আসমানী চোখ বন্ধ করে রাখল। যেন সত্যি-সত্যি ঘুমুচ্ছে। সে কাউকে জানতে দিতে চায় না যে সে সারারাত ঘুমুয় নি। সারারাত জেগে কাটিয়েছে। বিদেশে থাকা ঐ ছেলেটির সঙ্গে তার যেদিন বিয়ে হল সেদিন রাতেও এই অবস্থা। সারারাত সে জেগে, এক ফোঁটা ঘুম নেই। অবশ্য ঐ রাতে সে একা না বাড়ির সবাই জেগে ছিল। সবাই নানা রকম ঠাট্টা-তামাশা করছিল।
এর মধ্যে তার এক দূর সম্পর্কের ফুপাতো ভাই সাদা কাপড় পরে ভূত সেজে তাদের ভয় দেখাল। কত না কাণ্ড হল সেই রাতে। আহা ঐ বেচারা ফুপাতো ভাইটা বেঁচে নেই। পরের বছরই তিন দিনের জ্বরে মারা গেল। ও বেঁচে থাকলে আজও এসে কত হৈচৈ করত। ভালোভালো মানুষগুলো, যাদের হৃদয় আনন্দে পরিপূর্ণ, যারা সব সময় পৃথিবীর সবাইকে আনন্দ দিতে চায় তাদেরকে এত সকাল-সকাল পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয় কেন? ভাবতে-ভাবতে আসমানীর চোখ ভিজে উঠতে শুরু করল।
আপু, সবাই রাগ করছে। দুলাভাই কিন্তু চলে আসবে।ভারি লজ্জা লাগছে আসমানীর। এখনো বিয়ে হয় নি, অথচ দুলাভাই ডাকছে। আজ ঐ লোকটার এ বাড়িতে নাস্তা করার কথা। নাস্তার পর দুজন মিলে কিছু কেনাকাটা করবে। যেমন ওর জন্য পায়জামা, পাঞ্জাবি এবং স্যুটের কাপড় কেনা হবে। আসমানী কিনবে তার বিয়ের শাড়ি। আজকাল নাকি নতুন নিয়ম হয়েছে এইসব কেনাকাটাগুলো হবু স্বামী-স্ত্রী একত্রে করে। এই কেনাকাটা করতে করতে সামান্য পরিচয় হয়।
দুপুরে দুজন একত্রে বসে খায়। দেশটা কী সুন্দর করেই না বদলাচ্ছে। দুজনে মিলে এই প্রথম কিছু কেনা—এরচে সুন্দর আর কী হতে পারে? আসমানীর মামী বললেন, তোর মুখ দিয়ে তো কোনো কথা বের হয় না। কম। দামি শাড়ি গুছিয়ে দিতে চাইলে রাজি হবি না, ব্লাউজ পিস দর্জির কাছে দিয়ে আসবি। স্যান্ডেলের মাপ দিবি। তুই আগে জিজ্ঞেস করে নিবি, তোমার বাজেট কত? আসমানীর মামা বললেন, ওরে বাজেট কি আর লাখ টাকা হবে না-কি?
খামাখা এসব জিজ্ঞাস করে লাভ নেই।মামী বললেন, খালি হাতে তো আর বিয়ে করছে না। এইসব মানম্যানে ধরনের ছেলেরা বিয়ের টাকা ইউনিভার্সিটি লাইফ থেকে জমানো শুরু করে। বাইরে থেকে মনে হয় ফকির।আসমানীর মামা ওদের দুজনের জন্যে একটা গাড়ি জোগাড় করে দিয়েছেন। পুরানো একটা ভোক্সওয়াগন। সারাদিন থাকবে। ড্রাইভারকে বলা আছে। গাড়িটার একটাই সমস্যা মাঝে-মাঝে স্টার্ট বন্ধ হয়ে যায়।
আসমানীকে অনেক রকম উপদেশও দেয়া হল, যেমন, ছেলে হয়ত বলবে, আমাকে ক্যাশ টাকা দিয়ে দাও আমি কিনে নেব তুই রাজি হবি না-যা কিবি দরাম করে কিনবি। তোর কাছে কত টাকা আছে শুরুতেই জানতে চাইবে-বলবি না কিন্তু।আজ জহিরকে দেখে আসমানীর বুকটা ধ্বক করে উঠল। বেচারার মুখ এত শুকনো কেন? কি হয়েছে? আসমানী আজ তৃতীয়বারের মতো তাকে দেখছে। আজো তার গায়ে ঐ হালকা নীল শার্টটা। ঐ নীল শার্ট ছাড়া কি বেচারার আর কোনো শার্ট নেই?
