আমাদের রাজা বড় সর্বনেশে। বুড়ো এদিক-ওদিক সন্দেহের দৃষ্টি দিল। তারপর গলা নামিয়ে বলল, এ রাজা পিশাচ। পেয়াদারা বল্লমের খোঁচা মেরে তাঁতিদের দিয়ে কাপড় বোনায়। যারা বোনে না তাদের শূলে চড়ায়। রূপসার কাপড় বিদেশ থেকে সদাগর এসে কিনে নিয়ে যায়। যা টাকা আসে তার চার ভাগের তিন ভাগ যায় রাজকোষে।
তাঁতিরা সব একজোটে রাজাকে হটিয়ে তার ছেলেকে সিংহাসনে বসাবে ঠিক করেছিল। সেকথা কেউ গিয়ে তোলে রাজার কানে। আর সেই সময় লাগে এই মড়ক। রাজা চায় তাঁতিরা সব মরুক। তাই ওষুধ এনে সরিয়ে রেখেছে।কানাইয়ের মনটা শক্ত হয়ে উঠল। এমন শয়তান রাজা এই রূপসার রাজ্যে? সে যে করে থোক। চাঁদনির পাতা এনে দেবে তাঁতিদের জন্য।
যেকরে হোক! বুড়ো বলে চলল, রাজা শয়তান, কিন্তু তার ছেলে রাজকুমার, সে সোনার চাঁদ ছেলে। তোমারই মতন বয়স তার। সে যদি রাজা হয় তা হলে দেশের সব দুঃখু দূর হবে।এই রাজাকে সরাবার কোনও রাস্তা নেই বুঝি? সে কি আর আমরা জানি? আমরা মুখ্য-সুখ মানুষ, আমরা শুধু দুঃখু পেতেই জানি।আরও একটা কথা জিজ্ঞেস করার ছিল বুড়োকে।
রাজবাড়িটা কোনদিকে বলতে পারো? এই রাস্তা দিয়ে সোজা গেলে রাজপথ পড়বে। বাঁয়ে ঘুরে দেখবে দূরে রাজার কেল্লার ফটক দেখা যাচ্ছে। তবে তোমায় সেখানে ঢুকতে দেবে না। পাহারা বড় কড়া।কানাই বুড়োর কাছে বিদায় নিয়ে কিছুদূর গিয়েই রাজপথে পড়ল। বাঁ দিকে ঘুরে সত্যিই দেখল দূরে কেল্লার ফটক দেখা যাচ্ছে।
কানাই ইতিমধ্যেই মতলব এটে নিয়েছে। সে এমনি ভাবে হেঁটে গিয়ে যখন ফটক থেকে বিশ হাত দূরে, প্রহরী তাকে সন্দেহের চোখে দেখছে, তখন সে দিল ফটক লক্ষ্য করে বেদম ছুট।চোখের পলকে কানাই প্রথম ফটক দ্বিতীয় ফটক পেরিয়ে পৌঁছে গেল একটা বাগানে। এখানে আশেপাশে কোনও লোক নেই দেখে কানাই থামল। বাঁ দিকে বাগান, তাকে চারিদিক দিয়ে ঘিরে আছে শ্বেতপাথরের দালান।
কানাই কী করবে ভাবতে ভাবতে এগিয়ে চলল। বাগানে ফুলের ছড়াছড়ি, চারিদিক রঙে রঙ, কে বলবে এই দেশে শুখনাইয়ের মড়ক লেগেছে।এই ফুলের মধ্যেই কি চাঁদনি গাছ রয়েছে? ছোট ছোট ছুঁচলো বেগুনি পাতা আর হলদে ফুল। যদি এর মধ্যেই থাকে তা হলে সে কাজ অনেক সহজে হয়ে যায়।
এদিক-ওদিক দেখতে দেখতে কানাই এগোচ্ছিল, হঠাৎ তার পিঠে পড়ল একটা হাত, আর আরেকটা হাত তার কোমরটা জড়িয়ে ধরে কোলপাঁজা করে তুলে নিল।কানাই দেখলে সে এক অতিকায় প্রহরীর হাতে বন্দি।প্রহরী কানাইকে সোজা নিয়ে গেল রাজসভায়। কানাই দেখল রাজা সিংহাসনে বসে আছেন, আর তাঁকে ঘিরে রয়েছে সভাসদরা।
রাজা যে শয়তান সেটা তাঁর কুতকুতে চোখ, ঘন ভুরু আর গালপাট্টা দেখলেই বোঝা যায়।এটাকে কোত্থেকে পেলি? রাজা কানাইয়ের দিকে চোখ রেখে পেয়াদাকে জিজ্ঞেস করলেন।মহারাজ, এ অন্দরমহলের বাগানে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক দেখছিল। এ ব্যাটা ফটক দিয়ে ঢুকল কী করে? দু-দুটো সশস্ত্র প্রহরী রয়েছে সেখানে!তা জানি না মহারাজ! হুঁ।
