তবু তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে দুঃখিত। লােকটি স্নেহময় গলায় বলল, কষ্ট কইরা খান। না–খাইলে শরীরে বল পাইবেন না।’
মিসির আলি শুধুমাত্র লােকটিকে খুশি করবার জন্যে পাউরুটি দুধে ভিজিয়ে মুখে দিলেন। খেতে কেমন যেন ঘাসের মতাে লাগছে।
আজ শুক্রবার।
শুক্রবারে রুটিন ভিজিটে ডাক্তাররা আসেন না। সেটাই স্বাভাবিক। তাঁদের ঘর সংসার আছে, পুত্র-কন্যা আছে। জন্মদিন, বিয়ে, বিবাহবার্ষিকী আছে। একটা দিন কি তাঁরা ছুটি নেবেন না? অবশ্যই নেবেন। মিসির আলি ধরেই নিয়েছিলেন তাঁর কাছে কেউ আসবে না।
কিন্তু তাঁকে অবাক করে দিয়ে এ্যাপ্রন গায়ে মাঝবয়েসী এক ডাক্তার এসে উপস্থিত। ডাক্তার আসার এটা সময় নয়। প্রথমত শুক্রবার, দ্বিতীয়ত দেড়টা বাজে, লাঞ্চ ব্রেক। ডিউটির ডাক্তাররাও এই সময় ক্যান্টিনে খেতে যান।
ডাক্তার সাহেব বললেন, ‘কেমন আছেন?
মিসির আলি হেসে ফেলে বললেন, ভালাে থাকলে কি হাসপাতালে পড়ে খাকি?
‘আপনাকে দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে ভালাে আছেন। কাল রাতে খুব খারাপ অবস্থায় ছিলেন। প্রবল ডেলিরিয়াম।
‘আপনি রাতে এসেছিলেন?
‘চিনতে পারছিনা। মাথা এলােমেলাে হয়ে আছে। গত রাতে কী ঘটেছে কিছু মনে নেই। | ডাক্তার সাহেব চেয়ারে বসলেন। তাঁর শরীর বেশ ভারি। শরীরের সঙ্গে মিল রেখে গলার স্বর ভারি। চশমার কাঁচ ভারি। সবই ভারি–ভারি, তবুও মানুষটির কথা বলার মধ্যে সহজ হালকা ভঙ্গি আছে। এ–জাতীয় মানুষ গল্প করতে এবং গল্প শুনতে ভালবাসে। মিসির আলি বললেন, ‘ডাক্তার সাহেব, আমি আপনার জন্যে কী করতে পারি বলুন।” | ‘একটা সমস্যার সমাধান করতে পারেন। এই কেবিনটা ছেড়ে অন্য একটা কেবিনে চলে যেতে পারেন। একজন মহিলা এই কেবিনে আসতে চাচ্ছেন।
অনীশ-পর্ব-(২)
মিসির আলি হাসতে–হাসতে বললেন, ‘আমি এই মুহূর্তে কেবিন ছেড়ে দিচ্ছি। ‘এই মুহুর্তে ছাড়তে হবে না। কাল ছাড়লেও হবে।
ডাক্তার সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। মিসির আলি বললেন, ‘ভদ্রমহিলা বিশেষ করে এই কেবিনে আসতে চাচ্ছেন কেন? তাঁর ধারণা, এই কেবিন খুব লাকি। কেবিনের নম্বর চার শ’ নয়। যােগ করলে হয় রে। তের নম্বরটি নাকি তাঁর জন্যে খুব লাকি। সৌভাগ্য–সংখ্যা। নিউমােরলজি‘ র হিসাব।
কী অদ্ভুত কথা! ডাক্তার সাহেব হালকা স্বরে বললেন, ‘অসুস্থ অবস্থায় মন দুর্বল থাকে। দুর্বল মনে তের নম্বরটি ঢুকে গেলে সমস্যা।
‘মনের মধ্যে যা ঢুকেছে তা বের করে দিন।
ডাক্তার সাহেব হেসে ফেলে বললেন, ‘এটা তাে কোনাে কাঁটা না রে ভাই, যে, চিমটা দিয়ে বের করে নিয়ে আসব। এর নাম কুসংস্কার। কুসংস্কার মনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিকড় ছড়িয়ে দেয়। কুসংস্কারকে তুলে ফেলা আমার মতাে সাধারণ মানুষের কর্ম নয়। যাই ভাই। আপনি তাহলে কাল ভােরে কেবিন নম্বর চার শ পাঁচে চলে যাবেন। কেবিনটা সিঁড়ির কাছে না, কাজেই হৈ–চৈ হবে না। তা ছাড়া জানালার ভিউ ভালাে। গাছপালা দেখতে পারবেন।’| মিসির আলি গম্ভীর গলায় বললেন, কিছু মনে করবেন না। আমি এই রুম্ম ছাড়ব না। এখানেই থাকব।
অনীশ-পর্ব-(২)
ডাক্তার সাহেব বিস্মিত হয়ে তাকালেন। কি একটা বলতে গিয়েও বললেন না। মিসির আলি বললেন, ‘রুম ছাড়ব না, কারণ ছাড়লে কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। আমি এই জীবনে কুসংস্কার প্রশ্রয় দেবার মতাে কোনাে কাজ করি নি। ভবিষ্যতেও করব না।’
‘ও, আচ্ছা।’ | ‘আপনি যদি অন্য কোনাে কারণ বলতেন, রুম ছেড়ে দিতাম। আমার কাছে চার শ” নয় নম্বর যা, চার শ’ পাঁচ–ও । তফাত মাত্র চারটা ডিজিটের।
ডাক্তার সাহেব বিব্রত গলায় বললেন, ‘আপনি কি ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা বলবেন? অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ভদ্রমহিলা এ–ঘরে না–আসা পর্যন্ত অপারেশন করাবেন না। অপেক্ষা করবেন। অথচ অপারেশনটা জরুরি।
ওঁর অসুবিধা কী? ‘কিডনির কাছাকাছি একটা সিস্টের মতাে হয়েছে। আপনি যদি তাঁর সঙ্গে কথা বলেন তাহলে ভালাে হয়। ভদ্রমহিলাকে আপনি চেনেন।
‘তাই নাকি?’ ‘হা। ভালাে করেই চেনেন। উনি অনুরােধ করলে না বলতে পারবেন না। ‘নাম কি তাঁর?’ ‘আমি ওঁকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনি কথা বলুন।
অনীশ-পর্ব-(২)
মিসির আলি গকিয়ে আছেন। | দরজা ধরে যে–মহিলা দাঁড়িয়ে, তাঁর বয়স ত্রিশের কাছাকাছি হলেও তাঁকে দেখাচ্ছে বালিকার মতো লম্বাটে মুখ, কাটা–কাটা চেহারা। অসম্ভব রূপবতী। সাধারণত রূপবতীরা মানুষকে আকর্ষণ করে না—একটু দূরে সরিয়ে রাখে। এই মেয়েটির মধ্যে আকর্ষণী ক্ষমতা প্রবল। মিসির আলি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন। মেয়েটি বলল, আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন ?
না।’ ‘সে কী, চেনা উচিত ছিল তাে! আপনি সিনেমা দেখেন না নিশ্চয়ই?
এরুল। মিসির আলি মঞ্জত হয়ে পিরয়ে রাখে। এই
**, আপনি কি আমাকে ‘টিভি? টিভি দেখেন না? টিভি দেখলেও তাে আমাকে চেনার কথা!
‘আমার টিভি নেই। বাড়িওয়ালার বাসায় গিয়ে অবশ্যি মাঝে–মাঝে দেখি। আপনি কি কোনাে অভিনেত্রী? | ‘হ্যা। এলেবেলে টাইপ অভিনেত্রী নই। খুব নামকরা। রাস্তায় বের হলে “ট্রাফিক জ্যাম হয়ে যাবে। মেয়েটির কথা বলার ভঙ্গিতে মিসির আলি হেসে ফেললেন। মেয়েটিও হাসল । অভিনেত্রীর মাপা হাসি নয়, অন্তরঙ্গ খসি। সহজ–সরল হাসি।
‘আপনি কিন্তু এখনাে আমার নাম জিজ্ঞেস করেননি। ‘কী নাম?
‘আসমানী। এটা আমার আসল নাম। সিনেমার জন্যে আমার ভিন্ন নাম আছে। সেই নাম অাপনার জানার দরকার নেই। ভেতরে আসব ?
অনীশ-পর্ব-(২)
আসুন।
মেয়েটি ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসল। গলার স্বর খানিকটা গম্ভীর করে বলল, ‘শুনলাম আপনি নাকি কুসংস্কার সহ্য করতে পারেন না।
ঠিকই শুনেছেন। সহ্য করি না এবং প্রশ্রয় দিই না।’
‘কুসংস্কার–টুসংস্কার কিছু না। আপনি আপনার ঘরটা আমাকে ছেড়ে দিন। আমার এই কেবিনটা খুব পছন্দ। আমি আপনার কাছে হাতজোড় করছি। প্লীজ।
মেয়েটি সত্যি–সত্যি হাতজোড় করল। মিসির আলি লজ্জায় পড়ে গেলেন। এ কী কাণ্ড।
‘আমি এক্ষুণি ছেড়ে দিচ্ছি। হাতজোড় করতে হবে না।
থ্যাংকস।
থ্যাংকস বলারও প্রয়ােজন নেই, তবে আমার ধারণা, এই কেবিনটিতেও শেষ পর্যন্ত আপনি থাকতে রাজি হবেন না।’
এ–রকম মনে হবার কারণ কী? ‘আপনি রাতে যখন ঘুমুতে যাবেন তখন হঠাৎ করে দেয়ালের একটা লেখা আপনার চোখে পড়বে—সবুজ মার্কারে কাঁচা–কাঁচা হাতে লেখা—
এই ঘরে যে থাকবে সে মারা যাবে।। ইহা সত্য, মিথ্যা নয়।
লেখা পড়েই আপনি আঁৎকে উঠবেন। যেহেতু আপনার মন খুব দুর্বল, সেহেতু আপনি আর এখানে থাকবেন না।
আসমানী বলল, কোথায় লেখাটা—দেখি।’ তিনি লেখাটা দেখালেন। সমানী বলল, কে লিখেছে?
মিসির আলি থেমে–থেমে বললেন, যে লিখেছে তার সঙ্গে আমার দেখা হয় নি, তবে আমি অনুমান করতে পারি, একটি বাচ্চা মেয়ের লেখা। মেয়েটির উচ্চতা চার ফুট দু ইঞ্চি এবং মেয়েটি এই ঘরেই মারা গেছে।
আসমানী ভুরু কুঁচকে বলল, ‘এ–সব আপনার অনুমান?” ‘জ্বি, অনুমান। তবে যুক্তিনির্ভর অনুমান?” ‘যুক্তিনির্ভর অনুমান মানে?
অনীশ-পর্ব-(২)
এক–এক করে বলি। এটা একটা মেয়ের লেখা তা অনুমান করছি দেয়ালে আঁকা কিছু ছবি দেখে। সবুজ মার্কারে আঁকা বেশ কিছু ছবি আছে, সবই বেণী-বাঁধা
বালিকাদের ছবি। মেয়েরা একটা বয়স পর্যন্ত শুধু মেয়েদের ছবি আঁকে।
‘প্তাই বুঝি? ‘হ্যা, তাই। ‘আর মেয়েটির উচ্চতা কীভাবে আঁচ করলেন?
