অ্যাসট্রেতে চারটি সিগারেট পড়ে আছে। এই থেকে বলা যেতে পারে, পঞ্চাশ মিনিটের মতাে পার হয়েছে। পঞ্চাশ মিনিট অবশ্যি এক জন রাজকন্যার দর্শনলাভের জন্যে যথেষ্ট নয়। রাজকন্যাদের জন্যে পঞ্চাশ ঘন্টা বসে থাকা যায়।
পর্দা সরিয়ে রমিলা ঢুকল, দাঁত কেলিয়ে বলল, আফা আসতাছে।
ফিরােজ মনে মনে বলল, ধন্য হলাম। রাজকন্যার আগমনবার্তা নকিব ঘোষণা করল। এখন সম্ভবত জাতীয় সঙ্গীত বাজবে—আমার সােনার বাংলা আমি তােমায় ভালবাসি।
‘ফিরােজ সাহেব, আপনি কি ভালাে আছেন? ‘জি, ভালাে।’ ‘আপনি ঐ দিন এসেছিলেন, আমার মনটা খুব খারাপ ছিল, নিচে নামতে ইচ্ছা ছিল না। আপনি কিছু মনে করেন নি তাে?’।
“না না, কিছু মনে করি নি। একা-একা বসে থাকতে আমার ভালােই লাগে।’
‘আপনার ঐ কাজের ব্যাপারটা নিয়ে বাবার সঙ্গে আলাপ করেছিলাম। তিনি ওকে বলেছেন।
প্রথমে তাে আপনি “নাে” বলে দিয়েছিলেন, আবার কেন…… ‘আপনার চাকরি চলে যাবে বলছিলেন যে, তাই। আপনি বসুন, দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
ফিরােজ বসল। বসতে গিয়ে মনে হল, এই মেয়েটি বসবে না। কথা বলবে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে। যে-কোনােভাবেই হােক, বুঝিয়ে দেবে, তুমি আর আমি একই আসনে পাশাপাশি বসতে পারি না। সেটা শােভন নয়। কিন্তু অবাক কাণ্ড, মেয়েটি বসল। ফিরােজ বলল, আমি অবশ্যি খুব ভয়েভয়ে এসেছি। ভেবেছি আপনি গালাগালি করবার জন্যে আমাকে ডেকেছেন।
কী আশ্চর্য। গালাগালি করব কেন?
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
যেদিন আপনি আমার কাজ বন্ধ করে দিলেন, সেদিন রাগ করে আপনাদের একটা দামী কাপ ভেঙে ফেলেছিলাম। ‘তাই নাকি! বাহ, বেশ তাে!’
আপনি জানতেন না?’ অপালা অবাক হয়ে বলল, ‘সামান্য কাপ ভাঙার ব্যাপারে আমি জানব কেন? ‘ও, আচ্ছা।
‘আপনি যে-দিন ইচ্ছা কাজ শুরু করতে পারেন। যে-কোনাে প্রয়ােজনে আমাদের ম্যানেজারবাবুর সঙ্গে কথা বললেই হবে। আমি পড়াশােনা নিয়ে ব্যস্ত, নিচে সাধারণত নামি না।
কিসের এত পড়াশােনা? ‘অনার্স ফাইন্যাল।
‘ও, আচ্ছা। আপনাকে অবশ্যি অনার্স ফাইন্যালের ছাত্রী মনে হয় না। মনে হয় কলেজ-টলেজে পড়েন।
অপালা কিছু বলল না। তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হল। ফিরােজ সেটা লক্ষ করল না। ফুর্তির ভঙ্গিতে বলতে লাগল, পড়াশােনা করতে-করতে যদি ব্রেইন টায়ার্ড হয়ে যায়, তাহলে চলে আসবেন, আমি কাজ বন্ধ রেখে আপনার সঙ্গে গল্প-গুজব করব, ব্রেইন আবার ফ্রেশ হয়ে যাবে।’
তার মানে? আপনি কী বলতে চাচ্ছেন? | ফিরােজ অবাক হয়ে দেখল, মেয়েটির মুখ রাগে লাল হয়ে গেছে। ঠোট অল্প অল্প কাঁপছে। এতটা রেগে যাবার মতাে কিছু কি সে বলেছে?
