অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী পর্ব:১
তোমার একটি নাম আছে। তোমাকে বাড়িতে ওই নাম ধরে সবাই ডাকে। তোমার মা-বাবা-ভাই-বোন-আত্মীয়স্বজন পাড়ার লোক সবাই।ক্লাসের হাজিরা খাতায় ওই নামটি লেখা হয়েছে। ওই নামে লোকে তোমার কাছে চিঠিপত্র লেখে। এই পত্র লেখকদের অনেকেই নিজেদের নাম-ধাম উহ্য রেখে মনের গহন কথাটি প্রকাশ করে থাকে। তোমার মা অত্যন্ত সতর্ক এবং সাবধানী মহিলা। তার ঘ্রাণশক্তি অত্যন্ত প্রখর। এই ধরনের চিঠি তার হাতে পড়ামাত্রই ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করতে পারেন, ভেতরের কাগজে দাহ্য পদার্থ রয়েছে। তিনি কালবিলম্ব না করে এই উড়ে আসা চিঠিগুলো গ্যাসের চুলোয় জ্বালিয়ে ফেলেন। কখনো-সখনো তোমার মায়ের সতর্ক চোখের ফাঁক দিয়ে কোনো চিঠি তোমার হাতে এসে পড়ে। তুমি অত্যন্ত মাতৃভক্ত মেয়ে।
কোনো ব্যাপারে মায়ের অবাধ্য হওয়ার কথা তুমি স্বপ্নেও চিন্তা করতে পার না। তারপরও ওই চিঠিগুলোর প্রতি তুমি মায়ের মতো নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে পার না। কারণ, বুঝে ফেলেছ, তোমার এখন চিঠি আসার বয়স। যেসব চিঠি তোমার হাতে পড়ে, তোমার মা যাতে ঘুণাক্ষরেও টের না পান, অত্যন্ত সন্তর্পণে সেজন্যে বাথরুমে গোসল করার সময় মর্ম উদ্ধার করতে চেষ্টা করো। অধিকাংশ আজেবাজে চিঠি, ফাত্রা কথায় ভর্তি। কারা এসব লেখে তাদের অনেককেই তুমি চেন। যাওয়া-আসার পথে অনেকের সঙ্গেই তোমার দেখা হয়। এই ধরনের কুপাঠ্য চিঠি পড়ার পর তোমার নিজের ওপর রাগ বাড়তে থাকে এবং শরীর গুলিয়ে ওঠে। খুব ভাল করে সুগন্ধি সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে গোসল করার পরও তোমার মধ্যে একটা অপবিত্র ভাব, একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি কাজ করতে থাকে। একটা পীড়িত ভাব তোমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে।
মাঝে মাঝে এমন চিঠিও আসে, পড়ার পর পুকুরে ঢিল ছুঁড়লে যেমন লহরি খেলে, তেমনি তোমার মনেও তরঙ্গ ভাঙতে থাকে। এই পত্রলেখককে মনে হয় তুমি চেন। কালো কালির অক্ষরে তার চোখের দৃষ্টি, মুখের ভাব দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তুমি নিজে খুব অসুখী বোধ করতে থাক। সারাটি দিন একটা গাম্ভীর্যের আবরণে নিজেকে অবৃত করে রাখ। তোমার মা কড়া মহিলা হলেও তার মনে এক ধরনের আশঙ্কা দোলা দিয়ে যায়। তিনি মনে মনে প্রমাদ গুণতে থাকেন। কারণ তোমার মতিগতি তার কাছে বড় দুর্বোধ্য মনে হয়। তিনি তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবিত হয়ে পড়েন।
