‘বলুন।’
কেন সবসময় এ-রকম উল্টোপাল্টা কথা বলেন? ‘সত্যি কথা বলছি। শুধু-শুধু মিথ্যা বলব কেন?’
‘ঐ ভদ্রলােকের সঙ্গে আমার টেলিফোনে কথা হয়েছে। আপনি তাঁর কাছে এখনাে যান নি। তিনি ঠিকানা বদলেছেন, এখন থাকেন রামকৃষ্ণ মিশন রােডে।
ও, আচ্ছা। ‘আপনি গেলেই উনি আপনাকে কাজ দেবেন। ‘মেনি থ্যাংকস। ‘ফিরােজ সাহেব।
‘আচার-আচরণ সাধারণ মানুষের মতাে করার চেষ্টা করুন। ইয়ারকি- ফাজলামি তাে যথেষ্ট করলেন। বয়স কত আপনার?
‘পঁয়ত্রিশ। ‘বয়স তাে মাশাআল্লাহ্ কম হয় নি। আরেকটা কথা। ‘বলুন, শুনছি।
ফখরুদ্দিন সাহেবের বাড়িতে একবার যাবেন।
কেন? ‘ওনার মেয়ে টেলিফোনে আপনাকে চাচ্ছিল।
বলেন কী! কীরকম গলায় চাইল? কীরকম গলায় মানে! প্রেম-প্রেম গলা, না রাগ-রাগ গলা?
বি করিম সাহেব তার উত্তর দিলেন না। টেলিফোন নামিয়ে রাখলেন। রাগে তাঁর গা জ্বলে যাচ্ছে। ফিরােজ হৃষ্টচিত্তে খেতে বসল। প্রচুর আয়ােজন। টেবিলের দিকে তাকাতেই মন ভরে যায়।।
‘সিরিয়াস এক বড়লােকের মেয়ের সঙ্গে প্রেম হয়ে গেছে, বুঝলে আপা। একেবারে লুদকালদকি প্রেম।
তাজিন কিছু বলল না। একটা বিশাল আকৃতির সরপুটি ভাজা ফিরােজের পাতে তুলে দিল।
‘ঐ মেয়ে আমার খোঁজে দিনে চার বার পাঁচ বার করে অফিসে টেলিফোন করছে। বি করিম সাহেবের কান ঝালাপালা।
‘সত্যি-সত্যি বলছিস?’
এই যে মাছ হাতে নিয়ে বলছি। বাঙালির ছেলে মাছ হাতে মিথ্যা কথা বলে না। মেয়েটার নাম কি? ‘অপালা। বিয়ের পর অপা করে ডাকব। অপালা শব্দটার মানে কী, জানিস নাকি? জানি না। মেয়েটাকে ছবিতে যে-রকম দেখাচ্ছে আসলেও কি সে-রকম
ফিরােজ ভাত মাখতে-মাখতে বলল, ‘তুই একটা মিসটেক করে ফেললি রে আপা। ছবির মেয়ে আর ঐ মেয়ে দুই ভিন্ন ব্যক্তিত্ব। তুই গুবলেট করে ফেলেছিস।
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
তাজিন রাগ করতে গিয়েও করতে পারল না। তাদের পাঁচ বােনের পর এই এক ভাই। আদরে-আদরেই ওর মাথা নষ্ট হয়েছে। জীবনে কিছুই করল না। কোনাে দিন যে করতে পারবে তাও মনে হচ্ছে না।
‘ফিরােজ।
‘সবটাই কি তাের কাছে একটা খেলা?’ ‘খেলা হবে কেন?
তাজিন আর কিছু বলল না। ফিরােজের খাওয়া দেখতে লাগল। কেমন মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে খাচ্ছে। গালভর্তি দাড়ি। হঠাৎ দাড়ি রাখার শখ হল কি জন্যে কে বলবে? জিজ্ঞেস করলে অদ্ভুত কিছু বলে হাসাতে চেষ্টা করবে। ইদানীং আর ফিরােজের কথায়
তার হাসি আসে না, রাগ ধরে যায়। চড় মারতে ইচ্ছে করে।
‘দাড়িতে আমাকে কেমন লাগছে রে আপা? ‘ভালাে।’ ‘রবীন্দ্রনাথ-রবীন্দ্রনাথ ভাব চলে এসেছে না?
