“জ্যাঠাইমা!” “কে, রমেশ? আয় বাবা, ঘরে আয়।” বলিয়া আহ্বান করিয়া বিশ্বেশ্বরী তাড়াতাড়ি একখানি মাদুর পাতিয়া দিলেন। ঘরে পা দিয়াই রমেশ চমকিত হইয়া উঠিল। কারণ, জ্যাঠাইমার কাছে যে স্ত্রীলোকটি বসিয়াছিল, তাহার মুখ দেখিতে না পাইলেও বুঝিল—এ রমা। তাহার ভারি একটা চিত্তজ্বালার সহিত মনে হইল, ইহারা মাসীকে মাঝ্খানে রাখিয়া অপমান করিতেও ত্রুটি করে না, আবার নিতান্ত নির্লজ্জার মত নিভৃতে কাছে আসিয়াও বসে! এদিকে রমেশের আকস্মিক অভ্যাগমে রমারও অবস্থাসঙ্কট কম হয় নাই।
কারণ, শুধু যে সে এ গ্রামের মেয়ে, তাই নয়; রমেশের সহিত তাহার সম্বন্ধটাও এইরূপ যে, নিতান্ত অপরিচিতার মত ঘোমটা টানিয়া দিতেও লজ্জা করে, না দিয়াও সে স্বস্তি পায় না। তা ছাড়া সেদিন মাছ লইয়া একটা সেদিন কাণ্ড ঘটিয়া গেল! তাই সবদিক্ বাঁচাইয়া যতটা পারা যায়, সে আড় হইয়া বসিয়াছিল। রমেশ আর সেদিকে চাহিল না।
ঘরে যে আর কেহ আছে, তাহা একেবারে অগ্রাহ্য করিয়া দিয়া, ধীরে সুস্থে মাদুরের উপর উপবেশন করিয়া কহিল, “জ্যাঠাইমা!” জ্যাঠাইমা বলিলেন, “হঠাৎ এমন দুপুরবেলা যে, রমেশ?” রমেশ কহিল, “দুপুরবেলা না এসে তোমার কাছে যে একটু বস্তে পাইনে। তোমার কাজ ত কম নয়!” জ্যাঠাইমা তাহার প্রতিবাদ না করিয়া শুধু একটুখানি হাসিলেন। রমেশ মৃদু হাসিয়া বলিল, “বহুকাল আগে ছেলেবেলায় একবার তোমার কাছে বিদায় নিয়ে গিয়েছিলুম। আবার আজ একবার নিতে এলুম। এই হয়ত শেষ নেওয়া, জ্যাঠাইমা!” তাহার মুখের হাসি সত্ত্বেও কন্ঠস্বরে ভারাক্রান্ত হৃদয়ের এমনই একটা গভীর অবসাদ প্রকাশ পাইল যে, উভয় শ্রোতা বিস্মিত-ব্যথায় চমকিয়া উঠিলেন।
“বালাই, ষাট্! ও কি কথা, বাপ।” বলিয়া বিশ্বেশ্বরীর চোখদুটি যেন ছলছল করিয়া উঠিল। রমেশ শুধু একটু হাসিল। বিশ্বেশ্বরী স্নেহার্দ্রকন্ঠে প্রশ্ন করিলেন, “শরীরটা কি এখানে ভাল থাক্চে না,—বাবা?” রমেশ নিজের সুদীর্ঘ এবং অত্যন্ত বলশালী দেহের পানে বার দুই দৃষ্টিপাত করিয়া বলিল, “এ যে খোট্টার দেশের ডালরুটির দেহ জ্যাঠাইমা, এ কি এত শীঘ্রই খারাপ হয়? তা’ নয়, শরীর আমার বেশ ভালই আছে, কিন্তু এখানে আমি আর একদণ্ডও টিঁকতে পাচ্ছিনে, সমস্ত প্রাণটা যেন আমার থেকে-থেকে খাবি খেয়ে উঠ্চে।