এখন তোমার নামের কথায় আসি। এই নাম দিয়েই তোমাকে সবাই চেনে। যে অফিসটিতে তুমি পার্টটাইম কাজ করো, সেখানে ওই নামেই তোমাকে সবাই জানে। ওই নামেই তোমাকে নিয়োগপত্র দেয়া হয়েছিল। ওই নামেই মাসের শেষে তোমার মাইনের বিল হয়, চেক কাটা হয়। সবার কাছে শুনতে শুনতে তোমার মনে এমন একটা প্রতীতি গাঢ়মূল হয়েছে যে, তোমার নামটি তোমার সত্তার অবিভাজ্য অংশে পরিণত হয়েছে। কেরামুন কাতেবুন নামে যে দুজন ফেরেশতা তোমার কাঁধের ওপর বসে অদৃশ্য কাগজে, অদৃশ্য কালিতে, তুমি সারাদিন ভাল করেছ কি মন্দ করেছ, সমস্ত তোমার নামের পাশে টুকটুক করে লিখে নিচ্ছেন। ওই ফেরেশতা সাহেবেরা তোমার নামের পাশে এমন একটা অদৃশ্য জাল পেতে রেখেছেন, তোমার ভাল-মন্দ সেখানে মাকড়সার জালের মধ্যে মশা-মাছির মতো টুকটুক আটকা পড়ে যাচ্ছে।
কোনো সুন্দর যুবা পুরুষ দেখে তোমার মনে যদি একটি মিষ্টি চিন্তা ঢেউ দিয়ে জেগে ওঠে, মনের সেই একান্ত ভাললাগাটুকুও ফেরেশতা সাহেবদের পেতে রাখা রাডারে ধরা পড়বেই পড়বে।তোমার যখন মৃত্যু হবে, সাদা কাফনে ঢেকে তোমার প্রাণহীন শরীর যখন মাটির গহিনে নামানো হবে, তখনো তুমি নামের জাল ছিঁড়ে পালিয়ে যেতে পারবে না। দুজন ভীষণ-দর্শন ফেরেশতা তরুণ বজ্রের মতো ভয়ংকর শব্দে তোমার নাম ধরে চিৎকার করে ডাক দেবেন। তোমাকে মৃত্যুর নিস্তব্ধতার ভেতর থেকে জেগে উঠতে হবে।
এক সময় পৃথিবীতে তুমি মানুষের শরীর নিয়ে বেঁচেছিলে, রক্তের উষ্ণতা এবং হৃদয়ের জ্বর নিয়ে মানুষকে ভালোবাসার চেষ্টা করেছিলে, অপ্রাপ্য সুন্দর বস্তু দেখে তোমার মনে লোভ জন্মেছিল, ফেরেশতা দুজন জেরার পর জেরা করে সব তোমার কাছ থেকে টেনে বের করে ছাড়বেন, কিছুই গোপন রাখতে পারবে না। পৃথিবীতে তুমি চোখ দিয়ে দেখেছিলে, হাত দিয়ে স্পর্শ করেছিলে, ঠোঁট দিয়ে চুমু খেয়েছিলে, এক কথায়, কেন বেঁচেছিলে, কীভাবে বেঁচেছিলে, তার সমস্ত কৈফিয়ত তোমাকে দিতে হবে। ফেরেশতা সাহেবদের প্রত্যাশিত জবাবদিহি যদি তোমার মুখ থেকে বেরিয়ে না আসে, তাহলে কাটাঅলা গদার আঘাতে…। থাক, তোমাকে আগাম ভয় পাইয়ে দিতে চাইনে।
তারপর অনেক বছর (কত বছর আমি বলতে পারব না) ঘুমিয়ে থাকার পর হাশরের দিন ইস্রাফিল ফেরেশতার শিঙার হুংকারে আবার তোমাকে জেগে উঠতেই হবে। আল্লাহতায়ালা যখনই ইচ্ছে করবেন, অমনি, কম্পিউটারের পর্দায় তোমার আমলনামা ভেসে উঠবে। আল্লাহতায়ালা মানুষের পাপ-পুণ্যের সূক্ষ্ম বিচারক। তিনি তোমাকে জাহান্নামে ছুঁড়ে দেবেন কি বেহেশতে দাখিল করবেন, সে তোমার এবং আল্লাহর ব্যাপার।তোমার নামের প্রশ্নটি তুললাম, তার একটা কারণও আছে। আমি ভেবে দেখেছি নামের চাইতে মাথা ঘামাবার উপযুক্ত বিষয়বস্তু দুনিয়াতে দ্বিতীয় কিছু নেই। আল্লাহতায়ালা তো প্রথম মানব আদমকে নাম শিক্ষাই দিয়েছিলেন। তার মানে নাম শিক্ষা দেয়ার ছলে নামের শৃঙ্খলে তাকে বেঁধে ফেলেছিলেন।
নামের বাঁধন ছিঁড়ে আদমের পালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। আদমের বংশধরদেরও কারো নামের বন্ধন ছিন্ন করা সম্ভব হবে না।তোমার এই নামটির কথা চিন্তা করে দেখো। যখনই এই নামটি তোমার রাখা হয়েছিল, তখন নামের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক অনুভব করার বোধ জন্মায়নি। এখন দেখো ওই নামটি তোমাকে কত কিছুর সঙ্গে বেঁধে ফেলেছে। মা-বাবা আত্মীয়স্বজন, পাড়াপড়শি, এমন কি গোপনে গোপনে যারা তোমাকে ভালোবাসে, সবার মনে ওই নামটি তোমার অস্তিত্বের প্রতীক হিসেবে, স্থান-বিবর্জিত সর্বনামরূপে, এমনভাবে গেঁথে আছে, তুমি ইচ্ছে করলে মুছে ফেলতে পারবে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতায়, রেশন দোকানের তালিকায়, অফিসের হাজিরা বইতে, ভোটার লিস্টের পাতায়, পানি-বিদ্যুৎ, গ্যাস বিলের মাসিক খতিয়ানে, পাসপোর্টের সিলমোহরের নিচে এমনভাবে তোমাকে অদৃশ্য রশিতে আটকে রেখেছে, পালিয়ে যাবে তার কোনো উপায় নেই। এমন কি মরে গিয়েও না। মৃত্যুর অপর পারে আল্লাহর বিক্রমশালী ফেরেশতারা নামের রশি নিয়ে তোমাকে গ্রেফতার করার জন্যে প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করছেন। স্বয়ং আল্লাহতায়ালার ঘরেও তোমার নামটি রেকর্ড হয়ে গেছে।
তোমার ওই অতি পরিচিত, অতি ব্যবহৃত নামের আমার প্রয়োজন হবে না। ওই নাম তোমার জন্য একটি কারাগারস্বরূপ। তোমাকে আমি দেখি মুক্তি এবং স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে। তাই ঠিক করেছি আমি একটা নতুন নাম দেব। তোমার মা-বাবার দেয়া নাম তোমাকে চারপাশ থেকে আটকে ফেলেছে, সেই ঘেরাটোপ থেকে তোমার প্রকৃত সত্তা বের করে আনার জন্যে একটা মানানসই নাম আমার চাই। অভিযাত্রীরা অচেনা ভূখণ্ডে পদার্পণকরামাত্রই একটা নাম দিয়ে বসেন। লেখকেরা একটা গল্প লিখলে নতুন নাম দেন, বিজ্ঞানীরা নতুন কিছু আবিষ্কার করলে তড়িঘড়ি একটা নাম দিয়ে ফেলেন। তাদের যুক্তি হলো, যে বস্তুর অস্তিত্ব দুনিয়াতে ছিল না, আমরা তাকে নতুন সত্তায় সত্তাবান করেছি, সুতরাং নতুন একটি নাম দেব না কেন? অত গম্ভীর এবং প্যাঁচালো বিতর্কের মধ্যে আমি যাব না।
শাদা কথায় আমি তোমার একটি নতুন নামকরণ করতে চাই। আমার মনে একটা দুঃসাহস ঘনিয়ে উঠেছে, আমি তোমাকে নতুন করে সৃষ্টি করব। আল্লাহতায়ালার ইচ্ছেতে তোমাকে জন্মাতে হয়েছে, তাই তুমি তার কাছে ঋণী। ওই রক্ত-মাংসের শরীর তুমি মা-বাবার কাছ থেকে পেয়েছ, মা-বাবার কাছেও তোমার এমন কিছু ঋণ রয়েছে যা কোনোদিন অস্বীকার করতে পারবে না। পরিবারের মধ্যে তুমি বেড়ে উঠেছ, রাষ্ট্র তোমাকে নিরাপত্তা দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে, এমন কি বাংলাভাষী মানুষজন তোমার জিভে বাংলা ভাষাটি তুলে দিয়েছে। সবাই তোমাকে দাবি করে, তোমার অস্তিত্বের মধ্যে সবকিছুর অস্তিত্ব সমুদ্রের পানির মধ্যে লবণের মতো মিশে আছে।
