বদনাম – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বদনাম

ঠাকুর ক্রিং ক্রিং ক্রিং সাইকেলের আওয়াজ; সদর দরজার কাছে লাফ দিয়ে নেমে পড়লেন ইন্স্পেক্টার বিজয়বাবু গায়ে ছাঁটা কোর্তা, কোমরে কোমরবন্ধ, হাফপ্যাণ্টপরা, চলনে কেজো লোকের দাপট দরজার কড়া নাড়া দিতেই গিন্নি এসে খুলে দিলেন

ইন্স্পেক্টার ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই ঝংকার দিয়ে উঠলেন— “এমন করে তো আর পারি নে, রাত্তিরের পর রাত্রির খাবার আগলে রাখি! তুমি কত চোর ডাকাত ধরলে, সাধু সজ্জনও বাদ গেল না, আর একটা লোক অনিল মিত্তিরের পিছন পিছন তাড়া করে বেড়াচ্ছ, সে থেকে থেকে তোমার সামনে এসে নাকের উপর বুড়ো আঙুল নাড়া দিয়ে কোথায় দৌড় মারে তার ঠিকানা নেই

দেশসুদ্ধ লোক তোমার এই দশা দেখে হেসে খুন, যেন সার্কাসের খেলা হচ্ছেইন্স্পেক্টার বললেন, “আমার উপরে ওর নেকনজর আছে কী ভাগ্যিস বেলে খালাস আসামীই বটে, তবু পুলিসে না রিপোর্ট্করে কোথাও যাবার হুকুম নেই, তাই আমাকে সেদিন চিঠিতে জানিয়ে গেল—‘ইন্স্পেক্টারবাবু, ভয় পাবেন না, সভার কাজ সেরেই আমি ফিরে আসছি

কোথায় সভা তার কোনো সন্ধান নেই পুলিসে যেন ভেলকি খেলছেস্ত্রী সৌদামিনী বললে, “শোনো তবে আজ রাত্তিরের খবর দিই, শুনলে তোমার তাক লেগে যাবে লোকটার কী আস্পর্ধা, কী বুকের পাটা! রাত্তির তখন দুটো, আমি তোমার খাবার আগলে বসে আছি, একটু ঝিমুনি এসেছে

হঠাৎ চমকে দেখি সেই তোমাদের অনিল ডাকাত, আমাকে প্রণাম করে বললে, ‘দিদি, আজ ভাইফোঁটার দিন, মনে আছে? ফোঁটা নিতে এসেছি আমার আপন দিদি এখন চট্টগ্রামে কী সব চক্রান্ত করছে কিন্তু ফোঁটা আমি চাই, ছাড়ব না, এই বসলুম’…সত্যি কথা তোমাকে বলব আমার মনের মধ্যে উছলে উঠল স্নেহ

মনে হল এক রাত্তিরের জন্যে আমি ভাইকে পেয়েছি সে বললে, ‘দিদি, আজ তিন দিন কোনোমতে আধপেটা খেয়ে বনে জঙ্গলে ঘুরেছি আজ তোমার হাতের ফোঁটা তোমার হাতের অন্ন নিয়ে আবার আমি উধাও হবতোমার জন্যে যে ভাত বাড়া ছিল তাই আমি তাকে আদর করে খাওয়ালুম বললুম, ‘এই বেলা তুমি পালাও, তাঁর আসবার সময় হয়েছে

লোকটা বললে, ‘কোনো ভয় নেই, তিনি আমারই সন্ধানে চিতলবেড়ে গেছেন, ফিরতে অন্তত তিনটে বাজবে আমি রয়ে বসে তোমার পায়ের ধুলো নিয়ে যেতে পারববলে তোমারই জন্যে সাজা পান টপ করে মুখে নিলে তুলে তার পরে বললে কিনা— ‘ইন্স্পেক্টারবাবু হাভানা চুরুট খেয়ে থাকেন; তারই একটা আমাকে দাও, আমি খেতে খেতে যাব যেখানে আমার সব দলের লোক আছে; তারা আজ সভা করবে

তোমার ডাকাত অনায়াসে, নির্ভয়ে, সেই জায়গাটার নাম আমাকে বলে দিলেইন্স্পেক্টারবাবু বললেন, “নামটা কী শুনতে পারি কিসদু বললেতুমি এমন প্রশ্ন আমাকে জিজ্ঞেস করলে এর থেকে প্রমাণ হয় তোমার ডাকাত আমাকে চিনেছিল কিন্তু তুমি আজও আমাকে চেনো নিযা হোক, আমি তাকে তোমার বহু শখের একটি হাভানা চুরুট দিয়েছি

সে জ্বালিয়ে দিব্যি সুস্থ মনে পায়ের ধুলো নিয়ে চুরুট ফুঁকতে ফুঁকতে চলে গেলবিজয় বসে ছিলেন, লাফ দিয়ে উঠে বললেন, “বলো সে কোন্দিকে গেল, কোথায় তাদের সভা হচ্ছেসদু উঠে ঘাড় বেঁকিয়ে বললে, “কী! এমন কথা তোমার মুখ দিয়ে বের হল! আমি তোমার স্ত্রী হয়েছি,তাই বলে কি পুলিসের চরের কাজ করব

তোমার ঘরে এসে আমি যদি ধর্ম খুইয়ে বসি, তবে তুমিই বা আমাকে বিশ্বাস করবে কী করেইন্স্পেক্টার চিনতেন তাঁর স্ত্রীকে ভালো করে খুব শক্ত মেয়ে, এর জিদ কিছুতেই নরম হবে না হতাশ হয়ে বসে নিশ্বেস ফেলে বললেন, “হায় রে, এমন সুযোগটাও কেটে গেল! ” বসে বসে তাঁর নবাবি ছাঁদের গোঁফজোড়াটাতে তা দিতে লাগলেন, আর থেকে থেকে ফুঁসে উঠলেন অধৈর্যে

তাঁর জন্য তৈরি দ্বিতীয় দফার খিচুড়ি তাঁর মুখে রুচল না এই গেল এই গল্পের প্রথম পালা দ্বিতীয় সদু স্বামীকে বললে, “কী গো, তুমি যে নৃত্য জুড়ে দিয়েছ! আজ তোমার মাটিতে পা পড়ছে না ডিস্ট্রিক্‌‌ট্পুলিসের সুপারিণ্টেন্ডের নাগাল পেয়েছ নাকি” “পেয়েছি বৈকি” “কী রকম শুনি” “আমাদের যে চর, নিতাই চক্রবর্তী, সে ওদের ওখানে চরগিরি করে

তার কাছে শোনা গেল আজ মোচকাঠির জঙ্গলে ওদের একটা মস্ত সভা হবে সেটাকে ঘেরাও করবার বন্দোবস্ত হচ্ছে ভারী জঙ্গল, আমরা আগে থাকতে লুকিয়ে সার্ভেয়ার পাঠিয়ে তন্ন তন্ন করে সার্ভে করে নিয়েছি কোথাও আর লুকিয়ে পালাবার ফাঁক থাকবে না” “তোমাদের বুদ্ধির ফাঁকের মধ্যে দিয়ে বড়ো বড়ো ফুটোই থাকবে

অনেক বার তো লোক হাসিয়েছ, আর কেন এবারে ক্ষান্ত দাও” “সে কি কথা সদু এমন সুযোগ আর পাব না” “আমি তোমাকে বলছি, আমার কথা শোনো মোচকাঠির জঙ্গল সব বাজে কথা সে তোমাদেরই ঘরের আনাচে কানাচে ঘুরছে তোমাদের মুখের উপরে তুড়ি মেরে দেবে দৌড়, আমি তোমাকে বলে দিলুম

” “তা, তুমি যদি লুকিয়ে তাদের ঘরের খবর দাও, তা হলে সবই সম্ভব হবে” “দেখো, অমন চালাকি কোরো না বোকামি করতে হয় পেট ভরে করো, অনেক বার করেছ, কিন্তু নিজের ঘরের বউকে নিয়ে—” কথাটা চাপা পড়ল চোখের উপর আঁচল চাপার সঙ্গেসদু, আমি দেখেছি যে এই একটা বিষয়ে তোমার ঠাট্টাটুকুও সয় না” “তা সত্যি, পুলিসের ঠাট্টাতেও যে গায়ে দাঁত বসে

এখন কিছু খেয়ে নেবে কি না বলো” “তা নেব, সময় আছে, সব একেবারে পাকাপাকি ঠিকঠাক হয়ে গেছে” “দেখো, আমি সত্যি কথাই বলব তোমরা যা কানাকানি কর তা যদি জানতে পারতুম তা হলে ওদের কাছে ফাঁস করে দেওয়া কর্তব্য মনে করতুম” “সর্বনাশ, কিছু শুনেছ নাকি তুমি” “তোমাদের সংসারে চোখ কান খুলে রাখতেই হয়, কিছু কানে যায় বৈকি

” “কানে যায়, আর তার পরে?” “আর তার পরে চণ্ডীদাস বলেছেন, ‘কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো আকুল করিয়া দিল প্রাণ” “তোমার ঠাট্টাতেই তুমি জিতে যাও, কোন্টা যে তোমার আসল কথা ধরা যায় না” “তা বুঝবার বুদ্ধিই যদি থাকত তবে এই পুলিস ইন্স্পেক্টরি কাজ তুমি করতে না

এর চেয়ে বড়ো কাজেই সরকার বাহাদুর তোমাকে লাগিয়ে দিতেন বিশ্বহিতৈষীর পদে, বক্তৃতা দিতে দিতে দেশে বিদেশে জাল ফেলতে” “সর্বনাশ, তা হলে সেইযে মেয়েটির গুজব শোনা যাচ্ছে, সে দেখি আমার আপন ঘরেরই ভিতরকার” “ দেখো, কুকুরটা চেঁচিয়ে মরছে

ইন্স্পেক্টারবাবু মহা খাপ্পা হয়ে বললেন, “আমি এক্ষুনি গিয়ে লাগাব কুকুরটাকে আমার পিস্তলের গুলি।সদু তার স্বামীর কাপড় ধরে টেনে বললে, “না, কক্ষনো তুমি যেতে পারবে না।” “কেন।” “তুমি সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই একেবারে টুঁটি ক্যাঁক্করে চেপে ধরবে। বড়ো বদমাইস কুকুর। কেবল আমাকেই চেনে।

” “একটা খবর পেয়েছি সদু, সেই অনিল লোকটা হরবোলা, সব জন্তুরই নকল করতে পারে। রোজ রাত্রি দুটোর সময়ে ওইযে তোমায় ডাক দিচ্ছে না তাই বা বলি কী করে।সদু একেবারে জ্বলে উঠে বললে, “অ্যাঁ, শেষকালে আমাকে সন্দেহ! এই রইল তোমার ঘরকন্না পড়ে, আমি চললুম আমার ভগ্নীপতির বাড়িতে।

এই বলে সে উঠে পড়ল।আরে, কোথায় যাও! ভালো মুশকিল! নিজের ঘরের স্ত্রীকে ঠাট্টা করব না, আমি ঠাট্টার জন্যে পরের ঘরের মেয়ে কোথায় খুঁজে পাই। পেলেই বা শান্তি রক্ষা হবে কী করে।বলে ওকে জোর করে ধরে বসালেন। সদু কেবলই চোখ মুছতে লাগল।আহা, কী করছ, কাঁদ কেন, সামান্য একটা ঠাট্টা নিয়ে!” “না, তোমার এই ঠাট্টা আমার সইবে না, আমি বলে রাখছি।

” “আচ্ছা, আচ্ছা, ব্যস্‌— রইল, এখন তুমি আরামে নিশ্চিন্ত হয়ে তোমার কুকুরকে খাইয়ে এসো। আবার কাটলেট নইলে খায় না, পুডিং না হলে পেট ওর ভরে না। সামান্য কুকুর নিয়ে তুমি অত বাড়াবাড়ি কর কেন আমি বুঝতেই পারি না।সদু বললে, “তোমরা পুরুষ মানুষ বুঝবে না। পুত্রহীনা মেয়ের বুকে যে স্নেহ জমে থাকে সে যেকোনো একটা প্রাণীকে পেলে তাকে বুকের কাছে টেনে নেয়।

ওকে একদিন না দেখলে আমার মনে কেবলই ভয় হতে থাকে, কে ওকে কোন্দিক থেকে ধরে নিয়ে গেল। তাই তো আমি ওকে এত যত্নে ঢেকেঢুকে রাখি।” “কিন্তু আমি বলে দিচ্ছি সদু, কোনো জানোয়ার এত আদরে বেশি দিন বাঁচতে পারে না।” “তা, যতদিন বাঁচে ভালো করেই বাঁচুক।বিজয়বাবু বিশ্রাম করতে লাগলেন। ইতিমধ্যে পুলিসের দলবল জুটল, চলল সবাই আলাদা আলাদা রাস্তায় মোচকাঠির দিকে।

বহু দূরের পথ, প্রায় রাত পুইয়ে গেল যেতেআসতে। পরের দিন বেলা সাতটার সময় মুখ শুকিয়ে ইন্স্পেক্টার বাড়িতে এসে কেদারাটার উপরে ধপাস করে বসে পড়লেন। বললেন, “সদু, বড়ো ফাঁকি দিয়েছে! তোমার কথাই সত্যি। পুলিসের লোক ঘেরাও করলে বন, সে বনে জনমানব নেই। হৈ হৈ লাগিয়ে দিলে; চীৎকার করে বলতে লাগলে, ‘কোথায় আছ বের হও, নইলে আমরা গুলি চালাব।

অনেকগুলো ফাঁকা গুলি চলল, কোনো সাড়া নেই। পুলিসের লোক খুব সাবধানে বনের মধ্যে ঢুকে তল্লাস করলে। তখন ভোর হয়ে এসেছে। রব উঠল, ‘ধর্সেই নিতাইকে, বদমাইসকে।নিতাইয়ের আর টিকি দেখা যায় না। একখানা চিঠি পাওয়া গেল, কেবল এই কটি কথা— ‘আসামী নিরাপদ। দিদিকে আমার প্রণাম জানাবেন।

অনিল।দেখো দেখি কী কাণ্ড, এর মধ্যে আবার তোমার নাম জড়ানো কেন, শেষ কালে— “শেষকালে আবার কী। পুলিসের ঘরের গিন্নি কি আসামীর ঘরের দিদি হতেই পারে না। সংসারের সব সম্বন্ধই কি সরকারী খামের ছাপমারা। আমি আর কিছু বলব না। এখন তুমি একটু শোও, একটু ঘুমোও।ঘুম ভাঙল তখন বেলা দুপুর।

স্নান করে মধ্যাহ্ন ভোজনের পর বিজয় বসে বসে পান চিবোতে চিবোতে বললেন, লোকটার চালাকির কথা কী আর তোমাকে বলব। দলবল নিয়ে চার দিকে প্রোপাগাণ্ডা ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে, ভোর রাত্তিরে কুম্ভক যোগ করে শূন্যে আসন করেএটা নাকি অনেকের স্বচক্ষে দেখা। গ্রামের লোকের বিশ্বাস জন্মিয়ে দিয়েছে একজন সিদ্ধপুরুষ, বাবা ভোলানাথের চিহ্নিত।

ওর গায়ে হাত দেবে হিন্দুর ঘরে আজ এমন লোক নেই। তারা আপন ঘরের দাওয়ায় ওর জন্য খাবার রেখে দেয়রীতিমত নৈবেদ্য। সকালবেলা উঠে দেখে তার কোনো চিহ্ন নেই। হিন্দু পাহারাওয়ালারা তো ওর কাছে ঘেঁষতেই চায় না। একজন দারোগা সাহস করে হিজলাকান্দির দাঙ্গার পরে ওকে গ্রেপ্তার করেছিল।

হপ্তা খানেকের মধ্যে তার স্ত্রী বসন্ত হয়ে মারা গেল। এর পরে আর প্রমাণের অভাব রইল না। সেইজন্য এবারে যখন মোচকাঠিতে ওর কোনো সাড়া পাওয়া গেল না, পাহারাওয়ালারা ঠিক করলে যে যখন খুশি আপনাকে লোপ করে দিতে পারে। তার একটি সাক্ষীও রেখে গেছেএকটা জলা জায়গায় পায়ের দাগ দেখা গেল, দুহাত অন্তর একএকটি পদক্ষেপদেড় হাত লম্বা।

হিন্দু পাহারাওয়ালারা সেই পায়ের দাগের উপরে ভক্তিভরে লুটিয়ে পড়ে আরকি! এই লোককে সম্পূর্ণ মন দিয়ে ধরপাকড় করা শক্ত হয়ে উঠেছে। ভাবছি মুসলমান পাহারাওয়ালা আনাব, কিন্তু দেশের হাওয়ার গুণে মুসলমানকে যদি ছোঁয়াচ লাগে তবে আরও সর্বনাশ হবে। খবরের কাগজওয়ালারা মোচকাঠিতে সংবাদদাতা পাঠাতে শুরু করলে।

কোন্পলাতকের এই লম্বা পা, তা নিয়ে অনেকক্ষণ আলোচনা হল। এখন লোকটাকে কী করা যায়। এই কিছুদিন বেলে খালাস পেয়েছিল, সেই সুযোগে দেশের হাওয়ায় যেন গাঁজার ধোঁওয়া লাগিয়ে দিলে। দিকে পিছনে প্রোপাগাণ্ডা চলছেই, নানা রকম ছায়া নানা জায়গায় দেখা যায়।এক জায়গায় মহাদেবের একগাছি চুল পাওয়া গেছে বলে আমার ভক্ত কনেস্টবল অত্যন্ত গদ্গদ হয়ে উঠেছে।

সেটা যে শণের দড়ি সে কথা বিচার করবার সাহসই হল না। দিনের মধ্যে চারদিকে একেবারে গুজবের ঝড় উঠে গেল। মোচকাঠিতে পায়ের চিহ্নের উপরে মন্দির বানাবে লে একজন ধনী মাড়োয়ারি ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে বসেছে। একজন ভক্ত পাওয়া গেল, তিনি ছিলেন এক সময়ে ডিস্ট্রিক্ট্জজ। তাঁর কাছে বসে অনিল ডাকাত শিবসংহিতার ব্যাখ্যা শুরু করে দিলেলোকটার পড়াশুনা আছে।

এমনি করে ভক্তি ছড়িয়ে যেতে লাগল। এবারকার বেলের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে পর ওর নামে সাক্ষী জোগাড় করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। অনিল ডাকাতকে নিয়ে এই তো আমার এক মস্ত সমস্যা বাধল।সদু, তুমি জান বোধ হয় দিকে আর এক সংকট বেধেছে। আমার মামাতো ভাই গিরিশ সে হাতিবাঁধা পরগনায় পুলিসের দারোগাগিরি করে।

কর্তব্যের খাতিরে একজন কুলীন ব্রাক্ষ্মণের ছেলের হাতে হাতকড়ি লাগিয়েছিল। সেই অবধি গ্রামের লোকেরা তাকে জাতে ঠেলবার মন্ত্রণা করছে। দিকে তার মেয়ের বিয়ের বয়স পেরিয়ে যায়, যে পাত্রই জোটে তাকে ভাঙিয়ে দেয় গ্রামের লোক। পাত্র যদি জোটে তবে পুরুত জোটে না। দূর গ্রাম থেকে পুরুতের সন্ধান পেল, কিন্তু হঠাৎ দেখা গেল সে কখন দিয়েছে দৌড়।

এবারে একটা কিনারা পাওয়া গেছে। বৃন্দাবন থেকে এক বাবাজি এসে হঠাৎ সদু, তুমি জান বোধ হয় দিকে আর এক সংকট বেধেছে। আমার মামাতো ভাই গিরিশ সে হাতিবাঁধা পরগনায় পুলিসের দারোগাগিরি করে। কর্তব্যের খাতিরে একজন কুলীন ব্রাক্ষ্মণের ছেলের হাতে হাতকড়ি লাগিয়েছিল। সেই অবধি গ্রামের লোকেরা তাকে জাতে ঠেলবার মন্ত্রণা করছে।

দিকে তার মেয়ের বিয়ের বয়স পেরিয়ে যায়, যে পাত্রই জোটে তাকে ভাঙিয়ে দেয় গ্রামের লোক। পাত্র যদি জোটে তবে পুরুত জোটে না। দূর গ্রাম থেকে পুরুতের সন্ধান পেল, কিন্তু হঠাৎ দেখা গেল সে কখন দিয়েছে দৌড়। এবারে একটা কিনারা পাওয়া গেছে। বৃন্দাবন থেকে এক বাবাজি এসে হঠাৎ আমার হেড কনেস্টবলের বাড়িতে আড্ডা দিলে, সদ্ব্রাক্ষ্মণ খাইয়েদাইয়ে আমরা সবাই মিলে তাঁকে খুশি করাচ্ছি।

তাঁকে রাজি করানো গেছে। এখন গ্রামের লোকের হাত থেকে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সদু, তুমিও কাজে সাহায্য করো।” “ওমা, করব না তো কী! তো আমার কর্তব্য। আহা, তোমাদের গিরিশের মেয়ে, আমাদের মিনু। সে তো কোনো অপরাধ করে নি। তার বিয়ে তো হওয়াই চাই। আনো তোমার বৃন্দাবনবাসীকে, আমি জানি সব স্বামীজিদের কী করে আদর যত্ন করতে হয়।এলেন বৃন্দাবনবাসী।

বুকে লুটিয়ে পড়ছে সাদা দাড়ি, নারদ মুনির মতো। সদু ভক্তিতে গদগদ হয়ে পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল, পাড়ার লোক তার প্রণামের ঘটা দেখে হেসে বাঁচে না। প্রবীণা প্রতিবেশিনী মুচকে হেসে বললেন, “সাধু সন্ন্যাসীদের প্রতি তোমার এত ভক্তি হঠাৎ জেগে উঠল কী করে।সদু হেসে বললে, “দরকার পড়লেই ভক্তি উথলে ওঠে।

বাবাঠাকুরেরা পায়ের ধুলো নিয়ে গলে যান। মিনুর বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত আমার ভক্তিটাকে টিকিয়ে রাখতে হবে।ঘন ঘন শাঁখ বেজে উঠল, উলুর সঙ্গে বর আসার শব্দ এল চার দিক থেকে। কনেকে একটি চেলীজড়ানো পুঁটুলির মতো করে এয়োর দল নিয়ে এল ছাঁদনাতলায়। নির্বিঘ্নে কাজ সমাধা হল।

বর কনে বাবাজিকে প্রণাম করে অন্দরে যাবার জন্য উঠে দাঁড়াল, তখন বাবাজি আশীর্বাদ শেষ করে বিজয়বাবুকে আর সভার সবাইকে বললেন, “মশায়, আমার খবরটা এবারে দিয়ে যাই। পুরুতের কাজ আমার পেশা নয়। আমার যা পেশা সে আপনার সমস্ত দারোগাকনেস্টবলদের ভালো করেই জানা আছে। এখন আপনাদের পুরুতের দক্ষিণা দেবার সময় এসেছে।

সে পর্যন্ত আমার আর সবুর সইবে না। অতএব আপনারা বিদায় করবার আগেই আমি বিদায় নিলেম।এই লে সন্ন্যাসী সকলের সামনে দাড়ি গোঁফ টেনে ফেলে তিন লাফে চণ্ডীমণ্ডপের পাঁচিল ডিঙিয়ে উধাও। সভার লোকেরা হাঁ করে চেয়ে রইল। বিজয়বাবুর মুখে কথা নেই। বিয়ের ভোজ শেষ হয়ে গেছে, পাড়াপড়শী গেছে যে যার ঘরে। বরবধূ বাসর ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছে।

 

Read more

বদনাম (২য় পর্ব) – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *