে কথাগুলি টলম্যান বলল, শফিক তার জন্যে প্রস্তুত ছিল না।প্রায় দু বছর আগে আগস্ট ফিফটিনথ এক ব্যাচ ওষুধ তৈরি হয়েছিল, যা নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে বাতিল করে দেওয়া হয়। তোমার মনে আছে? মনে নেই। কাগজপত্র দেখতে হবে।কাগজপত্র আমার সঙ্গে আছে, তুমি দেখতে পার! তুমি ছিলে প্রডাকশান সুপারভাইজার, তোমার সই আছে।সই থাকলে ঠিক আছে।না, ঠিক নেই। কারণ কারখানার লগবুকে ঐ দিন ঐ তারিখে কোনো গুয়ারির কথা নেই। ঐ দিন কোনো ওষুধ তৈরি হয়। নি। নষ্ট করার প্রশ্নই ওঠে না।
শফিক তাকিয়ে রইল। টলম্যান ঠাণ্ডা গলায় বলল, তার তিন মাস পর তুমি আশি হাজার টাকার একটা চেক ইসু করেছ স্টোরের দুটি এয়ারকুলার কেনার জন্যে। সেই এয়ার কুলার কেনা হয় নি, চেক কিন্তু ভাঙানো হয়েছে।শফিক কিছু বলল না। টলম্যান বলল, ঐ মাসেই তার দিন দশকের ভেতর মিডার্ন কার নামের এক এজেন্সিকে গাড়ি কেনা বাবদ অগ্রিম এক লক্ষ টাকা দেওয়া হয় ফরেন করেন্সিতে-ছ হাজার ডলার। মডার্ন কার বলে কোনো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নেই। যে ঠিকানা দেওয়া হয়েছে, ঐ ঠিকানারও কোনো অস্তিত্ব নেই। তুমি কিছু বলবে? না।কাগজপত্র সব নিয়ে এসেছি, দেখতে পার। প্রয়োজন বোধ করলে আমার সঙ্গে ডিসকাস করতে পার। তুমি কি দায়িত্ব অস্বীকার করতে চাও? না। অস্বীকার করার পথ কোথায়?
দ্যাট্স রাইট, অস্বীকার করবার পথ নেই। এটা একটি জটিল চক্রান্ত। আমার ধারণা, তোমাকে ব্যবহার করা হয়েছে। চিংড়ি মাছটা খাও, ভালো বানিয়েছে। এতটা স্পাইসি না করলেও পারত। আমার তো জিব পুড়ে গেছে।টলম্যান রুমালে মুখ মুছল। চেয়ারে বুলিয়ে রাখা কোটের পকেট থেকে মুখবন্ধ একটা খাম বের করে এগিয়ে দিল শফিকের দিকে। সহজ গলায় বলল, সরি। আই হ্যাভ টুবি ক্রুয়েল ওনলি টু বি কাইণ্ড। তোমাকে আপাতত সাসপেও করা হল। পুরো তদন্ত হবে। তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পার।–তদন্ত হবে নিরপেক্ষ। চিঠিটা খুলে পড়। হাতে নিয়ে বসে আছ কেন? শফিক চিঠি খুলল, মূল সাসপেনশন অর্ডারের সঙ্গে পেনসিলে টলম্যানের লেখা একটা নোট। নোটের ভাবাৰ্থ হচ্ছে, আমি খুবই দুঃখিত। এই ব্যাপারটা সহজ ভাবে নিতে চেষ্টা কর।
শফিক অসময়ে বাড়ি ফিরেছে। নীলুও সকাল-সকাল এসেছে। তার শরীর ভালো লাগছিল না।–ছুটি নিয়ে এসেছে। শফিককে দেখে হঠাৎ তার মনটা ভালো হয়ে গেল। সে খুশি-খুশি গলায় বলল, আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল বাসায় এসে তোমাকে দেখব।তাই নাকি? হ্যাঁ। আচ্ছা চল না একটা কাজ করি, কোথাও বেড়াতে যাই। যাবে? নীলুকে অবাক করে দিয়ে শফিক বলল, চল যাই। কোথায় যেতে bia? সত্যি যাবে? হ্যাঁ, যাব।নীলু তৎক্ষণাৎ চুল বাঁধতে বসিল, শফিক যাতে মত বদলাবার সময় না। পায়। আগে এ-রকম হয়েছে, বেড়াতে যাবার জন্যে রাজি হয়ে শেষ মুহূর্তে বলেছে, আজ না গেলে হয় না? শরীরটা কেমন যেন ম্যাজম্যাজ করছে।শফিক পা ঝুলিয়ে খাটে বসেছে। তার মুখ দেখে মনের আঁচ পাওয়া যায় না। তবু নীলুর মনে হল শফিক কিছু একটা নিয়ে চিন্তিত।নীলু বলল, শাহানার কাণ্ড শুনেছ? না। কী কাণ্ড?
আজ জহিরকে নিয়ে কাঠমুণ্ড চলে গিয়াছে। কাউকে কিছু বলে নি। রফিক টুনি আর বাবলুকে নিয়ে ও বাড়িতে গিয়ে শোনে, কিছুক্ষণ আগে এযারপোর্ট রওনা হয়েছে।ভালোই তো।আমাদের কাউকে কিছু জানাল না কেন কে জানে। আসুক জহির, ওকে ধরব শক্ত করে।টুনি, বাবলু ওরা কোথায়? ছাদে। এখন ওদের ডাকাডাকি করবে না। বেরুচ্ছি। দেখলে আর রক্ষা থাকবে না, সঙ্গে যাবার জন্যে হৈচৈ শুরু করবে। তুমি কি এক কাপ চা খাবে? না।আচ্ছা শোন, তুমি কি কোনো কিছু নিয়ে চিন্তিত নাকি? কেমন যেন অন্য রকম লাগছে তোমাকে? না, চিন্তিত না।এই শাড়িতে কি আমাকে ভালো দেখাচ্ছে? হাঁ দেখাচ্ছে। কোথায় যাবে কিছু ঠিক করেছ? আমার এক বান্ধবীর বাসা আছেনয়া পন্টনে, যাবে?