আমার কথা বলি। কারো দাবি আমি অস্বীকার করিনে। আমি তোমাকে দু’বেলার অন্ন সরবরাহ করি নি, মাসমাইনের টাকা দিই নি, ঘুমোবার বাসগৃহের ব্যবস্থা করি নি, চলাফেরার নিরাপত্তা নিশ্চিত করি নি, জ্ঞানবিদ্যার ঊধ্বজগতে তুলে ধরি নি, পরকালে বিচার-আচার করার জন্যে উদ্যত মুষল হাতে দাঁড়িয়ে থাকি নি। তারপরও তোমার প্রতি আমার একটা ভিন্নরকম দাবি, একটা অধিকারবোধ হালফিল জন্ম নিতে আরম্ভ করেছে। তোমার সত্তার যে অংশটিতে আল্লাহতায়ালার অধিকার নেই, কোনো মানুষের এখতিয়ার নেই, রাষ্ট্র সমাজ, কারো কাছে দায়বদ্ধতা স্বীকার করে না, যেখানে তুমি শুধু তুমি, তোমার অস্তিত্বের সেই মর্মবিন্দুটি আমি স্পর্শ করতে চাই। যদি আমি সাধক চরিত্রের মানুষ হতাম, সারা জীবনের সাধনায় সেই অপ্রকাশ-বিন্দুটি স্পর্শ করে একটি সুন্দর নাম ধ্যানের উত্তাপে ফুলের মতো ফুটিয়ে তুলতাম।
সাধ আর সাধ্য এক জিনিস নয়। আমার যদি সে কামালিয়াত থাকত, একটি নাম, শুধু একটি নামে তোমার সত্তার আসল রূপ বিকশিত করার জন্যে সমস্ত জীবন ধ্যানের আসনে কাটিয়ে দিতাম।আমার ধৈর্যের পরিমাণ খুবই অল্প। তড়িঘড়ি একটা নাম দিয়ে ফেলতে চাই। যদি তোমার নাম ঈশ্বরী রাখতাম, বেশ হতো। তোমাকে ঈশ্বরের সঙ্গে জড়াবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছেও আমার নেই। কারণ তুমি একান্ত আমার। সেখানে কারো কোনো অংশ নেই, একেবারে লা শরিক। উপায়ান্তর না দেখে তোমার একটি নাম নির্বাচন করার জন্যে সঙ্গীত শাস্ত্রের শরণ নিলাম।একমাত্র সঙ্গীতই তো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত অপ্রকাশকে মূর্ত করে তুলতে পারে। সুতরাং তোমার নাম রাখলাম সোহিনী।
সোহিনী রাগের নামে তোমার নামকরণ করলাম। একটু হাল্কা বোধ করছি। নামকরণ তো করলাম। এই রাগটি সম্পর্কে একটা ধারণা দেয়া দরকার। এটি মাড়োয়া ঠাটের অন্তর্গত একটি রাগ। এতে পঞ্চম স্বরটি ব্যবহার হয় না। বলতে হবে এটি একটি ষাড়ব রাগ। আরোহীতে সা গা হ্ম ধা নি সা এবং অবরোহীতে সা নি ধা হ্ম ধা গা, হ্ম গা রে সা অনুসরণ করে গাওয়া হয়। গাইবার সময় রাতের শেষ প্রহর। গুণী গাইয়ে যখন তারপুরার স্বরে তন্ময় হয়ে, কণ্ঠের তড়িতের মধ্য দিয়ে এই রাগের সৌন্দর্য লক্ষণসমূহ প্রকাশ করতে থাকেন, তখন কী যে এক অনির্বচনীয় রূপ-রসের জগৎ মূর্তিমান হয়ে ওঠে, সে আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। সৌন্দর্যের সঙ্গে কষ্টের একটা সংযোগ আছে এটাই সোহিনী রাগের বৈশিষ্ট্য।
রাত যতই শেষের দিকে গড়াতে থাকে, এই রাগটির সৌন্দর্য ততই প্রস্ফুটিত হতে থাকে। কিন্তু একটি কথা, সঙ্গীতশাস্ত্রে যে গাইয়ে বিশুদ্ধি এবং নির্ভরতা অর্জন করে নি, তার কণ্ঠে সোহিনী রাগ কখনো গহন সৌন্দর্য নিয়ে ধরা দেবে না।সেই প্রাচীনকালে সঙ্গীতশাস্ত্র যখন সবে আকার পেতে আরম্ভ করেছে ধ্যানী সাধকদের তন্ময় সাধন দৃষ্টিতে রাগ-রাগিণীগুলো তাদের সৌন্দর্যের ভাণ্ডার উন্মোচিত করে রসমূর্তিতে আবির্ভূত হতো। সাধকের প্রাণ রাগ-রাগিণীর চলার গতি আর অপূর্ব তাললয়ের স্বর্ণ-রেখায় আঁকা হয়ে যেত। তখন পৃথিবী তরুণী ছিল। নিসর্গের ভাণ্ডার থেকে, বিহঙ্গের কাকলি থেকে, প্রাণকুলের ডাক থেকে, হাওয়ার স্বনন থেকে, নদীর গতিধারা থেকে সুর উঠে এসে সাধকের কণ্ঠে নিবাস রচনা করত।
তখন মানুষের অনুভূতি ছিল স্বচ্ছ, অকলঙ্ক। হৃৎপিণ্ডের লাল শোণিতের চাইতে তাজা অনুরাগ দিয়ে সুরের সাধনা করতেন সাধকেরা। তাদের নির্মল ধ্যানদৃষ্টিতে যে সুরগুলোর মধ্যে শক্তির প্রকাশ ধরা পড়ত, তাকে বলতেন রাগ, আর যে সুরগুলোতে চলমান সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করতেন বলতেন রাগিণী। আমার ধারণা, সোহিনী রাগ নয়, রাগিণী ।সোহিনী, তুমি আমার অর্ধেক আনন্দ, অর্ধেক বেদনা। অর্ধেক কষ্ট, অর্ধেক সুখ। অর্ধেক নারী, অর্ধেক ঈশ্বরী। তোমাকে নিয়ে আমি কি করব! তোমার টানা টানা কালো চোখের অতল চাউনি আমাকে আকুল করে।
তোমার মুখের দীপ্তি মেঘ-ভাঙা চাঁদের হঠাৎ ছড়িয়ে-যাওয়া জোছনার মতো আমার মনের গভীরে সুবর্ণ তরঙ্গ জাগিয়ে তোলে। দিঘল চিকন কালো কেশরাশি যখন তুমি আলুলায়িত করো, হাওয়া-লাগা চারাগাছের মতো আমি কেমন আন্দোলিত হয়ে উঠি। তোমাকে নিয়ে। আমি যাব কোথায়? সোহিনী তুমি কি নিদারুণ সংকটের মধ্যে আমাকে ছুঁড়ে দিয়েছ? তুমি এসো, এসো বলে কাছে ডাকছ, আবার না-না’ বলে দূরে ঠেলে দিচ্ছ। ওই না-আসা না-যাওয়ার পথের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে কি অবস্থা করেছ আমার! তোমার মনে কি আমার প্রতি একটুও দয়া নেই?
কাঞ্চনজঙ্র অমল ধবল সূর্যালোক-চমকানো তুষার চূড়োর মতো আমাকে আকর্ষণ করছ। আমি যতদূর যাই, যতদূর যেতে থাকি, কাঞ্চনজঙ্ঘা ততদূরে পিছোতে থাকে। ক্লান্ত হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে যখন অদৃষ্টকে ধিক্কার দিতে থাকি সোনা-মাখানো কাঞ্চনজঙ্ঘার সমস্ত তুষার মধুর হাসি ছড়িয়ে দিয়ে হাতছানিতে ডাকতে থাকে, এই তো আমি, সেই কতকাল থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তোমার প্রতীক্ষা করছি। তুমি আমাকে কি নিষ্ঠুর অগ্নিপরীক্ষার মধ্যে ফেলে দিয়েছ? নিজের সঙ্গে আমাকে কী কঠিন লড়াইটা না করতে হচ্ছে! আমি যে দাঁড়িয়ে থাকব, তার উপায় নেই, সামনে পা ফেলব, সে শক্তিও পাচ্ছিনে। এই না-চলা না-দাঁড়ানো অবস্থা, তার কী যে যন্ত্রণা!
তোমার সঙ্গে যখন প্রথম দেখা হলো, সেদিন কি বার, কোন্ মাস, দিবসের কোন প্রহর, কিছুই মনে নেই। শুধু মনে আছে তোমার সঙ্গে দেখা হলো। চরাচর চিরে তুমি যখন আবির্ভূত হলে, রজনীগন্ধার বোঁটার মতো যখন ঈষৎ নত হয়ে দাঁড়ালে, আমার শরীরের সমস্ত রক্ত মিছিল করে উজানে চলতে আরম্ভ করল। চেতনার স্তরে স্তরে উৎসবের সাড়া পড়ে গেল। আচমকা আমি বলে উঠলাম, আমি পেয়েছি, পেয়ে গেছি! নিজের উচ্চারণে নিজেই চমকে গেলাম। এ কী বলছি আমি! সামনে তুমি দাঁড়িয়ে। আমার মনে হলো, তুমি আসবে বলে, এসে এমনি করে দাঁড়াবে বলে, কতকাল ধরে তোমার প্রতীক্ষায় আমি অধীর ছিলাম।
আজ তুমি এসে গেছ। তোমার এলানো চুলের গোছা ছড়িয়ে পড়েছে। চোখের তারা দুটো থরথর কাঁপছে। শরীর থেকে সুঘ্রাণ বেরিয়ে আসছে। বহুকাল আগে বিস্মৃত একটি স্বপ্ন যেন আমার সামনে মূর্তিমান হয়েছে। শরীরের রেখাঁটি ঘিরে ঘিরে, শাড়িটি কোমর ছাড়িয়ে, বক্ষদেশ ছাড়িয়ে কাঁধের ওপর উঠে এসেছে। আঁচল-প্রান্ত হাল্কা হাওয়ায় একটু একটু করে কাঁপছে। আমি মৃদু খসখস শব্দ শুনতে পাচ্ছি। দুটো গানের কলি ঢেউ দিয়ে মনের মধ্যে জেগে উঠল- সোহাগ ভরে অনুরাগে জড়িয়ে ধীরে ধীরে / বেনারসী প্যাঁচ দিয়েছে শরীর বল্লরীরে।
আমি বিড়বিড় করে বলতে থাকলাম, তুমি আমার জীবন। তোমাকে না পেলে আমি বাঁচব না। তুমি আমার গন্তব্য, আমার মঞ্জিলে মকসুদ। তোমার জন্য, শুধু তোমার জন্যে দুনিয়ার অপর প্রান্ত অবধি আমি ছুটে যাব। দুস্তর সমুদ্র পাড়ি দেব। দুর্লঙ্ পাহাড়ের শীর্ষ চূড়োয় আমি আরোহণ করব। তুমি আমার মৃত্যু। তোমার পেছন পেছন আমি তীর্থযাত্রীর মতো ছুটে যাব। যদি মৃত্যু আমাকে গ্রাস করতে ছুটে আসে শহিদের আবেগ নিয়ে আমি সেই মরণকে আলিঙ্গন করব।
সোহিনী, তুমি আমার বুকে কী এক দুঃসাহসের জন্ম দিয়েছ! কী এক অসম্ভব আশা আমার মনে রক্ত-শতদলের মতো ফুটিয়ে তুলেছ! আমার শরীরের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে কী অপার শক্তির লহরি খেলিয়ে তুলেছ! আমি তোমাকে বারণ করতে পারছিনে। একটা দুর্বার গতিবেগ আমাকে ছুটিয়ে নিতে চাইছে। তুমি আমার পথ, আমার গন্তব্য। আমাকে যেতে হবে, আমাকে যেতে হবে। শরীরের প্রতি লোমকূপ থেকে একটা সিদ্ধান্ত প্রবাহিত হয়ে আমাকে তোমার অভিমুখে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
তোমার অভিমুখে যাওয়া ছাড়া আমার আর কোনো পথ খোলা নেই, যখন বুঝতে পারলাম, মনটা বিষাদে ছেয়ে গেল। মনে হলো জেনেশুনে একটা ফাঁস গলায় পরলাম। এই ফাসই আমাকে টেনে নিয়ে যাবে। ধরে নিলাম আমার মৃত্যুদণ্ড লেখা হয়ে গেছে। কখন কার্যকর হবে শুধু ঘোষণাটা করা হয়নি। ভীষণ ভারি, ভীষণ কষ্টদায়ক ক্রুশের মতো মৃত্যুদণ্ডের আদেশ চেতনায় বয়ে নিয়ে তোমার দিকে পা বাড়াব বলে যখন স্থির করলাম, বুকের ভেতর অনেকগুলো কণ্ঠের চাপা গুমরানো কান্নার শব্দ কান পেতে শুনলাম। আমার বুকের ভেতর কাঁদছে আমার অতীত। অতীতে যেসব নারী আমার জীবনে এসেছিল, এখন দেখছি, তাদের কেউ বিদেয় হয়নি। বুকের ভেতর রাজ্যপাট বিস্তার করে বসে আছে।
তোমার দিকে পা বাড়াই কী সাধ্য! তারা কেউ অধিকার ছেড়ে দিতে রাজি নয়। তাদের একেকজন মনের একেকটা অঞ্চল এমনভাবে খামচে ধরে আছে, অধিকার থেকে উপড়ে ফেলি কেমন করে! আমি যখন বাতাসে কান পাতি, বুকের ভেতর থেকে খিলখিল হাসির ধ্বনি, প্রাণ নিংড়ানো কান্নার আওয়াজ, চাপা চাপা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ ভেসে আসতে থাকে। এই সমস্ত রক্ত মাংসের নারী আমার জীবনে এসেছিল। এখন তাদের কেউ নেই। নেই বলে কি একেবারে নেই? মাটির গভীরে দেবে যাওয়া বোমা যেমন সমস্ত তেজস্ক্রিয়তাসহ আত্মগোপন করে থাকে, নাড়াচাড়া লাগলেই বিস্ফোরিত হয়; তেমনি আমিও যতই অতীত থেকে নিজের অস্তিত্ব টেনে আনতে চাই, কেউ হেসে, কেউ কেঁদে, কেউ ধমক দিয়ে বলতে থাকে, না না আমরা তোমাকে এক পাও নড়তে দেব না।
অতীত অভিজ্ঞতার মৌমাছি-চক্রে তোমাকে আটকে রাখব। অতীত এসে আগামীর পথ রোধ করে দাঁড়ায়। বুদ্ধত্ব অর্জনের পূর্ব-মূহূর্তে এমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল সাধক গৌতমের। ঝাঁকে ঝাঁকে মারকন্যা তার চারপাশে এসে নানা ভঙ্গিমায় নৃত্য করতে থাকে। কেউ গৌতমের কানে কানে ফিসফিসিয়ে বলে, আমি তোমাকে বিলাসের সমুদ্রে ভাসিয়ে নেব; কেউ বলে, আমি ভোগ-সুখের অপরিমেয় আনন্দে ডুবিয়ে রাখব, কেউ বলে, স্বর্ণ-সম্পদের ভাণ্ডার তোমার বিস্ফারিত দৃষ্টির সামনে মেলে ধরব। তুমি আমার হও, তুমি চোখ মেলে তাকাও। গৌতমের অন্তরে ঘন হয়ে গাঢ় হয়ে নির্বাণের তৃষ্ণা জন্ম নিয়েছিল। নির্বাণের আকাঙ্ক্ষা তাকে বুদ্ধত্ব অর্জনের পথে ধাবিত করে নিয়েছিল।
সোহিনী, প্রেমও তো এক ধরনের নির্বাণ। আমি নিতান্তই সামান্য মানুষ । গৌতমের উচ্চতায় নিজেকে স্থাপন করব, এমন ধৃষ্টতা আমার মতো তুচ্ছাতিতুচ্ছ জীবের কেমন করে হবে! তারপরও আমি সাহস করে বলব, আমার চেতনায় প্রেমের কুঁড়ি ফুটি ফুটি করছে। এই প্রেমের শক্তিতেই এমন শক্তিমান হয়ে উঠেছি, মাঝে মাঝে নিজেকে তরুণ দেবতার মতো মনে হয়। আমার অতীতের দিকে আমি সাহস করে তাকাতে পারি। তার অক্টোপাস-বন্ধন ছিন্ন করে নিজেকে অনন্তের অভিমুখে ছুটিয়ে নিতে পারি। সোহিনী, তুমি ভাল করেই জানো আমার কোনো ধন-সম্পদ নেই। মা-বাবা-আত্মীয়-স্বজন, স্ত্রী-পুত্র-পরিবার আমার কিছুই নেই।
যে সজীব বন্ধন একজন মানুষকে নানা কিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত করে রাখে, আমার ভাগ্য এমন ফর্সা যে সেসব কিছুই আমার জোটেনি। অতীত দিনের অর্জন বলতে আমার জীবনে যেসব নারী এসেছিল, যারা আমাকে কাঁদিয়েছে, হাসিয়েছে, দাগা দিয়েছে, যারা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, সেই দুঃখ-সুখের স্মৃতি চক্রটুকুই শুধু আমার একমাত্র অর্জন। এতকাল স্মৃতি নিয়েই বেঁচে ছিলাম। তোমার স্পর্শে আমার সমগ্র সত্তা জেগে উঠেছে। কাদায়-আটকানো হাতি যেমন ডাঙায় ওঠার জন্যে সমস্ত শক্তি দিয়ে চেষ্টা করে, আমিও সেরকম স্মৃতির জলাভূমি থেকে ছুটে বেরিয়ে আসার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছি প্রাণপণ।
কাজটা সহজ নয়, সোহিনী। একজন মানুষের শরীরের একটা হাত কিংবা পা দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হয়ে অবশ হয়ে গেলে মানুষ যেমন স্বেচ্ছায় আপন হাতে সে অঙ্গটি কেটে বাদ দিতে পারে না, সে রকমই অতীতকে বর্তমানে টেনে তুলে তার জীর্ণ অংশ হেঁটে ফেলাও একরকম অসম্ভব। দিব্য চেতনা অর্জন না করলে কেউ তা পারে না। আমি মনে করছি আমার হৃদয়ে প্রেম জন্ম নিয়েছে। অমৃতলোকের হাওয়া। আমার মনে তরঙ্গ জাগিয়ে তুলছে, তীব্রভাবে অনুভব করছি, আমি অমৃতলোকের যাত্রী।
আমার যাত্রাপথ যদি অবারিত করতে চাই, আমার জীবনে যেসব নারী এসেছিল, চলে গিয়েছে, স্মৃতির গভীরে খনন করে তাদের লাশগুলো আমাকে বের করে আনতে হবে। স্মৃতিকে যদি অতীতমুক্ত না করি, বর্তমানকে ধারণ করব কোথায়? সোহিনী, আমি জানি, আমার অনেক অশ্রু ঝরবে, বুকের ভেতর তপ্ত শোণিতের ধারা বইবে। কিন্তু উপায় কি? এই এতগুলো নারীর স্মৃতি-ভার বুকে নিয়ে আমি তোমার দিকে অগ্রসর হবো কেমন করে? আমি যদি নির্ধারতা অর্জন না করি, সামনে চলব কেমন করে? তাই স্মৃতির ভাঁড়ার উন্মোচন করে এইসব নারীকে অস্তিত্বহীন করে ফেলতে চাই।
তারা ভাল ছিল কি মন্দ ছিল, সে বিচারে আমার কাজ নেই। সবচেয়ে বড় কথা, তারা আমার জীবনে এসেছিল। একেকজন একেক ধরনের বন্ধনে আমার চেতনালোক আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এখন আমি সেই বন্ধনের গিঁটগুলো খুলে ফেলতে উদ্যত হয়েছি। মনে হয়, হাতুড়ি দিয়ে পাঁজরে আঘাত হানছি। সমস্ত জীবনের অর্জিত গহন সম্পদ তছনছ করে ফেলতে যাচ্ছি। কী করব! প্রেমপন্থের যাত্রী আমি। স্মৃতির কবর না খুঁড়লে তো আমার যাওয়া হবে না। সবকিছু ঝেড়ে ফেলে দিয়ে কেবল আমার আমিত্বটুকু নিয়েই তোমাকে অনুসরণ করতে চাই।প্রিয় সোহিনী, আমি তোমার কাছে দুরদানার কথা বয়ান করব। তার পুরো নাম দুরদানা আফরাসিয়াব। কেমন ফার্সি কিংবা তুর্কি মনে হয় না! লোকে বলত দুর্দান্ত থান্ডার।
দুরদানার সঙ্গে থান্ডার শব্দটি বেশ মানিয়ে গিয়েছিল। কেউ কেউ তাকে দুর্দান্ত চক্রযান বলেও ডাকত। কারণ নাখালপাড়ার দিক থেকে দ্রুতবেগে সাইকেল চালিয়ে সে আর্ট ইনস্টিটিউটে আসত। আজ থেকে তিরিশ বছর আগে একটি উনিশ বছরের তরুণী ঢাকার রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে কলেজে আসছে-যাচ্ছে, ব্যাপারটা কল্পনা করে দেখো। দুপাশের মানুষ হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখত। খাইবার মেল ছবিতে পাঞ্জাবি হিরোইন নীলুর লড়াকুপনা দেখে তৃতীয় শ্রেণীর দর্শকেরা যেমন শিস্ দিত, অশ্লীল মন্তব্য ছুঁড়ে দিত, তেমনি সাইকেল চালানোরত দুরদানাকে দেখেও রাস্তার লোকেরা তাদের অবদমিত অনুভূতি অশালীন ভাষায় প্রকাশ করতে থাকত।
ছেমরির বুক-পাছা-নিতম্ব এসব নিয়ে সরস আলোচনার ঝড় বয়ে যেত। পাঞ্জাবি হিরোইন নীলুর কাজ-কারবার পর্দায় সীমিত ছিল। আর গোটা উন্মুক্ত রাজপথটাই ছিল দুরদানার চলন ক্ষেত্র। রাজহাঁস যেমন পাখা থেকে পানি ঝেড়ে ফেলে, তেমনি দুরদানাও লোকজনের কোনো মন্তব্য গায়ে মাখত না। স্কুলগামী ছোট ঘোট বাচ্চারা হাততালি দিয়ে সাইকেল চালানোরত দুরদানাকে অভিনন্দন জানাতো। দুরদানা খুশি হয়ে হ্যান্ডেল থেকে দুহাত উঠিয়ে নিয়ে শুধু পায়ে প্যাডেল ঘুরিয়ে বাচ্চাদের তাক লাগিয়ে দিত। প্রিয় সোহিনী, আজ থেকে তিরিশ বছর আগে ঢাকার রাস্তায় এত ভিড় ছিল না। অনায়াসে দুরদানা স্কুলের বাচ্চাদের সাইকেলের খেলা দেখাতে পারত।
Read more