” শরীর খারাপ হয় নাই শুনিয়া, বিশ্বেশ্বরী নিশ্চিন্ত হইয়া হাসিমুখে জিজ্ঞাসা করিলেন, “এই তোর জন্মস্থান—এখানে টিঁকতে পারচিস্নে, কেন বল্ দেখি?” রমেশ মাথা নাড়িয়া বলিল, “সে আমি বল্তে চাইনে। আমি জানি তুমি নিশ্চয়ই সমস্ত জানো।” বিশ্বেশ্বরী ক্ষণকাল মৌন থাকিয়া, একটু গম্ভীর হইয়া বলিলেন, “সব না জান্লেও কতক জানি বটে।
কিন্তু, সেই জন্যেই ত বলচি, তোর আর কোথাও গেলে চল্বে না, রমেশ?” রমেশ কহিল, “কেন চল্বে না, জ্যাঠাইমা? কেউ ত এখানে আমাকে চায় না।” জ্যাঠাইমা বলিলেন, “চায় না বলেই ত তোকে আর কোথাও পালিয়ে যেতে আমি দেব না। এই যে ডাল রুটি খাওয়া দেহের বড়াই কর্ছিলি রে, সে কি পালিয়ে যাবার জন্যে?” রমেশ চুপ করিয়া রহিল। আজ কেন যে তাহার সমস্ত চিত্ত জুড়িয়া গ্রামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আগুন জ্বলিয়া উঠিয়াছিল, তাহার একটু বিশেষ কারণ ছিল।
গ্রামের যে পথটা বরাবর ষ্টেশনে গিয়া পৌঁছিয়াছিল, তাহার একটা জায়গা আটদশ বৎসর পূর্ব্বে বৃষ্টির জলস্রোতে ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল। সেই অবধি ভাঙনটা ক্রমাগত দীর্ঘতর এবং গভীরতর হইয়া উঠিয়াছে। প্রায়ই জল জমিয়া থাকে—স্থানটা উত্তীর্ণ হইতে সকলকেই একটু দুর্ভাবনায় পড়িতে হয়। অন্য সময়ে কোনমতে পা টিপিয়া, কাপড় তুলিয়া, অতি সন্তর্পণে ইহারা পার হয়, কিন্তু বর্ষাকালে আর কষ্টের অবধি থাকে না।
কোন বছর বা দুটো বাঁশ ফেলিয়া দিয়া, কোন বছর বা একটা ভাঙা তালের ডোঙা উপুড় করিয়া দিয়া, কোনমতে তাহারি সাহায্যে ইহারা আছাড় খাইয়া, হাত-পা ভাঙ্গিয়া, ওপারে গিয়া হাজির হয়। কিন্তু এত দুঃখসত্ত্বেও গ্রামবাসীরা আজ পর্য্যন্ত তাহার সংস্কারের চেষ্টামাত্র করে নাই। মেরামত করিতে টাকাকুড়ি ব্যয় হওয়া সম্ভব।
এই টাকাটা রমেশ, নিজে না দিয়া চাঁদা তুলিবার চেষ্টায় আটদশদিন পরিশ্রম করিয়াছে; কিন্তু আট-দশটা পয়সা কাহারো কাছে বাহির করিতে পারে নাই। শুধু তাই নয়—আজ সকালে ঘুরিয়া আসিবার সময়, পথের ধারে শ্যাকরাদের দোকানের ভিতরে এই প্রসঙ্গ হঠাৎ কাণে যাওয়ায়, সে বাহিরে দাঁড়াইয়া শুনিতে পাইল, কে একজন আর একজনকে হাসিয়া বলিতেছে, “একটা পয়সা কেউ তোরা দিস্নে। দেখচিস্নে ওর নিজের গরজটাই বেশী?
জুতো পায়ে মস্মসিয়ে চলা চাই কিনা! না দিলে, ও আপনি সারিয়ে দেবে তা’ দেখিস! তা ছাড়া এতকাল যে ও ছিল না, আমাদের ইষ্টীশান যাওয়া কি আট্কে ছিল? কে আর একজন কহিল, সবুর কর না হে! চাটুয্যে মশাই বল্ছিলেন, ওর মাথায় হাত বুলিয়ে শীতলাঠাকুরের ঘরটাও ঠিকঠাক করে নেওয়া হবে। খোশামোদ ক’রে দুটো ‘বাবু’ ‘বাবু’ কর্তে পার্লেই ব্যস! তখন হইতে সারা-সকালবেলাটা এই দুটো কথা তাহাকে যেন আগুন দিয়া পোড়াইতেছিল।
জ্যাঠাইমা ঠিক এই স্থানটাতেই ঘা দিলেন। বলিলেন, “সে ভাঙনটা যে সারাবার চেষ্টা কর্ছিলি, তার কি হ’ল?” রমেশ বিরক্ত হইয়া কহিল, “সে হবে না, জ্যাঠাইমা—কেউ একটা পয়সা চাঁদা দেবে না।” বিশ্বেশ্বরী হাসিয়া বলিলেন, “দেবে না বলে হবে না রে! তোর দাদামশায়ের ত তুই’ অনেক টাকা পেয়েচিস্—এই ক’টা টাকা তুই ত নিজেই দিতে পারিস্! রমেশ একেবারে আগুন হইয়া উঠিল। কহিল, “কেন দেব?
আমার ভারী দুঃখ হচ্চে যে, না বুঝে অনেক গুলো টাকা এদের ইস্কুলের জন্যে খরচ করে ফেলেছি। এ গাঁয়ের কারো জন্যে কিচ্ছু কর্তে নেই।” রমার দিকে একবার কটাক্ষে চাহিয়া লইয়া বলিল,—এদের দান কর্লে এরা বোকা মনে করে; ভাল কর্লে গরজ ঠাওরায়। ক্ষমা করাও মহাপাপ; ভাবে—ভয়ে পেছিয়ে গেল!” জ্যাঠাইমা খুব হাসিয়া উঠিলেন; কিন্তু রমার চোখমুখ একেবারে রক্তবর্ণ হইয়া উঠিল। রমেশ রাগ করিয়া কহিল, “হাস্লে যে জ্যাঠাইমা?
” “না হেসে করি কি বল্ ত বাছা?” বলিয়া সহসা একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া বিশ্বেশ্বরী বলিলেন, “বরং আমি বলি, তোরই এখানে থাকা সবচেয়ে দরকার। রাগ করে যে জন্মভূমি ছেড়ে চলে যেতে চাচ্ছিস্, রমেশ, বল্ দেখি তোর রাগের যোগ্য লোক এখানে আছে কে?” একটু থামিয়া, কতটা, যেন নিজের মনেই বলিতে লাগিলেন—“আহা! এরা যে কত দুঃখী, কত দুর্ব্বল—তা’ যদি জানিস্, রমেশ, এদের উপর রাগ কর্তে তোর আপনি লজ্জা হবে।
ভগবান্ যদি দয়া ক’রে তোকে পাঠিয়েছেন—তবে এদের মাঝ্খানেই তুই থাক্, বাবা।” “কিন্তু, এরা যে আমাকে চায় না, জ্যাঠাইমা!” জ্যাঠাইমা বলিলেন, “তাই থেকেই কি বুঝ্তে পারিসনে, বাবা, এরা তোর রাগ অভিমানের কত অযোগ্য? আর শুধু এরাই নয়—যে গ্রামে ইচ্ছে ঘুরে আয় দেখ্বি সমস্তই এক।” সহসা রমার প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া বলিয়া উঠিলেন, “তুমি যে সেই থেকে ঘাড় হেঁট করে চুপ করে বসে আছ, মা?—হাঁ রমেশ, তোরা দু’ভাই বোনে কি কথাবার্ত্তা বলিস্নে?