চল যাই।নয়া পল্টনের বাসায় নীলুর বান্ধবীকে পাওয়া গেল না। তারা ঘরে তালা দিয়ে কোথায় যেন গিয়েছে। নীলুর অসম্ভব মন খারাপ হল।শফিক বলল, অন্য কোথাও চল। তোমার আরো বান্ধবী আছে নিশ্চয়ই।থাক, এমনি চল রাস্তায় একটু হাঁটি।শফিক তাতেও রাজি। তারা কিছুক্ষণ হাঁটল। নীলু একটি মিষ্টি পান কিনল। রাস্তায় দু টাকা করে বেলি ফুলের মালা বিক্রি হচ্ছে। নীলুর একটা কিনতে ইচ্ছা হচ্ছে, আবার বলতে লজ্জাও লাগছে। আশ্চর্য কাণ্ড, নীলুকে অবাক করে দিয়ে শফিক বেলি ফুলওয়ালার দিকে এগিয়ে গেল। কত সামান্য ব্যাপার, অথচ এতেই নীলুর হৃদয় আবেগে পূর্ণ হল।
তার মনে হতে লাগল, এই পৃথিবীতে তার মতো সুখী মেয়ে আর একটিও নেই। তার ইচ্ছে করছে শফিকের হাত ধরে হাঁটতে। আজকাল ছেলেমেয়েরা কেমন সুন্দর হাত ধরাধরি করে হাঁটে। দেখতে ভালো লাগে। দিন বদলে যাচ্ছে। নতুন দিনের সবই যে ভালো তা নয়, কিন্তু কিছু কিছু জিনিস ভালো।শফিক বলল, আরো হাঁটবো? তোমার হাঁটতে ভালো লাগছে না? লাগছে।জান, আজ শরীরটা ভালো লাগছিল না বলে সকাল—সকাল চলে এসেছিলাম, এখন এত চমৎকার লাগছে! হাসলে এই গম্ভীর মানুষটাকে এত সুন্দর লাগে! অথচ এই একেবারেই হাসে না।নীলু নরম সুরে বলল, আমার একটা কথা শুনবে? হ্যাঁ, শুনব।চল না। আজ আমরা বাইরে কোথাও খাই। কোনো নিরিবিলি রেস্টুরেন্টে। যাবে?
চল যাওয়া যাক।তোমার মন থেকে ইচ্ছে না করলে থাক।শফিক হেসে বলল, আমার ইচ্ছে করছে। টাকা আছে তো তোমার কাছে? আমার মানিব্যাগ ফাঁকা।টাকা আছে। বেশি কিছু তো আর খাব না।রেস্টুরেন্টে বসে নীলুর একটু খারাপ লাগল। বেচারি টুনিকে ফেলে একা-একা খাওয়া। সে হয়তো না খেয়ে বাবা-মার জন্য বসে থাকবে।নীলু বলল, কিছু খাওয়ার দরকার নেই, চল বাসায় চলে যাই। বরং দুটো কোন্ড ড্রিংকের অর্ডার দাও, নয়তো এরা আবার কী ভাববে।শফিক মেনু দেখে একগাদা খাবারের অর্ডার দিল।নীলু বলল, এত কে খাবে?
টুনি খাবে। প্যাকেটে করে বাসায়নিয়ে যাব।এটা ভালোই করেছ, টাকায় শর্ট পড়বে না তো? আমার কাছে তিন শ টাকা আছে।শর্ট পড়লে কোটি খুলে রেখে দেব।বলতে-বলতে শফিক শব্দ করে হাসল। খাবারগুলি চমৎকার। কিংবা কে জানে অনেক দিন পর বাইরে খেতে এসেছে বলেই হয়তো এত ভালো লাগছে। মাঝে মাঝে এমন এলে হয়। তা কি আর সম্ভব হবে? কতগুলি টাকা আজ দিতে হবে! হিসেবের টাকা।শফিক বলল, চুপচাপ খােচ্ছ কেন, কথা বল।কী বলব? মজার মজার কিছু গল্প বল।মজার গল্প বুঝি আমি জানি? তুমি বরং একটা গল্প বল।শফিক কি একটা বলতে গিয়ে বলল না। রুমাল দিয়ে মুখ মুছে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল, খেতে ইচ্ছা করছে না।কেন?
জানিনা। শরীরটা বোধহয় খারাপ। শরীর খারাপ, তাহলে এলে কেন? তোমার সঙ্গে কখনো আসা হয় না। সুযোগ হল একটা। নীলু দেখল, শফিক আবার হাসছে। কী চমৎকারই না তাকে লাগছে। গ্রে কালারের এই কোটটায় কী সুন্দর মানিয়েছে! নীলুর খুব ইচ্ছা করছে শফিকের কোলে একটা হাত রাখে। মজার কোনো একটা গল্প বলে শফিককে আবার হাসিয়ে দেয়। তার চোখ ভিজে উঠতে শুরু করেছে।শাহানার এই প্রথম প্লেনে চড়া।আকাশে ওড়বার মতো বিরাট একটা ব্যাপার ঘটে যাচ্ছে, কিন্তু তার জন্যে যতটা উত্তেজিত হওয়া উচিত ততটা উত্তেজিত সে হচ্ছে না। অথচ প্রথম টেনে চড়ার উল্লাস তার এখনও মনে আছে।
