অনীশ-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ

অনীশ

তিনি তার পরেও বললেন, আসুন, আসুন। 

বুড়ি ঘরে ঢুকল না। দরজার ওপাশ থেকেই বলল, ‘আপনার কি মাথা ধরা আছে? 

‘এখন নেই। রােজই সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়। আজ এখনাে কেন যে শুরু হচ্ছে না বুঝতে পারছি না।’ 

 বুড়ি হাসতে হাসতে বলল, “মনে হচ্ছে মাথা নাধরায় আপনার মন খারাপ হয়ে গেছে। স্যার, আমি কি বসব? 

‘বসুন, বসুন। আমাকে স্যার বলছেন কেন তা তাে বুঝতে পারছি না!” 

‘আপনি শিক্ষকমানুষ, এই জন্যেই স্যার বলছি। ভালাে শিক্ষক দেখলেই ছাত্রী হতে ইচ্ছা করে।’ 

‘আমি ভালাে শিক্ষক, আপনাকে কে বলল । 

কেউ বলে নি। আমার মনে হচ্ছে। আপনি কথা বলার সময় খুব জোর দিয়ে বলেন। এমনভাবে বলেন যে, যখন শুনি মনে হয় আপনি যা বলছেন তা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন বলেই বলছেন। ভালাে শিক্ষকের এটা হচ্ছে প্রথম শর্ত। 

‘দ্বিতীয় শর্ত কী? 

‘দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে জ্ঞান। ভালাে শিক্ষককে প্রচুর জানতে হবে এবং ভালােমতাে জানতে হবে।’ 

‘আপনি নিজেও কিন্তু শিক্ষকের মতো কথা বলছেন। 

বুড়ি বলল আমার জীবনের ইচ্ছা কী ছিল জানেন? কিন্ডার গার্টেনের শিক্ষিকা হওয়া। ফ্রকপরা ছােটছােট ছেলেমেয়ে ঘুরে বেড়াবে, আমি তাদের পড্রাব, গান শেখাব। ব্যথা পেয়ে কাঁদলে আদর করব। অথচ আমি কী হয়েছি দেখুনএকজন অভিনেত্রী। আমার সমস্ত কর্মকাণ্ড বয়স্ক মানুষ নিয়ে। আমার জীবনে শিশুর কোনো স্থান নেই। স্যার, আমি কী বকবক করে আপনাকে বিরক্ত করছি? 

অনীশ-পর্ব-(৪)

‘না, করছেন না। 

‘আপনি আমাকে তুমি করে ডাকলে আমি খুব খুশি হব। আপনি আমাকে তুমি করে ডাকবেন, এবং নাম ধরে ডাকবেন। প্লীজ। 

‘বুড়ি ডাকতে বলছ? 

‘হ্যা, বুড়ি ডাকবেন। আমার ডাক নামটা বেশ অদ্ভুত না? যখন সত্যিসত্যি বুড়ি হব, তখন বুড়ি বলে ডাকার কেউ থাকবে না।’ 

মিসির আলি বললেন, ‘তুমি কি সবসময় এমন গুছিয়ে কথা বল ? 

আপনার কী ধারণা? 

আমার ধারণা ভুমি কম কথা বল। যারা কথা বেশি বলে, তারা গুছিয়ে কিছু বলতে পারে না। যারা কম কথা বলে, তারা যখন বিশেষ কোনাে কথা বলতে চায়, তখন খুব গুছিয়ে বলতে পারে। আমার ধারণা তুমি আমাকে বিশেষ কিছু বলতে চাচ্ছ।’ 

‘আপনার ধারণা সত্যি নয়। আমি আপনাকে বিশেষ কিছু বলতে চাচ্ছি না। আগামীকাল আমার অপারেশন। ভয়ভয় লাগছে। ভয় কাটানাের জন্যে আপনার সঙ্গে গল্প করতে এসেছি। 

‘ভয় কেটেছে? 

অনীশ-পর্ব-(৪)

কাটে তবে ভুল যাইআমার এখান থেকে যাবার গরম পানিতে গোসল করব। আয়াকে গরম পানি আনতে বলেছিগােসলের পর কড়া ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ব।। 

মিসির আলি হাই তুললেনমেয়েটির কথা এখন আর শুনতে ভালাে লাগছে না। তাকে বলাও যাচ্ছে নাতুমি এখন যাওআমার মাথা ধরেছেমাথা সত্যি সত্যি ধরল–-বলা যেতমাথা ধরে নি। 

আপনি কি তৃত বিশ্বাস করেন স্যার? মিসির আলি হেসে ফেলে বললেন, গমটা বল। 

কোন গল্পটা বলব?| কেউ যখন জানতে চায়, আপনি কি ভূত বিশ্বাস করেন, তৎ তার মাথায় একটা ভূতের গল্প থাকেঐটা সে শোনাতে চায়তুমিও চাচ্ছি। 

আপন ভল করেছেনআমি আপনাকে কোনাে গল্প শােনাতে চাচ্ছি কোনাে ভৌতিক গল্প আমার জানা নেই। 

আর একটা কথা, আপনি দয়া করে আচ্ছাবা লবেন না, এবং নিজেকে বেশি বদ্ধিমান মনে করবেন না‘ 

বুড়ি, তুমি রেগে যাচ্ছ।আমাকে তুমিতুমি করে বলবেন না

বুটি উঠে দাঁড়াল এবং প্রায় ঝড়ের চুল সড় চলে গেলমিসির আলি দীঘনিঃশ্বাস ফেললেনতাঁর মনে হল, এই মাত্র মেয়েদের মধ্যেই বিপরীত শুণাবলীর দর্শনীয় সমাবেশ ঘটয়েছে

অনীশ-পর্ব-(৪)

মেয়েকে যেত সবসময়ই সন্তান ধারণ করতে হয়, সেহেতু প্রকৃতি তাকে করল, ধীর হির! একই সঙ্গে ঠিক একই মাত্রায় তাকে মলমশত, অধীর, হির। তি এইসব হিসাবনিকাশ খুব মজার। 

খে মনে হয় পরিহাসপ্রিয় প্রবৃত্ত সই মজার খেলা খেলছে। 

মিসির আলি বই খুলবেন, মত পরের জগৎ সম্পর্কে মিখ সাহেবের বও পড়া যাক| দেহের ভেতর লুকিয়ে আছে মানুষের সূক্ষ্ম দেহ! সেই দেহকে বলে বাইওলামিক বড়ি! ফুলদৃষ্টিতে সেই দেহ দেখা যায় নাস্কুল দেহের বিনাশ হলেই সম্মা দেহ বা বাইক স্কুল দেহ থেকে আলাদা হয়ে যায়সূক্ষ দেহ শক্তির মতাে শক্তির যেমুন মাশ নেইসূক্ষ দেহেরও তেমনি বিনাশ নেই! সূক্ষ্ম দেহের তবধর্ম আজদূৈর্ধ, মুল দেহের কামনাবাসনার সঙ্গে সম্পর্কিত। যার কামনাবাসনা পুলিশ এর অঙ্গদৈব তত বেশি। 

 মিশালি বই বন্ধ করে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেনমিথ নামের এই লােহ বৈজ্ঞানিক শক ব্যবহার করে তাঁর গ্রন্থটি তারিক্তি করার চেষ্টা করেছেননিজের বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন পাঠকদের কাছেগ্রহের শুভ ভূমিকার কথাই সবাই বলে-যে পাতাতুমি আছে, সেসম্পর্কে কেউ কিছু বলে 

একজন ক্ষতির মানুষ সমাজের যতটা ক্ষতি করতে পারে, তারচেয়ে এক গুণ বেশি ক্ষতি করতে পারে সেই মানুষটির লেখা একটি ই। বইয়ের কথা বিশ্বাস করার 

আমাদের যেপ্রবণতা, তার শিকড় অনেক দূর চলে গেছে। একটা বই মাটিতে পড়ে থাকলে তা মাটি থেকে তুলে মাথায় ঠেকাতে হয়। এই ট্রেনিং দিয়ে দেওয়া হয়েছে সুদূর শৈশবে। 

অনীশ-পর্ব-(৪)

‘স্যার, আসব? 

মেয়েটি আবার দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। তাকে লজ্জিত এবং অনুতপ্ত মনে হচ্ছেঝড়ের বেগে ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার অপরাধে সে নিজেকে অপরাধী করে কষ্ট পাচ্ছে। 

‘স্যার, আসব? মিসির আলি হাসতে হাসতে বললেন, না।’ 

মেয়েটি ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসতেবসতে বলল, ‘একটু আগে নিতান্ত বালিকার মতাে যেব্যবহার আপনার সঙ্গে আমি করেছি, এ-রকম ব্যবহার আমি কখনােই কারাে সঙ্গেই করি না। আপনার সঙ্গে কেন করলাম তাও জানি না। আপনার কাছেই আমি জানতে চাচ্ছিকেন এমন ব্যবহার করলাম?’ 

মিসির আলি বললেন, এটা বলার জন্যে তুমি আস নি। অন্য কিছু বলতে এসেছ-সেটাই বরং বল।’ 

বুড়ি নিচু গলায় বলল, আমি খুব বড় ধরনের একটা সমস্যায় ভুগছি। কষ্ট পাচ্ছিভয়ংকর কষ্ট পাচ্ছি। আমার সমস্যাটা কেউএকজন বুঝতে পারলে আমি কিছুটা হলেও শান্তি পেতাম। মনে হয় আপনি বুঝবেন।’ 

বােঝার চেষ্টা করব। বল তােমার সমস্যা। 

‘বড় একটা খাতায় সব লেখা আছে! খাতাটা আপনাকে দিয়ে যাব। আপনি ধীরেসুস্থে আপনার অবসর সময়ে পড়বেন। তবে একটি শর্ত আছে।” 

কি শর্ত? 

অনীশ-পর্ব-(৪)

‘কাল আমার অপারেশন হবে। আমি মারাও যেতে পারি। যদি মারা যাই, তাহলে আপনি এই খাতায় কি লেখা তা পড়বেন না। খাতাটা নষ্ট করে ফেলবেন। আর যদি বেঁচে থাকি তবেই পড়বেন। | মিসির আলি বললেন, ‘তােমার এই শর্ত পালনের জন্যে সবচেয়ে ভালাে হয় যদি খাতাটা তােমার কাছে রেখে দাও। তুমি মরে গেলে আমি খাতাটা পাব না। বেঁচে থাকলে তুমি নিজেই আমাকে দিতে পারবে।’ 

‘খাতাটা আমি আমার কাছে রাখতে চাচ্ছি না। আমি চাই না অন্য কেউ এই লেখা পড়ুক। আমি মারা গেলে সেই সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। আপনার কাছে খাতাটা থাকলে এই দুশ্চিন্তা থেকে আমি মুক্ত থাকব।’ 

‘দাও তােমার খাতা। 

কাল ভােরবেলা অপারেশন থিয়েটারে যাবার আগেআগে আপনার কাছে পাঠাব। 

‘ভালাে কথা, পাঠিও।’ 

এখন আপনি কোনােএকটা হাসির গল্প বলে আমার মন ভালাে করে দিন। ‘আমি কোনাে হাসির গল্প জানি না।’ ‘বেশ, তাহলে একটা দুঃখের কথা বলে মন খারাপ করিয়ে দিন। অসম্ভব  খারাপ করে দিল। যেন আমি হাউমাউ করে কাঁদি। 

অনীশ-পর্ব-(৪)

রাতের বেলার রাউন্ডের ডাক্তার এসে মিসির আলির ঘরে বুড়িকে দেখে খুব বিরক্ত হলেন। কড়া গলায় বললেন, ‘কাল আপনার অপারেশন। আপনি ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছেন, এর মানে কী?’ | বুড়ি শান্ত গলায় বলল, ‘এমনও তাে হতে পারে ডাক্তার সাহেব যে আজ রাতই আমার জীবনের শেষ রাত। মৃত্যুর পর কোনােএকটা জগৎ থাকলে ভালাে কথা, কিন্তু জগৎ তাে নাও থাকতে পারে। তখন? 

ডাক্তার সাহেব বললেন, ‘প্লীজ, আপনি নিজের ঘরে যান। বিশ্রাম করুন। 

উঠে চলে গেল। ডাক্তার সাহেব বললেন, ‘এই ভদ্রমহিলার সঙ্গে কি আপনার পরিচয় আছে? 

‘সম্প্রতি হয়েছে।” ‘উনি তাে ডেনজারাস মহিলা। ‘ডেনজারাস কোন অর্থে বলছেন? 

‘সব অর্থেই বলছি। যেকোনাে সিনেমাপত্রিকা খুঁজে বের করুনওঁর সম্পর্কে কোনােনাকোনাে স্ক্যান্ডালের খবর পাবেন। একবার সুইসাইড করার চেষ্টা করেছেনএকগাদা ঘুমের অষুধ খেয়েছিলেন। এই হাসপাতালেই চিকিৎসা হয়। একবার গায়ে আগুন লাগাবার চেষ্টাও করেছেন। তার বাঁ পায়ের কিন অনেকখানিই নষ্ট। বাইরে থেকে স্কিন গ্রাফটিং করিয়েছেন।’ 

মনে হচ্ছে খুব ইন্টারেস্টিং চরিত্র। 

‘অনেকের কাছে ইন্টারেস্টিং মনে হতে পারে। আমার কাছে কখনাে মনে হয় না। এই মহিলার লক্ষ লক্ষ টাকা। ইচ্ছা করলেই তিনি ইংল্যান্ড স্লামেরিকায় গিয়ে অপারেশনটা করাতে পারেন। দেশেও নামীদামী ক্লিনিক আছে, সেখানে যেতে পারেন। তা যাবেন না। এসে উঠবেন সরকারি হাসপাতালে। কেন বলুন তাে?’ 

‘কেন?’ 

অনীশ-পর্ব-(৪)

পাবলিসিটি, আর কিছুই না। অপারেশন হয়ে যাবার পর পত্রিকায় খবর হবে—অমুক হাসপাতালে অপারেশন হয়েছে। স্রোতের মতো ভক্ত আসবে। হসপিটাল অ্যাডমিনিসট্রেশন কলাপস্ করবে। আমাদের পুলিশে খবর দিতে হবে। পুলিশ লাঠি চার্জ করবে।

আবারও খবরের কাগজের প্রথম পাতায় নিউজ হবে। হাসপাতাল থেকে রিলিজুড় হয়ে যাবার পর তিনি খবৱের কাগজে ইন্টার দেবেন। সাংবাদিক জিজ্ঞেস করবে, আপনি বিদেশে চিকিৎসা নাকরিয়ে এখানে কেন করালেন? তিনি হাসিমুখে জবাব দেবেন“আমি দেশকে বড় ভালবাসি। খবরের কাগজে তার হাস্যমুখী ছবি ছাপা হবে। নিচে লেখারূপা চৌধুরী দেশকে ভালবাসেন। 

‘তাঁর নাম রূপা চৌধুরী ? ‘কেন, আপনি জানতেন না? 

না।’ ‘রূপা চৌধুরীর নাম জানেন না শুনলে লােকে হাসবে। ওর কথা বাদ দিন; আপনি কেমন আছেন বলুন। মাথাধরা শুরু হয়েছে?” 

এখানাে হয় নি, তবে হবেহবে করছে। 

বছর খালি পড়ে থাকে। আপনি আমার ঐ বাড়িতে কিছুদিন থেকে আসুন না। 

আপনার পৈত্রিক বাড়িতে?

এই বিশেষ ফেভার আপনি কেন করতে চাচ্ছেন? আমি আপনার একজন সাধারণ রুগী। এর বেশি কিছু না। আপনি নিশ্চয়ই আপনার সব রুগীদের হাওয়া বদলের জন্যে আপনার পৈত্রিক বাড়িতে পাঠান না।” 

‘তা পাঠাই না.……. ‘আমাকে পাঠাতে চাচ্ছেন কেন? 

 

Read more

অনীশ-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *