‘আমি যদি বলি মানুষ হিসেবে আপনাকে আমার পছন্দ হয়েছে, তাহলে কি আপনার বিশ্বাস হবে?
‘বিশ্বাস হবে না। যে–সব গুণাবলী একজন মানুষকে সবার কাছে প্রিয় করে তার কিছুই আমার নেই। আমি শুকনাে ধরনের মানুষ। গল্প করতে পারি না। গল্প শুনতেও ভালাে লাগে না।’
ডাক্তার সাহেব উঠে দাঁড়াতে–দাঁড়াতে বললেন, “আমার বড় মেয়েটি আপনার ছাত্রী। তার ধারণা, আপনি অসাধারণ একজন মানুষ। সে চাচ্ছে যেন আপনার জন্যে বিশেষ কিছু করা হয়। | মিসির আলি হেসে ফেললেন। তাঁর ছাত্র–ছাত্রীরা তাকে সম্পূর্ণ অন্য চোখে দেখে—এটা তিনি লক্ষ করেছেন।
যদিও তার কোনাে কারণ বের করতে পারেন নি। অন্য দশ জন শিক্ষক যেভাবে ক্লাস নেন তিনিও সেভাবেই নেন। এর বেশি তো কিছু করেন না। তার পরেও তার ছাত্র–ছাত্রীরা এ–রকম ভাবে কেন? রহসটা কী?
মিসির আলি সাহেব। ‘জ্বি!”
আমার বড় মেয়ের স্বামী ধনবান ব্যক্তি। আমার বড় মেয়ে চাচ্ছে তার খরচে আপনাকে বাইরে পাঠাতে, যাতে সর্বাধুনিক চিকিৎসার সুযােগ গ্রহণ করতে পারেন। আপনি রেগে যাবেন কি না এই ভেবেই এ–প্রস্তাব এতক্ষণ দিই নি।
অনীশ-পর্ব-(৫)
‘আপনার বড় মেয়ের নাম কি?
‘আমার মেয়ে বলেছে আপনি তার নাম জানতে চাইলে নাম যেন আমি না বলি।
সে তার নাম জানাতে চাচ্ছে না। আপনি কি আমার মেয়ের প্রস্তাবটি গ্রহণ করবেন?
‘না, তবে আপনার প্রস্তাব গ্রহণ করব। আপনার পৈত্রিক বাড়িতে কিছুদিন থাকব।
বাড়ি নিশ্চয়ই খুব সুন্দর? | হা—খুবই সুন্দর। সামনে নদী আছে। আপনার জন্যে নৌকার ব্যবস্থা থাকবে। ইচ্ছা করলে নৌকায় রাত্রিযাপন করতে পারবেন। পাকা বাড়ি।
দোতলায় বারান্দা বেশ বড়। বারান্দায় এসে দাঁড়ালে ঘরে যেতে ইচ্ছা করে না—এমন। মিসির আলি ক্লান্ত গলায় বললেন, ‘প্রাকৃতিক দৃশ্য আমাকে তেমন আকর্ষণ করে ।‘ ‘গিয়ে দেখুন, এখন হয়তাে করবে। অসুস্থ মানুষকে প্রকৃতি খুব প্রভাবিত করে।
পরিবেশেরও রােগ নিরাময়ের ক্ষমতা আছে। আমি কি ব্যবস্থা করব?
করুন।
দিন পাঁচেক সময় লাগবে। আমি একজন ডাক্তারের ব্যবস্থাও করব। আমার ছাত্র গৌরীপুর শহরে প্র্যাকটিস করে। তাকে চিঠি লিখে দেব, যাতে তিন–চার দিন পরপর সে আপনাকে দেখে আসে। খাওয়াদাওয়া নিয়ে চিন্তা করবেন না। বজলু আছে।
সে হচ্ছে একের ভেতর তিন কেয়ার টেকার, কুক এবং দারােয়ান। এই তিন কাজেই সে দক্ষ। বিশেষ করে রান্না সে খুব ভালো করে। মাঝে–মাঝে তার রান্নার প্রশংসা করবেন। দেখবেন সে কত খুশি হয়।
ডাক্তার সাহেবের পৈত্রিক বাড়ি বারােকাদায়। | ময়মনসিংহ–মােহনগঞ্জ লাইনের অতিথপুর স্টেশনে নেমে ছ’ মাইল যেতে হয় রিকশায়, দু’ মাইল হেঁটে, এবং বাকি দু’–তিন মাইল নৌকায়।
অনীশ-পর্ব-(৫)
মিসির আলির খুবই কষ্ট হল। অতিথপুর থেকে রওনা হয়ে বেশ কয়েকবার মনে হল, না–গেলে কেমন হয়? শেষ পর্যন্ত পৌছলেন একটামাত্র কারণে ডাক্তার সাহেব নানান জোগাড়যন্তর করে রেখেছেন। লােকজনকে খবর দেওয়া হয়েছে। এরপরে না যাওয়াটা অন্যায়।
ডাক্তার সাহেবের পৈত্রিক বাড়ি খুবই সুন্দর।
সম্প্রতি চুনকাম করা হয়েছে বলেই বােধহয় সবুজের ভেতর ধবধবে সাদা বাড়ি ঝকঝক করছে।
বাড়ি দেখে খুশি হবার বদলে মিসির আলির মন খারাপ হয়ে গেল।
এত বড় বাড়ি খালি পড়ে আছে।
খাঁ-খাঁ করছে।
কোনাে মানে হয়? বাড়ির জন্যে তাে মানুষ নয়, মানুষের জন্যেই বাড়ি। | বাড়ির সামনে নদী না—খালের মতাে আছে। অল্প পানি। সেই পানিতেই পানসিজাতীয় বিরাট এক নৌকা। বজলু হাসিমুখে বলল—স্যার, নৌকা আপনার জন্যে। বড় আপা চিঠি দিয়েছে—যেন প্রত্যেক বিকালে নৌকার মধ্যে আপনার চা দিই।
“ঠিক আছে, নৌকাতে চা দিও|
আগামীকাল কী খাবেন, স্যার যদি বলেন। মফস্বল জায়গা। আগে–আগে না বললে জোগাড়যন্তর করা যায় না। রাতের ব্যবস্থা আছে কই মাছ, শিং মাছ। মাংসের মধ্যে আস্থে কবুতরের মাংস! মাছের মাথা দিয়া মাষকালাইয়ের ডাল রানধা করছি।
যথেষ্ট হয়েছে। দেখ বজলু খাওয়াদাওয়া নিয়ে তুমি বেশি ব্যস্ত হয়াে না। খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে আমার আগ্রহ খুব কম। দুই পদের বেশি কখনাে রান্না করবে বজলু সব কটা দাঁত বের করে হেসে ফেলল——
আপনি বললে তাে আর হবে না। বড় আপা চিঠি দিয়ে দিয়েছেন—লিখেছেন, সারের যত্নের যেন কোনাে ত্রুটি না হয়। সবসময় খুব কম করে হলেও যেন প্রতি বেলা পাঁচ পদের আয়ােজন হয়।
অনীশ-পর্ব-(৫)
আমি স্যার অনেক কষ্টে পাঁচ পদের ব্যবস্থা কৱেছি কই মাছের ভাজি শিং মাছের ঝোল, কুতরের মাংস, বেগুন ভর্তা আর ডাল।
আগামীকাল কী করি, এই চিন্তায় আমি অস্থির।
‘অস্থির হবার কোনাে প্রয়ােজন নেই বজলু। আপাতত চা খাওয়াও।’
‘তাহলে স্যার নৌকায় গিয়া বসেন। বিছানা পাতা আছে। আপা বলে দিয়েছেন নৌকায় চা দেওয়ার জন্যে।
মিসির আলি সাহেও নৌকাতেই বসলেন। তাঁর মন বলছে, বজলু তাকে বিরক্ত করে মারবে। ভালবাসার অত্যাচার, কঠিন অত্যাচার। একে গ্রহণও করা যায় না, বর্জনও করা যায় না।
নৌকায় বসে মিসির আলি একটা মজার জিনিস লক্ষ করলেন। খাল বরাবর আমগাছগুলি টিয়া পাখিতে ভর্তি। দশ–পনেরটি নয়, শত–শত। এরা যখন ওড়ে তখন আর এদের সবুজ দেখায় না। কালাে দেখায়। এর মানে কী? টিয়া কালাে দেখাবে কেন?
চলমান সবুজ রঙ যদি কালাে দেখায়, তাহলে তাে চলন্ত ট্রেনের সবুজ কামরাগুলিও কালাে দেখানাের কথা। তা কি দেখায় ? মিসির আলি মনে করতে পারলেন না। বুলুকে একবার পাঠাতে হবে চলন্ত ট্রেন দেখে আসার জন্যে। সে দেখে এসে বলুক।
প্রথম রাতে মিসির আলির ভালাে ঘুম হল না। প্রকাণ্ড বড় খাট—তাঁর মনে হতে লাগল তিনি মাঠের মাঝখানে শুয়ে আছেন। বাতাসও খুব সমস্যা করতে লাগল । জানালা দিয়ে এক–একবার দমকা হাওয়া আসে, আর তাঁর মনে হয় তাঁকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। মাঝরাতে দরজা–জানালা বন্ধ করে তিনি বুড়ির খাতা নিয়ে বসলেন।
অনীশ-পর্ব-(৫)
আমার বাবা মারা যান, যখন আমার বয়স পনের মাস। | বাবার অভাব আমি বােধ করি নি, কারণ বাবা সম্পর্কে আমার কোনাে স্মৃতি নেই। স্মৃতি থাকলেই অভাববােধের ব্যাপারটা চলে আসত। আমাকে মানুষ করেছেন আমার মা। তিনি শ্ৰত্যন্ত সাবধানী শহিলা। বাবার অভাব যাতে আমি কোনােদিন বুঝতে
—পারি, তার সবরকম চেষ্টা তিনি বাবার মৃত্যুর পর থেকেই করে আসছেন। তিনি যা যা করেছেন তার কোনােটিই কোনাে সুস্থ মহিলা কখনাে করবেন না। মা হচ্ছেন একজন অসুস্থ, অস্বাভাবিক মহিলা। যেহেতু জন্ম থেকেই আমি তাঁকে দেখে আসছি, তাঁর অস্বাভাবিকতা আমার চোখে ধরা পড়তে অনেক সময় লেগেছে।
বাবার মৃত্যুর পর ঘর থেকে তাঁর সমস্ত ছবি, ব্যবহারি জিনিস সরিয়ে ফেলা হয়—কিছু নষ্ট করে দেওয়া হয়, কিছু পাঠিয়ে দেওয়া হয় আমার দাদার বাড়িতে। মা’র যুক্তি ছিল—বাবার স্মৃতিজড়িত কিছু তাঁর চারপাশে রাখতে পারবেন না। স্মৃতির কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা তার নেই।
অনীশ-পর্ব-(৫)
বাবা কেমন ছিলেন, তিনি কী করতেন, কী গল্প করতেন—এ–সব নিয়েও মা কখনাে আমার সঙ্গে কিছু বলেন নি। বাবার সম্পর্কে কিছু বলতে গেলেই তাঁর নাকি অসম্ভব কষ্ট হয়। মা এই কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে বাবার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সবকিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন।
বাবার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবার সঙ্গেই সম্পর্ক ছিন্ন করলেন। আমার নাম তিতলী, যা বাবা আগ্রহ করে রেখেছিলেন তা–ও বদলানাে হল। আমার নতুন নাম হল রূপা। তিতলী নাম মা বদলালেন, কারণ এই নাম তাঁকে বাবার কথা মনে করিয়ে দিত।
মা অসম্ভব রূপবতী। আরেকটি বিয়ে করাই মা’র জন্যে স্বাভাবিক ছিল। পাত্রের অভাব ছিল না। রূপবৃতীদের পাত্রের অভাব কখনাে হয় না। মা বিয়ে করতে রাজি হলেন না। বিয়ের বিপক্ষে একটি যুক্তি দিলেন, যে–ছেলেটিকে বিয়ে করব তার স্বভাব চরিত্র যদি রূপার বাবার চেয়ে খারাপ হয়, তাহলে কখনাে তাকে ভালবাসতে পারব
দিনরাত রূপার বাবার সঙ্গে তার তুলনা করে নিজে কষ্ট পাব, তাকে কষ্ট দেব। সেটা ঠিক হবে না। আর যদি ছেলেটি রূপার বাবার চেয়ে ভালাে হয়, তাহলে রূপার বাবাকে আমি ক্রমে–ক্রমে ভূলে যাব। তাও ঠিক হবে না। এই মানুষটিকে আমি খুলতে চাই না।
আমার মামারা ছাপােষা ধরনের মানুষ। মা’কে নিয়ে তাঁরা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। কন্যাসহ বােনের বােঝা মাথায় নেবার মত সামর্থ্য বা ইচ্ছা কোনােটাই তাঁদের ছিল না। তবু মা তাঁদের ঘাড়ে সিন্দাবাদের ভূতের মত চেপে রইলেন।
অনীশ-পর্ব-(৫)
কিছুদিন তিনি এক ভাইয়ের বাড়িতে থাকেন, তারপর যান অন্য ভাইয়ের বাসায়। মামারা ধরেই নিলেন মা তাঁর জীবনটা এভাবেই পার করবেন। তারা মা’র সঙ্গে কুৎসিত গলায় ঝগড়া করেন। গালাগালি করেন। মা নির্বিকার। আমার বয়স যখন পাঁচ হল তখন আমাকে বললেন, ‘রূপা, তােকে তাে এখন একটা স্কুলে দিতে হয়। ঘুরে–ঘুরে জীবন পার করলে হবে
আমাকে থিতু হতে হবে। আমি এখন একটা বাসা ভাড়া নেব। সম্ভব হলে একটা বাড়ি কিনে নেব।’ আমি বললাম, ‘টাকা পাবে কোথায় ?
মা বললেন, ‘টাকা আছে। তাের বাবার একটা পয়সাও খর্চ করি নি, জমা করে রেখেছি। | বাবা বিদেশি এক দূতাবাসে চাকরি করতেন। চাকরিকালীন সময়ে রােড অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান বলে ইস্যুরেন্স থেকে এবং দুবাস থেকে বেশ ভালাে টাকাই পেয়েছিলেন।
মা সেই টাকার অনেকখানি খরচ করে নয়াটোলায় দোতলা এক বাড়ি কিনে ফেললেন।
বেশ বড় বাড়ি।
প্রায় এক বিঘা জমি নিয়ে বাড়ি। একতলা দোতলা মিলে অনেকগুলি ঘর।
ভেতরের দিকে দুটো আমগাছ, একটা সজনেগাছ, একটা কাঁঠালগাছ।
বাড়ি পুরনো হলেও সব মিলিয়ে খুব সুন্দর।
একতলাটা পাঁচ হাজার টাকায় ভাড়া হল। আমরা খাকি দোতলায়।
পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বাড়ি। মা সেই পাঁচিল আরাে উচু করলেন।
ভারি গেট করলেন।
একজন দারােয়ান রাখলেন।
আমাদের নতুন জীবন শুরু হল।
অনীশ-পর্ব-(৫)
নতুন জীবন অনেক আনন্দময় হওয়া উচিত ছিল। মামাদের ঝগড়া–গালাগালি নেই। সুভাব–অনটন নেই। এত বড় দোতলায় আমরা দু জনমাত্র মানুষ। বাড়িটাও সুন্দর। দোতলায় রেলিং দেওয়া টানা-বারান্দাও আছে। আমার খেলার সঙ্গী–সাথী আছে।
একতলার ভাড়াটের আমার বয়সী দু’টি যমজ মেয়ে আছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের নিজস্ব বাড়িতে আমার ভয়াবহ জীবন শুরু হল। মা সারাক্ষণ আমাকে আগলে রাখেন। নিজে স্কুলে নিয়ে যান, যে–চারঘন্টা স্কুল চলে মা মাঠে বসে থাকেন। ছুটি হলে আমাকে নিয়ে বাসায় ফেরেন। দুপুরে খাবার পরই আমাকে আমার ঘরে আটকে দেন। ঘুমুতে হবে। বিকেলে যদি বলি, ‘মা, নিচে খেলতে যাই? | তিনি গম্ভীর মুখে বলেন, ‘না। দোতলার বারান্দায় বসে খেল। খেলার জন্যে নিচে যেতে হবে কেন?
‘নিচে গেলে কী হবে মা?”
তুমি নিচে গেলে আমি এখানে একা–একা কী করব? আসল কথা হচ্ছে মা’র নিঃসঙ্গতা। আমি তার একমাত্র সঙ্গী। সেই সঙ্গী তিনি একমুহুর্তের জন্যেও চোখের আড়াল করবেন না। দিনের পর দিন রাগারাগি করেছি, কান্নাকাটি করেছি, কোনাে লাভ হয় নি।
কতবার বলেছি, ‘মা, সবাই কত জায়গায় বেড়াতে যায়—চল আমরাও যাই। বেড়িয়ে আসি।
‘কোথায় যাবে? ‘চল কক্সবাজার যাই।
Read more