বলবন্ত আর যশোবন্তকে শূলে চড়াও। ফটকে নতুন প্রহরী মোতায়েন করো। এ রাজ্যে কাজে ফাঁকির শাস্তি মৃত্যু।মহারাজের পাশে দু-তিনজন কর্মচারী আদেশ পালন করার জন্য হাঁ হাঁ করে উঠল।রাজা এবার কানাইয়ের দিকে দৃষ্টি দিলেন।তোর ব্যাপার কী শুনি। তোর নাম কী? আজ্ঞে, আমার নাম কানাই।
কোত্থেকে আসছিস? কানাই ঠিক করেছিল যে রাজার কাছে সে সব কথা সত্যি বলবে না। সে বলল, আজ্ঞে পাশের গাঁ থেকে।কাগমারি? আজ্ঞে হাঁ।বাগানে কী খুঁজছিলি? কই, কিছু খুঁজিনি তো। শুধু দাঁড়িয়ে ছিলাম।রাজা যেন একটু নিশ্চিন্ত হলেন। বললেন, ঠিক আছে; এখন একে হাজতে পোরো। পরে এর বিচার হবে।
তিন মিনিটের মধ্যে কানাই দেখল যে সে কারাগারে বন্দি। গরাদওয়ালা দরজা খড়াং শব্দে বন্ধ। হতেই সে হতাশ হয়ে কারাগারের এককোণে বসে পড়ল। আর আটদিন বাকি আছে। তার মধ্যে চাঁদনির পাতা নিয়ে দেশে ফিরতে না পারলে তার বাপকে সে চিরতরে হারাবে।
এমন হতাশ কানাইয়ের কোনওদিনও লাগেনি। জগাইবাবার কথা মনে পড়ল তার। নীল আর। লাল ফল দুটো আর ঝিনুকটা এখনও তার ট্যাঁকে রয়েছে। কিন্তু কই, জগাইবাবা তো তাকে আর ডাকল না। ওগুলো দিয়ে কী কাজ হয় তাও জানা গেল না।কয়েদখানার একটামাত্র খুপরি জানলা; সেটা পশ্চিম দিকে হওয়াতে তার ভিতর দিয়ে বিকেলের রোদ এসে পড়েছে।
কমলা রঙের রোদ দেখে কানাই বুঝল যে, সূর্য অস্ত যাবার মুখে।ক্রমে সেই আলোটুকুও চলে গিয়ে ঘর অন্ধকার হয়ে গেল। ঘরের বাইরে একজন প্রহরী, সে সেখানে টহল ফিরছে। তার পায়ের একটানা খট খট শব্দে কানাইয়ের চোখে ঘুম এল, আর দশ মিনিটের মধ্যে কানাই ঘুমে ঢলে পড়ল।এইভাবে জেগে ঘুমিয়ে, কয়েদখানার অখাদ্য খাওয়া খেয়ে, তিনদিন চলে গেল।
সময় আর মাত্র পাঁচদিন। সন্ধ্যা হয়-হয়, কানাইয়ের চোখে ঘুমের আমেজ, মন থেকে আশা প্রায় মুছে এসেছে, এমন সময় সে হঠাৎ সজাগ হয়ে উঠল। বাইরে প্রহরী এখন টহল দিচ্ছে, কে যেন এর মধ্যে বাইরে একটা মশাল জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে, তার আলোয় ফটকের গরাদের লম্বা লম্বা ছায়া পড়েছে কারাগারের মেঝেতে।
কিন্তু কানাইয়ের ঘুমটা ভাঙল কেন? কান পাততেই কানাই কারণটা বুঝল।তার ট্যাঁকের ঝিনুক থেকে একটা শব্দ আসছে।কানাই! কানাই! কানাই! কানাই তাড়াতাড়ি ঝিনুকটা বার করে কানের উপর চেপে ধরল। তারপরেই সে পরিষ্কার শুনতে পেল জগাইবাবার কথা।শোন, কানাই, মন দিয়ে শোন। আরও কিছু কথা মনে পড়েছে।
তোর কাছে যে নীল ফলটা আছে সেটা খেলে তোর মধ্যে অদৃশ্য হবার শক্তি আসবে। কিন্তু অদৃশ্য হতে গেলে আগে একটা কথা বলে নিতে হবে। সেটা হল ফক্কা। সেটা বললেই তোকে আর কেউ দেখতে পাবে না। আবার যখন নিজের চেহারায় ফিরে আসতে চাইবি, তখন বলতে হবে টক্কা। বুঝলি? হ্যাঁ, বুঝেছি, মনে মনে বলল কানাই।
আচ্ছা, এবার আরেকটা কথা বলি–সেটাও হঠাৎ মনে পড়ল। রূপসার রাজা তার ছেলেকে বন্দি করে রেখেছে প্রাসাদের ছাতের কোণে একটা ঘরে। বাবাকে হটিয়ে ছেলে সিংহাসনে না বসা অবধি রূপসার কোনও গতি নেই; শুখনাই অসুখে সারা দেশ ছারখার হয়ে যাবে। রাজাকে এক সদাগর এক লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে একটা পান্না বিক্রি করে আজ থেকে সাত বছর আগে।
এই পান্না রাজার গলার হারে বসানো। এই পান্নায় জাদু আছে; এটাই যত নষ্টের গোড়া। বুঝছিস? কানাই বুঝেছে ঠিকই, কিন্তু চাঁদনির পাতা কী করে পাওয়া যাবে সেই নিয়ে তো জগাইবাবা কিছুই বললেন না! ঝিনুকের ভিতর আবার কথা শোনা গেল।চাঁদনি উদ্ধার করায় বড় বিপদ। কিন্তু তারও রাস্তা আছে।কী রাস্তা? সেটা মনে পড়ছে না, বলল জগাইবাবা। পড়লে বলব।
ব্যস্, কথা শেষ। কানাই কানে সমুদ্রের গর্জন শুনতে পাচ্ছে। সে ঝিনুকটাকে আবার ট্যাঁকে গুঁজে নিল।প্রহরী এখনও টহল দিচ্ছে। লম্বা টহল, তার গোড়ায় আর শেষটায় প্রহরী কানাইয়ের দৃষ্টির বাইরে চলে যায়। বাঁ দিকে একবার প্রহরী অদৃশ্য হতেই ট্যাঁক থেকে নীল ফলটা বার করে কানাই টপ করে মুখে পুরে দিল।
তারপর প্রহরী ডান দিকে অদৃশ্য হতেই কানাই ধাঁ করে বলে দিল ফক্কা! প্রহরী ফেরার পথে কয়েদখানার দিকে দেখেই চমকে উঠল। তার টহল থেমে গেল।সে প্রথমে গরাদের ফাঁক দিয়ে ভিতরে দেখল-এ-কোণ, ও-কোণ, সে-কোণ।তারপর মশালটা গরাদের ভিতর ঢুকিয়ে দিয়ে আবার দেখল।তারপর মশাল রেখে চাবি দিয়ে ফটক খুলে অতি সন্তর্পণে ভিতরে ঢুকল।
তার চোখে অবাক ভাবটা তখন দেখবার মতো!কানাই এই সময়টার জন্যই অপেক্ষা করছিল। প্রহরীকে বেশ কিছুটা ভিতরে ঢুকতে দিয়ে টু করে পাশ কাটিয়ে খোলা ফটক দিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ল।পা টিপে টিপে কোনও শব্দ না করে দুজন প্রহরীর নাকের সামনে দিয়ে কানাই বেরিয়ে এসে পৌঁছল একটা ঘোরানো সিঁড়ির মুখে।
সেই সিঁড়ি দিয়ে সে উঠতে লাগল উপরে। নিঘাত এ সিঁড়ি ছাতে গিয়ে পৌঁছেছে।হ্যাঁ, কানাইয়ের আন্দাজে ভুল নেই। সিঁড়ি উঠে গিয়ে একটা দরজার মুখে পৌঁছেছে, সেই দরজা পেরোতেই কানাই দেখল সে ছাতে এসে পড়েছে।পেল্লায় ছাত, এককোণে একটা ঘর। তাতে একটা জানলা। সেই জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে একটা টিমটিমে আলো।
ঘরের দরজার বাইরে বসে আছে একটা প্রহরী, তার মাথা হেঁট।অদৃশ্য কানাই এগিয়ে গেল প্রহরীর দিকে। যা আন্দাজ করেছিল তাই; প্রহরী মুখ হাঁ করে ঘুমোচ্ছে, তার নাক দিয়ে ঘড় ঘড় শব্দ বেরোচ্ছে।ঘরের দরজায় একটা বড় তালা ঝুলছে। বোধহয় তারই চাবি রয়েছে প্রহরীর কোমরে গোঁজা।কানাই খুব সাবধানে প্রহরীর ঘুম না ভাঙিয়ে চাবিটা বার করে নিল।
তারপর সেটা তালায় ঢুকিয়ে একটা প্যাঁচ দিতেই খুট করে তালা খুলে গেল। কী ভাগ্যি এই শব্দেও প্রহরীর ঘুম। ভাঙেনি।এবার দরজা খুলে অদৃশ্য কানাই ঘরের ভিতর ঢুকল। ঘরে একটা টেমি জ্বলছে, আর একটা খাটিয়ায় চোখে অবাক দৃষ্টি নিয়ে বসে আছে তারই বয়সি একটি ফুটফুটে ছেলে। ঘরের দরজা খুলল, অথচ কাউকে দেখা যাচ্ছে না, তাতে রাজকুমারের মুখ হাঁ হয়ে গেছে।
এ কি ভেলকি নাকি? দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে কানাই এবার খাটের দিকে ঘুরে ফিসফিস্ করে বলল, টক্কা!–আর অমনই তার চেহারা দেখা যাওয়াতে রাজকুমার আরও চমকে উঠে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল, তুমি কে? কোনও জাদুকর নাকি? ফিসফিসিয়েই কথা হল, যদিও প্রহরীর নাকডাকানি থেকে মনে হয় বাজ পড়লেও তার ঘুম ভাঙবে না।
কানাই রাজকুমারকে পুরো ব্যাপারটা খুলে বলল। রাজকুমার বলল, গাছের কথা তুমি বলছ বটে, কিন্তু সে গাছ তুমি পাবে কী করে? সে তত সহজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।কী করে পাব তা জানি না, বলল কানাই, কিন্তু গাছের পাতা আমার চাই-ই। শুধু আমার বাবার জন্য নয়; তোমাদের এখানে তাঁতিরা সব মরতে বসেছে।
তাদের জন্য পাতা লাগবে। কম করে হাজার পাতা তো থাকবেই সে গাছে; তাতে হাজার লোকের প্রাণ বাঁচবে।আমিও তো তাদের বাঁচাতে চাই, বলল রাজকুমার। বাবাকে আমি সে কথা বলেছিলাম। বাবা তাতেই আমাকে বন্দি করে রাখার হুকুম দিলেন। বাবা নিজের ছাড়া আর কারুর ভালও চান না। নিজের ভাল মানে যত বেশি টাকা আসে কোষাগারে ততই ভাল।
ধর্মেকর্মে বাবার মতি নেই, প্রজাদের মঙ্গলের চিন্তা নেই, আমি যে তাঁর নিজের ছেলে, তার জন্যও মায়া-মমতা কিচ্ছু নেই।কানাই বলল, আচ্ছা, তোমার বাবার গলার হারে একটা জাদুপান্না আছে, তাই না? তা তো বটেই। সাত বচ্ছর আগে এক সদাগর বাবাকে সেটা বেচে। সেই থেকে বাবার একটা দিনের জন্যও কোনও অসুখ হয়নি, আর বাবার অত্যাচারও বেড়ে গেছে তিনগুণ।
এখানকার তাঁতিরা তাঁকে সিংহাসন থেকে সরাবার ফন্দি করেছিল। হয়তো তারা সে কাজে সফল হত, কিন্তু সেইসময়ই লাগে শুনাইয়ের মড়ক।কানাই একটু ভেবে বলল, আচ্ছা, একটা কথা বলো দেখি। রাজামশাইয়ের শোয়ার ঘরটা কোথায়? আমি তো ইচ্ছা করলে অদৃশ্য হতে পারি।
আমি যদি তার গলা থেকে হারটা খুলে নিয়ে আসি? কানাই একটু ভেবে বলল, আচ্ছা, একটা কথা বলো দেখি। রাজামশাইয়ের শোয়ার ঘরটা কোথায়? আমি তো ইচ্ছা করলে অদৃশ্য হতে পারি। আমি যদি তার গলা থেকে হারটা খুলে নিয়ে আসি? রাজকুমার গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ল।বাবার শোয়ার ঘর রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে।
কিন্তু তার দরজায় প্রহরী ছাড়াও একটা ভয়ানক হিংস্র কুকুর পাহারা দেয়। সে তোমাকে দেখতে না পেলেও তোমার গন্ধ পাবে, আর পেলেই চিৎকার শুরু করবে। না, ওভাবে হবে না। অন্য উপায় দেখতে হবে। যা করতে হবে দিনের বেলা।কানাই একটুক্ষণ চুপ করে ভেবে বলল, তোমাকে তো এবার পালাতে হবে।
আমি যখন এসেই পড়েছি, তখন আর তুমি বন্দি থাকবে কেন? রাজবাড়ি ছাড়া তোমার কোনও ঠাঁই আছে? তা আছে, বলল রাজকুমার। তাঁতিদের মধ্যে আমার এক বন্ধু আছে, তার নাম গোপাল। তার এক বিধবা মা ছাড়া আর কেউ নেই। আমার নিজের মা-কে হারিয়েছি আমি তিন বছর বয়সে। গোপালের মা-কে আমি নিজের মায়ের মতো ভালবাসি।
বাবা গোপালের সঙ্গে মিশতে দেন না আমাকে; কিন্তু আজ যদি তার কাছে যাই, সে আমাকে ফিরিয়ে দেবে না।তার বাড়িতে কি দুজনের জায়গা হবে? হবে বইকী। তিনজনে এক ঘরে মাদুর পেতে শুয়ে থাকব। আমার খুব অভ্যাস আছে।তা হলে চলো, চাঁদের আলোয় বেরিয়ে পড়ি।কিন্তু ফটকে প্রহরী আছে যে? প্রহরী আমাদের কিছু করতে পারবে না।
তোমাকে পিঠে করে নিয়ে আমি ঝড়ের বেগে বেরিয়ে যাব। কেউ আমাদের নাগাল পাবে না।সত্যি বলছ? সত্যি।কিন্তু যে আমার এমন বন্ধুর কাজ করল, তার নামটা তো এখনও জানলাম না।আমার নাম কানাই।আর আমার নাম কিশোর। তবে চলো যাই এবার। ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে সোজা নেমে যাব।বেশ। নীচে সিঁড়ির মুখে দরজা পেরোলেই বাগান।সেইখান থেকেই দেব ছুট!
গোপালদের বাড়ি তাঁতিপাড়ার এক প্রান্তে। সেখানে শুই রোগ এখনও পৌঁছয়নি, কিন্তু কবে এসে পৌঁছবে তার ঠিক কি? গোপালের মা সেই কথা ভেবে কানাই আর কিশোরকে বলেছিলেন, আমার এখানে থাকার বিপদটা কী তা জানো। সেটা ভেবেও কি তোমরা তিনজনে একসঙ্গে থাকতে চাও? তিনজনেই মাথা নেড়ে বলেছিল হ্যাঁ, তারা তাই চায়।
সেই সঙ্গে কানাই বলেছিল, আপনি ভাববেন না। শুখনাই রোগের ওষুধ আছে রাজবাড়িতে। সে ওষুধ আমি জোগাড় করবই যে করে হোক। তা হলে আর কারুর ব্যারাম থাকবে না।কিন্তু মুখে বলা এক, আর কাজে আরেক।তিনদিন কেটে গেল, তবু কাজ এগোলো না একটুও। আর মাত্র দুদিন আছে কানাইয়ের বাপ, তারপরেই তার আয়ু শেষ।
এদিকে ঝিনুকেও আর কোনও কথা শোনা যায়নি। জগাইবাবা এমন চুপ কেন? এর মধ্যে অবিশ্যি আরও অনেক কাণ্ড ঘটে গেছে। কানাই আর রাজকুমার দুজনেই কয়েদি অবস্থা থেকে পালিয়েছে দেখে রাজবাড়িতে হুলস্থুল পড়ে গেছে। এ জিনিস কেমন করে হয়? যে প্রহরী দুজন পাহারায় ছিল তাদের দুজনকেই শুলে চড়ানো হয়েছে।
কানাই আর কিশোরকে ধরার জন্য শয়ে শয়ে সেপাই সারা রাজ্যে খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিয়েছে। গোপাল তাঁতির সঙ্গে যে রাজকুমারের ভাব ছিল সেটা রাজা জানতেন, তাই গোপালের বাড়িতেও পেয়াদা পাঠিয়েছিলেন। ঠিক সেই সময় কানাই বুদ্ধি করে ফক্কা বলে অদৃশ্য হয়ে পেয়াদার হাত থেকে বল্লম টেনে নিয়ে তাকে ল্যাঙ মেরে ফেলে দিয়েছে; পেয়াদা এই ভেলকিতে ভড়কে গিয়ে দিয়েছে চম্পট।
Read more
কানাইয়ের কথা (৩য় পর্ব) – সত্যজিৎ রায়