আচ্ছা আমি ওকে আজ পছন্দ করে কয়েকটা শার্ট কিনে দেব।গাড়িতে ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই জহির ইতস্তত করে বলল, আসমানী একটা সমস্যা হয়েছে।আসমানী চোখ তুলে তাকাল, কিছু বলল না। কি সমস্যা হয়েছে জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। নিজ থেকেই বলবে।আমার এক মামাতো বোন আছে-ওর নাম অরু। ও গতকাল আমার কাছ থেকে সাত হাজার টাকা নিয়ে গেছে। ওর কি না-কি সমস্যা।আসমানী ক্ষীণ গলায় বলল, কি সমস্যা? গুছিয়ে বলে নাই। স্বামীর সাথে বনিবনা হচ্ছে না। হয়ত আলাদা থাকতে চায়। আমি কিছু জিজ্ঞেস করি নি। কাঁদতে-কাঁদতে টাকাটা চাইল, দিয়ে দিলাম।
আজ তাহলে কী করবেন? চলে যাবেন? পছন্দ করে রাখি পরে এক সময়….আসমানী বলল, আমার জিনিসগুলি থাক। আপনারগুলি কিনে ফেলি।জহির অবাক হয়ে বলল, আমার কি জিনিস?পায়জামা, পাঞ্জাবি, স্যুটের কাপড়…।আরে কী যে বল, আমি স্যুটের কাপড় কিনব নাকি? আমি হচ্ছি কেরানি মানুষ।কেরানি মানুষরা বুঝি স্যুট পরে না? পরে। না পরলেও হয়, না পরাটাই ভালো।
আসমানীর কাছে জহিরকে খুব লাজুক বলে মনে হচ্ছে না। আশ্চর্যের ব্যাপার, বোকা বলেও মনে হচ্ছে না। অথচ বাসার সবাই বলছিল…ছেলেটা বোকা টাইপের। আসমানীর ফুপুতে খুব খারাপ ভঙ্গিতেই বলেছিলেন, ছেলেটা ভেলা। রূপ দেখে আর ইশ নাই। সারাক্ষণ হাঁ করে আছে। এই ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিলে কপালে দুঃখ আছে। এমন দুঃখ যে দুঃখের আর সীমা-পরিসীমা থাকবে না।
ঘন্টাখানিক দুজন নিউমার্কেটে এলোমেলো ঘুরল। সম্পূর্ণ অজানা-অচেনা একজন ছেলে, যে ছেলে দুদিন পর তার স্বামী হবে তাকে নিয়ে ঘুরতে কেমন লাগে আসমানী বুঝতে চেষ্টা করছে, পারছে না। তবে একটা জিনিস সে বুঝতে পারছে মানুষটার সঙ্গে তার কথা বলতে ভালো লাগছে, কথা বলতে ইচ্ছাও করছে।
আসমানী বলল, নীল রঙ বুঝি আপনার খুব পছন্দ? জহির বিস্মিত হয়ে বলল, কই না তো!এই নীল শার্টটা পরে রোজ আসেন।
জহির কিছু বলল না। আসমানী বলল, আসুন আপনার জন্য কয়েকটা শার্ট কিনি। চকলেট রঙের শার্ট আমার খুব পছন্দ। আপনার কি চকলেট রঙের কোনো শার্ট আছে? না।আসুন না একটা কিনি।আশ্চর্যের ব্যাপার, সব রকম শার্ট ঢাকা শহরে আছে শুধু চকলেট রঙের শার্টই নেই।আসমানী ক্লান্তিহীন হাঁটল—এ দোকানে ঢুকল, ও দোকানে ঢুকল। কোথাও পাওয়া গেল না।
দুপুরে তারা গেল এক চীনে-রেস্তরাঁয়। অন্ধকার-অন্ধকার ঘর। ভালো করে মুখও দেখা যায় না। জহির অবশ্যি এর আগেও বেশ কয়েকবার এই রেস্তরাঁতেই এসেছে। এসেছে অরুর সঙ্গে।মাঝে-মাঝে অরুর খুব বাজারের নেশা হত। স্কলারশিপের টাকা জমিয়ে কিছু টাকা হলেই সে বাজারে যাবে। সঙ্গে যাবে জহির।
অরু খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলবে, জহির ভাই, আমার জিনিসপত্রগুলি ক্যারি করবার জন্যে আমার একজন গাধা দরকার। সঙ্গে চলুন তো? গাধা বলায় আপনি আবার কোনো রকম মানসিক কষ্টবোধ করবেন না। আমার কাছে গাধা কোনো গালাগালি নয়। গাধা হচ্ছে—শান্ত, নিরীহ, ভদ্র এবং কষ্টসহিষ্ণু একটি প্রাণী। নিজের জন্যে যে তেমন কিছু কখনো চায় না। সব সময় চায় অন্যকে সুখী করতে। আপনি যেমন আমাকে সুখী করতে চান, তাই না? আপনি চান না আমি সুখী হই?
হ্যাঁ চাই।এই জন্যেই গাধা বললাম। বুঝলেন জনাব, রাগ করবেন না।একগাদা বাজার-টাজার করার পর অরু খেতে যেত চাইনিজ রেস্তরাঁয়। অন্ধকার ঘরে মুখোমুখি খেতে বসা। এইসব খাবার জহিরের মোটেই মুখে রোচে না। স্যুপে কেমন কাঁচা মাংসের গন্ধ। এই জিনিস সবাই এত আগ্রহ করে খায় কী করে? অরু খায়, জহির চুপচাপ বসে থাকে।আজ দুজনের কেউ-ই খাচ্ছেনা।
দুজনই চুপচাপ বসে আছে। স্যুপমুখে দিয়ে আসমানী বলল, খেতে কেমন যেন ভাতের মাড়ের মতো লাগছে।কথাটা শুনে জহিরের খুব ভালো লাগল। মেয়েটা বেশ মজার তো।আসমানী বলল, গুলশান বাজারে যাবেন? গুলশান বাজারে হয়ত চকলেট কালারের শার্ট পাওয়া যাবে। বিদেশিদের মার্কেট তো। ওখানে সব কিছু পাওয়া যায়। আচ্ছা, আপনি কি কখনো গুলশান মার্কেটে গিয়েছেন?
না।আমিও যাই নি। আমি শুধু শুনেছি।বলতে বলতে অকারণ মনের আনন্দে আসমানী একটু হেসে ফেলল।কি সুন্দর হাসি। হাসির সময় অনেক মেয়ের চোখ ছোট হয়ে যায় কিন্তু এই মেয়েটার সবই অদ্ভুত। এর চোখ বড় হয়ে যায়।আসমানী? কি? এই খাবারগুলো খেতে তোমার একটুও ভালো লাগছে না, তাই না? হ্যাঁ।আমারও না। চল উঠে পড়ি। আসমানী বলল, টেবিল পরিষ্কার করে নিয়ে যাক তারপর আমরা খানিকক্ষণ কফি খেতেখেতে গল্প করব। কথাগুলি আসমানী খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল। যেন সে প্রায়ই এখানে আসে, প্রায়ই খাবার-টাবার শেষ করার পর কফি খায়। গল্প করে।আসমানী। জ্বি।তুমি কি প্রায়ই এখানে আস?
না তো!আমি কয়েকবার এখানে এসেছি। অরুর সঙ্গে। ওর আবার এইসব খাবার খুব আলো লাগে।জহির লক্ষ করল, আসমানীকে এখন কেমন অন্যমনস্ক লাগছে। জহির বলল, আচ্ছা তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি মানে এম্নি জিজ্ঞেস করা, তোমার ইচ্ছা না হলে জবাব দিও না।আসমানী প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে বলল, আপনি কী বলতে চান আমি জানি যার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিল তার সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়েছে কিনা—এই তো?
জহির খুবই অবাক হল। মাথা নিচু করে বলল, হ্যাঁ।আসমানী বলল, না কোনোদিন দেখা হয় নি।জহির বলল, তবে উনার ছবি তোমার কাছে আছে। তাই না?আসমানী অস্পষ্ট স্বরে বলল, হা একটা ছবি আছে।জহির বলল, ঐ ছবিতে উনার গায়ে নিশ্চয়ই চকলেট রঙের একটা শার্ট ছিল।
আসমানী শান্ত চোখে তাকিয়ে রইল। জহিরের কথার জবাব দিল না। জবাব দেবার কিছু নেই। কথাটা পুরোপুরি সত্যি। আসমানী ভেবে পেল না বোকা ধরনের এই মানুষটা এটা কী করে বুঝে ফেলল।জহির বলল, চল যাওয়া যাক। অনেকক্ষণ বসে আছি। এঁরা হয়ত ভাবছেন।আসমানী নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল, কিছু বলল না। সত্যি-সত্যি অনেকক্ষণ কেটে গেছে। বিকেল হয়ে গেছে।
আকাশ মেঘলা। আজকের সকালটা খুব সুন্দর ছিল—এখন কেন জানি ভয়ঙ্কর খারাপ লাগছে। আসমানীর চেঁচিয়ে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। মন খারাপ, ভয়ঙ্কর মন খারাপ।আসমানী বলল, আপনাকে সঙ্গে আসতে হবে না। আপনি থাকুন। আমি একা-একাই যাব। জহির বলব, তুমি কি কোনো কারণে আমার ওপর রাগ করেছ? আসমানী জবাব দিল না। কিন্তু জহির দেখল আসমানীর চোখ ছলছ্ল করছে।
বারান্দায় কে যেন দাঁড়িয়ে।লম্বা একজন কেউ এমনভাবে দাঁড়িয়ে যেন সে নিজেকে লুকাতে চাইছে। আগে বারান্দায় সারারাত পচিশ ওয়াটের একটা বাতি জ্বলতো—এখন জ্বলে না। সুইচে কি যেন গণ্ডগোল হয়েছে।রাত প্রায় আটটা। দুটা টিউশানি শেষ করে ফিরতে-ফিরতে রাত সাড়ে নটার মতো বাজে, ভাগ্যিস আজ একটা বাড়িতে যেতে হয় নি। ছেলেটার গলাব্যথা, গলাব্যথা নিয়ে পড়বে না।বারান্দায় পা দেয়ার আগেই জহির বলল, কে?
দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা যেন আরো একটু সরে গেল।কে? জহির ভাই, আমি তরু।আরে রু। তুমি এখানে? কতক্ষণ ধরে আছ? অনেকক্ষণ।বল কি! দশটার আগে আসলে তো আমাকে পাওয়ার কথা না। ভাগ্যিস পেয়ে গেলে। আজ একটা ছেলে পড়ল না। ওর গলাব্যথা। তুমি… কথা বলে সময় নষ্ট করবেন না জহির ভাই। দরজা খুলুন।
জহির তালা খুলতে-খুলতে বলল, অপেক্ষা করার কোন দরকার ছিল না তরু। যখন দেখলে আমি নেই তখন একটা স্লিপ লিখে চলে গেলেই হত। তুমি স্লিপ লিখে চলে গেলেই আমি বাসায় চলে যেতাম।আপনি এত বকবক করছেন কেন জহির ভাই। দরজাটা খুলুন না।তোমাকে একটা জিনিস শিখিয়ে দিচ্ছি। চাবিটা কোথায় থাকে দেখ।
আমার একটা চাবি সঙ্গে থাকে, আরেকটা চাবি জানালা খুলে একটু হাত বাড়ালেই পাবে। যদি কখনো এসে দেখ আমি নেই তখন হাত বাড়িয়ে চাবি নিয়ে দরজা খুলে ফেলবে। তখন আর কষ্ট করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না।উফ আপনি এত কথা বলা শিখেছেন।জহির লজ্জিত মুখে বলল, তোমাকে দেখে হঠাৎ এত ভালো লাগছে যে শুধু কথা বলতে ইচ্ছা করছে।
তরু চোখ বড়-বড় করে তাকাল। জহির বলল, কেউ তো আমার কাছে আসে। না। হঠাৎ যখন কেউ এসে পড়ে এমন ভালো লাগে।তরু বিছানায় বসতে-বসতে বলল, আমি তো জানি অরু আপা মাঝেমাঝে আপনার এখানে আসে। তাই না?তা আসে, কাজে আসে। এসেই বলে, চললাম। বড় অদ্ভুত মেয়ে।অদ্ভুত এবং সুন্দর—তাই না জহির ভাই? হ্যাঁ। সুন্দর তো বটেই। মনটাও ভালো। সুন্দর মেয়েগুলির মন সাধারণত একটু ছোট থাকে, ওর সে রকম না।আমি এত রাতে আপনার জন্য কেন বসে আছি তা কি জানেন? না।তাহলে জিজ্ঞেস করছেন না কেন?
জহির দেখল তরুর চোখ ভেজা। বারান্দায় দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে এতক্ষণ হয়ত কাঁদছিল। জহির অভিভূত হয়ে গেল। কাউকে কাঁদতে দেখলে তার বড় খারাপ লাগে। জহির কোমল গলায় বলল, কি হয়েছে তরু? তরু ঘরের চারদিকে তাকাতে-তাকাতে বলল, ইস ঘর-দের কী করে রেখেছেন। আমি এসে সুন্দর করে সাজিয়ে দেব। ঘরভর্তি এত ক্যালেন্ডার কেন? এই জিনিসটাই খারাপ লাগে। এ কি, গত বছরের ক্যালেন্ডারও দেখি আছে।জহির লজ্জিত গলায় বলল, ফেলা হয় নি। সুন্দর ক্যালেন্ডার, ফেলতে মায়া লাগল।এত মায়া করলে চলবে না জহির ভাই। খুব প্রিয় জিনিসকেও ছুঁড়ে ফেলার সাহস থাকতে হবে।তুমি কী জন্যে এসেছ বল। মামা-মামীর শরীর ভালো?
হুঁ।তাহলে?অরু আপা আপনার কাছে কবে এসেছিল?কেন বল তো?আপনি আমার কথার জবাব আগে দিন। কবে এসেছিল?দিন তিনেক আগে।কেন? তা দিয়ে তোমার দরকার কি? আহা বলেন না।কিছু টাকার জন্যে।কত টাকা? তা দিয়ে তোমার দরকার কি? দরকার আছে জহির ভাই। খুব দরকার। আপা পালিয়ে গেছে।
জহির হতভম্ব হয়ে বলল, তোমার কথা বুঝলাম না। পালিয়ে গেছে মানে? আজ বিকেলে আজহার সাহেব এসেছিলেন, তাকে দুলাভাই বলব কিনা বুঝতে পারছি না। উনি বললেন, একটা চিঠি লিখে অরু পালিয়ে গেছে।কি লেখা চিঠিতে? আমি কী করে জানব চিঠিতে কী লেখা, চিঠি তো আর সঙ্গে করে নিয়ে আসেন নি। আমরা জানতে চাই নি চিঠিতে কী লেখা।তোমরা ভদ্রলোকের সঙ্গে কোনো কথা বললে না?
না। শুধু মা বলল, আপনি আমাদের কাছে এসেছেন কেন? আমরা ওর খবর আগেও রাখতাম না, এখনো রাখি না। তারপর ঐ লোকটা আপনার ঠিকানা চাইল। সেই ঠিকানাও আমরা দিলাম না।দিলে না কেন? আমি দিতে চাচ্ছিলাম কিন্তু বলার আগেই বাবা বললেন, জহিরের বাসা চিনি, ঠিকানা জানি না। লোকটা তখন আর কিছু না বলে চলে গেল। এরপর থেকেই বাসায় কান্নাকাটি চলছে। খুব খারাপ অবস্থা। এদিকে আবার মীরু…।
মীরু আবার কী করল? আপনি আমার সঙ্গে একটু বাসায় চলুন তো।চল যাই।কে বলে বাসায় কোনো সমস্যা আছে।সব স্বাভাবিক।
বরকত সাহেব উঠানে বসে পত্রিকা পড়ছেন। জহির এবং তরুকে মুখ তুলে একবার তাকিয়ে দেখলেন। মনে হচ্ছে খুবই জরুরি একটা খবর পড়ছেন। ওদের দিকে তাকিয়ে নষ্ট করার মতো সময়ও তার নেই।জহির বলল, মামা ভালো আছেন? বরকত সাহেব আবার তাকালেন। এবারো জবাব দিলেন না।এসব কী শুনলাম তরুর কাছ থেকে? নতুন কিছু শোন নি। নতুন কি শুনলে? অরু পালিয়ে গেছে এইতো শুনেছ? অরু কি আজ নতুন পালিয়েছে?
আগেও তো পালিয়েছে। Itsnothingnew. একবার মানুষ যা করে, সেই জিনিসটাই সে বার বার করে। যাও ভেতরে যাও। Concerned হওয়ার কোনো দরকার নেই। সব ঠিকই আছে।বরকত সাহেব স্বাভাবিক ভাব দেখাবার চেষ্টা করছেন।ভেঙ্গে পড়েছেন শাহানা। সেই ভেঙ্গে পড়াটা অরুর কারণে না মীরুর কারণে তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। অরুর ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু মীরু কী করেছে? মীরুর ঘরের দরজা বন্ধ। সেই ঘর অন্ধকার। কিছুক্ষণ পরপর ফুপিয়ে কান্নার শব্দ আসছে।
জহির বলল, মামী মীরুর কী হয়েছে? শাহানা খড়খড়ে গলায় বললেন, মীরুর তো কিছু হয় নি। মীরুর কথা কে তোমাকে বলেছে?তরু বলছিল…. তরু কি পৃথিবীর সব জেনে বসে আছে? ওর জিহ্বাটা এত লম্বা কেন? কে তাকে বলেছে রাতদুপুরে তোমাকে ধরে নিয়ে আসতে? তুমি কে? তুমি করবেটা কি? এত রাগ করছেন কেন মামী? তোমার বোকামি দেখে রাগ করছি। তোমার মতে বোকা পুরুষ মানুষ দেখি নি। আমার কাছ থেকে তুমি যাও তো।
তোমাকে দেখলেই রাগ লাগছে।মামীর কথায় জহির রাগ করল না। একটা বড় রকমের সমস্যা যে হয়েছে তা তো বোঝাই যাচ্ছে। সমস্যার সময় কারোর মাথা ঠিক থাকে না। মেয়েরা নার্ভাস হয়ে অকারণ রাগারাগি করে।জহির রাত দশটা পর্যন্ত থেকেও বিশেষ কিছু জানতে পারল না। বরকত সাহেব পত্রিকার পাতা চোখের সামনে মেলে আগের মতোই বসে রইলেন। জহির যখন বলল, মামা আমি কি থাকব না চলে যাব?বরকত সাহেব বিরক্ত গলায় বললেন, তোমার এখানে থাকার দরকারটা কি?
তরু যে তোমাকে ধরে নিয়ে এসেছে তাতেই আমি রাগ করেছি। আমার সব কটা মেয়ে গাধা—শুধু গাধা না, গাধার গাধা।তরু পাশেই দাঁড়িয়েছিল। বরকত সাহেব তাকেও প্রচণ্ড একটা ধমক দিলেন। এই ধমকের বিষয়বস্তু হল-গাধার মতো দাঁড়িয়ে না থেকে জানালা বন্ধ করে রাখলে মশা ঘরে কম ঢোকে।জহির চলে গেল।জহির দুবার কলিং বেল টিপল।
মনে হয় আজহার সাহেব জহিরের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। দরজা খোলার আগেই বললেন, আসুন জহির সাহেব, আসুন। আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। জানতাম আপনি আসবেন। ধারণা ছিল আরো পরে আসবেন। রাত বারটা-একটার দিকে। আগেই এসে পড়েছেন। কেমন আছেন জহির সাহেব?
জ্বি ভালো।বসুন। এই বিছানায় আরাম করে পা তুলে বসুন। আপনাকে অনেকক্ষণ থাকতে হবে। কথা আছে।বলুন কি কথা।বলব। সবই বলব, আপনি এত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন ভাই? চা খান। দোকান থেকে ফ্লাস্ক ভর্তি করে চা নিয়ে এসেছি। চা খাব আর গল্প করব।আগে ব্যাপারটি কি বলুন।ব্যাপার কিছুই নেই। ব্যাপার খুব সিম্পল—অরু চলে গেছে। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় লিপিস্টিক দিয়ে লিখেছে–
যে ভাবে এসেছিলাম।সে ভাবে চলে গেলাম।চারদিকে লিলুয়া বাতাস।কাব্য করার একটা প্রচেষ্টা। ফাজলামি আর কি। লিলুয়া বাতাস কি জানেন? না।
ডিকশনারিতে পাবেন না। লিলুয়া বাতাস মানে হচ্ছে যে বাতাস মানুষ নিয়ে খেলা করে, মানুষকে উদাস করে, বিষণ্ণ করে। মৈমনসিংহ গীতিকায় আছে। আমিই শিখিয়েছিলাম।ও চলে গেল কেন? জানি না ভাই। সত্যি জানি না। উদ্ভট-উদ্ভট কথা সে আমার সম্পর্কে অনেককে বলে—যেমন আমি এখানে তাসের আড্ডা বসাই, মদের আড়াবসাই, আজেবাজে বন্ধুবান্ধব নিয়ে ফুর্তি করি। একটা কথাও ঠিক না। কেন সে এসব বলে তাও বুঝি না। আমি একজন শিক্ষক মানুষ। আজেবাজে সব কাণ্ডকারখানা ইচ্ছা থাকলেও আমি করতে পারব না।
আমি জানি সে আমার জন্য অনেক কিছু ছেড়েছে। আমিও কি তার জন্যে অনেক কিছু ছাড়ি নি? আমি কি তার জন্যে আমার স্ত্রী-পুত্র-কন্যা সব ছাড়ি নি? আপনি কি জানেন যে আমার চাকরি চলে গেছে? বেসরকারি কলেজের চাকরি। আমার স্ত্রী কলেজ গভর্নিং বডিকে ভয়ঙ্কর সব কথাবার্তা বলেছে। শুধু তাই না, তার দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়া ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে, এক মেয়েকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে রাজি করিয়েছেঐ মেয়ে লিখিত একটা অভিযোগ করেছে আমার সম্পর্কে। সেই অভিযোগ কি শুনতে চান? অভিযোগ হচ্ছে—একদিন বিকেলে এই মেয়ে আমার কাছে পড়া বুঝতে এসেছিল তখন নাকি আমি তার শাড়ি খুলে ফেলার চেষ্টা করেছি।
শিক্ষকতা আমার পছন্দ। আমি পড়াতে পছন্দ করি। কিন্তু আজ আমার সব গেছে। ঘরে বসে থাকি। কেরুর জীন কিনে নিয়ে আসি আর চুকচুক করে খাই।জহির বলল, আপনি তো একটু আগে বললেন খান না; এইসব রটনা।না পুরোপুরি রটনা না। টুথ কিছু আছে। সব সত্যির সঙ্গে যেমন মিথ্যা মেশানো থাকে তেমনি সব মিথ্যার সঙ্গেও সত্যি মেশানো থাকে। আপনি বসুন।
আপনাকে একটা মজার জিনিস দেখাব।কি দেখাবেন? বললাম তো একটা মজার জিনিস। ইন্টারেস্টিং।জহির বসে আছে। তার বসে থাকতে ভালো লাগছে না, আবার উঠে চলে যেতেও ইচ্ছে। করছে না। আজহার নামেরই এই মানুষটির সবাইকে মুগ্ধ করে রাখার একটা ক্ষমতা আছে।জহির সাহেব? জ্বি।দেখুন তাকিয়ে, এর নাম কি বলুন?
জহির তাকিয়ে দেখল, জিনিসটির বিশেষ কোনো নাম মনে পড়ল না। বাঁকানো ধরনের একটা ছোরা। ছোরার হাতলে নানান ধরনের কারুকার্য। নীল, হলুদ কিছু পাথর বসানো।আজহার সাহেব শান্ত গলায় বললেন, রাজপুত রমণীদের কাছে এই জিনিস থাকে। ওরা কোমরে গুজে রাখে। অরুও এটি জোগাড় করল এবং ঘোষণা করল, এটা সে কিনেছে একটা খুন করবার জন্যে। আমাকে সে খুন করবে। এখন বলুন, আপনাকে আপনার স্ত্রী এই কথা বললে আপনার শুনতে কেমন লাগত? জহির বলল, অরু খুব রসিকতা করে।আপনার সঙ্গে সে কি কখনো রসিকতা করেছে? না।
তাহলে আমার সঙ্গে তার কিসের রসিকতা? আমি কি তাকে পা ধরে সেধেছিলাম, এস তুমি আমাকে বিয়ে করে উদ্ধার কর? না কখনো না। সে সায়েন্সের মেয়ে, আমি পড়াই ইতিহাস। তার এক বান্ধবীর সঙ্গে কী মনে করে সে আমার একটা ক্লাস করতে এল-গল্পটা কি আপনি শুনতে চান? বলুন।
Read more