না মা, সে কোরো না। ওর বাপের সঙ্গে তোমাদের যা’ হয়ে গেছে, সে ঠাকুরপোর মৃত্যুর সঙ্গেই শেষ হয়ে গেছে। সে নিয়ে তোমরা দুজন মনান্তর ক’রে থাক্লে ত কিছুতেই চলবে না।” রমা মুখ নীচু করিয়াই আস্তে আস্তে বলিল, “আমি মনান্তর রাখ্তে চাইনে, জ্যাঠাইমা! রমেশদা’—” অকস্মাৎ তাহার মৃদুকণ্ঠ রমেশের গম্ভীর উত্তপ্ত কণ্ঠস্বরে ঢাকিয়া গেল।
সে উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, “এর মধ্যে তুমি কিছুতে থেকো না মা! জ্যাঠাইমা! সেদিন কোনগতিকে ওঁর মাসীর হাতে প্রাণে বেঁচেচ; আজ আবার উনি গিয়ে যদি তাঁকে পাঠিয়ে দেন—একেবারে তোমাকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলে তবে তিনি বাড়ী ফির্বেন।” বলিয়াই কোনরূপ বাদ-প্রতিবাদের অপেক্ষামাত্র না করিয়াই দ্রুতপদে বাহির হইয়া গেল।
বিশ্বেশ্বরী চেঁচাইয়া ডাকিলেন, “যাসনে, রমেশ, কথা শুনে যা।” রমেশ দ্বারের বাহির হইতে বলিল, “না, জ্যাঠাইমা—যারা অহঙ্কারের স্পর্দ্ধায় তোমাকে পর্য্যন্ত পায়ের তলায় মাড়িয়ে চলে, তাদের হয়ে একটি কথাও তুমি বোলো না—” বলিয়া তাহার দ্বিতীয় অনুরোধের পূর্ব্বেই চলিয়া গেল। বিহ্বলের মত রমা কয়েক মুহূর্ত্ত বিশ্বেশ্বরীর মুখের পানে চাহিয়া থাকিয়া কাঁদিয়া ফেলিল—“এ কলঙ্ক আমার কেন, জ্যাঠাইমা? আমি কি মাসীকে শিখিয়ে দিই, না, তার জন্য আমি দায়ী?
” জ্যাঠাইমা তাহার হাতখানা নিজের হাতের মধ্যে টানিয়া লইয়া সস্নেহে বলিলেন, “শিখিয়ে যে দাও না, এ কথা সত্যি। কিন্তু তাঁর জন্যে দায়ী তোমাকে কতকটা হ’তে হয় বই কি মা!” রমা অন্য হাতে চোখ মুছিতে মুছিতে রুদ্ধ অভিমানে সতেজ অস্বীকার করিয়া বলিল, “কেন দায়ী? কখ্খনো না। আমি যে এর বিন্দুবিসর্গও জান্তাম না, জ্যাঠাইমা! তবে কেন আমাকে উনি, মিথ্যে দোষ দিয়ে, অপমান ক’রে গেলেন?” বিশ্বেশ্বরী ইহা লইয়া আর তর্ক করিলেন না। ধীরভাবে বলিলেন, “সকলে ত ভেতরের কথা জান্তে পারে না, মা।
কিন্তু তোমাকে অপমান কর্বার ইচ্ছে ওর কখনো নেই, এ কথা তোমাকে আমি নিশ্চয় বল্তে পারি। তুমি ত জান না, মা, কিন্তু আমি গোপাল সরকারের মুখে শুনে টের পেয়েছি, তোমার ওপর ওর কত শ্রদ্ধা, কত বিশ্বাস। সেদিন তেঁতুলগাছটা কাটিয়ে দু’ঘরে যখন ভাগ করে নিলে, তখন ও কা’রো কথায় কাণ দেয়নি যে; ওর তা’তে অংশ ছিল। তাদের মুখের ওপর হেসে বলেছিল, চিন্তার কারণ নেই—রমা যখন আছে, তখন আমার ন্যায্য অংশ আমি পাবই; সে কখনো পরের জিনিস আত্মসাৎ কর্বে না।
আমি ঠিক জানি, মা, এত বিবাদ-বিসংবাদের পরেও তোমার ওপর ওর সেই বিশ্বাসই ছিল, যদি না সেদিন গড়পুকুরের—” কথাটার মাঝখানেই বিশ্বেশ্বরী সহসা থামিয়া গিয়া নির্নিমেষ-চক্ষে কিছুক্ষণ ধরিয়া রমার আনত শুষ্কমুখের পানে চাহিয়া থাকিয়া অবশেষে বলিলেন, “আজ একটা কথা বলি, মা, তোমাকে। বিষয়-সম্পত্তি রক্ষা করার দাম যতই হোক রমা, এই রমেশের প্রাণটার দাম তার চেয়ে অনেক—অনেক বেশি। কারো কথায়, কোন বস্তুর লোভেতেই, মা সেই জিনিসটিকে তোমরা চারিদিক থেকে ঘা মেরে মেরে নষ্ট ক’রে ফেলো না।
দেশের যে ক্ষতি তাতে হবে, আমি নিশ্চয় বল্চি তোমাকে, কোন কিছু দিয়েই আর তার পূরণ হবে না।” রমা স্থির হইয়া রহিল, একটি কথারও প্রতিবাদ করিল না। বিশ্বেশ্বরী আর কিছু বলিলেন না। খানিক পরে রমা অস্পষ্ট মৃদুকন্ঠে কহিল,—“বেলা গেল, আজ বাড়ী যাই জ্যাঠাইমা!” বলিয়া প্রণাম করিয়া, পায়ের ধূলা মাথায় লইয়া চলিয়া গেল।
যত রাগ করিয়াই রমেশ চলিয়া আসুক, বাড়ী পৌঁছিতে না পৌঁছিতে তাহার সমস্ত উত্তাপ যেন জল হইয়া গেল। সে বার বার করিয়া বলিতে লাগিল—“এই সোজা কথাটা না বুঝিয়া কি কষ্টই না পাইতেছিলাম। বাস্তবিক, রাগ করি কাহার উপর? যাহারা এতই সঙ্কীর্ণভাবে স্বার্থপর যে, যথার্থ মঙ্গল কোথায়, তাহা চোখ মেলিয়া দেখিতেই জানে না, শিক্ষার অভাবে যাহারা এম্নি অন্ধ যে, কোনমতে প্রতিবেশীর বলক্ষয় করাটাকেই নিজেদের বল-সঞ্চয়ের শ্রেষ্ঠ উপায় বলিয়া মনে করে, যাহাদের ভাল করিতে গেলে সংশয়ে কণ্টকিত হইয়া উঠে, তাহাদের উপর অভিমান করার মত ভ্রম আর ত কিছুই হইতে পারে না!
” তাহার মনে পড়িল, দূরে সহরে বসিয়া সে বই পড়িয়া, কানে গল্প শুনিয়া, কল্পনা করিয়া কতবার ভাবিয়াছে, ‘আমাদের বাঙ্গালী জাতির আর কিছু যদি না থাকে ত নিভৃত গ্রামগুলির সেই শান্তি-স্বচ্ছন্দতা আজও আছে, যাহা বহুজনাকীর্ণ সহরে নাই।সেখানে স্বল্পেসন্তুষ্ট, সরল গ্রামবাসীরা সহানুভূতিতে গলিয়া যায়, একজনের দুঃখে আর একজন বুক দিয়া আসিয়া পড়ে, একজনের সুখে আর একজন অনাহূত উৎসব করিয়া যায়। শুধু সেইখানে, সেই সব হৃদয়ের মধ্যেই এখনো বাঙ্গালীর সত্যকার ঐশ্বর্য অক্ষয় হইয়া আছে।
’ হায় রে! এ কি ভয়ানক ভ্রান্তি! তাহার সহরের মধ্যেও যে এমন বিরোধ, এত পরশ্রীকাতরতা চোখে পড়ে নাই! আর সেই কথাটা মনে পড়িতে তাহার সর্ব্বাঙ্গ বহিয়া যেন অসংখ্য সরীসৃপ চলিয়া বেড়াইতে লাগিল। নগরের সজীব চঞ্চল পথের ধারে যখনই কোন পাপের চিহ্ন তাহার চোখে পড়িয়া গেছে; তখনই সে মনে করিয়াছে, কোনমতে তাহার জন্মভূমি সেই ছোট্ট গ্রামখানিতে গিয়া পড়িলে সে এই সকল দৃশ্য হইতে চিরদিনের মত রেহাই পাইয়া বাঁচিবে।
সেখানে যাহা সকলের বড়—সেই ধর্ম্ম আছে, এবং সামাজিক চরিত্রও আজি সেখানে অক্ষুণ্ণ হইয়া বিরাজ করিতেছে! হা ভগবান্! কোথায় সেই চরিত্র? কোথায় সেই জীবন্ত ধর্ম্ম আমাদের এই সমস্ত প্রাচীন নিভৃত গ্রামগুলিতে! ধর্ম্মের প্রাণটাই যদি আকর্ষণ করিয়া লইয়াছে, তাহার মৃতদেহটাকে ফেলিয়া রাখিয়াছে কেন? এই বিবর্ণ বিকৃত শবদেহটাকেই হতভাগ্য গ্রাম্য-সমাজ যে যথার্থ ধর্ম্ম বলিয়া প্রাণপণে জড়াইয়া ধরিয়া, তাহারি বিষাক্ত পূতিগন্ধময় পিচ্ছিলতায় অহর্নিশি অধঃপথেই নামিয়া চলিতেছে! অথচ সর্ব্বাপেক্ষা মর্ম্মান্তিক পরিহাস এই যে, জাতিধর্ম্ম নাই বলিয়া সহরের প্রতি ইহাদের অবজ্ঞা, অশ্রদ্ধারও অন্ত নাই!
রমেশ বাড়ীতে পা দিতেই দেখিল, প্রাঙ্গণের একধারে একটি প্রৌঢ়া স্ত্রীলোক একটি এগারো বারো বছরের ছেলেকে লইয়া জড়সড় হইয়া বসিয়াছিল, উঠিয়া দাঁড়াইল। কিছু না জানিয়া শুধু ছেলেটির মুখ দেখিয়াই রমেশের বুকের ভিতরটা যেন কাঁদিয়া উঠিল। গোপাল সরকার চণ্ডীমণ্ডপের বারান্দায় বসিয়া লিখিতেছিল; উঠিয়া আসিয়া কহিল,—“ছেলেটি দক্ষিণপাড়ার দ্বারিক ঠাকুরের ছেলে। আপনার কাছে কিছু ভিক্ষার জন্য এসেচে।” ভিক্ষার নাম শুনিয়াই রমেশ জ্বলিয়া উঠিয়া বলিল, “আমি কি শুধু ভিক্ষা দিতেই বাড়ী এসেচি, সরকার মশায়? গ্রামে কি আর লোক নেই?
” গোপাল সরকার একটু অপ্রতিভ হইয়া বলিল, “সে ত ঠিক কথা বাবু! কিন্তু কর্ত্তা ত কখনও কারুকে ফেরাতেন না; তাই, দায়ে পড়লেই, এই বাড়ীর দিকেই লোকে ছুটে আসে।” ছেলেটির পানে চাহিয়া প্রৌঢ়াটিকেই উদ্দেশ করিয়া বলিল,—“হাঁ কামিনীর মা, এদের দোষও ত কম নয়, বাছা! জ্যান্ত থাক্তে প্রায়শ্চিত্ত ক’রে দিলে না, এখন মড়া যখন ওঠে না, তখন টাকার জন্য ছুটে বেড়াচ্চে! ঘরে ঘটিটা বাটিটাও কি নেই বাপু?” কামিনীর মা জাতিতে সদ্গোপ। এই ছেলেটির প্রতিবেশী। মাথা নাড়িয়া বলিল,—“বিশ্বেস না হয়, বাপু, গিয়ে দেখ্বে চল। আমার কিছু থাক্লেও কি মরা বাপ ফেলে একে ভিক্ষে কর্তে আনি? চোখে না দেখ্লেও শুনেচ ত সব?