‘আপনি হঠাৎ এমন রেগে গেলেন কেন? আমি অন্য কিছু ভেবে এটা বলি নি। আপনার চেয়ে অনেক-অনেক রূপবতী একটি মেয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। সেই মেয়েটিকে আগামী সপ্তাহে আমি বিয়ে করছি। দেখুন, তার ছবি দেখুন। | ফিরােজ হাজি সাহেবের মেয়ের ছবিটি টেবিলে রাখল। ভাগ্যিস ছবিটি সঙ্গে ছিল! মেয়েটি একদৃষ্টিতে ছবিটির দিকে তাকিয়ে আছি। ফিরােজ সহজ স্বরে বলল, ‘আপনাকে গল্প করতে এখানে আসতে বলার পেছনে কোনাে উদ্দেশ্য ছিল না। আশা করি এটা আপনি বুঝতে পারছেন। আরেকটি কথা, যদি সেরকম কোনাে উদ্দেশ্য
আমার থাকে, তাহলে সেটা কি খুব দোষের কিছু? ভাগ্যগুণে বিরাট এক বড়লােকের ঘরে আপনার জন্ম হয়েছে, আমার ভাগ্য তেমন সুপ্রসন্ন ছিল না। তাই বলে আমার যদি আপনাকে ভালাে লাগে, সেটা আমি বলতে পারব না? যদি বলি সেটা দোষের হয়ে যাবে? | অপালা উঠে দাঁড়াল। ফিরােজ বলল, ‘কথার জবাব না-দিয়েই চলে যাচ্ছেন? আমি কাজ করব কি করব না, সেটা অন্তত বলে যান।
‘কাজ করবেন না কেন? অবশ্যি আপনার ইচ্ছা না-করলে ভিন্ন কথা।
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
ফিরােজ কাজে লেগে পড়ল। মতিনের ডিজাইন রাখল না। সম্পূর্ণ নিজের পরিকল্পনা। পছন্দ হলে হবে, না হলে হবে না। এক সপ্তাহ সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা ছ’টা পর্যন্ত কাজ। এর মধ্যে অপালাকে একটি বারের জন্যেও নিচে নামতে দেখা গেল না। এক বার কিছু সময়ের জন্যে বারান্দায় এসেছিল, ফিরােজের দিকে চোখ পড়তেই চট করে সরে গেল। অপমানিত হবার মতাে ঘটনা, কিন্তু ফিরােজকে তা স্পর্শ করল না। এক বার কাজে ডুবে গেলে অন্য কিছু তার মনে থাকে না। দেয়ালের ডিসটেম্পার বদলাতে গিয়ে মনে-মনে ভাবল—এই অহঙ্কারী মেয়ে থাকুক তার অহঙ্কার নিয়ে, আমার কিছুই যায় আসে না।
ডিসটেম্পারের রঙ কিছুতেই পছন্দ হচ্ছে না। তার প্রয়ােজন আকাশি রঙ, কিন্তু সেটা পাওয়া যাচ্ছে না। হয় বেশি গাঢ় হয়ে যাচ্ছে কিংবা বেশি হালকা। কড়া হলুদ এক বার দিয়ে দেখলে হয়। এতে রােদের এফেক্ট চলে আসতে পারে। হলুদ সবার অপছন্দের রঙ। ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে ম্যাজিকের মতাে এফেক্ট সৃষ্টি হতে পারে। সে চতুর্থ বার ডিসটেম্পার বদলে আবার আগের নীল রঙে ফিরে গেল। গৃহসজ্জায় দেয়াল খুবই জরুরি। এই দেয়ালের রঙ ঘরকে বন্দি করে ফেলবে কিংবা মুক্তি দেবে।
কাজ শেষ হবার পরও অপালা দেখতে গেল না। রমিলাকে বলল, ‘চলে যেতে বল। আর ম্যানেজারবাবুকে বল টাকাপয়সা মিটিয়ে দিতে।
দাড়িওয়ালা লােকটা আফনের পছন্দ হয়েছে কি না জানতে চায়। পছন্দ হয়েছে। বেশ পছন্দ হয়েছে। দেখলেন না তাে আফা! দেখতে ইচ্ছা করছে না।
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
অপালা তার দু’ দিন পর নিশানাথবাবুর সঙ্গে ঘর দেখতে গেল। তার বিস্ময়ের সীমা রইল না। এ কী অদ্ভুত কাণ্ড! কি-রকম ফাঁকা-ফাঁকা শান্তি-শান্তি ভাব। মেঝেতে এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত কার্পেটের মতাে শীতল পাটি। ছােট-ছােট বেতের চেয়ারে হালকা নীল রঙের গদি। চেয়ারগুলি একটি গােল সেন্ট্রাল টেবিলের চারপাশে এমনভাবে সাজান, যেন পদ্মফুল ফুটে আছে। শীতল পাটিটিকে লাগছে। দিঘির কালাে জলের মতাে। দেয়ালে একটিমাত্র জলরঙ ছবি। ঘন বন, মাঝখানে ছােট্ট একটি জলা। সেই জলার পানিতে আকাশের নীল রঙের ছায়া পড়েছে। একটি ছােট্ট মেয়ে সেই পানিতে ভাসছে। সমস্ত ঘরটায় একটা স্বপ্ন-স্বপ্ন ভাব চলে এসেছে। অপালার বিস্ময় কাটতে দীর্ঘ সময় লাগল।
‘ম্যানেজারকাকু, কেমন লাগছে আপনার কাছে?
‘ভালােই তাে’ ‘শুধু ভালােই তাে! আরাে কিছু বলুন।
‘ছােকরা এলেমদার, তবে বিরাট ফক্কড়। যত টাকা নিয়েছে এই ঘর করতে, এর সিকি টাকাও লাগে না। ছাের্করা বিরাট ফোরটোয়েন্টি।
Read more