‘মেয়েটির উচ্চতা আঁচ করেছি আরাে সহজে। আমরা যখন দেয়ালে কিছু লিখি, তখন লিখি চোখ বরাবর। মেয়েটি বিছানায় বসে–বসে লিখেছে। সেখান থেকে তার উচ্চতা আঁচ করলাম।’
‘দাঁড়িয়েও তাে লিখতে পারে। হয়তাে মেঝেতে দাঁড়িয়ে লিখেছে।
‘ভা পারে। তবে মেয়েটি অসুস্থ। বিছানায় বসে–বসে লেখাই তার জন্যে যুক্তি সঙ্গত।’
আসমানী গম্ভীর গলায় বলল, ‘মেয়েটি যে বেঁচে নেই তা কী করে অনুমান করলেন ? কাউকে জিজ্ঞেস করেছেন? ‘না, কাউকে জিজ্ঞেস করি নি। এটাও অনুমান। বাচ্চারা দেয়ালে লেখার ব্যাপারে খুবই পার্টিকুলার। যা বিশ্বাস করে তা–ই সে দেয়ালে লেখে। যদি বাচ্চাটি সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে যেত তাহলে অবধারিতভাবে এই লেখার জন্যে সে লজ্জিত বােধ করত এবং হাসপাতাল ছেড়ে যাবার আগে লেখাটি নষ্ট করে যেত।
আপনি কী কবেন জানতে পারি?
‘মাস্টারি করতাম, এখন করি না। পার্ট টাইম টীচার ছিলাম। অস্থায়ী পোেস্ট। চাকরি চলে গেছে।
‘আপনি আমাকে দেখে কি আমার সম্পর্কে কিছু বলতে পারেন?
একটা সামান্য কথা বলতে পারি—আপনার আসল নাম আসমানী নয়। অন্য কিছু।’
এ–রকম মনে হবার কারণ কী? ‘আসমানী নামটি আপনি এমনভাবে বললেন যাতে আমার কাছে মনে হল অচেনা একটি শব্দ বলছেন। তার চেয়েও বড় কথা আপনার পরনে আসমানী রঙের একটি শাড়ি। শাড়িটি পরার পর থেকেই হয়তাে আসমানী নামটা আপনার মাথায় ঘুরছে। প্রথম সুযােগে এই নামটি বললেন।
অনীশ-পর্ব-(২)
‘আমার ডাক নাম “বুড়ি’।
মিসির আলি কিছু বললেন না। তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। বুড়ি বলল, আপনি অনুমানগুলি কীভাবে করেন?
‘লজিক ব্যবহার করে করি। সামান্য লজিক। লজিক ব্যবহার করার ক্ষমতা সবার মধ্যেই আছে। বেশির ভাগ মানুষই তা ব্যবহার করে না। যেমন আপনি ব্যবহার করছেন
ভেবে বসে আছেন চার শ’ নয় নম্বর ঘরটি আপনার জন্যে লাকি। এ–রকম ভাবার পিছনে কোনাে লজিক নেই।’
লজিকই কি এই পৃথিবীর শেষ কথা? ‘হা।’
আপনি কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন যে লজিকই হচ্ছে পৃথিবীর শেষ কথা— লজিকের বাইরে কিছু নেই। পৃথিবীর সমস্ত রহস্যের সমাধান আছে লজিকে, পারবেন বলতে?’
পারব।’ ‘ভালাে কথা। শুনে খুশি হলাম। আমি কি আপনার নাম জানতে পারি?
‘আমার নাম মিসির আলি। আপনি কি কাল ভােরে এই কেবিনে আসতে চান? না মত বদলেছেন?
‘আমি কাল ভােরে চলে আসব। যাই মিসির আলি সাহেব। স্লামালিকুম।
মেয়েটি নিজের কেবিনে ফিরে গেল। রাত দশটার ভেতর সে চার শ নয় নম্বর কেবিনে আগের রুগীর যাবতীয় তথ্য জোগাড় করল। এই কেবিনে ‘লাবণা নামের দশ বছর বয়সী একটি মেয়ে থাকত। হার্টের ভাল্বের কী একটি জুটিল সমস্যায় সে দীর্ঘদিন এই ঘরটিতে ছিল। মারা গেছে মাত্র দশ দিন আগে। তার ওজন তেষট্টি পাউণ্ড। উচ্চতা চার ফুট এক ইঞ্চি।
মিসির আলি সাহেব সামান্য ভুল করেছেন। তিনি বলেছেন চার ফুট দুই ইঞ্চি। এইটুকু ভুল বােধহয় ক্ষমা করা যায়।
Read more