এই ছমাস ধ’রে আমার যথাসর্ব্বস্ব এই জন্যই ঢেলে দিয়েচি। বলি, ঘরের পাশে বামুনের ছেলেমেয়ে না খেতে পেয়ে মর্বে!” রমেশ এই ব্যাপারটা কতক যেন অনুমান করিতে পারিল। গোপাল সরকার তখন বুঝাইয়া কহিল,—“এই ছেলেটির বাপ—দ্বারিক চক্রবর্ত্তী, ছয়মাস হইতে কাসরোগে শয্যাগত থাকিয়া, আজ ভোরবেলায় মরিয়াছে; প্রায়শ্চিত্ত হয় নাই বলিয়া, কেহ শবস্পর্শ করিতে চাহিতেছে না—এখন সেইটা করা নিতান্ত প্রয়োজন।
কামিনীর মা গত ছয়মাসকাল তাহার সর্ব্বস্ব এই নিঃস্ব ব্রাহ্মণ-পরিবারের জন্য ব্যয় করিয়া ফেলিয়াছে; আর তাহারও কিছু নাই। সেই জন্যে ছেলেটিকে লইয়া আপনার কাছে আসিয়াছে।” রমেশ খানিকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “বেলা ত প্রায় দুটো বাজে। যদি প্রায়শ্চিত্ত না হয়, মড়া পড়েই থাকবে?” সরকার হাসিয়া কহিল, “উপায় কি বাবু?
অশাস্তর কাজ ত আর হ’তে পারে না। আর এতে পাড়ার লোককেই বা দোষ দেবে কে, বলুন—যা হোক্, মড়া প’ড়ে থাক্বে না; যেমন ক’রে হোক, কাজটা ওদের কর্তেই হবে। তাই ত ভিক্ষে—হাঁ কামিনীর মা, আর কোথাও গিয়েছিলে?” ছেলেটি মুঠা খুলিয়া একটি সিকি ও চারিটি পয়সা দেখাইল। কামিনীর মা কহিল, “সিকিটি মুখুয্যেরা দিয়েচে, আর পয়সা চারটি হালদার মশাই দিয়েচেন।
কিন্তু যেমন ক’রে হোক ন’সিকের কমে ত হবে না! তাই, বাবু যদি”—রমেশ তাড়াতাড়ি কহিল, “তোমরা বাড়ী যাও বাপু, আর কোথাও যেতে হবে না! আমি এখনি সমস্ত বন্দোবস্ত ক’রে, লোক পাঠিয়ে দিচ্চি।” তাদের বিদায় করিয়া দিয়া রমেশ, গোপাল সরকারের মুখের প্রতি অত্যন্ত ব্যথিত দুই চক্ষু তুলিয়া প্রশ্ন করিল,—“এমন গরীব এ গাঁয়ে আর কয়ঘর আছে, জানেন আপনি?” সরকার কহিল,—“দু’তিন ঘর আছে, বেশী নেই।
এদেরও মোটা ভাত-কাপড়ের সংস্থান ছিল, বাবু, শুধু একটা চালদা গাছ নিয়ে মামলা ক’রে দ্বারিক চক্কোত্তি আর সনাতন হাজরা, দু’ঘরেই বছরপাঁচেক আগে শেষ হ’য়ে গেল।” গলাটা একটু খাটো করিয়া কহিল,—“এতদূর গড়াত না, বাবু, শুধু আমাদের বড় বাবু, আর গোবিন্দ গাঙুলীই, দু’জনকেই নাচিয়ে তুলে এতটা ক’রে তু্ল্লেন।” “তার পরে?” সরকার কহিল,—“তার পর, আমাদের বড়বাবুর কাছেই দুঘরের গলা পর্য্যন্ত এতদিন বাঁধা ছিল।
গত বৎসর উনি সুদে-আসলে সমস্তই কিনে নিয়েচেন। হাঁ, চাষার মেয়ে বটে ওই কামিনীর মা! অসময়ে বামুনের যা কর্লে, এমন দেখ্তে পাওয়া যায় না।” রমেশ, একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া চুপ করিয়া রহিল। তার পর, গোপাল সরকারকে সমস্ত বন্দোবস্ত করিয়া দিবার জন্য পাঠাইয়া দিয়া, মনে মনে বলিল,—“তোমার আদেশই মাথায় তুলে নিলাম, জ্যাঠাইমা! মরি এখানে, সেও ঢের ভাল, কিন্তু এ দুর্ভাগ্য গ্রামকে ছেড়ে আর কোথাও যেতে চাইব না।”
Read more