তাজিন কিছু বলল না। ‘রবীন্দ্রনাথের মুখের গঠনের সাথে আমার মুখের গঠনের অদ্ভুত মিল আছে।
চুলদাড়িগুলি আরেকটু লম্বা হােক, দেখবি।
‘তখন কী করবি? একটা আলখাল্লা কিনবি?’ | ‘এটা মন্দ বলিস নি আপা। একটা আলখাল্লা কিনলে হয়। রেডিমেড বােধহয় পাওয়া যায় না। অর্ডার দিয়ে বানাতে হবে। তারপর সেই আলখাল্লা পরে বাংলা একাডেমীর কোনাে একটা অনুষ্ঠানে গিয়ে সবাইকে ভড়কে দেব। চারদিকে ফিসফাস শুরু হবে—গুরুদেব এসে গেছেন।
চুপ কর দেখি!
‘সরি, আমার আবার মনেই থাকে না তুই বাংলার ছাত্রী। দে, একটা পান দে। চমনবাহার থাকলে চমনবাহার দিয়ে দে।’
অপালা যে-বার ক্লাস এইটে বৃত্তি পেল, সে-বার তার বাবা তাকে চমৎকার একটা উপহার দিয়েছিলেন। লিসবন থেকে কেনা মরক্কো চামড়ায় বাঁধাই-করা পাঁচ শ’ পাতার বিশাল একটা খাতা। মলাটে একটি স্প্যানিস নর্তকীর ছবি। চামড়ায় এত সুন্দর ছবি কী করে আকা হল কে জানে! দেখলে মনে হয় মেয়েটি চামড়া ফুড়ে বের হয়ে এসে নাচা শুরু করবে।
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
ভেতরের পাতাগুলির রঙ মাখনের মতাে। কী মসৃণ। প্রতিটি পাতায় অপূর্ব সব জলছাপ। গাছপালা, নদী, আকাশের মেঘ।
ফখরুদ্দিন সাহেব হাসতে-হাসতে বললেন, ‘উপহারটি মনে হয় খুব পছন্দ হয়েছে?
আনন্দে অপালার চোখে পানি এসে গিয়েছিল। সে নিজেকে সামলে গাঢ় গলায়। বলল, হ্যা।
এখন থেকে এই খাতায় গল্প, কবিতা, নাটক—এইসব লিখবে। এইসব তাে আমি লিখতে পারি না বাবা। ‘লিখতে-লিখতেই লেখা হয়। চেষ্টা করবে। ঐ সব না পার, জীবনের বিশেষ বিশেষ ঘটনা লিখে রাখবে। এই যে তুমি বৃত্তি পেলে, এটা তাে বেশ একটা বড় ঘটনা। সুন্দর করে এটা লিখবে। তারপর তােমার যখন অনেক বয়স হয়ে যাবে, চুল হবে সাদা, চোখে ছানি পড়বে—তখন ঐ খাতাটা বের করে পড়বে, দেখবে কত ভালাে লাগে।’
‘আমি কোনােদিন বুড়াে হব না বাবা। ‘তাই বুঝি? ফখরুদ্দিন সাহেব ঘর কাঁপিয়ে অনেকক্ষণ ধরে হাসলেন।
চমৎকার সেই খাতায় প্রথম এক বছর অপালা কিছুই লিখল না। তার অনেক বার লিখতে ইচ্ছে করল, কলম নিয়ে বসল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুন্দর পাতাগুলি নষ্ট করতে ইচ্ছে করল না। সে খাতা খুলে রেখে মনে-মনে পাতার পর পাতা লিখে যেতে লাগল। অনেক লেখা পছন্দ হল না, সেগুলি মনে-মনেই কেটে নতুন করে লিখল।
Read more