মাছ-তারাপদ রায়

মাছ-তারাপদ রায়

ভগবানের প্রথম অবতার হল মাছ।

মাছ হল আমাদের দেবতা।

আবার প্রেমের দেবতা, কামের দেবতা মদনের নাম হল মীনকেতন, মীনধ্বজ। মদনের পতাকার প্রতীক মাছ।

বাঙ্গালি হিন্দুর সব মঙ্গলকার্যে মাছ অপরিহার্য। বিয়েতে, অন্নপ্রাশনে তো বটেই, শুভ বিজয়াদশমীতে, শ্রীপঞ্চমীতে জোড়া মাছ লাগবে। জোড়া ইলিশ যদি নেহাতই না জোটে, আঁশওয়ালা একজোড়া মাছের কপালে সিঁদুরের ফোঁটা দিয়ে বরণ করতে হবে।

এদিকে আবার রাশিচক্রের দ্বাদশ রাশির অন্যতম হল মীনরাশি। সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর একটি আত্মজীবনীমূলক কবিতায় লিখেছিলেন যে, তিনি যদিও সঠিক জানেন না— তাঁর ধারণা, তাঁর হল মনিরাশি, কারণ ‘যেরকম মাছ ভালবাসি।’

আরো অনেক আগে বাঙালির অন্য এক প্রাণের কবি প্রার্থনা করেছিলেন, “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।”

অবশ্য এই দুধে-ভাতের সঙ্গে মাছে-ভাতের জন্যে দুর্বলতাও আমাদের কম নয়। দুর্ভাগ্যের বিষয়, বাঙালির আহার তালিকা থেকে দুধ-ভাত অনেকদিন বিদায় নিয়েছে। কষ্টেসৃষ্টে মাছে-ভাতে এখনও একটু টিকে আছে।

মাছের সম্পর্কে লিখতে গিয়ে মেছোগল্পের কথাও বলতে হয়। মেছোগল্প মানে আঁশটে গন্ধওয়ালা গল্প, যাকে ইংরেজিতে বলে ফিশি টেল (Fishy Tale)। কোনো ঘটনা বা ব্যাপার সন্দেহজনক বা গোলমেলে মনে হলে বলা হয় ফিশি ব্যাপার।

মাছের গল্প প্রথমে যেটা মনে পড়ছে, সেটা এক মৎস্য-শিকারির। অবশ্য মাছের অধিকাংশ গল্পই হতভাগ্য মৎস্যশিকারিকে নিয়ে।

ধরেই নেওয়া হয়, যাঁরা ছিপ দিয়ে মাছ ধরেন, তাঁরা তাঁদের মাছ শিকারের গল্পগুলো একটু বানিয়ে বানিয়ে বলেন। কথাই আছে যে একজন মৎস্য-শিকারি তখনই সত্যি কথা বলেন, যখন অন্য কোনও মৎস্য-শিকারি সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেন, “ও লোকটা মিথুক।”

একটা সত্যি ঘটনার উল্লেখ করা এখানে অসংগত হবে না। আমার এক কাকা ছিলেন শৌখিন মৎস্য-শিকারি। ছিপ, বঁড়শি, চার, টোপ ইত্যাদিতে ছিল তার প্রবল উৎসাহ। আর উৎসাহ ছিল মাছের গল্প বা মাছ ধরার গল্প বলায়।

একদিন লক্ষ করলাম, কাকা লোকদের একটা কাতলা মাছের গল্প বলছেন যে, মাছটা তাঁর ছিপের সুতো ছিঁড়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু গল্পটার গোলমাল হল এই যে, কাকা একেকজন লোককে মাছটার আকার একেকরকম দেখাচ্ছেন।

বেশ কয়েকবার এ-ঘটনা ঘটবার পর আমি কাকাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “একেকবার একেকজন লোককে কাতলা মাছটার সাইজ একেকরকম বলছ কেন?”

মৃদু হেসে কাকা বললেন, “যে যতটা বিশ্বাস করবে, যে যেমন বিশ্বাস করবে তাকে তেমন সাইজ বলি। আমি কখনও কাউকে মাছটার আকার তত বড় বলি না যত বড় সে বিশ্বাস করবে না।”

ছিপ-বঁড়শি দিয়ে মাছধরার কাহিনীর সঙ্গে এবার জাল দিয়ে মাছ ধরার গল্প বলতে হয়।

কোলাঘাটের কাছে রূপনারায়ণে একবার ফাল্গুন মাসে দেখি, সারি সারি ইলিশ মাছ ধরার নৌকো। ফাল্গুন মাসে ইলিশ মাছ একটু অস্বাভাবিক। তীরের কাছ দিয়ে একটা নৌকো যাচ্ছিল। আমি সেই নৌকোর মাঝিদের চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনারা যে এখন ইলিশ মাছ ধরতে যাচ্ছেন, এটা কি ইলিশ মাছের সময়?”

অত্যন্ত বিরক্ত মুখে এক প্রবীণ জেলে নৌকো থেকে আমাকে জানালেন, “দেখুন, যখন ইলিশের সময়, একটা ইলিশও তখন নদীতে আসেনি, আবার এখন যখন ইলিশের সময় নয়, তখন ঝাঁকে-ঝাঁকে হাজারে-হাজারে ইলিশ নদীতে চলে এসেছে। তা ইলিশরা নিজেরাই যদি তাদের নিয়ম না মানে, আমরা সে নিয়ম মেনে কী করব?”

অনেক হাসির ব্যাপার হল। এবার একটা দুঃখের গল্প বলি।

গল্পটা খুবই পুরনো, খুবই দুঃখের, চিরকালের এবং চিরদেশের। যে কোনো শৌখিন মাছশিকারি, যিনি কিনা ছিপ-বঁড়শি, চার-টোপের কারবারি, তাঁর মনের গোপনতম দুঃখের সত্য কাহিনী এটা।

সাতদিন ধরে চারের মশলা জোগাড় করা হয়েছে। তেলের ঘানি থেকে আনা হয়েছে সরষের খোল— যা তিনদিন জলে ভিজিয়ে সারা বাড়ি পচা গন্ধে ভরে গিয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হালুইকরের দোকান থেকে নিয়ে আসা চিনির গাদ, যেটা মিষ্টি বানানোর কড়াইয়ের ওপরের সাদা ফেনা থেকে কালো লোহার হাতায় তুলে উনুনের পাশে একটা বড় গামলায় রেখে দেওয়া হয়।

হাজার বোতল চোলাই মদের মাদার টিংচার (Mother Tincture) এক হাতা চিনির গাদ।

সেই চিনির গাদের মদির সৌরভে শুধু বাড়ি বা পাড়া নয়, পুরো এলাকা আচ্ছন্ন হয়ে গেছে।

এবং এখানেই শেষ নয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একাঙ্গী, টম্বল, ছোটএলাচ, মেথি— এইসব দামি মশলা সমূহের ভাজা গুঁড়ো। তার গন্ধও কম মনোহর নয়।

এ হল চারের কথা। এর পরে টোপ আছে, হুইল আছে সুতো আছে, বঁড়শি আছে, ফাতনা আছে। সে এক বিরাট রাজসূয় যজ্ঞের ব্যাপার।

কিন্তু ফল কী হল?

সারাদিনের পণ্ডশ্রমের শেষে শূন্য হাতে এবং ব্যথিত হৃদয়ে মৎস্য-শিকারি ফিরলেন। যথারীতি একটি মাছও তিনি ধরতে পারেননি। কিন্তু বাড়িতে তো খালিহাতে যাওয়া যায় না— সে তো মহা হাসাহাসির ব্যাপার হবে। ফেরার পথে ভদ্রলোক এক মাছের দোকানে গিয়ে চারটে মোটামুটি সাইজের মাছ কিনলেন তার পর মাছওয়ালাকে বললেন, “ভাই, মাছগুলো আমাকে দূর থেকে ছুড়ে ছুড়ে দাও তো। আমি ধরি।”

মাছওয়ালা অবাক হয়ে বললে, “কেন?”

ভদ্রলোক বললেন, “তাহলে আর কিছু না হোক, বাড়ি গিয়ে বলতে পারব মাছগুলো আমিই ধরেছি। শুধু শুধু মিথ্যে কথা বলতে হবে না।”

পুনশ্চঃ

নদীর ধারে দাঁড়িয়ে একজন লোক ছিপ দিয়ে মাছ ধরছিল। হঠাৎ তার ছিপে ধরা পড়ল একটা অতিকায় বোয়াল মাছ।

একটু টানা-হ্যাঁচড়ার পর বোয়াল মাছটা অতর্কিতে বঁড়শির সুতোয় জোর ঝাঁকি দিতে লোকটা ছিপ সমেত জলে পড়ে গেল।

অতঃপর শুরু হল মাছে-মানুষে লড়াই। একদিকে বঁড়শির ও-প্রান্তে মহাবলী বোয়াল মাছ মাছের শিকারিকে টানছে, অন্যদিকে জলের মধ্যে ছিপ হাতে লোকটা মাছটাকে খেলিয়ে তোলার চেষ্টা করছে।

রাস্তা দিয়ে সরল প্রকৃতির এক গ্রাম্য লোক যাচ্ছিল। সে এই দৃশ্য দেখে স্বগতোক্তি করল, “আমি বুঝতে পারছি না মানুষ মাছ ধরছে, না মাছ মানুষ ধরছে।”

‘আয়রে আয় ছেলের দল মাছ ধরিতে যাই’— বাংলাভাষার শিশু-ভোলানো ছড়ার জালে ঝলমল করছে নানা বর্ণের, নানা আকারের মাছ। দাদার হাতে কলম ছিল ছুড়ে মেরেছে, কারণ ও-পারেতে রুই-কাতলা ভেসে উঠছে। তাতে রুই-কাতলার মতো বড় মাছের কোনও ক্ষতি হয়েছে বলে মনে হয় না; কিন্তু দাদার কলমটা গেছে। অত বড় মাছ চোখে পড়ার উত্তেজনায় এটা হয়েছে। তা ছাড়া, মাছ ধরেও যে খুব সুবিধে হয়েছে সব সময় তা নয়— সেই একবার তো শুধু ধরা মাছটাই চিলে নিয়ে গেল তাই নয়, মাছ ধরার ছিপটাও নিয়ে গেল কোলাব্যাঙে।

কেবল ছড়ার ছন্দলহরী নয়, আমার বাল্যস্মৃতি ভরে আছে মাছের ঘ্রাণে। সে ঘ্রাণ শুধু কাঁচা মাছের আঁশটে গন্ধের নয়, তার পাশাপাশি রয়েছে সারা বাড়ি উঠোন-অন্দর-বাইরে ভ্রাম্যমাণ মাছ ভাজার বা সাঁতলানোর ভারী সুঘ্রাণ এবং সর্বোপরি মশলা ও মদের গন্ধ-মেশানো মাছের চারের মৌতাত।

আমার ছেলেবেলার পূর্ববঙ্গীয় মফস্বলে মাছকে সীমাবদ্ধ করা উচিত হবে না। ‘বাঙালীর জীবনে নারী’র মতোই চাঞ্চল্যকর গ্রন্থ রচনা করা যায় ‘বাঙ্গালীর জীবনে মাছ’ নাম দিয়ে। আমাদের জীবনচর্চায় মাছ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। মাছ দশাবতারের প্রথম অবতার। পুজো-পার্বণে, আহারে-বাসনে মাছ অপরিহার্য। সরস্বতী পুজোয় যে জোড়া ইলিশকে বরণ করতে হবে তাকেই কপালে সিঁদুরের ফোটা পরিয়ে মঙ্গলাচরণ করে বিদায় জানাতে হবে বিজয়া দশমীতে।।

অন্নপ্রাশনে ভাতের শিশুর মুখে ছোঁয়াতে হবে এক টুকরো মাছ। ভোজের পাতে নিমন্ত্রিতদের খাওয়াতে হবে অন্তত দু’রকম মাছ— একটা সরষেবাটা ঝোল, আর-একটা ঘি-গরমমশলা দিয়ে। তা খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে অসুখ সারার পর অন্নপথ্য হবে একটু গলা ভাত আর লেবুর রস দিয়ে কাঁচকলা সেদ্ধ সহযোগে মাগুর বা শিঙি মাছ দিয়ে। মাছ পাঠাতে হবে বিয়ের তত্ত্বে, আশীর্বাদে, পাকা-দেখায়। ঝালে-ঝোলে-চচ্চড়িতে বিয়ের ভোজ হবে জমজমাট। মরার পরেও মাছ; শ্রাদ্ধ মিটে যাওয়ার পরে মৎস্যমুখী হবিষ্য-উত্তর নিয়মভঙ্গ।

বৈষ্ণব কবিরা নিরামিষ, নিকষিত হেম ছিলেন। কিন্তু মঙ্গলকাব্যে মাছের ছড়াছড়ি। ঈশ্বর গুপ্ত থেকে বুদ্ধদেব বসু তপসে মাছ থেকে ইলিশ মাছ— বাঙালি কবিরা মাছের জয়জয়কার করেছেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ছন্দের নমুনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, ‘পাতলা করে কাটো সখি কাতলা মাছটিরে’। তাঁরই ছড়ায় খেঁদুবাবুর এঁদো পুকুরে মাছ ভেসে ওঠায়, সেই মরা মাছের চচ্চড়িতে পদ্মমণি লঙ্কা ঠেসে দিয়েছিল।

বাংলা সিনেমায় এমন কোনও নায়ক নেই যিনি কোনও-না-কোনও ছবিতে মাছের মুড়ো চিবিয়ে খাননি। এখনও এমন কোনও দিন নেই যেদিন বাংলা খবরের কাগজে মাছ নিয়ে কোনও সংবাদ থাকে না। সে সংবাদ বাংলাদেশের ইলিশ নিয়েই হোক অথবা সুন্দরবনে গলদা চিংড়ি প্রকল্পের সাফল্য বা ব্যর্থতা নিয়ে হোক।।

মাছ ধরা ভেতো বাঙালির প্রিয়তম শখ। এ-শখ নাগরিক জীবনে তেমন পূরণ হয় না। কিন্তু গ্রামে-গঞ্জে এমন কোনও বাড়ি খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব, যে-বাড়িতে মাছ ধরার ছিপ নেই। মহানগরেও আছেন অদম্য মৎস্যশিকারিরা, যাঁরা দিনের পর দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা বহুমুল্য একশো টাকার টিকিট কেটে তীর্থের কাকের মতো বসে থাকেন পুকুরের জলে ছিপ ফেলে মাছ ধরার আশায়— যদিও মাছের দেখা মেলে ক্বচিৎ-ক্বদাচিৎ।

এক মিউনিসিপ্যাল পুকুরে বিনা অনুমতিতে মাছ ধরার অপরাধে এক ভদ্রলোক ধরা পড়েছিলেন। দুঃখের বিষয়, সেই ভদ্রলোক, যিনি কখনও বঁড়শিতে মাছ ধরতে পারেন না, সেদিন দুটো ছোট মাছ ধরেছিলেন। অন্যান্য দিন যখন কোনও মাছ তিনি ধরতে পারেন না, তখন লজ্জায় বাজার থেকে দুটো মাছ কিনে নিয়ে যেতেন; বাসায় গিয়ে বলতেন, ছিপে ধরেছি। তাঁর সহধর্মিণী কিন্তু এই চালাকি ধরে ফেলেছিলেন, ফলত যথারীতি নানারকম গঞ্জনা, টিটকিরি। আজ মিউনিসিপ্যাল পুকুরে ধরা পড়ার পর বিনা অনুমতিতে মাছ শিকার করার অপরাধে তাঁর পঞ্চাশটাকা জরিমানা হল; অবশ্য শিকার করা মাছ দুটো তিনি ফেরত পেলেন। আজ হাসিমুখে পঞ্চাশটাকা জরিমানা দিয়ে জরিমানার রসিদ হাতে করে বাড়ি ফিরলেন, দজ্জাল বউকে দেখাবেন, ‘এ মাছ ধরা মাছ না কেনা মাছ, এই রসিদ দেখো।’

মাছ শিকারের হাজারো গল্প। সবাই কিছু কিছু জানে, আমিও অনেক শিখেছি। সবচেয়ে বেশি গল্প— যে মাছ বঁড়শিতে আটকে ছিল কিন্তু ডাঙায় তোলা যায়নি, তার আগেই পালিয়ে ছিল— সেই মাছ নিয়ে। গল্পে এই সব মাছের আয়তন সাধারণত খুবই বড় হয়। এক ভদ্রলোক তাঁর ছিপ থেকে ছুটে-যাওয়া মাছের দৈর্ঘ্য একেক জনকে একেক রকম দেখাতেন।

এ বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করায় তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘কী আর করব? যে যেমন বিশ্বাস করে তাকে সেইরকম বলি।’ অন্য একজন এই সব বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ধার ধারতেন না। তাঁর ছিপের ছুটে-যাওয়া মাছ ক্রমশ বড় হতে লাগল, দেড় হাত থেকে দু’হাত-আড়াই হাত শেষে চার হাতে পৌঁছল।

তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, ‘পলাতক মাছটা যে জলের মধ্যে বড় হচ্ছে। যেমন-যেমন বড় হচ্ছে, তেমন-তেমন দেখাচ্ছি।’

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *