বাড়িওয়ালা করিম সাহেব বাসাতেই ছিলেন। পানি এখনো ছাড়া হয় নি। শুনে তিনি খুব হৈচৈ করতে লাগলেন। বারবার বললেন, এই সামান্য কাজের জন্যে আপনি নিজে আসলেন প্রফেসর সাহেব।–বড় লজ্জায় ফেললেন আমাকে! ছিঃ ছিঃ ছিঃ! মিসির আলি সাহেব বললেন, একটা টেলিফোন করা যাবে করিম সাহেব? একটা কেন, এক শটা করা যাবে। যখন ইচ্ছা তখন করা যাবে। দরকার হলে ট্রাংকল করবেন–খুলনা ময়মনসিংহ বরিশাল। টেলিফোনের বিল আবদুল করিমকে কিছু করতে পারবে না, বুঝলেন প্রফেসর সাহেব? ওরে, টেলিফোনটা প্রফেসর সাহেবকে এনে দে। আর দেখ, ঠাণ্ডা পেপসি বা সেভেন আপ কিছু আছে কি না।
কিছু লাগবে না।আপনি না বললেই হবে নাকি? আপনার একটা ইজ্জত আছে না? ছয় মাসে এক বছরে একবার আসেন। আমি বলতে গেলে রোজই বসে থাকি আপনার ওখানে আপনি ফ্যানটার নিচে ঠাণ্ডা হয়ে বসেন তো দেখি।মিসির আলি বসলেন। বাড়িওয়ালা করিম সাহেব মিসির আলিকে একটু বিশেষ রকম স্নেহ করেন। গত দুবছরে তিনি প্রতিটা ফ্লাটের ভাড়া তিন দফায় বাড়িয়েছেন। শুধু প্রফেসর সাহেবের ভাড়া এক পয়সাও বাড়ে নি। কেন বাড়ে নি কে জানে?
ফিরোজের মাকে টেলিফোনে পাওয়া গেল। তাঁর কাছ থেকে যে-সমস্ত তথ্য জানা গেল, সেগুলো হচ্ছে–ফিরোজ ভালো আছে, সুস্থ এবং স্বাভাবিক। তার ঘরে একটি মাইক্রোফোন বসিয়ে ঘরের যাবতীয় শব্দ টেপ করা হয়েছে। টেপগুলো তিনি সন্ধ্যাবেলা পাঠাবেন।ফিরোজের মা চিন্তিত স্বরে বললেন, আপনি অসুস্থ বলেছিলেন কেন? আমরা খুব ভয়ে-ভয়ে রাতটা কাটালাম। আপনার ওখানে সে কিছু করেছিল নাকি? না, তেমন কিছু করে নি। একটু উদভ্ৰান্ত মনে হচ্ছিল। ফিরোজ কি আছে ঘরে?
হ্যাঁ, আছে। কথা বলবেন?
বলব। দিন ওকে।
ফিরোজের গলা শান্ত ও স্বাভাবিক।
কেমন আছ ফিরোজ?
ভালো।
কী করছিলে?
কিছু করছিলাম না। একটা উপন্যাস নিয়ে বসেছিলাম।
কার উপন্যাস?
জন ষ্টেইনবেক। নাম হচ্ছে গিয়ে আপনার, সুইট থার্সডে। স্যার, আপনি পড়েছেন এটা?
গল্প-উপন্যাস আমি পড়িটড়ি না। এক জন লেখকের বানানো দুঃখ-কষ্টের বিবরণ পড়ে কী হয় বল? এমনিতেই আমাদের চারদিকে প্রচুর দুঃখ-কষ্ট আছে।
স্যার, আপনাকে বইটা পড়তেই হবে। আমার পড়া শেষ হলেই আপনাকে দিয়ে আসব।
আচ্ছা, ঠিক আছে। শোন ফিরোজ।
বলুন।
কাল রাতে তোমার কেমন ঘুম হয়েছিল?
ভালো।
কী রকম ভালো?
খুব ভালো। এক ঘুমে রাত পার করেছি। কি জন্যে জিজ্ঞেস করছেন স্যার?
এমনি জানতে চাচ্ছি। কোনো স্পেসিফিক কারণ নেই! তুমি কি কাল রাতে কোনো স্বপ্ন দেখেছ?
জ্বি-না স্যার।
চট করে না বলে দিও না। চিন্তা করে তারপর বল।
এবার ও সময় নিল জবাব দেয়ার আগে।
একটা স্বপ্ন দেখেছি। আর ওটা তো আমি প্রায়ই দেখি।
কোনটা?
ঐ যে, ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিচ্ছি, তারপর দেখি কোনো প্রশ্নের উত্তর জানি না।
এটা ছাড়া আর কোনো স্বপ্ন দেখ নি?
জ্বি-না।
শোন ফিরোজ, এ ছাড়াও যদি অন্য কোনো স্বপ্নের কথা মনে পড়ে, আমাকে জানিও।
জ্বি আচ্ছা!
তুমি কি আজ সন্ধ্যার দিকে এক বার আসবে?
না স্যার, আজ আসব না। বইটা শেষ করব।
প্রেমের উপন্যাস নাকি?
ফিরোজ লাজুক স্বরে বলল, হুঁ।
টেপগুলো পরীক্ষা করতে-করতে রাত তিনটা বেজে গেল। প্রথম চারটি টেপে তেমন কিছু নেই। এক বার শুধু কিছুক্ষণের জন্যে আহ্ উহ শব্দ। সেটা স্বপ্ন দেখার জন্যে, কিংবা বেকায়দা অবস্থায় শোয়ার জন্যে। তবে শেষ টেপটিতে মিসির আলির জন্যে বড় ধরনের বিস্ময় অপেক্ষা করছিল।তিনি বিচিত্র একটি কণ্ঠস্বর শুনলেন সেখানে। তীক্ষ্ণ তীব্ৰ। হাই ফ্রিকোয়েন্সি—
কথাগুলো এ-রকম :
অপরিচিত কণ্ঠস্বর : হুঁ হুঁ ফিরোজ। ফিরোজ … (অস্পষ্ট)
ফিরোজের কণ্ঠস্বর : না। না। উহুঁ না!
অপরিচিত : লোহার রাডটা কোথায়?
ফিরোজ : জানি না, আমি জানি না।
অপরিচিত : (অস্পষ্টভাবে কিছু বলল)। নিঃশ্বাসের শব্দ।
ফিরোজ : না। না। না।
অপরিচিত : লোহার রড। রড।
ফিরোজ : না। না!
অপরিচিত : (অস্পষ্টভাবে কিছু কথা)। হাসির শব্দ।
মিসির আলি অসংখ্যাবার এই অংশটি বাজিয়ে-বাজিয়ে শুনলেন। অস্পষ্ট অংশগুলো উদ্ধার করতে পারলেন না। অপরিচিত যে-কণ্ঠস্বর শুনছেন, তা ফিরোজেরই কণ্ঠস্বর। এটি তার একটি দ্বিতীয় সত্তা। সেকেণ্ড পারসোনালিটি। ফিরোজকে পুরোপুরি সুস্থ করতে হলে তার দ্বিতীয় সত্তাটিকে ভালোভাবে বুঝতে হবে।হানিফা ছটফট করছে। তার জ্বর কমে নি। এখন এক শ দুইয়েরও কিছু বেশি। মিসির আলি চিন্তিত বোধ করলেন। রাত দশটার দিকে জ্বর অনেক কম ছিল। নিরানব্বুই পয়েন্ট পাঁচ। এখন এত বাড়ল কেন? হানিফা জেগে আছে। কিন্তু কোনোরকম সাড়াশব্দ করছে না। মিসির আলি কোমল গলায় বললেন, খারাপ লাগছে নাকি রে বেটি?
না।
মাথার যন্ত্রণা আছে?
আছে।
বেশি?
জ্বি।
মাথা টিপে দেব?
হানিফা লজ্জিত স্বরে বলল, জ্বি-না।
না কেন? আরাম লাগবে। তার আগে মাথায় পানি ঢেলে জ্বরটা কমাতে হবে।
তিনি বাথরুমে ঢুকলেন পানির বালতির খোঁজে। তাঁর নিজের শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। মাথা ভার ভার লাগছে। বমি-বমি লাগছে। শুয়ে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে। কিন্তু একটি বাচ্চা মেয়ে জ্বরে ছটফট করবে, আর তিনি শুয়ে থাকবেন–এটা হয় না।
হানিফার এ-বাড়িতে আসার ইতিহাস বেশ বিচিত্র। গত বছর জুলাই মাসের দিকে একবার বেশ বড় একটা ঝড় হল; রাত একটায় জেগে উঠে দেখেন, দড়ামদুডুম শব্দে জানালার পাট আছড়ে পড়ছে। ছাটে ঘর ভেসে যাচ্ছে ইলেকট্রিসিটি নেই। চারদিক অন্ধকার। মোটামুটি একটি ভয়াবহ অবস্থা। তিনি জানালা বন্ধ করতে গিয়ে দেখলেন, আট ন বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে এক-একা দেয়াল ঘেঁষে বসে আছে।
কে রে তুই?
মেয়েটি ভয়-পাওয়া স্বরে বলল, আমি।
এখানে কী করছিস?
ঘুমাইতাছি।
জেগে জেগে ঘুমাচ্ছিস নাকি?
মেয়েটি জবাব দিল না।
বাপ-মা কোথায়?
মেয়েটি নিরুত্তর!
তোর বাবা-মা নেই।
না।
আত্মীয়স্বজন কেউ নেই?
না।
তুই কি এ-রকম এক-একা মানুষের বারান্দায় ঘুমোস নাকি?
মেয়েটি জবাব দিল না। মিসির আলি বললেন, ভয় লাগছে না তোর?
না।
বলিস কী! নাম কি তোর?
হানিফা।
আয়, ভেতরে আয়। ইস্, ভিজে জবজবে হয়ে গেছিস তো।
মিসির আলি হারিকেন জ্বালিয়ে তাকালেন মেয়েটির দিকে ছেলেদের মতো ছোটছোট করে কাটা চুল। আদুরে একটা মুখ।
তোর বাপের নাম কি?
জানি না।
বলিস কী! মার নাম?
জানি না।
তোর হাতে কী? মুঠোর ভেতর কী আছে?
হানিফা মুঠি খুলল। ভাংতি পয়সা।
ভিক্ষা করে পেয়েছিস?
হুঁ।
মিসির আলি গুনলেন। দু টাকা ত্রিশ পয়সা। এই বিশাল পৃথিবীতে আগামীকাল এই মেয়েটি যাত্রা শুরু করবে–দুই টাকা ত্রিশ পয়সা, একটা নোংরা ফ্রক এবং একটা তালি দেয়া প্যান্ট নিয়ে। কোনো মানে হয়?
তিনি একটি শুকনো লুঙ্গি বের করলেন। গম্ভীর গলায় বললেন, কাপড় বদলে এটা পরে ফেল। নিউমোনিয়া বাধাবি তো! ঐ ঘরে একটা বিছানা আছে, ওখানে গিয়ে শুয়ে থাক।মিসির আলি ভেবেছিলেন, সকাল হলেই সে চলে যেতে ব্যস্ত হয়ে যাবে। এক বার যাযাবর জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে গেলে বন্ধন আর ভালো লাগে না। কিন্তু হানিফা সকালবেলা চলে যাবার কোনো রকম লক্ষণ দেখাল না। এমনভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগল, যেন এইটি তার ঘরবাড়ি।
হানিফার প্রতি সমাজের যে দায়িত্ব ছিল, মিসির আলি তা পালন করেছেন। নিজেই তাকে পড়তে শিখেয়েছেন। যোগ ভাগ গুণ শিখিয়ে নিয়ে গেছেন স্কুলে ভর্তি করাবার জন্যে। কেউ ভর্তি করাতে রাজি হয় নি। এত বড় মেয়েকে ক্লাস ওয়ানে অ্যাডমিশন দেয়ানো সম্ভব নয়। তিনি হানিফাকে বলেছেন, ঠিক আছে, তুই ঘরে বসেই পড়াশোনা চালিয়ে যা। যথাসময়ে প্রাইভেটে তোকে দিয়ে ম্যাট্রিক দেওয়াব। আমি নিজে তো সব সময় দেখতে পারি না। এক জন মাষ্টার রেখে দেব।শেষরাতের দিকে হানিফার জ্বর কমে এল। শরীর ঘামতে লাগল। সে বিড়বিড় করে নানান কথা বলতে লাগল। মেয়েটির বিড়বিড় করে বলা কথাগুলো থেকেই মিসির আলি বড় ধরনের একটি আবিষ্কার করলেন। তাঁর বিস্ময়ের সীমা রইল না।
এই প্রসঙ্গে যথাসময়ে বলা হবে।
সাইকোলজি বিভাগের সভাপতি ডঃ সাইদুর রহমানের মেজাজ সকাল থেকেই খারাপ। মেজাজ খারাপের প্রধান দুটি কারণের একটি হচ্ছে–সুইডেনে একটি কনফারেন্সে তাঁর যাবার খুব শখ ছিল, কিন্তু আমন্ত্রণ আসেনি। তিনি চেষ্টা তদবিরের তেমন কোনো ত্রুটি করেন নি। যেখানে একটা চিঠি দেয়া দরকার, সেখানে তিনটি চিঠি দিয়েছেন। প্রফেসর নোয়েল বার্গকে বাংলাদেশের হস্তশিল্পের নমুনা হিসাবে একটি চটের ব্যাগ পাঠিয়েছেন, যেটা কিনতে তাঁর তিনশ টাকা লেগেছে। রাজশাহীতে তৈরি খুব ফ্যান্সি ধরনের ব্যাগ। প্রফেসর নোয়েল বার্গ একটি চিঠিতে ব্যাগের জন্যে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, কিন্তু বহু প্ৰতীক্ষিত নিমন্ত্রণের চিঠি পাঠান নি।
সাইদুর রহমান সাহেবের মেজাজ খারাপের দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে–মিসির আলিসংক্রান্ত সমস্যা। মিসির আলি লোকটিকে তিনি মনেপ্ৰাণে অপছন্দ করেন। পার্টটাইম টীচার হিসেবে মিসির আলির অ্যািপয়েন্টমেন্টের বিপক্ষে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। লাভ হয়নি। অ্যাপিয়েন্টমেন্ট হয়েছে। এবং অ্যাপিয়েন্টমেন্টের সময় ভাইসচ্যান্সেলর সাহেব বলেছেন, কোনো পোষ্ট অ্যাডভারটাইজ হওয়ামাত্র তাঁকে নেয়া হবে। সাইদুর রহমান সাহেব গত দু বছরে কোনো পোষ্ট অ্যাডভারটাইজড হতে দেন নি। এডহক ভিত্তিতে এক জনকে অ্যাপিয়েন্টমেন্ট দিয়েছেন।তাঁর ধারণা ছিল এডহক অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্যে মিসির আলি হৈচৈ করবেন। কিন্তু মিসির আলি কিছুই করেন নি। এটাও একটা রহস্য! এই লোকটির কি জীবনে উন্নতি করবার কোনোরকম ইচ্ছা নেই, না তার সবটাই ভান?
মিসির আলির ওপর আজ ভোরবেলায় তাঁর রাগ চরমে উঠেছে। কারণ তিনি দেখেছেন, সুইডেন থেকে মিসির আলির নামে একটি খাম এসেছে। তাঁর ধারণা, এটা কনফারেন্সের নিমন্ত্রণপত্র। কারণ, প্রেরকের নামের জায়গায় প্রফেসর নোয়েল বার্গের নাম আছে। প্রফেসর নোয়েল বাৰ্গ হচ্ছেন কনফারেন্সের আহ্বায়ক।সাইদুর রহমান সাহেব অফিসে খোঁজ নিলেন–মিসির আলি এসেছেন কি না। জানা গেল, তিনি এসেছেন। কাজেই সুইডেনের সেই খাম নিশ্চয়ই খোলা হয়েছে। সাইদুর রহমান সাহেব হেড ক্লার্ককে বললেন, মিসির আলি সাহেবের সঙ্গে যদি দেখা হয়, তাহলে বলবেন, আমি খোঁজ করছিলাম।
জ্বি আচ্ছা স্যার।
তাঁকে তো খুঁজেই পাওয়া যায় না। ডিপার্টমেন্টে আসেন না নাকি?
ক্লাস না থাকলে আসেন না।
গতকাল এসেছিলেন?
জ্বি, গতকাল এসেছিলেন। এক জন ছাত্রীর ঠিকানা খুঁজে বের করবার জন্যে খুব হৈচৈ করলেন।
তই নাকি?
জ্বি স্যার। নীলুফার ইয়াসমিন। সে দেড় বছর ধরে ইউনিভার্সিটিতে আসে না, এখন তার ঠিকানা খোঁজার জন্যে যদি অফিসের সব কাজকর্ম বন্ধ রাখতে হয়, তাহলে তো মুশকিল।কাজকর্ম বন্ধ রাখতে হবে কেন? এ—সব পাসোনাল কাজের জন্যে তো অফিস না। আপনি স্ট্রেইট বলে দেবেন।জ্বি আচ্ছা স্যার।তা ছাড়া এক জন টীচার ছাত্রীর ঠিকানার জন্যে ব্যস্ত হবে কেন? এ-সব ঠিক না। নানান রকমের কথা উঠতে পারে।
মিসির আলি ভেবেই পেলেন না, ইউনিভার্সিটির এক জন ছাত্রীর ঠিকানা বের করা এত সমস্যা হবে কেন? অফিসে নেই। অফিস থেকে বলা হল, সমস্ত রেকর্ডপত্র উীন অফিসে। ভীন অফিসে গিয়ে জানলেন, রেকর্ডপত্র আছে রেজিষ্টার অফিসে। রেজিস্ট্রর অফিসে যে কেরানি এসব ডীল করে, দু ঘন্টা অপেক্ষা করেও তার দেখা পাওয়া গোল না। সকালবেলা সে নাকি এসেছিল। চা খেতে গিয়েছে। মিসির আলি রেজিষ্টার অফিসের ক্যান্টিনেও খুঁজে এলেন। দেখা পাওয়া গেল না। আবার আসতে হবে আগামীকাল।ডিপার্টমেন্টে ফিরে এসে শুনলেন–সাইদুর রহমান সাহেব তাঁকে খোঁজ করেছেন। মিসির আলি বিস্মিত হলেন। সাইদুর রহমান সাহেব তাঁকে পছন্দ করেন না। বড় রকমের প্রয়োজনেও তাঁর খোঁজ করেন না। আজ করছেন কেন?
আসসালামুয়ালাইকুম স্যার।
ওয়ালাইকুম আসসালাম।
আপনি কি আমার খোঁজ করছিলেন?
বসুন মিসির আলি সাহেব। আছেন কেমন?
ভালো।
মিসির আলি বসলেন।
কি জন্যে ডেকেছিলেন?
তেমন কিছু না।সাইদুর রহমান সাহেব সিগারেট ধরালেন। সুইডেনের চিঠির প্রসঙ্গ তুলবেন কি না বুঝতে পারলেন না! তুললেও এমনভাবে তুলতে হবে, যাতে এই লোক বুঝতে না পারে, তিনি এই ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহী।মিসির আলি বললেন, স্যার, আপনি কি কিছু বলবেন?
তেমন ইস্পটেন্ট কিছু না। সুইডেনের কনফারেন্সের খবর কিছু জানেন? মানে আমার যাবার কথা ছিল। পেপারের অ্যাবস্ট্রাক্ট পাঠিয়েছিলাম প্রফেসর নোয়েলের কাছে।মিসির আলি সহজ গলায় বললেন, আমি ওদের ইনভাইটেশন পেয়েছি। পেপার দেবার জন্যে বলছে।তাই নাকি? সাইদুর রহমান সাহেব নিভে গেলেন। টেনে-টেনে বললেন, যাচ্ছেন। কবে নাগাদ? এক সপ্তাহের ভেতরই তো রওনা হওয়া উচিত? আমি যাচ্ছি ন স্যার।কেন?
আমার কাজের মেয়েটি অসুস্থ।সাইদুর রহমান সাহেব নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। কাজের মেয়ে অসুস্থ, এই জন্যে সে সুইডেন যাবে না। বদ্ধ উন্মাদ নাকি! কাজের মেয়ে অসুস্থ, সেই কারণে যাচ্ছেন না? ওটা একটা কারণ। তা ছাড়া অন্য একটি কারণ আছে।জানতে পারি? নিশ্চয়ই পারেন। আমি এক জন রোগীর মনোবিশ্লেষণ করছি। এই মুহুর্তে আমার পক্ষে বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়।সত্যি বলছেন?
মিসির আলি অবাক হয়ে বললেন, মিথ্যা বলব কেন? আপনি কি আপনার ডিসিসন ওদেরকে জানিয়েছেন? আজই তো মাত্ৰ চিঠি পেলাম।তবু আপনার উচিত ইমিডিয়েটলি আপনার ডিসিসন ওদের জানানো। হয়তো ওদের কোনো অলটারনেট ক্যানডিডেট আছে।স্যার, আপনার কি সেখানে যাবার ইচ্ছা? ইচ্ছা থাকলে বলেন।বলব মানে, আপনি কী করবেন?
নোয়েল আমার বন্ধুমানুষ। ইংল্যাণ্ডে আমরা একসঙ্গে ছিলাম। আমার তিনটা পেপার আছে যেখানে নোয়েল হচ্ছে এক জন কো-অথর। আপনার বোধহয় চোখে পড়ে নি।সাইদুর রহমান সাহেবের মুখ তেতো হয়ে গেল। তিনি বিরক্ত স্বরে বললেন, সুইডেন কি একটা যাওয়ার মতো জায়গা? আছে কি সেখানে, বলুন? দেখার কিছু আছে? কিছুই নেই। একটা ফালতু জায়গা।দেখাদেখিটা তো ইস্পটেন্ট নয়। সেমিনারটাই প্রধান। সারা পৃথিবী থেকে জ্ঞানীগুণীরা আসবেন।ঐসব কচকচানি শুনে কোনো লাভ হয়? কোনোই লাভ হয় না। শুধু বড়-বড় কথা।
এটা ঠিক বললেন না। সেখানে যাঁরা আসবেন, তাঁরা কথার চেয়ে কাজ অনেক বেশি করেন। বিশেষ করে এমন কিছু লোকজন আসবেন, যাঁদের দেখলে পুণ্য হয়।আপনিও তো ওদের নিমন্ত্রিত, তার মানে বলতে চাচ্ছেন, আপনাকে দেখলেও পুণ্য হবে? মিসির আলি একটু হকচকিয়ে গেলেন। পর মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, তা হবে। আপনি অনেকক্ষণ আমাকে দেখলেন। অনেক পুণ্য করলেন। উঠি স্যার? ডঃ সাইদুর রহমান বহু কষ্টে রাগ সামলালেন। মনে-মনে এমন কিছু গালাগালি দিলেন, যা তাঁর মতো অবস্থার ব্যক্তিরা কখনো দিতে পারে না। এর মধ্যে একটি গালি ভয়াবহ।
